📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 আকলের মর্যাদা সংক্রান্ত জাল বর্ণনা

📄 আকলের মর্যাদা সংক্রান্ত জাল বর্ণনা


একটি জাল হাদীস অনুসারে তারা আকলের উক্ত মর্যাদা কল্পনা করেছে; জাল হাদীসটি হলো:
أنَّ أَوَّلَ ما خلق الله العقل فقالَ لَهُ أقبل فأقبل فقالَ لَهُ أُدبِرُ فَأَدبَرَ فقال وعِزَّتى ما خلقت خلقًا أَكْرَمَ عَلَى مِنْكَ فِيكَ أَخُذُ وبِكَ أُعطى ولَكَ الثواب وعليك العقاب
'আল্লাহ প্রথমে 'আকল' সৃষ্টি করলেন। এরপর তাকে ডাকলেন এবং সে হাজির হলো। এরপর তাকে চলে যেতে বললেন এবং সেটা চলে গেল। এরপর তিনি বললেন, আমার শক্তির কসম আমি তোমার থেকে অধিক মর্যাদাপূর্ণ কিছুই সৃষ্টি করিনি। যা কিছু গ্রহণযোগ্য আমি তোমার মাধ্যমে গ্রহণ করব এবং যা কিছু প্রদানযোগ্য তোমার মাধ্যমে প্রদান করব। কারণ, তোমার ভিত্তিতেই শাস্তি এবং পুরস্কার নির্ধারিত হবে।'
আকলের ব্যাপারে উল্লেখিত এই হাদীসটি সমস্ত হাদীস-বিশেষজ্ঞদের ঐকমত্যে জাল এবং বানোয়াট। [২৪২]
কোনো নির্ভরযোগ্য হাদীসগ্রন্থে এটি পাওয়া যায় না।
কখনো-বা তারা 'আকল'কে 'কলম' নামকরণ করে। কারণ তিরমিযিতে উল্লেখিত বিশুদ্ধ হাদীসে এসেছে 'আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন। [২৪৩]
[নোট: বিভিন্ন গ্রন্থে প্রাপ্ত যেসব বর্ণনায় দাবি করা হয় যে, আকল বা বুদ্ধিমত্তার উচ্চ মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে সেগুলো জাল ও বানোয়াট। এগুলো হাদীস নয়, যা আলিমরা চিহ্নিত করেছেন।]
উপরন্তু, এই হাদীসটি যদি বিশুদ্ধ হতো তবুও এটি তাদের পক্ষে নয়; বরং বিপক্ষে দলীল। শুরুতে বলা হয়েছে,
أَوَّلُ مَا خَلَقَ اللَّهُ الْعَقْلِ فَقَالَ لَهُ
'আল্লাহ প্রথমে আকল সৃষ্টি করলেন...।'
অন্য বর্ণনায় এসেছে,
.... لَمَّا خَلَقَ اللهُ الْعَقْلَ قَالَ لَهُ
'আল্লাহ যখন আকল সৃষ্টি করলেন, তখন বললেন,...।'
সুতরাং হাদীসের অর্থ হলো, আল্লাহ আকল সৃষ্টি করার পর তার উদ্দেশ্যে প্রথমে কথা বলেছেন, এটিই প্রথম সৃষ্টি বিষয়টি এমন নয়।
'প্রথম' (أَوَّلُ) শব্দটি একটি সময় নির্দেশক ক্রিয়া-বিশেষণ, এটি কোনো সংখ্যা-বাচক শব্দ নয়। যেমন অপর বর্ণনায় এসেছে, لَمَّا 'যখন' ফলে উল্লিখিত উভয় বর্ণনার অর্থ একই রকম হয়। অর্থাৎ 'আকল সৃষ্টির পরপরই...'। উক্ত বর্ণনার বাকি অংশ একে সমর্থন করে যেখানে বলা হয়েছে, 'আমি তোমার থেকে অধিক মর্যাদাপূর্ণ কিছুই সৃষ্টি করিনি...' এ কথার অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলা আকলের পূর্বে অন্যান্য বস্তু সৃষ্টি করেছেন। এরপর বর্ণনাটিতে বলা হয়েছে, '...যা কিছু গ্রহণ যোগ্য আমি তোমার মাধ্যমে গ্রহণ করব এবং যা কিছু প্রদানযোগ্য তা তোমার মাধ্যমে প্রদান করব। কারণ তোমার ভিত্তিতেই শান্তি এবং পুরস্কার নির্ধারিত হবে।'
এখানে চার ধরনের বস্তুর উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের দর্শনমতে আসমান-জমিনের সবকিছুই 'আকল' হতে সৃষ্ট। তাহলে এই চার বস্তুর উদ্ভব কোথা হতে!?
তাদের বিভ্রান্তির কারণ:
মুসলিমরা যে অর্থে 'আকল' শব্দটিকে ব্যবহার করে গ্রিক দার্শনিকরা সেই অর্থে এই শব্দকে ব্যবহার করে না। মুসলিমদের ক্ষেত্রে, 'আকল' শব্দটি (عَقَلَ) ক্রিয়ার ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য, যার অর্থ, কোনো কিছু বোঝা, অনুধাবন করা ইত্যাদি। এই ক্রিয়াটি কুরআনে বারবার ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন: নিম্নোক্ত আয়াতসমূহ এসেছে,
وَقَالُوا لَوْ كُنَّا نَسْمَعُ أَوْ نَعْقِلُ مَا كُنَّا فِي أَصْحَابِ السَّعِيرِ
'তারা আরও বলবে, যদি আমরা শুনতাম অথবা বুঝতাম, তবে আমরা জাহান্নামবাসীদের মধ্যে থাকতাম না। [২৪৪]
أَفَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَتَكُونَ لَهُمْ قُلُوبٌ يَعْقِلُونَ بِهَا أَوْ آذَانٌ يَسْمَعُونَ بِهَا فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَكِن تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ
'তারা কি এই উদ্দেশ্যে দেশ ভ্রমণ করেনি, করলে তাদের অন্তরগুলো এমন হতো, যা দিয়ে তারা বুঝতে পারত অথবা কানগুলো এমন হতো, যা দিয়ে তারা শুনতে পেত। কেননা, চক্ষু তো অন্ধ হয় না; বরং বক্ষস্থিত অন্তরই অন্ধ হয়।' [২৪৫]
وَفِي الْأَرْضِ قِطَعُ مُتَجَاوِرَاتٌ وَجَنَّاتٌ مِّنْ أَعْنَابٍ وَزَرْعُ وَنَخِيلُ صِنْوَانٌ وَغَيْرُ صِنْوَانٍ يُسْقَى بِمَاءٍ وَاحِدٍ وَنُفَضِّلُ بَعْضَهَا عَلَى بَعْضٍ فِي الْأُكُلِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ
'এবং জমিনে বিভিন্ন শস্যক্ষেত্র রয়েছে, একটি অপরটির সাথে সংলগ্ন এবং আঙুরের বাগান আছে আর শস্য ও খেজুর রয়েছে, একটির মূল অপরটির সাথে মিলিত এবং কিছু মিলিত নয়। এগুলোকে একই পানি দ্বারা সেচ করা হয়। আর আমি স্বাদে একটিকে অপরটির চাইতে উৎকৃষ্টতর করে দিই। এগুলোর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে তাদের জন্য যারা বোঝে।' [২৪৬]
সুতরাং 'আকল' (عَقْلُ) ইসলামের একটি পারিভাষিক শব্দ, যার মাধ্যমে সেই অন্তর্নিহিত শক্তি ও ক্ষমতা বোঝানো হয়, যা আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক মানুষকে দিয়েছেন এবং যার মাধ্যমে তারা কোনো কিছু বুঝতে বা অনুধাবন করতে পারে।
অপরদিকে দার্শনিকদের ভাষায়, আকল বা বুদ্ধিমত্তা একটি স্বাধীন ও পৃথক সত্তা, যার মাধ্যমে আল্লাহপ্রদত্ত চিন্তাশক্তির পরিবর্তে যিনি চিন্তা করেন তাকে বোঝানো হয়। এই অর্থটি কুরআন ও রাসূলের ভাষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
দার্শনিকদের নিকট-ইমাম গাযালি উল্লেখ করেছেন-সৃষ্টিজগৎ (عَالَمُ الْخَلْقِ) হচ্ছে বস্তুজগৎ (عَالَمُ الْأَجْسَامِ)। আর আকল ও নফসের ক্ষেত্রে তারা 'আলামুল আমর' বলে। তারা এসব ক্যাটাগরিকে কখনো আলামুল জাবারূত, আলামুল মালাকৃত এবং আলামুল মুলক বলে বুঝিয়ে থাকেন। সুতরাং যারা কুরআন ও সুন্নাহতে ব্যবহৃত এসব শব্দের অর্থ ও নবিদের ভাষা সম্পর্কে অজ্ঞ তারা ভাবতে পারে জাবারূত, মালাকৃত ও মুলক শব্দগুলো দার্শনিকদের তত্ত্ব সমর্থন করে, কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা এমন নয়।
মুসলিমদের সাথে এসব দার্শনিকরা বিরাট ধোঁকাবাজি করেছে এবং তাদের সন্দেহ ও সংশয়ের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। যেমন তারা বলে, বিশ্বজগৎ হলো 'মুহদাস' (مُحْدَثُ)।
আরবি ভাষায় এর অর্থ 'অনস্তিত্ব থেকে কোনো কিছুকে অস্তিত্বে নিয়ে আসা'। অর্থাৎ যার একটি উৎস ও সূচনা আছে, যাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু এর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হলো, মহাবিশ্ব সুপ্রাচীন, যার কোনো শুরু নেই। যা সদাসর্বদা বিরাজমান ছিল এবং থাকবে।
অথচ আরবদের ভাষায় বা অন্য কোনো ভাষায়, তাদের চয়নকৃত অর্থে 'মুহদাস' শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি। যার কোনো সূচনা নেই, যা সদাসর্বদা বিরাজমান তাকে মুহদাস বলে অভিহিত করা হয়নি। আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন তিনিই সবকিছুর স্রষ্টা। সুতরাং সংজ্ঞানুসারে, প্রতিটি সৃষ্টবস্তু মুহদাস, আর প্রতিটি মুহদাস প্রথমে অনস্তিত্বশীল থাকার পর অস্তিত্বশীল হয়েছে। দার্শনিকদের এসব তত্ত্বের বিরুদ্ধে জাহমিয়া এবং মু'তাযিলারা একটি 'ইসলামি জবাব' প্রদানের চেষ্টা করেছে কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে। তারা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রদানকৃত সংবাদ ও তথ্য বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে, এ ছাড়া সঠিকভাবে যুক্তিও ব্যবহার করতে পারেনি। ফলে তারা ইসলামের কোনো সাহায্য করতে পারেনি এবং শত্রুদেরও কাবু করতে সক্ষম হয়নি; বরং উলটো তারাই তাদের বিভিন্ন ভ্রান্ত ধারণার সাথে যুক্ত হয়েছে এবং কিছু সঠিক যুক্তিপূর্ণ বিষয়ে অযথা বিতর্ক করেছে। তাদের একদিকে ওহির ইলম বুঝতে ব্যর্থতা, আরেকদিকে যুক্তির সঠিক ব্যবহারে অক্ষমতা দার্শনিকদের বিচ্যুতি ও বিভ্রান্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে। তাদের হঠকারিতা আরও বৃদ্ধি করেছে। এ বিষয়ে আমি আমার অন্য গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। [২৪৭]

