📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 শ্রেষ্ঠ নবির শ্রেষ্ঠ উম্মাহ

📄 শ্রেষ্ঠ নবির শ্রেষ্ঠ উম্মাহ


'দৃঢ় সংকল্পের অধিকারী' রাসূলদের মধ্যে মুহাম্মাদ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বশ্রেষ্ঠ। তিনি নবিদের সিলমোহর, তার পরে আর কোনো نবি আসবেন না। তিনি মুত্তাকী ব্যক্তিদের ইমাম (নেতা), আদম সন্তানদের শিরোমণি। মি'রাজের রাতে যখন সকল নবি একত্রে সালাত আদায় করেছিলেন, তখন তিনিই ছিলেন তাদের ইমাম ও খতীব। তিনি সর্বোচ্চ সম্মানিত স্থান (আল-মাকামুল মাহমূদ) এর অধিকারী, যে সম্মানের জন্য আগে-পরের সকল মানুষ তাঁর প্রতি ঈর্ষা অনুভব করবে। তিনি প্রশংসার পতাকা বাহক, হাউজে কাউসারের অধিকারী, যার চারপাশে বিচার-দিবসে মুমিনরা সমবেত হবে। তিনি বিচার-দিবসে সুপারিশকারী, 'আল-ওয়াসিলা' এবং 'আল-ফাদিলা'র অধিকারী, তাঁর কাছেই সর্বোত্তম কিতাব নাযিল হয়েছে, তাঁকে দ্বীনের সর্বোত্তম বিধি-বিধান প্রদান করা হয়েছে, তাঁর উম্মাহকেই মানবজাতির সর্বোত্তম উম্মাহ বানানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর অনুসারীদের মাঝে আল্লাহ তাআলা এমন-সব গুণাবলি, মর্যাদা ও কল্যাণের সমাবেশ ঘটিয়েছেন, যা পূর্ববর্তী কোনো জাতির মধ্যে এভাবে একত্রে ছিল না; বরং সকলের মাঝে পৃথক পৃথকভাবে বণ্টনকৃত ছিল। তাঁর উম্মাহই সর্বশেষ উম্মাহ, কিন্তু বিচার-দিবসে তাদেরই সবার আগে উঠানো হবে।
রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
"আমরা দুনিয়ায় (আগমনের দিক দিয়ে) সর্বশেষ (উম্মাহ)। কিন্তু কিয়ামাতের দিন মর্যাদার দিক দিয়ে সবার আগে থাকব। তবে তাদের (ইয়াহুদী-খ্রিষ্টান) আমাদের আগে কিতাব প্রদান করা হয়েছে এবং আমাদের তাদের পরে দেওয়া হয়েছে। তারপর এই দিন (শুক্রবার নির্ধারণ) সম্বন্ধে তাদের মধ্যে মতানৈক্য হয়েছে। আল্লাহ তাআলা আমাদের শুক্রবার দান করেছেন। অন্যান্য মানুষেরা আমাদের অনুগামী। এ দিনের পরদিন (শনিবার) ইয়াহূদীদের এবং তার পরের দিন (রোববার) নাসারাদের...।"[২৬]
“সর্বপ্রথম আমাকেই জমিন থেকে উঠানো হবে।”[২৭]
"আমি জান্নাতের দরজায় দাঁড়াব এবং প্রবেশের চেষ্টা করব। প্রহরী ফেরেশতা বলবে, কে আপনি? যখন বলব আমি মুহাম্মাদ, তখন ফেরেশতা বলবে, আপনার আগে অন্য কারও জন্য দরজা খোলার অনুমতি দেওয়া হয়নি।” [২৮]
তাঁর এবং তাঁর উম্মাতের মর্যাদা ও উত্তম গুণাবলি অসংখ্য। নুবুওয়তের মাধ্যমে তাঁকে আল্লাহ তাআলা তাঁর আউলিয়া ও দুশমনদের মাঝে পার্থক্যকারী বানিয়েছেন। মুহাম্মাদ ﷺ-এর ওপর নাযিলকৃত সমস্ত বিষয়ের ওপর ঈমান না এনে এবং প্রকাশ্যে ও গোপনে তাঁর অনুসরণ না করে কেউ আল্লাহর ওলি হতে পারে না।

