📄 রাসূলের অনুসরণ ব্যতীত কোনো আধ্যাত্মিক উন্নতি নেই
লক্ষণীয় বিষয় হলো, মুনাফিকদের মতো কিছু লোক আছে যারা কেবল বাহ্যিকভাবে রাসূলুল্লাহর বার্তা গ্রহণের ভান করে কিন্তু ভেতরে এমন-সব (কুফরি-শিরকি) বিশ্বাস রাখে যে, তাদের ঈমান নষ্ট হয়ে যায়। এসব লোকেরা নিজেদের কিংবা তাদের মতো অন্যদের 'আল্লাহর আউলিয়া' বলে দাবি করে, অথচ তাদের অন্তরে কুফরি লুকিয়ে থাকে। ঔদ্ধত্য অথবা মূর্খতার কারণে তারা রাসূলুল্লাহর আনীত বিষয়গুলো প্রত্যাখ্যান করে। এদের মতো অনেক ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানও নিজেদের আল্লাহর আউলিয়া মনে করে! তাদের কেউ কেউ মুহাম্মাদ-কে আল্লাহর রাসূল বলেও বিশ্বাস করে কিন্তু এরপর বলে, 'তাঁকে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের কাছে পাঠানো হয়নি, এ জন্য তাঁকে অনুসরণ করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়! কেননা, আমাদের কাছে তাঁর আগে অনেক নবি-রাসূল এসেছে'-এরা সবাই কাফির, যদিও নিজেদের আল্লাহর প্রিয় বান্দা (আউলিয়া) মনে করুক না কেন!
আল্লাহর আউলিয়া তো কেবল তারাই, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাঁর 'ওলায়াত' ঘোষণা করেছেন,
أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ
'মনে রেখো, যারা আল্লাহর বন্ধু, তাদের না কোনো ভয়-ভীতি আছে, না তারা চিন্তান্বিত হবে। যারা ঈমান এনেছে এবং ভয় করতে রয়েছে।' [৪৮]
ঈমান অর্জনের অত্যাবশ্যকীয় বিষয়ের মধ্যে রয়েছে—আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাব, নবি-রাসূল ও বিচার-দিবসের প্রতি ঈমান। মুমিনরা আল্লাহর প্রেরিত প্রত্যেক নবি ও প্রত্যেক কিতাবের ওপর ঈমান রাখে। আল্লাহ বলেন,
قُولُوا آمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنزِلَ إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَى وَعِيسَى وَمَا أُوتِيَ النَّبِيُّونَ مِن رَّبِّهِمْ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ فَإِنْ آمَنُوا بِمِثْلِ مَا آمَنتُم بِهِ فَقَدِ اهْتَدَوا وَإِن تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا هُمْ فِي شِقَاقٍ فَسَيَكْفِيكَهُمُ اللَّهُ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
'তোমরা বলো, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর ওপর এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের প্রতি এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব এবং তদীয় বংশধরের প্রতি এবং মূসা, ঈসা, অন্যান্য নবিকে পালনকর্তার পক্ষ থেকে যা দান করা হয়েছে, সেগুলোর ওপর। আমরা তাঁদের মধ্যে পার্থক্য করি না। আমরা তাঁরই আনুগত্যকারী।
অতএব তারা যদি ঈমান আনে তোমাদের ঈমান আনার মতো, তবে তারা সুপথ পাবে। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তারাই হঠকারিতায় রয়েছে। সুতরাং এখন তাদের জন্যে আপনার পক্ষ থেকে আল্লাহই যথেষ্ট। তিনিই সর্বশ্রোতা, মহাজ্ঞানী। [৪৯]
آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مِن رَّبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ كُلُّ آمَنَ بِاللَّهِ وَمَلَا بِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِن رُسُلِهِ وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِنَا رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنتَ مَوْلَانَا فَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ
'রাসূল বিশ্বাস রাখেন ওই সমস্ত বিষয় সম্পর্কে, যা তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুমিনরাও সবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি এবং তাঁর নবিগণের প্রতি। তারা বলে, আমরা তাঁর নবিদের মধ্যে কোনো তারতম্য করি না। তারা বলে, আমরা শুনলাম এবং মানলাম। আমরা তোমার ক্ষমা চাই, হে আমাদের পালনকর্তা, তোমারই দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।
আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোনো কাজের ভার দেন না, সে তা-ই পায় যা সে উপার্জন করে এবং তা-ই তার ওপর বর্তায়, যা সে করে। হে আমাদের পালনকর্তা, যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে আমাদের অপরাধী কোরো না। হে আমাদের পালনকর্তা, এবং আমাদের ওপর এমন দায়িত্ব অর্পণ কোরো না, যেমন আমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর অর্পণ করেছ, হে আমাদের রব, এবং আমাদের দ্বারা ওই বোঝা বহন কোরো না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নাই। আমাদের পাপ মোচন করো, আমাদের ক্ষমা করো এবং আমাদের প্রতি দয়া করো। তুমিই আমাদের রব। সুতরাং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করো।'[৫০]
الم ذَلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ * الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ وَالَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ وَبِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ أُولَبِكَ عَلَى هُدًى مِّن رَّبِّهِمْ وَأُولَبِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ )
'আলিফ-লাম-মীম। এটি সেই কিতাব যাতে কোনোই সন্দেহ নেই। মুত্তাকীদের জন্য এটি পথ প্রদর্শনকারী, যারা অদেখা বিষয়ের ওপর ঈমান আনে এবং সালাত প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি তাদের যে রিস্ক দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে এবং যারা ঈমান এনেছে সেসব বিষয়ের ওপর, যা কিছু তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং সেসব বিষয়ের ওপর, যা তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে। আর আখিরাতকে যারা নিশ্চিত বলে বিশ্বাস করে। তারাই নিজেদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সুপথপ্রাপ্ত, আর তারাই যথার্থ সফলকাম।'[৫১]
সুতরাং ঈমান অর্জনের একটি অত্যাবশ্যকীয় শর্ত হলো মুহাম্মাদ -কে শেষ নবি ও রাসূল হিসেবে বিশ্বাস করা। তাঁর পর আর কোনো নবি আসবেন না এবং তিনি জিন-ইনসান সকলের কাছেই আল্লাহর প্রেরিত বার্তাবাহক। যে তাঁর ওপর নাযিলকৃত বিষয়ের প্রতি ঈমান রাখে না সে তো মুমিনই নয়, আল্লাহর আউলিয়াদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়া তো পরের কথা! আর যে ব্যক্তি রাসূলের আনীত বিষয়ের প্রতি আংশিক ঈমান রাখে-কিছু অংশ বিশ্বাস করে ও কিছু প্রত্যাখ্যান করে-সেও কাফির। আল্লাহ বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيُرِيدُونَ أَن يُفَرِّقُوا بَيْنَ اللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيَقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَن يَتَّخِذُوا بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلًا أُولَبِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ حَقًّا وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُّهِينًا وَالَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَلَمْ يُفَرِّقُوا بَيْنَ أَحَدٍ مِنْهُمْ أُولَبِكَ سَوْفَ يُؤْتِيهِمْ أُجُورَهُمْ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا
'যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারী তদুপরি আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি বিশ্বাসে তারতম্য করতে চায় আর বলে যে, আমরা কতককে বিশ্বাস করি আর কতককে প্রত্যাখ্যান করি এবং এরই মধ্যবর্তী কোনো পথ অবলম্বন করতে চায়। প্রকৃতপক্ষে এরাই সত্য প্রত্যাখ্যানকারী। আর যারা সত্য প্রত্যাখ্যানকারী তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি লাঞ্ছনাদায়ক আযাব।
আর যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর ওপর, তাঁর রাসূলের ওপর এবং তাঁদের কারও প্রতি ঈমান আনতে গিয়ে কাউকে বাদ দেয়নি, শীঘ্রই তাদের প্রতিদান দেওয়া হবে। বস্তুত আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়ালু। [৫২]
