📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 শারীয়াত ভিন্ন কোনো হাকীকাত নেই

📄 শারীয়াত ভিন্ন কোনো হাকীকাত নেই


অনুরূপভাবে অনেক মানুষ শারীআত নিয়ে কথা বলে কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহর যেসব হুকুম ও নির্দেশনা (আইন) দিয়ে আল্লাহ তাআলা রাসূলকে প্রেরণ করেছেন তার বিপরীতে একজন কাজী বা বিচারকের হুকুমের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। সৃষ্টিজগতের কেউ আল্লাহর নির্ধারিত আইনের বিরুদ্ধাচরণ করার অধিকার রাখে না, যে এমন করে সে একজন কাফির। আর বিচারকের হুকুম কখনো সঠিক হয় আবার কখনো ভুল হয়। এগুলো নির্ভর করে বিচারকের শারীআতের জ্ঞান, তাকওয়া ও ন্যায়পরায়ণতার ওপর। রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিচারকদের সম্পর্কে বলেছেন, 'কাজী তিন ধরনের। দুই ধরনের কাজী জাহান্নামে যাবে, এক প্রকার জান্নাতি হবে। যে সত্য জেনে ন্যায়সংগত ফায়সালা করে, সে জান্নাতি হবে।
আর যে কাজী না জেনেই মানুষের জন্য ফায়সালা করে, সে জাহান্নামি হবে। আর যে কাজী সত্য জানে, কিন্তু অন্যায় ফায়সালা করে, সে জাহান্নামি হবে।' [৩৪৭]
আদমসন্তানদের মধ্যে যত জ্ঞানী ও বিচারক আছে, তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ও বিচারক হলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ। বুখারি ও মুসলিমের বিশুদ্ধ হাদীসে এসেছে, বিচারকার্য সম্পাদন করা সম্পর্কে নবি বলেছেন, 'আমি একজন মানুষ। তোমরা তোমাদের ঝগড়া-ফাসাদ নিষ্পত্তির জন্য আমার কাছে এসে থাকো। তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ দলিল-প্রমাণ উত্থাপনে প্রতিপক্ষের তুলনায় বেশি সুদক্ষ হতে পারে। আমি তাদের বক্তব্য শুনে সেই অনুসারে হয়তো ফায়সালা দিতে পারি। এভাবে আমি যদি (অজ্ঞাতসারে) কারও জন্য তার অন্য কোনো মুসলিম ভাইয়ের হক তাকে দেয়ার ফায়সালা করি, তবে সে যেন তা গ্রহণ না করে। কেননা আমি যেন তাকে জাহান্নামের একটি টুকরোই কেটে দিলাম।' [৩৪৮]
এখানে নবি ﷺ জানিয়েছেন, কখনো কখনো তিনি শুনানির ওপর নির্ভর করে রায় প্রদান করেন। যদি ফায়সালা বাস্তবতার সাথে না মিলে, তবে যার পক্ষে ফায়সালা যাবে তার জন্য সেটা গ্রহণ করা বৈধ নয়। এ ক্ষেত্রে অন্যায় ফায়সালা গ্রহণকারী ব্যক্তি জাহান্নামের আগুনের একটি টুকরো গ্রহণ করল।
কোনো বিচারক তার সামনে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যা ন্যায়সংগত মনে করল, সে অনুসারে ফায়সালা প্রদান করল। কিন্তু এরপরেও ফায়সালা ভুল হতে পারে। সে ক্ষেত্রে যার পক্ষে ফায়সালা যাবে, তার জন্য উক্ত সম্পদ গ্রহণ করা বৈধ নয়। আলিমদের ঐকমত্য অনুসারে এখানে সব ধরনের সম্পদ অন্তর্ভুক্ত। যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রেও বিচারকের ভুল ফায়সালায় কারও পক্ষে রায় গেলে সেটা গ্রহণ করা অবৈধ বলে অনেক আলিম মত দিয়েছেন। যেমন: ইমাম মালিক, শাফিঈ, আহমাদ ইবনু হাম্বল।
