📄 জান্নাতের বিভিন্ন মানযিল ও যমিনের মর্যাদা
কিছু মানুষ এমন রয়েছে, যারা নবি-রাসূলদের ওপর ব্যাপকতার সাথে সংক্ষিপ্ত (মুজমাল) ঈমান রাখে। আর বিস্তারিত (মুফাসসাল) ঈমানের ক্ষেত্রে, তাদের নিকট রাসূলের যে সমস্ত বার্তা বিস্তারিতভাবে পৌঁছে তারা তাতে বিস্তারিতভাবেই ঈমান রাখে এবং যা তাদের নিকট পৌঁছে না, তারা তা জানতে পারে না; ফলে ঈমানও আনে না। কিন্তু যদি জানতে পারত তাহলে ঈমান আনত। এ ক্ষেত্রে তারা সংক্ষিপ্ত ঈমান রাখে। এই শ্রেণির ব্যক্তিরা যা জানে—আল্লাহর আদেশ-নিষেধ—তা-ই যদি ঈমান ও তাকওয়ার সাথে আদায় করতে থাকে তাহলে তারাও আল্লাহর আউলিয়াদের মধ্যে শামিল হবে। ঈমান ও তাকওয়া অনুসারে আল্লাহর সাথে তাদের ‘ওলায়াত’ নির্ধারিত হবে। আর তারা যেসব বিষয়ের বার্তা পায়নি, সেগুলোর ওপর বিস্তারিত জ্ঞানার্জন ও ঈমান না আনার জন্য শাস্তিযোগ্য অপরাধী বলে সাব্যস্ত হবে না। কারণ, আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে কিছু করার হুকুম প্রদান করেন না। তাই সেগুলো পালনে ব্যর্থ হলেও তাকে শাস্তি দেওয়া হবে না। তবে যেসব বিষয় তার থেকে ছুটে গেছে তার সমানুপাতে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে ঘাটতি থেকে যাবে। অপরদিকে যে ব্যক্তি নবিদের রিসালাতে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জন করল এবং সবিস্তারে ঈমান আনল, তদনুসারে আমল করল, সে ঈমান ও ওলায়াতে পূর্বোক্ত ব্যক্তির থেকে অধিকতর পূর্ণাঙ্গতা অর্জন করল। তবে উভয়েই আল্লাহর আউলিয়া।
জান্নাতের অনেক স্তর রয়েছে। স্তরগুলোর মধ্যেও রয়েছে বিস্তর ব্যবধান। মুমিন, মুত্তাকী ও আল্লাহর আউলিয়ারা তাদের ঈমান ও আমলের অনুপাতে বিভিন্ন স্তর লাভ করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
مَّن كَانَ يُرِيدُ الْعَاجِلَةَ عَجَّلْنَا لَهُ فِيهَا مَا نَشَاءُ لِمَن تُرِيدُ ثُمَّ جَعَلْنَا لَهُ جَهَنَّمَ يَصْلَاهَا مَذْمُومًا مَّدْحُورًا وَمَنْ أَرَادَ الْآخِرَةَ وَسَعَى لَهَا سَعْيَهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَبِكَ كَانَ سَعْيُهُم مَّشْكُورًا كُلَّا نُمِدُّ هَؤُلَاءِ وَهَؤُلَاءِ مِنْ عَطَاءِ رَبِّكَ وَمَا كَانَ عَطَاءُ رَبِّكَ مَحْظُورًا انظُرْ كَيْفَ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَلَلْآخِرَةُ أَكْبَرُ دَرَجَاتٍ وَأَكْبَرُ تَفْضِيلًا
'যে কেউ ইহকাল কামনা করে, আমি সেসব লোককে যা ইচ্ছা সত্বর দিয়ে দিই। অতঃপর তাদের জন্যে জাহান্নাম নির্ধারণ করি। ওরা তাতে নিন্দিত-বিতাড়িত অবস্থায় প্রবেশ করবে।
আর যারা পরকাল কামনা করে এবং মুমিন অবস্থায় তার জন্য যথাযথ চেষ্টা-সাধনা করে, এমন লোকদের চেষ্টা স্বীকৃত হয়ে থাকে।
এদের এবং ওদের প্রত্যেককে আমি আপনার পালনকর্তার দান পৌঁছে দিই এবং আপনার পালকর্তার দান অবধারিত।
দেখুন, আমি তাদের একদলকে অপরের ওপর কীভাবে শ্রেষ্ঠত্ব দান করলাম। পরকাল তো নিশ্চয়ই মর্তবায় শ্রেষ্ঠ এবং ফযীলতে শ্রেষ্ঠতম।' [১০৩]
এখানে আল্লাহ তাআলা ব্যাখ্যা করেছেন, যারা আখিরাতের তুলনায় দুনিয়া কামনা করে, তিনি তাদের দুনিয়াবি রিযক বাড়িয়ে দেন। ইহজগতে তিনি নেককার মুত্তাকী নির্বিশেষে কারও রিযক আটকে রাখেন না। এরপর আল্লাহ বলেছেন, 'দেখুন, আমি তাদের একদলকে অপরের ওপর কীভাবে শ্রেষ্ঠত্ব দান করলাম। পরকাল তো নিশ্চয়ই মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ এবং ফযীলতে শ্রেষ্ঠতম। 'অর্থাৎ, এর মাধ্যমে স্পষ্ট হলো, দুনিয়ার মতো আখিরাতেও বিভিন্ন স্তর ও মর্যাদার পার্থক্য থাকবে। আর দুনিয়ার তুলনায় আখিরাতের স্তরভেদ আরও ব্যাপক।
যেভাবে আল্লাহ তার সকল ঈমানদার বান্দাদের মধ্যে মর্যাদার পার্থক্য উল্লেখ করেছেন, সেভাবে নবিদের মধ্যেও মর্যাদার পার্থক্য উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ বলেন,
تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ مِّنْهُم مَّن كَلَّمَ اللَّهُ وَرَفَعَ بَعْضَهُمْ دَرَجَاتٍ وَآتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَاتِ وَأَيَّدْنَاهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ
‘এই রাসূলগণ—আমি তাদের কাউকে কারও ওপর মর্যাদা দিয়েছি। তাদের মধ্যে কেউ তো হলো তারা যার সাথে আল্লাহ কথা বলেছেন, আর কারও মর্যাদা উচ্চতর করেছেন এবং আমি মারইয়াম-তনয় ঈসাকে প্রকৃষ্ট মু’জিযা দান করেছি এবং তাকে শক্তি দান করেছি ‘রূহুল কুদুস’ অর্থাৎ জিবরীলের মাধ্যমে...’।[১০৪]
وَتَيْنَادَاوُودَ زَبُورًا * وَلَقَدْ فَضَّلْنَا بَعْضَ النَّبِيِّينَ عَلَى بَعْضٍ
'...আমি তো কতক নবিকে কতক নবির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি এবং দাউদকে যাবুর দান করেছি’।[১০৫]
আবূ হুরায়রা হতে বর্ণিত আছে, নবি বলেছেন, 'দুর্বল মুমিনের তুলনায় শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে উত্তম ও অতি প্রিয়। তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে। যা তোমার উপকারে আসে তা-ই পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করো। আল্লাহর নিকট সাহায্য চাও, অক্ষম হয়ো না। আর তোমার সাথে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো কিছু ঘটলে এরূপ বোলো না যে, যদি আমি এমন এমন করতাম তবে এ রকমটা ঘটত না; বরং এ রকম বলো, আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন এবং তিনি যা চেয়েছেন তা-ই করেছেন। কেননা, তোমার ‘লাও’ (যদি) শব্দটি শয়তানের কর্মের দুয়ার খুলে দেয়।[১০৬]
আবূ হুরায়রা ও আমর ইবনুল আস হতে বর্ণিত, নবি বলেছেন, 'বিচারক যখন ইজতিহাদ করে (চিন্তাভাবনা করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছার চেষ্টা করে) বিচার করে, অতঃপর সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়, তার জন্য রয়েছে দুটি পুরস্কার। আর সে যখন ইজতিহাদ করে বিচার করতে গিয়ে ভুল করে বসে তবুও তার জন্য রয়েছে একটি পুরস্কার’।[১০৭]