টিকাঃ
[২৪২] ইবনুল কাইয়িম, আল-মাওজুআত, ১/১৭৪, আল-মানারুল মুনীফ, ৬৬; সুয়ূতি, আদ্দুরারুল মুনতাসিরা, ১৬৮; ইবনু হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, ৭/১৩; শাওকানি, আল-ফাওয়ায়িদুল মাজমূআহ, ৪৭৭。
[২৪৩] তিরমিযি, ২০১৭, সহীহ。
[২৪৪] সূরা মুল্ক, ৬৭: ১০。
[২৪৫] সূরা হাজ্জ, ২২:৪৬。
[২৪৬] সূরা রা'দ, ১৩: ৪。
[২৪৭] দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যা ১/১৫২。

একটি জাল হাদীস অনুসারে তারা আকলের উক্ত মর্যাদা কল্পনা করেছে; জাল হাদীসটি হলো:
أنَّ أَوَّلَ ما خلق الله العقل فقالَ لَهُ أقبل فأقبل فقالَ لَهُ أُدبِرُ فَأَدبَرَ فقال وعِزَّتى ما خلقت خلقًا أَكْرَمَ عَلَى مِنْكَ فِيكَ أَخُذُ وبِكَ أُعطى ولَكَ الثواب وعليك العقاب
'আল্লাহ প্রথমে 'আকল' সৃষ্টি করলেন। এরপর তাকে ডাকলেন এবং সে হাজির হলো। এরপর তাকে চলে যেতে বললেন এবং সেটা চলে গেল। এরপর তিনি বললেন, আমার শক্তির কসম আমি তোমার থেকে অধিক মর্যাদাপূর্ণ কিছুই সৃষ্টি করিনি। যা কিছু গ্রহণযোগ্য আমি তোমার মাধ্যমে গ্রহণ করব এবং যা কিছু প্রদানযোগ্য তোমার মাধ্যমে প্রদান করব। কারণ, তোমার ভিত্তিতেই শাস্তি এবং পুরস্কার নির্ধারিত হবে।'
আকলের ব্যাপারে উল্লেখিত এই হাদীসটি সমস্ত হাদীস-বিশেষজ্ঞদের ঐকমত্যে জাল এবং বানোয়াট। [২৪২]
কোনো নির্ভরযোগ্য হাদীসগ্রন্থে এটি পাওয়া যায় না।
কখনো-বা তারা 'আকল'কে 'কলম' নামকরণ করে। কারণ তিরমিযিতে উল্লেখিত বিশুদ্ধ হাদীসে এসেছে 'আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন। [২৪৩]
[নোট: বিভিন্ন গ্রন্থে প্রাপ্ত যেসব বর্ণনায় দাবি করা হয় যে, আকল বা বুদ্ধিমত্তার উচ্চ মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে সেগুলো জাল ও বানোয়াট। এগুলো হাদীস নয়, যা আলিমরা চিহ্নিত করেছেন।]
উপরন্তু, এই হাদীসটি যদি বিশুদ্ধ হতো তবুও এটি তাদের পক্ষে নয়; বরং বিপক্ষে দলীল। শুরুতে বলা হয়েছে,
أَوَّلُ مَا خَلَقَ اللَّهُ الْعَقْلِ فَقَالَ لَهُ
'আল্লাহ প্রথমে আকল সৃষ্টি করলেন...।'
অন্য বর্ণনায় এসেছে,
.... لَمَّا خَلَقَ اللهُ الْعَقْلَ قَالَ لَهُ
'আল্লাহ যখন আকল সৃষ্টি করলেন, তখন বললেন,...।'
সুতরাং হাদীসের অর্থ হলো, আল্লাহ আকল সৃষ্টি করার পর তার উদ্দেশ্যে প্রথমে কথা বলেছেন, এটিই প্রথম সৃষ্টি বিষয়টি এমন নয়।
'প্রথম' (أَوَّلُ) শব্দটি একটি সময় নির্দেশক ক্রিয়া-বিশেষণ, এটি কোনো সংখ্যা-বাচক শব্দ নয়। যেমন অপর বর্ণনায় এসেছে, لَمَّا 'যখন' ফলে উল্লিখিত উভয় বর্ণনার অর্থ একই রকম হয়। অর্থাৎ 'আকল সৃষ্টির পরপরই...'। উক্ত বর্ণনার বাকি অংশ একে সমর্থন করে যেখানে বলা হয়েছে, 'আমি তোমার থেকে অধিক মর্যাদাপূর্ণ কিছুই সৃষ্টি করিনি...' এ কথার অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলা আকলের পূর্বে অন্যান্য বস্তু সৃষ্টি করেছেন। এরপর বর্ণনাটিতে বলা হয়েছে, '...যা কিছু গ্রহণ যোগ্য আমি তোমার মাধ্যমে গ্রহণ করব এবং যা কিছু প্রদানযোগ্য তা তোমার মাধ্যমে প্রদান করব। কারণ তোমার ভিত্তিতেই শান্তি এবং পুরস্কার নির্ধারিত হবে।'
এখানে চার ধরনের বস্তুর উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের দর্শনমতে আসমান-জমিনের সবকিছুই 'আকল' হতে সৃষ্ট। তাহলে এই চার বস্তুর উদ্ভব কোথা হতে!?
তাদের বিভ্রান্তির কারণ:
মুসলিমরা যে অর্থে 'আকল' শব্দটিকে ব্যবহার করে গ্রিক দার্শনিকরা সেই অর্থে এই শব্দকে ব্যবহার করে না। মুসলিমদের ক্ষেত্রে, 'আকল' শব্দটি (عَقَلَ) ক্রিয়ার ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য, যার অর্থ, কোনো কিছু বোঝা, অনুধাবন করা ইত্যাদি। এই ক্রিয়াটি কুরআনে বারবার ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন: নিম্নোক্ত আয়াতসমূহ এসেছে,
وَقَالُوا لَوْ كُنَّا نَسْمَعُ أَوْ نَعْقِلُ مَا كُنَّا فِي أَصْحَابِ السَّعِيرِ
'তারা আরও বলবে, যদি আমরা শুনতাম অথবা বুঝতাম, তবে আমরা জাহান্নামবাসীদের মধ্যে থাকতাম না। [২৪৪]
أَفَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَتَكُونَ لَهُمْ قُلُوبٌ يَعْقِلُونَ بِهَا أَوْ آذَانٌ يَسْمَعُونَ بِهَا فَإِنَّهَا لَا تَعْمَى الْأَبْصَارُ وَلَكِن تَعْمَى الْقُلُوبُ الَّتِي فِي الصُّدُورِ
'তারা কি এই উদ্দেশ্যে দেশ ভ্রমণ করেনি, করলে তাদের অন্তরগুলো এমন হতো, যা দিয়ে তারা বুঝতে পারত অথবা কানগুলো এমন হতো, যা দিয়ে তারা শুনতে পেত। কেননা, চক্ষু তো অন্ধ হয় না; বরং বক্ষস্থিত অন্তরই অন্ধ হয়।' [২৪৫]
وَفِي الْأَرْضِ قِطَعُ مُتَجَاوِرَاتٌ وَجَنَّاتٌ مِّنْ أَعْنَابٍ وَزَرْعُ وَنَخِيلُ صِنْوَانٌ وَغَيْرُ صِنْوَانٍ يُسْقَى بِمَاءٍ وَاحِدٍ وَنُفَضِّلُ بَعْضَهَا عَلَى بَعْضٍ فِي الْأُكُلِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ
'এবং জমিনে বিভিন্ন শস্যক্ষেত্র রয়েছে, একটি অপরটির সাথে সংলগ্ন এবং আঙুরের বাগান আছে আর শস্য ও খেজুর রয়েছে, একটির মূল অপরটির সাথে মিলিত এবং কিছু মিলিত নয়। এগুলোকে একই পানি দ্বারা সেচ করা হয়। আর আমি স্বাদে একটিকে অপরটির চাইতে উৎকৃষ্টতর করে দিই। এগুলোর মধ্যে নিদর্শন রয়েছে তাদের জন্য যারা বোঝে।' [২৪৬]
সুতরাং 'আকল' (عَقْلُ) ইসলামের একটি পারিভাষিক শব্দ, যার মাধ্যমে সেই অন্তর্নিহিত শক্তি ও ক্ষমতা বোঝানো হয়, যা আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক মানুষকে দিয়েছেন এবং যার মাধ্যমে তারা কোনো কিছু বুঝতে বা অনুধাবন করতে পারে।
অপরদিকে দার্শনিকদের ভাষায়, আকল বা বুদ্ধিমত্তা একটি স্বাধীন ও পৃথক সত্তা, যার মাধ্যমে আল্লাহপ্রদত্ত চিন্তাশক্তির পরিবর্তে যিনি চিন্তা করেন তাকে বোঝানো হয়। এই অর্থটি কুরআন ও রাসূলের ভাষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
দার্শনিকদের নিকট-ইমাম গাযালি উল্লেখ করেছেন-সৃষ্টিজগৎ (عَالَمُ الْخَلْقِ) হচ্ছে বস্তুজগৎ (عَالَمُ الْأَجْسَامِ)। আর আকল ও নফসের ক্ষেত্রে তারা 'আলামুল আমর' বলে। তারা এসব ক্যাটাগরিকে কখনো আলামুল জাবারূত, আলামুল মালাকৃত এবং আলামুল মুলক বলে বুঝিয়ে থাকেন। সুতরাং যারা কুরআন ও সুন্নাহতে ব্যবহৃত এসব শব্দের অর্থ ও নবিদের ভাষা সম্পর্কে অজ্ঞ তারা ভাবতে পারে জাবারূত, মালাকৃত ও মুলক শব্দগুলো দার্শনিকদের তত্ত্ব সমর্থন করে, কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা এমন নয়।
মুসলিমদের সাথে এসব দার্শনিকরা বিরাট ধোঁকাবাজি করেছে এবং তাদের সন্দেহ ও সংশয়ের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। যেমন তারা বলে, বিশ্বজগৎ হলো 'মুহদাস' (مُحْدَثُ)।
আরবি ভাষায় এর অর্থ 'অনস্তিত্ব থেকে কোনো কিছুকে অস্তিত্বে নিয়ে আসা'। অর্থাৎ যার একটি উৎস ও সূচনা আছে, যাকে সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু এর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য হলো, মহাবিশ্ব সুপ্রাচীন, যার কোনো শুরু নেই। যা সদাসর্বদা বিরাজমান ছিল এবং থাকবে।
অথচ আরবদের ভাষায় বা অন্য কোনো ভাষায়, তাদের চয়নকৃত অর্থে 'মুহদাস' শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি। যার কোনো সূচনা নেই, যা সদাসর্বদা বিরাজমান তাকে মুহদাস বলে অভিহিত করা হয়নি। আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন তিনিই সবকিছুর স্রষ্টা। সুতরাং সংজ্ঞানুসারে, প্রতিটি সৃষ্টবস্তু মুহদাস, আর প্রতিটি মুহদাস প্রথমে অনস্তিত্বশীল থাকার পর অস্তিত্বশীল হয়েছে। দার্শনিকদের এসব তত্ত্বের বিরুদ্ধে জাহমিয়া এবং মু'তাযিলারা একটি 'ইসলামি জবাব' প্রদানের চেষ্টা করেছে কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে। তারা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রদানকৃত সংবাদ ও তথ্য বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে, এ ছাড়া সঠিকভাবে যুক্তিও ব্যবহার করতে পারেনি। ফলে তারা ইসলামের কোনো সাহায্য করতে পারেনি এবং শত্রুদেরও কাবু করতে সক্ষম হয়নি; বরং উলটো তারাই তাদের বিভিন্ন ভ্রান্ত ধারণার সাথে যুক্ত হয়েছে এবং কিছু সঠিক যুক্তিপূর্ণ বিষয়ে অযথা বিতর্ক করেছে। তাদের একদিকে ওহির ইলম বুঝতে ব্যর্থতা, আরেকদিকে যুক্তির সঠিক ব্যবহারে অক্ষমতা দার্শনিকদের বিচ্যুতি ও বিভ্রান্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে। তাদের হঠকারিতা আরও বৃদ্ধি করেছে। এ বিষয়ে আমি আমার অন্য গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। [২৪৭]