টিকাঃ
[২৬] বুখারি, ৮৯৬; মুসলিম, ৮৫৫。
[২৭] আবূ দাউদ, ৪৬৭৩; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১৫。
[২৮] মুসলিম, ১৯৭。

📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 রাসূলের আনুগত্য ব্যতীত কেউ ওলি হতে পারে না

📄 রাসূলের আনুগত্য ব্যতীত কেউ ওলি হতে পারে না


যদি কেউ আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও তাঁর ওলাইয়াত (মিত্রতা) দাবি করে কিন্তু সে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অনুসরণ করে না, তবে সে আল্লাহর আউলিয়াদের অন্তর্ভুক্ত নয়; বরং যে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বিরোধিতা করে সে আল্লাহর দুশমন। শয়তানের আউলিয়াদের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন,
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ )
"বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমাকে (রাসূল) অনুসরণ করো, যাতে আল্লাহও তোমাদের ভালোবাসেন এবং তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাশীল, দয়ালু।”[২৯]
এই আয়াত সম্পর্কে হাসান বাসরি রহ. বলেন, 'কিছু মানুষ আল্লাহকে ভালোবাসার দাবি করত, তাই তিনি তাদের পরীক্ষা করার জন্য এই আয়াত নাযিল করলেন।[৩০]
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন, যে রাসূলের অনুসরণ করে আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। আর যদি কোনো ব্যক্তি আল্লাহকে ভালোবাসার দাবি করে কিন্তু তাঁর রাসূলের অনুসরণ না করে, তবে সে আল্লাহর আউলিয়াদের অন্তর্ভুক্ত না; যদিও সে নিজেকে বা অন্যরা তাকে আল্লাহর আউলিয়া মনে করুক না কেন! রাসূলের অনুসরণ ব্যতীত তারা আল্লাহর নৈকট্যের ধারে-কাছেও আসতে পারবে না। যেমন ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানরা; তারা নিজেদের আল্লাহর আউলিয়া বলে দাবি করে বলত, তারা ছাড়া আর কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না! এমনকি তারা নিজেদের আল্লাহর প্রিয়ভাজন ও সন্তান-সন্ততি বলেও দাবি করে! আল্লাহ জাল্লা শানুহু বলেন,
وَقَالَتِ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى نَحْنُ أَبْنَاءُ اللَّهِ وَأَحِبَّاؤُهُ قُلْ فَلِمَ يُعَذِّبُكُم بِذُنُوبِكُم بَلْ أَنتُم بَشَرٌ مِّمَّنْ خَلَقَ يَغْفِرُ لِمَن يَشَاءُ وَيُعَذِّبُ مَن يَشَاءُ وَلِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَإِلَيْهِ الْمَصِيرُ
"ইয়াহূদী ও খ্রিষ্টানরা বলে, আমরা আল্লাহর সন্তান ও তাঁর প্রিয়জন। আপনি বলুন, তবে তিনি তোমাদের পাপের বিনিময়ে কেন শাস্তি দান করবেন? বরং তোমারও অন্যান্য সৃষ্ট মানবের অন্তর্ভুক্ত সাধারণ মানুষ। তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি প্রদান করেন। নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডলে ও এতদুভয়ের মধ্যে যা কিছু আছে, তাতে আল্লাহরই আধিপত্য রয়েছে এবং তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে।”[৩১]