আল্লাহ বলেন,
وَمَا لَكُمْ أَلَّا تُنفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلِلَّهِ مِيرَاثُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَا يَسْتَوِي مِّنَ الَّذِينَ أَنفَقُوا مِن مِّنكُم مَّنْ أَنفَقَ مِن قَبْلِ الْفَتْحِ وَقَاتَلَ أُولَبِكَ أَعْظَمُ دَرَجَةً بَعْدُ وَقَاتَلُوا وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَى وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ
'তোমাদের আল্লাহর পথে ব্যয় করাতে কিসে বাধা দেয়, যখন আল্লাহই নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের উত্তরাধিকারী? তোমাদের মধ্যে যে মক্কা বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে ও জিহাদ করেছে, সে সমান নয়। এরূপ লোকদের মর্যাদা বড় তাদের অপেক্ষা, যারা পরে ব্যয় করেছে ও জিহাদ করেছে। তবে আল্লাহ উভয়কে কল্যাণের ওয়াদা দিয়েছেন। তোমরা যা করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত।' [১০৮]
لَّا يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ وَالْمُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ فَضَّلَ اللَّهُ الْمُجَاهِدِينَ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ عَلَى الْقَاعِدِينَ دَرَجَةً وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَى وَفَضَّلَ اللَّهُ الْمُجَاهِدِينَ عَلَى الْقَاعِدِينَ أَجْرًا عَظِيمًا * دَرَجَاتٍ مِّنْهُ وَمَغْفِرَةً وَرَحْمَةً وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا ) ج
'গৃহে উপবিষ্ট মুমিন-যাদের কোনো সংগত ওযর নেই এবং ওইসব মুমিন, যারা জান ও মাল দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে-সমান নয়। যারা জান ও মাল দ্বারা জিহাদ করে, আল্লাহ তাদের পদমর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছেন গৃহে উপবিষ্টদের তুলনায় এবং প্রত্যেকের সাথেই আল্লাহ কল্যাণের ওয়াদা করেছেন। আল্লাহ মুজাহিদীনকে উপবিষ্টদের ওপর মহান প্রতিদানে শ্রেষ্ঠ করেছেন। এগুলো তাঁর পক্ষ থেকে পদমর্যাদা, ক্ষমা ও করুণা। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও করুণাময়।' [১০৯]
أَجَعَلْتُمْ سِقَايَةَ الْحَاجَ وَعِمَارَةَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ كَمَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَجَاهَدَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ لَا يَسْتَوُونَ عِندَ اللَّهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ ) الَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ أَعْظَمُ دَرَجَةً عِندَ اللَّهِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ * يُبَشِّرُهُمْ رَبُّهُم بِرَحْمَةٍ مِنْهُ وَرِضْوَانٍ وَجَنَّاتٍ لَّهُمْ فِيهَا نَعِيمٌ مُّقِيمٌ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا إِنَّ اللَّهَ عِندَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ ) ج
'তোমরা কি হাজীদের পানি সরবরাহ ও মাসজিদুল-হারাম আবাদকরণকে সেই লোকের সমান মনে করো, যে ঈমান রাখে আল্লাহ ও শেষ-দিনের প্রতি এবং যুদ্ধ করেছে আল্লাহর রাহে? এরা আল্লাহর দৃষ্টিতে সমান নয়, আর আল্লাহ যালিম লোকদের হিদায়াত করেন না। যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর রাহে নিজেদের জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করেছে, তাদের বড় মর্যাদা রয়েছে আল্লাহর কাছে, আর তারাই সফলকাম। তাদের সুসংবাদ দিচ্ছেন তাদের পরওয়ারদেগার স্বীয় দয়া ও সন্তোষের এবং জান্নাতের, সেখানে আছে তাদের জন্য স্থায়ী শান্তি। তথায় তারা থাকবে চিরদিন। নিঃসন্দেহে আল্লাহর কাছে আছে মহাপুরস্কার।' [১১০]
مَّنْ هُوَ قَانِتٌ آنَاءَ اللَّيْلِ سَاجِدًا وَقَابِما يَحْذَرُ الْآخِرَةَ وَيَرْجُو رَحْمَةَ رَبِّهِ قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ
'যে ব্যক্তি রাত্রিকালে সাজদার মাধ্যমে অথবা দাঁড়িয়ে ইবাদাত করে, পরকালের আশঙ্কা রাখে এবং তার পালনকর্তার রহমত প্রত্যাশা করে, সে কি তার সমান, যে এরূপ করে না? বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে? চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান।' [১১১]
يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ
'... তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দেবেন। আল্লাহ খবর রাখেন যা কিছু তোমরা করো।' [১১২]
টিকাঃ
[১০৩] সূরা ইসরা, ১৭: ১৮-২১。
[১০৪] সূরা বাকারাহ, ২: ২৫৩。
[১০৫] সূরা ইসরা, ১৭:৫৫。
[১০৬] মুসলিম, ২৬৬৪。
[১০৭] বুখারি, ৭৩৫২。
[১০৮] সূরা হাদীদ, ৫৭: ১০。
[১০৯] সূরা নিসা, ৪: ৯৫-৯৬。
[১১০] সূরা তাওবা, ৯: ১৯-২২。
[১১১] সূরা যুমার, ৩৯: ৯。
[১১২] সূরা মুজাদালা, ৫৮: ১১。
📄 হাকীকাত ও শারীয়াত
সত্যিকারের দ্বীন হলো বিশ্ব-জাহানের রবের দ্বীন। যে দ্বীনের ব্যাপারে সমস্ত নবি- রাসূলগণ একমত যদিও-বা তাদের নিজ নিজ আইন-কানুন (শারীআত) ভিন্ন ভিন্ন ছিল। নিম্নোক্ত আয়াতে শিরআহ' (شِرْعَةً) শব্দটি দ্বারা শারীআতই উদ্দেশ্য। আল্লাহ বলেন,
لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا
'...আমি তোমাদের প্রত্যেককে একটি আইন (শারীআত) ও স্পষ্ট পথ (منهاج) দিয়েছি।...' [২০৪]
ثُمَّ جَعَلْنَاكَ عَلَى شَرِيعَةٍ مِّنَ الْأَمْرِ فَاتَّبِعْهَا وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَ الَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ (১৮) إِنَّهُمْ لَن يُغْنُوا عَنكَ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا وَإِنَّ الظَّالِمِينَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَاللَّهُ وَلِيُّ الْمُتَّقِينَ (১৯)