ঈমানের অন্তর্ভুক্ত বিষয়ের মধ্যে আরও রয়েছে, সৃষ্টিজগতের কাছে আল্লাহর আদেশ- নিষেধ পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে নবিদের বিশ্বাস করা। তাদের প্রতিশ্রুতি, সুসংবাদ, সতর্কতা এবং হালাল-হারামের ওপর ঈমান রাখা। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যেসবের বৈধতা দিয়েছেন সেগুলো হালাল, আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা নিষেধ করেছেন তা হারাম। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা নির্ধারিত করেছেন সেটাই আমাদের দ্বীন (জীবনবিধান, পথ-পদ্ধতি, আদর্শ)। কাজেই, কোনো ব্যক্তি যদি দাবি করে মুহাম্মাদ -এর পথ ব্যতীত অন্য কোনো ওলির পথে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা সম্ভব তবে নিঃসন্দেহে সে একজন কাফির এবং শয়তানের ওলি।
টিকাঃ
[৪৮] সূরা ইউনুস, ১০: ৬২-৬৩。
[৪৯] সূরা বাকারাহ, ২: ১৩৬-১৩৭。
[৫০] সূরা বাকারাহ, ২: ২৮৫-২৮৬。
[৫১] সূরা বাকারাহ, ২: ১-৫。
[৫২] সূরা নিসা, ৪: ১৫০-১৫২。
📄 সাধুদের অসাধুতা
আরও জেনে রাখা প্রয়োজন, একজন ব্যক্তি যুহদ (দুনিয়াত্যাগ, সংসারবিরাগ), ইবাদাত-বন্দেগি, জ্ঞান ইত্যাদির মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতার যত উচ্চস্তরেই পৌঁছাক না কেন, মুহাম্মাদ-এর আনীত সমস্ত ওহির ওপর বিশ্বাস না করলে সে কখনো ঈমানদার হতে পারবে না, আল্লাহর আউলিয়া হওয়া তো আরও অসম্ভব। যেমন: ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানদের জ্ঞানী ও সংসারত্যাগী এবং তাদের অনুসারীরা এই দলের অন্তর্ভুক্ত।
অনুরূপভাবে, আরব, আজম, তুরস্ক, ভারত কিংবা অন্যান্য স্থানের সাধু-সন্ন্যাসীদেরও যত জ্ঞান, কলা-কৌশল ও ধর্মীয় ভক্তি আছে বলে মনে করা হোক না কেন, এরা কিছুতেই মুহাম্মাদ-এর রিসালাতে বিশ্বাসী নয়, এরা সবাই কাফির ও আল্লাহর দুশমন; যদিও অনেকে তাদের 'রহমানের আউলিয়া' মনে করুক না কেন! অনুরূপভাবে, পারস্যের জরাথ্রুস্টরাও (অগ্নিউপাসক) কাফির, গ্রিসের সাধুরাও কাফির-যেমন অ্যারিস্টটল ও অন্যান্যরা। এরা সবাই মূর্তি ও গ্রহ-নক্ষত্রের পূজারি।
অ্যারিস্টটল ছিল ঈসা-এর তিন শ বছর আগের মানুষ, সে ছিল সম্রাট আলেকজান্ডারের একজন মন্ত্রী। এই আলেকজান্ডার রোম ও গ্রিসের বিখ্যাত সম্রাট, যার পিতার নাম ফিলিপস। ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানদের ইতিহাসে সে একজন বিখ্যাত ব্যক্তি। উল্লেখ্য, কুরআনে যাকে জুলকারনাইন নামে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি আলেকজান্ডার নন, যদিও কিছু মানুষ ভুলবশত তা-ই মনে করে। যেমন: অনেকে মনে করে অ্যারিস্টটল ছিল জুলকারনাইনের একজন মন্ত্রী! আসলে জুলকারনাইনকেও মাঝে মাঝে আলেকজান্ডার বলে ডাকা হতো বলে তারা দুজনকে একই মানুষ মনে করেছে। ইবনু সিনা ও অন্যান্য ব্যক্তিও প্রকাশ্য এই ভুলটি করেছেন।
যাই হোক, বাস্তবতা ভিন্ন। সূরা কাহফে উল্লেখিত জুলকারনাইন আর আলেকজান্ডার কখনোই এক ব্যক্তি নয়, দুজন পৃথক ব্যক্তি। আলেকজান্ডার ছিল জুলকারনাইনের অনেক পরবর্তী সময়ের মানুষ, আর অ্যারিস্টটল ছিল আলেকজান্ডারের মন্ত্রী। আলেকজান্ডার কোনো দেয়াল নির্মাণ করেনি এবং ইয়াজুজ-মাজুজের দেশ সফর করেনি। আলেকজান্ডারের ইতিহাস রোমান ইতিহাসে সুপরিচিত ও সংরক্ষিত। তার অধীনে অ্যারিস্টটল মন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছে।
📄 শয়তান যাদের সহচর
জিন-শয়তানরা এসব লোকের সাথে সংযুক্ত হয় এবং তাদের কাছে আসে যেন কিছু চমকপ্রদ ঘটনার মাধ্যমে তাদের মানুষের সামনে আকর্ষণীয় হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। শয়তানের সাহায্য নিয়ে এসব লোকেরা নানারকম আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটায়, বাস্তবে এগুলো জাদুবিদ্যা। এরা একপ্রকার জাদুকর বা ভবিষ্যৎ-বক্তা (কাহিন) ছাড়া আর কিছুই নয়, যাদের কাছে শয়তান অবতরণ করে। আল্লাহ বলেন,
