📄 গুনাহের পক্ষে তাকদীরের দোহাই দেওয়া অবৈধ
যারা মনে করে তাকদীরের দোহাই দিয়ে গুনাহর শাস্তি থেকে বেঁচে যাওয়া যাবে তাদের কথা ওই মুশরিকদের মতো, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন,
سَيَقُولُ الَّذِينَ أَشْرَكُوا لَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا أَشْرَكْنَا وَلَا آبَاؤُنَا وَلَا حَرَّمْنَا مِن شَيْءٍ
'এখন মুশরিকরা বলবে, যদি আল্লাহ ইচ্ছা করতেন, তবে না আমরা শিরক করতাম, নাআমাদের বাপ-দাদারা এবংনা আমরা কোনো বস্তুকেহারাম করতাম।[৩০২]
এই ভ্রান্ত আবদারের জবাবে আল্লাহ বলেছেন,
كَذَلِكَ كَذَّبَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ حَتَّى ذَاقُوا بَأْسَنَا قُلْ هَلْ عِندَكُم مِّنْ عِلْمٍ فَتُخْرِجُوهُ لَنَا إِن تَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ أَنتُمْ إِلَّا تَخْرُصُونَ قُلْ فَلِلَّهِ الْحُجَّةُ الْبَالِغَةُ فَلَوْ شَاءَ لَهَدَاكُمْ أَجْمَعِينَ
'এমনিভাবে তাদের পূর্ববর্তীরা মিথ্যারোপ করেছে, এমনকি তারা আমার শাস্তি আস্বাদন করেছে। আপনি বলুন, তোমাদের কাছে কি কোনো প্রমাণ আছে যা আমাদেরকে দেখাতে পারো। তোমরা শুধু আন্দাজের অনুসরণ করো এবং তোমরা শুধু অনুমান করে কথা বলো। আপনি বলে দিন, অতএব, পরিপূর্ণ যুক্তি আল্লাহরই। তিনি ইচ্ছা করলে তোমাদের সবাইকে পথ প্রদর্শন করতেন।' [৩৩৩]
যদি তাকদীরের দোহাই দেওয়া বৈধ হতো তবে আল্লাহ তাআলা কওমে নূহ, আদ, সামূদ, লূত ও ফিরআউনের দলবলকে শাস্তি দিতেন না। কিংবা যারা শারীআতের নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন করে তাদের ওপর হুদূদ (শাস্তি) কার্যকরের আদেশ দিতেন না। যারা হিদায়াতের পরিবর্তে নিজেদের খেয়ালখুশির অনুসরণ করে তারা ব্যতীত কেউ তাকদীরের দোহাই দেয় না। যারা তাকদীরের দোহাই দিয়ে গুনাহগারদের নিন্দামন্দ করে না বা শাস্তি প্রদান করে না তারা তো কখনোই কাউকে নিন্দা বা শাস্তি প্রদান করতে পারবে না, তা সে যত জঘন্য অপরাধই করুক না কেন! এ ক্ষেত্রে যেসব কাজে মানুষ আনন্দ পায় এবং যেসব কাজে কষ্ট পায় সবই তার কাছে সমান হওয়া উচিত। সুতরাং যারা তার উপকার করে কিংবা ক্ষতি করে তাদের মধ্যে পার্থক্য করা উচিত না। সহজেই বোঝা যাচ্ছে যে, এ ধরনের ভ্রান্ত অবস্থান যুক্তি, বুদ্ধি ও শারীআতের আইনে কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ বলেন,
أَمْ نَجْعَلُ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَالْمُفْسِدِينَ فِي الْأَرْضِ أَمْ نَجْعَلُ الْمُتَّقِينَ كَالْفُجَّارِ
'আমি কি বিশ্বাসী ও সৎকর্মশীলদের পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী কাফিরদের সমতুল্য করে দেবো? না মুত্তাকীদের পাপাচারীদের সমান করে দেবো?' [৩৩৪]
أَفَنَجْعَلُ الْمُسْلِمِينَ كَالْمُجْرِمِينَ مَا لَكُمْ كَيْفَ تَحْكُمُونَ
'আমি কি মুসলিমদের অপরাধীদের ন্যায় গণ্য করব? তোমাদের কী হলো? তোমরা কেমন সিদ্ধান্ত দিচ্ছ?'[৩৩৫]
أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ اجْتَرَحُوا السَّيِّئَاتِ أَن نَّجْعَلَهُمْ كَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ سَوَاءٌ تَحْيَاهُمْ وَمَمَاتُهُمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ
'যারা দুষ্কর্ম উপার্জন করেছে তারা কি মনে করে যে, আমি তাদেরকে সে লোকদের মতো করে দেবো, যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং তাদের জীবন ও মুত্যু কি সমান হবে? তাদের দাবি কত মন্দ!' [৩৩৬]
টিকাঃ
[৩০২] সূরা আনআম, ৬: ১৪৮。
[৩৩৩] সূরা আনআম, ৬: ১৪৮-১৪৯。
[৩৩৪] সূরা সাদ, ৩৮: ২৮。
[৩৩৫] সূরা কলম, ৬৮: ৩৫-৩৬。
📄 আদম ও মুসার বিতর্ক
أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ
'তোমরা কি ধারণা করো যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে না?' [৩৩৭]
أَيَحْسَبُ الْإِنسَانُ أَن يُتْرَكَ سُدًى
'মানুষ কি মনে করে যে, তাকে এমনি ছেড়ে দেওয়া হবে?' [৩৩৮]
এমনিতেই ছেড়ে দেওয়ার অর্থ তাকে উপেক্ষা করা, কোনো আদেশ-নিষেধ প্রদান না করা।
সহীহ হাদীসে এসেছে নবি বলেছেন, 'আদম ও মূসা তাঁদের প্রতিপালকের কাছে তর্কে অবতীর্ণ হলেন। আদম মূসা-এর ওপর বিজয়ী হলেন। মূসা বললেন, 'আপনি তো সেই আদম যাকে আল্লাহ তাআলা আপন হাতে সৃষ্টি করেছেন এবং আপনার মাঝে তিনি তাঁর রূহ ফুঁকে দিয়েছেন, তিনি তাঁর ফেরেশতাদের দ্বারা আপনাকে সাজদা করিয়েছেন এবং তাঁর জান্নাতে আপনাকে বসবাস করতে দিয়েছেন। এরপর আপনি আপনার ভুলের দ্বারা মানুষকে পৃথিবীতে নামিয়ে এনেছেন।' আদম বললেন, 'তুমি তো সেই মূসা যাকে আল্লাহ তাআলা রিসালাতের দায়িত্ব ও তাঁর কালামসহ বিশেষ মর্যাদায় মনোনীত করেছেন এবং তোমাকে দান করেছেন ফলকসমূহ (তাওরাত কিতাব), যাতে সবকিছুর বর্ণনা লিপিবদ্ধ আছে এবং একান্তে কথোপকথনের জন্য নৈকট্য দান করেছে। আচ্ছা আমার সৃষ্টির কত বছর আগে আল্লাহ তাআলা তাওরাত লিপিবদ্ধ করেছেন বলে তুমি দেখতে পেয়েছ?' মূসা বললেন, 'চল্লিশ বছর আগে।' আদম বললেন, 'তুমি কি তাতে এ কথা পেয়েছ, وَعَصْى آدَمُ رَبَّهُ فَغَوْى আদম তাঁর প্রতিপালকের নির্দেশ অমান্য করেছে এবং পথহারা হয়েছে।' বললেন, 'হ্যাঁ।'
আদম বললেন, 'তারপরও তুমি আমাকে আমার এমন কাজের জন্য কেন তিরস্কার করছ যা আমাকে সৃষ্টি করার চল্লিশ বছর আগে আল্লাহ তাআলা আমার ওপর নির্ধারণ করে রেখেছে?” রাসূলুল্লাহ বলেন, 'এরপর আদম মূসা-এর ওপর বিজয়ী হলেন।' [৩৩৯]
এই হাদীসকে বুঝতে ব্যর্থ হয়ে দুইটি দল পথভ্রষ্ট হয়েছে। একদল একে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে (যদিও এর সনদ বিশুদ্ধ) কারণ তারা মনে করেছে, এখানে তাকদীরের দোহাই দিয়ে সকল অবাধ্যতাকারীকে নিন্দা ও শাস্তি থেকে রেহাই দেওয়া হয়েছে।
আরেক দলের বুঝ (হাদীস প্রত্যাখানের চেয়েও) আরও বিভ্রান্তিকর। তারা বিশ্বাস করে, আল্লাহর অবাধ্যতার পক্ষে তাকদীরের দোহাই দেয়া বৈধ। তাদের অনেকে বলতে পারে, হাকীকাতের পর্যায়ে থাকা লোকদের জন্য তাকদীরের দোহাই দেয়া বৈধ, তাদের নিজেদের কাজ বলতে কিছু নেই (তারা বিশ্বাস করে, তারা আল্লাহর সাথে মিশে গেছে—এমন দাবি থেকে আল্লাহ পবিত্র!)।
অনেকেই এই হাদীসের ব্যাখ্যা করে বলে, পিতা হওয়ার কারণে আদম বিতর্কে জয়ী হয়েছিলেন অথবা তিনি তাওবা করেছিলেন বলে অথবা গুনাহ হয়েছিল শারীআতে আর তিরস্কার করেছিল ভিন্ন ক্ষেত্রে, অথবা সেটা রূহের জগৎ ছিল আর এটা দুনিয়ার জগৎ—এ ধরনের ব্যাখ্যার একটিও সঠিক নয়; সবগুলো ভুল ও মিথ্যা।
