📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 রাসূলের আনুগত্য ব্যতীত কেউ ওলি হতে পারে না

📄 রাসূলের আনুগত্য ব্যতীত কেউ ওলি হতে পারে না


যদি কেউ আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর ওলাইয়াত (মিত্রতা) দাবি করে কিন্তু সে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অনুসরণ করে না, তবে সে আল্লাহর আউলিয়াদের অন্তর্ভুক্ত নয়; বরং যে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বিরোধিতা করে সে আল্লাহর দুশমন। শয়তানের আউলিয়াদের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন,
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ )
"বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমাকে (রাসূল) অনুসরণ করো, যাতে আল্লাহও তোমাদের ভালোবাসেন এবং তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাশীল, দয়ালু।”[২৯]
এই আয়াত সম্পর্কে হাসান বাসরি রহ. বলেন, 'কিছু মানুষ আল্লাহকে ভালোবাসার দাবি করত, তাই তিনি তাদের পরীক্ষা করার জন্য এই আয়াত নাযিল করলেন।[৩০]
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন, যে রাসূলের অনুসরণ করে আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। আর যদি কোনো ব্যক্তি আল্লাহকে ভালোবাসার দাবি করে কিন্তু তাঁর রাসূলের অনুসরণ না করে, তবে সে আল্লাহর আউলিয়াদের অন্তর্ভুক্ত না; যদিও সে নিজেকে বা অন্যরা তাকে আল্লাহর আউলিয়া মনে করুক না কেন! রাসূলের অনুসরণ ব্যতীত তারা আল্লাহর নৈকট্যের ধারে-কাছেও আসতে পারবে না। যেমন ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানরা; তারা নিজেদের আল্লাহর আউলিয়া বলে দাবি করে বলত, তারা ছাড়া আর কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না! এমনকি তারা নিজেদের আল্লাহর প্রিয়ভাজন ও সন্তান-সন্ততি বলেও দাবি করে! আল্লাহ জাল্লা শানুহু বলেন,
وَقَالَتِ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى نَحْنُ أَبْنَاءُ اللَّهِ وَأَحِبَّاؤُهُ قُلْ فَلِمَ يُعَذِّبُكُم بِذُنُوبِكُم بَلْ أَنتُم بَشَرٌ مِّمَّنْ خَلَقَ يَغْفِرُ لِمَن يَشَاءُ وَيُعَذِّبُ مَن يَشَاءُ وَلِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَإِلَيْهِ الْمَصِيرُ
"ইয়াহূদী ও খ্রিষ্টানরা বলে, আমরা আল্লাহর সন্তান ও তাঁর প্রিয়জন। আপনি বলুন, তবে তিনি তোমাদের পাপের বিনিময়ে কেন শাস্তি দান করবেন? বরং তোমারও অন্যান্য সৃষ্ট মানবের অন্তর্ভুক্ত সাধারণ মানুষ। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি প্রদান করেন। নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডলে ও এতদুভয়ের মধ্যে যা কিছু আছে, তাতে আল্লাহরই আধিপত্য রয়েছে এবং তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে।”[৩১]
وَقَالُوا لَن يَدْخُلَ الْجَنَّةَ إِلَّا مَن كَانَ هُودًا أَوْ نَصَارَى تِلْكَ أَمَانِيُّهُمْ قُلْ هَاتُوا بُرْهَانَكُمْ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ بَلَى مَنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَلَهُ أَجْرُهُ عِندَ رَبِّهِ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
"ওরা বলে, ইয়াহূদী অথবা খ্রিষ্টান ব্যতীত কেউ জান্নাতে যাবে না। এটা ওদের মনের বাসনা। বলে দিন, তোমরা সত্যবাদী হলে, প্রমাণ উপস্থিত করো। হাঁ, যে ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সমর্পণ করেছে এবং সে সৎকর্মশীলও বটে তার জন্য তার পালনকর্তার কাছে পুরস্কার বয়েছে। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।”[৩২]
আরব মুশরিকরা নিজেদের আল্লাহর দল বলে দাবি করত, কারণ তারা মক্কায় আল্লাহর ঘরের কাছে বসবাস করত। এটি ছিল তাদের গর্ব-অহংকারের উৎস। এ কারণে তারা নিজেদের অন্যান্য মানুষের থেকে শ্রেষ্ঠ মনে করত। আল্লাহ বলেন,
قَدْ كَانَتْ آيَاتِي تُتْلَى عَلَيْكُمْ فَكُنتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ تَنكِصُونَ مُسْتَكْبِرِينَ بِهِ سَامِرًا تَهْجُرُونَ ®
