📄 কুরআন-সুন্নাহকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা কাদের বৈশিষ্ট্য?
কাজেই কোনো ব্যক্তি যদি নিজেকে আল্লাহর ওলি দাবি করে অথবা তার সাথিরা দাবি করে যে তার কাছে ইলহাম আসে বা তিনি 'মুখাতাব', তাই সব বিষয়ে তাকে অনুসরণ করা ও তার সকল কথা গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক এবং তার সাথে মতপার্থক্য করা যাবে না বা বিরোধিতা করে প্রশ্ন করা যাবে না, এমনকি এ ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহ দলীলের দরকার নেই—তবে এসব ব্যক্তিরা মহাভ্রান্তি ও পথভ্রষ্টতার মধ্যে আছে। নিঃসন্দেহে এসব লোক থেকে উমর বহুগুণে উত্তম ছিলেন। তিনি ছিলেন খলীফা ও আমিরুল মুমিনীন; এরপরেও বিভিন্ন বিষয়ে মুসলিমরা তার সাথে মতপার্থক্য করেছেন এবং তার বা অন্যান্য ব্যক্তিদের কথা ও কাজকে কুরআন ও সুন্নাহর মানদণ্ডের সাথে মিলিয়েছেন। কুরআন-সুন্নাহকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা আউলিয়াদের জন্য বাধ্যতামূলক এবং তাদের কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নন।
এই উম্মাতের প্রথম যুগের আলিমগণ সর্বসম্মতভাবে একমত হয়েছেন, রাসূলুল্লাহ ব্যতীত যেকোনো ব্যক্তির মতামত গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করা যায়। নবিদের সাথে অন্যান্য নেককার ব্যক্তিদের পার্থক্য ঠিক এখানেই। নবিদের যেসব বিষয়ের খবর দেওয়া হয়েছে তাতে পরিপূর্ণ ঈমান রাখা বাধ্যতামূলক। উপরন্তু তাদের সকল আদেশ মানাও বাধ্যতামূলক। কিন্তু এ বিষয়টি আল্লাহর আউলিয়াদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় (যারা নবি নন)।
আউলিয়াদের সকল আদেশ মানা জরুরি নয় কিংবা তাদের জানানো সকল খবর বিশ্বাস করাও জরুরি নয়; বরং তাদের আদেশ-নিষেধ (শারীআতের হুকুম) ও খবরা-খবর (গায়েবের খবর, আল্লাহ ও তাঁর জাত-সিফাতের বর্ণনা ইত্যাদি) অবশ্যই কুরআন ও সুন্নাহর সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে। একজন ব্যক্তি আল্লাহর যত বড় ওলিই হোক না কেন, তার যা কিছু কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে তা মানা বাধ্যতামূলক, যা বৈসাদৃশ্যপূর্ণ হবে তা পরিপূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যাত হবে।
এমনকি তিনি যদি সত্যের সন্ধানে নিজের সর্বোচ্চ আন্তরিক প্রচেষ্টা ব্যয় করেন, তবুও সেগুলো মিলিয়ে দেখতে হবে। সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছালে তিনি দুইটি পুরস্কার পাবেন আর ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছালেও নিজের আন্তরিক প্রচেষ্টার জন্য একটি পুরস্কার পাবেন, এ ক্ষেত্রে তার ভুলত্রুটি ক্ষমা করা হবে। ঐকান্তিক প্রচেষ্টার পরেও যদি ভুলবশত কুরআন ও সুন্নাহর বিরুদ্ধে চলে যান, তবে এসব ভুলের জন্য কোনো গুনাহ নেই যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি নিজের সাধ্যমতো তাকওয়া অবলম্বন করবেন। আল্লাহ বলেন,
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ 'অতএব তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করো...।' [১৬০]
টিকাঃ
[১৬০] সূরা তাগাবুন, ৬৪: ১৬。
📄 আউলিয়াদের অন্ধ অনুসরণকারী খ্রিষ্টানদের মতো
যারা আউলিয়াদের সবকিছু যাচাই না করেই মেনে নেয়, তারা খ্রিষ্টানদের অনুরূপ। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهَا وَاحِدًا لَّا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ ))