এই হাদীসের সঠিক অর্থ: নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণ করার কারণে মানবজাতির ওপর যে দুর্দশা নেমে এসেছে কেবল সেজন্যই মূসা পিতা আদমকে তিরস্কার করেছেন। ফলে তিনি বলেছেন, কেন আপনি নিজেকে এবং আমাদেরকে জান্নাত থেকে বহিষ্কার করালেন? যে ভুলের জন্য আদম আ.-ও আগেই তাওবা করেছেন সেজন্য তাকে নিন্দা করেননি, কারণ মূসা নিশ্চিতভাবেই জানেন তাওবা করার পর কাউকে সেজন্য তিরস্কার করা যায় না। কারণ, তিনি নিজেও তার কৃত ভুলের জন্য তাওবা করেছিলেন। আর আদমও যদি সে ক্ষেত্রে তাকদীরের দোহাই দেওয়া বৈধ মনে করতেন তবে তিনি গুনাহ মাফের জন্য এই দুআ করতেন না,
টিকাঃ
[৩৩৬] সূরা জাসিয়া, ৪৫: ২১。
[৩৩৭] সূরা মুমিনূন, ২৩: ১১৫。
[৩৩৮] সূরা কিয়ামাহ, ৭৫: ৩৬。
[৩৩৯] মুসলিম, ২৬৫২; বুখারি, ৩৪০৯。
📄 তাকদীরের উপর সন্তুষ্টি
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
'... হে আমাদের পালনকর্তা, আমরা নিজেদের প্রতি যুলুম করেছি। যদি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি অনুগ্রহ না করেন, তবে আমরা অবশ্যই অবশ্যই ধ্বংস হয়ে যাব।' [৩৪০]
বিপদ-আপদের মুখে মুমিনদের সবরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীর গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। গুনাহ করলে তাওবা-ইস্তিগফারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَاصْبِرْ إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنبِكَ
'অতএব, আপনি সবর করুন নিশ্চয় আল্লাহর ওয়াদা সত্য। আপনি আপনার গুনাহের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করুন...।' [৩৪১]
এখানে আল্লাহ তাআলা বিপদের মুখে সবরের নির্দেশ দিয়েছেন এবং নিন্দনীয় কাজ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বলেছেন। আল্লাহ বলেন,
مَا أَصَابَ مِن مُّصِيبَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ وَمَن يُؤْمِن بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُ
'আল্লাহর নির্দেশ ব্যতিরেকে কোনো বিপদ আসে না এবং যে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস করে, তিনি তার অন্তরকে সৎপথ প্রদর্শন করেন।' [৩৪২]
উক্ত আয়াত সম্পর্কে ইবনু মাসউদ (রদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, 'সে-ই সত্যিকারের পুরুষ যে হাসিমুখে বিপদ কবুল করে নেয়, সবর করে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে জেনে সন্তুষ্ট থাকে।'[৩৪৩]
কাজেই মুমিনরা অসুস্থতা, দারিদ্র্য বা যুলুমের মতো দুঃখ-দুর্দশার শিকার হলে আল্লাহর হুকুমের সামনে সবর করে, ধৈর্য ধরে। যদিও সেসব বিপর্যয় অন্য কারও গুনাহের কারণে হোক না কেন। যেমন: কারও পিতা আল্লাহর অবাধ্যতার কাজে সমস্ত সম্পদ খরচ করে ফেলল এরপর সন্তান দরিদ্র হয়ে গেল, তখন এই বিপর্যয়ের জন্য সন্তানকে সবর করতে হবে। যদি সে এ জন্য পিতাকে তিরস্কার করে, তবে ওই সন্তানকে তাকদীরের ব্যাপারে স্মরণ করিয়ে দেওয়া বৈধ হবে। আলিমদের সর্বসম্মত মতে, বিপদ-মুসীবতে সবর করা বাধ্যতামূলক। তবে তাকদীরের ওপর সন্তুষ্ট থাকা এর চেয়েও উঁচু মর্যাদার। অনেকের মতে, সন্তুষ্ট থাকা বাধ্যতামূলক। আবার অনেকের মতে, সন্তুষ্ট থাকা প্রশংসনীয় তবে বাধ্যতামূলক নয়—এটাই সঠিক মতামত।