"তোমাদের আমার আয়াতসমূহ শোনানো হতো, তখন তোমরা উল্টো পায়ে সরে পড়তে। এ বিষয়ে অহংকার করে অর্থহীন গল্প-গুজব করে যেতে।”[৩৩]
এ আয়াত সম্পর্কে ইবনু আব্বাস বলেন, এর মাধ্যমে আল্লাহর ঘর কা'বাকে বোঝানো হয়েছে, যার ব্যাপারে তারা বলত, 'আমরাই এর অধিবাসী'; ফলে তারা অহংকার করত।[৩৪]
وَإِذْ يَمْكُرُ بِكَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِيُثْبِتُوكَ أَوْ يَقْتُلُوكَ أَوْ يُخْرِجُوكَ وَيَمْكُرُونَ وَيَمْكُرُ اللَّهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ وَإِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آيَاتُنَا قَالُوا قَدْ سَمِعْنَا لَوْ نَشَاءُ لَقُلْنَا مِثْلَ هَذَا إِنْ هَذَا إِلَّا أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِينَ وَإِذْ قَالُوا اللَّهُمَّ إِن كَانَ هَذَا هُوَ الْحَقَّ مِنْ عِندِكَ فَأَمْطِرْ عَلَيْنَا حِجَارَةً مِنَ السَّمَاءِ أَوِ ائْتِنَا بِعَذَابٍ أَلِيمٍ وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنتَ فِيهِمْ وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ وَمَا لَهُمْ أَلَّا يُعَذِّبَهُمُ اللَّهُ وَهُمْ يَصُدُّونَ عَنِ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَمَا كَانُوا أَوْلِيَاءَهُ إِنْ أَوْلِيَاؤُهُ إِلَّا الْمُتَّقُونَ وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ ®
"আর কাফিররা যখন প্রতারণা করত আপনাকে বন্দী অথবা হত্যা করার উদ্দেশ্যে কিংবা আপনাকে বের করে দেওয়ার জন্য, তখন তারা যেমন চক্রান্ত করত আল্লাহও তেমনি কৌশল করতেন। বস্তুত আল্লাহর কৌশল-ই সর্বোত্তম। আর কেউ যখন তাদের নিকট আমার আয়াতসমূহ পাঠ করে তবে বলে, আমরা শুনেছি, ইচ্ছা করলে আমরাও এমন বলতে পারি; এ তো পূর্ববর্তী ইতিহাস ছাড়া আর কিছুই নয়। তা ছাড়া তারা যখন বলতে আরম্ভ করে যে, ইয়া আল্লাহ, এই যদি তোমার পক্ষ থেকে (আগত) সত্য দ্বীন হয়ে থাকে, তবে আমাদের ওপর আকাশ থেকে প্রস্তর বর্ষণ করো কিংবা আমাদের ওপর বেদনাদায়ক আযাব নাযিল করো। অথচ আল্লাহ কখনোই তাদের ওপর আযাব নাযিল করবেন না, যতক্ষণ আপনি তাদের মাঝে অবস্থান করবেন অথবা তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে। আর তাদের মধ্যে এমন কী বিষয় রয়েছে, যার ফলে আল্লাহ তাদের ওপর আযাব দান করবেন না? অথচ তারা মাসজিদুল হারামে যেতে বাধাদান করে, অথচ তাদের সে অধিকার নেই। এর অধিকার তো কেবল মুত্তাকীদের। কিন্তু তাদের অধিকাংশই সে বিষয়ে অবহিত নয়।” [৩৫]
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা ব্যাখ্যা করে জানিয়েছেন, মুশরিকরা তার আউলিয়া নয়, তারা আল্লাহর ঘরের আউলিয়াও (রক্ষণাবেক্ষণকারী, তদারককারী) নয়। শুধু আল্লাহভীরু পরহেযগার লোকেরাই আল্লাহর আউলিয়া।
আমর ইবনুল আস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি নবি -কে গোপনে নয় প্রকাশ্যে বলতে শুনেছি, "নিশ্চয়ই অমুক অমুক পরিবার আমার আউলিয়া নয়। (এভাবে তিনি আত্মীয়দের একদলকে বোঝালেন [৩৬]) কেবল আল্লাহ এবং নেক আমলকারী মুমিনগণই আমার আউলিয়া।”[৩৭]
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ مَوْلَاهُ وَجِبْرِيلُ وَصَالِحُ الْمُؤْمِنِينَ
“...তবে জেনে রেখো, আল্লাহ, জিবরীল এবং সৎকর্মপরায়ণ মুমিনগণ তাঁর (রাসূলের) মাওলা (সহায়, সাহায্যকারী বন্ধু, মিত্র, অভিভাবক)।”[৩৮]
সৎকর্মপরায়ণ মুমিনগণ (وَصَالِحُ الْمُؤْمِنِينَ) বলে মুমিনদের মধ্যে যারা নেককার ও পরহেযগার তাদের বোঝানো হয়েছে। যে সকল মুমিনের তাকওয়া আছে, তারা আল্লাহর আউলিয়া। এই শ্রেণিতে আছেন আবূ বকর, উমর, উসমান, আলি এবং গাছের তলায় বায়আত প্রদানকারী (বায়আতুর রিদওয়ান) সকল সাহাবায়ে কেরাম। রদিয়াল্লাহু আনহুম আজমাঈন। তাদের সংখ্যা মোট চৌদ্দ শ জন, তারা সকলেই জান্নাতি। এ বিষয়ে বিশুদ্ধ হাদীস রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “গাছের তলায় বায়আত প্রদানকারীদের কেউ আগুনে প্রবেশ করবে না।” [৩৯]
“মুত্তাকীরাই আমার আউলিয়া, তারা যে-ই হোক না কেন, যেখানেই থাকুক না কেন!”[৪০]

টিকাঃ
[২৯] সূরা আলে ইমরান, ৩: ৩১。
[৩০] ইবনু জারীর তাবারি, তাফসীর, ৬/৩২২。
[৩১] সূরা মাইদা, ৫: ১৮。
[৩২] সূরা বাকারাহ, ২: ১১১-১১২。
[৩৩] সূরা মুমিনূন, ২৩: ৬৬-৬৭。
[৩৪] ইবনু কাসীর, তাফসীর, ১০/১৩৩。
[৩৫] সূরা আনফাল, ৮: ৩০-৩৪。
[৩৬] আরবী আউলিয়া শব্দের মাধ্যমে সাধারণভাবে যারা নিকটস্থ, প্রিয়, অথবা মিত্র তাদের বোঝানো হয়। এ ছাড়া সুনির্দিষ্টভাবে রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়দেরও বোঝানো হয়, যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে。
[৩৭] বুখারি, ৫৯৯০; মুসলিম, ২১৮১。
[৩৮] সূরা তাহরীম, ৬৬: ৪。
[৩৯] আবূ দাউদ, ৪৬৫৩; তিরমিযি, ৩৮৬০, সহীহ。
[৪০] ইবনু হিব্বান, ৬৪৭, সহীহ。

📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 শয়তানের আউলিয়াদের কিছু ভ্রান্ত বিশ্বাস