'এরপর আমি আপনাকে রেখেছি ধর্মের এক বিশেষ শারীআতের ওপর। অতএব, আপনি এর অনুসরণ করুন এবং অজ্ঞদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করবেন না। আল্লাহর সামনে তারা আপনার কোনো উপকারে আসবে না। যালিমরা একে অপরের বন্ধু। আর আল্লাহ মুত্তাকীদের বন্ধু।' [২০৫]
এখানে 'মিনহাজ' অর্থ পথ। আল্লাহ বলেন,
وَأَن لَّوِ اسْتَقَامُوا عَلَى الطَّرِيقَةِ لَأَسْقَيْنَاهُم مَّاءً غَدَقًا لِتَفْتِنَهُمْ فِيهِ وَمَن يُعْرِضْ عَن ذِكْرِ رَبِّهِ يَسْلُكْهُ عَذَابًا صَعَدًا *
'আর এই প্রত্যাদেশ করা হয়েছে যে, তারা যদি সত্যপথে কায়েম থাকত, তবে আমি তাদের প্রচুর পানি বর্ষণে সিক্ত করতাম। যাতে এ ব্যাপারে তাদের পরীক্ষা করি। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তিনি তাকে উদীয়মান আযাবে পরিচালিত করবেন।' [২০৬]
সুতরাং শারীআতের দৃষ্টান্ত নদীর মতো আর 'মিনহাজ' (কর্মপদ্ধতি) হলো নদীতে বয়ে চলা স্রোতধারা, যা দ্বীনের হাকীকাতের দিকে ছুটে চলেছে। আর তা হলো: শরীকহীন একক আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করা। এটাই ইসলামের হাকীকাত। কেননা, ইসলামের মূলকথা হচ্ছে, ব্যক্তি সর্বান্তঃকরণে একমাত্র বিশ্বজাহানের রব আল্লাহর নিকটই আত্মসমর্পণ করবে অন্য কারও নিকট না। যে ব্যক্তি আল্লাহ বাদে অন্য কারও নিকট আত্মসমর্পণ করে সে একজন মুশরিক এবং আল্লাহ তাঁর সাথে শিরকের গুনাহ ক্ষমা করেন না।
যারা অহংকারবশত আল্লাহর নিকট সর্বান্তঃকরণে আত্মসমর্পণ করে না তাদের ব্যাপারে তিনি বলেন,
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ
'তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেব। যারা আমার ইবাদাতে অহংকার করে তারা সত্বরই জাহান্নামে দাখিল হবে লাঞ্ছিত হয়ে।' [২০৭]
এই দ্বীন (ইসলাম) আগের ও পরের সমস্ত নবি-রাসূলদের দ্বীন। আল্লাহ বলেন,
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ )
'যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন তালাশ করে, কস্মিনকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখিরাতে সে ক্ষতিগ্রস্ত।' [২০৮]
এটি একটি ব্যাপক অর্থবোধক আয়াত, যা সর্বযুগে সর্বস্থানে প্রযোজ্য।
ইবরাহীম, ইয়াকূব ও তাদের গোত্রসমূহ, মূসা, ঈসা ও তাদের শিষ্যবৃন্দ সকলের দ্বীন ছিল ইসলাম। আর এর সারকথা হলো, একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করা এবং তার সাথে কিছু শরীক না করা। নূহ-এর উক্তি উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন,
وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ نُوحٍ إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ يَا قَوْمِ إِن كَانَ كَبُرَ عَلَيْكُم مَّقَامِي وَتَذْكِيرِي بِآيَاتِ اللَّهِ فَعَلَى اللَّهِ تَوَكَّلْتُ فَأَجْمِعُوا أَمْرَكُمْ وَشُرَكَاءَكُمْ ثُمَّ لَا يَكُنْ أَمْرُكُمْ عَلَيْكُمْ غُمَّةً ثُمَّ اقْضُوا إِلَى وَلَا تُنظِرُونِ فَإِن تَوَلَّيْتُمْ فَمَا سَأَلْتُكُم مِّنْ أَجْرٍ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى اللَّهِ وَأُمِرْتُ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ
'...হে আমার সম্প্রদায়, যদি তোমাদের মাঝে আমার অবস্থিতি এবং আল্লাহর আয়াতসমূহের মাধ্যমে নাসীহত করা ভারী বলে মনে হয়ে থাকে, তবে আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করছি। এখন তোমরা সবাই মিলে নিজেদের কর্ম সাব্যস্ত করো এবং এতে তোমাদের শরীকদের সমবেত করে নাও, যাতে তোমাদের মাঝে নিজেদের কাজের ব্যাপারে কোনো সন্দেহ-সংশয় না থাকে। অতঃপর আমার সম্পর্কে যা কিছু করার করে ফেলো এবং আমাকে অব্যাহতি দিয়ো না। তারপরও যদি বিমুখতা অবলম্বন করো, তবে আমি তোমাদের কাছে কোনো রকম বিনিময় কামনা করি না। আমার বিনিময় হলো আল্লাহর দায়িত্বে। আর আমার প্রতি নির্দেশ রয়েছে যেন আমি আনুগত্য অবলম্বন করি। [২০৯]
وَمَن يَرْغَبُ عَن مِلَّةِ إِبْرَاهِيمَ إِلَّا مَن سَفِهَ نَفْسَهُ وَلَقَدِ اصْطَفَيْنَاهُ فِي الدُّنْيَا وَإِنَّهُ فِي الْآخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِينَ إِذْ قَالَ لَهُ رَبُّهُ أَسْلِمْ قَالَ أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ وَوَصَّى بِهَا إِبْرَاهِيمُ بَنِيهِ وَيَعْقُوبُ يَا بَنِيَّ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى لَكُمُ الدِّينَ فَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
'যে নিজেকে বোকা প্রতিপন্ন করে সে ব্যতীত ইবরাহীমের ধর্ম থেকে কে মুখ ফেরায়? নিশ্চয়ই আমি তাকে পৃথিবীতে মনোনীত করেছি এবং সে পরকালে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত। স্মরণ করো! যখন তাকে তার পালনকর্তা বললেন, অনুগত হও। সে বলল, আমি বিশ্বপ্রতিপালকের অনুগত হলাম।
এরই ওসীয়াত করেছে ইবরাহীম তার সন্তানদের এবং ইয়াকূবও যে, হে আমার সন্তানগণ, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের জন্য এ ধর্মকে মনোনীত করেছেন। কাজেই তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না।' [২১০]
وَقَالَ مُوسَى يَا قَوْمِ إِن كُنتُمْ آمَنتُم بِاللَّهِ فَعَلَيْهِ تَوَكَّلُوا إِن كُنتُم مُّسْلِمِينَ *
'আর মূসা বলল, হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা যদি আল্লাহর ওপর ঈমান এনে থাকো, তবে তারই ওপর ভরসা করো যদি তোমরা আজ্ঞাবহ হয়ে থাকো।' [২১১]
যখন ফিরআউনের জাদুকররা মূসা-এর বার্তার হাকীকাত বুঝতে পেরে বলেছিল,
رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَتَوَفَّنَا مُسْلِمِينَ )
