📄 ঈমান ও নিফাকের মিশ্রণ
কিছু মানুষের ঈমান খুব দুর্বল, যার সাথে নিফাক মিশ্রিত থাকে। আবদুল্লাহ ইবনু আম্র হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "চারটি স্বভাব যার মধ্যে থাকে সে খাঁটি মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোনো একটি স্বভাব থাকবে, তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থেকে যায়। সেগুলো হলো: ১. আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে, ২. কথা বললে মিথ্যা বলে, ৩. চুক্তি করলে ভঙ্গ করে, এবং ৪. বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীল গালি দেয়।”[৫৭]
আবূ হুরায়রা বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, 'ঈমানের সত্তরটিরও বেশি শাখা রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোত্তমটি হলো, 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলা, আর সর্বনিম্ন হলো রাস্তা হতে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করা। আর লজ্জাও ঈমানের একটি শাখা। [৫৮]
এই হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি, যাদের মধ্যে এসব বৈশিষ্ট্যের কোনোটি পাওয়া যাবে, তাদের মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ নিফাক রয়েছে, যতক্ষণ না তারা নিজেদের সংশোধন করে।
বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ সর্বোত্তম মুমিনদের একজন আবূ যার-কে বলেছেন, 'তোমার মধ্যে অজ্ঞতা যুগের কর্মকাণ্ড বিদ্যমান...।' তিনি বলেন, আমি বললাম, তা কি আমার বৃদ্ধ বয়সে? তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' [৫৯]
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, 'জাহেলি যুগের চারটি বিষয় আমার উম্মাতের মধ্যে পাওয়া যাবে—বংশ-মর্যাদার বড়াই (সামাজিক মর্যাদা বা অবস্থান নিয়ে গর্ব করা), অন্যের বংশের প্রতি কটাক্ষ, মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ করা ও নক্ষত্রের অসিলায় বৃষ্টি প্রার্থনা করা।'[৬০]
'মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি—যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে, আমানত রাখা হলে তা খিয়ানত করে।[৬১] এই হাদীসের অন্য সূত্রে এসেছে, '...যদিও সে সালাত আদায় করে, সিয়াম পালন করে এবং নিজেকে মুসলিম মনে করে।'[৬২]
ইবনু আবী মুলাইকা বর্ণনা করেছেন, 'আমি মুহাম্মাদ-এর তিরিশ জন সাহাবির সাক্ষাৎ পেয়েছি। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের ব্যাপারে নিফাকের ভয় করতেন।'[৬৩]
আল্লাহ জাল্লা শানুহু বলেন,
وَمَا أَصَابَكُمْ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعَانِ فَبِإِذْنِ اللَّهِ وَلِيَعْلَمَ الْمُؤْمِنِينَ وَلِيَعْلَمَ الَّذِينَ نَافَقُوا وَقِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا قَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوِ ادْفَعُوا قَالُوا لَوْ نَعْلَمُ قِتَالًا لَّا تَّبَعْنَاكُمْ هُمْ لِلْكُفْرِ يَوْمَئِذٍ أَقْرَبُ مِنْهُمْ لِلْإِيمَانِ يَقُولُونَ بِأَفْوَاهِهِم مَّا لَيْسَ فِي قُلُوبِهِمْ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا يَكْتُمُونَ
'আর যেদিন দু-দল সৈন্যের মোকাবিলা হয়েছে; সেদিন তোমাদের ওপর যা আপতিত হয়েছে তা আল্লাহর হুকুমেই হয়েছে এবং তা এ জন্য যে, তাতে ঈমানদারদের জানা যায়। আর যাতে মুনাফিকদের সনাক্ত করা যায়। আর তাদের বলা হলো, এসো, আল্লাহর রাহে লড়াই করো কিংবা শত্রুদের প্রতিহত করো। তারা বলেছিল, আমরা যদি জানতাম যে লড়াই হবে, তাহলে অবশ্যই তোমাদের সাথে থাকতাম; সেদিন তারা ঈমানের তুলনায় কুফরির কাছাকাছি ছিল। যা তাদের অন্তরে নেই তারা নিজের মুখে সে কথাই বলে। বস্তুত আল্লাহ ভালোভাবে জানেন তারা যা কিছু গোপন করে থাকে।'[৬৪]
এখানে, উহুদের যুদ্ধের ঘটনায় আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের ঈমান অপেক্ষা কুফরের অধিক নিকটবর্তী বলেছেন। এটি স্পষ্ট যে, তাদের ঈমানের সাথে কুফর মিশ্রিত থাকে তবে ঈমানের চেয়ে তাদের কুফর অধিক শক্তিশালী। অন্যদেরও ঈমানের সাথে কুফর মিশ্রিত থাকে কিন্তু তাদের কুফর অপেক্ষা ঈমান শক্তিশালী।
যেহেতু মুত্তাকী মুমিনদের আল্লাহর আউলিয়া বলে বর্ণনা করা হয়েছে [৬৫], সেহেতু এটি সুস্পষ্ট যে ঈমান ও তাকওয়ার মাত্রা অনুসারে আল্লাহর নৈকট্য (ওলায়াত) নির্ধারিত হয়। যার ঈমান ও তাকওয়া যত বেশি, সে আল্লাহর তত বেশি নৈকট্যপ্রাপ্ত। ঈমান ও তাকওয়ার পরিমাণ অনুসারে মানুষের অবস্থা বিভিন্ন রকম হয়। সে অনুসারে আল্লাহর নৈকটের পরিমাণও বিভিন্নরূপ হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَاِذَا مَآ اُنْزِلَتْ سُوْرَةٌ فَمِنْهُمْ مَّنْ يَّقُوْلُ اَيُّكُمْ زَادَتْهُ هٰذِهٖٓ اِيْمَانًا ۚ فَاَمَّا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا فَزَادَتْهُمْ اِيْمَانًا وَّهُمْ يَسْتَبْشِرُوْنَ وَاَمَّا الَّذِيْنَ فِيْ قُلُوْبِهِمْ مَّرَضٌ فَزَادَتْهُمْ رِجْسًا اِلٰى رِجْسِهِمْ وَمَاتُوْا وَهُمْ كٰفِرُوْنَ
'আর যখন কোনো সূরা অবতীর্ণ হয়, তখন তাদের কেউ কেউ বলে, এ সূরা তোমাদের মধ্যেকার ঈমান কতটা বৃদ্ধি করল? অতএব যারা ঈমানদার, এ সূরা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করেছে এবং তারা আনন্দিত হয়েছে।
বস্তুত যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে এটি তাদের কলুষের সাথে আরও কলুষ বৃদ্ধি করেছে এবং তারা কাফির অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করেছে।' [৬৬]
إِنَّمَا النَّسِيْٓءُ زِيَادَةٌ فِى الْكُفْرِ يُضَلُّ بِهِ الَّذِيْنَ كَفَرُوْا...