وَقَالُوا لَن يَدْخُلَ الْجَنَّةَ إِلَّا مَن كَانَ هُودًا أَوْ نَصَارَى تِلْكَ أَمَانِيُّهُمْ قُلْ هَاتُوا بُرْهَانَكُمْ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ بَلَى مَنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَلَهُ أَجْرُهُ عِندَ رَبِّهِ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
"ওরা বলে, ইয়াহূদী অথবা খ্রিষ্টান ব্যতীত কেউ জান্নাতে যাবে না। এটা ওদের মনের বাসনা। বলে দিন, তোমরা সত্যবাদী হলে, প্রমাণ উপস্থিত করো। হাঁ, যে ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সমর্পণ করেছে এবং সে সৎকর্মশীলও বটে তার জন্য তার পালনকর্তার কাছে পুরস্কার বয়েছে। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।”[৩২]
আরব মুশরিকরা নিজেদের আল্লাহর দল বলে দাবি করত, কারণ তারা মক্কায় আল্লাহর ঘরের কাছে বসবাস করত। এটি ছিল তাদের গর্ব-অহংকারের উৎস। এ কারণে তারা নিজেদের অন্যান্য মানুষের থেকে শ্রেষ্ঠ মনে করত। আল্লাহ বলেন,
قَدْ كَانَتْ آيَاتِي تُتْلَى عَلَيْكُمْ فَكُنتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ تَنكِصُونَ مُسْتَكْبِرِينَ بِهِ سَامِرًا تَهْجُرُونَ ®
"তোমাদের আমার আয়াতসমূহ শোনানো হতো, তখন তোমরা উল্টো পায়ে সরে পড়তে। এ বিষয়ে অহংকার করে অর্থহীন গল্প-গুজব করে যেতে।”[৩৩]
এ আয়াত সম্পর্কে ইবনু আব্বাস বলেন, এর মাধ্যমে আল্লাহর ঘর কা'বাকে বোঝানো হয়েছে, যার ব্যাপারে তারা বলত, 'আমরাই এর অধিবাসী'; ফলে তারা অহংকার করত।[৩৪]
وَإِذْ يَمْكُرُ بِكَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِيُثْبِتُوكَ أَوْ يَقْتُلُوكَ أَوْ يُخْرِجُوكَ وَيَمْكُرُونَ وَيَمْكُرُ اللَّهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ وَإِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آيَاتُنَا قَالُوا قَدْ سَمِعْنَا لَوْ نَشَاءُ لَقُلْنَا مِثْلَ هَذَا إِنْ هَذَا إِلَّا أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِينَ وَإِذْ قَالُوا اللَّهُمَّ إِن كَانَ هَذَا هُوَ الْحَقَّ مِنْ عِندِكَ فَأَمْطِرْ عَلَيْنَا حِجَارَةً مِنَ السَّمَاءِ أَوِ ائْتِنَا بِعَذَابٍ أَلِيمٍ وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنتَ فِيهِمْ وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ وَمَا لَهُمْ أَلَّا يُعَذِّبَهُمُ اللَّهُ وَهُمْ يَصُدُّونَ عَنِ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَمَا كَانُوا أَوْلِيَاءَهُ إِنْ أَوْلِيَاؤُهُ إِلَّا الْمُتَّقُونَ وَلَكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ ®