বিপদের মুখে আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরে সন্তুষ্ট থাকার চেয়েও উচ্চতর স্তর হলো আপতিত বিপদের জন্য আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায় করা! কারণ, অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি বিপদের মধ্যে অনেক নিয়ামাত দেখতে পায়। যেমন: গুনাহ মাফের মর্যাদা বৃদ্ধি, আল্লাহর দিকে ফিরে আসার সুযোগ, তাঁর সামনে নত হওয়া, নিয়তের বিশুদ্ধতা অর্জন এবং গাইরুল্লাহ বাদে এককভাবে আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ ভরসা করা।
আর যারা পথভ্রষ্ট সীমালঙ্ঘনকারী, তারা নিজেদের খেয়ালখুশি, কামনা-বাসনা ও অন্যায়ের পক্ষে যুক্তি হিসেবে তাকদীরের দোহাই দেয়। অথচ ভালো কাজের জন্য নিজের কৃতিত্ব দাবি করে, এ ক্ষেত্রে আল্লাহকে ধন্যবাদ দেয় না। জনৈক আলিম বলেছেন, 'অনুগত থাকলে তুমি কাদরিয়্যা, অবাধ্যতা করলে তুমি জাবরিয়্যা, আসলে তুমি তা-ই, যা তোমার খেয়ালখুশির সাথে মিলে যায়!' [৩৪৪]
আর যারা হিদায়াতের অনুসারী ও নেক আমল সম্পাদনকারী, তারা যখন কোনো ভালো আমল করে তখন এর মাধ্যমে তারা আল্লাহর নিয়ামাত প্রত্যক্ষ করে। তারা বুঝতে পারে আল্লাহ তাআলা তার প্রতি উদার এবং তাকে ইসলাম দিয়ে ধন্য করেছেন, তাদের মাঝে শামিল করেছেন যারা সালাত কায়েম করে, তাকওয়া প্রদান করেছেন এবং আল্লাহর শক্তি ও সাহায্য ছাড়া কোনো ভালো কাজ করা সম্ভব নয় এবং গুনাহ থেকে বাঁচাও সম্ভব নয়। তাকদীরের প্রতি সঠিক বুঝ রাখার কারণে তারা নিজেদেরকে নিয়ে অতি আনন্দিত হয় না, নিজেদের কাজের জন্য কৃতিত্ব দাবি করে না এবং কারও প্রতি অনুগ্রহ করে খোঁটা দেয় না। আর গুনাহ করলে তারা আল্লাহর কাছে তাওবা ও ইসতিগফার করে।
শাদ্দাদ ইবনু আওস বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "সাইয়্যিদুল ইসতিগফার' বা সর্বোত্তম ক্ষমা প্রার্থনা হলো, বান্দা বলবে,
اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَى وَأَبُوْءُ لَكَ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهَ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ إِلَّا أَنْتَ
'হে আল্লাহ, তুমি আমার রব। তুমি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই; তুমি আমায় সৃষ্টি করেছ। আমি তোমারই বান্দা। আমি আমার সাধ্যমতো তোমার সাথে কৃত ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বদ্ধপরিকর। আমি যা কিছু করেছি তার মন্দ প্রভাব থেকে বাঁচার জন্যে তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তুমি যেসব নিয়ামাত আমাকে দান করেছ তার স্বীকৃতি প্রদান করছি। আমি তোমার নিকট আমার সকল অন্যায় ও অপরাধ স্বীকার করছি। অতএব, তুমি আমায় মার্জনা করো। কেননা, তুমি ছাড়া অপরাধ মার্জনা করার ক্ষমতা আর কারও নেই।'
