📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 বিশুদ্ধ হাদীসে আউলিয়াদের মর্যাদা

📄 বিশুদ্ধ হাদীসে আউলিয়াদের মর্যাদা


আবূ হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, আল্লাহ তাআলা বলেন “যে ব্যাক্তি আমার কোনো ওলির সাথে শত্রুতা করে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করি। আমি আমার বান্দার ওপর যা কিছু ফরয করেছি, তা আদায়ের মাধ্যমে সে আমার যতটুকু নৈকট্য অর্জন করতে পারে অন্য কিছুর মাধ্যমে ততটুকু পারে না। আমার বান্দা সর্বদা নফল ইবাদাতের মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হতেই থাকে। অবশেষে আমি তাকে ভালোবেসে ফেলি। আর যখন তাকে ভালোবেসে ফেলি তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শোনে। আমি তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আমি তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমি তার পা হয়ে যাই, যা দ্বারা সে চলে। যদি সে আমার কাছে কিছু চায়, তবে আমি অবশ্যই তাকে তা দান করি। যদি সে আমার কাছে আশ্রয় চায়, আমি তাকে আশ্রয় দিই। আমি কোনো কাজে এতটা দ্বিধা করি না, যতটা মুমিন বান্দার প্রাণ হরণে করি। সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে আর আমি তার কষ্ট অপছন্দ করি।” [১৬]
এটি আল্লাহর আউলিয়াদের ব্যাপারে বর্ণিত হাদীসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিশুদ্ধ। এখানে রাসূলুল্লাহ ব্যাখ্যা করেছেন, যদি কেউ আল্লাহর আউলিয়াদের সাথে শত্রুতা করে তবে সে আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হলো!
অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
وَإِنِّي لَأَثْأَرُ لِأَوْلِيَائِي كَمَا يَثْأَرُ اللَّيْثُ الْحَرِبُ
"আমি আমার আউলিয়ার পক্ষে সেভাবে প্রতিশোধ নিই, যেভাবে লড়াইরত সিংহ প্রতিশোধ নেয়।" [১৭]
অর্থাৎ, লড়াইরত সিংহ যেভাবে প্রতিশোধ নেয়, তিনিও সেভাবে তার আউলিয়ার বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেন। কেননা, আল্লাহর আউলিয়া হলো সেই সকল মানুষ, যারা তার ওপর ঈমান রাখে এবং পরিপূর্ণ আনুগত্য করে। ফলে আল্লাহ যা ভালোবাসেন তারাও তা ভালোবাসে, আল্লাহ যা ঘৃণা করেন তারাও তা ঘৃণা করে, যাতে আল্লাহ খুশি হন তারাও তাতে খুশি হয়, যাতে আল্লাহ অখুশি হন তারাও তাতে অখুশি হয়। তিনি যেসব কাজের আদেশ করেন তারা সেসব কাজ পালন করে, অন্যকেও তা করতে আদেশ করে। তিনি যা নিষেধ করেন তারা সেসব থেকে নিজেরা বিরত থাকে, অন্যকেও তা থেকে নিষেধ করে। যেসব খাতে খরচ করলে আল্লাহ খুশি হন, তারা সেখানে খরচ করে। আর যেখানে অর্থ খরচ করলে আল্লাহ অখুশি হবেন, সেখানে অর্থ প্রদানে বিরত থাকে।
রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "ঈমানের সবচেয়ে মজবুত আংটা (কড়া) হলো, আল্লাহর জন্য ভালোবাসা এবং আল্লাহর জন্য ঘৃণা।”[১৮]
আরেক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালোবাসবে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুশমনি করবে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করবে এবং দান করা থেকে বিরতও থাকবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, সে ব্যক্তি তার ঈমান পরিপূর্ণ করে নিয়েছে।” [১৯]

টিকাঃ
[১৬] বুখারি, ৬৫০২।
[১৭] বাগাবি, শারহুস সুন্নাহ, ১২৪৯, একজন বর্ণনাকারী দুর্বল।
[১৮] আহমাদ, আল-মুসনাদ, ৪/২৮৬; আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ৪/১৭৭।

📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 আউলিয়া শব্দের অর্থ

📄 আউলিয়া শব্দের অর্থ


'আউলিয়া' (أَوْلِيَاءُ) শব্দটি বহুবচন; এর একবচন 'ওলি' (وَلِيُّ), যার শব্দমূল এসেছে 'ওয়াও, লাম, ইয়া' (و-ل-ي) হতে।
'ওলায়াত' (وَلَايَةٌ বন্ধুত্ব, মিত্রতা, অভিভাবকত্ব) শব্দটির বিপরীত শব্দ 'আদাওয়াত' (عَدَاوَةٌ শত্রুতা)।
'ওলায়াত' শব্দের মৌলিক অর্থ ভালোবাসা ও নৈকট্য, এবং 'আদাওয়াত' শব্দের অর্থ ঘৃণা, বৈরিতা ও দূরত্ব।
এ ক্ষেত্রে নামকরণের সার্থকতা সুস্পষ্ট।
আবার এমনও বলা হয় যে, ওলিকে 'ওলি' বলার কারণ হলো, সে আল্লাহর আনুগত্যে ধারাবাহিক থাকে। তবে এর চেয়ে পূর্বের ব্যাখ্যাই অধিক সঠিক। সুতরাং 'ওলি' অর্থ নৈকট্যপ্রাপ্ত। যেমন: বলা হয়, هَذَا يَى هَذَا = এটি ওটির নিকটবর্তী।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর একটি হাদীস থেকেও এই অর্থ বুঝে আসে:
أَلْحِقُوا الْفَرَائِضَ بِأَهْلِهَا فَمَا بَقِيَ فَهُوَ لِأَوْلَى رَجُلٍ ذَكَرٍ
"(উত্তরাধিকার সম্পত্তির) অংশীদারদের প্রাপ্য অংশ দিয়ে দাও। অতঃপর যা অবশিষ্ট থাকে তা নিকটতম (আওলা-أَوْلَى, আলোচ্য শব্দমূলের পরম অর্থবোধক) পুরুষ লোকের প্রাপ্য।”[২০]
অর্থাৎ, 'আওলা' শব্দের দ্বারা এখানে মৃত ব্যক্তির নিকটতম আত্মীয়কে বোঝানো হয়েছে। ‘পুরুষ’ শব্দের পর ‘লোক’ (رَجُلٍ ذَكَرٍ) শব্দটি ব্যবহারের মাধ্যমে গুরুত্বারোপ করে বোঝানো হয়েছে, এই বিধানটি কেবল পুরুষ আত্মীয়ের জন্য, এখানে নারীরা অন্তর্ভুক্ত নয়। একই অর্থবোধক শব্দ একাধিকবার ব্যবহারের মাধ্যমে গুরুত্ব বোঝানোর চল রয়েছে। যেমন যাকাতের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, [২১] ( ... فَابْنُ لَبَوْنٍ ذَكَرٍ ...)
এখানে, নির্দিষ্ট বয়সের দুগ্ধপোষ্য মদ্দা উটকে বোঝানো হয়েছে, ‘উট’ পুংলিঙ্গবাচক শব্দ হবার পরেও (ذَكَرٍ) ‘মদ্দা’ শব্দটি বাহ্যত অপ্রয়োজনীয় বা আতিশয্যবাচক মনে হলেও এর মাধ্যমে গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে।

