📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 সাহাবিদের মর্যাদা

📄 সাহাবিদের মর্যাদা


নবি বলেছেন, 'তোমরা আমার সাহাবিদের গালি দিয়ো না। সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ সোনাও দান-খয়রাত করে তবে তা তাদের কারও এক মুদ্দ বা অর্ধ মুদ্দ দান-খয়রাত করার সমান মর্যাদাসম্পন্নও হবে না।' [২২৬]
আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে যারা অগ্রবর্তী তারা অন্যান্য সাহাবিদের তুলনায় মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ বলেন,
لَا يَسْتَوِي مِنكُم مَّنْ أَنفَقَ مِن قَبْلِ الْفَتْحِ وَقَاتَلَ أُولَبِكَ أَعْظَمُ دَرَجَةً مِّنَ الَّذِينَ أَنفَقُوا مِن بَعْدُ وَقَاتَلُوا وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَى
'তোমাদের মধ্যে যে মক্কা বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে ও জিহাদ করেছে, সে সমান নয়। এরূপ লোকদের মর্যদা বড় তাদের অপেক্ষা, যারা পরে ব্যয় করেছে ও জিহাদ করেছে। তবে আল্লাহ উভয়কে কল্যাণের ওয়াদা দিয়েছেন।' [২২৭]
وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُم بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
'আর যারা সর্বপ্রথম হিজরতকারী ও আনসারদের মধ্যে পুরাতন, এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ সে সমস্ত লোকদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন কানন-কুঞ্জ, যার তলদেশ দিয়ে প্রস্রবণসমূহ প্রবাহিত। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে; এটাই হলো মহান কৃতকার্যতা।' [২২৮]
বিজয়ের পূর্বে যারা দান করেছে ও লড়াই করেছে তারাই অগ্রবর্তী। এই বিজয়ের মাধ্যমে হুদায়বিয়ার চুক্তি বোঝানো হয়েছে, যা মক্কা বিজয়ের সূচনা। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا لِيَغْفِرَ لَكَ اللَّهُ مَا تَقَدَّمَ مِن ذَنبِكَ وَمَا تَأَخَّرَ وَيُتِمَّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكَ وَيَهْدِيَكَ صِرَاطًا مُسْتَقِيمًا )
'নিশ্চয় আমি আপনার জন্যে এমন একটা ফায়সালা করে দিয়েছি, যা সুস্পষ্ট। যাতে আল্লাহ আপনার অতীত ও ভবিষ্যৎ ত্রুটিসমূহ মার্জনা করে দেন এবং আপনার প্রতি তাঁর নিয়ামাত পূর্ণ করেন ও আপনাকে সরল পথে পরিচালিত করেন।' [২২৯]
সাহাবায়ে কেরام রাসূলুল্লাহ-এর কাছে জানতে চেয়েছিলেন, 'এটাই কি বিজয়?' তিনি জবাবে বললেন, 'হ্যাঁ!' [২৩০]
অগ্রবর্তীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ যারা তারা হলেন, চার খলীফা। আবার তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি আবূ বকর তারপর উমর। এটি সাহাবা, তাবিয়িন, সকল ইমাম এবং এই উম্মাহর সিংহভাগ মানুষের থেকেই সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। এর পক্ষে বিভিন্ন দলীল-প্রমাণাদি আমি আমার مِنْهَاجُ أَهْلِ السُّنَّةِ النَّبَوِيَّةِ فِي نَقْضِ كَلَامِ الشَّيعَةِ وَالْقَدْرِيَّةِ “ সবিস্তারে আলোচনা করেছি।

টিকাঃ
[২২৩] সূরা ফাতির, ৩৫: ৩২。
[২২৪] হাইসামি, মাজমাউয যাওয়াইদ, ১০/৪০০, বর্ণনাকারীগণ বিশ্বস্ত。
[২২৫] বুখারি, ৬৬৫৮; মুসলিম, ২৫৩৬。
[২২৬] বুখারি, ৩৬৭৩; মুসলিম, ২৫৪০。
[২২৭] সূরা হাদীদ, ৫৭: ১০。
[২২৮] সূরা তাওবা, ৯: ১০০。
[২২৯] সূরা ফাতহ, ৪৮: ১-২。
[২৩০] মুসলিম, ১৭৮৫; আবূ দাউদ, ২৭৩৬。

📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 ইবনু আরাবির ভ্রান্ত চিন্তাধারা

📄 ইবনু আরাবির ভ্রান্ত চিন্তাধারা


একদল পথভ্রষ্ট লোক মনে করে, নবিদের সিলমোহরের মতো 'আউলিয়াদের সিলমোহর' আছে, আর তিনিই আউলিয়াদের সর্বোত্তম ব্যক্তি! মুহাম্মাদ ইবনু আলি হাকীম তিরমিযি [২৩১] (বিখ্যাত হাদীস সংকলক নন) ব্যতীত প্রথম যুগের আলিমদের মধ্যে কেউ কখনো 'আউলিয়াদের সিলমোহর'-এর ব্যাপারে কেউ কথা বলেননি। এ সম্পর্কে তিনি একটি বই [২৩২] লেখেন যাতে অনেক ভুলত্রুটি রয়েছে। এরপর পরবর্তী প্রজন্মের কিছু মুসলিম এগুলো বিশ্বাস করতে শুরু করল এবং নিজেকেই আউলিয়াদের সিলমোহর ভাবতে আরম্ভ করল। এমনকি তাদের মধ্যে কেউ কেউ এই দাবি করে বসল যে, আল্লাহ সম্পর্কে জানার দিক দিয়ে নবিদের সিলমোহর থেকে আউলিয়াদের সিলমোহর বেশি মর্যাদাবান ও উত্তম। আর আল্লাহর ব্যাপারে নবিরা নাকি তাদের জ্ঞান থেকে উপকৃত হয়েছেন! এভাবে 'আউলিয়াদের সিলমোহর' এর মর্যাদা নবিদের সিলমোহর থেকেও বেশি সাব্যস্ত করল! 'আল-ফুতূহাতুল মাক্কিয়্যাহ' (الْفُتُوْحَاتُ الْمَكَّيَّةُ) ও 'ফুসূসুল হিকাম' (فُصُوْصُ الْحِكَمِ) এর লেখক ইবনু আরাবি [২৩৩] এ বিষয়ে একাত্মতা প্রকাশ করেছে এবং এর পক্ষে কথা বলেছে। এর মাধ্যমে সে শারীআতের নির্দেশনা ও সুস্থ চিন্তাশক্তির বিরুদ্ধাচরণ করেছে এবং আল্লাহ তাআলার সকল আম্বিয়া ও আউলিয়াদেরও বিরুদ্ধাচরণ করেছে। এ ক্ষেত্রে তার বিভ্রান্তি সুস্পষ্ট সেই ব্যক্তির মতো, যে বলে فَخَرَّ عَلَيْهِمُ السَّقْفُ مِنْ تَحْتِهِمْ 'তাদের নিচ থেকে তাদের মাথার ওপর ছাদ ধসে পড়েছে!' আসলে তার বুদ্ধিও নেই, কুরআনের জ্ঞানও নেই।
অথচ মূল আয়াতে এসেছে,
فَخَرَّ عَلَيْهِمُ السَّقْفُ مِن فَوْقِهِمْ 'এরপর ওপর থেকে তাদের মাথায় ছাদ ধসে পড়েছে।' [২৩৪]
অতীতের একজন নবি এই উম্মাতের সমস্ত আউলিয়াদের থেকেও বহু উত্তম। নবিদের ওপর সর্বোত্তম দরূদ ও সালাম পেশ করছি।
সুতরাং মর্যাদার বিষয়ে নবিদের এবং আউলিয়াদের মাঝে কোনো তুলনাই চলে না। উপরন্তু নবিদের পরে আগমনকারী ব্যক্তিরা নবিদের থেকে প্রাপ্ত ইলমের ভিত্তিতেই আল্লাহর ব্যাপারে জানতে পেরেছে। আবার তারাই নিজেদের নবিদের থেকে শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করছে।
কেউ কেউ তো শ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম হবার আশায় নিজেকে 'আউলিয়াদের সিলমোহর' বলেও দাবি করছে। কারণ, নবিদের সিলমোহর বা সর্বশেষ নবি হলেন সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবি।
তাদের এই ধারণা সঠিক নয়। কারণ নবিদের সিলমোহর রাসূলুল্লাহ -এর শ্রেষ্ঠত্ব কুরআন-হাদীসের অসংখ্য দলীল দ্বারা প্রমাণিত। যেমন রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
'কিয়ামতের দিন আমিই হব বানী আদমের সরদার। তবে এতে আমার কোনো অহংকার নেই।' [২৩৫]
