📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 নবিদের মর্যাদার স্তরভেদ

📄 নবিদের মর্যাদার স্তরভেদ


অগ্রবর্তী ও নৈকট্যপ্রাপ্তদের সাথে ডান দিকের বান্দাদের স্তরভেদের মতো নবিদের মর্যাদাতেও স্তরভেদ দেখা যায়; যেমন, কেউ ছিলেন আল্লাহর বান্দা-রাসূল, আবার কেউ ছিলেন বাদশা-নবি। আল্লাহ তাআলা মুহাম্মাদ ﷺ-কে একজন বান্দা-রাসূল এবং একজন বাদশা-নবি হওয়ার মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন। তিনি বান্দা-রাসূল হওয়াকেই বেছে নিয়েছিলেন। [৮৫]
বাদশা-নবিদের মধ্যে আছেন দাউদ, সুলাইমান ও তাঁদের ন্যায় অন্যান্য নবিগণ। সুলাইমান আলাইহিস সালাম-এর ঘটনা উল্লেখ করে আল্লাহ তাআলা বলেন,
قَالَ رَبِّ اغْفِرْ لِي وَهَبْ لِي مُلْكًا لَّا يَنبَغِي لِأَحَدٍ مِّن بَعْدِي إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ * فَسَخَّرْنَا لَهُ الرِّيحَ تَجْرِى بِأَمْرِهِ رُخَاءً حَيْثُ أَصَابَ وَالشَّيَاطِينَ كُلَّ بَنَّاءٍ وَغَوَّاصٍ وَآخَرِينَ مُقَرَّنِينَ فِي الْأَصْفَادِ هَذَا عَطَاؤُنَا فَامْنُنْ أَوْ أَمْسِكْ بِغَيْرِ حِسَابٍ
'সুলাইমান বললেন, হে আমার পালনকর্তা, আমাকে মাফ করুন এবং আমাকে এমন সাম্রাজ্য দান করুন, যা আমার পরে আর কেউ পেতে পারবে না। নিশ্চয় আপনি পরম দাতা। তখন আমি বাতাসকে তাঁর অনুগত করে দিলাম, যা তাঁর হুকুমে অবাধে প্রবাহিত হতো, যেখানে সে পৌঁছাতে চাইত। আর সকল শয়তানকে তাঁর অধীন করে দিলাম অর্থাৎ, যারা ছিল প্রাসাদ নির্মাণকারী ও ডুবুরি। এবং অন্য আরও অনেককে অধীন করে দিলাম, যারা আবদ্ধ থাকত শৃঙ্খলে। এগুলো আমার অনুগ্রহ। অতএব, এগুলো কাউকে দাও অথবা নিজে রেখে দাও—এর কোনো হিসেব দিতে হবে না।'[৮৬]
অর্থাৎ আপনি যাকে ইচ্ছা দান করতে পারেন, যাকে ইচ্ছা প্রত্যাখ্যান করতে পারেন, আপনার কাজের হিসাব নেওয়ার মতো কেউ নেই। এ জন্য বাদশা-নবিরা আল্লাহ তাআলার আদেশ পালন করেন এবং নিষেধকৃত বিষয় পরিহার করেন। এরপর অন্যান্য ক্ষেত্রে তারা স্বাধীনভাবে নিজেদের দুনিয়াবি শক্তি ও সম্পদ ব্যবহার করেন। আল্লাহও এতে খুশি থাকেন, ফলে তারা গুনাহমুক্ত থাকেন।
আর যিনি আল্লাহর বান্দা-রাসূল, তিনি আল্লাহর আদেশ ব্যতীত নিজের ইচ্ছা অনুসারে কাউকে কিছু দিতে পারেন না কিংবা কিছু আটকেও রাখতে পারেন না; বরং আল্লাহ যাকে দেওয়ার জন্য আদেশ দেন তিনি কেবল তাকেই প্রদান করেন। যাকে দায়িত্ব ও ক্ষমতা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন, তাকেই তাতে নিযুক্ত করেন। এভাবে তার সমস্ত কর্মকাণ্ড আল্লাহ তাআলার ইবাদাতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। আবূ হুরায়রা বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, ‘... আমি তোমাদের দানও করি না এবং তোমাদের বঞ্চিতও করি না। আমি তো কেবল বণ্টনকারী (কাসিম), যেভাবে আদিষ্ট হই, সেভাবে ব্যয় করি.'[৮৭]
