📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 আউলিয়া শব্দের অর্থ

📄 আউলিয়া শব্দের অর্থ


'আউলিয়া' (أَوْلِيَاءُ) শব্দটি বহুবচন; এর একবচন 'ওলি' (وَلِيُّ), যার শব্দমূল এসেছে 'ওয়াও, লাম, ইয়া' (و-ل-ي) হতে।
'ওলায়াত' (وَلَايَةٌ বন্ধুত্ব, মিত্রতা, অভিভাবকত্ব) শব্দটির বিপরীত শব্দ 'আদাওয়াত' (عَدَاوَةٌ শত্রুতা)।
'ওলায়াত' শব্দের মৌলিক অর্থ ভালোবাসা ও নৈকট্য, এবং 'আদাওয়াত' শব্দের অর্থ ঘৃণা, বৈরিতা ও দূরত্ব।
এ ক্ষেত্রে নামকরণের সার্থকতা সুস্পষ্ট।
আবার এমনও বলা হয় যে, ওলিকে 'ওলি' বলার কারণ হলো, সে আল্লাহর আনুগত্যে ধারাবাহিক থাকে। তবে এর চেয়ে পূর্বের ব্যাখ্যাই অধিক সঠিক। সুতরাং 'ওলি' অর্থ নৈকট্যপ্রাপ্ত। যেমন: বলা হয়, هَذَا يَى هَذَا = এটি ওটির নিকটবর্তী।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর একটি হাদীস থেকেও এই অর্থ বুঝে আসে:
أَلْحِقُوا الْفَرَائِضَ بِأَهْلِهَا فَمَا بَقِيَ فَهُوَ لِأَوْلَى رَجُلٍ ذَكَرٍ
"(উত্তরাধিকার সম্পত্তির) অংশীদারদের প্রাপ্য অংশ দিয়ে দাও। অতঃপর যা অবশিষ্ট থাকে তা নিকটতম (আওলা-أَوْلَى, আলোচ্য শব্দমূলের পরম অর্থবোধক) পুরুষ লোকের প্রাপ্য।”[২০]
অর্থাৎ, 'আওলা' শব্দের দ্বারা এখানে মৃত ব্যক্তির নিকটতম আত্মীয়কে বোঝানো হয়েছে। ‘পুরুষ’ শব্দের পর ‘লোক’ (رَجُلٍ ذَكَرٍ) শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমে গুরুত্বারোপ করে বোঝানো হয়েছে, এই বিধানটি কেবল পুরুষ আত্মীয়ের জন্য, এখানে নারীরা অন্তর্ভুক্ত নয়। একই অর্থবোধক শব্দ একাধিকবার ব্যবহারের মাধ্যমে গুরুত্ব বোঝানোর চল রয়েছে। যেমন যাকাতের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, [২১] ( ... فَابْنُ لَبَوْنٍ ذَكَرٍ ...)
এখানে, নির্দিষ্ট বয়সের দুগ্ধপোষ্য মদ্দা উটকে বোঝানো হয়েছে, ‘উট’ পুংলিঙ্গবাচক শব্দ হবার পরেও (ذَكَرٍ) ‘মদ্দা’ শব্দটি বাহ্যত অপ্রয়োজনীয় বা আতিশয্যবাচক মনে হলেও এর মাধ্যমে গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে।

