📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 যাদের থেকে কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে

📄 যাদের থেকে কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে


রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'তিন প্রকার লোক হতে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে (অর্থাৎ, শাস্তি থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে): ঘুমিয়ে থাকা লোক জাগ্রত না হওয়া পর্যন্ত; শিশু বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত এবং নিষ্ক্রিয় বুদ্ধিসম্পন্ন লোকের জ্ঞান না আসা পর্যন্ত।' [১১৫]
বুখারি-মুসলিম বাদে হাদীসের অন্যান্য প্রধান গ্রন্থসমূহে (আস-সুনান) আলি ও আয়িশা হতে এই বর্ণনাটি এসেছে এবং হাদীস-বিশারদগণ এই হাদীসের গ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারে একমত। তবে যে বয়সে শিশু ভালো-মন্দের পার্থক্য করতে পারে (সাধারণত সাত বছরের শিশু ভালো-মন্দের পার্থক্য করতে পারে। একে 'তাময়ীয' বয়স বলে।) তারা বৈধ ইবাদাত-বন্দেগি করলে আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কৃত করা হবে, এটিই অধিকাংশ আলিমের মত। আর মানসিক ভারসাম্যহীন উন্মাদের ক্ষেত্রে আলিমদের ঐকমত্য হলো, তার কোনো ইবাদাত বৈধ নয়।
কেননা, তার কাছ থেকে কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে, তার কাছ থেকে ঈমান, কুফর, সালাত বা অন্যান্য কিছুর হিসাব নেওয়া হবে না। উপরন্তু, তার দৈনন্দিন কথা ও কর্মগুলোও বাতিল গণ্য হবে। যেমন—তার ব্যবসা-বাণিজ্য, তার শিল্পকর্ম, কাপড়ের ব্যবসা, সুগন্ধি বিক্রি, কামার বা কাঠের কাজ-কর্মও অগ্রহণযোগ্য। সে কোনো চুক্তি করলে সেগুলো অবৈধ, যেমন ক্রয়-বিক্রয়, বিবাহ-শাদী, তালাক, সাক্ষী, স্বীকারোক্তি বা অন্যান্য মৌখিক সাক্ষ্য ইত্যাদির কোনো আইনগত বৈধতা নেই, এগুলো সম্পূর্ণ অর্থহীন। তার কোনো শাস্তি বা পুরস্কার নেই, এ ব্যাপারে আলিমগণ একমত। তবে মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির অবস্থার সাথে ভালো-মন্দ পার্থক্যকারী নাবালক শিশুর কিছু ব্যবধান আছে। সেই নাবালক শিশুর মৌখিক আমল (ইবাদাত বন্দেগি ও দৈনন্দিন কথা-বার্তা) বেশ কিছু জায়গায় গ্রহণযোগ্য। এর পক্ষে শারীআতের দলীল (কুরআন ও হাদীস) পাওয়া যায়। আবার বেশ কিছু ব্যাপারে মতানৈক্যও রয়েছে।