'এই মাস পিছিয়ে দেওয়ার কাজ কেবল কুফরির মাত্রা বৃদ্ধি করে, যার ফলে কাফিরগণ গোমরাহীতে পতিত হয়। [৬৭]
وَالَّذِيْنَ اهْتَدَوْا زَادَهُمْ هُدًى وَّاٰتٰهُمْ تَقْوٰهُمْ
'যারা হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়েছে, তাদের হিদায়াত আরও বেড়ে যায় এবং আল্লাহ তাদের তাকওয়া দান করেন।' [৬৮]
فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ فَزَادَهُمُ اللَّهُ مَرَضًا وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ بِمَا كَانُوا يَكْذِبُونَ *
'তাদের অন্তঃকরণ ব্যাধিগ্রস্ত আর আল্লাহ তাদের ব্যাধি আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। বস্তুত তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে ভয়াবহ আযাব, তাদের মিথ্যাচারের দরুন।'[৬৯]
এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন, একজন ব্যক্তি তার ঈমানের মাত্রা অনুসারে আল্লাহ তাআলার আংশিক নৈকট্য (ওলায়াত) লাভ করতে পারে, আবার একই সময়ে সে তার কুফর ও নিফাকের মাত্রা অনুসারে আল্লাহ তাআলার প্রতি শত্রুতার (আদাওয়াত) একটি অংশও ধারণ করতে পারে। আল্লাহ বলেন,
وَيَزْدَادَ الَّذِينَ آمَنُوا إِيمَانًا '...এবং মুমিনদের ঈমান বৃদ্ধি পায়।' [৭০]
لِيَزْدَادُوا إِيمَانًا مَّعَ إِيمَانِهِمْ '...যাতে তাদের ঈমানের সাথে আরও ঈমান বেড়ে যায়।' [৭১]
টিকাঃ
[৫৭] বুখারি, ৩৬; মুসলিম, ৫৮।
[৫৮] মুসলিম, ৩৫।
[৫৯] বুখারি, ৩০; মুসলিম, ১৬৬১।
[৬০] মুসলিম, ৯৩৪।
[৬১] বুখারি, ৩৩; মুসলিম, ৭৪।
[৬২] মুসলিম, ৫৯।
[৬৩] বুখারি, আত-তারীখুল কাবীর, ৫/১৩৭।
[৬৪] সূরা আলে ইমরান, ৩: ১৬৬-১৬৭।
[৬৫] দ্রষ্টব্য: সূরা ইউনুস, ১০: ৬২-৬৪।
[৬৬] সূরা তাওবা, ৯: ১২৪-১২৫।
[৬৭] সূরা তাওবা, ৯: ৩৭।
[৬৮] সূরা মুহাম্মাদ, ৪৭ : ১৭।
[৬৯] সূরা বাকারাহ, ২: ১০।
[৭০] সূরা মুদ্দাসির, ৭৪: ৩১।
[৭১] সূরা ফাতহ, ৪৮: ৪।
📄 বন্ধুত্ব ও শত্রুতার ভিত্তি
মুমিন মুত্তাকীরা আল্লাহর আউলিয়া। যেহেতু ঈমান ও তাকওয়ার ভিত্তিতে মানুষের স্তরভেদ আছে, সেহেতু এর ভিত্তিতে আল্লাহর নিকট মানুষের ওলায়াতও (নৈকট্য) বিভিন্ন রকমের হয়। অনুরূপভাবে, কুফর ও নিফাকের মাত্রা অনুসারে আল্লাহ তাআলার প্রতি দুশমনি ও দূরত্বের মাত্রা নির্ধারিত হয়।
ঈমান ও তাকওয়ার ভিত্তি হলো সকল নবি ও রাসূলের ওপর ঈমান আনা। তাদের প্রতি ঈমান আনা তখনই হবে যখন সমস্ত নবি ও রাসূলের শেষ নবি মুহাম্মাদ -এর প্রতি ঈমান আনা হবে। সুতরাং মুহাম্মাদ -এর প্রতি ঈমান আনা আল্লাহ তাআলার নাযিলকৃত সকল কিতাব ও সকল নবি-রাসূলের ওপর ঈমান আনাকে অন্তর্ভুক্ত করে।