'আমি জান্নাতের দরজায় আসব এবং প্রবেশের অনুমতি চাইব। তখন প্রহরী ফেরেশতা বলবে, কে আপনি? যখন বলব, আমি মুহাম্মাদ। তখন ফেরেশতা বলবে, 'আপনার আগে অন্য কারও জন্য দরজা খোলার অনুমতি দেওয়া হয়নি।' [২৩৬]
মিরাজের রাতের ঘটনায় আল্লাহ তাআলা সকল নবির ওপর রাসূলুল্লাহ -এর মর্যাদা সমুন্নত করেছেন। আল্লাহ বলেন,
تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ
'এই রাসূলগণ, আমি তাদের কাউকে কারও ওপর মর্যাদা দিয়েছি। তাদের মধ্যে কেউ তো হলো তারা যার সাথে আল্লাহ কথা বলেছেন, আর কারও মর্যাদা উচ্চতর করেছেন...।' [২৩৭]
এগুলো ছাড়াও আরও অনেক প্রমাণ রয়েছে। সকল নবি আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহিপ্রাপ্ত হয়েছেন। কিন্তু মুহাম্মাদ -এর নুবুওয়াত অন্য কারও ওহির মুখাপেক্ষী নয়। তাঁর শারীআত স্বয়ংসম্পূর্ণ, এটি পূর্ববর্তী কোনো শারীআতের মুখাপেক্ষী নয়। এই বিষয়টি অন্যান্য নবিদের তুলনায় ভিন্ন, যেমন: ঈসা তাঁর অনুসারীদের অধিকাংশ আইন-কানুনের জন্য মূসা -এর ওপর নাযিলকৃত কিতাব তাওরাতের নির্দেশনা দিতেন। তাওরাতের নির্দেশনা ঈসা এসে পরিপূর্ণ করেছেন। এ কারণে খ্রিষ্টানরা ঈসা -এর পূর্বের নবিগণের কিতাবের মুখাপেক্ষী। যেমন: তাওরাত, যাবুর এবং অন্যান্য নবির কিতাবসমূহ। আবার পূর্ববর্তী জাতিদের মুহাদ্দাসিনের প্রয়োজন হতো, কিন্তু উম্মাতে মুহাম্মাদির জন্য কোনো মুহাদ্দাসের প্রয়োজন নেই। মুহাম্মাদ -এর পর আর কোনো নবি বা মুহাদ্দাসের প্রয়োজন নেই, কেননা আল্লাহ তাআলা তাঁর নুবুওয়াতের মধ্যে সর্বপ্রকার উত্তম গুণাবলি, জ্ঞান ও নেক আমলের সমাবেশ ঘটিয়েছেন, যা পূর্ববর্তী নবিদের মধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিল। এভাবে আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ -এর ওপর যে নিয়ামাত দিয়েছেন তা সরাসরি একত্রে ও এককভাবে তার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে, কারও কোনো প্রকার মধ্যস্ততার প্রয়োজন পড়েনি।
আল্লাহর যে আউলিয়া নবি নন, তার এসব বৈশিষ্ট্য নেই। মুহাম্মাদ -এর সংবাদ লাভ করার পর তাঁর অনুসরণ ব্যতীত কোনো ব্যক্তি আল্লাহর ওলি হতে পারে না। সুতরাং সে হিদায়াত ও তাকওয়ার যা কিছু অর্জন করবে তা মুহাম্মাদ -এর মাধ্যমেই অর্জন করবে। একইভাবে যারা পূর্ববর্তী নবিদের উম্মাত ছিল তারাও তাদের সময়ে নিজ জাতির কাছে প্রেরিত নবির অনুসরণ ব্যতীত কিছুতেই আল্লাহর ওলি হতে পারে না। যদি কেউ দাবি করে বলে, মুহাম্মাদ -এর রিসালাতের সংবাদ পাওয়ার পরেও আউলিয়াদের মধ্যে এমন ব্যক্তিত্ব আছে, যারা মুহাম্মাদ এর মুখাপেক্ষী নয় এবং আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর জন্য তাদের নিজস্ব পদ্ধতি আছে, তারা কাফির এবং নাস্তিক।