'হে আমাদের রব, আমাদের জন্য ধৈর্যের দ্বার খুলে দাও এবং আমাদের মুসলিম হিসেবে মৃত্যু দান করো।' [২১২]
ইউসুফ বলেছেন,
تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ ))
'... আমাকে ইসলামের ওপর মৃত্যুদান করুন এবং আমাকে স্বজনদের সাথে মিলিত করুন।[২১৩]
সাবার রানী বিলকীস ইসলাম গ্রহণের পর বলেছিল,
رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي وَأَسْلَمْتُ مَعَ سُلَيْمَانَ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
'হে আমার রব, আমি তো নিজের প্রতি যুলুম করেছি, আমি সুলাইমানের সাথে বিশ্বজাহানের পালনকর্তা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করলাম'। [২১৪]
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّا أَنزَلْنَا التَّوْرَاةَ فِيهَا هُدًى وَنُورٌ يَحْكُمُ بِهَا النَّبِيُّونَ الَّذِينَ أَسْلَمُوا لِلَّذِينَ هَادُوا وَالرَّبَّانِيُّونَ وَالْأَحْبَارُ
'আমি তাওরাত অবতীর্ণ করেছি। এতে হিদায়াত ও আলো রয়েছে। আল্লাহর আজ্ঞাবহ পয়গম্বর, দরবেশ ও আলিমরা এর মাধ্যমে ইয়াহূদীদের ফায়সালা দিতেন'। [২১৫]
ঈসা -এর শিষ্যরা বলেছিলেন,
آمَنَّا بِاللَّهِ وَاشْهَدْ بِأَنَّا مُسْلِمُونَ
'আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি। আর তুমি সাক্ষী থাকো যে, আমরা হুকুম কবুল করে নিয়েছি'। [২১৬]
সুতরাং সকল নবিদের পথ এক ও অভিন্ন, যদিও তাদের আইন-কানুনে বা শারীআতে কিছুটা ভিন্নতা ছিল। বুখারি ও মুসলিম উল্লেখিত হাদীসে এসেছে, নবি বলেছেন, 'আমরা নবিগণ একই দ্বীনের অনুসারী'। [২১৭]
আল্লাহ তাআলা বলেন,
شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ كَبُرَ عَلَى الْمُشْرِكِينَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَيْهِ اللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَن يَشَاءُ وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَن يُنِيبُ )
'তিনি তোমাদের জন্যে দ্বীনের ক্ষেত্রে সে পথই নিধারিত করেছেন, যার আদেশ দিয়েছিলেন নূহকে, যা আমি প্রত্যাদেশ করেছি আপনার প্রতি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে এই মর্মে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করো এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি কোরো না। আপনি মুশরিকদের যে বিষয়ের প্রতি আমন্ত্রণ জানান, তা তাদের কাছে দুঃসাধ্য বলে মনে হয়। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন এবং যে তার অভিমুখী হয়, তাকে পথ প্রদর্শন করেন।' [২১৮]
يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ وَإِنَّ هَذِهِ أُمَّتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَأَنَا رَبُّكُمْ فَاتَّقُونِ فَتَقَطَّعُوا أَمْرَهُم بَيْنَهُمْ زُبُرًا كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ *
'হে রাসূলগণ, পবিত্র বস্তু আহার করুন এবং সৎকাজ করুন। আপনারা যা করেন সে বিষয়ে আমি পরিজ্ঞাত। আপনাদের এই উম্মাত সব তো একই দ্বীনের অনুসারী এবং আমি আপনাদের পালনকর্তা; অতএব আমাকে ভয় করুন। অতঃপর মানুষ তাদের বিষয়কে বহুধা বিভক্ত করে দিয়েছে। প্রত্যেক সম্প্রদায় নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে আনন্দিত হচ্ছে।' [২১৯]
টিকাঃ
[২০৪] সূরা মাইদা, ৫: ৪৮।
[২০৫] সূরা জাসিয়া, ৪৫: ১৮-১৯।
[২০৬] সূরা জিন, ৭২: ১৬-১৭।
[২০৭] সূরা গাফির, ৪০: ৬০।
[২০৮] সূরা আ-লি ইমরান, ৩: ৮৫।
[২০৯] সূরা ইউনুস, ১০: ৭১-৭২।
[২১০] সূরা বাকারাহ, ২: ১৩০-১৩২।
[২১১] সূরা ইউনুস, ১০: ৮৪।
[২১২] সূরা আ'রাফ, ৭: ১২৬।
[২১৩] সূরা ইউসুফ, ১২: ১০১।
[২১৪] সূরা নামল, ২৭:৪৪।
[২১৫] সূরা মাইদা, ৫: ৪৪।
[২১৬] সূরা আলে ইমরান, ৩: ৫২।
[২১৭] বুখারি, ৩৪৪১; মুসলিম, ২৩৬৫।
[২১৮] সূরা শূরা, ৪২: ১৩।
[২১৯] সূরা মুমিনূন, ২৩: ৫১-৫৩।
📄 রাসূলের অনুসরণ বাধ্যতামূলক
এটা জানা বাধ্যতামূলক যে, আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ-কে সকল মানুষ ও জিনের কাছে রাসূল হিসেবে পাঠিয়েছেন। প্রত্যেক জিন-ইনসানের ওপর মুহাম্মাদ-এর রিসালাত বিশ্বাস করা ও আনুগত্য করা বাধ্যতামূলক। তিনি যা কিছু প্রচার করেছেন তার সবকিছু বিশ্বাস করা, তার সকল আদেশ-নিষেধের আনুগত্য করা প্রত্যেকের ওপর বাধ্যতামূলক। যার কাছে এই বার্তা পৌঁছল কিন্তু মুহাম্মাদ-এর নুবুওয়াতে ঈমান আনল না, সে একজন কাফির-চাই সে জিন-ইনসান যা-ই হোক না কেন।
মুহাম্মাদ-কে সকল মানুষ ও জিনের কাছে পাঠানো হয়েছে। এই বিষয়ে মুসলিমদের ঐকমত্য রয়েছে। একবার জিনেরা কুরআন তিলাওয়াত শুনল, এরপর নিজেদের জাতির কাছে সতর্ককারী হিসেবে ফিরে গেল। যখন রাসূলুল্লাহ তাইফ থেকে ফেরার সময় বাৎনু নাখলাহ নামক স্থানে সাহাবিদের নিয়ে সালাত আদায়ের সময় তখন এই ঘটনা ঘটেছিল।
আল্লাহ তাআলা তার রাসূলকে এই ঘটনা জানিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِذْ صَرَفْنَا إِلَيْكَ نَفَرًا مِنَ الْجِنِّ يَسْتَمِعُونَ الْقُرْآنَ فَلَمَّا حَضَرُوهُ قَالُوا أَنصِتُوا فَلَمَّا قُضِيَ وَلَّوْا إِلَى قَوْمِهِم مُنذِرِينَ قَالُوا يَا قَوْمَنَا إِنَّا سَمِعْنَا كِتَابًا أُنزِلَ مِن بَعْدِ مُوسَى مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ يَهْدِى إِلَى الْحَقِّ وَإِلَى طَرِيقٍ مُسْتَقِيمٍ يَا قَوْمَنَا أَجِيبُوا دَاعِيَ اللَّهِ وَآمِنُوا بِهِ يَغْفِرْ لَكُم مِّن ذُنُوبِكُمْ وَيُجِرْكُم مِّنْ عَذَابٍ أَلِيمٍ وَمَن لَّا يُجِبْ دَاعِيَ اللَّهِ فَلَيْسَ بِمُعْجِزِ فِي الْأَرْضِ وَلَيْسَ لَهُ مِن دُونِهِ أَوْلِيَاءُ أُولَبِكَ فِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ
'যখন আমি একদল জিনকে আপনার প্রতি আকৃষ্ট করেছিলাম, তারা কুরআন পাঠ শুনছিল। তারা যখন কুরআন পাঠের জায়গায় উপস্থিত হলো, তখন পরস্পর বলল, চুপ থাকো। অতঃপর যখন পাঠ সমাপ্ত হলো, তখন তারা তাদের সম্প্রদায়ের কাছে সতর্ককারীরূপে ফিরে গেল।
তারা বলল, হে আমাদের সম্প্রদায়, আমরা এমন এক কিতাব শুনেছি, যা মূসার পর অবতীর্ণ হয়েছে। এ কিতাব পূর্ববর্তী সব কিতাবের প্রত্যায়ন করে, সত্যধর্ম ও সরল পথের দিকে পরিচালিত করে।
হে আমাদের সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর কথা মান্য করো এবং তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো। তিনি তোমাদের গুনাহ মার্জনা করবেন।
আর যে ব্যক্তি আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর কথা মানবে না, সে পৃথিবীতে আল্লাহকে অপারগ করতে পারবে না এবং আল্লাহ ব্যতীত তার কোনো সাহায্যকারী থাকবে না। এ ধরনের লোকই প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত।' [৫১৩]
এরপর আল্লাহ তাআলা নিম্নোক্ত আয়াতগুলো নাযিল করেন:
قُلْ أُوحِيَ إِلَى أَنَّهُ اسْتَمَعَ نَفَرٌ مِنَ الْجِنِّ فَقَالُوا إِنَّا سَمِعْنَا قُرْآنًا عَجَبًا يَهْدِي إِلَى الرُّشْدِ فَآمَنَّا بِهِ وَلَن نُّشْرِكَ بِرَبِّنَا أَحَدًا وَأَنَّهُ تَعَالَى جَدُّ رَبِّنَا مَا اتَّخَذَ صَاحِبَةً وَلَا وَلَدًا وَأَنَّهُ كَانَ يَقُولُ سَفِيهُنَا عَلَى اللَّهِ شَطَطًا وَأَنَّا ظَنَنَّا أَن لَّن تَقُولَ الْإِنسُ وَالْجِنُّ عَلَى اللَّهِ كَذِبًا وَأَنَّهُ كَانَ رِجَالٌ مِنَ الْإِنسِ يَعُوذُونَ بِرِجَالٍ مِّنَ الْجِنِّ فَزَادُوهُمْ رَهَقًا وَأَنَّهُمْ ظَنُّوا كَمَا ظَنَنتُمْ أَن لَّن يَبْعَثَ اللَّهُ أَحَدًا
'বলুন, আমার প্রতি ওহি নাযিল করা হয়েছে যে, জিনদের একটি দল কুরআন শ্রবণ করেছে, অতঃপর তারা বলেছে, আমরা বিস্ময়কর কুরআন শ্রবণ করেছি; যা সৎপথ প্রদর্শন করে। ফলে আমরা তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছি। আমরা কখনো আমাদের পালনকর্তার সাথে কাউকে শরীক করব না। এবং আরও বিশ্বাস করি যে, আমাদের পালনকর্তার মহান মর্যাদা সবার ঊর্ধ্বে। তিনি কোনো পত্নী গ্রহণ করেননি এবং তাঁর কোনো সন্তান নেই।
আমাদের মধ্যে নির্বোধরা আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে বাড়াবাড়ির কথাবার্তা বলত।
অথচ আমরা মনে করতাম, মানুষ ও জিন কখনো আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে মিথ্যা বলতে পারে না। অনেক মানুষ অনেক জিনের আশ্রয় নিত, ফলে তারা জিনদের আত্মম্ভরিতা বাড়িয়ে দিত। তারা ধারণা করত, যেমন তোমরা মানবরা ধারণা করো যে, মৃত্যুর পর আল্লাহ তাআলা কখনো কাউকে পুনরুত্থিত করবেন না।[৫১৪]
অর্থাৎ, আলিমদের সুস্পষ্ট মত অনুসারে, জিনদের মধ্যে নির্বোধরা এরূপ কথা বলত।
সালাফদের অনেকের মতে, লোকেরা যখন উপত্যকা ও বিরানভূমি অতিক্রম করত তখন তারা বলত, আমরা এখানে বসবাসকারী জিনদের সর্দারের নিকট তার সম্প্রদায়ের নির্বোধদের ক্ষতি থেকে আশ্রয় চাই। যখন মানুষ জিনের কাছে সাহায্য চাইতে শুরু করল তখন কেবল তাদের কুফর ও সীমালঙ্ঘনই বৃদ্ধি পেল। যেমন: আল্লাহ বলেছেন,
وَأَنَّهُ كَانَ رِجَالٌ مِّنَ الْإِنسِ يَعُوذُونَ بِرِجَالٍ مِّنَ الْجِنِّ فَزَادُوهُمْ رَهَقًا وَأَنَّهُمْ ظَنُّوا كَمَا ظَنَنتُمْ أَن لَّن يَبْعَثَ اللَّهُ أَحَدًا وَأَنَّا لَمَسْنَا السَّمَاءَ فَوَجَدْنَاهَا مُلِئَتْ حَرَسًا شَدِيدًا وَشُهُبًا *
‘অনেক মানুষ অনেক জিনের আশ্রয় নিত, ফলে তারা জিনদের আত্মম্ভরিতা বাড়িয়ে দিত। তারা ধারণা করত, যেমন তোমরা মানবরা ধারণা করো যে, মৃত্যুর পর আল্লাহ তাআলা কখনো কাউকে পুনরুত্থিত করবেন না। আমরা আকাশ পর্যবেক্ষণ করছি, অতঃপর দেখতে পেয়েছি যে, কঠোর প্রহরী ও উল্কাপিণ্ড দ্বারা আকাশ পরিপূর্ণ।[৫১৫]
কুরআন নাযিলের পূর্বে জিনদেরকে উল্কাপিণ্ড দিয়ে ধাওয়া করা হতো ও সেগুলো তাদের দিকে নিক্ষিপ্ত করা হতো, কিন্তু উল্কাপিণ্ড নিক্ষিপ্ত হওয়ার আগে চুরি করে তারা কিছু খবরাখবর সংগ্রহ করত। কিন্তু মুহাম্মাদ-কে পাঠানোর পর সমস্ত আসমানকে কঠিন পাহারা ও উল্কাপিণ্ড দিয়ে পরিপূর্ণ করা হলো। চুরি করে কোনো তথ্য সংগ্রহ করার আগেই সেগুলো তাদেরকে ধাওয়া করত। এ ব্যাপারে জানিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَأَنَّا كُنَّا نَقْعُدُ مِنْهَا مَقَاعِدَ لِلسَّمْعِ فَمَن يَسْتَمِعِ الْآنَ يَجِدْ لَهُ شِهَابًا رَّصَدًا *
'আমরা আকাশের বিভিন্ন ঘাঁটিতে সংবাদ শ্রবণার্থে বসতাম। এখন কেউ সংবাদ শুনতে চাইলে সে জ্বলন্ত উল্কাপিণ্ড ওত পেতে থাকতে দেখে'।[৫১৬]
وَمَا تَنَزَّلَتْ بِهِ الشَّيَاطِينُ وَمَا يَنبَغِي لَهُمْ وَمَا يَسْتَطِيعُونَ إِنَّهُمْ عَنِ السَّمْعِ لَمَعْزُولُونَ ۞
'এই কুরআন শয়তানরা অবতীর্ণ করেনি। তারা এ কাজের উপযুক্ত নয় এবং তারা এর সামর্থ্যও রাখে না। তাদেরকে তো শ্রবণের জায়গা থেকে দূরে রাখা রয়েছে'।[৫১৭]
وَأَنَّا لَا نَدْرِي أَشَرٌّ أُرِيدَ بِمَن فِي الْأَرْضِ أَمْ أَرَادَ بِهِمْ رَبُّهُمْ رَشَدًا وَأَنَّا مِنَّا الصَّالِحُونَ وَمِنَّا دُونَ ذَلِكَ كُنَّا طَرَابِقَ قِدَدًا ۞
'আমরা জানি না পৃথিবীবাসীদের অমঙ্গল সাধন করা অভীষ্ট, না তাদের পালনকর্তা তাদের মঙ্গল সাধন করার ইচ্ছা রাখেন। আমাদের কেউ কেউ সৎকর্মপরায়ণ এবং কেউ কেউ এরূপ নয়। আমরা ছিলাম বিভিন্ন পথে বিভক্ত'।[৫১৮]
অর্থাৎ, আলিমদের মতে এর অর্থ বিভিন্ন চিন্তাধারা বা মাযহাব; জিনদের মধ্যেও মুসলিম, অমুসলিম, ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান, সুন্নাতের অনুসারী কিংবা বিদআতি ইত্যাদি সব রকম আছে।
وَأَنَّا ظَنَنَّا أَن لَّن تُعْجِزَ اللَّهَ فِي الْأَرْضِ وَلَن تُعْجِزَهُ هَرَبًا ۞
'আমরা বুঝতে পেরেছি যে, আমরা পৃথিবীতে আল্লাহ তাআলাকে পরাস্ত করতে পারব না এবং পলায়ন করেও তাঁকে অপারগ করতে পারব না'।[৫১৯]