"আর কাফিররা যখন প্রতারণা করত আপনাকে বন্দী অথবা হত্যা করার উদ্দেশ্যে কিংবা আপনাকে বের করে দেওয়ার জন্য, তখন তারা যেমন চক্রান্ত করত আল্লাহও তেমনি কৌশল করতেন। বস্তুত আল্লাহর কৌশল-ই সর্বোত্তম। আর কেউ যখন তাদের নিকট আমার আয়াতসমূহ পাঠ করে তবে বলে, আমরা শুনেছি, ইচ্ছা করলে আমরাও এমন বলতে পারি; এ তো পূর্ববর্তী ইতিহাস ছাড়া আর কিছুই নয়। তা ছাড়া তারা যখন বলতে আরম্ভ করে যে, ইয়া আল্লাহ, এই যদি তোমার পক্ষ থেকে (আগত) সত্য দ্বীন হয়ে থাকে, তবে আমাদের ওপর আকাশ থেকে প্রস্তর বর্ষণ করো কিংবা আমাদের ওপর বেদনাদায়ক আযাব নাযিল করো। অথচ আল্লাহ কখনোই তাদের ওপর আযাব নাযিল করবেন না, যতক্ষণ আপনি তাদের মাঝে অবস্থান করবেন অথবা তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে। আর তাদের মধ্যে এমন কী বিষয় রয়েছে, যার ফলে আল্লাহ তাদের ওপর আযাব দান করবেন না? অথচ তারা মাসজিদুল হারামে যেতে বাধাদান করে, অথচ তাদের সে অধিকার নেই। এর অধিকার তো কেবল মুত্তাকীদের। কিন্তু তাদের অধিকাংশই সে বিষয়ে অবহিত নয়।” [৩৫]
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা ব্যাখ্যা করে জানিয়েছেন, মুশরিকরা তার আউলিয়া নয়, তারা আল্লাহর ঘরের আউলিয়াও (রক্ষণাবেক্ষণকারী, তদারককারী) নয়। শুধু আল্লাহভীরু পরহেযগার লোকেরাই আল্লাহর আউলিয়া।
আমর ইবনুল আস হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি নবি -কে গোপনে নয় প্রকাশ্যে বলতে শুনেছি, "নিশ্চয়ই অমুক অমুক পরিবার আমার আউলিয়া নয়। (এভাবে তিনি আত্মীয়দের একদলকে বোঝালেন [৩৬]) কেবল আল্লাহ এবং নেক আমলকারী মুমিনগণই আমার আউলিয়া।”[৩৭]
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ مَوْلَاهُ وَجِبْرِيلُ وَصَالِحُ الْمُؤْمِنِينَ
“...তবে জেনে রেখো, আল্লাহ, জিবরীল এবং সৎকর্মপরায়ণ মুমিনগণ তাঁর (রাসূলের) মাওলা (সহায়, সাহায্যকারী বন্ধু, মিত্র, অভিভাবক)।”[৩৮]
সৎকর্মপরায়ণ মুমিনগণ (وَصَالِحُ الْمُؤْمِنِينَ) বলে মুমিনদের মধ্যে যারা নেককার ও পরহেযগার তাদের বোঝানো হয়েছে। যে সকল মুমিনের তাকওয়া আছে, তারা আল্লাহর আউলিয়া। এই শ্রেণিতে আছেন আবূ বকর, উমর, উসমান, আলি এবং গাছের তলায় বায়আত প্রদানকারী (বায়আতুর রিদওয়ান) সকল সাহাবায়ে কেরাম। রদিয়াল্লাহু আনহুম আজমাঈন। তাদের সংখ্যা মোট চৌদ্দ শ জন, তারা সকলেই জান্নাতি। এ বিষয়ে বিশুদ্ধ হাদীস রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, “গাছের তলায় বায়আত প্রদানকারীদের কেউ আগুনে প্রবেশ করবে না।” [৩৯]
“মুত্তাকীরাই আমার আউলিয়া, তারা যে-ই হোক না কেন, যেখানেই থাকুক না কেন!”[৪০]

