📄 এই উম্মাহর শ্রেষ্ঠ আউলিয়া যারা
এই উম্মাতে এসব আউলিয়াদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি হলেন আবূ বকর, এরপর উমর ইবনুল খাত্তাব। নবিদের পরে এই উম্মাহর সর্বোত্তম ব্যক্তি হলেন আবূ বকর ও উমর।
আগেই বলেছি, বিশুদ্ধ হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণিত, উমর এই উম্মাতের একজন মুহাদ্দাস (তীক্ষ্ণবুদ্ধি ও সূক্ষ্মদৃষ্টিসম্পন্ন লোক, যাদের অন্তরে আল্লাহ সত্যের দিশা দান করেন) ছিলেন। এই উম্মাহর অন্য যেকোনো মুহাদ্দাস বা ইলহাম ও অনুপ্রেরণার মাধ্যমে সত্যের দিশারি প্রাপ্ত ব্যক্তি থেকে উমর উত্তম। আর তিনি সর্বদাই ফরয ও ওয়াজিব আমল পালন করতেন। নিজের কাজকর্মকে সর্বদাই রাসূলুল্লাহ -এর আনীত আদর্শের সাথে পরিমাপ করতেন।
যখন এগুলো রাসূলের আদর্শের সাথে মিলে যেত, তখন সেটা উমরের উচ্চ মর্যাদা ও তাকওয়ার পরিচায়ক। আমরা জানি, একাধিক ঘটনায় উমর -এর মতামতের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ ওহি নাযিল হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য কিছু সময় দেখা যায়, রাসূলুল্লাহ -এর মতামতের সাথে উমর -এর মতের পার্থক্য হয়েছে। যখনই উমর বিষয়টি বুঝতে পারতেন, নিজের মতামত পরিবর্তন করতেন এবং রাসূলের অনুসরণ করতেন। হুদায়বিয়ার চুক্তির ঘটনায় তিনি নিজের মত পরিবর্তন করেছিলেন। প্রথমে ভেবেছিলেন এখানে মুসলিমদের যুদ্ধ করা উচিত ছিল। এরপর রাসূলের সাথে পরামর্শ করে তিনি মতামত পরিবর্তন করেন। এই হাদীসটি সুপরিচিত, বুখারি ও অন্যান্য হাদীসগ্রন্থে সহজলভ্য।
নবি হিজরতের ষষ্ঠ বর্ষে ওমরাহ করতে বের হলেন। সাথে ছিল চৌদ্দ শ’ মুসলিম। এই মুসলিমরা তার কাছে গাছের তলায় বাইয়াত প্রদান করলেন। এরপর নবি মুশরিকদের সাথে আলোচনার পর চুক্তি করলেন। সে অনুসারে সিদ্ধান্ত হলো, এ বছর তারা ওমরাহ না করেই মদীনায় যাবেন এবং পরবর্তী বছর ওমরাহ করবেন। এ ছাড়া আরও বেশ কিছু শর্ত ছিল, যা মুসলিমদের কাছে অন্যায় মনে হচ্ছিল। সেটি মেনে নেওয়া মুসলিমদের জন্য খুবই কঠিন ছিল। তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সেই চুক্তি করলেন। শুরুতে উমর সেই চুক্তিকে কড়াভাবে অপছন্দ করছিলেন।
এমনকি তিনি নবি -কে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা কি সত্যের ওপরে নই, আর আমাদের শত্রুরা কি মিথ্যার ওপরে নয়? নবি বললেন, অবশ্যই! এরপর উমর বললেন, আমাদের মৃত ব্যক্তিরা কি জান্নাতে নয় আর তাদের মৃতরা কি জাহান্নামি নয়? নবি বললেন, অবশ্যই! উমর বললেন, তবে কেন আমরা আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে এত হীনতা স্বীকার করব? রাসূলুল্লাহ বললেন, 'আমি অবশ্যই রাসূল; অতএব আমি তাঁর (আল্লাহর) অবাধ্য হতে পারি না, তিনিই আমার সাহায্যকারী। আমি বললাম, আপনি কি আমাদের বলেননি যে, আমরা শীঘ্রই বায়তুল্লাহ যাব এবং তাওয়াফ করব। তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি কি এ বছরই আসার কথা বলেছি? উমর বললেন, না। তিনি বললেন, তুমি অবশ্যই কা'বা গৃহে যাবে এবং তাওয়াফ করবে।
