📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তি তাকওয়া

📄 সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তি তাকওয়া


يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ
'হে মানবজাতি, আমি তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিতি লাভ করো। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক উত্তম, যে সর্বাধিক পরহেযগার। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।'[১১৭]
আবূ হুরায়রা বর্ণনা করেছেন, 'রাসূলুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করা হলো, 'সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি কে?' তিনি বললেন, 'তোমাদের মধ্যে যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহভীরু।' সাহাবিগণ বললেন, আমরা এ কথা জিজ্ঞেস করছি না। তিনি বললেন, 'তাহলে আল্লাহর নবি ইউসুফ, যাঁর পিতা ইয়াকূবও আল্লাহর নবি, আবার তাঁর পিতা ইসহাকও আল্লাহর নবি এবং তাঁর পিতা ইবরাহীম তিনি আল্লাহর খলীল (বন্ধু)। সাহাবিগণ বললেন, 'আমরা আপনাকে এ বিষয়েও জিজ্ঞেস করছি না'। তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, 'তাহলে তোমরা আরবের বিভিন্ন গোত্রের কথা জিজ্ঞেস করছ? (জেনে রেখো,) মানুষ হলো সোনা ও রুপার খনির মতো খনি। জাহিলিয়াতের যুগে যারা ভালো ছিল, তারা ইসলামের যুগেও ভালো, যদি তারা বুদ্ধিমান ও জ্ঞানবান হয়ে থাকে।[১১৮]
সুতরাং (ধনী বা ফকীর হওয়া নয়) কুরআন ও সুন্নাহ থেকে সুস্পষ্টভাবে দেখা গেল, যাদের তাকওয়া সর্বাধিক তারাই আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম মানুষ।

টিকাঃ
[১১৭] সূরা হুজুরাত, ৪৯: ১৩。
[১১৮] বুখারি, ৪৬৮৯; মুসলিম, ২৩৭৮。

📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 যারা দরিদ্র

📄 যারা দরিদ্র


নবি বলেছেন, 'হে লোকসকল, নিশ্চয় তোমাদের রব একজন এবং তোমাদের পিতাও একজন। মনে রেখো! অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, এবং আরবের ওপর অনারবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; কৃষ্ণাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই শ্বেতাঙ্গের ওপরে আবার শ্বেতাঙ্গেরও কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই কৃষ্ণাঙ্গের ওপরে—শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হবে শুধু তাকওয়ার ভিত্তিতে।'[১১৯]
'আল্লাহ তাআলা তোমাদের থেকে জাহিলিয়াতের অহমিকা এবং পূর্বপুরুষ নিয়ে বড়াই করা দূর করেছেন। এখন লোকেরা দুই প্রকারে বিভক্ত হয়েছে, তাকওয়াবান মুমিন ও দুর্ভাগা পাপী। তোমরা সকলেই আদমের সন্তান-সন্ততি আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে ধুলোমাটি থেকে...'[১২০]
সুতরাং বিভিন্ন রকম মানুষদের মধ্যে যে যত বেশি পরহেযগার ও আল্লাহ-অভিমুখী, সে আল্লাহর কাছে তত উত্তম। যদি তাদের তাকওয়ার স্তর সমান হয়, তাহলে তারা সমপর্যায়ের ও সমমর্যাদার।
'ফাক্র' (فَقْرٌ) শব্দটি একটি শারঈ পরিভাষা, যার মাধ্যমে সম্পদের অভাব বা দারিদ্র্য বোঝানো হয়। আবার আল্লাহর সামনে সকলেই অভাবগ্রস্ত, মুখাপেক্ষী—এ অর্থও উদ্দেশ্য নেওয়া হয়। যেমন প্রথম অর্থে আল্লাহ বলেন,
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ
'যাকাত হলো কেবল ফকীর, মিসকীনদের জন্য এবং...'[১২১]
আর দ্বিতীয় অর্থে বলেন,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ أَنتُمُ الْفُقَرَاءُ إِلَى اللَّهِ
'হে মানুষ, আল্লাহর কাছে তোমরা সবাই ফকীর...'[১২২]
কুরআনে আল্লাহ তাআলা দুই ধরনের দরিদ্র লোকের প্রশংসা করেছেন:
(১) যারা যাকাতের প্রাপক এবং
(২) যাদের বায়তুল মাল থেকে ফাই (গনীমাত) দেওয়া যায়।
প্রথম দল সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
لِلْفُقَرَاءِ الَّذِينَ أُحْصِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ لَا يَسْتَطِيعُونَ ضَرْبًا فِي الْأَرْضِ يَحْسَبُهُمُ الْجَاهِلُ أَغْنِيَاءَ مِنَ التَّعَفُّفِ تَعْرِفُهُم بِسِيمَاهُمْ لَا يَسْأَلُونَ النَّاسَ إِلْحَافًا وَمَا تُنفِقُوا مِنْ خَيْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ بِهِ عَلِيمٌ *
‘খয়রাত ওই সকল গরীব লোকের জন্যে যারা আল্লাহর পথে আবদ্ধ হয়ে গেছে, জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র ঘোরাফেরা করতে সক্ষম নয়। অজ্ঞ লোকেরা হাত না পাতার কারণে তাদের অভাবমুক্ত মনে করে। তোমরা তাদের লক্ষণ দ্বারা চিনবে। তারা মানুষের কাছে কাকুতি-মিনতি করে ভিক্ষা চায় না। তোমরা যে অর্থ ব্যয় করবে, তা আল্লাহ তাআলা অবশ্যই পরিজ্ঞাত।’[১২৩]
এবং দ্বিতীয় দল সম্পর্কে বলেন,
لِلْفُقَرَاءِ الْمُهَاجِرِينَ الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِن دِيَارِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا وَيَنصُرُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولَئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ *
‘এই ধন-সম্পদ দেশত্যাগী নিঃস্বদের জন্যে, যারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টিলাভের অন্বেষণে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাহায্যার্থে নিজেদের বাস্তুভিটা ও ধন-সম্পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে। তারাই সত্যবাদী।’[১২৪]
এরা সেই দলভুক্ত, যারা শয়তান থেকে পলায়ন করেছে এবং আল্লাহর দুশমনদের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিকভাবে লড়াই করে।