هَلْ أُنَبِّئُكُمْ عَلَى مَن تَنَزَّلُ الشَّيَاطِينُ تَنَزَّلُ عَلَى كُلِّ أَفَاكٍ أَثِيمٍ يُلْقُونَ السَّمْعَ وَأَكْثَرُهُمْ كَاذِبُونَ
'আমি আপনাকে বলব কি, কার নিকট শয়তানরা অবতরণ করে? তারা অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক মিথ্যাবাদী, গুনাহগারের ওপর। তারা শ্রুত কথা এনে দেয় এবং তাদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী। [৫৩]
এরা সবাই নানাবিধ গোপন খবর প্রকাশ করে ও চমকপ্রদ কাজ ঘটায়। কিন্তু এরা নবি-রাসূলদের অনুসারী নয়। প্রয়োজন অনুসারে এরা মিথ্যাচার করে। এদের সাহায্যকারী শয়তানরাও তাদের কাছে মিথ্যা বলে। তাদের কাজকর্ম গুনাহ ও অনাচারে পরিপূর্ণ।
এগুলোর বিভিন্ন প্রকার রয়েছে। যেমন: শিরক, যুলুম, অশ্লীলতা কিংবা ইবাদাত- বন্দেগিতে বাড়াবাড়ি ও মনগড়া বিষয় অনুসরণ করা।
এসব অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘনের কারণে জিন-শয়তানরা তাদের কাছে আসে এবং তাদের সাথি হয়ে যায়। এভাবে এই লোকেরা শয়তানের আউলিয়াতে পরিণত হয়, এরা কিছুতেই আল্লাহর আউলিয়া নয়। আল্লাহ বলেন,
وَمَن يَعْشُ عَن ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ *
'যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়, আমি তার জন্যে এক শয়তান নিয়োজিত করে দিই, অতঃপর সে-ই হয় তার সঙ্গী।'[৫৪]
'রহমানের যিক্র' বা আল্লাহর স্মরণের মধ্যে রয়েছে সেসব স্মরণিকা, যা তিনি তাঁর রাসূলের কাছে নাযিল করেছেন, যেমন: কুরআন। কাজেই যে কুরআনে বিশ্বাস করে না কিংবা তাতে উল্লেখিত তথ্য, খবর ও হুকুম-আহকামে বিশ্বাস করে না, সে রহমানের যিক্র (স্মরণ) থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ফলে একজন শয়তান তার সার্বক্ষণিক সাথি হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন,
وَهَذَا ذِكْرٌ مُّبَارَكٌ أَنزَلْنَاهُ
'এবং এটা একটা বরকতময় উপদেশ, যা আমি নাযিল করেছি।'[৫৫]
وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِى فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْمَى وَقَدْ كُنتُ بَصِيرًا قَالَ كَذَلِكَ أَتَتْكَ آيَاتُنَا فَنَسِيتَهَا وَكَذَلِكَ الْيَوْمَ تُنسَى )
'এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কিয়ামাতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব।
সে বলবে, হে আমার পালনকর্তা, আমাকে কেন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলেন? আমি তো চক্ষুষ্মান ছিলাম। আল্লাহ বলবেন, যেমনিভাবে তোমার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, অতঃপর তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে, তেমনিভাবে আজ তোমাকে ভুলে যাব।' [৫৬]
লক্ষ করুন, এই আয়াতগুলো থেকে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে, 'আমার স্মরণ' (ذِكْرِي) ও 'আমার আয়াতসমূহ' শব্দগুলোর মাধ্যমে কুরআনকে বোঝানো হয়েছে। সুতরাং কোনো ব্যক্তি যদি দিনরাত সর্বদা মুখে আল্লাহর স্মরণ করতে থাকে (আল্লাহর স্মরণকে আরবিতে ذِكْرٌ 'যিক্র' বলা হয়) এবং কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলার মাধ্যমে নিজেকে প্রশিক্ষিত করে কিংবা ধারাবাহিক ইবাদাত-বন্দেগি ও ভক্তি-সাধনায় উৎকর্ষ অর্জন করে কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর আল্লাহর নাযিলকৃত যিক্র (কুরআন) অনুসরণ করে না, তবে সে শয়তানের আউলিয়াদের একজন। সে যতই অলৌকিক বিষয় দেখাক না কেন, এমনকি পানির ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া বা শূন্যে ভেসে যাওয়া ইত্যাদি। জিন- শয়তানের সাহায্য নিয়ে সে শূন্যে ভেসে বেড়াতে বা পানির ওপর বিচরণ করতে সক্ষম। সামনে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
টিকাঃ
[৫৩] সূরা শুআরা, ২৬: ২২১-২২৩。
[৫৪] সূরা যুখরুফ, ৪৩: ৩৬。
[৫৫] সূরা আম্বিয়া, ২১:৫০。
[৫৬] সূরা ত্বহা, ২০: ১২৪-১২৬。