'তারা তাদের পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগীদের তাদের রব হিসেবে গ্রহণ করেছে আল্লাহ ব্যতীত এবং মারইয়ামের পুত্রকেও। অথচ তারা আদিষ্ট ছিল একমাত্র মা'বুদের ইবাদাতের জন্য। তিনি ছাড়া কোনো মা'বুদ নেই, তারা তাঁর শরীক সাব্যস্ত করে, তার থেকে তিনি পবিত্র। [১৮০]
আদি ইবনু হাতিম উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, এই আয়াত সম্পর্কে জানতে চেয়ে আমি রাসূলুল্লাহ -কে বললাম, তারা তো তাদের (পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগীদের) ইবাদাত করে না! নবি বললেন, 'তারা হারামকে হালাল বানায় এবং হালালকে হারাম বানায়, এরপর লোকেরা তাদের আনুগত্য করে। এটাই হলো তাদের ইবাদাত করা। [১৮১]
এ কারণে এসব লোক সম্পর্কে বলা হয়, দ্বীনের মূলনীতি হতে বিচ্যুত হওয়ার কারণে তারা আত্মপ্রবঞ্চনার শিকার। সবচেয়ে মৌলিক নীতি হলো রাসূলুল্লাহ-এর আনীত বার্তার ওপর ঈমান আনয়ন করা। মুহাম্মাদ -এর রিসালাত সমস্ত সৃষ্টিজগতের জন্য; জিন-ইনসান, আরব-অনারব, আলিম, আবিদ, শাসক-শাসিত নির্বিশেষে সকলের জন্য। এই বিষয়ের ওপর অবশ্যই ঈমান আনতে হবে। প্রকাশ্যে এবং গোপনে রাসূলের আনুগত্য ব্যতীত আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর কোনো রাস্তা নেই। এমনকি যদি মূসা, ঈসা বা অন্য কোনো নবি মুহাম্মাদ -এর সাক্ষাৎ পেতেন তবে তাদের ওপরও তাঁর অনুসরণ ও আনুগত্য করা আবশ্যক হতো। আল্লাহ বলেন,
وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّينَ لَمَا آتَيْتُكُم مِّن كِتَابٍ وَحِكْمَةٍ ثُمَّ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مُّصَدِّقُ لِمَا مَعَكُمْ لَتُؤْمِنُنَّ بِهِ وَلَتَنصُرُنَّهُ قَالَ أَأَقْرَرْتُمْ وَأَخَذْتُمْ عَلَى ذَلِكُمْ إِصْرِى قَالُوا أَقْرَرْنَا قَالَ فَاشْهَدُوا وَأَنَا مَعَكُم مِّنَ الشَّاهِدِينَ فَمَن تَوَلَّى بَعْدَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
'আর আল্লাহ যখন নবিগণের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন যে, আমি যা কিছু তোমাদের দান করেছি কিতাব ও জ্ঞান এবং অতঃপর তোমাদের নিকট কোনো রাসূল আসেন তোমাদের কিতাবকে সত্য বলে দেওয়ার জন্য, তখন সে রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে এবং তার সাহায্য করবে। তিনি বললেন, 'তোমরা কি অঙ্গীকার করছ এবং এই শর্তে আমার ওয়াদা গ্রহণ করে নিয়েছ? তারা বললেন, 'আমরা অঙ্গীকার করেছি।' তিনি বললেন, তাহলে এবার সাক্ষী থাকো। আর আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষী রইলাম। অতঃপর যে লোক এই ওয়াদা থেকে ফিরে দাঁড়াবে, সে-ই হবে নাফরমান।' [১৮২]
ইবনু আব্বাস বলেন, প্রত্যেক নবির কাছ থেকে আল্লাহ তাআলা এই মর্মে শপথ গ্রহণ করেছেন যে, যদি তার জীবদ্দশায় মুহাম্মাদ চলে আসেন, তবে তারা তার ওপর ঈমান আনবেন, সাহায্য ও সমর্থন করবেন। তিনি তাঁর অনুসারীদের কাছ থেকেও এই শপথ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন; যদি তোমাদের জীবদ্দশায় মুহাম্মাদ প্রেরিত হন, তবে তোমরা তার ওপর ঈমান আনবে ও তাকে সাহায্য করবে।' [১৮৩]
আল্লাহ জাল্লা শানুহু বলেন,
لَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَن يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَا أَنزَلَ اللَّهُ وَإِلَى الرَّسُولِ رَأَيْتَ الْمُنَافِقِينَ يَصُدُّونَ عَنكَ صُدُودًا فَكَيْفَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ ثُمَّ جَاءُوكَ يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا إِحْسَانًا وَتَوْفِيقًا أُولَئِكَ الَّذِينَ يَعْلَمُ اللَّهُ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ وَعِظْهُمْ وَقُل لَّهُمْ فِي أَنفُسِهِمْ قَوْلًا بَلِيغًا وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ جَاءُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَّحِيمًا فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
'আপনি কি তাদের দেখেননি, যারা দাবি করে যে, যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে আমরা সে বিষয়ের ওপর ঈমান এনেছি এবং আপনার পূর্বে যা অবর্তীণ হয়েছে। তারা বিরোধীয় বিষয়কে শয়তানের দিকে নিয়ে যেতে চায়, অথচ তাদের প্রতি নির্দেশ হয়েছে, যাতে তারা ওকে মান্য না করে। পক্ষান্তরে শয়তান তাদের প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়।
আর যখন আপনি তাদের বলবেন, আল্লাহর নির্দেশের দিকে এসো, যা তিনি রাসূলের প্রতি নাযিল করেছেন, তখন আপনি মুনাফিকদের দেখবেন, ওরা আপনার কাছ থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে যাচ্ছে।
এমতাবস্থায় যদি তাদের কৃতকর্মের দরুন বিপদ আরোপিত হয়, তবে তাতে কী হলো! অতঃপর তারা আপনার কাছে আল্লাহর নামে কসম খেয়ে খেয়ে ফিরে আসবে যে, মঙ্গল ও সম্প্রীতি ছাড়া আমাদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।
এরা হলো সে সমস্ত লোক, যাদের মনের গোপন বিষয় সম্পর্কেও আল্লাহ তাআলা অবগত। অতএব, আপনি ওদের উপেক্ষা করুন এবং ওদের সদুপদেশ দিয়ে এমন কোনো কথা বলুন, যা তাদের জন্য কল্যাণকর।
বস্তুত আমি একমাত্র এই উদ্দেশ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি, যাতে আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী তাঁদের আদেশ-নিষেধ মান্য করা হয়। আর সেসব লোক যখন নিজেদের অনিষ্ট সাধন করেছিল, তখন যদি আপনার কাছে আসত অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করত এবং রাসূলও যদি তাদের ক্ষমা করিয়ে দিতেন। অবশ্যই তারা আল্লাহকে ক্ষমাকারী, মেহেরবানরূপে পেত।
অতএব, তোমার পালনকর্তার কসম, সে লোক ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায় বিচারক বলে মনে করে। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোনো রকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং তা হৃষ্টচিত্তে কবুল করে নেবে।' [১৮৪]
টিকাঃ
[১৭৯] সূরা বাকারাহ, ২: ১৬৫-১৬৭。
[১৮০] সূরা তাওবাহ, ৯: ৩১。
[১৮১] তিরমিযি, ৩০৯৫, হাসান。
[১৮২] সূরা আলে ইমরান, ৩: ৮১-৮২。
[১৮৩] ইবনু কাসীর, তাফসীর, ১/৩২৫; তাবারি, তাফসীর, ৬/৫৫৬。
[১৮৪] সূরা নিসা, ৪: ৬০-৬৫。
📄 আউলিয়াদের অনুসরণে বিভ্রান্তির কারণ
যারা কোনো ওলির অনুসরণের কারণে আল্লাহর রাসূলের আনীত বিষয়ের বিরুদ্ধে চলে যায় তারা মূলত দুইটি বিষয়ের ভিত্তিতে নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে;
(১) তারা উক্ত ব্যক্তিকে সত্যিকার অর্থেই আল্লাহর ওলি মনে করে এবং
(২) আল্লাহর আউলিয়াদের সাথে কোনো বিষয়ে মতপার্থক্যকে তারা গ্রহণযোগ্য মনে করে না।
সাহাবি ও তাবিয়িগণ আল্লাহর শ্রেষ্ঠ আউলিয়াদের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু তাদের কাছ থেকেও কুরআন-সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক কোনো কিছু গ্রহণ করা যাবে না, তাহলে যেসব আউলিয়া অপেক্ষাকৃত কম মর্যাদার অধিকারী তাদের ব্যাপারে আমাদের কী করা উচিত?