অপরদিকে, কুফর ও নিফাকের ভিত্তি হলো আল্লাহ তাআলার নবিদের অস্বীকার করা এবং তাদের রিসালাত প্রত্যাখ্যান করা। যারা এতে কুফরি করবে তারা আখিরাতে শাস্তি ভোগ করবে। আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন, নবি-রাসূল পাঠানো ব্যতীত তিনি কাউকে শাস্তি প্রদান করবেন না। আল্লাহ বলেন,
مَّنِ اهْتَدَى فَإِنَّمَا يَهْتَدِى لِنَفْسِهِ وَمَن ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولًا
'যে কেউ সৎপথে চলে, তারা নিজের মঙ্গলের জন্যেই সৎপথে চলে। আর যে পথভ্রষ্ট হয়, তারা নিজের অমঙ্গলের জন্যেই পথভ্রষ্ট হয়। কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না। কোনো রাসূল না পাঠানো পর্যন্ত আমি কাউকেই শাস্তি দান করি না।' [৯৯]
إِنَّا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ كَمَا أَوْحَيْنَا إِلَى نُوحٍ وَالنَّبِيِّينَ مِن بَعْدِهِ وَأَوْحَيْنَا إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَعِيسَى وَأَيُّوبَ وَيُونُسَ وَهَارُونَ وَسُلَيْمَانَ وَآتَيْنَا دَاوُودَ زَبُورًا وَرُسُلًا قَدْ قَصَصْنَاهُمْ عَلَيْكَ مِن قَبْلُ وَرُسُلًا لَّمْ نَقْصُصْهُمْ عَلَيْكَ وَكَلَّمَ اللَّهُ مُوسَى تَكْلِيمًا رُسُلًا مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى اللَّهِ حُجَّةٌ بَعْدَ الرُّسُلِ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا
'আমি আপনার প্রতি ওহি পাঠিয়েছি, যেমন করে ওহি পাঠিয়েছিলাম নূহের প্রতি এবং সে সমস্ত نবি-রাসূলের প্রতি, যাঁরা তাঁর পরে প্রেরিত হয়েছেন। আর ওহি পাঠিয়েছি ইসমাঈল, ইবরাহীম, ইসহাক, ইয়াকূব ও তাঁর সন্তানবর্গের প্রতি এবং ঈসা, আইয়ূব, ইউনূস, হারূন ও সুলাইমানের প্রতি। আর আমি দাউদকে দান করেছি যাবুর গ্রন্থ।
এ ছাড়া এমন রাসূল পাঠিয়েছি, যাদের ইতিবৃত্ত আমি আপনাকে শুনিয়েছি ইতিপূর্বে এবং এমন রাসূল পাঠিয়েছি, যাদের বৃত্তান্ত আপনাকে শোনাইনি। আর আল্লাহ মূসার সাথে কথোপকথন করেছেন সরাসরি।
সুসংবাদদাতা ও ভীতি-প্রদর্শনকারী রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি, যাতে রাসূলগণের পরে আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপ করার মতো কোনো অবকাশ মানুষের জন্য না থাকে। আল্লাহ প্রবল পরাক্রমশীল, প্রাজ্ঞ।'[১০০]
تَكَادُ تَمَيَّزُ مِنَ الْغَيْظِ كُلَّمَا أُلْقِيَ فِيهَا فَوْجٌ سَأَلَهُمْ خَزَنَتُهَا أَلَمْ يَأْتِكُمْ نَذِيرٌ قَالُوا بَلَى قَدْ جَاءَنَا نَذِيرٌ فَكَذَّبْنَا وَقُلْنَا مَا نَزَّلَ اللَّهُ مِن شَيْءٍ إِنْ أَنتُمْ إِلَّا فِي ضَلَالٍ كبير
'ক্রোধে জাহান্নাম যেন ফেটে পড়বে। যখনই তাতে কোনো সম্প্রদায় নিক্ষিপ্ত হবে তখন তাদের তার সিপাহিরা জিজ্ঞাসা করবে। তোমাদের কাছে কি কোনো সতর্ককারী আগমন করেনি?