টিকাঃ
[১৯] আবূ দাউদ, ৪৬৮১; তিরমিযি, ২৬৪২, সহীহ।
[২০] বুখারি, ৬৭৩২; মুসলিম, ১৬১৫।

📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 বন্ধুত্ব ও শত্রুতার উৎস

📄 বন্ধুত্ব ও শত্রুতার উৎস


যিনি আল্লাহর ওলি, তিনি আল্লাহর সব বিধানের সাথে একমত পোষণ করেন এবং আল্লাহ যা ভালোবাসেন তাতে খুশি থাকেন ও সন্তুষ্টচিত্তে পালন করেন। আর আল্লাহ যা অপছন্দ করেন, তিনিও তা অপছন্দ করেন। তিনি সৎকাজের আদেশ ও মন্দ কাজে নিষেধ করেন। সুতরাং সহজেই বোঝা যাচ্ছে, যারা আল্লাহর ওলির সাথে দুশমনি করে, তারা মূলত আল্লাহর বিরুদ্ধেই শত্রুতা করে।
যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّى وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ
“হে মুমিনগণ, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদের বন্ধুরূপে গ্রহণ কোরো না।”[২২]
কাজেই, যারা আল্লাহর ওলির বিরুদ্ধে শত্রুতা পোষণ করে তারা আল্লাহর প্রতিই শত্রুতা পোষণ করে, আর যে আল্লাহর প্রতি শত্রুতা পোষণ করে সে তো আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত! এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর আউলিয়াদের ব্যাপারে বর্ণিত হাদীসে কুদসিতে বলেছেন,
مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ
“যে আমার ওলির বিরুদ্ধে শত্রুতা পোষণ করল, সে আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হলো।”[২৩]

টিকাঃ
[২১] বুখারি, ১৪৫৪。
[২২] সূরা মুমতাহিনা, ৬০: ১。
[২৩] বুখারি, ৬৫০২।

📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 নবিগণ শ্রেষ্ঠ আউলিয়া

📄 নবিগণ শ্রেষ্ঠ আউলিয়া


আল্লাহর আউলিয়াদের মধ্যে সর্বোত্তম হলেন নবিগণ (আলাইহিমুস সালাম)। আর নবিদের মধ্যে সর্বোত্তম হলেন রাসূলগণ। আর রাসূলদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ পাঁচ জন। কুরআনে তাদেরকে 'উলুল আযমি মিনার রুসুল' مِنْ الرُّسُلِ اولُوا الْعَزْمِ مِنَ 'দৃঢ় সংকল্পের অধিকারী' বলা হয়েছে। তারা হলেন নূহ, ইবরাহীম, মূসা, ঈসা এবং মুহাম্মাদ (আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালাম)। আল্লাহ তাআলা বলেন,
شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّىٰ بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَىٰ أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ
"তিনি তোমাদের জন্যে দ্বীনের ক্ষেত্রে সে পথই নির্ধারণ করেছেন, যার আদেশ দিয়েছিলেন নূহকে; যা আমি প্রত্যাদেশ করেছি আপনার প্রতি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে এই মর্মে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করো এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি কোরো না।”[২৪]
অন্যত্র এসেছে,
وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّينَ مِيثَاقَهُمْ وَمِنكَ وَمِن نُّوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ۖ وَأَخَذْنَا مِنْ هُم مِّيثَاقًا غَلِيظًا لِّيَسْأَلَ الصَّادِقِينَ عَن صِدْقِهِمْ ۚ وَأَعَدَّ لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا أَلِيمًا
"যখন আমি নবিদের কাছ থেকে, আপনার কাছ থেকে এবং নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও মারইয়াম-তনয় ঈসার কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম এবং অঙ্গীকার নিলাম তাদের কাছ থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার। সত্যবাদীদের তাদের সত্যবাদিতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার জন্য। তিনি কাফিরদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।”[২৫]

টিকাঃ
[২৪] সূরা শুআরা, ৪২: ১৩。
[২৫] সূরা আহযাব, ৩৩: ৭-৮।

📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 শ্রেষ্ঠ নবির শ্রেষ্ঠ উম্মাহ