📄 কারামাত ওলায়াতের প্রমাণ নয়
যারা বিনা প্রশ্নে আল্লাহর ওলিদের অনুসরণ করে, নিজেদের বিশ্বাসের পক্ষে তাদের প্রধান যুক্তি হলো অমুক ব্যক্তি আল্লাহর একজন ওলি, এ জন্যই আমরা তাকে অনুসরণ করছি আর তার সাথে বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে এবং তিনি নানা বিষয়ের খবরাখবর জানিয়ে দেন, উদাহরণস্বরূপ: তিনি অমুক ব্যক্তির দিকে অঙ্গুলি ইশারা করলে সে মৃত্যুবরণ করেছে! অথবা তিনি শূন্যে ভেসে গিয়ে মক্কায় হজ্জ করে এসেছেন বা অন্যত্র সফর করেছেন অথবা পানির ওপর দিয়ে হেঁটেছেন। কিংবা আরও বলতে পারে, তিনি অলৌকিকভাবে অমুক জলাশয় পূর্ণ করেছেন বা মাঝে মাঝে মানুষের চোখ থেকে অদৃশ্য হয়ে যান বা তার কাছে সাহায্য চাইলে তিনি অনুপস্থিত বা মৃত হলেও সেখানে হাজির হয়ে যান এবং তাদের সমস্যার সমাধান করেন কিংবা তিনি মানুষের হারানো সম্পত্তির খবর জানিয়ে দেন অথবা প্রবাসে অবস্থানরত ব্যক্তির অসুস্থতা বা অন্যান্য খবর জানিয়ে দেন ইত্যাদি ইত্যাদি।
এসব ঘটনা বা অন্যান্য অনুরূপ ঘটনা সংঘটন করলেও প্রমাণিত হয় না যে, অমুক ব্যক্তি আল্লাহর একজন ওলি। বরং যারা সত্যিকার অর্থেই আল্লাহর ওলি, তারা সর্বসম্মতভাবে একমত হয়েছেন যে, যদি কেউ শূন্যে ভেসে বেড়ায় বা পানির ওপর দিয়ে হেঁটে যায়, এতে আশ্চর্য হয়ে তার কথা-কর্মকে প্রাধান্য দেওয়া যাবে না; বরং প্রথমে মিলিয়ে দেখতে হবে যে অমুক ব্যক্তি রাসূলের অনুসরণ করছে কি না এবং তার কাজকর্ম রাসূলের আদেশ-নিষেধের সাথে সংগতিপূর্ণ কি না?
আল্লাহর আউলিয়াদের কারামাত এসব ঘটনা থেকে আরও মহান। এসব আশ্চর্যজনক ঘটনা যেভাবে আল্লাহর আউলিয়াদের মাধ্যমে প্রকাশিত হতে পারে তেমনিভাবে আল্লাহর দুশমনের মাধ্যমেও প্রকাশিত হতে পারে। অনেক কাফির-মুশরিক, ইয়াহূদী, খ্রিষ্টান ও মুনাফিকের কাছ থেকেও বহু আশ্চর্যজনক ঘটনা দেখতে পাওয়া যায়। এমনকি বিদআতের অনুসারী পথভ্রষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমেও সেসব ঘটতে পারে। উল্লেখিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অলৌকিক ঘটনাগুলো শয়তানের প্রভাবে ঘটে। ফলে এসব ঘটনা ঘটতে দেখলেই কাউকে আল্লাহর ওলি বলে বিশ্বাস করার অনুমতি নেই। কাউকে আল্লাহর আউলিয়াদের অন্তর্ভুক্ত মনে করার জন্য কুরআন ও হাদীসে উল্লেখিত আউলিয়াদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, আমল ও শর্তসমূহ দেখা জরুরি। ঈমানের অভ্যন্তরীণ হাকীকাত, ইসলামের বাহ্যিক আইন-কানুনসমূহ ও কুরআনের আলোকে এগুলো শনাক্ত করা সম্ভব।
অলৌকিক ঘটনা সংঘটন সম্পর্কে উল্লেখ্য, এগুলো এমন ব্যক্তির মাধ্যমেও ঘটতে পারে যে ওযু করে না, সালাত আদায় করে না; বরং সব সময় অপবিত্র থাকে, কুকুরের সংস্পর্শে থাকে এবং নোংরা, আবর্জনা, শৌচাগার, কবরস্থান ও পশুর খোঁয়াড়ের মতো স্থানে থাকে। তাদের গায়ে দুর্গন্ধ থাকে এবং ইসলামের নির্দেশিত উপায়ে পবিত্রতা অর্জন করে না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, 'যে ঘরে অপবিত্র লোক (গোসল ফরয হওয়ার পর যে পবিত্রতা অর্জন করেনি) কুকুর ও কোনো কিছুর প্রতিকৃতি থাকে সে ঘরে ফেরেশতা প্রবেশ করে না।' [১৮৫]