তারা বলবে, হ্যাঁ, আমাদের কাছে সতর্ককারী আগমন করেছিল, অতঃপর আমরা মিথ্যারোপ করেছিলাম এবং বলেছিলাম, আল্লাহ তাআলা কোনো কিছু নাযিল করেননি। তোমরা মহাবিভ্রান্তিতে পড়ে রয়েছ।' [১০১]
এখানে আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন, যখনই একটি দলকে আগুনে নিক্ষেপ করা হবে, তারা স্বীকার করবে তাদের কাছে সতর্ককারী এসেছিল কিন্তু তারা তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং যারা সতর্ককারী রাসূলের বার্তা অস্বীকার করেছে তারা ব্যতীত কাউকে আগুনে নিক্ষেপ করা হবে না। আল্লাহ তাআলা ইবলীস শয়তানের ব্যাপারে বলেন,
لَأَمْلَأَنَّ جَهَنَّمَ مِنكَ وَمِمَّن تَبِعَكَ مِنْهُمْ أَجْمَعِينَ
'তোর দ্বারা আর তাদের মধ্যে যারা তোর অনুসরণ করবে তাদের দ্বারা আমি জাহান্নাম পূর্ণ করব।' [১০২]
আল্লাহ তাআলা বলছেন, তিনি ইবলীস ও তার অনুসারীদের দিয়ে জাহান্নামের আগুন পরিপূর্ণ করবেন। সুতরাং তাদের দ্বারা যখন তা পূর্ণ করবেন তখন অন্য কেউ তাতে প্রবেশ করবে না। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, যাদের কোনো গুনাহ নেই তারা আগুনে প্রবেশ করবে না। কারণ, তারা শয়তানের অনুসরণ করেনি। একইভাব, আগের আয়াতের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে নবি-রাসূল আসার পর (সত্য প্রত্যাখ্যানে) কোনো ওজুহাত দেখানো চলবে না। এ ধরনের অস্বীকারকারীরা বাদে অন্যেরা আগুনে প্রবেশ করবে না।
টিকাঃ
[৯৯] সূরা ইসরা, ১৭: ১৫。
[১০০] সূরা নিসা, ৪: ১৬৩-১৬৫。
[১০১] সূরা মুল্ক, ৬৭: ৮-৯。
[১০২] সূরা সাদ, ৩৮: ৮৫。
📄 জান্নাতের বিভিন্ন মানযিল ও যমিনের মর্যাদা
কিছু মানুষ এমন রয়েছে, যারা নবি-রাসূলদের ওপর ব্যাপকতার সাথে সংক্ষিপ্ত (মুজমাল) ঈমান রাখে। আর বিস্তারিত (মুফাসসাল) ঈমানের ক্ষেত্রে, তাদের নিকট রাসূলের যে সমস্ত বার্তা বিস্তারিতভাবে পৌঁছে তারা তাতে বিস্তারিতভাবেই ঈমান রাখে এবং যা তাদের নিকট পৌঁছে না, তারা তা জানতে পারে না; ফলে ঈমানও আনে না। কিন্তু যদি জানতে পারত তাহলে ঈমান আনত। এ ক্ষেত্রে তারা সংক্ষিপ্ত ঈমান রাখে। এই শ্রেণির ব্যক্তিরা যা জানে—আল্লাহর আদেশ-নিষেধ—তা-ই যদি ঈমান ও তাকওয়ার সাথে আদায় করতে থাকে তাহলে তারাও আল্লাহর আউলিয়াদের মধ্যে শামিল হবে। ঈমান ও তাকওয়া অনুসারে আল্লাহর সাথে তাদের ‘ওলায়াত’ নির্ধারিত হবে। আর তারা যেসব বিষয়ের বার্তা পায়নি, সেগুলোর ওপর বিস্তারিত জ্ঞানার্জন ও ঈমান না আনার জন্য শাস্তিযোগ্য অপরাধী বলে সাব্যস্ত হবে না। কারণ, আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে কিছু করার হুকুম প্রদান করেন না। তাই সেগুলো পালনে ব্যর্থ হলেও তাকে শাস্তি দেওয়া হবে না। তবে যেসব বিষয় তার থেকে ছুটে গেছে তার সমানুপাতে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে ঘাটতি থেকে যাবে। অপরদিকে যে ব্যক্তি নবিদের রিসালাতে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জন করল এবং সবিস্তারে ঈমান আনল, তদনুসারে আমল করল, সে ঈমান ও ওলায়াতে পূর্বোক্ত ব্যক্তির থেকে অধিকতর পূর্ণাঙ্গতা অর্জন করল। তবে উভয়েই আল্লাহর আউলিয়া।
জান্নাতের অনেক স্তর রয়েছে। স্তরগুলোর মধ্যেও রয়েছে বিস্তর ব্যবধান। মুমিন, মুত্তাকী ও আল্লাহর আউলিয়ারা তাদের ঈমান ও আমলের অনুপাতে বিভিন্ন স্তর লাভ করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
مَّن كَانَ يُرِيدُ الْعَاجِلَةَ عَجَّلْنَا لَهُ فِيهَا مَا نَشَاءُ لِمَن تُرِيدُ ثُمَّ جَعَلْنَا لَهُ جَهَنَّمَ يَصْلَاهَا مَذْمُومًا مَّدْحُورًا وَمَنْ أَرَادَ الْآخِرَةَ وَسَعَى لَهَا سَعْيَهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَبِكَ كَانَ سَعْيُهُم مَّشْكُورًا كُلَّا نُمِدُّ هَؤُلَاءِ وَهَؤُلَاءِ مِنْ عَطَاءِ رَبِّكَ وَمَا كَانَ عَطَاءُ رَبِّكَ مَحْظُورًا انظُرْ كَيْفَ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَلَلْآخِرَةُ أَكْبَرُ دَرَجَاتٍ وَأَكْبَرُ تَفْضِيلًا
'যে কেউ ইহকাল কামনা করে, আমি সেসব লোককে যা ইচ্ছা সত্বর দিয়ে দিই। অতঃপর তাদের জন্যে জাহান্নাম নির্ধারণ করি। ওরা তাতে নিন্দিত-বিতাড়িত অবস্থায় প্রবেশ করবে।
আর যারা পরকাল কামনা করে এবং মুমিন অবস্থায় তার জন্য যথাযথ চেষ্টা-সাধনা করে, এমন লোকদের চেষ্টা স্বীকৃত হয়ে থাকে।
এদের এবং ওদের প্রত্যেককে আমি আপনার পালনকর্তার দান পৌঁছে দিই এবং আপনার পালকর্তার দান অবধারিত।
দেখুন, আমি তাদের একদলকে অপরের ওপর কীভাবে শ্রেষ্ঠত্ব দান করলাম। পরকাল তো নিশ্চয়ই মর্তবায় শ্রেষ্ঠ এবং ফযীলতে শ্রেষ্ঠতম।' [১০৩]