এরপর আবু বকরের কাছে গিয়ে উমর একই কথা বললেন, যা তিনি নবি -কে বলেছিলেন। আবূ বকর নবি -এর মতো অনুরূপ উত্তর দিলেন, যদিও আবূ বকর উমর এর সাথে নবি -এর পূর্বের কথোপকথন শোনেননি। সুতরাং এই ঘটনায় বোঝা গেল, উমর -এর তুলনায় আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে আবূ বকরের অধিক সাদৃশ্য ছিল। অতঃপর বিষয়টি বুঝতে পেরে উমর নিজের মতামত ও অবস্থান পরিবর্তন করলেন এবং বললেন, এর জন্য (অর্থাৎ ধৈর্যহীনতার কাফফারা হিসাবে) আমার অনেক নেক আমল রয়েছে।[১৫৭]
অনুরূপভাবে রাসূলের ওফাতের পর প্রথমে উমর তার মৃত্যু অস্বীকার করেছিলেন। এরপর যখন আবূ বকর বললেন, তিনি নিশ্চিতভাবেই মৃত্যুবরণ করেছেন তখন উমর নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার করলেন। [১৫৮]
অনুরূপভাবে, আবূ বকর -এর খিলাফাতকালে যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধে উমর বলেছিলেন, হে আবূ বকর, আপনি কীরূপে আরবের লোকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন? আবূ বকর বললেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল এ কথার সাক্ষ্য দেওয়া পর্যন্ত এবং সালাত কায়িম করা ও যাকাত আদায় করা পর্যন্ত আমি লোকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি। আল্লাহর শপথ! তারা রাসূলুল্লাহ -এর কাছে যা প্রদান করত, তা থেকে একটি বকরির বাচ্চা দান করতেও যদি অস্বীকার করে, তবে আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। উমর বললেন, তখন আমি আবূ বকরের অভিমত উপলব্ধি করলাম, আল্লাহ তাআলা তাঁর অন্তর উন্মুক্ত করেছেন। আমি বুঝতে পারলাম, তাঁর অভিমতই সঠিক।' [১৫৯]
অন্যান্য অনুরূপ ঘটনার সাথে এই ঘটনার মাধ্যমে উমরের তুলনায় আবু বকরের উচ্চমর্যাদা প্রকাশিত হয়। যদিও আমরা জানি উমর একজন মুহাদ্দাস ছিলেন যাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্যের দিশা দেয়া হতো। উমর মুহাদ্দাস হলেও আবূ বকর ছিলেন আস-সিদ্দীক (সত্যবাদী, সদা বিশ্বস্ত)। যিনি সিদ্দীক তিনি নবির কাছ থেকে (সত্যের দিশা) গ্রহণ করেন আর আল্লাহ তাআলা তার নবিকে সকল প্রকার কথা ও কর্মের ভুল থেকে হেফাজত করেন। অপরদিকে একজন মুহাদ্দাস তার অন্তরের অনুপ্রেরণা হতে দিশা গ্রহণ করেন। আর এ ক্ষেত্রে তিনি ভুলত্রুটি থেকে সুরক্ষিত নন। এ জন্য একজন মুহাদ্দাস সব সময় নিজেকে রাসূলের আনীত আদর্শের সাথে মিলিয়ে দেখতে বাধ্য, আর নবি-রাসূলগণ ভুলত্রুটি থেকে মুক্ত।
এ জন্য উমর সাহাবায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ করতেন, আলোচনা করতেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। অনেক ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরাম উমরের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য করতেন। এ ক্ষেত্রে তারা কুরআন ও সুন্নাহ হতে যুক্তি-তর্ক পেশ করতেন। উমর নিজেও কুরআন ও সুন্নাহ হতে তার অভিমত পেশ করতেন। সেসব পরামর্শ হতে উমর তাদের ভিন্নমত ও আলোচনা গ্রহণ করতেন। তিনি কখনোই এমনটা বলতেন না যে, 'আমি একজন মুহাদ্দাস, মুখাতাব, আমার কাছে ইলহাম আসে, আমার সকল কথা মানতে হবে, বিরোধিতা করা যাবে না!'
টিকাঃ
[১৫৭] বুখারি, ২৭৩১。
[১৫৮] বুখারি, ৩৬৬৭。
[১৫৯] বুখারি, ১৩৯৯; মুসলিম, ২০。
📄 কুরআন-সুন্নাহকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা কাদের বৈশিষ্ট্য?