অন্যত্র এসব নোংরা স্থান সম্পর্কে নবি ﷺ বলেছেন, 'এসব স্থানে শয়তান উপস্থিত থাকে।' [১৮৬]
অর্থাৎ এসব স্থানে শয়তান যাতায়াত করে।
নবি ﷺ বলেছেন, 'যে ব্যক্তি পিয়াজ বা রসুন কিংবা ওই-জাতীয় সবজি খায় সে যেন আমাদের মাসজিদের কাছে না আসে। কেননা, এ দুটি বস্তু মানুষকে কষ্ট দেয় আর যে বস্তু মানুষকে কষ্ট দেয়, তাতে ফেরেশতারাও কষ্ট পান। [১৮৭]
'নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র আর তিনি পবিত্রতা ভালোবাসেন।' [১৮৮]
'তিনি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, তিনি পরিচ্ছন্নতা ভালোবাসেন।' [১৮৯]
জমিনে বিচরণকারী প্রাণীগুলোর মধ্যে চারটি এমন আছে যেগুলো হত্যায় কোনো পাপ নেই। হারামে হোক কিংবা হারামের বাইরে হোক। (তা হলো:) কাক, চিল ও দংশনকারী (পাগলা) কুকুর ও ইঁদুর।' [১৯০]
অন্য সূত্রে বিচ্ছুর কথাও উল্লেখিত রয়েছে। [১৯১]
রাসূলুল্লাহ মুসলিমদের কুকুর হত্যা করতে নির্দেশ দিয়েছেন (পরবর্তী সময়ে এই নির্দেশ প্রত্যাহার করে শুধু দংশনকারী কুকুর হত্যার নির্দেশ দেয়া হয়)।
তিনি বলেন, 'যে ব্যক্তি শস্য খেতের পাহারা কিংবা হিফাজতের উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে কুকুর পোষে, প্রতিদিন তার নেক আমল থেকে এক 'কীরাত' [১৯২] পরিমাণ কমতে থাকবে।' [১৯৩]
'ফেরেশতারা কখনো এমন-সব কাফেলার সঙ্গী হয় না, যাদের সঙ্গে কুকুর কিংবা ঘণ্টা থাকে।' [১৯৪]
'তোমাদের কারও পাত্রে যখন কুকুর মুখ লাগিয়ে পান করবে তখন সে পাত্র পবিত্র করার পদ্ধতি হলো সাতবার তা ধুয়ে ফেলা। একবার মাটি দিয়ে (ঘষে ফেলবে)।' [১৯৫]
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَاكْتُبْ لَنَا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ إِنَّا هُدْنَا إِلَيْكَ قَالَ عَذَابِي أُصِيبُ بِهِ مَنْ أَشَاءُ وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ فَسَأَكْتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَالَّذِينَ هُم بِآيَاتِنَا يُؤْمِنُونَ الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِندَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنجِيلِ يَأْمُرُهُم بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزَرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنزِلَ مَعَهُ أُولَبِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
'আর পৃথিবীতে এবং আখিরাতে আমাদের জন্য কল্যাণ লিখে দাও। আমরা তোমার দিকে প্রত্যাবর্তন করছি। আল্লাহ তাআলা বললেন, আমার আযাব তারই ওপর পরিব্যাপ্ত। সুতরাং তা তাদের জন্য লিখে দেব, যারা ভয় রাখে, যাকাত দান করে এবং যারা আমার আয়াতসমূহের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করে।