টিকাঃ
[১১৯] আবূ নুআইম, হিলইয়া, ৩/১০০; বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, ৫১৩৭, সহীহ。
[১২০] আবূ দাউদ, ৫১১৬, সহীহ; তিরমিযি, ৩৯৫。
[১২১] সূরা তাওবা, ৯: ৬০。
[১২২] সূরা ফাতির, ৩৫: ১৫。
[১২৩] সূরা বাকারাহ, ২: ২৭৩。
[১২৪] সূরা হাশর, ৫৯: ৮。

📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 ইসলামের শ্রেষ্ঠ আমল

📄 ইসলামের শ্রেষ্ঠ আমল


নবি বলেন, 'মুমিন সেই ব্যক্তি, যার থেকে মানুষ আপন জান-মাল নিরাপদ বোধ করে এবং মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার হাত ও জবান থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে। মুহাজির সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর অবাধ্যতা ও পাপাচার হতে পলায়ন করে। আর মুজাহিদ[১২৫] সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর আনুগত্যের ক্ষেত্রে নিজের নফসের (কামনা-বাসনার) বিরুদ্ধে লড়াই করে।'[১২৬]
এ সম্পর্কিত আরেকটি বর্ণনা রয়েছে যেখানে বলা হয়, তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'আমরা ছোট জিহাদ থেকে বড় জিহাদের দিকে ফিরলাম'। এটি একটি জাল হাদীস।
এর কোনো উৎস নেই এবং রাসূলুল্লাহর কথা ও কাজ সম্পর্কে অবগত জ্ঞানী ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ এটি বর্ণনা করেননি।[১২৭]
কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল; বরং এটিই ইসলামে একজন ব্যক্তির সর্বোচ্চ খিদমাহ। আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَّا يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ وَالْمُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ فَضَّلَ اللَّهُ الْمُجَاهِدِينَ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ عَلَى الْقَاعِدِينَ دَرَجَةً وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَى وَفَضَّلَ اللَّهُ الْمُجَاهِدِينَ عَلَى الْقَاعِدِينَ أَجْرًا عَظِيمًا * دَرَجَاتٍ مِّنْهُ وَمَغْفِرَةً وَرَحْمَةً وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا
'গৃহে উপবিষ্ট মুমিন-যাদের কোনো সংগত ওযর নেই এবং ওইসব মুমিন, যারা জান ও মাল দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে-সমান নয়। যারা জান ও মাল দ্বারা জিহাদ করে, আল্লাহ তাদের পদমর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছেন গৃহে উপবিষ্টদের তুলনায় এবং প্রত্যেকের সাথেই আল্লাহ কল্যাণের ওয়াদা করেছেন। আল্লাহ মুজাহিদীনকে উপবিষ্টদের ওপর মহান প্রতিদানে শ্রেষ্ঠ করেছেন। এগুলো তাঁর পক্ষ থেকে পদমর্যাদা, ক্ষমা ও করুণা; আল্লাহ ক্ষমাশীল ও করুণাময়। [১২৮]
أَجَعَلْتُمْ سِقَايَةَ الْحَاجِ وَعِمَارَةَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ كَمَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَجَاهَدَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ لَا يَسْتَوُونَ عِندَ اللَّهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ * الَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ أَعْظَمُ دَرَجَةً عِندَ اللَّهِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَابِرُونَ * يُبَشِّرُهُمْ رَبُّهُم بِرَحْمَةٍ مِّنْهُ وَرِضْوَانٍ وَجَنَّاتٍ لَّهُمْ فِيهَا نَعِيمٌ مُّقِيمٌ * خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا إِنَّ اللَّهَ عِندَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ *
