📄 আসহাবুস সুফফা
এ ধরনের ভ্রান্ত বিশ্বাস পোষণকারীদের অনেকে এমনটাও বলে থাকে যে, আসহাবুস সুফফার (মাসজিদে নববীতে অবস্থানকারী দরিদ্র সাহাবায়ে কেরাম, যাদের কোনো বাড়ি বা থাকার স্থান ছিল না) জন্য নবি -এর কোনো প্রয়োজন নেই, তিনি তাদের প্রতি প্রেরিত হননি!
তাদের অনেকে এমনটাও বলে, আসহাবুস সুফফার কাছে আল্লাহ ওহি নাযিল করেছেন! তাদের সেসব গোপন ইলম দিয়েছেন, যা নবি -এর কাছে মি'রাজের রাতে নাযিল হয়েছিল! সুতরাং তাদের ভাষ্যমতে আসহাবুস সুফফার মর্যাদা রাসূলের মর্যাদার সমতুল্য!
এসব চরম মূর্খরা এটাও জানে না, মি'রাজের ঘটনা মদীনাতে নয়; বরং রাসূল মক্কায় থাকাকালে ঘটেছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন,
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
"পবিত্র ও সুমহান সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রিবেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত—যার চার দিকে আমি পর্যাপ্ত বারাকাহ দান করেছি, যাতে আমি তাঁকে আমার কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দিই। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।” [৪১]
উপরন্তু, রাসূলুল্লাহর হিজরতের আগ পর্যন্ত মদীনাতে আসহাবুস সুফফার কোনো অস্তিত্বই ছিল না। 'সুফফা' হলো মাসজিদে নববীর উত্তর প্রান্তে অবস্থিত একটি স্থান, যেখানে সেসব নওমুসলিম থাকতেন, যাদের মদীনাতে থাকার মতো কোনো পরিবার, বন্ধু বা নিকটাত্মীয় ছিল না। তখনকার ঘটনা ছিল, মুমিনরা নবিজির কাছে থাকার জন্য মদীনায় হিজরত করতেন, যদি মদীনায় থাকার মতো কোনো স্থান পেতেন তাহলে সেখানেই চলে যেতেন, আর সেটা সম্ভব না হলে তারা মাসজিদেই থাকতেন যতক্ষণ পর্যন্ত না অন্যত্র বসবাসের একটি স্থান পাওয়া যেত।
আসহাবুস সুফফার মধ্যে এমন কেউ নেই, যারা কখনো সুফফা ত্যাগ করেননি, বা অন্যকথায় সর্বদা মাসজিদে নববীর বারান্দায় বসবাস করেছেন—এমন কোনো দল নেই; বরং তাদের সংখ্যা হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটত। যেমন: কেউ কিছুদিন সেখানে বসবাসের পর মদীনার অন্যত্র চলে যেতেন।
সুফফার অধিবাসীরা অন্যান্য সাধারণ মুসলিমদের মতোই ছিলেন। দ্বীন বা ইলমের ক্ষেত্রে তাদের বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য ছিল না; বরং তাদের মধ্যে মুরতাদ হয়ে গেছে এমন ব্যক্তিও ছিল। যাদের পরবর্তী সময়ে রাসূলুল্লাহ -এর নির্দেশে হত্যা করা হয়েছিল। সহীহ বুখারিতে একদল আরবের ঘটনা এসেছে, যারা মদীনাতে আল্লাহর রাসূলের সাক্ষাতে এসেছিল। কিন্তু মদীনার পরিবেশের সাথে তারা নিজেদের মানিয়ে নিতে পারল না। তাদের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটল। সুস্থতার জন্য তারা দুধ পান করতে চাইল। রাসূলুল্লাহ তাদের উটের চারণভূমিতে গিয়ে (চিকিৎসা হিসেবে) সেখানকার উটের দুগ্ধ ও মূত্র পান করতে নির্দেশ দিলেন। পরবর্তী সময়ে যখন তারা সুস্থতা ফিরে পেল তখন উটের রাখালদের হত্যা করল এবং উটগুলো চুরি করে নিয়ে পালিয়ে গেল। (এভাবে তারা একত্রে মুরতাদ হওয়া, বিশ্বাসঘাতকতা, চুরি-ডাকাতি এবং হত্যার অপরাধ সংঘটিত করল।) তাদের ধরার জন্য রাসূলুল্লাহ বাহিনী প্রেরণ করলেন। গ্রেপ্তারের পর নির্দেশ দিলেন, উত্তপ্ত লোহার শলাকা দিয়ে যেন তাদের চোখ উপড়ে নেয়া হয়, হাত-পা কেটে ফেলা হয় এবং তাদের সেভাবেই মদীনার উত্তপ্ত-পাথুরে ভূমিতে মৃত্যু পর্যন্ত ফেলে রাখা হয়। তারা পানি পান করতে চাইলে তাদের যেন পান করানো না হয়।[৪২]
অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'এই লোকেরা সুফফাতে অবস্থান নিয়েছিল।'
সুতরাং, সেখানে যেমন এ ধরনের লোকেরাও থাকত তেমনি সাহাবিদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি সা'দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস-ও থাকতেন। যিনি সুফফার অধিবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মর্যাদাবান ব্যক্তি ছিলেন। পরে অবশ্য তিনি অন্যত্র চলে যান। সেখানে আবূ হুরায়রা-সহ কিছু সাহাবিও থাকতেন। [৪৩]
দেখুন, আনসারদের মধ্যে কেউই সুফফায় থাকতেন না। এ ছাড়াও মুহাজিরদের মধ্যে যারা প্রবীণ, যেমন: আবূ বকর, উমর, উসমান, আলি, তালহা, জুবাইর, আবদুর রহমান ইবনু আওফ, আবূ উবাইদা ইবনুল জাররাহ এবং তাদের মতো অন্যান্য বড় সাহাবিরাও কখনো আসহাবুস সুফফার অন্তর্ভুক্ত হননি।
বর্ণিত আছে যে, মুগীরা ইবনু শু'বাহ-এর এক পুত্র সুফফাতে বসবাস করেছিলেন, যার ব্যাপারে নবি বলেন, "সে সাত জনের একজন"। উলামাদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে বর্ণনাটি মিথ্যা ও বানোয়াট। যদিও আবূ নুআইম তার 'হিলইয়াতুল আউলিয়া' গ্রন্থে এটি উল্লেখ করেছেন!
টিকাঃ
[৪১] সূরা ইসরা, ১৭: ১。
[৪২] বুখারি, ২৩৩, ۱۵۰۱; মুসলিম, ১৬৭১。
[৪৩] 'তারীখু মান নাযালাস সুফফাহ' নামক কিতাবে আবূ আবদির রহমান সুলামি সুফফায় অবস্থানকারী সকল সাহাবিদের জীবনী একত্র করেছেন。
📄 আউলিয়া আবদাল সম্পর্কিত কিছু বানোয়াট বর্ণনা
যেসব বর্ণনাতে রাসূলুল্লাহ-এর সূত্রে এবং সুনির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করে কিছু রহস্যময় ব্যক্তির কথা বর্ণনা করা হয়েছে, সেগুলোও মিথ্যা ও বানোয়াট। সেসব বর্ণনার একটিও রাসূলের কথা বলে প্রমাণিত নয়। এ ধরনের জাল বর্ণনার উদাহরণ: বিভিন্ন বানোয়াট বর্ণনায় উল্লেখ করা হয় যে, আউলিয়া, আবদাল, নুকাবা (একবচন নকীব), নুজাবা (একবচন নজীব), আওতাদ বা আকতাব (একবচন কুতুব, আক্ষরিক অর্থ খুঁটি) এর সংখ্যা চার, সাত, বারো, চল্লিশ, সত্তর, তিন শ, তিন শ তেরো অথবা বর্ণনা করা হয় কেবল একজন কুতুব আছেন ইত্যাদি। এসবের একটিও বিশুদ্ধ নয়, এগুলো সব জাল ও দুর্বল বর্ণনা। কোনো সালাফকে 'আবদাল' শব্দটি বাদে উল্লেখিত পরিভাষার কোনোটি ব্যবহার করতে দেখা যায়নি।
ইমাম আহমাদ সংকলিত 'আল-মুসনাদ' গ্রন্থে একটি হাদীস দেখতে পাওয়া যায়, যেখানে 'আবদাল' শব্দের ব্যবহার রয়েছে। সেখানে চল্লিশ জন আবদালের কথা বলা হয়েছে, যারা শামে থাকবেন। যখনই তাদের একজন ইন্তিকাল করবে তখনই আল্লাহ তাআলা আরেকজনকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে দেন। [৪৪]
এ বর্ণনাকে আলি -এর প্রতি আরোপ করা হয়, কিন্তু বর্ণনাসূত্রটি বিচ্ছিন্ন এবং এটি প্রমাণিতও নয়। এ ছাড়াও জানা কথা যে, শামে অবস্থানকারী মুআবিয়া ও তাঁর বাহিনীর তুলনায় আলি ও তাঁর সাথিরা মর্যাদাবান ও সত্যের অধিক নিকটবর্তী ছিলেন। সুতরাং সকল আবদাল একত্রে মুআবিয়া -এর বাহিনীতে থাকতে পারেন না।
আবূ সাঈদ খুদরি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "মুসলিমদের মধ্যে যখন মতবিরোধ দেখা দেবে তখন একদল লোক দ্বীন থেকে বের হয়ে যাবে। দুই দলের মধ্যে যে দলটি সত্যের অধিক নিকটবর্তী, তারা তাদের হত্যা করবে।”[৪৫]