টিকাঃ
[২৯] সূরা আলে ইমরান, ৩: ৩১。
[৩০] ইবনু জারীর তাবারি, তাফসীর, ৬/৩২২。
[৩১] সূরা মাইদা, ৫: ১৮。
[৩২] সূরা বাকারাহ, ২: ১১১-১১২。
[৩৩] সূরা মুমিনূন, ২৩: ৬৬-৬৭。
[৩৪] ইবনু কাসীর, তাফসীর, ১০/১৩৩。
[৩৫] সূরা আনফাল, ৮: ৩০-৩৪。
[৩৬] আরবী আউলিয়া শব্দের মাধ্যমে সাধারণভাবে যারা নিকটস্থ, প্রিয়, অথবা মিত্র তাদের বোঝানো হয়। এ ছাড়া সুনির্দিষ্টভাবে রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়দেরও বোঝানো হয়, যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে。
[৩৭] বুখারি, ৫৯৯০; মুসলিম, ২১৮১。
[৩৮] সূরা তাহরীম, ৬৬: ৪。
[৩৯] আবূ দাউদ, ৪৬৫৩; তিরমিযি, ৩৮৬০, সহীহ。
[৪০] ইবনু হিব্বান, ৬৪৭, সহীহ。

📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 শয়তানের আউলিয়াদের কিছু ভ্রান্ত বিশ্বাস

📄 শয়তানের আউলিয়াদের কিছু ভ্রান্ত বিশ্বাস


কিছু কাফিরও নিজেদের আল্লাহর আউলিয়া বলে দাবি করে! কিন্তু তারা কখনোই আল্লাহর আউলিয়া নয়; বরং তারা আল্লাহর দুশমন। একইভাবে বাহ্যিকভাবে ইসলামের নিদর্শন প্রকাশকারী মুনাফিকরাও অনুরূপ দাবি করে। তারা প্রকাশ্যে কালিমার সাক্ষ্য প্রদান করে বলে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, সমস্ত মানবজাতির কাছে তাঁকে পাঠানো হয়েছে! না, শুধু মানবজাতি নয়; বরং জিন-ইনসান উভয়ের কাছেই তিনি সর্বশেষ প্রেরিত নবি ও রাসূল—মুখে এসব কথা বললেও মুনাফিকদের অন্তরে ভিন্ন বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস থাকে। ফলে তাদের কালিমার সাক্ষ্য বাতিল। কালিমার সাক্ষ্য বাতিলকারী কিছু ভ্রান্ত বিশ্বাসের নমুনা:
(১) কোনো ব্যক্তি মুখে বলল কিন্তু অন্তরে মুহাম্মাদ-কে আল্লাহর রাসূল বলে স্বীকার করল না; বরং এই বিশ্বাস রাখে যে, অন্যান্য মহান রাজা-বাদশাহদের মতো তিনিও একজন মহান ও সম্মানিত বাদশাহ, নেতা বা শাসক ছিলেন; কিংবা যদি মনে করে, তিনি তাঁর নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টা ও ব্যক্তিগত সাফল্যের মাধ্যমে মানুষের নেতৃত্ব দিয়েছেন—তবে এটি হবে কালিমার সাক্ষ্য বাতিলকারী বিশ্বাস।
(২) কেউ যদি বিশ্বাস করে মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল কিন্তু তাঁকে সমস্ত মানবজাতির প্রতি পাঠানো হয়নি, তিনি শুধু অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষদের প্রতি প্রেরিত হয়েছিলেন, আহলুল কিতাবদের প্রতি নয়। যেমন অনেক ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানদের কাছ থেকে এ রকম কথা প্রায়ই শোনা যায়।
(৩) যদি কেউ বিশ্বাস করে, মুহাম্মাদ পুরো সৃষ্টিজগতের প্রতি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল, কিন্তু আল্লাহর কিছু বিশেষ আউলিয়া আছেন যাদের প্রতি তাঁকে রাসূল হিসেবে পাঠানো হয়নি! তারা রাসূলুল্লাহ-এর রিসালাতের অমুখাপেক্ষী, ওইসব আউলিয়া আল্লাহর সাথে এমন সম্পর্ক রাখেন যে, তাদের (হিদায়াতের জন্য) নবি-রাসূলের কোনো প্রয়োজন নেই, দলীল হিসেবে মূসা ও খিজির-এর ঘটনা পেশ করেন—তাহলে এটিও হবে ঈমান বিনষ্টকারী বিশ্বাস।
(৪) যদি বলে, নবি-রাসূলের দরকার নেই, সে নিজেই সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে তার প্রয়োজন পূরণ করে নিতে পারে এবং কোনো প্রকার মাধ্যম ছাড়াই তার নিকট থেকে উপকৃত হতে পারে। আর সেটাই তার জন্য যথেষ্ট।
(৫) যদি এ রকম বিশ্বাস করে যে, রাসূলুল্লাহ -এর কাছে কেবল জাহিরি (বাহ্যিক) ইলম নাযিল করা হয়েছে, কিন্তু বাতিনি (গোপন) ইলম নাযিল করা হয়নি বা তিনি সেসব জানতেন না; অথবা যদি কেউ বিশ্বাস করে আউলিয়ারা নবি-এর থেকেও বেশি বা ভিন্ন কোনো উৎস থেকে তাঁর সমপর্যায়ের ইলম রাখেন।
এই সবগুলো বিশ্বাস ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়।

📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 আসহাবুস সুফফা

📄 আসহাবুস সুফফা


এ ধরনের ভ্রান্ত বিশ্বাস পোষণকারীদের অনেকে এমনটাও বলে থাকে যে, আসহাবুস সুফফার (মাসজিদে নববীতে অবস্থানকারী দরিদ্র সাহাবায়ে কেরাম, যাদের কোনো বাড়ি বা থাকার স্থান ছিল না) জন্য নবি -এর কোনো প্রয়োজন নেই, তিনি তাদের প্রতি প্রেরিত হননি!
তাদের অনেকে এমনটাও বলে, আসহাবুস সুফফার কাছে আল্লাহ ওহি নাযিল করেছেন! তাদের সেসব গোপন ইলম দিয়েছেন, যা নবি -এর কাছে মি'রাজের রাতে নাযিল হয়েছিল! সুতরাং তাদের ভাষ্যমতে আসহাবুস সুফফার মর্যাদা রাসূলের মর্যাদার সমতুল্য!
এসব চরম মূর্খরা এটাও জানে না, মি'রাজের ঘটনা মদীনাতে নয়; বরং রাসূল মক্কায় থাকাকালে ঘটেছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন,
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
"পবিত্র ও সুমহান সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রিবেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত—যার চার দিকে আমি পর্যাপ্ত বারাকাহ দান করেছি, যাতে আমি তাঁকে আমার কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দিই। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।” [৪১]
উপরন্তু, রাসূলুল্লাহর হিজরতের আগ পর্যন্ত মদীনাতে আসহাবুস সুফফার কোনো অস্তিত্বই ছিল না। 'সুফফা' হলো মাসজিদে নববীর উত্তর প্রান্তে অবস্থিত একটি স্থান, যেখানে সেসব নওমুসলিম থাকতেন, যাদের মদীনাতে থাকার মতো কোনো পরিবার, বন্ধু বা নিকটাত্মীয় ছিল না। তখনকার ঘটনা ছিল, মুমিনরা নবিজির কাছে থাকার জন্য মদীনায় হিজরত করতেন, যদি মদীনায় থাকার মতো কোনো স্থান পেতেন তাহলে সেখানেই চলে যেতেন, আর সেটা সম্ভব না হলে তারা মাসজিদেই থাকতেন যতক্ষণ পর্যন্ত না অন্যত্র বসবাসের একটি স্থান পাওয়া যেত।
আসহাবুস সুফফার মধ্যে এমন কেউ নেই, যারা কখনো সুফফা ত্যাগ করেননি, বা অন্যকথায় সর্বদা মাসজিদে নববীর বারান্দায় বসবাস করেছেন—এমন কোনো দল নেই; বরং তাদের সংখ্যা হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটত। যেমন: কেউ কিছুদিন সেখানে বসবাসের পর মদীনার অন্যত্র চলে যেতেন।