📄 শয়তানের আউলিয়াদের কিছু ভ্রান্ত বিশ্বাস


কিছু কাফিরও নিজেদের আল্লাহর আউলিয়া বলে দাবি করে! কিন্তু তারা কখনোই আল্লাহর আউলিয়া নয়; বরং তারা আল্লাহর দুশমন। একইভাবে বাহ্যিকভাবে ইসলামের নিদর্শন প্রকাশকারী মুনাফিকরাও অনুরূপ দাবি করে। তারা প্রকাশ্যে কালিমার সাক্ষ্য প্রদান করে বলে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, সমস্ত মানবজাতির কাছে তাঁকে পাঠানো হয়েছে! না, শুধু মানবজাতি নয়; বরং জিন-ইনসান উভয়ের কাছেই তিনি সর্বশেষ প্রেরিত নবি ও রাসূল—মুখে এসব কথা বললেও মুনাফিকদের অন্তরে ভিন্ন বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস থাকে। ফলে তাদের কালিমার সাক্ষ্য বাতিল। কালিমার সাক্ষ্য বাতিলকারী কিছু ভ্রান্ত বিশ্বাসের নমুনা:
(১) কোনো ব্যক্তি মুখে বলল কিন্তু অন্তরে মুহাম্মাদ-কে আল্লাহর রাসূল বলে স্বীকার করল না; বরং এই বিশ্বাস রাখে যে, অন্যান্য মহান রাজা-বাদশাহদের মতো তিনিও একজন মহান ও সম্মানিত বাদশাহ, নেতা বা শাসক ছিলেন; কিংবা যদি মনে করে, তিনি তাঁর নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টা ও ব্যক্তিগত সাফল্যের মাধ্যমে মানুষের নেতৃত্ব দিয়েছেন—তবে এটি হবে কালিমার সাক্ষ্য বাতিলকারী বিশ্বাস।
(২) কেউ যদি বিশ্বাস করে মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল কিন্তু তাঁকে সমস্ত মানবজাতির প্রতি পাঠানো হয়নি, তিনি শুধু অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষদের প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন, আহলুল কিতাবদের প্রতি নয়। যেমন অনেক ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানদের কাছ থেকে এ রকম কথা প্রায়ই শোনা যায়।
(৩) যদি কেউ বিশ্বাস করে, মুহাম্মাদ পুরো সৃষ্টিজগতের প্রতি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল, কিন্তু আল্লাহর কিছু বিশেষ আউলিয়া আছেন যাদের প্রতি তাঁকে রাসূল হিসেবে পাঠানো হয়নি! তারা রাসূলুল্লাহ-এর রিসালাতের অমুখাপেক্ষী, ওইসব আউলিয়া আল্লাহর সাথে এমন সম্পর্ক রাখেন যে, তাদের (হিদায়াতের জন্য) নবি-রাসূলের কোনো প্রয়োজন নেই, দলীল হিসেবে মূসা ও খিজির-এর ঘটনা পেশ করেন—তাহলে এটিও হবে ঈমান বিনষ্টকারী বিশ্বাস।
(৪) যদি বলে, নবি-রাসূলের দরকার নেই, সে নিজেই সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে তার প্রয়োজন পূরণ করে নিতে পারে এবং কোনো প্রকার মাধ্যম ছাড়াই তার নিকট থেকে উপকৃত হতে পারে। আর সেটাই তার জন্য যথেষ্ট।
(৫) যদি এ রকম বিশ্বাস করে যে, রাসূলুল্লাহ -এর কাছে কেবল জাহিরি (বাহ্যিক) ইলম নাযিল করা হয়েছে, কিন্তু বাতিনি (গোপন) ইলম নাযিল করা হয়নি বা তিনি সেসব জানতেন না; অথবা যদি কেউ বিশ্বাস করে আউলিয়ারা নবি-এর থেকেও বেশি বা ভিন্ন কোনো উৎস থেকে তাঁর সমপর্যায়ের ইলম রাখেন।
এই সবগুলো বিশ্বাস ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়।

📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 আসহাবুস সুফফা

📄 আসহাবুস সুফফা


এ ধরনের ভ্রান্ত বিশ্বাস পোষণকারীদের অনেকে এমনটাও বলে থাকে যে, আসহাবুস সুফফার (মাসজিদে নববীতে অবস্থানকারী দরিদ্র সাহাবায়ে কেরাম, যাদের কোনো বাড়ি বা থাকার স্থান ছিল না) জন্য নবি -এর কোনো প্রয়োজন নেই, তিনি তাদের প্রতি প্রেরিত হননি!
তাদের অনেকে এমনটাও বলে, আসহাবুস সুফফার কাছে আল্লাহ ওহি নাযিল করেছেন! তাদের সেসব গোপন ইলম দিয়েছেন, যা নবি -এর কাছে মি'রাজের রাতে নাযিল হয়েছিল! সুতরাং তাদের ভাষ্যমতে আসহাবুস সুফফার মর্যাদা রাসূলের মর্যাদার সমতুল্য!
এসব চরম মূর্খরা এটাও জানে না, মি'রাজের ঘটনা মদীনাতে নয়; বরং রাসূল মক্কায় থাকাকালে ঘটেছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন,
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
"পবিত্র ও সুমহান সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রিবেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত—যার চার দিকে আমি পর্যাপ্ত বারাকাহ দান করেছি, যাতে আমি তাঁকে আমার কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দিই। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।” [৪১]
উপরন্তু, রাসূলুল্লাহর হিজরতের আগ পর্যন্ত মদীনাতে আসহাবুস সুফফার কোনো অস্তিত্বই ছিল না। 'সুফফা' হলো মাসজিদে নববীর উত্তর প্রান্তে অবস্থিত একটি স্থান, যেখানে সেসব নওমুসলিম থাকতেন, যাদের মদীনাতে থাকার মতো কোনো পরিবার, বন্ধু বা নিকটাত্মীয় ছিল না। তখনকার ঘটনা ছিল, মুমিনরা নবিজির কাছে থাকার জন্য মদীনায় হিজরত করতেন, যদি মদীনায় থাকার মতো কোনো স্থান পেতেন তাহলে সেখানেই চলে যেতেন, আর সেটা সম্ভব না হলে তারা মাসজিদেই থাকতেন যতক্ষণ পর্যন্ত না অন্যত্র বসবাসের একটি স্থান পাওয়া যেত।
আসহাবুস সুফফার মধ্যে এমন কেউ নেই, যারা কখনো সুফফা ত্যাগ করেননি, বা অন্যকথায় সর্বদা মাসজিদে নববীর বারান্দায় বসবাস করেছেন—এমন কোনো দল নেই; বরং তাদের সংখ্যা হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটত। যেমন: কেউ কিছুদিন সেখানে বসবাসের পর মদীনার অন্যত্র চলে যেতেন।
সুফফার অধিবাসীরা অন্যান্য সাধারণ মুসলিমদের মতোই ছিলেন। দ্বীন বা ইলমের ক্ষেত্রে তাদের বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য ছিল না; বরং তাদের মধ্যে মুরতাদ হয়ে গেছে এমন ব্যক্তিও ছিল। যাদের পরবর্তী সময়ে রাসূলুল্লাহ -এর নির্দেশে হত্যা করা হয়েছিল। সহীহ বুখারিতে একদল আরবের ঘটনা এসেছে, যারা মদীনাতে আল্লাহর রাসূলের সাক্ষাতে এসেছিল। কিন্তু মদীনার পরিবেশের সাথে তারা নিজেদের মানিয়ে নিতে পারল না। তাদের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটল। সুস্থতার জন্য তারা দুধ পান করতে চাইল। রাসূলুল্লাহ তাদের উটের চারণভূমিতে গিয়ে (চিকিৎসা হিসেবে) সেখানকার উটের দুগ্ধ ও মূত্র পান করতে নির্দেশ দিলেন। পরবর্তী সময়ে যখন তারা সুস্থতা ফিরে পেল তখন উটের রাখালদের হত্যা করল এবং উটগুলো চুরি করে নিয়ে পালিয়ে গেল। (এভাবে তারা একত্রে মুরতাদ হওয়া, বিশ্বাসঘাতকতা, চুরি-ডাকাতি এবং হত্যার অপরাধ সংঘটিত করল।) তাদের ধরার জন্য রাসূলুল্লাহ বাহিনী প্রেরণ করলেন। গ্রেপ্তারের পর নির্দেশ দিলেন, উত্তপ্ত লোহার শলাকা দিয়ে যেন তাদের চোখ উপড়ে নেয়া হয়, হাত-পা কেটে ফেলা হয় এবং তাদের সেভাবেই মদীনার উত্তপ্ত-পাথুরে ভূমিতে মৃত্যু পর্যন্ত ফেলে রাখা হয়। তারা পানি পান করতে চাইলে তাদের যেন পান করানো না হয়।[৪২]
অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'এই লোকেরা সুফফাতে অবস্থান নিয়েছিল।'
সুতরাং, সেখানে যেমন এ ধরনের লোকেরাও থাকত তেমনি সাহাবিদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি সা'দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস-ও থাকতেন। যিনি সুফফার অধিবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মর্যাদাবান ব্যক্তি ছিলেন। পরে অবশ্য তিনি অন্যত্র চলে যান। সেখানে আবূ হুরায়রা-সহ কিছু সাহাবিও থাকতেন। [৪৩]
দেখুন, আনসারদের মধ্যে কেউই সুফফায় থাকতেন না। এ ছাড়াও মুহাজিরদের মধ্যে যারা প্রবীণ, যেমন: আবূ বকর, উমর, উসমান, আলি, তালহা, জুবাইর, আবদুর রহমান ইবনু আওফ, আবূ উবাইদা ইবনুল জাররাহ এবং তাদের মতো অন্যান্য বড় সাহাবিরাও কখনো আসহাবুস সুফফার অন্তর্ভুক্ত হননি।
বর্ণিত আছে যে, মুগীরা ইবনু শু'বাহ-এর এক পুত্র সুফফাতে বসবাস করেছিলেন, যার ব্যাপারে নবি বলেন, "সে সাত জনের একজন"। উলামাদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে বর্ণনাটি মিথ্যা ও বানোয়াট। যদিও আবূ নুআইম তার 'হিলইয়াতুল আউলিয়া' গ্রন্থে এটি উল্লেখ করেছেন!