টিকাঃ
[২৪২] ইবনুল কাইয়িম, আল-মাওজুআত, ১/১৭৪, আল-মানারুল মুনীফ, ৬৬; সুয়ূতি, আদ্দুরারুল মুনতাসিরা, ১৬৮; ইবনু হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি, ৭/১৩; শাওকানি, আল-ফাওয়ায়িদুল মাজমূআহ, ৪৭৭।
[২৪৩] তিরমিযি, ২০১৭, সহীহ।
[২৪৪] সূরা মুল্ক, ৬৭: ১০।
[২৪৫] সূরা হাজ্জ, ২২:৪৬।
[২৪৬] সূরা রা'দ, ১৩: ৪।
[২৪৭] দেখুন, বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যা ১/১৫২।

📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 যারা ফেরেশতাদের অস্তিত্ব অস্বীকারকারী

📄 যারা ফেরেশতাদের অস্তিত্ব অস্বীকারকারী


দার্শনিকদের মতে, জিবরীল মুহাম্মাদ ﷺ-এর একটি কল্পনামাত্র! আকলের তুলনায় স্বপ্ন ও কল্পনার অবস্থান গৌণ। আকল থেকেই এসবের উৎপত্তি। এমতাবস্থায় কিছু বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট সূফি-দরবেশের আগমন ঘটল। এরা দার্শনিকদের সেই দূষিত চিন্তা-চেতনাগুলোর সাথে একাত্মতা পোষণ করল এবং নিজেদেরকে আল্লাহর আউলিয়া সাব্যস্ত করে আরও বিভ্রান্ত হলো। এরা বলতে শুরু করল, আল্লাহর আউলিয়াদের মর্যাদা নবিদের চেয়েও ঊর্ধ্বে, আউলিয়ারা কোনো মাধ্যম ছাড়াই আল্লাহর কাছ থেকে তথ্য ও খবরাখবর লাভ করে! আগেই বলেছি, 'ফুতুহাত' ও 'ফুসূস' গ্রন্থের রচয়িতা ইবনু আরাবি তাদের অন্যতম। সে দাবি করে বলেছে, 'ফেরেশতা যে উৎস থেকে মুহাম্মাদ-এর কাছে সংবাদ প্রদান করে, সেও নাকি সেই একই উৎস থেকে সংবাদ পায়!' [২৪৮]
এখানে ইবনু আরাবি যে উৎসের কথা বুঝিয়েছে, সেটা 'আকল' ছাড়া আর কিছু নয়, কেননা তার কাছে ফেরেশতা কেবল একটি কল্পনা! আর আকলের তুলনায় কল্পনার অবস্থান গৌণ এবং কল্পনা আকলের অধীন। সুতরাং ইবনু আরাবি ও তার মতো অন্যান্য ব্যক্তিরা মনে করে তারা সরাসরি 'উৎস থেকে' ইলম গ্রহণ করেছে এবং কোনো গৌণ উপাদান থেকে গ্রহণ করেনি; আর (তাদের ভাষ্যমতে) নবিরা কল্পনা থেকে ইলম গ্রহণ করেছে যা কিনা একটি গৌণ উপাদান। ফলে ইবনু আরাবি শেষমেশ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাল, সে মুহাম্মাদ-এর থেকেও শ্রেষ্ঠ!
যদিও-বা আমরা দেখেছি, (দার্শনিকদের মতে) নুবুওয়াত তিনটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং সেগুলোর মাধ্যমে তারা নুবুওয়াতকে শনাক্ত করে। তাদের সেই দূষিত মানদণ্ডেও এই ব্যক্তি নবিদের দলে শামিল হওয়ার উপযুক্ত নয়; তাদের থেকে শ্রেষ্ঠ হওয়া তো আরও দূরের কথা! যদিও-বা, তাদের সেইসব মানদণ্ডে যেকোনো মুমিন ব্যক্তিই উত্তীর্ণ হতে পারে।
যাইহোক, নুবুওয়াত সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়! যদি ইবনু আরাবি নিজেকে সূফিবাদের সাথে সম্পৃক্ত বলে দাবি করে, তবে এটা বিভ্রান্ত ও দার্শনিকদের সূফিবাদ; আহলুল কালামের সূফিবাদ নয়। কুরআন ও সুন্নাহর অনুসারী ইমামদের সূফিবাদ তো আরও পরের কথা। কুরআন ও সুন্নাহর অনুসারী সূফিদের মধ্যে রয়েছেন ফুযাইল ইবনু ইয়ায, ইবরাহীম ইবনু আদহাম, আবূ সুলাইমান দারানি, মারূফ কারখি, জুনাইদ ইবনু মুহাম্মাদ, সাহল ইবনু আবদিল্লাহ তুসতারি ও তাদের মতো অন্যান্য গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ। আল্লাহ তাদের ওপর রহম করুন!
আল্লাহ তাআলা কুরআনে ফেরেশতাদের সম্পর্কে যা বর্ণনা করেছেন তা দার্শনিক ও তাদের দ্বারা প্রভাবিত ব্যক্তিদের চিন্তা থেকে ভিন্ন। আল্লাহ বলেন,
وَقَالُوا اتَّخَذَ الرَّحْمَنُ وَلَدًا سُبْحَانَهُ بَلْ عِبَادُ مُكْرَمُونَ لَا يَسْبِقُونَهُ بِالْقَوْلِ وَهُم بِأَمْرِهِ يَعْمَلُونَ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضَى وَهُم مِّنْ خَشْيَتِهِ مُشْفِقُونَ وَمَن يَقُلْ مِنْهُمْ إِنِّي إِلَهُ مِّن دُونِهِ فَذَلِكَ نَجْزِيهِ جَهَنَّمَ كَذَلِكَ نَجْزِي الظَّالِمِينَ )
'তারা বলল, দয়াময় আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছে। তাঁর জন্য কখনো এটি যোগ্য নয়; বরং তারা তো তাঁর সম্মানিত বান্দা। তারা আগে বেড়ে কথা বলতে পারে না এবং তারা তাঁর আদেশেই কাজ করে। তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে যা আছে, তা তিনি জানেন। তারা শুধু তাদের জন্যে সুপারিশ করে, যাদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট এবং তারা তাঁর ভয়ে ভীত। তাদের মধ্যে যে বলে, তিনি ব্যতীত আমিই উপাস্য, তাকে আমি জাহান্নামের শাস্তি দেব। আমি যালিমদের এভাবেই প্রতিফল দিয়ে থাকি।' [২৪৯]
وَكَم مِّن مَّلَكٍ فِي السَّمَاوَاتِ لَا تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِن بَعْدِ أَن يَأْذَنَ اللَّهُ لِمَن يَشَاءُ وَيَرْضَى