যে দলটি ইসলাম থেকে বের হয়ে গিয়েছিল তারা হলো খারেজি। খারেজিদের ঐতিহাসিক পটভূমি হলো, যখন আলি -এর খিলাফাতকালে মুসলিমদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলো, তখন তারা দলত্যাগ করল। পরবর্তী সময়ে আলি ইবনু আবী তালিব তাদের ফিতনা নির্মূল করেছিলেন। এভাবে বিশুদ্ধ হাদীসের মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, আলি ইবনু আবী তালিব ছিলেন মুআবিয়া ও তাঁর সাথিদের তুলনায় সত্যের অধিক নিকটবর্তী। তাহলে ভেবে দেখুন, দুই দলের মধ্যে যে দলটি অপেক্ষাকৃত কম মর্যাদাবান তাদের মধ্যে কীভাবে সবগুলো আবদাল থাকতে পারে?
রাসূলুল্লাহ -এর প্রতি আরোপকৃত মিথ্যাগুলোর মধ্যে আরেকটি হলো জনৈক কবির ঘটনা। তিনি নাকি একজন কবিকে বলতে শুনেছেন,
'লালসার সর্প দংশেছে মোর কলিজায় হায়, নেই কোনো হাকিম, নেই কোনো কবিরাজ, কে সারাবে আমায়! আছে শুধু মোর মাহবুব, তাঁর প্রেমে আছে উপশম আছে জাদুকরী নিরাময়!'
বর্ণনাটিতে বলা হয়, এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ এত আবেগতাড়িত হয়ে গেলেন যে, তাঁর কাঁধ থেকে চাদর পড়ে গেল!
আলিমদের ঐকমত্য অনুসারে এটি একটি বানোয়াট বর্ণনা। কতিপয় মিথ্যুক এর চেয়েও বানোয়াট বিষয় যুক্ত করেছেন, এই কবিতা শুনে তিনি এত আবেগতাড়িত হয়েছিলেন যে, চাদর ছিঁড়ে ফেলেন! এমনকি জিবরীল সেই ছেঁড়া চাদরের একটি অংশ আরশে ঝুলিয়ে দেন![৪৬]
এ ধরনের ভ্রান্ত বর্ণনাগুলোকে আলিমরা ও সীরাত বর্ণনাকারীগণ নবি-এর ওপর আরোপিত সবচেয়ে সুস্পষ্ট জঘন্য মিথ্যাগুলোর অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
উমর-এর প্রতি আরোপিত এ রকম একটি মিথ্যা বর্ণনায় বলা হয়েছে, তিনি বলেছেন, 'নবি ও আবূ বকর কথা বলতে থাকবেন, আর তাঁদের মাঝে আমি পরদেশি লোকের মতো থাকব।' এটি একটি মিথ্যা ও বানোয়াট বর্ণনা। এ ব্যাপারে হাদীস বিশেষজ্ঞদের ঐকমত্য রয়েছে।[৪৭]
টিকাঃ
[৪৪] আহমাদ, ৮৯৬。
[৪৫] মুসলিম, ১০৬৪。
[৪৬] যাহাবি, মীযানুল ই'তিদাল, ৩/১৬৪。
[৪৭] ইবনুল কাইয়িম, আল-মানারুল মুনীফ, ১১৫。
📄 রাসূলের অনুসরণ ব্যতীত কোনো আধ্যাত্মিক উন্নতি নেই
লক্ষণীয় বিষয় হলো, মুনাফিকদের মতো কিছু লোক আছে যারা কেবল বাহ্যিকভাবে রাসূলুল্লাহর বার্তা গ্রহণের ভান করে কিন্তু ভেতরে এমন-সব (কুফরি-শিরকি) বিশ্বাস রাখে যে, তাদের ঈমান নষ্ট হয়ে যায়। এসব লোকেরা নিজেদের কিংবা তাদের মতো অন্যদের 'আল্লাহর আউলিয়া' বলে দাবি করে, অথচ তাদের অন্তরে কুফরি লুকিয়ে থাকে। ঔদ্ধত্য অথবা মূর্খতার কারণে তারা রাসূলুল্লাহর আনীত বিষয়গুলো প্রত্যাখ্যান করে। এদের মতো অনেক ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানও নিজেদের আল্লাহর আউলিয়া মনে করে! তাদের কেউ কেউ মুহাম্মাদ-কে আল্লাহর রাসূল বলেও বিশ্বাস করে কিন্তু এরপর বলে, 'তাঁকে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের কাছে পাঠানো হয়নি, এ জন্য তাঁকে অনুসরণ করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়! কেননা, আমাদের কাছে তাঁর আগে অনেক নবি-রাসূল এসেছে'-এরা সবাই কাফির, যদিও নিজেদের আল্লাহর প্রিয় বান্দা (আউলিয়া) মনে করুক না কেন!
আল্লাহর আউলিয়া তো কেবল তারাই, যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাঁর 'ওলায়াত' ঘোষণা করেছেন,
أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ
'মনে রেখো, যারা আল্লাহর বন্ধু, তাদের না কোনো ভয়-ভীতি আছে, না তারা চিন্তান্বিত হবে। যারা ঈমান এনেছে এবং ভয় করতে রয়েছে।' [৪৮]
ঈমান অর্জনের অত্যাবশ্যকীয় বিষয়ের মধ্যে রয়েছে—আল্লাহ, ফেরেশতা, কিতাব, নবি-রাসূল ও বিচার-দিবসের প্রতি ঈমান। মুমিনরা আল্লাহর প্রেরিত প্রত্যেক নবি ও প্রত্যেক কিতাবের ওপর ঈমান রাখে। আল্লাহ বলেন,
قُولُوا آمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنزِلَ إِلَى إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَى وَعِيسَى وَمَا أُوتِيَ النَّبِيُّونَ مِن رَّبِّهِمْ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ فَإِنْ آمَنُوا بِمِثْلِ مَا آمَنتُم بِهِ فَقَدِ اهْتَدَوا وَإِن تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا هُمْ فِي شِقَاقٍ فَسَيَكْفِيكَهُمُ اللَّهُ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
'তোমরা বলো, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর ওপর এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের প্রতি এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব এবং তদীয় বংশধরের প্রতি এবং মূসা, ঈসা, অন্যান্য নবিকে পালনকর্তার পক্ষ থেকে যা দান করা হয়েছে, সেগুলোর ওপর। আমরা তাঁদের মধ্যে পার্থক্য করি না। আমরা তাঁরই আনুগত্যকারী।
অতএব তারা যদি ঈমান আনে তোমাদের ঈমান আনার মতো, তবে তারা সুপথ পাবে। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তারাই হঠকারিতায় রয়েছে। সুতরাং এখন তাদের জন্যে আপনার পক্ষ থেকে আল্লাহই যথেষ্ট। তিনিই সর্বশ্রোতা, মহাজ্ঞানী। [৪৯]
آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مِن رَّبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ كُلُّ آمَنَ بِاللَّهِ وَمَلَا بِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِن رُسُلِهِ وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِن نَّسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِنَا رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنتَ مَوْلَانَا فَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ
'রাসূল বিশ্বাস রাখেন ওই সমস্ত বিষয় সম্পর্কে, যা তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাঁর কাছে অবতীর্ণ হয়েছে এবং মুমিনরাও সবাই বিশ্বাস রাখে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি এবং তাঁর নবিগণের প্রতি। তারা বলে, আমরা তাঁর নবিদের মধ্যে কোনো তারতম্য করি না। তারা বলে, আমরা শুনলাম এবং মানলাম। আমরা তোমার ক্ষমা চাই, হে আমাদের পালনকর্তা, তোমারই দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে।
আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোনো কাজের ভার দেন না, সে তা-ই পায় যা সে উপার্জন করে এবং তা-ই তার ওপর বর্তায়, যা সে করে। হে আমাদের পালনকর্তা, যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা ভুল করি, তবে আমাদের অপরাধী কোরো না। হে আমাদের পালনকর্তা, এবং আমাদের ওপর এমন দায়িত্ব অর্পণ কোরো না, যেমন আমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর অর্পণ করেছ, হে আমাদের রব, এবং আমাদের দ্বারা ওই বোঝা বহন কোরো না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নাই। আমাদের পাপ মোচন করো, আমাদের ক্ষমা করো এবং আমাদের প্রতি দয়া করো। তুমিই আমাদের রব। সুতরাং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য করো।'[৫০]