কোনো ব্যক্তি পূর্ণ প্রত্যয় সহকারে দিনের বেলা এই দুআ পাঠ করে যদি সন্ধ্যার পূর্বেই মারা যায় তবে সে জান্নাতবাসী হবে। আর কোনো ব্যক্তি যদি পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাস সহকারে রাতের বেলা এই দুআ পাঠ করে সকাল হওয়ার পূর্বেই মারা যায়, তবে সেও জান্নাতে যাবে।' [৩৪৫]
আবূ যার থেকে বর্ণিত, নবি আপন রবের নিকট থেকে বর্ণনা করে বলেন, তিনি বলেছেন, 'হে আমার বান্দাগণ, আমি যুলুমকে আমার জন্য হারাম করে দিয়েছি, আর তা তোমাদের মধ্যেও হারাম করে দিয়েছি; অতএব তোমরা একে অপরের ওপর যুলুম কোরো না। হে আমার বান্দাগণ, আমি যাকে হিদায়াত দিয়েছি সে ছাড়া তোমরা সকলেই পথভ্রষ্ট। সুতরাং আমার কাছে হিদায়াত চাও, আমি তোমাদের হিদায়াত দান করব। হে আমার বান্দাগণ, আমি যাকে অন্ন দান করেছি, সে ছাড়া তোমরা সকলেই ক্ষুধার্ত। সুতরাং তোমরা আমার নিকট খাদ্য চাও, আমি তোমাদের খাদ্য দান করব। হে আমার বান্দাগণ, তোমরা সবাই বিবস্ত্র, সে ব্যতীত যাকে আমি কাপড় পরিয়েছি। সুতরাং আমার কাছে বস্ত্র চাও, আমি তোমাদেরকে বস্ত্র দান করব। হে আমার বান্দাগণ, তোমরা রাতদিন গুনাহ করছ, আর আমিই তোমাদের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিই। সুতরাং আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দেবো। হে আমার বান্দাগণ, তোমরা কখনোই আমার ক্ষতি করার সামর্থ্য রাখো না যে, আমার ক্ষতি করবে; আর তোমরা কখনোই আমার উপকার করার ক্ষমতা রাখো না যে, আমার উপকার করবে।
'হে আমার বান্দাগণ, তোমরা পূর্বাপর সকল মানুষ ও জিন যদি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় মুত্তাকী ও পরহেযগার ব্যক্তির হৃদয়ের মতো হয়ে যায়, তবে তা আমার রাজত্বে কিছুই বৃদ্ধি করবে না। আমার বান্দাগণ, তোমাদের পূর্বাপর সকল মানুষ ও জিন যদি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে পাপী ব্যক্তির হৃদয়ের মতো হয়ে যায়, তবে তা আমার রাজত্বে কিছুই কমাতে পারবে না। হে আমার বান্দাগণ, তোমাদের পূর্বের ও তোমাদের পরের সকলে, তোমাদের সমস্ত মানুষ ও তোমাদের সমস্ত জিন যদি সবাই একটি ময়দানে দাঁড়িয়ে আমার কাছে চায় এবং আমি সকলের চাওয়া পূরণ করে দিই তবে আমার নিকট যা আছে তা থেকে কেবল ততটুকুই কমতে পারে যেমন সমুদ্রের পানিতে একটি সুই রাখলে তা যতটা কমায়। হে আমার বান্দাগণ, আমি তোমাদের আমলকে (কাজকে) তোমাদের জন্য গণনা করে রাখি, আর আমি তার পুরোপুরি প্রতিফল দিয়ে দেবো। সুতরাং যে ব্যক্তি উত্তম প্রতিফল পাবে তার উচিত আল্লাহর প্রশংসা করা, আর যে তার বিপরীত পাবে সে যেন শুধু তার নিজেকেই ধিক্কার দেয়।'[৩৪৬]
এখানে আল্লাহ তাআলা কল্যাণকর জিনিসের জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন, আর মন্দ বিষয়ের জন্য অন্য কাউকে দোষারোপ করার কথা বলেননি, শুধু নিজেকেই দায়ী করতে বলেছে। অনেকেই হাকীকাতের কথা বলে কিন্তু আল্লাহর কদরের হাকীকাত বুঝতে ব্যর্থ হয়। তারা আল্লাহর সৃষ্টি ও কর্ম, বিভিন্ন ঘটনা নির্ধারণ, আদেশ-নিষেধ, দ্বীনের সাথে সম্পর্কিত সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টির হাকীকাত বোঝে না। অপরদিকে তারা সেই দুই ব্যক্তি মধ্যেও পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়, যাদের একজন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ অনুসারে দ্বীনের হাকীকাতের ওপর দৃঢ় থাকে এবং অপরজন কেবল নিজের খেয়ালখুশি ও ঝোঁকের অনুসরণ করে; কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সেগুলো মিলিয়ে দেখার পরোয়া করে না।