'আকাশে অনেক ফেরেশতা রয়েছে। তাদের কোনো সুপারিশ ফলপ্রসূ হয় না— যতক্ষণ আল্লাহ যার জন্যে ইচ্ছা ও যাকে পছন্দ করেন, অনুমতি না দেন।' [২৫০]
قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُم مِّن دُونِ اللَّهِ لَا يَمْلِكُونَ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ وَمَا لَهُمْ فِيهِمَا مِن شِرْكٍ وَمَا لَهُ مِنْهُم مِّن ظَهِيرٍ وَلَا تَنفَعُ الشَّفَاعَةُ عِندَهُ إِلَّا لِمَنْ أَذِنَ لَهُ حَتَّى إِذَا فُزِعَ عَن قُلُوبِهِمْ قَالُوا مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ قَالُوا الْحَقَّ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ
'বলুন, তোমরা তাদেরকে আহ্বান করো, যাদেরকে উপাস্য মনে করতে আল্লাহ ব্যতীত। তারা নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের অণু পরিমাণ কোনো কিছুর মালিক নয়, এতে তাদের কোনো অংশও নেই এবং তাদের কেউ আল্লাহর সহায়কও নয়। যার জন্যে অনুমতি দেওয়া হয়, তার জন্যে ব্যতীত আল্লাহর কাছে কারও সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না। যখন তাদের মন থেকে ভয়ভীতি দূর হয়ে যাবে, তখন তারা পরস্পর বলবে, তোমাদের পালনকর্তা কী বললেন? তারা বলবে, তিনি সত্য বলেছেন এবং তিনিই সবার ওপরে মহান।' [২৫১]
وَلَهُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَنْ عِندَهُ لَا يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِهِ وَلَا يَسْتَحْسِرُونَ * يُسَبِّحُونَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ لَا يَفْتُرُونَ *
'নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যারা আছে, তারা তাঁরই। আর যারা তাঁর সান্নিধ্যে আছে তারা তাঁর ইবাদাতে অহংকার করে না এবং অলসতাও করে না।
তারা রাত্রিদিন তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করে এবং ক্লান্ত হয় না।' [২৫২]
আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন, ফেরেশতারা ইবরাহীম ও মারিয়াম -এর সামনে মানুষের আকৃতিতে এসেছিলেন। রাসূলুল্লাহ -এর সামনেও জিবরীল মানুষের আকৃতিতে আসতেন। কখনো তিনি সাহাবি দিহইয়া কালবি -এর আকৃতিতে আসতেন আবার কখনো অপরিচিত বেদুঈনের আকৃতিতে আসতেন। সাহাবায়ে কেরام তাকে এসব আকৃতিতে দেখেছেন।
আল্লাহ তাআলা জিবরীলকে শক্তিধর বলে বর্ণনা করেছেন,
ذِي قُوَّةٍ عِندَ ذِي الْعَرْشِ مَكِينٍ مُطَاعٍ ثَمَّ أَمِينٍ *
'যিনি শক্তিশালী, আরশের মালিকের নিকট মর্যাদাশালী, সবার মান্যবর, সেখানকার বিশ্বাসভাজন।' [২৫৩]
এবং মুহাম্মাদ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে বলেছেন,
وَلَقَدْ رَآهُ بِالْأُفُقِ الْمُبِينِ *
'তিনি সেই ফেরেশতাকে প্রকাশ্য দিগন্তে দেখেছেন।' [২৫৪]
জিবরীল সম্পর্কে আরও বর্ণনা দিয়ে বলেছেন,
عَلَّمَهُ شَدِيدُ الْقُوَى * ذُو مِرَّةٍ فَاسْتَوَى * وَهُوَ بِالْأُفُقِ الْأَعْلَى ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَى أَفَتُمَارُونَهُ عَلَى مَا يَرَى * وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَى عِندَ سِدْرَةِ الْمُنتَهَى عِندَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَى إِذْ يَغْشَى السّدْرَةَ مَا يَغْشَى مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَى لَقَدْ رَأَى مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى
'তাঁকে শিক্ষা দান করে এক শক্তিশালী ফেরেশতা, সহজাত শক্তিসম্পন্ন, সে নিজ আকৃতিতে প্রকাশ পেল।
ঊর্ধ্ব দিগন্তে,
অতঃপর নিকটবর্তী হলো ও ঝুলে গেল।
তখন দুই ধনুকের ব্যবধান ছিল অথবা আরও কম।
তখন আল্লাহ তাঁর দাসের প্রতি যা প্রত্যাদেশ করবার, তা প্রত্যাদেশ করলেন। রাসূলের অন্তর মিথ্যা বলেনি যা সে দেখেছে।
তোমরা কি সে বিষয়ে বিতর্ক করবে যা সে দেখেছে?
নিশ্চয় সে তাকে আরেকবার দেখেছিল, সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে, যার কাছে অবস্থিত বসবাসের জান্নাত।
যখন বৃক্ষটি দ্বারা আচ্ছন্ন হওয়ার, তদ্দ্বারা আচ্ছন্ন ছিল। তাঁর দৃষ্টিবিভ্রম হয়নি এবং সীমালঙ্ঘনও করেনি।
নিশ্চয় সে তার পালনকর্তার মহান নিদর্শনাবলি অবলোকন করেছে।' [২৫৫]
আয়িশা থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ দুইটি ঘটনা ব্যতীত কখনো জিবরীলকে তার নিজ আকৃতিতে দেখেননি। উল্লেখিত আয়াতে এই দুইটি ঘটনা এসেছে-প্রথমবার তাকে স্পষ্ট দিগন্তে দেখেছেন এবং দ্বিতীয়বার তাকে সিদরাতুল মুনতাহার নিকট দেখেছেন। [২৫৬]