টিকাঃ
[১৯] আবূ দাউদ, ৪৬৮১; তিরমিযি, ২৬৪২, সহীহ।
[২০] বুখারি, ৬৭৩২; মুসলিম, ১৬১৫।

📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 বন্ধুত্ব ও শত্রুতার উৎস

📄 বন্ধুত্ব ও শত্রুতার উৎস


যিনি আল্লাহর ওলি, তিনি আল্লাহর সব বিধানের সাথে একমত পোষণ করেন এবং আল্লাহ যা ভালোবাসেন তাতে খুশি থাকেন ও সন্তুষ্টচিত্তে পালন করেন। আর আল্লাহ যা অপছন্দ করেন, তিনিও তা অপছন্দ করেন। তিনি সৎকাজের আদেশ ও মন্দ কাজে নিষেধ করেন। সুতরাং সহজেই বোঝা যাচ্ছে, যারা আল্লাহর ওলির সাথে দুশমনি করে, তারা মূলত আল্লাহর বিরুদ্ধেই শত্রুতা করে।
যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّى وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ
“হে মুমিনগণ, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদের বন্ধুরূপে গ্রহণ কোরো না।”[২২]
কাজেই, যারা আল্লাহর ওলির বিরুদ্ধে শত্রুতা পোষণ করে তারা আল্লাহর প্রতিই শত্রুতা পোষণ করে, আর যে আল্লাহর প্রতি শত্রুতা পোষণ করে সে তো আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত! এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর আউলিয়াদের ব্যাপারে বর্ণিত হাদীসে কুদসিতে বলেছেন,
مَنْ عَادَى لِي وَلِيًّا فَقَدْ آذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ
“যে আমার ওলির বিরুদ্ধে শত্রুতা পোষণ করল, সে আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হলো।”[২৩]

টিকাঃ
[২১] বুখারি, ১৪৫৪。
[২২] সূরা মুমতাহিনা, ৬০: ১。
[২৩] বুখারি, ৬৫০২।

📘 ফুরকান রহমানের আউলিয়া ও শয়তানের আউলিয়া চিহ্নিতকরনের বিবরণ > 📄 নবিগণ শ্রেষ্ঠ আউলিয়া

📄 নবিগণ শ্রেষ্ঠ আউলিয়া


আল্লাহর আউলিয়াদের মধ্যে সর্বোত্তম হলেন নবিগণ (আলাইহিমুস সালাম)। আর নবিদের মধ্যে সর্বোত্তম হলেন রাসূলগণ। আর রাসূলদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ পাঁচ জন। কুরআনে তাদেরকে 'উলুল আযমি মিনার রুসুল' مِنْ الرُّسُلِ اولُوا الْعَزْمِ مِنَ 'দৃঢ় সংকল্পের অধিকারী' বলা হয়েছে। তারা হলেন নূহ, ইবরাহীম, মূসা, ঈসা এবং মুহাম্মাদ (আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালাম)। আল্লাহ তাআলা বলেন,
شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّىٰ بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَىٰ أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ
"তিনি তোমাদের জন্যে দ্বীনের ক্ষেত্রে সে পথই নির্ধারণ করেছেন, যার আদেশ দিয়েছিলেন নূহকে; যা আমি প্রত্যাদেশ করেছি আপনার প্রতি এবং যার আদেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা ও ঈসাকে এই মর্মে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করো এবং তাতে অনৈক্য সৃষ্টি কোরো না।”[২৪]
অন্যত্র এসেছে,
وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّينَ مِيثَاقَهُمْ وَمِنكَ وَمِن نُّوحٍ وَإِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ۖ وَأَخَذْنَا مِنْ هُم مِّيثَاقًا غَلِيظًا لِّيَسْأَلَ الصَّادِقِينَ عَن صِدْقِهِمْ ۚ وَأَعَدَّ لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا أَلِيمًا
"যখন আমি নবিদের কাছ থেকে, আপনার কাছ থেকে এবং নূহ, ইবরাহীম, মূসা ও মারইয়াম-তনয় ঈসার কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম এবং অঙ্গীকার নিলাম তাদের কাছ থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার। সত্যবাদীদের তাদের সত্যবাদিতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করার জন্য। তিনি কাফিরদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।”[২৫]

টিকাঃ
[২৪] সূরা শুআরা, ৪২: ১৩。
[২৫] সূরা আহযাব, ৩৩: ৭-৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00