'তোমরা কি হাজীদের পানি সরবরাহ ও মাসজিদুল-হারাম আবাদকরণকে সেই লোকের সমান মনে করো, যে ঈমান রাখে আল্লাহ ও শেষ-দিনের প্রতি এবং যুদ্ধ করেছে আল্লাহর রাহে? এরা আল্লাহর দৃষ্টিতে সমান নয়, আর আল্লাহ যালিম লোকদের হিদায়াত করেন না।
যারা ঈমান এনেছে, দেশ ত্যাগ করেছে এবং আল্লাহর রাহে নিজেদের জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করেছে, তাদের বড় মর্যাদা রয়েছে আল্লাহর কাছে আর তারাই সফলকাম।
তাদের সুসংবাদ দিচ্ছেন তাদের পরওয়ারদেগার স্বীয় দয়া ও সন্তোষের এবং জান্নাতের, সেখানে আছে তাদের জন্য স্থায়ী শান্তি।
সেখানে তারা থাকবে চিরদিন। নিঃসন্দেহে আল্লাহর কাছে আছে মহাপুরস্কার। [১২৯]
নুমান ইবনু বাশীর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি রাসূলুল্লাহ -এর মিম্বারের নিকটেই ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি বলে উঠল ইসলাম গ্রহণের পর আমি যদি আর কোনো সৎকাজই না করি, তাতে আমার কোনো পরওয়া নেই; তবে আমি হাজীদের পানি পান করাব। অপর একজন বলে উঠলে, মুসলমান হওয়ার পর আমি আর কোনো সৎকাজই না করি তাতে আমার কোনো পরোয়া নেই, তবে আমি মাসজিদুল হারামের মেরামত প্রভৃতি করে যাব। আলি ইবনু আবী তালিব বললেন, তোমরা যা যা বলেছ তার চাইতে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা উত্তম। তখন উমর তাদের ধমক দিয়ে বলে উঠলেন রাসূলুল্লাহর মিম্বরের সামনে তোমরা আওয়াজ উঁচু কোরো না; বরং যখন সালাত আদায়ের শেষে আমি তাঁর নিকটে গিয়ে তোমরা যে ব্যাপারে বাদানুবাদ করছ, তা জিজ্ঞেস করে নেব, তখন আল্লাহ তাআলা (সেই পরিপ্রেক্ষিতে) নাযিল করলেন,
أَجَعَلْتُمْ سِقَايَةَ الْحَاجِ وَعِمَارَةَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ كَمَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَجَاهَدَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ لَا يَسْتَوُونَ عِندَ اللَّهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ
যারা হাজীদের পানি সরবরাহ করে এবং মাসজিদুল হারামের রক্ষণাবেক্ষণ করে তোমরা কি তাদের ওদের সমজ্ঞান করো, যারা আল্লাহ ও পরকালে ঈমান আনে...। [১৩০]-[১৩১]
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করলাম, কোন আমল আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়? তিনি বললেন, 'যথাসময়ে সালাত আদায় করা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এরপর কোনটি? তিনি বললেন, 'এরপর পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার।' আমি বললাম, এরপর কোনটি? রাসূলুল্লাহ বললেন, 'এরপর জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ (আল্লাহর পথে জিহাদ)। ইবনু মাসউদ বলেন, এগুলো তো রাসূলুল্লাহ আমাকে বলেছেনই, যদি আমি আরও বেশি জানতে চাইতাম, তাহলে তিনি আরও বলতেন।[১৩২]
বুখারি ও মুসলিমে উল্লেখিত আরেকটি বর্ণনায় নবি-এর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, সর্বোত্তম আমল কোনটি? তিনি জবাব দিলেন, 'আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা।' আবার জিজ্ঞেস করা হলো, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, 'আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।' প্রশ্ন করা হলো, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, 'পাপমুক্ত হাজ্জ।'[১৩৩]
এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ-এর কাছে এসে আরয করল, 'আমাকে এমন আমলের সন্ধান দিন, যা জিহাদের সমতুল্য।' তিনি বললেন, এমন আমল তো আমি দেখছি না। পরে বললেন, আচ্ছা, 'তুমি কি এই সামর্থ্য রাখো যখন মুজাহিদ জিহাদে বের হয়, তখন থেকে তুমি মাসজিদে প্রবেশ করে বিরতিহীন সালাত আদায় করতে থাকবে এবং লাগাতার সাওম পালন করবে, যাতে কোনো বিরতি দেবে না...!' [১৩৪]
ইয়ামান যাবার প্রাক্কালে মুআয ইবনু জাবাল নবি -এর কাছে উপদেশ চাইলে তিনি বলেন, 'হে মুআয, তুমি যেখানেই থাকো না কেন আল্লাহকে ভয় করবে এবং ভালো আমলের মাধ্যমে মন্দকে মুছে দেবে, মানুষের সাথে উত্তম চরিত্র ও ব্যবহার বজায় রাখবে।' [১৩৫]
অন্য হাদীসে তিনি বলেন, 'হে মুআয, নিশ্চয়ই আমি তোমাকে ভালোবাসি। প্রত্যেক সালাতের পর এ কথাটি বলতে ভুলবে না, 'হে আল্লাহ, আমাকে আপনার যিকর, কৃতজ্ঞতা আদায় ও সর্বোত্তম উপায়ে ইবাদাত পালন করতে সাহায্য করুন।' [১৩৬]
আরেকবার নবি মুআযকে বললেন, 'হে মুআয, তুমি কি জানো বান্দার ওপর আল্লাহর হক কী?' আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, 'বান্দার ওপর তাঁর হক হলো, তারা তাঁর ইবাদাত করবে এবং কাউকে শরীক করবে না। আর তুমি কি জানো এই আমল করলে আল্লাহর ওপর বান্দার কী হক রয়েছে?' আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, 'আল্লাহর ওপর বান্দার হক হলো, তাদের শাস্তি না দেওয়া।' [১৩৭]
নবি মুআয-কে বলেন, 'সকল বিষয়ের মূল হলো ইসলাম, এর প্রধান খুঁটি সালাত এবং চূড়া আল্লাহর পথে জিহাদ করা। এরপর বলেন, 'হে মুআয, সব কল্যাণকর বিষয়ের দরজা সম্পর্কে কি আমি তোমাকে দিক-নির্দেশনা দেব না? সিয়াম হলো ঢালস্বরূপ, পানি যেমন আগুন নিভিয়ে দেয় তেমনি সদাকাও গুনাহসমূহকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়, আর মধ্যরাতের সালাত (তাহাজ্জুদ)। এরপর তিনি তিলাওয়াত করলেন,
تَتَجَافَى جُنُوبُهُمْ عَنِ الْمَضَاجِعِ يَدْعُونَ رَبَّهُمْ خَوْفًا وَطَمَعًا وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ فَلَا تَعْلَمُ نَفْسٌ مَّا أُخْفِيَ لَهُم مِّن قُرَّةِ أَعْيُنٍ جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ ) 'তারা (মু'মিনরা গভীর রাতে) শয্যা ত্যাগ করে তাদের রবকে ডাকে আশায় ও ভীতি-সহকারে এবং আমি তাদের যে রিযক দান করেছি তা থেকে তারা ব্যয় করে। কেউই জানে না তার জন্য চোখ জুড়ানো কী লুকিয়ে রাখা হয়েছে তার কৃতকর্মের পুরস্কারস্বরূপ।'[১৩৮]
তারপর বললেন, 'তোমাকে এই সবকিছুর মাথা, বুনিয়াদ এবং সর্বোচ্চ চূড়াস্বরূপ আমল সম্পর্কে অবহিত করব কি?
এরপর বললেন, অবশ্যই, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
তিনি বললেন, সবকিছুর মাথা হলো ইসলাম, বুনিয়াদ হলো সালাত আর চূড়া হলো জিহাদ।
এরপর বললেন, এ সবকিছুর মূল পুঁজি সম্পর্কে তোমাকে অবহিত করব কি?
আমি বললাম, অবশ্যই, ইয়া রাসূলাল্লাহ!
তিনি তাঁর জিহ্বা ধরে বললেন, এটিকে সংযত রাখো।
আমি বললাম, 'হে আল্লাহর নবি, আমরা যে কথাবর্তা বলি সেই কারণেও কি আমাদের পাকড়াও করা হবে?
তিনি বললেন, 'তোমার মা তোমার ওপর ক্রন্দন করুক, হে মুআয! লোকেদের অধোমুখে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়ার জন্য এই জবানের কামাই ছাড়া আর কি কিছু আছে?[১৩৯]
মুসলিম ও বুখারিতে উল্লেখিত একটি হাদীসে এই বর্ণনাটির মর্মার্থ পাওয়া যায়, নবি বলেছেন, 'যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি এবং বিচার-দিবসের প্রতি বিশ্বাস করে সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।'[১৪০]