টিকাঃ
[২৪৮] ফুসূসুল হিকাম, ১/৬২。
[২৪৯] সূরা আম্বিয়া, ২১: ২৬-২৯。
[২৫০] সূরা নাজম, ৫৩: ২৬。
[২৫১] সূরা সাবা, ৩৪: ২২-২৩。
[২৫২] সূরা আম্বিয়া, ২১: ১৯-২০。
[২৫৩] সূরা তাকভীর, ৮১: ২০-২১。
[২৫৪] সূরা তাকভীর, ৮১: ২৩。
[২৫৫] সূরা নাজম, ৫৩: ৫-১৮。
[২৫৬] মুসলিম, ১৭৭; তিরমিযি, ৩০৬৮。

দার্শনিকদের মতে, জিবরীল মুহাম্মাদ ﷺ-এর একটি কল্পনামাত্র! আকলের তুলনায় স্বপ্ন ও কল্পনার অবস্থান গৌণ। আকল থেকেই এসবের উৎপত্তি। এমতাবস্থায় কিছু বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট সূফি-দরবেশের আগমন ঘটল। এরা দার্শনিকদের সেই দূষিত চিন্তা-চেতনাগুলোর সাথে একাত্মতা পোষণ করল এবং নিজেদেরকে আল্লাহর আউলিয়া সাব্যস্ত করে আরও বিভ্রান্ত হলো। এরা বলতে শুরু করল, আল্লাহর আউলিয়াদের মর্যাদা নবিদের চেয়েও ঊর্ধ্বে, আউলিয়ারা কোনো মাধ্যম ছাড়াই আল্লাহর কাছ থেকে তথ্য ও খবরাখবর লাভ করে! আগেই বলেছি, 'ফুতুহাত' ও 'ফুসূস' গ্রন্থের রচয়িতা ইবনু আরাবি তাদের অন্যতম। সে দাবি করে বলেছে, 'ফেরেশতা যে উৎস থেকে মুহাম্মাদ-এর কাছে সংবাদ প্রদান করে, সেও নাকি সেই একই উৎস থেকে সংবাদ পায়!' [২৪৮]
এখানে ইবনু আরাবি যে উৎসের কথা বুঝিয়েছে, সেটা 'আকল' ছাড়া আর কিছু নয়, কেননা তার কাছে ফেরেশতা কেবল একটি কল্পনা! আর আকলের তুলনায় কল্পনার অবস্থান গৌণ এবং কল্পনা আকলের অধীন। সুতরাং ইবনু আরাবি ও তার মতো অন্যান্য ব্যক্তিরা মনে করে তারা সরাসরি 'উৎস থেকে' ইলম গ্রহণ করেছে এবং কোনো গৌণ উপাদান থেকে গ্রহণ করেনি; আর (তাদের ভাষ্যমতে) নবিরা কল্পনা থেকে ইলম গ্রহণ করেছে যা কিনা একটি গৌণ উপাদান। ফলে ইবনু আরাবি শেষমেশ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাল, সে মুহাম্মাদ-এর থেকেও শ্রেষ্ঠ!
যদিও-বা আমরা দেখেছি, (দার্শনিকদের মতে) নুবুওয়াত তিনটি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং সেগুলোর মাধ্যমে তারা নুবুওয়াতকে শনাক্ত করে। তাদের সেই দূষিত মানদণ্ডেও এই ব্যক্তি নবিদের দলে শামিল হওয়ার উপযুক্ত নয়; তাদের থেকে শ্রেষ্ঠ হওয়া তো আরও দূরের কথা! যদিও-বা, তাদের সেইসব মানদণ্ডে যেকোনো মুমিন ব্যক্তিই উত্তীর্ণ হতে পারে।
যাইহোক, নুবুওয়াত সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়! যদি ইবনু আরাবি নিজেকে সূফিবাদের সাথে সম্পৃক্ত বলে দাবি করে, তবে এটা বিভ্রান্ত ও দার্শনিকদের সূফিবাদ; আহলুল কালামের সূফিবাদ নয়। কুরআন ও সুন্নাহর অনুসারী ইমামদের সূফিবাদ তো আরও পরের কথা। কুরআন ও সুন্নাহর অনুসারী সূফিদের মধ্যে রয়েছেন ফুযাইল ইবনু ইয়ায, ইবরাহীম ইবনু আদহাম, আবূ সুলাইমান দারানি, মারূফ কারখি, জুনাইদ ইবনু মুহাম্মাদ, সাহল ইবনু আবদিল্লাহ তুসতারি ও তাদের মতো অন্যান্য গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ। আল্লাহ তাদের ওপর রহম করুন!
আল্লাহ তাআলা কুরআনে ফেরেশতাদের সম্পর্কে যা বর্ণনা করেছেন তা দার্শনিক ও তাদের দ্বারা প্রভাবিত ব্যক্তিদের চিন্তা থেকে ভিন্ন। আল্লাহ বলেন,
وَقَالُوا اتَّخَذَ الرَّحْمَنُ وَلَدًا سُبْحَانَهُ بَلْ عِبَادُ مُكْرَمُونَ لَا يَسْبِقُونَهُ بِالْقَوْلِ وَهُم بِأَمْرِهِ يَعْمَلُونَ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضَى وَهُم مِّنْ خَشْيَتِهِ مُشْفِقُونَ وَمَن يَقُلْ مِنْهُمْ إِنِّي إِلَهُ مِّن دُونِهِ فَذَلِكَ نَجْزِيهِ جَهَنَّمَ كَذَلِكَ نَجْزِي الظَّالِمِينَ )
'তারা বলল, দয়াময় আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছে। তাঁর জন্য কখনো এটি যোগ্য নয়; বরং তারা তো তাঁর সম্মানিত বান্দা। তারা আগে বেড়ে কথা বলতে পারে না এবং তারা তাঁর আদেশেই কাজ করে। তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে যা আছে, তা তিনি জানেন। তারা শুধু তাদের জন্যে সুপারিশ করে, যাদের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট এবং তারা তাঁর ভয়ে ভীত। তাদের মধ্যে যে বলে, তিনি ব্যতীত আমিই উপাস্য, তাকে আমি জাহান্নামের শাস্তি দেব। আমি যালিমদের এভাবেই প্রতিফল দিয়ে থাকি।' [২৪৯]
وَكَم مِّن مَّلَكٍ فِي السَّمَاوَاتِ لَا تُغْنِي شَفَاعَتُهُمْ شَيْئًا إِلَّا مِن بَعْدِ أَن يَأْذَنَ اللَّهُ لِمَن يَشَاءُ وَيَرْضَى