টিকাঃ
[১১৫] আবূ দাউদ, ৪৩৯৯; নাসাঈ, ৩৪৩২; ইবনু মাজাহ, ২০৪১; আহমাদ, ২৫১৫৭, সহীহ。

📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির ওলায়াত

📄 মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির ওলায়াত


আমাদের জেনে রাখা উচিত, যেহেতু মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির ঈমান, আমল, ও ফরয-নফলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের প্রচেষ্টার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই, সুতরাং এ ধরনের ব্যক্তিদের পক্ষে আল্লাহর আউলিয়া হওয়া অসম্ভব। এ জন্য পাগল, উন্মাদ বা মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিকে আল্লাহর আউলিয়া মনে করা যাবে না। বিশেষত যদি কেউ বলে, অমুক পাগলের মাধ্যমে কিছু গোপন খবর জানা গেছে, যা সে সরাসরি ওই ব্যক্তির কাছ থেকে শুনেছে অথবা আশ্চর্য কোনো আচরণ দেখেছে, যেমন-পাগল ব্যক্তিটি কারও দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করল আর সে মারা গেল বা অজ্ঞান হয়ে গেল!
এ ব্যাপারে স্মরণ করা যেতে পারে, ইয়াহুদী-খ্রিষ্টান ও মুশরিকরাও প্রায়ই বিভিন্ন গোপন খবর জানিয়ে দেয় ও নানারকম চমকপ্রদ ঘটনা দেখায়, এগুলো শয়তানের প্রভাবে ঘটে। গণক, জ্যোতিষী, জাদুকর এবং বিধর্মী সাধুপুরুষদের অবস্থাও একই রকম। এদের কারও কাছ থেকে কোনো অলৌকিক ঘটনা দেখতে পেলে, সেই ঘটনার ভিত্তিতে তাদের আল্লাহর আউলিয়া বলা যাবে না, যদিও সেসব ঘটনায় ঈমানের সাথে সাংঘর্ষিক কিছু নাও থাকে। আর যদি ঈমানের সাথে সাংঘর্ষিক কিছু থেকে থাকে তাহলে তো আল্লাহর আউলিয়া না, আল্লাহর দুশমন।
উদাহরণস্বরূপ, যদি জানা যায় অমুক ব্যক্তি গোপনে বা প্রকাশ্যে আল্লাহর রাসূলের অনুসরণকে বাধ্যতামূলক মনে করে না, কিংবা ইলমকে যাহিরি-বাতিনি (প্রকাশ্য ও গুপ্ত) ইত্যাদি ভাগে বিভক্ত করে এবং রাসূলের আনীত হিদায়াতের কিছু অংশ অনুসরণ করে আর কিছু বর্জন করে, কিংবা নবিদের পথ ও পদ্ধতি ব্যতীত আল্লাহর কাছে নৈকট্য অর্জনের জন্য আউলিয়াদের কোনো বিশেষ পথ ও পদ্ধতি (তরীকা) আছে বলে বিশ্বাস করে, অথবা যদি বলে, 'নবিরা পথ সংকীর্ণ করে দিয়েছে!' অথবা বলে, এগুলো তো সাধারণ মানুষের জন্য, বিশেষ মানুষের জন্য নয়! অথবা অনুরূপ ভ্রান্ত কিছু বলে, যেমন তথাকথিত ও স্বঘোষিত 'ওলি'রা বলে থাকে। তাহলে উক্ত ব্যক্তি ঈমান বিনষ্টকারী কুফরের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে, আল্লাহর নৈকট্য অর্জন তো অনেক পরের কথা। আর যারা কিছু চমকপ্রদ ঘটনার কারণে এদের পক্ষে যুক্তিতর্ক পেশ করে উকালতি করে, তারা ইয়াহূদী-খ্রিষ্টানদের থেকেও মারাত্মক পথভ্রষ্ট।
একই কথা পাগলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আল্লাহর আউলিয়াদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য বিশুদ্ধ ঈমান ও আমলের উপস্থিতি থাকা জরুরি, যা তার ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। আবার যারা দুরারোগ্য পাগলামিতে আক্রান্ত, কখনো সুস্থ থাকে আবার কখনো অসুস্থ থাকে, তাদের ক্ষেত্রে শুধু সুস্থতার অবস্থা বিবেচ্য। সুস্থতার সময়ে যদি সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান রাখে এবং ওয়াজিব আমলসমূহ পালন করে, হারাম থেকে বেঁচে থাকে, তবে তার ঈমান ও তাকওয়ার কারণে সে পুরস্কৃত হবে এবং অন্যান্য সময়ের মানসিক অসুস্থতা সেই পুরস্কার অর্জনে কোনো প্রতিবন্ধক হবে না।
মানসিক সুস্থতার সময়ে করা আমলের সমানুপাতে সে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করবে। আবার ঈমান আনা ও কিছুদিন ইসলাম পালন করার পর যদি কেউ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে, তবে আল্লাহ তাআলা তাকে অসুস্থতার পূর্বের ঈমান ও তাকওয়ার বদৌলতে পুরস্কৃত করবেন। এ ক্ষেত্রে পরবর্তী অসুস্থতার কারণে পূর্ববর্তী নেক আমল বাতিল হবে না। কেননা, এই অসুস্থতার জন্য তো তার কোনো গুনাহ দায়ী নয়। মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির অসুস্থতার সময়ে (আমলনামা লিপিবদ্ধকারী) কলম উঠিয়ে নেয়া হয়।
সুতরাং যদি কেউ বাহ্যিকভাবে আল্লাহর আউলিয়ার বেশ ধারণ করে কিন্তু বাধ্যতামূলক আমলগুলো পালন করে না এবং হারাম থেকে বেঁচেও থাকে না; বরং দেখা যায় আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের বিপরীতধর্মী আমল করে, তখন সেসব ব্যক্তিকে আল্লাহর ওলি বলা যাবে না। এই ব্যক্তি যদি সার্বক্ষণিক মানসিক ভারসাম্যহীন না হয় কিংবা দুরারোগ্য মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত না হয় এবং সুস্থতার সময়ে ফরয-ওয়াজিব আমল উপেক্ষা করে ও হারাম কাজ করে এবং নবি ﷺ-এর অনুসরণ বাধ্যতামূলক মনে করে না, তবে সে একজন কাফির। যে তাকে আল্লাহর ওলি বলে বিশ্বাস করে সেও কাফির। আর যদি সে সত্যিই মানসিক ভারসাম্যহীন হয়, তবে তো তার ওপর থেকে কলম উঠিয়েই নেয়া হয়েছে!
এ ক্ষেত্রে সে কুফফারের মতো শাস্তির যোগ্য হয় না, আবার মুমিন-মুত্তাকীদের মতো পুরস্কারেরও যোগ্য হয় না। অর্থাৎ, আল্লাহ তার আউলিয়াদের যেসব কারামাত দান করেন, সে সেগুলোর যোগ্য হয় না। সুতরাং সম্ভাব্য ঘটনার মধ্যে যা-ই ঘটুক না কেন, উক্ত ব্যক্তিকে আল্লাহর ওলি মনে করার অনুমতি নেই। যদি মানসিক সুস্থতার সময়ে সে তাকওয়া অবলম্বন করে, তবে আমলের অনুপাতে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করবে। আর যদি মানসিক সুস্থতার সময়ে কুফর ও নিফাক অবলম্বন করে, তবে সে একজন কাফির। বা মুনাফিক। এরপর যদি পাগল হয়ে যায়, তবে পূর্বের সুস্থতার সময়ে কৃত কুফরি ও নিফাকের সমানুপাতে শাস্তিপ্রাপ্ত হবে। মানসিক ভারসাম্য হারানোর কারণে পূর্বের সুস্থতার সময়ের কোনো আমল বাতিল হবে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00