টিকাঃ
[২৩১] মৃত্যু: ৩২০ হিজরি。
[২৩২] বইটির নাম خَتْمُ الْوَلَايَةِ
[২৩৩] জন্ম: ৫৬০ হিজরি, মৃত্যু: ৬৩৮ হিজরি。
[২৩৪] সূরা নাহল, ১৬: ২৬。
[২৩৫] ইবনু মাজাহ, ৪৩০৮; আহমাদ, ১০৯৮৭。
[২৩৬] মুসলিম, ১৯৭。
[২৩৭] সূরা বাকারাহ, ২: ২৫৩。

📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 জাহিরি-বাতিনি ইলম

📄 জাহিরি-বাতিনি ইলম


আর যদি বলে, 'কেবল জাহিরি (বাহ্যিক) ইলমের জন্য আমি মুহাম্মাদের মুখাপেক্ষী কিন্তু বাতিনি (গুপ্ত) ইলমের জন্য তাঁর মুখাপেক্ষী নই, অথবা কেবল শারীআতের ইলমের জন্য তাঁর মুখাপেক্ষী কিন্তু হাকীকাতের জন্য নই'-তবে এই ব্যক্তি ওইসব ইয়াহূদী ও খ্রিষ্টানদের থেকেও অভিশপ্ত ও পথভ্রষ্ট, যারা বলে, 'মুহাম্মাদ কেবল উম্মিদের কাছে প্রেরিত নবি, যাদের কাছে পূর্ববর্তী আসমানি কিতাব আছে তাদের কাছে তাকে পাঠানো হয়নি!' মূলত এরা (ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানরা) কিতাবের কিছু অংশে বিশ্বাস করে এবং কিছু প্রত্যাখ্যান করে; এ কারণে আল্লাহ তাদের সত্যিকারের কাফির বলেছেন। অনুরূপভাবে যারা বলে, 'তিনি (রাসূলুল্লাহ) কেবল জাহিরি (বাহ্যিক) ইলম সহকারে প্রেরিত হয়েছেন কিন্তু তাকে বাতিনি (গুপ্ত) ইলম দেওয়া হয়নি', তারা রাসূলের আনীত রিসালাতের কিছু ব্যাপারে বিশ্বাস করল এবং কিছু প্রত্যাখ্যান করল। সুতরাং সেও একজন কাফির। উপরন্তু এরা ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানদের থেকেও অধিক মাত্রায় সত্য প্রত্যাখ্যানকারী। কারণ, ইসলামের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের সাথে সংযুক্ত ইলমের তাৎপর্য বাহ্যিক বিষয়ের সাথে যুক্ত জ্ঞানের থেকে অধিক। যেমন: ঈমান, ঈমানের হাকীকাত ও এর শর্তসমূহ।
তাই যদি কেউ দাবি করে, তিনি শুধু বাহ্যিক (জাহিরি) বিষয়গুলো জানতেন আর অভ্যন্তরীণ (বাতিনি) বিষয় জানতেন না, যেমন: ঈমানের হাকীকাতের মতো অভ্যন্তরীণ বিষয় জানতেন না কিংবা হাকীকাতের বিষয়গুলো তিনি কুরআন-সুন্নাহর বাইরে থেকে গ্রহণ করেছেন, তবে এই ব্যক্তির দাবিকৃত কথার