الم ذَلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ * الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ وَالَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِن قَبْلِكَ وَبِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ أُولَبِكَ عَلَى هُدًى مِّن رَّبِّهِمْ وَأُولَبِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ )
'আলিফ-লাম-মীম। এটি সেই কিতাব যাতে কোনোই সন্দেহ নেই। মুত্তাকীদের জন্য এটি পথ প্রদর্শনকারী, যারা অদেখা বিষয়ের ওপর ঈমান আনে এবং সালাত প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি তাদের যে রিস্ক দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে এবং যারা ঈমান এনেছে সেসব বিষয়ের ওপর, যা কিছু তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং সেসব বিষয়ের ওপর, যা তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে। আর আখিরাতকে যারা নিশ্চিত বলে বিশ্বাস করে। তারাই নিজেদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে সুপথপ্রাপ্ত, আর তারাই যথার্থ সফলকাম।'[৫১]
সুতরাং ঈমান অর্জনের একটি অত্যাবশ্যকীয় শর্ত হলো মুহাম্মাদ -কে শেষ নবি ও রাসূল হিসেবে বিশ্বাস করা। তাঁর পর আর কোনো নবি আসবেন না এবং তিনি জিন-ইনসান সকলের কাছেই আল্লাহর প্রেরিত বার্তাবাহক। যে তাঁর ওপর নাযিলকৃত বিষয়ের প্রতি ঈমান রাখে না সে তো মুমিনই নয়, আল্লাহর আউলিয়াদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হওয়া তো পরের কথা! আর যে ব্যক্তি রাসূলের আনীত বিষয়ের প্রতি আংশিক ঈমান রাখে-কিছু অংশ বিশ্বাস করে ও কিছু প্রত্যাখ্যান করে-সেও কাফির। আল্লাহ বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيُرِيدُونَ أَن يُفَرِّقُوا بَيْنَ اللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيَقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَن يَتَّخِذُوا بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلًا أُولَبِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ حَقًّا وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُّهِينًا وَالَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَلَمْ يُفَرِّقُوا بَيْنَ أَحَدٍ مِنْهُمْ أُولَبِكَ سَوْفَ يُؤْتِيهِمْ أُجُورَهُمْ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَّحِيمًا
'যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারী তদুপরি আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি বিশ্বাসে তারতম্য করতে চায় আর বলে যে, আমরা কতককে বিশ্বাস করি আর কতককে প্রত্যাখ্যান করি এবং এরই মধ্যবর্তী কোনো পথ অবলম্বন করতে চায়। প্রকৃতপক্ষে এরাই সত্য প্রত্যাখ্যানকারী। আর যারা সত্য প্রত্যাখ্যানকারী তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি লাঞ্ছনাদায়ক আযাব।
আর যারা ঈমান এনেছে আল্লাহর ওপর, তাঁর রাসূলের ওপর এবং তাঁদের কারও প্রতি ঈমান আনতে গিয়ে কাউকে বাদ দেয়নি, শীঘ্রই তাদের প্রতিদান দেওয়া হবে। বস্তুত আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়ালু। [৫২]