এখানে আল্লাহ তাআলা ব্যাখ্যা করেছেন, যারা আখিরাতের তুলনায় দুনিয়া কামনা করে, তিনি তাদের দুনিয়াবি রিযক বাড়িয়ে দেন। ইহজগতে তিনি নেককার মুত্তাকী নির্বিশেষে কারও রিযক আটকে রাখেন না। এরপর আল্লাহ বলেছেন, 'দেখুন, আমি তাদের একদলকে অপরের ওপর কীভাবে শ্রেষ্ঠত্ব দান করলাম। পরকাল তো নিশ্চয়ই মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ এবং ফযীলতে শ্রেষ্ঠতম। 'অর্থাৎ, এর মাধ্যমে স্পষ্ট হলো, দুনিয়ার মতো আখিরাতেও বিভিন্ন স্তর ও মর্যাদার পার্থক্য থাকবে। আর দুনিয়ার তুলনায় আখিরাতের স্তরভেদ আরও ব্যাপক।
যেভাবে আল্লাহ তার সকল ঈমানদার বান্দাদের মধ্যে মর্যাদার পার্থক্য উল্লেখ করেছেন, সেভাবে নবিদের মধ্যেও মর্যাদার পার্থক্য উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ বলেন,
تِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ مِّنْهُم مَّن كَلَّمَ اللَّهُ وَرَفَعَ بَعْضَهُمْ دَرَجَاتٍ وَآتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَاتِ وَأَيَّدْنَاهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ
‘এই রাসূলগণ—আমি তাদের কাউকে কারও ওপর মর্যাদা দিয়েছি। তাদের মধ্যে কেউ তো হলো তারা যার সাথে আল্লাহ কথা বলেছেন, আর কারও মর্যাদা উচ্চতর করেছেন এবং আমি মারইয়াম-তনয় ঈসাকে প্রকৃষ্ট মু’জিযা দান করেছি এবং তাকে শক্তি দান করেছি ‘রূহুল কুদুস’ অর্থাৎ জিবরীলের মাধ্যমে...’।[১০৪]
وَتَيْنَادَاوُودَ زَبُورًا * وَلَقَدْ فَضَّلْنَا بَعْضَ النَّبِيِّينَ عَلَى بَعْضٍ
'...আমি তো কতক নবিকে কতক নবির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি এবং দাউদকে যাবুর দান করেছি’।[১০৫]
আবূ হুরায়রা হতে বর্ণিত আছে, নবি বলেছেন, 'দুর্বল মুমিনের তুলনায় শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে উত্তম ও অতি প্রিয়। তবে উভয়ের মধ্যেই কল্যাণ রয়েছে। যা তোমার উপকারে আসে তা-ই পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করো। আল্লাহর নিকট সাহায্য চাও, অক্ষম হয়ো না। আর তোমার সাথে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো কিছু ঘটলে এরূপ বোলো না যে, যদি আমি এমন এমন করতাম তবে এ রকমটা ঘটত না; বরং এ রকম বলো, আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন এবং তিনি যা চেয়েছেন তা-ই করেছেন। কেননা, তোমার ‘লাও’ (যদি) শব্দটি শয়তানের কর্মের দুয়ার খুলে দেয়।[১০৬]
আবূ হুরায়রা ও আমর ইবনুল আস হতে বর্ণিত, নবি বলেছেন, 'বিচারক যখন ইজতিহাদ করে (চিন্তাভাবনা করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছার চেষ্টা করে) বিচার করে, অতঃপর সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়, তার জন্য রয়েছে দুটি পুরস্কার। আর সে যখন ইজতিহাদ করে বিচার করতে গিয়ে ভুল করে বসে তবুও তার জন্য রয়েছে একটি পুরস্কার’।[১০৭]
আল্লাহ বলেন,
وَمَا لَكُمْ أَلَّا تُنفِقُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلِلَّهِ مِيرَاثُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ لَا يَسْتَوِي مِّنَ الَّذِينَ أَنفَقُوا مِن مِّنكُم مَّنْ أَنفَقَ مِن قَبْلِ الْفَتْحِ وَقَاتَلَ أُولَبِكَ أَعْظَمُ دَرَجَةً بَعْدُ وَقَاتَلُوا وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَى وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ
'তোমাদের আল্লাহর পথে ব্যয় করাতে কিসে বাধা দেয়, যখন আল্লাহই নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের উত্তরাধিকারী? তোমাদের মধ্যে যে মক্কা বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে ও জিহাদ করেছে, সে সমান নয়। এরূপ লোকদের মর্যাদা বড় তাদের অপেক্ষা, যারা পরে ব্যয় করেছে ও জিহাদ করেছে। তবে আল্লাহ উভয়কে কল্যাণের ওয়াদা দিয়েছেন। তোমরা যা করো, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত।' [১০৮]
لَّا يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ وَالْمُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ فَضَّلَ اللَّهُ الْمُجَاهِدِينَ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ عَلَى الْقَاعِدِينَ دَرَجَةً وَكُلًّا وَعَدَ اللَّهُ الْحُسْنَى وَفَضَّلَ اللَّهُ الْمُجَاهِدِينَ عَلَى الْقَاعِدِينَ أَجْرًا عَظِيمًا * دَرَجَاتٍ مِّنْهُ وَمَغْفِرَةً وَرَحْمَةً وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا ) ج