কাজেই কোনো ব্যক্তি যদি নিজেকে আল্লাহর ওলি দাবি করে অথবা তার সাথিরা দাবি করে যে তার কাছে ইলহাম আসে বা তিনি 'মুখাতাব', তাই সব বিষয়ে তাকে অনুসরণ করা ও তার সকল কথা গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক এবং তার সাথে মতপার্থক্য করা যাবে না বা বিরোধিতা করে প্রশ্ন করা যাবে না, এমনকি এ ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহ দলীলের দরকার নেই—তবে এসব ব্যক্তিরা মহাভ্রান্তি ও পথভ্রষ্টতার মধ্যে আছে। নিঃসন্দেহে এসব লোক থেকে উমর বহুগুণে উত্তম ছিলেন। তিনি ছিলেন খলীফা ও আমিরুল মুমিনীন; এরপরেও বিভিন্ন বিষয়ে মুসলিমরা তার সাথে মতপার্থক্য করেছেন এবং তার বা অন্যান্য ব্যক্তিদের কথা ও কাজকে কুরআন ও সুন্নাহর মানদণ্ডের সাথে মিলিয়েছেন। কুরআন-সুন্নাহকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরা আউলিয়াদের জন্য বাধ্যতামূলক এবং তাদের কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নন।
এই উম্মাতের প্রথম যুগের আলিমগণ সর্বসম্মতভাবে একমত হয়েছেন, রাসূলুল্লাহ ব্যতীত যেকোনো ব্যক্তির মতামত গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করা যায়। নবিদের সাথে অন্যান্য নেককার ব্যক্তিদের পার্থক্য ঠিক এখানেই। নবিদের যেসব বিষয়ের খবর দেওয়া হয়েছে তাতে পরিপূর্ণ ঈমান রাখা বাধ্যতামূলক। উপরন্তু তাদের সকল আদেশ মানাও বাধ্যতামূলক। কিন্তু এ বিষয়টি আল্লাহর আউলিয়াদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় (যারা নবি নন)।
আউলিয়াদের সকল আদেশ মানা জরুরি নয় কিংবা তাদের জানানো সকল খবর বিশ্বাস করাও জরুরি নয়; বরং তাদের আদেশ-নিষেধ (শারীআতের হুকুম) ও খবরা-খবর (গায়েবের খবর, আল্লাহ ও তাঁর জাত-সিফাতের বর্ণনা ইত্যাদি) অবশ্যই কুরআন ও সুন্নাহর সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে। একজন ব্যক্তি আল্লাহর যত বড় ওলিই হোক না কেন, তার যা কিছু কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে তা মানা বাধ্যতামূলক, যা বৈসাদৃশ্যপূর্ণ হবে তা পরিপূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যাত হবে।
এমনকি তিনি যদি সত্যের সন্ধানে নিজের সর্বোচ্চ আন্তরিক প্রচেষ্টা ব্যয় করেন, তবুও সেগুলো মিলিয়ে দেখতে হবে। সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছালে তিনি দুইটি পুরস্কার পাবেন আর ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছালেও নিজের আন্তরিক প্রচেষ্টার জন্য একটি পুরস্কার পাবেন, এ ক্ষেত্রে তার ভুলত্রুটি ক্ষমা করা হবে। ঐকান্তিক প্রচেষ্টার পরেও যদি ভুলবশত কুরআন ও সুন্নাহর বিরুদ্ধে চলে যান, তবে এসব ভুলের জন্য কোনো গুনাহ নেই যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি নিজের সাধ্যমতো তাকওয়া অবলম্বন করবেন। আল্লাহ বলেন,
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ 'অতএব তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করো...।' [১৬০]
টিকাঃ
[১৬০] সূরা তাগাবুন, ৬৪: ১৬。
📄 আউলিয়াদের অন্ধ অনুসরণকারী খ্রিষ্টানদের মতো
যারা আউলিয়াদের সবকিছু যাচাই না করেই মেনে নেয়, তারা খ্রিষ্টানদের অনুরূপ। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهَا وَاحِدًا لَّا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ ))
'তারা তাদের পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগীদের তাদের রব হিসেবে গ্রহণ করেছে আল্লাহ ব্যতীত এবং মারইয়ামের পুত্রকেও। অথচ তারা আদিষ্ট ছিল একমাত্র মা'বুদের ইবাদাতের জন্য। তিনি ছাড়া কোনো মা'বুদ নেই, তারা তাঁর শরীক সাব্যস্ত করে, তার থেকে তিনি পবিত্র। [১৮০]