টিকাঃ
[৪১] সূরা ইসরা, ১৭: ১。
[৪২] বুখারি, ২৩৩, ۱۵۰۱; মুসলিম, ১৬৭১。
[৪৩] 'তারীখু মান নাযালাস সুফফাহ' নামক কিতাবে আবূ আবদির রহমান সুলামি সুফফায় অবস্থানকারী সকল সাহাবিদের জীবনী একত্র করেছেন。

📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 আউলিয়া আবদাল সম্পর্কিত কিছু বানোয়াট বর্ণনা

📄 আউলিয়া আবদাল সম্পর্কিত কিছু বানোয়াট বর্ণনা


যেসব বর্ণনাতে রাসূলুল্লাহ-এর সূত্রে এবং সুনির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ করে কিছু রহস্যময় ব্যক্তির কথা বর্ণনা করা হয়েছে, সেগুলোও মিথ্যা ও বানোয়াট। সেসব বর্ণনার একটিও রাসূলের কথা বলে প্রমাণিত নয়। এ ধরনের জাল বর্ণনার উদাহরণ: বিভিন্ন বানোয়াট বর্ণনায় উল্লেখ করা হয় যে, আউলিয়া, আবদাল, নুকাবা (একবচন নকীব), নুজাবা (একবচন নজীব), আওতাদ বা আকতাব (একবচন কুতুব, আক্ষরিক অর্থ খুঁটি) এর সংখ্যা চার, সাত, বারো, চল্লিশ, সত্তর, তিন শ, তিন শ তেরো অথবা বর্ণনা করা হয় কেবল একজন কুতুব আছেন ইত্যাদি। এসবের একটিও বিশুদ্ধ নয়, এগুলো সব জাল ও দুর্বল বর্ণনা। কোনো সালাফকে 'আবদাল' শব্দটি বাদে উল্লেখিত পরিভাষার কোনোটি ব্যবহার করতে দেখা যায়নি।
ইমাম আহমাদ সংকলিত 'আল-মুসনাদ' গ্রন্থে একটি হাদীস দেখতে পাওয়া যায়, যেখানে 'আবদাল' শব্দের ব্যবহার রয়েছে। সেখানে চল্লিশ জন আবদালের কথা বলা হয়েছে, যারা শামে থাকবেন। যখনই তাদের একজন ইন্তিকাল করবে তখনই আল্লাহ তাআলা আরেকজনকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে দেন। [৪৪]
এ বর্ণনাকে আলি -এর প্রতি আরোপ করা হয়, কিন্তু বর্ণনাসূত্রটি বিচ্ছিন্ন এবং এটি প্রমাণিতও নয়। এ ছাড়াও জানা কথা যে, শামে অবস্থানকারী মুআবিয়া ও তাঁর বাহিনীর তুলনায় আলি ও তাঁর সাথিরা মর্যাদাবান ও সত্যের অধিক নিকটবর্তী ছিলেন। সুতরাং সকল আবদাল একত্রে মুআবিয়া -এর বাহিনীতে থাকতে পারেন না।
আবূ সাঈদ খুদরি বলেন, 'রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "মুসলিমদের মধ্যে যখন মতবিরোধ দেখা দেবে তখন একদল লোক দ্বীন থেকে বের হয়ে যাবে। দুই দলের মধ্যে যে দলটি সত্যের অধিক নিকটবর্তী, তারা তাদের হত্যা করবে।”[৪৫]