অর্থ হলো সে কিছু অংশ রাসূলুল্লাহ-এর রিসালাত থেকে বিশ্বাস করে এবং কিছু অংশে বিশ্বাস করে না। এই ব্যক্তির অবস্থা তার থেকেও নিকৃষ্ট যে বলে, 'আমি কিছু অংশ বিশ্বাস করি এবং কিছু প্রত্যাখ্যান করি'। কেননা, আংশিক প্রত্যাখ্যানকারী ব্যক্তি যা বিশ্বাস করে সেটাকে অবিশ্বাসকৃত অংশের তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ ভাবে না।
কিন্তু এসব নাস্তিক্যবাদী পথভ্রষ্টরা আল্লাহর নৈকট্যকে (ওলায়াত) নুবুওয়াতের থেকেও শ্রেষ্ঠ মনে করে! তারা কিছু মানুষদের বিভ্রান্ত করে বলে, 'নুবুওয়াতের চেয়ে মুহাম্মাদের ওলায়াতের মর্যাদা বেশি!' কবিতার সুরে তারা বলে,
مقام النبوة في برزخ فويق الرسول ودون الولى
নুবুওয়াতের মর্যাদা রাসূলের ওপরে কিন্তু ওলির নিচে!
আরও বলে,
'আমরা তার ওলায়াতে শরীক আছি, যা তার রিসালাতের চেয়েও বড়!'
নিঃসন্দেহে এটি মারাত্মক ভ্রান্তি! আল্লাহ তাআলার নৈকট্যপ্রাপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে কেউই রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সমপর্যায়ের নয়; এমনকি ইবরাহীম, মূসা বা অন্যান্য রাসূলও নন। সুতরাং উল্লেখিত নাস্তিক্যবাদী ফিরকার কাউকে নিয়ে কথা বলা নিষ্প্রয়োজন!
জেনে রাখা প্রয়োজন, প্রত্যেক রাসূলই একজন নবি। আর প্রত্যেক নবিই আল্লাহ তাআলার ওলি। সুতরাং যিনি রাসূল তিনি একাধারে নবি এবং ওলি। তার রিসালাতের মধ্যে নুবুওয়াত অন্তর্ভুক্ত, আর নুবুওয়াতের মধ্যে ওলায়াত অন্তর্ভুক্ত। তাহলে ওলায়াত কীভাবে রিসালাত থেকে বড় হতে পারে যখন তা রিসালাতের অধীনে রয়েছে!
যদি তারা মনে করে তিনি আল্লাহর ওলায়াত (নৈকট্য) ব্যতীত 'নাবা' (সংবাদ, খবরাখবর, ওহি বা নুবুওয়াত) লাভ করেছেন, তবে এটি অগ্রহণযোগ্য। একজন নবি আল্লাহর ওলি হওয়া ব্যতীত ওহি গ্রহণ করতে পারেন না। আল্লাহর নৈকট্য থেকে তাকে পৃথক করা যায় না। আর যদি মেনে নেওয়া হয় যে, শুধু নুবুওয়াতই লাভ করেছেন, তবুও একজন নবির সমপর্যায়ের ওলায়াত (আল্লাহর নৈকট্য) অর্জন করা অন্য কারও পক্ষে সম্ভব নয়।

📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 নাস্তিক্যবাদী দর্শন ও শয়তানের আউলিয়া

📄 নাস্তিক্যবাদী দর্শন ও শয়তানের আউলিয়া


ভ্রান্ত ব্যক্তিদের অনেকে বলতে পারে, ফেরেশতা যে উৎস থেকে মুহাম্মাদ ﷺ-এর কাছে ওহি নাযিল করতেন তারাও সেই একই উৎস থেকে জ্ঞান গ্রহণ করেছে, যেমনটা ইবনু আরাবি বলত। এর কারণ তারা নাস্তিক্যবাদী দার্শনিকদের কাছ থেকে আকীদার জ্ঞান গ্রহণ করেছে। তাদের আকীদার উৎস 'কাশফ'।
দার্শনিকরা বলে, 'মহাবিশ্ব সুপ্রাচীন। এর কোনো শুরু নেই। এর সবকিছু একটি অভিন্ন উৎসের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।' অ্যারিস্টটল ও তার অনুসারীরা বলত, أَوَّلُهَا مُوْجَبُّ بِجَاتِهِ অর্থাৎ, 'সবকিছুর প্রথমে শুরুটা হয়েছিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে।'
তাদের পরবর্তীদের অনেকেই এই মতবাদে বিশ্বাসী ছিল। তাদের মধ্যে অন্যতম একজন ইবনু সিনা। [২৩৮]
তারা এ কথা বলে না এবং বিশ্বাসও করে না যে, আল্লাহ তাআলা আসমান, জমিন ও উভয়ের মাঝে সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। তিনি সবকিছু তাঁর ইচ্ছা ও কুদরত অনুসারে সৃষ্টি করেছেন এবং বিশ্বজগতের সবকিছু সম্পর্কে তিনি অবগত।
বরং তারা তাঁর জ্ঞানকে পুরোপুরি অস্বীকার করে যেমনটা অ্যারিস্টটল করত। অথবা তারা বলে, চলমান ও পরিবর্তনশীল বিষয়ের জ্ঞানের ক্ষেত্রে তিনি কেবল সাধারণ কিছু বিষয় জানেন, ইবনু সিনাও এমনটা বলত। উল্লেখিত দুই বক্তব্যের মধ্যে কার্যত কোনো পার্থক্য নেই। অ্যারিস্টটল যেভাবে আল্লাহর জ্ঞানকে অস্বীকার করেছে তেমনিভাবে ইবনু সিনাও করেছে। প্রতিটি বাস্তব অস্তিত্বশীল বস্তুর অনেক সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য থাকে। এসব বৈশিষ্ট্য বিশদ। এটি সবকিছুর নিজস্ব ধরন ও কার্যকলাপের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যে এসব বৈশিষ্ট্যের 'বিস্তারিত' খবর না জেনে কেবল 'সাধারণগুলো' জানে সে মহাবিশ্বের কিছুই জানে না। উল্লেখ্য, এসব 'সাধারণ' বৈশিষ্ট্য কেবল একটি তাত্ত্বিক ধারণা, বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্ব নেই। এ বিষয়ে অন্যত্র আমি বিস্তারিত আলোচনা করেছি। যেমন: رَدُّ تَعَارُضِ الْعَقْلِ وَالْنَقْلِ ও অন্যান্য গ্রন্থে।
আলোচ্য ব্যক্তিদের কুফরির ধরন ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানদের থেকেও নিকৃষ্ট; বরং তাদের কুফরি জাহিলি আরবের মূর্তিপূজারি মুশরিকদের থেকেও নিকৃষ্ট। কেননা, ইয়াহূদী-খ্রিষ্টান ও আরবের মুশরিকরা অন্ততপক্ষে আল্লাহকে আসমান ও জমিনের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে স্বীকার করত এবং মানত যে, তিনি সবকিছু তার ইচ্ছা ও কুদরত অনুসারে সৃষ্টি করেছেন। ওদিকে, অ্যারিস্টটল ও তার মতো অন্যান্য গ্রিক দার্শনিকরা নক্ষত্র ও মূর্তির পূজা করত। তারা ফেরেশতা ও নবি রাসূলদের সম্পর্কে কিছুই জানত না। অ্যারিস্টটলের রচনাসমূহে এসবের কোনো উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায় না; বরং গ্রিক দার্শনিকদের অধিকাংশ অধ্যয়ন ও লেখালেখি ছিল 'ন্যাচারাল সায়েন্স' (প্রাকৃতিক বিজ্ঞান) কেন্দ্রিক।
আর ধর্মীয় আকীদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে তারা প্রত্যেকেই অধিকাংশ সময় ভুল সিদ্ধান্ত প্রদান করত, খুব কমই সঠিক কথা বলত। ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানরা তাদের ধর্মীয় গ্রন্থের নানা বিকৃতি ও পরিবর্তন সত্ত্বেও এসব দার্শনিকদের থেকে অধিক ধর্মীয় জ্ঞান রাখত। পরবর্তী দার্শনিকদের মধ্যে ইবনু সিনার মতো অনেকে সুচতুরভাবে নিজেদের ভ্রান্ত দার্শনিক ধ্যান-ধারণাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কিছু হাদীসের সাথে মিশ্রিত করত। তারা জাহমিয়া এবং মু'তাযিলা ফিরকার মতো বিভ্রান্তদের কাছ থেকে আকীদার বিভিন্ন মূলনীতি গ্রহণ করে তার সাথে তাদের ভ্রান্ত চিন্তা-চেতনা মিশিয়ে দিয়ে একটি মাযহাব দাঁড় করিয়েছিল। এই মাযহাব (চিন্তাধারা) থেকে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধরনের দার্শনিকদের উৎপত্তি হয়েছে। এসব চিন্তাধারায় নানারকম সংঘাতপূর্ণ বিষয় ও সত্যের বিকৃতি দেখা যায়, যার কিছু আমি অন্যত্র বিশ্লেষণ করেছি। [২৩৯]

টিকাঃ
[২৩৮] (ইবনু সিনা একজন কাফির। যে পরিপূর্ণভাবে প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকদের নাস্তিক্যবাদী দর্শনে বিশ্বাস করত এবং মুসলিম ছদ্মবেশে মুসলিমদের মাঝে তার কুফরি চিন্তা-ধারা ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল) -ইংরেজি অনুবাদকের টিকা। সেলিম আবদুল্লাহ ইবনে মরগান

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00