আবূ হানিফা উভয় প্রকারের মধ্যে পার্থক্য করেছেন এবং কেবল সম্পত্তির অধিকারের ক্ষেত্রে উক্ত হাদীস প্রযোজ্য বলে মত দিয়েছেন।
আশ-শারউ (الشَّرْعُ) বা আশ-শারীআহ (الشَّرِيْعَةُ) শব্দের মাধ্যমে যখন কুরআন ও সুন্নাহকে বোঝানো হবে তখন আল্লাহর কোনো আউলিয়া বা অন্য কারও জন্য এর বিরুদ্ধাচরণের অনুমতি বা বৈধতা নেই। যে বিশ্বাস করে প্রকাশ্য কিংবা অপ্রকাশ্য বিষয়ে মুহাম্মাদ -এর অনুসরণ ব্যতীত অমুক আউলিয়ার তরীকা অনুসরণ করলে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যাবে, সে একজন কাফির।
‘আউলিয়াদের পথ (তরীকা) ভিন্ন’ এই মর্মে যারা সূরা কাহফে বর্ণিত মূসা ও খিযির -এর ঘটনাকে অপব্যাখ্যা করে, তারা দুইটি স্থানে ভুল করে।
(১) মূসাকে খিযিরের কাছে (রাসূল হিসেবে) পাঠানো হয়নি এবং মূসাকে অনুসরণ করা খিযিরের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল না। সুনির্দিষ্টভাবে বানী ইসরাঈলের কাছে মূসা -কে রাসূল হিসেবে পাঠানো হয়েছিল, অপরদিকে মুহাম্মাদ -কে পাঠানো হয়েছে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন জাতির কাছে অর্থাৎ জিন ও ইনসান জাতির কাছে।
যদি খিযিরের থেকে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তিরাও মুহাম্মাদ -এর সাক্ষাৎ পেতেন, যেমন: ইবরাহীম, মূসা বা ঈসা তবে তাদের জন্যেও মুহাম্মাদ -এর অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক হতো। সুতরাং খাজির একজন ওলি বা নবি যা-ই হোন না কেন, তিনিও মুহাম্মাদ -এর সাক্ষাৎ পেলে তাকে অনুসরণ করতে বাধ্য থাকতেন। এ জন্যেই মূসাকে খাজির বলেছিলেন, ‘হে মূসা, আপনি আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন ধরনের জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত, আল্লাহ তাআলা যা আপনাকে শিখিয়েছেন। আমি তা জানি না। আর আমিও আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন এক জ্ঞান লাভ করেছি, যা তিনি আমাকে শিখিয়েছেন। আপনি তা জানেন না।’ [৩৪১]
কিন্তু রাসূলুল্লাহ -এর বার্তা পৌঁছানোর পর আর কোনো জিন বা মানুষের জন্য এই কথা বলার কোনো সুযোগ নেই।
(২) কুরআনে বর্ণিত খাজিরের তিনটি ঘটনার একটিতেও মূসার শারীআতের কোনো লঙ্ঘন হয়নি। বরং সেগুলো বৈধ ছিল। যদিও প্রথমে মূসা সেই ঘটনাগুলোর বৈধতার কারণ বুঝতে পারছিলেন না। যখন খাজির ব্যাখ্যা করলেন, তিনি মেনে নিলেন। যালিম রাজা কর্তৃক নৌকা ছিনিয়ে নেওয়া হবে এই ভয়ে তাতে ছিদ্র করে দেওয়া এবং পরবর্তী সময় মেরামত করে দেওয়ার বৈধতা আছে। কোনো অত্যাচারী বা হামলাকারী যদি নাবালক হয়, তবুও তাকে হত্যার বৈধতা আছে। যদি কেউ পিতামাতার প্রতি অত্যাচারী হয় এবং তাকে হত্যা ব্যতীত অন্য কোনো উপায়ে তার প্রতিরোধ করা না যায় তবে তাকে হত্যা করা যায়।