'গৃহে উপবিষ্ট মুমিন-যাদের কোনো সংগত ওযর নেই এবং ওইসব মুমিন, যারা জান ও মাল দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে-সমান নয়। যারা জান ও মাল দ্বারা জিহাদ করে, আল্লাহ তাদের পদমর্যাদা বাড়িয়ে দিয়েছেন গৃহে উপবিষ্টদের তুলনায় এবং প্রত্যেকের সাথেই আল্লাহ কল্যাণের ওয়াদা করেছেন। আল্লাহ মুজাহিদীনকে উপবিষ্টদের ওপর মহান প্রতিদানে শ্রেষ্ঠ করেছেন। এগুলো তাঁর পক্ষ থেকে পদমর্যাদা, ক্ষমা ও করুণা। আল্লাহ ক্ষমাশীল ও করুণাময়।' [১০৯]
أَجَعَلْتُمْ سِقَايَةَ الْحَاجَ وَعِمَارَةَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ كَمَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَجَاهَدَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ لَا يَسْتَوُونَ عِندَ اللَّهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ ) الَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجَاهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ أَعْظَمُ دَرَجَةً عِندَ اللَّهِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ * يُبَشِّرُهُمْ رَبُّهُم بِرَحْمَةٍ مِنْهُ وَرِضْوَانٍ وَجَنَّاتٍ لَّهُمْ فِيهَا نَعِيمٌ مُّقِيمٌ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا إِنَّ اللَّهَ عِندَهُ أَجْرٌ عَظِيمٌ ) ج
'তোমরা কি হাজীদের পানি সরবরাহ ও মাসজিদুল-হারাম আবাদকরণকে সেই লোকের সমান মনে করো, যে ঈমান রাখে আল্লাহ ও শেষ-দিনের প্রতি এবং যুদ্ধ করেছে আল্লাহর রাহে? এরা আল্লাহর দৃষ্টিতে সমান নয়, আর আল্লাহ যালিম লোকদের হিদায়াত করেন না। যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর রাহে নিজেদের জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করেছে, তাদের বড় মর্যাদা রয়েছে আল্লাহর কাছে, আর তারাই সফলকাম। তাদের সুসংবাদ দিচ্ছেন তাদের পরওয়ারদেগার স্বীয় দয়া ও সন্তোষের এবং জান্নাতের, সেখানে আছে তাদের জন্য স্থায়ী শান্তি। তথায় তারা থাকবে চিরদিন। নিঃসন্দেহে আল্লাহর কাছে আছে মহাপুরস্কার।' [১১০]
مَّنْ هُوَ قَانِتٌ آنَاءَ اللَّيْلِ سَاجِدًا وَقَابِما يَحْذَرُ الْآخِرَةَ وَيَرْجُو رَحْمَةَ رَبِّهِ قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُولُو الْأَلْبَابِ
'যে ব্যক্তি রাত্রিকালে সাজদার মাধ্যমে অথবা দাঁড়িয়ে ইবাদাত করে, পরকালের আশঙ্কা রাখে এবং তার পালনকর্তার রহমত প্রত্যাশা করে, সে কি তার সমান, যে এরূপ করে না? বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না; তারা কি সমান হতে পারে? চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান।' [১১১]
يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ
'... তোমাদের মধ্যে যারা ঈমানদার এবং যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দেবেন। আল্লাহ খবর রাখেন যা কিছু তোমরা করো।' [১১২]
টিকাঃ
[১০৩] সূরা ইসরা, ১৭: ১৮-২১。
[১০৪] সূরা বাকারাহ, ২: ২৫৩。
[১০৫] সূরা ইসরা, ১৭:৫৫。
[১০৬] মুসলিম, ২৬৬৪。
[১০৭] বুখারি, ৭৩৫২。
[১০৮] সূরা হাদীদ, ৫৭: ১০。
[১০৯] সূরা নিসা, ৪: ৯৫-৯৬。
[১১০] সূরা তাওবা, ৯: ১৯-২২。
[১১১] সূরা যুমার, ৩৯: ৯。
[১১২] সূরা মুজাদালা, ৫৮: ১১。
📄 হাকীকাত ও শারীয়াত
সত্যিকারের দ্বীন হলো বিশ্ব-জাহানের রবের দ্বীন। যে দ্বীনের ব্যাপারে সমস্ত নবি- রাসূলগণ একমত যদিও-বা তাদের নিজ নিজ আইন-কানুন (শারীআত) ভিন্ন ভিন্ন ছিল। নিম্নোক্ত আয়াতে শিরআহ' (شِرْعَةً) শব্দটি দ্বারা শারীআতই উদ্দেশ্য। আল্লাহ বলেন,
لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا
'...আমি তোমাদের প্রত্যেককে একটি আইন (শারীআত) ও স্পষ্ট পথ (منهاج) দিয়েছি।...' [২০৪]
ثُمَّ جَعَلْنَاكَ عَلَى شَرِيعَةٍ مِّنَ الْأَمْرِ فَاتَّبِعْهَا وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَ الَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ (১৮) إِنَّهُمْ لَن يُغْنُوا عَنكَ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا وَإِنَّ الظَّالِمِينَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَاللَّهُ وَلِيُّ الْمُتَّقِينَ (১৯)
'এরপর আমি আপনাকে রেখেছি ধর্মের এক বিশেষ শারীআতের ওপর। অতএব, আপনি এর অনুসরণ করুন এবং অজ্ঞদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করবেন না। আল্লাহর সামনে তারা আপনার কোনো উপকারে আসবে না। যালিমরা একে অপরের বন্ধু। আর আল্লাহ মুত্তাকীদের বন্ধু।' [২০৫]
এখানে 'মিনহাজ' অর্থ পথ। আল্লাহ বলেন,