টিকাঃ
[৩৪০] সূরা আ'রাফ, ৭: ২৩。
[৩৪১] সূরা মুমিন, ৪০ : ৫৫。
[৩৪২] সূরা তাগাবুন, ৬৪: ১১。
[৩৪৩] তাবারি, তাফসীর, ২৮/১২৩。
[৩৪৪] নোট: মুসলিমদের মধ্যে এই দুটি বিভ্রান্ত চিন্তাধারা বৃদ্ধি পেয়েছে। কাদরিয়্যা ফিরকা অনুসারে, মানুষ নিজেই তার কর্মের স্রষ্টা। তারা বলে, আল্লাহ তাঁর সকল বান্দার আনুগত্যের ইচ্ছা করলেন কিন্তু কিছু বান্দারা আল্লাহর ইচ্ছাকে পরাজিত করে গুনাহ করল! আর জাবরিয়্যা ফিরকা অনুসারে, মানুষ তার (ভালো-মন্দ) কোনো আমলের জন্যে দায়ী নয়; যেহেতু কদীরে নির্ধারিত।-ইংরেজি অনুবাদক。
[৩৪৫] বুখারি, ৬৩০৬, ৬৩২৩。
[৩৪৬] মুসলিম, ২৫৭৭。
📄 শারীয়াত ভিন্ন কোনো হাকীকাত নেই
অনুরূপভাবে অনেক মানুষ শারীআত নিয়ে কথা বলে কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহর যেসব হুকুম ও নির্দেশনা (আইন) দিয়ে আল্লাহ তাআলা রাসূলকে প্রেরণ করেছেন তার বিপরীতে একজন কাজী বা বিচারকের হুকুমের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। সৃষ্টিজগতের কেউ আল্লাহর নির্ধারিত আইনের বিরুদ্ধাচরণ করার অধিকার রাখে না, যে এমন করে সে একজন কাফির। আর বিচারকের হুকুম কখনো সঠিক হয় আবার কখনো ভুল হয়। এগুলো নির্ভর করে বিচারকের শারীআতের জ্ঞান, তাকওয়া ও ন্যায়পরায়ণতার ওপর। রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিচারকদের সম্পর্কে বলেছেন, 'কাজী তিন ধরনের। দুই ধরনের কাজী জাহান্নামে যাবে, এক প্রকার জান্নাতি হবে। যে সত্য জেনে ন্যায়সংগত ফায়সালা করে, সে জান্নাতি হবে।
আর যে কাজী না জেনেই মানুষের জন্য ফায়সালা করে, সে জাহান্নামি হবে। আর যে কাজী সত্য জানে, কিন্তু অন্যায় ফায়সালা করে, সে জাহান্নামি হবে।' [৩৪৭]
আদমসন্তানদের মধ্যে যত জ্ঞানী ও বিচারক আছে, তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ও বিচারক হলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ। বুখারি ও মুসলিমের বিশুদ্ধ হাদীসে এসেছে, বিচারকার্য সম্পাদন করা সম্পর্কে নবি বলেছেন, 'আমি একজন মানুষ। তোমরা তোমাদের ঝগড়া-ফাসাদ নিষ্পত্তির জন্য আমার কাছে এসে থাকো। তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ দলিল-প্রমাণ উত্থাপনে প্রতিপক্ষের তুলনায় বেশি সুদক্ষ হতে পারে। আমি তাদের বক্তব্য শুনে সেই অনুসারে হয়তো ফায়সালা দিতে পারি। এভাবে আমি যদি (অজ্ঞাতসারে) কারও জন্য তার অন্য কোনো মুসলিম ভাইয়ের হক তাকে দেয়ার ফায়সালা করি, তবে সে যেন তা গ্রহণ না করে। কেননা আমি যেন তাকে জাহান্নামের একটি টুকরোই কেটে দিলাম।' [৩৪৮]
এখানে নবি ﷺ জানিয়েছেন, কখনো কখনো তিনি শুনানির ওপর নির্ভর করে রায় প্রদান করেন। যদি ফায়সালা বাস্তবতার সাথে না মিলে, তবে যার পক্ষে ফায়সালা যাবে তার জন্য সেটা গ্রহণ করা বৈধ নয়। এ ক্ষেত্রে অন্যায় ফায়সালা গ্রহণকারী ব্যক্তি জাহান্নামের আগুনের একটি টুকরো গ্রহণ করল।
কোনো বিচারক তার সামনে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যা ন্যায়সংগত মনে করল, সে অনুসারে ফায়সালা প্রদান করল। কিন্তু এরপরেও ফায়সালা ভুল হতে পারে। সে ক্ষেত্রে যার পক্ষে ফায়সালা যাবে, তার জন্য উক্ত সম্পদ গ্রহণ করা বৈধ নয়। আলিমদের ঐকমত্য অনুসারে এখানে সব ধরনের সম্পদ অন্তর্ভুক্ত। যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রেও বিচারকের ভুল ফায়সালায় কারও পক্ষে রায় গেলে সেটা গ্রহণ করা অবৈধ বলে অনেক আলিম মত দিয়েছেন। যেমন: ইমাম মালিক, শাফিঈ, আহমাদ ইবনু হাম্বল।
আবূ হানিফা উভয় প্রকারের মধ্যে পার্থক্য করেছেন এবং কেবল সম্পত্তির অধিকারের ক্ষেত্রে উক্ত হাদীস প্রযোজ্য বলে মত দিয়েছেন।
আশ-শারউ (الشَّرْعُ) বা আশ-শারীআহ (الشَّرِيْعَةُ) শব্দের মাধ্যমে যখন কুরআন ও সুন্নাহকে বোঝানো হবে তখন আল্লাহর কোনো আউলিয়া বা অন্য কারও জন্য এর বিরুদ্ধাচরণের অনুমতি বা বৈধতা নেই। যে বিশ্বাস করে প্রকাশ্য কিংবা অপ্রকাশ্য বিষয়ে মুহাম্মাদ -এর অনুসরণ ব্যতীত অমুক আউলিয়ার তরীকা অনুসরণ করলে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যাবে, সে একজন কাফির।
‘আউলিয়াদের পথ (তরীকা) ভিন্ন’ এই মর্মে যারা সূরা কাহফে বর্ণিত মূসা ও খিযির -এর ঘটনাকে অপব্যাখ্যা করে, তারা দুইটি স্থানে ভুল করে।
(১) মূসাকে খিযিরের কাছে (রাসূল হিসেবে) পাঠানো হয়নি এবং মূসাকে অনুসরণ করা খিযিরের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল না। সুনির্দিষ্টভাবে বানী ইসরাঈলের কাছে মূসা -কে রাসূল হিসেবে পাঠানো হয়েছিল, অপরদিকে মুহাম্মাদ -কে পাঠানো হয়েছে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন জাতির কাছে অর্থাৎ জিন ও ইনসান জাতির কাছে।
যদি খিযিরের থেকে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তিরাও মুহাম্মাদ -এর সাক্ষাৎ পেতেন, যেমন: ইবরাহীম, মূসা বা ঈসা তবে তাদের জন্যেও মুহাম্মাদ -এর অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক হতো। সুতরাং খাজির একজন ওলি বা নবি যা-ই হোন না কেন, তিনিও মুহাম্মাদ -এর সাক্ষাৎ পেলে তাকে অনুসরণ করতে বাধ্য থাকতেন। এ জন্যেই মূসাকে খাজির বলেছিলেন, ‘হে মূসা, আপনি আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন ধরনের জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত, আল্লাহ তাআলা যা আপনাকে শিখিয়েছেন। আমি তা জানি না। আর আমিও আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন এক জ্ঞান লাভ করেছি, যা তিনি আমাকে শিখিয়েছেন। আপনি তা জানেন না।’ [৩৪১]
কিন্তু রাসূলুল্লাহ -এর বার্তা পৌঁছানোর পর আর কোনো জিন বা মানুষের জন্য এই কথা বলার কোনো সুযোগ নেই।
(২) কুরআনে বর্ণিত খাজিরের তিনটি ঘটনার একটিতেও মূসার শারীআতের কোনো লঙ্ঘন হয়নি। বরং সেগুলো বৈধ ছিল। যদিও প্রথমে মূসা সেই ঘটনাগুলোর বৈধতার কারণ বুঝতে পারছিলেন না। যখন খাজির ব্যাখ্যা করলেন, তিনি মেনে নিলেন। যালিম রাজা কর্তৃক নৌকা ছিনিয়ে নেওয়া হবে এই ভয়ে তাতে ছিদ্র করে দেওয়া এবং পরবর্তী সময় মেরামত করে দেওয়ার বৈধতা আছে। কোনো অত্যাচারী বা হামলাকারী যদি নাবালক হয়, তবুও তাকে হত্যার বৈধতা আছে। যদি কেউ পিতামাতার প্রতি অত্যাচারী হয় এবং তাকে হত্যা ব্যতীত অন্য কোনো উপায়ে তার প্রতিরোধ করা না যায় তবে তাকে হত্যা করা যায়।