টিকাঃ
[১২৫] জিহাদের ব্যাপক অর্থের মধ্যে নফসের বিরুদ্ধে মুজাহাদাও অন্তর্ভুক্ত, তবে শুধু নফসের জিহাদ করলেই মুজাহিদ হওয়া যায় না কিংবা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধের বাধ্যবাধকতা আদায় হয় না কিংবা মুজাহিদের সমান সওয়াব ও মর্যাদা অর্জন করা যায় না。
[১২৬] ইবনু হিব্বان, ৪৮৬২; আহমাদ, ২৩৯৫৮, সহীহ。
[১২৭] আজলূনি বলেন, হাফিয ইবনু হাজার আসকালানি বলেন, 'এটি মানুষের মুখে মুখে খুব প্রসিদ্ধ। তবে এটি হলো, ইবরাহীম ইবনু উলাইয়্যা-এর কথা। আর 'ইহয়াউল উলূমে' এটিকে হাদীস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।' ইরাকি বলেন, বাইহাকি জাবির থেকে দুর্বল সনদে এটি বর্ণনা করেছেন। খতীবে বাগদাদিও তার 'তারীখ' গ্রন্থে জাবির থেকে বর্ণনা করেছেন। কাশফুল খফা, ১/৫১১。
[১২৮] সূরা নিসা, ৪: ৯৫-৯৬。
[১২৯] সূরা তাওবা, ৯: ১৯-২২。
[১৩০] সূরা তাওবা, ৯: ১৯-২২。
[১৩১] মুসলিম, ১৮৭৯。
[১৩২] বুখারি, ৫২৭; মুসলিম, ৮৫。
[১৩৩] বুখারি, ২৬; মুসলিম, ৮৩。
[১৩৪] বুখারি, ২৭৮৫。
[১৩৫] তিরমিযি, ১৯৮৭; আহমাদ, ২২০৫৯, হাসান。
[১৩৬] আহমাদ, ২২১১৯; আবূ দাউদ, ১৫২২; নাসাঈ, ৯৯৩৭, সহীহ。
[১৩৭] বুখারি, ৫৯৬৭; মুসলিম, ৩০。
[১৩৮] সূরা সাজদা, ৩২: ১৬-১৭。
[১৩৯] তিরমিযি, ২৬১৬, হাসান সহীহ。
[১৪০] বুখারি, ৬১৩৫; মুসলিম, ৪৭。

📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 সর্বোত্তম হিদায়াত রাসূলের হিদায়াত

📄 সর্বোত্তম হিদায়াত রাসূলের হিদায়াত


অর্থাৎ চুপ থাকার থেকে ভালো কথা বলা উত্তম এবং মন্দ কথা বলার চেয়ে চুপ থাকা উত্তম। দীর্ঘ সময় ধরে চুপ থাকা একটি বিদআত। যেমন উত্তম খাদ্য ও পানীয় থেকে নিজেকে একেবারে প্রত্যাহার করে নেওয়া যেভাবে নিষিদ্ধ তেমনিভাবে এটিও নিষিদ্ধ। এগুলো সবই নিন্দনীয় বিদআত। এ মর্মে ইবনু আব্বাস হতে বর্ণিত আছে,
রাসূলুল্লাহ মক্কার রোদের মধ্যে দাঁড়ানো এক ব্যক্তিকে অতিক্রম করে যাচ্ছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, একি! লোকজন বলল যে, আবূ ইসরাঈল সে সিয়াম রাখার, সারাটা দিন রৌদ্রে দাঁড়িয়ে থাকার, ছায়া গ্রহণ না করার এবং কথাবার্তা না বলার মান্নত করেছে। তাই সে এ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। তিনি বললেন, তাকে বলে দাও, 'সে যেন কথা বলে, ছায়া গ্রহণ করে, বসে এবং তার সিয়াম পূর্ণ করে।' [১৪১]
(নোট-রাসূলের কথা থেকে প্রমাণ হয় যে, লোকটির শপথের চারটি অংশের মধ্যে কেবল সিয়াম রাখা আল্লাহর আনুগত্যের অংশ। কেননা, আল্লাহ সিয়ামের নির্দেশনা দিয়েছেন কিন্তু বাকি তিনটি ছিল নিন্দনীয় নব-উদ্ভাবিত বিষয় বা বিদআত। এ জন্য নবি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লোকেদের বললেন, ওই লোকটিকে বিরত করতে যদিও সে কসম (নাযার) করেছিল)।
আনাস ইবনু মালিক বর্ণনা করেছেন, 'তিন জনের একটি দল রাসূলুল্লাহ -এর ইবাদাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য রাসূলুল্লাহ -এর বিবিগণের গৃহে আগমন করল। যখন তাঁদের এ সম্পর্কে অবহিত করা হলো, তখন তারা এ ইবাদাতের পরিমাণ যেন কম মনে করল এবং বলল, আমরা রাসূলুল্লাহ এর সমকক্ষ হতে পারি না। কারণ, তার আগে ও পরের সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়েছে। এমন সময় তাদের মধ্য থেকে একজন বলল, আমি সারাজীবন রাতে সালাত আদায় করতে থাকব।
অপর একজন বলল, আমি সারাবছর সিয়াম পালন করতে থাকব এবং কখনো বিরতি দেব না। অপরজন বলল, আমি নারী-বিবর্জিত থাকব, কখনো শাদী করব না। এরপর রাসূলুল্লাহ তাদের নিকট এলেন এবং বললেন, "তোমরা ওই সকল ব্যক্তি, যারা এরূপ কথাবার্তা বলেছ? আল্লাহর কসম! আমি আল্লাহকে তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি এবং তোমাদের চেয়ে তাঁর প্রতি আমি বেশি আনুগত্যশীল; অথচ আমি সিয়াম পালন করি, আবার সিয়াম থেকে বিরতও থাকি। সালাত আদায় করি আবার ঘুমাইও এবং বিয়ে-শাদীও করি। সুতরাং যারা আমার সুন্নাতের প্রতি বিরাগ ভাব পোষণ করবে, তারা আমার দলভুক্ত নয়।' [১৪২]
অর্থাৎ যদি কেউ নবি -এর পথ ব্যতীত অন্য কোনো পথ অনুসরণ করাকে শ্রেষ্ঠ মনে করে, তবে তার সাথে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কোনো সম্পর্ক নেই। আল্লাহ বলেন,
وَمَن يَرْغَبُ عَن مِلَّةِ إِبْرَاهِيمَ إِلَّا مَن سَفِهَ نَفْسَهُ وَلَقَدِ اصْطَفَيْنَاهُ فِي الدُّنْيَا وَإِنَّهُ فِي الْآخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِينَ
'ইবরাহীমের মিল্লাত থেকে কে মুখ ফেরায়? কিন্তু সে ব্যক্তি, যে নিজেকে বোকা প্রতিপন্ন করে। নিশ্চয়ই আমি তাকে পৃথিবীতে মনোনীত করেছি এবং সে পরকালে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত। [১৪৩]
বরং প্রত্যেক মুসলিমের ওপর এই বিশ্বাস বাধ্যতামূলক, 'সর্বোত্তম কিতাব আল্লাহর কিতাব আর সর্বোত্তম হিদায়াত মুহাম্মাদ -এর হিদায়াত' - বিশুদ্ধ হাদীসে এসেছে রাসূলুল্লাহ প্রত্যেক জুমার খুতবায় উল্লেখিত কথাটি বলতেন। [১৪৪]

টিকাঃ
[১৪১] ইবনু হিব্বান, ৪৩৮৫, সহীহ。
[১৪২] বুখারি, ৫০৬৩。
[১৪৩] সূরা বাকারাহ, ২: ১৩০。
[১৪৪] মুসলিম, ৮৬৭。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00