وَأَن لَّوِ اسْتَقَامُوا عَلَى الطَّرِيقَةِ لَأَسْقَيْنَاهُم مَّاءً غَدَقًا لِتَفْتِنَهُمْ فِيهِ وَمَن يُعْرِضْ عَن ذِكْرِ رَبِّهِ يَسْلُكْهُ عَذَابًا صَعَدًا *
'আর এই প্রত্যাদেশ করা হয়েছে যে, তারা যদি সত্যপথে কায়েম থাকত, তবে আমি তাদের প্রচুর পানি বর্ষণে সিক্ত করতাম। যাতে এ ব্যাপারে তাদের পরীক্ষা করি। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তিনি তাকে উদীয়মান আযাবে পরিচালিত করবেন।' [২০৬]
সুতরাং শারীআতের দৃষ্টান্ত নদীর মতো আর 'মিনহাজ' (কর্মপদ্ধতি) হলো নদীতে বয়ে চলা স্রোতধারা, যা দ্বীনের হাকীকাতের দিকে ছুটে চলেছে। আর তা হলো: শরীকহীন একক আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করা। এটাই ইসলামের হাকীকাত। কেননা, ইসলামের মূলকথা হচ্ছে, ব্যক্তি সর্বান্তঃকরণে একমাত্র বিশ্বজাহানের রব আল্লাহর নিকটই আত্মসমর্পণ করবে অন্য কারও নিকট না। যে ব্যক্তি আল্লাহ বাদে অন্য কারও নিকট আত্মসমর্পণ করে সে একজন মুশরিক এবং আল্লাহ তাঁর সাথে শিরকের গুনাহ ক্ষমা করেন না।
যারা অহংকারবশত আল্লাহর নিকট সর্বান্তঃকরণে আত্মসমর্পণ করে না তাদের ব্যাপারে তিনি বলেন,
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ
'তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি সাড়া দেব। যারা আমার ইবাদাতে অহংকার করে তারা সত্বরই জাহান্নামে দাখিল হবে লাঞ্ছিত হয়ে।' [২০৭]
এই দ্বীন (ইসলাম) আগের ও পরের সমস্ত নবি-রাসূলদের দ্বীন। আল্লাহ বলেন,
وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ )
'যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন তালাশ করে, কস্মিনকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখিরাতে সে ক্ষতিগ্রস্ত।' [২০৮]
এটি একটি ব্যাপক অর্থবোধক আয়াত, যা সর্বযুগে সর্বস্থানে প্রযোজ্য।
ইবরাহীম, ইয়াকূব ও তাদের গোত্রসমূহ, মূসা, ঈসা ও তাদের শিষ্যবৃন্দ সকলের দ্বীন ছিল ইসলাম। আর এর সারকথা হলো, একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করা এবং তার সাথে কিছু শরীক না করা। নূহ-এর উক্তি উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন,
وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ نُوحٍ إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ يَا قَوْمِ إِن كَانَ كَبُرَ عَلَيْكُم مَّقَامِي وَتَذْكِيرِي بِآيَاتِ اللَّهِ فَعَلَى اللَّهِ تَوَكَّلْتُ فَأَجْمِعُوا أَمْرَكُمْ وَشُرَكَاءَكُمْ ثُمَّ لَا يَكُنْ أَمْرُكُمْ عَلَيْكُمْ غُمَّةً ثُمَّ اقْضُوا إِلَى وَلَا تُنظِرُونِ فَإِن تَوَلَّيْتُمْ فَمَا سَأَلْتُكُم مِّنْ أَجْرٍ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى اللَّهِ وَأُمِرْتُ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْمُسْلِمِينَ
'...হে আমার সম্প্রদায়, যদি তোমাদের মাঝে আমার অবস্থিতি এবং আল্লাহর আয়াতসমূহের মাধ্যমে নাসীহত করা ভারী বলে মনে হয়ে থাকে, তবে আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করছি। এখন তোমরা সবাই মিলে নিজেদের কর্ম সাব্যস্ত করো এবং এতে তোমাদের শরীকদের সমবেত করে নাও, যাতে তোমাদের মাঝে নিজেদের কাজের ব্যাপারে কোনো সন্দেহ-সংশয় না থাকে। অতঃপর আমার সম্পর্কে যা কিছু করার করে ফেলো এবং আমাকে অব্যাহতি দিয়ো না। তারপরও যদি বিমুখতা অবলম্বন করো, তবে আমি তোমাদের কাছে কোনো রকম বিনিময় কামনা করি না। আমার বিনিময় হলো আল্লাহর দায়িত্বে। আর আমার প্রতি নির্দেশ রয়েছে যেন আমি আনুগত্য অবলম্বন করি। [২০৯]
وَمَن يَرْغَبُ عَن مِلَّةِ إِبْرَاهِيمَ إِلَّا مَن سَفِهَ نَفْسَهُ وَلَقَدِ اصْطَفَيْنَاهُ فِي الدُّنْيَا وَإِنَّهُ فِي الْآخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِينَ إِذْ قَالَ لَهُ رَبُّهُ أَسْلِمْ قَالَ أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ وَوَصَّى بِهَا إِبْرَاهِيمُ بَنِيهِ وَيَعْقُوبُ يَا بَنِيَّ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى لَكُمُ الدِّينَ فَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
'যে নিজেকে বোকা প্রতিপন্ন করে সে ব্যতীত ইবরাহীমের ধর্ম থেকে কে মুখ ফেরায়? নিশ্চয়ই আমি তাকে পৃথিবীতে মনোনীত করেছি এবং সে পরকালে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত। স্মরণ করো! যখন তাকে তার পালনকর্তা বললেন, অনুগত হও। সে বলল, আমি বিশ্বপ্রতিপালকের অনুগত হলাম।