সে সমস্ত লোক, যারা আনুগত্য অবলম্বন করে এ রাসূলের, যিনি উম্মি নবি, যাঁর সম্পর্কে তারা নিজেদের কাছে রক্ষিত তাওরাত ও ইঞ্জিলে লেখা দেখতে পায়, তিনি তাদের নির্দেশ দেন সৎকর্মের, বারণ করেন অসৎকর্ম থেকে; তাদের জন্য যাবতীয় পবিত্র বস্তু হালাল ঘোষণা করেন ও নিষিদ্ধ করেন হারাম বস্তুসমূহ এবং তাদের ওপর থেকে সে বোঝা নামিয়ে দেন এবং বন্দিত্ব অপসারণ করেন, যা তাদের ওপর বিদ্যমান ছিল। সুতরাং যেসব লোক তাঁর ওপর ঈমান এনেছে, তাঁর সাহচর্য অবলম্বন করেছে, তাঁকে সাহায্য করেছে এবং সে নূরের অনুসরণ করেছে, যা তার সাথে অবতীর্ণ করা হয়েছে, শুধু তারাই নিজেদের উদ্দেশ্যে সফলতা অর্জন করতে পেরেছে।' [১৯৬]
সুতরাং কোনো ব্যক্তি যদি নোংরা অপবিত্র বস্তুর সংস্পর্শে থাকে যেগুলো শয়তানের পছন্দনীয় অথবা পেশাব-পায়খানার সাথে সময় কাটায় কিংবা যেসব নির্জন স্থানে জিন-শয়তান থাকে সেখানে ঘুরে বেড়ায় বা সাপ-বিচ্ছু, কুকুরের কান ইত্যাদি অপবিত্র ও হারাম প্রাণী ভক্ষণ করে কিংবা মূত্র পান করে বা শয়তানের পছন্দনীয় অন্যান্য নোংরা কাজ করে অথবা সে আল্লাহকে বাদ দিয়ে কোনো সৃষ্টিকে ডাকে ও সাহায্য প্রার্থনা করে।
এবং নিজেকে তাদের অভিমুখী করে অথবা তাদের 'শাইখ' এর দিকে সাজদা করে কিন্তু রব্বুল আলামীনের জন্য নিজের দ্বীনকে একান্তভাবে বিশুদ্ধ করে না কিংবা সে যদি কুকুর ও আগুনের সংস্পর্শে থাকে, পশুর খোঁয়াড় ও অন্যান্য নোংরা স্থান বা কবরস্থানে ঘুরে বেড়ায় বিশেষত ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান ও মুশরিকদের কবরস্থানে সময় কাটায় অথবা কুরআন শুনতে অপছন্দ করে, এর প্রতি আগ্রহ না থাকে কিন্তু কবিতা ও সংগীত শুনতে পছন্দ করে এবং কুরআনের চেয়ে শয়তানের বাদ্যযন্ত্র বাঁশি (মিউজিক) শুনতে বেশি ভালো লাগে, তবে এগুলো শয়তানের আউলিয়ার বৈশিষ্ট্য, কখনোই রহমানের আউলিয়ার বৈশিষ্ট্য নয় এবং তা হতে পারে না।
ইবনু মাসউদ বলেন, 'তোমাদের জন্য কুরআন ছাড়া আর কিছু চাওয়ার দরকার নেই। যদি কেউ কুরআন ভালোবাসে তবে সে আল্লাহকে ভালোবাসে আর যদি সে কুরআনকে পছন্দ করে তবে সে আল্লাহকে পছন্দ করে।' [১৯৭]
উসমান ইবনু আফফান বলেন, 'যদি আমাদের অন্তর পরিচ্ছন্ন হয়, তবে আমরা কখনোই আল্লাহর কালাম থেকে পরিতৃপ্ত হব না।' [১৯৮]
ইবনু মাসউদ বলেন, 'আল্লাহর স্মরণের কারণে অন্তরে ঈমান বৃদ্ধি পায়, যেভাবে পানির কারণে শস্য জন্মায়। আর গান বাজনার কারণে অন্তরে নিফাক বৃদ্ধি পায় যেভাবে পানির কারণে শস্য জন্মায়।' [১৯৯]
টিকাঃ
[১৮৫] আবূ দাউদ, ২২৭; আহমাদ, ২/৫২, সহীহ。
[১৮৬] ইবনু হিব্বান, ১৪০৬; আবূ দাউদ, ৬, সহীহ。
[১৮৭] বুখারি, ৮৫৪; মুসলিম, ৫৬৪。
[১৮৮] মুসলিম, ১০১৫。
[১৮৯] আজলুনি, কাশফুল খফা, ১/৩৪১, একজন বর্ণনাকারী দুর্বল。
[১৯০] বুখারি, ৩৩১৪; মুসলিম, ১১৯৮。
[১৯১] নাসাঈ, ২৮৮১。
[১৯২] উহুদ পাহাড় সমপরিমাণ。
[১৯৩] বুখারি, ২৩২৩
[১৯৪] মুসলিম, ২১১৩。
[১৯৫] নাসাঈ, কুবরা, ৬৯; ইবনু আসাকির, মু'জামুশ শুয়ূখ, ২/৭৮৪, সহীহ。
[১৯৬] সূরা আ'রাফ, ৭: ১৫৬-১৫৭。
[১৯৭] ইবনু রজব, জামিউল উলূমি ওয়াল হিকাম, ৩১৮。
[১৯৮] ইবনুল কাইয়িম, ইগাসাতুল লাহফান, ১/৫৫。