এখানে জিনেরা বলেছে যে, তারা আল্লাহকে অপারগ করতে পারবে না-দুনিয়াতেই থাকুক বা সেখান থেকে পলায়ন করুক না কেন।
وَأَنَّا لَمَّا سَمِعْنَا الْهُدَى آمَنَّا بِهِ فَمَن يُؤْمِن بِرَبِّهِ فَلَا يَخَافُ بَخْسًا وَلَا رَهَقًا وَأَنَّا مِنَّا الْمُسْلِمُونَ وَمِنَّا الْقَاسِطُونَ فَمَنْ أَسْلَمَ فَأُولَبِكَ تَحَرَّوْا رَشَدًا
'আমরা যখন সুপথের নির্দেশ শুনলাম, তখন তাতে বিশ্বাস স্থাপন করলাম। অতএব, যে তার পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস করে, সে লোকসান ও জোরজবরের আশঙ্কা করে না। আমাদের কিছুসংখ্যক মুসলিম এবং কিছুসংখ্যক অন্যায়কারী। যারা আজ্ঞাবহ হয়, তারা সৎপথ বেছে নিয়েছে।' [৫২০]
কাসিত (قاسِطٌ) শব্দটি মুক্বসিত (مُقْسِطُ) শব্দ দুটির মূল এক হলেও অর্থ বিপরীত। মুক্বসিত হলো ন্যায়বান ও সত্যনিষ্ঠ, আর কাসিত হলো যে সত্য থেকে বিচ্যুত ও যুলুম করে।
وَأَنَّا مِنَّا الْمُسْلِمُونَ وَمِنَّا الْقَاسِطُونَ فَمَنْ أَسْلَمَ فَأُولَبِكَ تَحَرَّوْا رَشَدًا وَأَمَّا الْقَاسِطُونَ فَكَانُوا لِجَهَنَّمَ حَطَبًا وَأَن لَّوِ اسْتَقَامُوا عَلَى الطَّرِيقَةِ لَأَسْقَيْنَاهُم مَّاءً غَدَقًا لِنَّفْتِنَهُمْ فِيهِ وَمَن يُعْرِضْ عَن ذِكْرِ رَبِّهِ يَسْلُكْهُ عَذَابًا صَعَدًا وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا وَأَنَّهُ لَمَّا قَامَ عَبْدُ اللَّهِ يَدْعُوهُ كَادُوا يَكُونُونَ عَلَيْهِ لِبَدًا * قُلْ إِنَّمَا أَدْعُو رَبِّي وَلَا أُشْرِكُ بِهِ أَحَدًا * قُلْ إِنِّي لَا أَمْلِكُ لَكُمْ ضَرًّا وَلَا رَشَدًا * قُلْ إِنِّي لَن يُجِيرَنِي مِنَ اللَّهِ أَحَدٌ وَلَنْ أَجِدَ مِن دُونِهِ مُلْتَحَدًا
'আমাদের কিছুসংখ্যক আজ্ঞাবহ এবং কিছুসংখ্যক অন্যায়কারী। যারা আজ্ঞাবহ হয়, তারা সৎপথ বেছে নিয়েছে। আর যারা অন্যায়কারী, তারা তো জাহান্নামের ইন্ধন। আর এই প্রত্যাদেশ করা হয়েছে যে, তারা যদি সত্যপথে কায়েম থাকত, তবে আমি তাদেরকে প্রচুর পানি বর্ষণে সিক্ত করতাম।
যাতে এ ব্যাপারে তাদেরকে পরীক্ষা করি। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তিনি তাকে উদীয়মান আযাবে পরিচালিত করবেন। এবং এই ওহিও করা হয়েছে যে, মাসজিদসমূহ আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করার জন্য। অতএব, তোমরা আল্লাহ তাআলার সাথে কাউকে ডেকো না। আর যখন আল্লাহ তাআলার বান্দা তাঁকে ডাকার জন্যে দণ্ডায়মান হলো, তখন অনেক জিন তার কাছে ভিড় জমাল।
বলুন, আমি তো আমার পালনকর্তাকেই ডাকি এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করি না। বলুন, আমি তোমাদের ক্ষতি সাধন করার ও সুপথে আনয়ন করার মালিক নই। বলুন, আল্লাহ তাআলার কবল থেকে আমাকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না এবং তিনি ব্যতীত আমি কোনো আশ্রয়স্থল পাব না।'[৫২১]
إِلَّا بَلَاغًا مِّنَ اللَّهِ وَرِسَالَاتِهِ وَمَن يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَإِنَّ لَهُ نَارَ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا حَتَّى إِذَا رَأَوْا مَا يُوعَدُونَ فَسَيَعْلَمُونَ مَنْ أَضْعَفُ نَاصِرًا وَأَقَلُّ عَدَدًا *
'কিন্তু আল্লাহ তাআলার বাণী পৌঁছানো ও তাঁর পয়গام প্রচার করাই আমার কাজ। যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করে, তার জন্যে রয়েছে জাহান্নামের আগুন। তথায় তারা চিরকাল থাকবে। এমনকি যখন তারা প্রতিশ্রুত শাস্তি দেখতে পাবে, তখন তারা জানতে পারবে, কার সাহায্যকারী দুর্বল এবং কার সংখ্যা কম।' [৫২২]
যখন জিনেরা এটা শুনল, তারা রাসূলুল্লাহ -এর কাছে এল এবং ঈমান আনল। এই জিনেরা ছিল নাসীবীন (نَصِيْبِينُ) নামক স্থানের বাসিন্দা। যেমন আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ বর্ণিত বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা বিষয়টি প্রমাণিত।[৫২৩]
আরেকটি বিশুদ্ধ বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ তাদেরকে সূরা রহমান তিলাওয়াত করে শুনিয়েছিলেন এবং প্রতিবার যখন তিনি এই আয়াত পড়তেন,
فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ *
'অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের পালনকর্তার কোন কোন অনুগ্রহকে অস্বীকার করবে?' [৫২৪]
তখন জিনেরা বলত,
وَلَا بِشَيْءٍ مِّنْ آلَاءِ رَبَّنَا نُكَذِّبُ فَلَكَ الْحَمْدُ
'হে আমাদের রব, আমরা আপনার কোনো অনুগ্রহকেই অস্বীকার করি না। সমস্ত প্রশংসা আপনার জন্য।'[৫২৫]
যখন জিনেরা রাসূলুল্লাহ -এর নিকট সমবেত হলো তখন তারা তার নিকট তাদের জন্য এবং তাদের জীবজন্তুর জন্য খাদ্য প্রার্থনা করল। জবাবে রাসূল বললেন, 'যেসমস্ত হাড্ডিতে আল্লাহর নাম নেওয়া হবে, সেগুলো তোমাদের খাদ্য। তোমাদের হস্তগত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা গোশতে ভরপুর হয়ে যাবে। এবং সকল বিষ্ঠা তোমাদের জীবজন্তুর খাদ্য।' রাসূলুল্লাহ বললেন, তোমরা ওই দুটি জিনিস (হাড্ডি ও বিষ্ঠা) দ্বারা ইস্তিনজা করবে না। কেননা, ওগুলো তোমাদের জিন ভাইদের (ও তাদের জানোয়ারের) খাদ্য।[৫২৬]
এই নিষেধাজ্ঞা অনেক বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত। এই দলিলের ভিত্তিতে আলিমরা বলেছেন, শুষ্ক গোবর দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করা যাবে না। তারা বলেছেন, এসব কাজে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ এগুলো জিন ও তাদের জানোয়ারদের খাদ্য। সুতরাং মানুষ ও তাদের গবাদি পশুর খাদ্য দিয়ে পবিত্রতা অর্জন নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি আরও অধিক সমীচীন ও সুস্পষ্ট।