'আকাশে অনেক ফেরেশতা রয়েছে। তাদের কোনো সুপারিশ ফলপ্রসূ হয় না— যতক্ষণ আল্লাহ যার জন্যে ইচ্ছা ও যাকে পছন্দ করেন, অনুমতি না দেন।' [২৫০]
قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُم مِّن دُونِ اللَّهِ لَا يَمْلِكُونَ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ وَمَا لَهُمْ فِيهِمَا مِن شِرْكٍ وَمَا لَهُ مِنْهُم مِّن ظَهِيرٍ وَلَا تَنفَعُ الشَّفَاعَةُ عِندَهُ إِلَّا لِمَنْ أَذِنَ لَهُ حَتَّى إِذَا فُزِعَ عَن قُلُوبِهِمْ قَالُوا مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ قَالُوا الْحَقَّ وَهُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ
'বলুন, তোমরা তাদেরকে আহ্বান করো, যাদেরকে উপাস্য মনে করতে আল্লাহ ব্যতীত। তারা নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের অণু পরিমাণ কোনো কিছুর মালিক নয়, এতে তাদের কোনো অংশও নেই এবং তাদের কেউ আল্লাহর সহায়কও নয়। যার জন্যে অনুমতি দেওয়া হয়, তার জন্যে ব্যতীত আল্লাহর কাছে কারও সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না। যখন তাদের মন থেকে ভয়ভীতি দূর হয়ে যাবে, তখন তারা পরস্পর বলবে, তোমাদের পালনকর্তা কী বললেন? তারা বলবে, তিনি সত্য বলেছেন এবং তিনিই সবার ওপরে মহান।' [২৫১]
وَلَهُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَنْ عِندَهُ لَا يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِهِ وَلَا يَسْتَحْسِرُونَ * يُسَبِّحُونَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ لَا يَفْتُرُونَ *
'নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যারা আছে, তারা তাঁরই। আর যারা তাঁর সান্নিধ্যে আছে তারা তাঁর ইবাদাতে অহংকার করে না এবং অলসতাও করে না।
তারা রাত্রিদিন তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করে এবং ক্লান্ত হয় না।' [২৫২]
আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন, ফেরেশতারা ইবরাহীম ও মারিয়াম -এর সামনে মানুষের আকৃতিতে এসেছিলেন। রাসূলুল্লাহ -এর সামনেও জিবরীল মানুষের আকৃতিতে আসতেন। কখনো তিনি সাহাবি দিহইয়া কালবি -এর আকৃতিতে আসতেন আবার কখনো অপরিচিত বেদুঈনের আকৃতিতে আসতেন। সাহাবায়ে কেরাম তাকে এসব আকৃতিতে দেখেছেন।
আল্লাহ তাআলা জিবরীলকে শক্তিধর বলে বর্ণনা করেছেন,
ذِي قُوَّةٍ عِندَ ذِي الْعَرْشِ مَكِينٍ مُطَاعٍ ثَمَّ أَمِينٍ *
'যিনি শক্তিশালী, আরশের মালিকের নিকট মর্যাদাশালী, সবার মান্যবর, সেখানকার বিশ্বাসভাজন।' [২৫৩]
এবং মুহাম্মাদ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে বলেছেন,
وَلَقَدْ رَآهُ بِالْأُفُقِ الْمُبِينِ *
'তিনি সেই ফেরেশতাকে প্রকাশ্য দিগন্তে দেখেছেন।' [২৫৪]
জিবরীল সম্পর্কে আরও বর্ণনা দিয়ে বলেছেন,
عَلَّمَهُ شَدِيدُ الْقُوَى * ذُو مِرَّةٍ فَاسْتَوَى * وَهُوَ بِالْأُفُقِ الْأَعْلَى ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَى أَفَتُمَارُونَهُ عَلَى مَا يَرَى * وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَى عِندَ سِدْرَةِ الْمُنتَهَى عِندَهَا جَنَّةُ الْمَأْوَى إِذْ يَغْشَى السّدْرَةَ مَا يَغْشَى مَا زَاغَ الْبَصَرُ وَمَا طَغَى لَقَدْ رَأَى مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى
'তাঁকে শিক্ষা দান করে এক শক্তিশালী ফেরেশতা, সহজাত শক্তিসম্পন্ন, সে নিজ আকৃতিতে প্রকাশ পেল।
ঊর্ধ্ব দিগন্তে,
অতঃপর নিকটবর্তী হলো ও ঝুলে গেল।
তখন দুই ধনুকের ব্যবধান ছিল অথবা আরও কম।
তখন আল্লাহ তাঁর দাসের প্রতি যা প্রত্যাদেশ করবার, তা প্রত্যাদেশ করলেন। রাসূলের অন্তর মিথ্যা বলেনি যা সে দেখেছে।
তোমরা কি সে বিষয়ে বিতর্ক করবে যা সে দেখেছে?
নিশ্চয় সে তাকে আরেকবার দেখেছিল, সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে, যার কাছে অবস্থিত বসবাসের জান্নাত।
যখন বৃক্ষটি দ্বারা আচ্ছন্ন হওয়ার, তদ্দ্বারা আচ্ছন্ন ছিল। তাঁর দৃষ্টিবিভ্রম হয়নি এবং সীমালঙ্ঘনও করেনি।
নিশ্চয় সে তার পালনকর্তার মহান নিদর্শনাবলি অবলোকন করেছে।' [২৫৫]
আয়িশা থেকে বর্ণিত, 'রাসূলুল্লাহ দুইটি ঘটনা ব্যতীত কখনো জিবরীলকে তার নিজ আকৃতিতে দেখেননি। উল্লেখিত আয়াতে এই দুইটি ঘটনা এসেছে-প্রথমবার তাকে স্পষ্ট দিগন্তে দেখেছেন এবং দ্বিতীয়বার তাকে সিদরাতুল মুনতাহার নিকট দেখেছেন। [২৫৬]