আদি ইবনু হাতিম উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন, এই আয়াত সম্পর্কে জানতে চেয়ে আমি রাসূলুল্লাহ -কে বললাম, তারা তো তাদের (পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগীদের) ইবাদাত করে না! নবি বললেন, 'তারা হারামকে হালাল বানায় এবং হালালকে হারাম বানায়, এরপর লোকেরা তাদের আনুগত্য করে। এটাই হলো তাদের ইবাদাত করা। [১৮১]
এ কারণে এসব লোক সম্পর্কে বলা হয়, দ্বীনের মূলনীতি হতে বিচ্যুত হওয়ার কারণে তারা আত্মপ্রবঞ্চনার শিকার। সবচেয়ে মৌলিক নীতি হলো রাসূলুল্লাহ-এর আনীত বার্তার ওপর ঈমান আনয়ন করা। মুহাম্মাদ -এর রিসালাত সমস্ত সৃষ্টিজগতের জন্য; জিন-ইনসান, আরব-অনারব, আলিম, আবিদ, শাসক-শাসিত নির্বিশেষে সকলের জন্য। এই বিষয়ের ওপর অবশ্যই ঈমান আনতে হবে। প্রকাশ্যে এবং গোপনে রাসূলের আনুগত্য ব্যতীত আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর কোনো রাস্তা নেই। এমনকি যদি মূসা, ঈসা বা অন্য কোনো নবি মুহাম্মাদ -এর সাক্ষাৎ পেতেন তবে তাদের ওপরও তাঁর অনুসরণ ও আনুগত্য করা আবশ্যক হতো। আল্লাহ বলেন,
وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّينَ لَمَا آتَيْتُكُم مِّن كِتَابٍ وَحِكْمَةٍ ثُمَّ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مُّصَدِّقُ لِمَا مَعَكُمْ لَتُؤْمِنُنَّ بِهِ وَلَتَنصُرُنَّهُ قَالَ أَأَقْرَرْتُمْ وَأَخَذْتُمْ عَلَى ذَلِكُمْ إِصْرِى قَالُوا أَقْرَرْنَا قَالَ فَاشْهَدُوا وَأَنَا مَعَكُم مِّنَ الشَّاهِدِينَ فَمَن تَوَلَّى بَعْدَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ
'আর আল্লাহ যখন নবিগণের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন যে, আমি যা কিছু তোমাদের দান করেছি কিতাব ও জ্ঞান এবং অতঃপর তোমাদের নিকট কোনো রাসূল আসেন তোমাদের কিতাবকে সত্য বলে দেওয়ার জন্য, তখন সে রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে এবং তার সাহায্য করবে। তিনি বললেন, 'তোমরা কি অঙ্গীকার করছ এবং এই শর্তে আমার ওয়াদা গ্রহণ করে নিয়েছ? তারা বললেন, 'আমরা অঙ্গীকার করেছি।' তিনি বললেন, তাহলে এবার সাক্ষী থাকো। আর আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষী রইলাম। অতঃপর যে লোক এই ওয়াদা থেকে ফিরে দাঁড়াবে, সে-ই হবে নাফরমান।' [১৮২]
ইবনু আব্বাস বলেন, প্রত্যেক নবির কাছ থেকে আল্লাহ তাআলা এই মর্মে শপথ গ্রহণ করেছেন যে, যদি তার জীবদ্দশায় মুহাম্মাদ চলে আসেন, তবে তারা তার ওপর ঈমান আনবেন, সাহায্য ও সমর্থন করবেন। তিনি তাঁর অনুসারীদের কাছ থেকেও এই শপথ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন; যদি তোমাদের জীবদ্দশায় মুহাম্মাদ প্রেরিত হন, তবে তোমরা তার ওপর ঈমান আনবে ও তাকে সাহায্য করবে।' [১৮৩]
আল্লাহ জাল্লা শানুহু বলেন,
لَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَن يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَن يَكْفُرُوا بِهِ وَيُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُضِلَّهُمْ ضَلَالًا بَعِيدًا وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَا أَنزَلَ اللَّهُ وَإِلَى الرَّسُولِ رَأَيْتَ الْمُنَافِقِينَ يَصُدُّونَ عَنكَ صُدُودًا فَكَيْفَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ ثُمَّ جَاءُوكَ يَحْلِفُونَ بِاللَّهِ إِنْ أَرَدْنَا إِلَّا إِحْسَانًا وَتَوْفِيقًا أُولَئِكَ الَّذِينَ يَعْلَمُ اللَّهُ مَا فِي قُلُوبِهِمْ فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ وَعِظْهُمْ وَقُل لَّهُمْ فِي أَنفُسِهِمْ قَوْلًا بَلِيغًا وَمَا أَرْسَلْنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذْنِ اللَّهِ وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ جَاءُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا اللَّهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللَّهَ تَوَّابًا رَّحِيمًا فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
'আপনি কি তাদের দেখেননি, যারা দাবি করে যে, যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে আমরা সে বিষয়ের ওপর ঈমান এনেছি এবং আপনার পূর্বে যা অবর্তীণ হয়েছে। তারা বিরোধীয় বিষয়কে শয়তানের দিকে নিয়ে যেতে চায়, অথচ তাদের প্রতি নির্দেশ হয়েছে, যাতে তারা ওকে মান্য না করে। পক্ষান্তরে শয়তান তাদের প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়।
আর যখন আপনি তাদের বলবেন, আল্লাহর নির্দেশের দিকে এসো, যা তিনি রাসূলের প্রতি নাযিল করেছেন, তখন আপনি মুনাফিকদের দেখবেন, ওরা আপনার কাছ থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে যাচ্ছে।
এমতাবস্থায় যদি তাদের কৃতকর্মের দরুন বিপদ আরোপিত হয়, তবে তাতে কী হলো! অতঃপর তারা আপনার কাছে আল্লাহর নামে কসম খেয়ে খেয়ে ফিরে আসবে যে, মঙ্গল ও সম্প্রীতি ছাড়া আমাদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।
এরা হলো সে সমস্ত লোক, যাদের মনের গোপন বিষয় সম্পর্কেও আল্লাহ তাআলা অবগত। অতএব, আপনি ওদের উপেক্ষা করুন এবং ওদের সদুপদেশ দিয়ে এমন কোনো কথা বলুন, যা তাদের জন্য কল্যাণকর।
বস্তুত আমি একমাত্র এই উদ্দেশ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি, যাতে আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী তাঁদের আদেশ-নিষেধ মান্য করা হয়। আর সেসব লোক যখন নিজেদের অনিষ্ট সাধন করেছিল, তখন যদি আপনার কাছে আসত অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করত এবং রাসূলও যদি তাদের ক্ষমা করিয়ে দিতেন। অবশ্যই তারা আল্লাহকে ক্ষমাকারী, মেহেরবানরূপে পেত।
অতএব, তোমার পালনকর্তার কসম, সে লোক ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায় বিচারক বলে মনে করে। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোনো রকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং তা হৃষ্টচিত্তে কবুল করে নেবে।' [১৮৪]
টিকাঃ
[১৭৯] সূরা বাকারাহ, ২: ১৬৫-১৬৭。
[১৮০] সূরা তাওবাহ, ৯: ৩১。
[১৮১] তিরমিযি, ৩০৯৫, হাসান。
[১৮২] সূরা আলে ইমরান, ৩: ৮১-৮২。
[১৮৩] ইবনু কাসীর, তাফসীর, ১/৩২৫; তাবারি, তাফসীর, ৬/৫৫৬。
[১৮৪] সূরা নিসা, ৪: ৬০-৬৫。
📄 আউলিয়াদের অনুসরণে বিভ্রান্তির কারণ
যারা কোনো ওলির অনুসরণের কারণে আল্লাহর রাসূলের আনীত বিষয়ের বিরুদ্ধে চলে যায় তারা মূলত দুইটি বিষয়ের ভিত্তিতে নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে;
(১) তারা উক্ত ব্যক্তিকে সত্যিকার অর্থেই আল্লাহর ওলি মনে করে এবং
(২) আল্লাহর আউলিয়াদের সাথে কোনো বিষয়ে মতপার্থক্যকে তারা গ্রহণযোগ্য মনে করে না।
সাহাবি ও তাবিয়িগণ আল্লাহর শ্রেষ্ঠ আউলিয়াদের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু তাদের কাছ থেকেও কুরআন-সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক কোনো কিছু গ্রহণ করা যাবে না, তাহলে যেসব আউলিয়া অপেক্ষাকৃত কম মর্যাদার অধিকারী তাদের ব্যাপারে আমাদের কী করা উচিত?