মুহাম্মাদ -কে মানুষ-জিন নির্বিশেষে সকলের কাছেই পাঠানো হয়েছে রাসূল হিসেবে। এর মাধ্যমে তিনি সুলাইমান -এর থেকেও অধিক সম্মানিত হয়েছেন। সুলাইমান -এর প্রতি জিনদেরকে অনুগত করে দেওয়া হয়েছিল। তিনি তাদের বাদশাহ হিসেবে যেমন খুশি আদেশ করতে পারতেন এবং ইচ্ছামতো কাজ করিয়ে নিতে পারতেন। আর ওদিকে, মুহাম্মাদ তাদেরকে আল্লাহর বান্দা ও রাসূল হিসেবে সেইসব আদেশ করতেন যা আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি করেছেন, আর আল্লাহর একজন বান্দা-রাসূলের মর্যাদা একজন বাদশাহ-নবি থেকে উচ্চ।
কাফির জিনরা জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করবে, এ ব্যাপারে দলিল-প্রমাণ ও ইজমা রয়েছে। আর ঈমানদার জিনদের ব্যাপারে অধিকাংশ আলিমদের মতামত হলো তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে।
এবং অধিকাংশ আলিমদের মতামত হলো, নবি ও রাসূলগণকে কেবল মানুষদের মধ্য থেকেই পাঠানো হয়েছে, কোনো জিনকে কখনো নবি হিসেবে পাঠানো হয়নি, তাদের মধ্যে কেবল সতর্ককারী ও দ্বীনের প্রতি আহ্বানকারী ছিল। এই সতর্ককারী জিনরা মানুষ-নবিদের কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করত এরপর নিজের জাতির কাছে ফিরে গিয়ে সেই বার্তা পৌঁছে দিত। এখানে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই।
এখানে যা অবগত করা উদ্দেশ্য তা হলো, মানুষ এবং জিনের মধ্যে বিভিন্ন রকমের সম্পর্ক রয়েছে। কেউ যদি জিনদের সাথে শুধু এই উদ্দেশ্যে যোগাযোগ করে যে, সে তাদের কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বার্তা পৌঁছে দিতে চায়—যেমন: একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করা এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য করা—তবে সেই ব্যক্তি আল্লাহর সর্বোত্তম আউলিয়াদের অন্তর্ভুক্ত। এই দাওয়াতি কাজের মাধ্যমে সে রাসূলের খলীফা ও স্থলাভিষিক্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
আবার কেউ কেউ নিজের প্রয়োজনে জিনদেরকে বৈধ ও অনুমোদিত কাজে ব্যবহার করে। এ ক্ষেত্রে সে ওই ব্যক্তির ন্যায়, যে মানুষদেরকে বৈধ ও অনুমোদিত কাজে ব্যবহার করে। এই হুকুম তখন যখন তিনি তাদেরকে বাধ্যতামূলক কাজের আদেশ করেন এবং হারাম থেকে নিষেধ করেন; এরপর অনুমোদিত কাজে তাদেরকে ব্যবহার করেন। বিষয়টি বিভিন্ন কাজে আদেশ প্রদানকারী রাজা-বাদশাহদের অনুরূপ।
এটি শুধু তখনই প্রযোজ্য যখন তাকে আল্লাহর আউলিয়াদের অন্তর্ভুক্ত বলে মেনে নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে সর্বোচ্চ তিনি আল্লাহ তাআলার সাধারণ আউলিয়াদের অন্তর্ভুক্ত হবেন (যেমন প্রত্যেক মুমিন আল্লাহর একজন ওলি)। বিষয়টি বান্দা-রাসূলদের তুলনায় অন্যান্য বাদশাহ-নবিদের মর্যাদার অনুরূপ। যেমন ইবরাহীম , ঈসা ও মুহাম্মাদ -এর তুলনায় সুলাইমান , দাউদ ও ইউসুফ -এর মর্যাদা।
আর যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কর্তৃক নিষিদ্ধ কাজে জিনকে ব্যবহার করে, যেমন: শিরক, মানুষ হত্যা; অথবা হত্যা বাদে অন্যান্য যুলুম-নির্যাতন, যেমন: অসুস্থ করে দেওয়া, ভুলিয়ে দেওয়া ইত্যাদি; অথবা অশ্লীলতা ও গুনাহের কাজে তাদেরকে ব্যবহার করে, যেমন: কোনো নারী বা পুরুষ অন্য কোনো নারী বা পুরুষের সাথে গুনাহ (বিবাহ-বহির্ভূত প্রেম) করতে চায়, এসব কাজে জিনদের সাহায্য গ্রহণ করা ইত্যাদি।
এ ক্ষেত্রে যদি কুফরি কাজে তাদের সাহায্য গ্রহণ করে তবে তারা কাফির হয়ে যাবে। আর যদি তারা আল্লাহর অবাধ্যতার কাজে তাদের সাহায্য গ্রহণ করে তবে তারা ফাসিক ও অবাধ্য। এরা দ্বীন থেকে বিচ্যুত গুনাহগার, দ্বীনের সরল-সঠিক পথ পরিত্যাগকারী।
যদি জিনদের সাহায্য গ্রহণকারী ব্যক্তিদের পর্যাপ্ত শারঈ ইলম না থাকে, আর জিনদের সাহায্যকে আল্লাহর পক্ষ থেকে কারামাত বলে মনে করে, যেমন: বিদআতিদের সংগীত শোনার জন্য জিনদের সাহায্যে উড়ে যাওয়া, অথবা জিনদের সাহায্য গ্রহণ করে আরাফাতের ময়দানে পৌঁছে যাওয়া কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যেভাবে হাজ্জ করতে নির্দেশ দিয়েছেন সেভাবে না করা, কিংবা তাদের মাধ্যমে এক শহর থেকে অন্য শহরে অল্প সময়ে ভ্রমণ করা বা এ রকম আরও ঘটনাবলি।
প্রকৃতপক্ষে এইসব ব্যক্তি হলো ধোঁকাগ্রস্ত ও প্রতারিত। শয়তান তাদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেছে এবং পথভ্রষ্ট করার আগ পর্যন্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে।
এসব ঘটনা যে জিনদের সাহায্যে ঘটে বিষয়টি অনেকেই বোঝে না। বরং তারা মনে করে আল্লাহর আউলিয়াদের এ রকম কারামাত দেওয়া হয়; অথচ এসব লোকদের ঈমানের হাকীকাতের (প্রকৃত অবস্থার) ব্যাপারে পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই কিংবা কুরআনের জ্ঞান নেই, ফলে তারা রহমানের কারামাত ও শয়তানের ধোঁকার মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। সুতরাং দুর্বল ঈমানের কারণে তারা শয়তানের ফাঁদে আটকা পড়ে যায়। যদি কেউ গ্রহ-নক্ষত্র ও মূর্তিপূজারি মুশরিক হয়, তবে জিনেরা তাদের অন্তরে এমন ধারণা জন্মিয়ে দেয় যে, তারা এসব শিরকি পূজা থেকে উপকৃত হচ্ছে। আরও ধারণা জন্মিয়ে দেয় যে, তারা এসব রাজা, বাদশাহ, নবি বা সাধু পুরুষদের ছবি-মূর্তির মাধ্যমে বরকত ও সুপারিশ প্রাপ্ত হচ্ছে! যদিও-বা তারা মনে করে,
তারা কোনো নবি বা সাধু পুরুষের ইবাদাত করছে; কিন্তু বাস্তবে তারা শয়তানের পূজা করছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَيَوْمَ يَحْشُرُهُمْ جَمِيعًا ثُمَّ يَقُولُ لِلْمَلَائِكَةِ أَهَؤُلَاءِ إِيَّاكُمْ كَانُوا يَعْبُدُونَ قَالُوا سُبْحَانَكَ أَنتَ وَلِيُّنَا مِن دُونِهِم بَلْ كَانُوا يَعْبُدُونَ الْجِنَّ أَكْثَرُهُم بِهِم مُّؤْمِنُونَ )
'যেদিন তিনি তাদের সবাইকে একত্র করবেন এবং ফেরেশতাদেরকে বলবেন, এরা কি তোমাদেরই পূজা করত?