ঈমানের অন্তর্ভুক্ত বিষয়ের মধ্যে আরও রয়েছে, সৃষ্টিজগতের কাছে আল্লাহর আদেশ- নিষেধ পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে নবিদের বিশ্বাস করা। তাদের প্রতিশ্রুতি, সুসংবাদ, সতর্কতা এবং হালাল-হারামের ওপর ঈমান রাখা। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যেসবের বৈধতা দিয়েছেন সেগুলো হালাল, আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা নিষেধ করেছেন তা হারাম। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা নির্ধারিত করেছেন সেটাই আমাদের দ্বীন (জীবনবিধান, পথ-পদ্ধতি, আদর্শ)। কাজেই, কোনো ব্যক্তি যদি দাবি করে মুহাম্মাদ -এর পথ ব্যতীত অন্য কোনো ওলির পথে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা সম্ভব তবে নিঃসন্দেহে সে একজন কাফির এবং শয়তানের ওলি।
টিকাঃ
[৪৮] সূরা ইউনুস, ১০: ৬২-৬৩。
[৪৯] সূরা বাকারাহ, ২: ১৩৬-১৩৭。
[৫০] সূরা বাকারাহ, ২: ২৮৫-২৮৬。
[৫১] সূরা বাকারাহ, ২: ১-৫。
[৫২] সূরা নিসা, ৪: ১৫০-১৫২。
📄 সাধুদের অসাধুতা
আরও জেনে রাখা প্রয়োজন, একজন ব্যক্তি যুহদ (দুনিয়াত্যাগ, সংসারবিরাগ), ইবাদাত-বন্দেগি, জ্ঞান ইত্যাদির মাধ্যমে আধ্যাত্মিকতার যত উচ্চস্তরেই পৌঁছাক না কেন, মুহাম্মাদ-এর আনীত সমস্ত ওহির ওপর বিশ্বাস না করলে সে কখনো ঈমানদার হতে পারবে না, আল্লাহর আউলিয়া হওয়া তো আরও অসম্ভব। যেমন: ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানদের জ্ঞানী ও সংসারত্যাগী এবং তাদের অনুসারীরা এই দলের অন্তর্ভুক্ত।
অনুরূপভাবে, আরব, আজম, তুরস্ক, ভারত কিংবা অন্যান্য স্থানের সাধু-সন্ন্যাসীদেরও যত জ্ঞান, কলা-কৌশল ও ধর্মীয় ভক্তি আছে বলে মনে করা হোক না কেন, এরা কিছুতেই মুহাম্মাদ-এর রিসালাতে বিশ্বাসী নয়, এরা সবাই কাফির ও আল্লাহর দুশমন; যদিও অনেকে তাদের 'রহমানের আউলিয়া' মনে করুক না কেন! অনুরূপভাবে, পারস্যের জরাথ্রুস্টরাও (অগ্নিউপাসক) কাফির, গ্রিসের সাধুরাও কাফির-যেমন অ্যারিস্টটল ও অন্যান্যরা। এরা সবাই মূর্তি ও গ্রহ-নক্ষত্রের পূজারি।
অ্যারিস্টটল ছিল ঈসা-এর তিন শ বছর আগের মানুষ, সে ছিল সম্রাট আলেকজান্ডারের একজন মন্ত্রী। এই আলেকজান্ডার রোম ও গ্রিসের বিখ্যাত সম্রাট, যার পিতার নাম ফিলিপস। ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানদের ইতিহাসে সে একজন বিখ্যাত ব্যক্তি। উল্লেখ্য, কুরআনে যাকে জুলকারনাইন নামে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি আলেকজান্ডার নন, যদিও কিছু মানুষ ভুলবশত তা-ই মনে করে। যেমন: অনেকে মনে করে অ্যারিস্টটল ছিল জুলকারনাইনের একজন মন্ত্রী! আসলে জুলকারনাইনকেও মাঝে মাঝে আলেকজান্ডার বলে ডাকা হতো বলে তারা দুজনকে একই মানুষ মনে করেছে। ইবনু সিনা ও অন্যান্য ব্যক্তিও প্রকাশ্য এই ভুলটি করেছেন।
যাই হোক, বাস্তবতা ভিন্ন। সূরা কাহফে উল্লেখিত জুলকারনাইন আর আলেকজান্ডার কখনোই এক ব্যক্তি নয়, দুজন পৃথক ব্যক্তি। আলেকজান্ডার ছিল জুলকারনাইনের অনেক পরবর্তী সময়ের মানুষ, আর অ্যারিস্টটল ছিল আলেকজান্ডারের মন্ত্রী। আলেকজান্ডার কোনো দেয়াল নির্মাণ করেনি এবং ইয়াজুজ-মাজুজের দেশ সফর করেনি। আলেকজান্ডারের ইতিহাস রোমান ইতিহাসে সুপরিচিত ও সংরক্ষিত। তার অধীনে অ্যারিস্টটল মন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছে।