📄 মু’তাযিলা ও মুরজিয়াদের বিভ্রান্তির খণ্ডন
সুতরাং যারা বলে, 'কাবীরা গুনাহকারী ব্যক্তি চিরস্থায়ী জাহান্নামি' এবং পূর্বোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা করে যে, কেবল অগ্রবর্তী ব্যক্তিরাই জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যারা আমলে মধ্যপন্থী ও যারা নিজেদের ওপর অত্যাচারী, তারা কখনো জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না—যেমন ব্যাখ্যা করে মুতাযিলারা। ঠিক এর বিপরীত ব্যাখ্যা করে মুরজিয়ারা। তারা বলে, কাবীরা গুনাহগাররা কখনোই জাহান্নামে প্রবেশ করবে না! সকল কাবীরা গুনাহকারী ব্যক্তি কোনো শাস্তি ভোগ না করেই জান্নাতে প্রবেশ করবে! এই উভয় মতবাদই উম্মাহর সালাফে সালেহীন ও সমস্ত ইমামদের ইজমা এবং নবি ﷺ-এর সুপ্রমাণিত বহু হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক। এ ক্ষেত্রে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।
দুইটি আয়াতের মাধ্যমে মু'তাযিলা ও মুরজিয়াদের মিথ্যাচার ফাঁস হয়ে যায়;
(প্রথম আয়াত) : إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاءُ وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا ) 'নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে লোক তাঁর সাথে শরীক করে। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। আর যে লোক অংশীদার সাব্যস্ত করল আল্লাহর সাথে, সে যেন অপবাদ আরোপ করল।'[৯৬]
দেখুন, এখানে আল্লাহ তাআলা জানাচ্ছেন, তিনি শিরকের গুনাহ ক্ষমা করেন না। এ ছাড়া অন্য যেকোনো গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। এই আয়াত অনুসারে যদি কেউ মু'তাযিলাদের মতো বলে, এখানে তাওবাকারীদের (প্রতি সাধারণ ক্ষমার) কথা বলা হয়েছে, তবে সেটা সঠিক নয়। কারণ, যে ব্যক্তি শিরক থেকে তাওবা করে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। আবার শিরক ছাড়া অন্যান্য গুনাহ থেকে তাওবা করলেও আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দেন। এখানে ইচ্ছার কোনো সম্পর্ক নেই। (সুতরাং সুস্পষ্ট হলো, এই আয়াতে তাদের কথা বলা হয়েছে, যারা গুনাহ থেকে কখনো তাওবা না করে মৃত্যুবরণ করেছে। সে ক্ষেত্রে যদি তাদের গুনাহ শিরকের পর্যায়ভুক্ত হয়, তবে সেটা কখনো ক্ষমা করা হবে না। এরচেয়ে নিম্ন পর্যায়ের হলে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করবেন, তাকে ক্ষমা করবেন)।
তাওবাকারীদের ক্ষমা করা প্রসঙ্গে অন্যত্র আল্লাহ বলেন, (দ্বিতীয় আয়াত) قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ 'বলুন, হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের ওপর যুলুম করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।'[৯৭]
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা কোনো শর্ত বা সীমাবদ্ধতা ছাড়াই সকল গুনাহের প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছেন। বান্দা তাওবা করলে আল্লাহ যেকোনো গুনাহ ক্ষমা করেন, যেমন-শিরক থেকে তাওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করেন, কাবীরা গুনাহ থেকে তাওবা করলেও আল্লাহ ক্ষমা করেন, যে কেউ যেকোনো গুনাহ থেকে তাওবা করুক আল্লাহ ক্ষমা করবেন।
সুতরাং তাওবা সম্পর্কিত (সূরা যুমার, ৩৯ : ৫৩) আয়াতে কোনো শর্ত ছাড়াই সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা প্রদান করা হয়েছে কিন্তু পূর্বের আয়াতে (সূরা নিসা, ৪:৪৮) শর্তসাপেক্ষে ও সীমাবদ্ধ ক্ষমার ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
সূরা নিসার আয়াতে উল্লেখিত 'সীমিত ক্ষমা' হতে শিরকের অপরাধকে সুনির্দিষ্টভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে (শিরক থেকেও যেগুলো ভয়াবহ অপরাধ যেমন, আল্লাহ তাআলাকে নিষ্ক্রিয় মনে করা, সেগুলোও যে ক্ষমা থেকে বাদ পড়বে তা খুলে বলার প্রয়োজন পড়ে না) আর অন্যান্য গুনাহর ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে ও আল্লাহর সিদ্ধান্ত অনুসারে ক্ষমার ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
উল্লেখিত আয়াত দুটির মাধ্যমে সেসব লোকের ভ্রান্তি সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়ে, যারা সকল গুনাহের ক্ষেত্রেই আল্লাহর নিঃশর্ত ক্ষমার ঘোষণা দেয় অথবা বলে, গুনাহর কারণে কাউকে শাস্তি দেওয়া হবে না। কারণ, বিষয়টি যদি এমনই হতো তাহলে আল্লাহ তাআলা বলতেন না, তিনি কিছু লোককে ক্ষমা করবেন এবং কিছুকে ক্ষমা করবেন না। এ ছাড়া, যদি নিজের ওপর যুলুমকারী প্রত্যেকের সকল অপরাধ বিনা তাওবায় এবং গুনাহ দূরকারী নেক আমল করা ছাড়াই যদি ক্ষমা করে দেয়া হতো, তবে আল্লাহ তাআলা তাদের প্রতি ক্ষমাকে শর্তসাপেক্ষে ও নিজের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল বলে ঘোষণা করতেন না। আল্লাহ বলেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاءُ وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا )
'নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে লোক তাঁর সাথে শরীক করে। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। আর যে লোক আল্লাহর সাথে শিরক করল, সে যেন মহা অপবাদ আরোপ করল।[৯৮]
এই আয়াত হতে প্রমাণিত হয়, আল্লাহ কিছু লোককে ক্ষমা করবেন এবং কিছুকে ক্ষমা করবেন না (অন্যথায়, 'যার জন্য তিনি ইচ্ছা করবেন'-এই আয়াত অর্থহীন হতো। আর আল্লাহর কিতাবে অর্থহীন কিছু নেই)। সুতরাং মুসলিম উম্মাহর সকল গুনাহগারের প্রত্যেকেই বিনা শাস্তিতে জান্নাত পেয়ে যাবে—এমন দাবি বাতিল।
টিকাঃ
[৯৬] সূরা নিসা, ৪:৪৮。
[৯৭] সূরা যুমার, ৩৯: ৫৩。
[৯৮] সূরা নিসা, ৪ : ৪৮。