📄 শ্রেষ্ঠ নবির শ্রেষ্ঠ উম্মাহ


'দৃঢ় সংকল্পের অধিকারী' রাসূলদের মধ্যে মুহাম্মাদ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বশ্রেষ্ঠ। তিনি নবিদের সিলমোহর, তার পরে আর কোনো نবি আসবেন না। তিনি মুত্তাকী ব্যক্তিদের ইমাম (নেতা), আদম সন্তানদের শিরোমণি। মি'রাজের রাতে যখন সকল নবি একত্রে সালাত আদায় করেছিলেন, তখন তিনিই ছিলেন তাদের ইমাম ও খতীব। তিনি সর্বোচ্চ সম্মানিত স্থান (আল-মাকামুল মাহমূদ) এর অধিকারী, যে সম্মানের জন্য আগে-পরের সকল মানুষ তাঁর প্রতি ঈর্ষা অনুভব করবে। তিনি প্রশংসার পতাকা বাহক, হাউজে কাউসারের অধিকারী, যার চারপাশে বিচার-দিবসে মুমিনরা সমবেত হবে। তিনি বিচার-দিবসে সুপারিশকারী, 'আল-ওয়াসিলা' এবং 'আল-ফাদিলা'র অধিকারী, তাঁর কাছেই সর্বোত্তম কিতাব নাযিল হয়েছে, তাঁকে দ্বীনের সর্বোত্তম বিধি-বিধান প্রদান করা হয়েছে, তাঁর উম্মাহকেই মানবজাতির সর্বোত্তম উম্মাহ বানানো হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর অনুসারীদের মাঝে আল্লাহ তাআলা এমন-সব গুণাবলি, মর্যাদা ও কল্যাণের সমাবেশ ঘটিয়েছেন, যা পূর্ববর্তী কোনো জাতির মধ্যে এভাবে একত্রে ছিল না; বরং সকলের মাঝে পৃথক পৃথকভাবে বণ্টনকৃত ছিল। তাঁর উম্মাহই সর্বশেষ উম্মাহ, কিন্তু বিচার-দিবসে তাদেরই সবার আগে উঠানো হবে।
রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
"আমরা দুনিয়ায় (আগমনের দিক দিয়ে) সর্বশেষ (উম্মাহ)। কিন্তু কিয়ামাতের দিন মর্যাদার দিক দিয়ে সবার আগে থাকব। তবে তাদের (ইয়াহুদী-খ্রিষ্টান) আমাদের আগে কিতাব প্রদান করা হয়েছে এবং আমাদের তাদের পরে দেওয়া হয়েছে। তারপর এই দিন (শুক্রবার নির্ধারণ) সম্বন্ধে তাদের মধ্যে মতানৈক্য হয়েছে। আল্লাহ তাআলা আমাদের শুক্রবার দান করেছেন। অন্যান্য মানুষেরা আমাদের অনুগামী। এ দিনের পরদিন (শনিবার) ইয়াহূদীদের এবং তার পরের দিন (রোববার) নাসারাদের...।"[২৬]
“সর্বপ্রথম আমাকেই জমিন থেকে উঠানো হবে।”[২৭]
"আমি জান্নাতের দরজায় দাঁড়াব এবং প্রবেশের চেষ্টা করব। প্রহরী ফেরেশতা বলবে, কে আপনি? যখন বলব আমি মুহাম্মাদ, তখন ফেরেশতা বলবে, আপনার আগে অন্য কারও জন্য দরজা খোলার অনুমতি দেওয়া হয়নি।” [২৮]
তাঁর এবং তাঁর উম্মাতের মর্যাদা ও উত্তম গুণাবলি অসংখ্য। নুবুওয়তের মাধ্যমে তাঁকে আল্লাহ তাআলা তাঁর আউলিয়া ও দুশমনদের মাঝে পার্থক্যকারী বানিয়েছেন। মুহাম্মাদ ﷺ-এর ওপর নাযিলকৃত সমস্ত বিষয়ের ওপর ঈমান না এনে এবং প্রকাশ্যে ও গোপনে তাঁর অনুসরণ না করে কেউ আল্লাহর ওলি হতে পারে না।

টিকাঃ
[২৬] বুখারি, ৮৯৬; মুসলিম, ৮৫৫。
[২৭] আবূ দাউদ, ৪৬৭৩; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১৫。
[২৮] মুসলিম, ১৯৭。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00