এরই ওসীয়াত করেছে ইবরাহীম তার সন্তানদের এবং ইয়াকূবও যে, হে আমার সন্তানগণ, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের জন্য এ ধর্মকে মনোনীত করেছেন। কাজেই তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না।' [২১০]
وَقَالَ مُوسَى يَا قَوْمِ إِن كُنتُمْ آمَنتُم بِاللَّهِ فَعَلَيْهِ تَوَكَّلُوا إِن كُنتُم مُّسْلِمِينَ *
'আর মূসা বলল, হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা যদি আল্লাহর ওপর ঈমান এনে থাকো, তবে তারই ওপর ভরসা করো যদি তোমরা আজ্ঞাবহ হয়ে থাকো।' [২১১]
যখন ফিরআউনের জাদুকররা মূসা-এর বার্তার হাকীকাত বুঝতে পেরে বলেছিল,
رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَتَوَفَّنَا مُسْلِمِينَ )
'হে আমাদের রব, আমাদের জন্য ধৈর্যের দ্বার খুলে দাও এবং আমাদের মুসলিম হিসেবে মৃত্যু দান করো।' [২১২]
ইউসুফ বলেছেন,
تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ ))
'... আমাকে ইসলামের ওপর মৃত্যুদান করুন এবং আমাকে স্বজনদের সাথে মিলিত করুন।[২১৩]
সাবার রানী বিলকীস ইসলাম গ্রহণের পর বলেছিল,
رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي وَأَسْلَمْتُ مَعَ سُلَيْمَانَ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
'হে আমার রব, আমি তো নিজের প্রতি যুলুম করেছি, আমি সুলাইমানের সাথে বিশ্বজাহানের পালনকর্তা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করলাম'। [২১৪]
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّا أَنزَلْنَا التَّوْرَاةَ فِيهَا هُدًى وَنُورٌ يَحْكُمُ بِهَا النَّبِيُّونَ الَّذِينَ أَسْلَمُوا لِلَّذِينَ هَادُوا وَالرَّبَّانِيُّونَ وَالْأَحْبَارُ
'আমি তাওরাত অবতীর্ণ করেছি। এতে হিদায়াত ও আলো রয়েছে। আল্লাহর আজ্ঞাবহ পয়গম্বর, দরবেশ ও আলিমরা এর মাধ্যমে ইয়াহূদীদের ফায়সালা দিতেন'। [২১৫]
ঈসা -এর শিষ্যরা বলেছিলেন,
آمَنَّا بِاللَّهِ وَاشْهَدْ بِأَنَّا مُسْلِمُونَ
'আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি। আর তুমি সাক্ষী থাকো যে, আমরা হুকুম কবুল করে নিয়েছি'। [২১৬]
সুতরাং সকল নবিদের পথ এক ও অভিন্ন, যদিও তাদের আইন-কানুনে বা শারীআতে কিছুটা ভিন্নতা ছিল। বুখারি ও মুসলিম উল্লেখিত হাদীসে এসেছে, নবি বলেছেন, 'আমরা নবিগণ একই দ্বীনের অনুসারী'। [২১৭]
আল্লাহ তাআলা বলেন,
شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ كَبُرَ عَلَى الْمُشْرِكِينَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَيْهِ اللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَن يَشَاءُ وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَن يُنِيبُ )
'তিনি তোমাদের জন্যে দ্বীনের ক্ষেত্রে সে পথই নিধারিত করেছেন, যার আদেশ দিয়েছিলেন নূহকে, যা আমি প্রত্যাদেশ করেছি আপনার প্রতি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে এই মর্মে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করো এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি কোরো না। আপনি মুশরিকদের যে বিষয়ের প্রতি আমন্ত্রণ জানান, তা তাদের কাছে দুঃসাধ্য বলে মনে হয়। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন এবং যে তার অভিমুখী হয়, তাকে পথ প্রদর্শন করেন।' [২১৮]
يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ وَإِنَّ هَذِهِ أُمَّتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَأَنَا رَبُّكُمْ فَاتَّقُونِ فَتَقَطَّعُوا أَمْرَهُم بَيْنَهُمْ زُبُرًا كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ *
'হে রাসূলগণ, পবিত্র বস্তু আহার করুন এবং সৎকাজ করুন। আপনারা যা করেন সে বিষয়ে আমি পরিজ্ঞাত। আপনাদের এই উম্মাত সব তো একই দ্বীনের অনুসারী এবং আমি আপনাদের পালনকর্তা; অতএব আমাকে ভয় করুন। অতঃপর মানুষ তাদের বিষয়কে বহুধা বিভক্ত করে দিয়েছে। প্রত্যেক সম্প্রদায় নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে আনন্দিত হচ্ছে।' [২১৯]
টিকাঃ
[২০৪] সূরা মাইদা, ৫: ৪৮।
[২০৫] সূরা জাসিয়া, ৪৫: ১৮-১৯।
[২০৬] সূরা জিন, ৭২: ১৬-১৭।
[২০৭] সূরা গাফির, ৪০: ৬০।
[২০৮] সূরা আ-লি ইমরান, ৩: ৮৫।
[২০৯] সূরা ইউনুস, ১০: ৭১-৭২।
[২১০] সূরা বাকারাহ, ২: ১৩০-১৩২।
[২১১] সূরা ইউনুস, ১০: ৮৪।
[২১২] সূরা আ'রাফ, ৭: ১২৬।
[২১৩] সূরা ইউসুফ, ১২: ১০১।
[২১৪] সূরা নামল, ২৭:৪৪।
[২১৫] সূরা মাইদা, ৫: ৪৪।
[২১৬] সূরা আলে ইমরান, ৩: ৫২।
[২১৭] বুখারি, ৩৪৪১; মুসলিম, ২৩৬৫।
[২১৮] সূরা শূরা, ৪২: ১৩।
[২১৯] সূরা মুমিনূন, ২৩: ৫১-৫৩।