ফেরেশতারা বলবে, আপনি পবিত্র, আমরা আপনার পক্ষে, তাদের পক্ষে নই; বরং তারা জিনদের পূজা করত। তাদের অধিকাংশই শয়তানে বিশ্বাসী। [৫২৭]
একইভাবে, সূর্য ও গ্রহ-নক্ষত্রের প্রতি সাজদাকারীরা ভাবে তারা কেবল সেসব বস্তুর প্রতিই সাজদা করছে, তারাও ভ্রান্তির শিকার। কারণ, সেসব পূজারি ও পূজিত বস্তুর মধ্যে শয়তান এসে হাজির হয় এবং নিজের উদ্দেশে সাজদা করিয়ে নেয়। এ জন্যে মুশরিকরা আল্লাহ বাদে অন্য যার কাছ থেকে সাহায্য প্রত্যাশা করে, শয়তান তাদের কাছে সেসব রূপে এসে হাজির হয়। যদি কেউ নামকাওয়াস্তে ইসলামের সাথে যুক্ত থাকে আর সে কোনো জীবিত-অনুপস্থিত বা মৃত মুসলিম নেক ব্যক্তির সাহায্য প্রত্যাশা করে,
তবে শয়তান তার কাছে সেই বুজুর্গের রূপে এসে হাজির হয়। আর যদি সে ভারতের কোনো মুশরিক হয়, তবে শয়তান তার কাছে তার চাহিদামতো কল্পিত দেবদেবী বা মূর্তিরূপে হাজির হয়।
যদি কোনো জীবিত বুজুর্গের সাহায্য প্রার্থনা করা হয়, আর যদি সে সত্যিকার অর্থেই শারঈআতের জ্ঞানের অধিকারী হয়, তবে শয়তান কখনো তাকে জানাবে না যে, তার অনুসারীদের কাছে তার রূপে কোনো জিনকে হাজির করা হয়েছে বা তার সাহায্য প্রার্থনা করা হয়েছে। কিন্তু সাহায্য প্রার্থনাকৃত ব্যক্তি যদি দুর্বল ইলমের অধিকারী হয়, তবে শয়তান তার কাছে তার অনুসারীদের আবেদন পৌঁছে দেয় এবং তার জবাব সেইসব সাহায্যপ্রার্থীদের কাছেও পৌঁছে দেয়। এভাবে মূর্খ ব্যক্তিরা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, তাদের পীর-বুজুর্গ বা সাধু বহুদূর থেকেও তাদের আবেদন শুনতে পান ও জবাব প্রদান করেন! অথচ বাস্তবতা হলো উভয়ের মাঝে মধ্যস্থতা করেছে শয়তান!
অনেকের ক্ষেত্রেই এগুলো ঘটে স্বপ্নের মাধ্যমে অথবা গায়েবি আওয়াজের মাধ্যমে। যাদের সাথে এসব ঘটনা ঘটেছে তাদের অনেকে বর্ণনা করেছে, 'পানি বা কাচের স্ফটিকের মতো কিছু একটা নিয়ে আমার সামনে হাজির করা হলো, এরপর আমি যা দেখতে চেয়েছি তার ছবি সেখানে ভেসে উঠল। এভাবে আমি আমার কথা সেসব লোকের কাছে পৌঁছে দিলাম। আর বহু দূরে অবস্থানকারী ও আমার সাহায্যপ্রার্থী সাথিদের কথাও সেখানে ভেসে উঠল, এরপর আমি তাদের উদ্দেশে আমার জবাব প্রদান করলাম।'
যেসব বুজুর্গদের সাথে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে তাদেরকে অনেকে বলে, আপনারা মিথ্যাবাদী! হাতসাফাই ও কারসাজির মাধ্যমে এগুলো ঘটিয়েছেন, যেভাবে ভণ্ড জাদুকর ও ধোঁকাবাজ ব্যক্তিরা গায়ে তেল মেখে আগুনে প্রবেশ করে বা কখনো লেবুর ছিলকা, ব্যাঙের তেল বা অন্যান্য কৌশল প্রয়োগ করে। এ ধরনের অভিযোগ শুনে তারা আশ্চর্য হয়ে যায় এবং বলে, আল্লাহর কসম! আমরা এসব কৌশলের কিছুই জানি না! এমতাবস্থায় একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি তাদেরকে বলে, আপনার দাবিতে আপনি সত্যবাদী কিন্তু এসব ঘটনা শয়তানের কারসাজিতে ঘটেছে। এরপর আল্লাহ যাদেরকে কবুল করেন, তারা সত্য স্বীকার করে নেয় এবং পূর্বের ভ্রান্তি থেকে তাওবা করে। নানা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, পূর্বোক্ত ঘটনাগুলো শয়তানের প্রভাবে ঘটেছিল।
এগুলো যে শয়তানের প্রভাবে ঘটেছে, সেটা আরও স্পষ্ট হয় যখন তারা দেখতে পান এসব অলৌকিক ঘটনা কেবল বিদআত, আল্লাহর অবাধ্যতার মাধ্যমেই ঘটে; আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশিত পথ ও পদ্ধতির বৈধ ইবাদাত-বন্দেগিতে এসব ঘটনা দেখতে পাওয়া যায় না। এমতাবস্থায় তারা বুঝতে পারেন, এগুলো হলো সেই 'কারামাত' যা শয়তান তার আউলিয়াদের প্রতি সরবরাহ করে, এগুলো রহমানের আউলিয়াদের প্রতি প্রদানকৃত কারামাত নয়।
আল্লাহ তাআলাই সব বিষয়ে সর্বাধিক অবগত। তাঁর কাছেই আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে। তাঁর কাছেই সবকিছুর পরিসমাপ্তি। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক সমস্ত নবি ও রাসূলের সর্দার মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজন, সাথি-সঙ্গী, তাঁকে সাহায্যকারী, তাঁর খলীফা, অনুগত ও অনুসারীদের প্রতি।
বিচার দিবসে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাঁর শাফায়াত দিয়ে ধন্য করুন, আমিন।
টিকাঃ
[৫১৩] সূরা আহকাফ, ৪৬: ২৯-৩২。
[৫১৪] সূরা জিন, ৭২: ১-৭。
[৫১৫] সূরা জিন, ৭২: ৬-৮。
[৫১৬] সূরা জিন, ৭২: ৯。
[৫১৭] সূরা শুআরা, ২৬: ২১০-২১২。
[৫১৮] সূরা জিন, ৭২: ১০-১১。
[৫১৯] সূরা জিন, ৭২: ১২。
[৫২০] সূরা জিন, ৭২: ১৪-১৫。
[৫২১] সূরা জিন, ৭২: ১৪-২২。
[৫২২] সূরা জিন, ৭২: ২৩-২৪。
[৫২৩] বিস্তারিত দেখুন: মুসলিম, ৪৫০。
[৫২৪] সূরা রহমান, ৫৫: ১৩。
[৫২৫] তিরমিযি, ৩৩৪৫, গরীব。
[৫২৬] মুসলিম, ৪৫০。
[৫২৭] সূরা সাবা, ৩৪: ৪০-৪১。