নাজদা হারূরি এই ঘটনাকে দলিল হিসেবে ব্যবহার করে ইবনু আব্বাস -কে যখন নাবালকদের হত্যার ব্যাপারে প্রশ্ন করেছিলেন তখন তিনি তাকে জবাব দিয়েছিলেন, 'মূসার সাথি খাজির সেই বালকের ব্যাপারে যা জানত, তুমিও যদি তাদের ব্যাপারে তা জেনে থাকো তাহলে তাদেরকে হত্যা করতে পারো, আর তুমি তো তা জানো না। সুতরাং তাদেরকে হত্যা করা থেকে দূরে থাকো। কেননা রাসূলুল্লাহ নাবালকদেরকে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন...।' [৩৫০]
এ ছাড়া দুই এতিম বালকের প্রতি সদাচার (বিনিময় ছাড়া দেয়াল মেরামত করে দেওয়া) ও ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করে সবর করার মধ্যে আল্লাহর শারীআতের কোনো লঙ্ঘন নেই।
আর যখন আশ-শারউ (الشَّرْعُ) বা আশ-শারীআহ (الشَّرِيعَةُ) শব্দের মাধ্যমে কাজী বা শাসকের বিচার বোঝানো হয়, তখন যেহেতু তারা ন্যায়পরায়ণ হতে পারে আবার অত্যাচারীও হতে পারে, সঠিক সিদ্ধান্ত প্রদান করতে পারে বা ভুলও করতে পারে, তাই তাদের অনুসরণ কুরআন-সুন্নাহর মতো আবশ্যক না।
এই শব্দের মাধ্যমে কখনো কখনো ফিকহের ইমামদের মতামতও বোঝানো হয়, যেমন: আবূ হানীফা, সুফইয়ান সাওরি, মালিক ইবনু আনাস, আওযাঈ, লাইস ইবনু সাদ, শাফিঈ, আহমাদ ইবনু হাম্বল, ইসহাক ও দাউদ প্রমুখ। এই ব্যক্তিবর্গের মতামতের পক্ষে কুরআন ও সুন্নাহর দলিলের সমর্থন থাকা জরুরি। ইমামদের অনুসরণ করা বৈধ। তবে রাসূল -এর অনুসরণের ন্যায় অন্য কোনো ব্যক্তি বা ইমামের অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক নয়। আবার কোনো ইমামের অনুসরণ করা নিষিদ্ধও নয় (অর্থাৎ যখন কোনো ব্যক্তি শারীআতের মূল উৎস থেকে স্বাধীনভাবে হুকুম-আহকাম নির্ণয় করতে পারে না কিংবা অনুসৃত মতের দলিল সম্পর্কে অবগত থাকে)। এ ছাড়া যারা বিনা ইলমে কথা বলে তাদের মতামতের অনুসরণ করা নিষিদ্ধ ও হারাম।
যদি শারীআতের বহির্ভূত কোনো আইন-কানুনকে শারীআতের নামে চালিয়ে দেওয়া হয় (যেমন: হাদীস জাল করা কিংবা কোনো দলিলের অর্থ এমনভাবে পরিবর্তন করা যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল বোঝাননি), তখন এগুলো তাবদীল (আল্লাহর আইন বদল করা) এর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত শারীআতের বিপরীতে এসব পরিবর্তিত ও অপব্যাখ্যাকৃত আইন-কানুনকে পৃথক করা আবশ্যক। যেমন: সৃষ্টিজগতের ওপর আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরের হাকীকাত (বাস্তবতা) ও আল্লাহর দ্বীনের আদেশ-নিষেধের হাকীকাতের মধ্যে পার্থক্য করা আবশ্যক। আবার যাদের অবস্থান কুরআন ও সুন্নাহর দলিল দ্বারা সমর্থিত এবং যারা শুধু নিজেদের খেয়ালখুশি ও নফসের প্রবৃত্তির ওপর নির্ভরশীল, এদুয়ের মাঝেও ব্যবধান করা জরুরি।
টিকাঃ
[৩৪৭] আবূ দাউদ, ৩৫৭৩; তিরমিযি, ১৩২২, সহীহ。
[৩৪৮] বুখারি, ৬৯৬৭; মুসলিম, ১৭১৩。
[৩৪১] বুখারি, ৪৭২৫; মুসলিম, ২৩০৮。
[৩৫০] মুসলিম, ২৭২৮; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৩২৯৯。