এ কারনেই আল্লাহ তাআলা শারঈ সম্পত্তির মালিকানাকে আল্লাহ এবং রাসূলের বলে বর্ণনা করেছেন,
قُلِ الْأَنفَالُ لِلَّهِ وَالرَّسُولِ
'...বলে দিন, গনীমতের মাল হলো আল্লাহর এবং রাসূলের...।'[৮৮]
مَّا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْ أَهْلِ الْقُرَى فَلِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ
'আল্লাহ জনপদবাসীদের কাছ থেকে তাঁর রাসূলকে যা দিয়েছেন, তা আল্লাহর, রাসূলের... '[৮৯]
وَاعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُم مِّن شَيْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَلِلرَّسُولِ
'...যা কিছু তোমরা গনীমত হিসেবে পাবে, তার এক-পঞ্চমাংশ হলো আল্লাহর জন্য, রাসূলের জন্য,...।'[৯০]
এ জন্য গনীমতের এসব সম্পত্তির বিষয়ে আলিমদের সুস্পষ্ট মতামত হলো, ইসলামি রাষ্ট্রপ্রধানদের ইজতিহাদ অনুসারে এগুলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পছন্দনীয় পথে ব্যয় করতে হবে। এটি ইমাম মালিক ও অন্যান্য সালাফদের মতামত। এটি ইমাম আহমাদেরও একটি মত। গনীমতের এক-পঞ্চমাংশ সম্পর্কে ইমাম শাফিয়ি ও ইমাম আহমাদের প্রসিদ্ধ মতামত হলো, একে পাঁচ ভাগে বিভক্ত করতে হবে।[৯১] তবে আবূ হানীফা -এর মতে, একে তিন ভাগে বিভক্ত করতে হবে।[৯২]
চলমান আলোচনার মাধ্যমে স্পষ্ট হলো, একজন বান্দা-রাসূলের মর্যাদা বাদশা-নবির থেকে উচ্চ। যেমন-ইবরাহীম, মূসা, ঈসা এবং মুহাম্মাদ-এর মর্যাদা ইউসুফ, দাউদ ও সুলাইমান-এর চেয়ে উচ্চ, যেমন অগ্রবর্তী ও নৈকট্যপ্রাপ্তদের মর্যাদা ডান দিকের নেককার বান্দাদের থেকে উচ্চ। সুতরাং সারকথা হলো, যারা আল্লাহর সকল আদেশ-নিষেধ পালন করার পর অন্যান্য আমলগুলো নিজের ইচ্ছানুসারে পালন করে, তারা দ্বিতীয় স্তরভুক্ত। আর যারা সবকিছু আল্লাহর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করে এবং বাধ্যতামূলক আমলগুলো পালনের পর নফল আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের প্রচেষ্টা করে, তারা প্রথম স্তরভুক্ত।

টিকাঃ
[৮৫] ইবনু হিব্বান, ৬৩৬৫; আহমাদ, ৭১৬০, সহীহ。
[৮৬] সূরা সাদ, ৩৮: ৩৫-৩৯。
[৮৭] বুখারি, ৩১১৭。
[৮৮] সূরা আনফাল, ৮: ১。
[৮৯] সূরা হাশর, ৫৯: ৭。
[৯০] সূরা আনফাল, ৮: ৪১。
[৯১] সূরা হাশর, ৫৯: ৭ নং আয়াতের বাকি অংশে পাঁচটি ভাগের উল্লেখ আছে。
[৯২] সারাখসি, আল-মাবসূত, ১০/৮-৯。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00