নাজদা হারূরি এই ঘটনাকে দলিল হিসেবে ব্যবহার করে ইবনু আব্বাস -কে যখন নাবালকদের হত্যার ব্যাপারে প্রশ্ন করেছিলেন তখন তিনি তাকে জবাব দিয়েছিলেন, 'মূসার সাথি খাজির সেই বালকের ব্যাপারে যা জানত, তুমিও যদি তাদের ব্যাপারে তা জেনে থাকো তাহলে তাদেরকে হত্যা করতে পারো, আর তুমি তো তা জানো না। সুতরাং তাদেরকে হত্যা করা থেকে দূরে থাকো। কেননা রাসূলুল্লাহ নাবালকদেরকে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন...।' [৩৫০]
এ ছাড়া দুই এতিম বালকের প্রতি সদাচার (বিনিময় ছাড়া দেয়াল মেরামত করে দেওয়া) ও ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করে সবর করার মধ্যে আল্লাহর শারীআতের কোনো লঙ্ঘন নেই।
আর যখন আশ-শারউ (الشَّرْعُ) বা আশ-শারীআহ (الشَّرِيعَةُ) শব্দের মাধ্যমে কাজী বা শাসকের বিচার বোঝানো হয়, তখন যেহেতু তারা ন্যায়পরায়ণ হতে পারে আবার অত্যাচারীও হতে পারে, সঠিক সিদ্ধান্ত প্রদান করতে পারে বা ভুলও করতে পারে, তাই তাদের অনুসরণ কুরআন-সুন্নাহর মতো আবশ্যক না।
এই শব্দের মাধ্যমে কখনো কখনো ফিকহের ইমামদের মতামতও বোঝানো হয়, যেমন: আবূ হানীফা, সুফইয়ান সাওরি, মালিক ইবনু আনাস, আওযাঈ, লাইস ইবনু সাদ, শাফিঈ, আহমাদ ইবনু হাম্বল, ইসহাক ও দাউদ প্রমুখ। এই ব্যক্তিবর্গের মতামতের পক্ষে কুরআন ও সুন্নাহর দলিলের সমর্থন থাকা জরুরি। ইমামদের অনুসরণ করা বৈধ। তবে রাসূল -এর অনুসরণের ন্যায় অন্য কোনো ব্যক্তি বা ইমামের অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক নয়। আবার কোনো ইমামের অনুসরণ করা নিষিদ্ধও নয় (অর্থাৎ যখন কোনো ব্যক্তি শারীআতের মূল উৎস থেকে স্বাধীনভাবে হুকুম-আহকাম নির্ণয় করতে পারে না কিংবা অনুসৃত মতের দলিল সম্পর্কে অবগত থাকে)। এ ছাড়া যারা বিনা ইলমে কথা বলে তাদের মতামতের অনুসরণ করা নিষিদ্ধ ও হারাম।
যদি শারীআতের বহির্ভূত কোনো আইন-কানুনকে শারীআতের নামে চালিয়ে দেওয়া হয় (যেমন: হাদীস জাল করা কিংবা কোনো দলিলের অর্থ এমনভাবে পরিবর্তন করা যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল বোঝাননি), তখন এগুলো তাবদীল (আল্লাহর আইন বদল করা) এর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত শারীআতের বিপরীতে এসব পরিবর্তিত ও অপব্যাখ্যাকৃত আইন-কানুনকে পৃথক করা আবশ্যক। যেমন: সৃষ্টিজগতের ওপর আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরের হাকীকাত (বাস্তবতা) ও আল্লাহর দ্বীনের আদেশ-নিষেধের হাকীকাতের মধ্যে পার্থক্য করা আবশ্যক। আবার যাদের অবস্থান কুরআন ও সুন্নাহর দলিল দ্বারা সমর্থিত এবং যারা শুধু নিজেদের খেয়ালখুশি ও নফসের প্রবৃত্তির ওপর নির্ভরশীল, এদুয়ের মাঝেও ব্যবধান করা জরুরি।

টিকাঃ
[৩৪৭] আবূ দাউদ, ৩৫৭৩; তিরমিযি, ১৩২২, সহীহ。
[৩৪৮] বুখারি, ৬৯৬৭; মুসলিম, ১৭১৩。
[৩৪১] বুখারি, ৪৭২৫; মুসলিম, ২৩০৮。
[৩৫০] মুসলিম, ২৭২৮; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৩২৯৯。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00