যে দলটি ইসলাম থেকে বের হয়ে গিয়েছিল তারা হলো খারেজি। খারেজিদের ঐতিহাসিক পটভূমি হলো, যখন আলি -এর খিলাফাতকালে মুসলিমদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলো, তখন তারা দলত্যাগ করল। পরবর্তী সময়ে আলি ইবনু আবী তালিব তাদের ফিতনা নির্মূল করেছিলেন। এভাবে বিশুদ্ধ হাদীসের মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, আলি ইবনু আবী তালিব ছিলেন মুআবিয়া ও তাঁর সাথিদের তুলনায় সত্যের অধিক নিকটবর্তী। তাহলে ভেবে দেখুন, দুই দলের মধ্যে যে দলটি অপেক্ষাকৃত কম মর্যাদাবান তাদের মধ্যে কীভাবে সবগুলো আবদাল থাকতে পারে?
রাসূলুল্লাহ -এর প্রতি আরোপকৃত মিথ্যাগুলোর মধ্যে আরেকটি হলো জনৈক কবির ঘটনা। তিনি নাকি একজন কবিকে বলতে শুনেছেন,
'লালসার সর্প দংশেছে মোর কলিজায় হায়, নেই কোনো হাকিম, নেই কোনো কবিরাজ, কে সারাবে আমায়! আছে শুধু মোর মাহবুব, তাঁর প্রেমে আছে উপশম আছে জাদুকরী নিরাময়!'
বর্ণনাটিতে বলা হয়, এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ এত আবেগতাড়িত হয়ে গেলেন যে, তাঁর কাঁধ থেকে চাদর পড়ে গেল!
আলিমদের ঐকমত্য অনুসারে এটি একটি বানোয়াট বর্ণনা। কতিপয় মিথ্যুক এর চেয়েও বানোয়াট বিষয় যুক্ত করেছেন, এই কবিতা শুনে তিনি এত আবেগতাড়িত হয়েছিলেন যে, চাদর ছিঁড়ে ফেলেন! এমনকি জিবরীল সেই ছেঁড়া চাদরের একটি অংশ আরশে ঝুলিয়ে দেন![৪৬]
এ ধরনের ভ্রান্ত বর্ণনাগুলোকে আলিমরা ও সীরাত বর্ণনাকারীগণ নবি-এর ওপর আরোপিত সবচেয়ে সুস্পষ্ট জঘন্য মিথ্যাগুলোর অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
উমর-এর প্রতি আরোপিত এ রকম একটি মিথ্যা বর্ণনায় বলা হয়েছে, তিনি বলেছেন, 'নবি ও আবূ বকর কথা বলতে থাকবেন, আর তাঁদের মাঝে আমি পরদেশি লোকের মতো থাকব।' এটি একটি মিথ্যা ও বানোয়াট বর্ণনা। এ ব্যাপারে হাদীস বিশেষজ্ঞদের ঐকমত্য রয়েছে।[৪৭]

টিকাঃ
[৪৪] আহমাদ, ৮৯৬。
[৪৫] মুসলিম, ১০৬৪。
[৪৬] যাহাবি, মীযানুল ই'তিদাল, ৩/১৬৪。
[৪৭] ইবনুল কাইয়িম, আল-মানারুল মুনীফ, ১১৫。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00