টিকাঃ
[২৪৮] ফুসূসুল হিকাম, ১/৬২।
[২৪৯] সূরা আম্বিয়া, ২১: ২৬-২৯।
[২৫০] সূরা নাজম, ৫৩: ২৬।
[২৫১] সূরা সাবা, ৩৪: ২২-২৩।
[২৫২] সূরা আম্বিয়া, ২১: ১৯-২০।
[২৫৩] সূরা তাকভীর, ৮১: ২০-২১।
[২৫৪] সূরা তাকভীর, ৮১: ২৩।
[২৫৫] সূরা নাজম, ৫৩: ৫-১৮।
[২৫৬] মুসলিম, ১৭৭; তিরমিযি, ৩০৬৮।

📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 যারা সর্বেশ্বরবাদী

📄 যারা সর্বেশ্বরবাদী


উপরন্তু, আল্লাহ তাআলা অন্যান্য আয়াতে জিবরীলকে বিশ্বস্ত ও পবিত্র রূহ বলে বর্ণনা করেছেন। অন্যান্য বর্ণনাসমূহ থেকেও এটি সুস্পষ্ট যে, তিনি এক মহান, জীবন্ত ও বুদ্ধিমান সৃষ্টি; তার স্বাধীন বাস্তব অস্তিত্ব রয়েছে; তিনি কোনো নবির কল্পনা নন। অথচ বিভ্রান্ত দার্শনিকরা তাকে নবিদের কল্পনা বলে অপবাদ দেয়। এদের সাথে আছে আরেকদল বিভ্রান্ত লোক যারা নিজেদেরকে আল্লাহর আউলিয়া বলে দাবি করে এবং নবিদের থেকেও নিজেকে বেশি জ্ঞানী মনে করে!
এসব লোকের বিভ্রান্তির চূড়ান্ত পরিণতি হলো, ঈমানের সকল রোকনকে অস্বীকার করা। আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাব, নবি-রাসূল এবং বিচার দিবসের ওপর বিশ্বাস রাখা হলো ঈমানের মূল বা রোকন। তাদের বিভ্রান্তিকর অবস্থানের কারণে তারা আল-খালিক (সৃষ্টিকর্তা)-কে অস্বীকার করে। কেননা, তারা সৃষ্টিকে স্রষ্টার অস্তিত্বের সাথে মিশিয়ে ফেলেছে এবং তারা বলে اَلْوُجُوْدُ وَاحِدٌ - অস্তিত্ব কেবল একটি! (বা সবকিছুই স্রষ্টা!) তারা নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তি এবং একটি জাতির মধ্যে পার্থক্য করে না।
বিদ্যমান প্রতিটি বস্তুই 'অস্তিত্বশীল' হওয়ার ক্ষেত্রে এক ও অভিন্ন। যেমন: সমস্ত মানুষ 'মানব-জাতির' অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে এবং সব মানুষ ও পশু 'প্রাণী-জাতির' অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দিক দিয়ে এক ও অভিন্ন। কিন্তু এই একতা ও অভিন্নতা কেবলই চিন্তাগত, এর কোনো বাস্তবতা নেই। কারণ একজন মানুষের আচরণ, প্রবৃত্তি ও বৈশিষ্ট্য আর একটি ঘোড়ার আচরণ, প্রবৃত্তি ও বৈশিষ্ট্য এক নয়। এমনিভাবে হুবহু আসমানের অস্তিত্ব আর মানুষের অস্তিত্ব এক নয়। যদিও দুটিই অস্তিত্বশীল। এ কথা সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, সৃষ্টার অস্তিত্ব সৃষ্টির অস্তিত্ব থেকে পৃথক ও আলাদা। তাদের দাবি মিথ্যা, ভ্রান্ত ও বাতিল।
ওইসব দার্শনিক এবং ভণ্ড আউলিয়াদের অবস্থা ফিরআউনের মতো, যে সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করেছিল। সে কোনো দৃশ্যমান ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সৃষ্টিকে অস্বীকার করেনি, কিন্তু দাবি করত এগুলো কোনো স্রষ্টা ছাড়াই স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে সৃষ্টি হয়েছে! এসব দার্শনিক ও ভণ্ড আউলিয়ারা এ বিষয়ে ফিরআউনের সাথে একমত (উভয়েই কার্যত আল্লাহকে অস্বীকার করে)। কিন্তু এরা মনে করে প্রতিটি দৃশ্যমান বস্তুই আল্লাহ! (যেহেতু তাদের কাছে সবকিছুই এক, اَلْوُجُوْدُ وَاحِدٌ (এ কারণে তারা ফিরআউনের চেয়েও অধিক পথভ্রষ্ট; যদিও-বা ফিরআউনের মন্দ কাজ আমাদের কাছে বেশি স্পষ্ট।
এ জন্যেই আলোচ্য বিভ্রান্ত ব্যক্তিরা বলে, মূর্তিপূজারিরা আল্লাহ বাদে অন্য কারও ইবাদাত করে না! (যেহেতু তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাস অনুসারে সবকিছুই আল্লাহ, এমনকি মূর্তিও!) এ জন্য তারা বলে, ফিরআউন যখন নিজেকে রব দাবি করে বলেছিল, 'আনা রব্বুকুমুল আ'লা' (أَنَا رَبُّكُمُ الْأَعْلَى)- 'আমি তোমাদের সবচেয়ে বড় রব'- তখন সে ঠিকই বলেছিল! কারণ তাদের মতে, সে শাসনক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অধিকারী ছিল। আর আমরা সবাই কোনো না কোনো কিছুর 'রব' অর্থাৎ কোনো কিছুর ওপর কর্তৃত্বশীল। তাদের মতে ফিরআউনের কথার অর্থ হলো: 'তোমাদের ওপর শাসন-কর্তৃত্বের কারণে আমি তোমাদের সবচেয়ে বড় রব!' তারা আরও বলে, জাদুকররা নাকি ফিরআউনের কথার সত্যতা বুঝতে পেরে বলল,
فَاقْضِ مَا أَنتَ قَاضٍ إِنَّمَا تَقْضِي هَذِهِ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا *
'অতএব, তুমি যা ইচ্ছা করতে পারো। তুমি তো শুধু এই পার্থিব জীবনেই যা করার করবে।' [২৫৭]
তারা বলে, 'সুতরাং ফিরআউন নিজেকে সর্বোচ্চ রব দাবি করে সত্যই বলেছে!' দেখুন, কীভাবে ফিরআউনের মতো অভিশপ্ত ব্যক্তিও এদের কাছে সত্যের মহান উৎস! তারা বিচার দিবসের বাস্তবতাও অস্বীকার করেছে। তারা মনে করে জাহান্নামি ব্যক্তিরাও জান্নাতি ব্যক্তিদের মতো বিরাট আরাম-আয়েশ ও আনন্দে থাকবে। এভাবে এই লোকেরা আল্লাহ, বিচার দিবস, ফেরেশতা, কিতাব ও নবি-রাসূলদের ওপর কুফরি করল। অথচ তারা নিজেদেরকে আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের মধ্যে সর্বোত্তম মনে করে; এমনকি তারা নিজেদেরকে নবিদের থেকেও শ্রেষ্ঠ মনে করে! তাদের মতে, নবিরা আল্লাহর ব্যাপারে তাদের থেকে কম জ্ঞান রাখে!

টিকাঃ
[২৫৭] সূরা ত্বহা, ২০: ৭২。

উপরন্তু, আল্লাহ তাআলা অন্যান্য আয়াতে জিবরীলকে বিশ্বস্ত ও পবিত্র রূহ বলে বর্ণনা করেছেন। অন্যান্য বর্ণনাসমূহ থেকেও এটি সুস্পষ্ট যে, তিনি এক মহান, জীবন্ত ও বুদ্ধিমান সৃষ্টি; তার স্বাধীন বাস্তব অস্তিত্ব রয়েছে; তিনি কোনো নবির কল্পনা নন। অথচ বিভ্রান্ত দার্শনিকরা তাকে নবিদের কল্পনা বলে অপবাদ দেয়। এদের সাথে আছে আরেকদল বিভ্রান্ত লোক যারা নিজেদেরকে আল্লাহর আউলিয়া বলে দাবি করে এবং নবিদের থেকেও নিজেকে বেশি জ্ঞানী মনে করে!
এসব লোকের বিভ্রান্তির চূড়ান্ত পরিণতি হলো, ঈমানের সকল রোকনকে অস্বীকার করা। আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাব, নবি-রাসূল এবং বিচার দিবসের ওপর বিশ্বাস রাখা হলো ঈমানের মূল বা রোকন। তাদের বিভ্রান্তিকর অবস্থানের কারণে তারা আল-খালিক (সৃষ্টিকর্তা)-কে অস্বীকার করে। কেননা, তারা সৃষ্টিকে স্রষ্টার অস্তিত্বের সাথে মিশিয়ে ফেলেছে এবং তারা বলে اَلْوُجُوْدُ وَاحِدٌ - অস্তিত্ব কেবল একটি! (বা সবকিছুই স্রষ্টা!) তারা নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তি এবং একটি জাতির মধ্যে পার্থক্য করে না।
বিদ্যমান প্রতিটি বস্তুই 'অস্তিত্বশীল' হওয়ার ক্ষেত্রে এক ও অভিন্ন। যেমন: সমস্ত মানুষ 'মানব-জাতির' অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে এবং সব মানুষ ও পশু 'প্রাণী-জাতির' অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দিক দিয়ে এক ও অভিন্ন। কিন্তু এই একতা ও অভিন্নতা কেবলই চিন্তাগত, এর কোনো বাস্তবতা নেই। কারণ একজন মানুষের আচরণ, প্রবৃত্তি ও বৈশিষ্ট্য আর একটি ঘোড়ার আচরণ, প্রবৃত্তি ও বৈশিষ্ট্য এক নয়। এমনিভাবে হুবহু আসমানের অস্তিত্ব আর মানুষের অস্তিত্ব এক নয়। যদিও দুটিই অস্তিত্বশীল। এ কথা সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সুতরাং প্রমাণিত হলো যে, সৃষ্টার অস্তিত্ব সৃষ্টির অস্তিত্ব থেকে পৃথক ও আলাদা। তাদের দাবি মিথ্যা, ভ্রান্ত ও বাতিল।
ওইসব দার্শনিক এবং ভণ্ড আউলিয়াদের অবস্থা ফিরআউনের মতো, যে সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করেছিল। সে কোনো দৃশ্যমান ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সৃষ্টিকে অস্বীকার করেনি, কিন্তু দাবি করত এগুলো কোনো স্রষ্টা ছাড়াই স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে সৃষ্টি হয়েছে! এসব দার্শনিক ও ভণ্ড আউলিয়ারা এ বিষয়ে ফিরআউনের সাথে একমত (উভয়েই কার্যত আল্লাহকে অস্বীকার করে)। কিন্তু এরা মনে করে প্রতিটি দৃশ্যমান বস্তুই আল্লাহ! (যেহেতু তাদের কাছে সবকিছুই এক, اَلْوُجُوْدُ وَاحِدٌ (এ কারণে তারা ফিরআউনের চেয়েও অধিক পথভ্রষ্ট; যদিও-বা ফিরআউনের মন্দ কাজ আমাদের কাছে বেশি স্পষ্ট।
এ জন্যেই আলোচ্য বিভ্রান্ত ব্যক্তিরা বলে, মূর্তিপূজারিরা আল্লাহ বাদে অন্য কারও ইবাদাত করে না! (যেহেতু তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাস অনুসারে সবকিছুই আল্লাহ, এমনকি মূর্তিও!) এ জন্য তারা বলে, ফিরআউন যখন নিজেকে রব দাবি করে বলেছিল, 'আনা রব্বুকুমুল আ'লা' (أَنَا رَبُّكُمُ الْأَعْلَى)- 'আমি তোমাদের সবচেয়ে বড় রব'- তখন সে ঠিকই বলেছিল! কারণ তাদের মতে, সে শাসনক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অধিকারী ছিল। আর আমরা সবাই কোনো না কোনো কিছুর 'রব' অর্থাৎ কোনো কিছুর ওপর কর্তৃত্বশীল। তাদের মতে ফিরআউনের কথার অর্থ হলো: 'তোমাদের ওপর শাসন-কর্তৃত্বের কারণে আমি তোমাদের সবচেয়ে বড় রব!' তারা আরও বলে, জাদুকররা নাকি ফিরআউনের কথার সত্যতা বুঝতে পেরে বলল,
فَاقْضِ مَا أَنتَ قَاضٍ إِنَّمَا تَقْضِي هَذِهِ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا *
'অতএব, তুমি যা ইচ্ছা করতে পারো। তুমি তো শুধু এই পার্থিব জীবনেই যা করার করবে।' [২৫৭]
তারা বলে, 'সুতরাং ফিরআউন নিজেকে সর্বোচ্চ রব দাবি করে সত্যই বলেছে!' দেখুন, কীভাবে ফিরআউনের মতো অভিশপ্ত ব্যক্তিও এদের কাছে সত্যের মহান উৎস! তারা বিচার দিবসের বাস্তবতাও অস্বীকার করেছে। তারা মনে করে জাহান্নামি ব্যক্তিরাও জান্নাতি ব্যক্তিদের মতো বিরাট আরাম-আয়েশ ও আনন্দে থাকবে। এভাবে এই লোকেরা আল্লাহ, বিচার দিবস, ফেরেশতা, কিতাব ও নবি-রাসূলদের ওপর কুফরি করল। অথচ তারা নিজেদেরকে আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের মধ্যে সর্বোত্তম মনে করে; এমনকি তারা নিজেদেরকে নবিদের থেকেও শ্রেষ্ঠ মনে করে! তাদের মতে, নবিরা আল্লাহর ব্যাপারে তাদের থেকে কম জ্ঞান রাখে!

টিকাঃ
[২৫৭] সূরা ত্বহা, ২০: ৭২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00