সুফফার অধিবাসীরা অন্যান্য সাধারণ মুসলিমদের মতোই ছিলেন। দ্বীন বা ইলমের ক্ষেত্রে তাদের বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য ছিল না; বরং তাদের মধ্যে মুরতাদ হয়ে গেছে এমন ব্যক্তিও ছিল। যাদের পরবর্তী সময়ে রাসূলুল্লাহ -এর নির্দেশে হত্যা করা হয়েছিল। সহীহ বুখারিতে একদল আরবের ঘটনা এসেছে, যারা মদীনাতে আল্লাহর রাসূলের সাক্ষাতে এসেছিল। কিন্তু মদীনার পরিবেশের সাথে তারা নিজেদের মানিয়ে নিতে পারল না। তাদের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটল। সুস্থতার জন্য তারা দুধ পান করতে চাইল। রাসূলুল্লাহ তাদের উটের চারণভূমিতে গিয়ে (চিকিৎসা হিসেবে) সেখানকার উটের দুগ্ধ ও মূত্র পান করতে নির্দেশ দিলেন। পরবর্তী সময়ে যখন তারা সুস্থতা ফিরে পেল তখন উটের রাখালদের হত্যা করল এবং উটগুলো চুরি করে নিয়ে পালিয়ে গেল। (এভাবে তারা একত্রে মুরতাদ হওয়া, বিশ্বাসঘাতকতা, চুরি-ডাকাতি এবং হত্যার অপরাধ সংঘটিত করল।) তাদের ধরার জন্য রাসূলুল্লাহ বাহিনী প্রেরণ করলেন। গ্রেপ্তারের পর নির্দেশ দিলেন, উত্তপ্ত লোহার শলাকা দিয়ে যেন তাদের চোখ উপড়ে নেয়া হয়, হাত-পা কেটে ফেলা হয় এবং তাদের সেভাবেই মদীনার উত্তপ্ত-পাথুরে ভূমিতে মৃত্যু পর্যন্ত ফেলে রাখা হয়। তারা পানি পান করতে চাইলে তাদের যেন পান করানো না হয়।[৪২]
অন্য বর্ণনায় এসেছে, 'এই লোকেরা সুফফাতে অবস্থান নিয়েছিল।'
সুতরাং, সেখানে যেমন এ ধরনের লোকেরাও থাকত তেমনি সাহাবিদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি সা'দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস-ও থাকতেন। যিনি সুফফার অধিবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মর্যাদাবান ব্যক্তি ছিলেন। পরে অবশ্য তিনি অন্যত্র চলে যান। সেখানে আবূ হুরায়রা-সহ কিছু সাহাবিও থাকতেন। [৪৩]
দেখুন, আনসারদের মধ্যে কেউই সুফফায় থাকতেন না। এ ছাড়াও মুহাজিরদের মধ্যে যারা প্রবীণ, যেমন: আবূ বকর, উমর, উসমান, আলি, তালহা, জুবাইর, আবদুর রহমান ইবনু আওফ, আবূ উবাইদা ইবনুল জাররাহ এবং তাদের মতো অন্যান্য বড় সাহাবিরাও কখনো আসহাবুস সুফফার অন্তর্ভুক্ত হননি।
বর্ণিত আছে যে, মুগীরা ইবনু শু'বাহ-এর এক পুত্র সুফফাতে বসবাস করেছিলেন, যার ব্যাপারে নবি বলেন, "সে সাত জনের একজন"। উলামাদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে বর্ণনাটি মিথ্যা ও বানোয়াট। যদিও আবূ নুআইম তার 'হিলইয়াতুল আউলিয়া' গ্রন্থে এটি উল্লেখ করেছেন!

টিকাঃ
[৪১] সূরা ইসরা, ১৭: ১。
[৪২] বুখারি, ২৩৩, ۱۵۰۱; মুসলিম, ১৬৭১。
[৪৩] 'তারীখু মান নাযালাস সুফফাহ' নামক কিতাবে আবূ আবদির রহমান সুলামি সুফফায় অবস্থানকারী সকল সাহাবিদের জীবনী একত্র করেছেন。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00