📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 সাধুদের অসাধুতা

📄 সাধুদের অসাধুতা


আরও জেনে রাখা প্রয়োজন, একজন ব্যক্তি যুহদ (দুনিয়াত্যাগ, সংসারবিরাগ), ইবাদাত-বন্দেগি, জ্ঞান ইত্যাদির মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতার যত উচ্চস্তরেই পৌঁছাক না কেন, মুহাম্মাদ-এর আনীত সমস্ত ওহির ওপর বিশ্বাস না করলে সে কখনো ঈমানদার হতে পারবে না, আল্লাহর আউলিয়া হওয়া তো আরও অসম্ভব। যেমন: ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানদের জ্ঞানী ও সংসারত্যাগী এবং তাদের অনুসারীরা এই দলের অন্তর্ভুক্ত।
অনুরূপভাবে, আরব, আজম, তুরস্ক, ভারত কিংবা অন্যান্য স্থানের সাধু-সন্ন্যাসীদেরও যত জ্ঞান, কলা-কৌশল ও ধর্মীয় ভক্তি আছে বলে মনে করা হোক না কেন, এরা কিছুতেই মুহাম্মাদ-এর রিসালাতে বিশ্বাসী নয়, এরা সবাই কাফির ও আল্লাহর দুশমন; যদিও অনেকে তাদের 'রহমানের আউলিয়া' মনে করুক না কেন! অনুরূপভাবে, পারস্যের জরাথ্রুস্টরাও (অগ্নিউপাসক) কাফির, গ্রিসের সাধুরাও কাফির-যেমন অ্যারিস্টটল ও অন্যান্যরা। এরা সবাই মূর্তি ও গ্রহ-নক্ষত্রের পূজারি।
অ্যারিস্টটল ছিল ঈসা-এর তিন শ বছর আগের মানুষ, সে ছিল সম্রাট আলেকজান্ডারের একজন মন্ত্রী। এই আলেকজান্ডার রোম ও গ্রিসের বিখ্যাত সম্রাট, যার পিতার নাম ফিলিপস। ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানদের ইতিহাসে সে একজন বিখ্যাত ব্যক্তি। উল্লেখ্য, কুরআনে যাকে জুলকারনাইন নামে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি আলেকজান্ডার নন, যদিও কিছু মানুষ ভুলবশত তা-ই মনে করে। যেমন: অনেকে মনে করে অ্যারিস্টটল ছিল জুলকারনাইনের একজন মন্ত্রী! আসলে জুলকারনাইনকেও মাঝে মাঝে আলেকজান্ডার বলে ডাকা হতো বলে তারা দুজনকে একই মানুষ মনে করেছে। ইবনু সিনা ও অন্যান্য ব্যক্তিও প্রকাশ্য এই ভুলটি করেছেন।
যাই হোক, বাস্তবতা ভিন্ন। সূরা কাহফে উল্লেখিত জুলকারনাইন আর আলেকজান্ডার কখনোই এক ব্যক্তি নয়, দুজন পৃথক ব্যক্তি। আলেকজান্ডার ছিল জুলকারনাইনের অনেক পরবর্তী সময়ের মানুষ, আর অ্যারিস্টটল ছিল আলেকজান্ডারের মন্ত্রী। আলেকজান্ডার কোনো দেয়াল নির্মাণ করেনি এবং ইয়াজুজ-মাজুজের দেশ সফর করেনি। আলেকজান্ডারের ইতিহাস রোমান ইতিহাসে সুপরিচিত ও সংরক্ষিত। তার অধীনে অ্যারিস্টটল মন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছে।

📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 শয়তান যাদের সহচর

📄 শয়তান যাদের সহচর


জিন-শয়তানরা এসব লোকের সাথে সংযুক্ত হয় এবং তাদের কাছে আসে যেন কিছু চমকপ্রদ ঘটনার মাধ্যমে তাদের মানুষের সামনে আকর্ষণীয় হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। শয়তানের সাহায্য নিয়ে এসব লোকেরা নানারকম আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটায়, বাস্তবে এগুলো জাদুবিদ্যা। এরা একপ্রকার জাদুকর বা ভবিষ্যৎ-বক্তা (কাহিন) ছাড়া আর কিছুই নয়, যাদের কাছে শয়তান অবতরণ করে। আল্লাহ বলেন,
هَلْ أُنَبِّئُكُمْ عَلَى مَن تَنَزَّلُ الشَّيَاطِينُ تَنَزَّلُ عَلَى كُلِّ أَفَاكٍ أَثِيمٍ يُلْقُونَ السَّمْعَ وَأَكْثَرُهُمْ كَاذِبُونَ
'আমি আপনাকে বলব কি, কার নিকট শয়তানরা অবতরণ করে? তারা অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক মিথ্যাবাদী, গুনাহগারের ওপর। তারা শ্রুত কথা এনে দেয় এবং তাদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী। [৫৩]
এরা সবাই নানাবিধ গোপন খবর প্রকাশ করে ও চমকপ্রদ কাজ ঘটায়। কিন্তু এরা নবি-রাসূলদের অনুসারী নয়। প্রয়োজন অনুসারে এরা মিথ্যাচার করে। এদের সাহায্যকারী শয়তানরাও তাদের কাছে মিথ্যা বলে। তাদের কাজকর্ম গুনাহ ও অনাচারে পরিপূর্ণ।
এগুলোর বিভিন্ন প্রকার রয়েছে। যেমন: শিরক, যুলুম, অশ্লীলতা কিংবা ইবাদাত- বন্দেগিতে বাড়াবাড়ি ও মনগড়া বিষয় অনুসরণ করা।
এসব অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘনের কারণে জিন-শয়তানরা তাদের কাছে আসে এবং তাদের সাথি হয়ে যায়। এভাবে এই লোকেরা শয়তানের আউলিয়াতে পরিণত হয়, এরা কিছুতেই আল্লাহর আউলিয়া নয়। আল্লাহ বলেন,
وَمَن يَعْشُ عَن ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ *
'যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়, আমি তার জন্যে এক শয়তান নিয়োজিত করে দিই, অতঃপর সে-ই হয় তার সঙ্গী।'[৫৪]
'রহমানের যিক্র' বা আল্লাহর স্মরণের মধ্যে রয়েছে সেসব স্মরণিকা, যা তিনি তাঁর রাসূলের কাছে নাযিল করেছেন, যেমন: কুরআন। কাজেই যে কুরআনে বিশ্বাস করে না কিংবা তাতে উল্লেখিত তথ্য, খবর ও হুকুম-আহকামে বিশ্বাস করে না, সে রহমানের যিক্র (স্মরণ) থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ফলে একজন শয়তান তার সার্বক্ষণিক সাথি হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন,
وَهَذَا ذِكْرٌ مُّبَارَكٌ أَنزَلْنَاهُ
'এবং এটা একটা বরকতময় উপদেশ, যা আমি নাযিল করেছি।'[৫৫]
وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِى فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْمَى وَقَدْ كُنتُ بَصِيرًا قَالَ كَذَلِكَ أَتَتْكَ آيَاتُنَا فَنَسِيتَهَا وَكَذَلِكَ الْيَوْمَ تُنسَى )
'এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কিয়ামাতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব।
সে বলবে, হে আমার পালনকর্তা, আমাকে কেন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলেন? আমি তো চক্ষুষ্মান ছিলাম। আল্লাহ বলবেন, যেমনিভাবে তোমার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, অতঃপর তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে, তেমনিভাবে আজ তোমাকে ভুলে যাব।' [৫৬]
লক্ষ করুন, এই আয়াতগুলো থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে, 'আমার স্মরণ' (ذِكْرِي) ও 'আমার আয়াতসমূহ' শব্দগুলোর মাধ্যমে কুরআনকে বোঝানো হয়েছে। সুতরাং কোনো ব্যক্তি যদি দিনরাত সর্বদা মুখে আল্লাহর স্মরণ করতে থাকে (আল্লাহর স্মরণকে আরবিতে ذِكْرٌ 'যিক্র' বলা হয়) এবং কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলার মাধ্যমে নিজেকে প্রশিক্ষিত করে কিংবা ধারাবাহিক ইবাদাত-বন্দেগি ও ভক্তি-সাধনায় উৎকর্ষ অর্জন করে কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর আল্লাহর নাযিলকৃত যিক্র (কুরআন) অনুসরণ করে না, তবে সে শয়তানের আউলিয়াদের একজন। সে যতই অলৌকিক বিষয় দেখাক না কেন, এমনকি পানির ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া বা শূন্যে ভেসে যাওয়া ইত্যাদি। জিন- শয়তানের সাহায্য নিয়ে সে শূন্যে ভেসে বেড়াতে বা পানির ওপর বিচরণ করতে সক্ষম। সামনে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।

টিকাঃ
[৫৩] সূরা শুআরা, ২৬: ২২১-২২৩。
[৫৪] সূরা যুখরুফ, ৪৩: ৩৬。
[৫৫] সূরা আম্বিয়া, ২১:৫০。
[৫৬] সূরা ত্বহা, ২০: ১২৪-১২৬。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00