📘 ফিতনার ইতিহাস 📄 মুআবিয়া রা.-কে হত্যার চেষ্টা

📄 মুআবিয়া রা.-কে হত্যার চেষ্টা


এদিকে মুআবিয়া রা.-এর অপেক্ষায় ওত পেতে থাকা বারক ইবনে আবদুল্লাহ তার ওপর বিষাক্ত তরবারি দিয়ে আঘাত করে। মুআবিয়া রা. সেই আঘাত থেকে বেঁচে গেলেও তার উরুতে আঘাত লাগে। লোকেরা তাকে ধরে বাড়িতে নিয়ে যায় এবং বারক ইবনে আবদুল্লাহকে আটক করে। এরপর মুআবিয়া রা.-এর চিকিৎসা করা হয়। আল্লাহ তাকে আরোগ্য দান করেন।

টিকাঃ
৩৪১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২৬৪

📘 ফিতনার ইতিহাস 📄 আমর ইবনুল আস রা.-কে হত্যার চেষ্টা

📄 আমর ইবনুল আস রা.-কে হত্যার চেষ্টা


আমর ইবনুল আস রা.-কে হত্যার প্রতিশ্রুতিদাতা আমর ইবনে বকর অপেক্ষা করতে থাকে, তিনি কখন ফজরের নামাজের জন্য বের হন। কিন্তু এদিন আমর ইবনুল আস রা. অসুস্থ ছিলেন। তাই তিনি তার নায়েব খারিজাকে নামাজের দায়িত্ব প্রদান করেন। আমর ইবনে বকর সেই নায়েবকেই আমর ইবনুল আস ভেবে হত্যা করে। লোকেরা তাকে ধরে ফেলে এবং নায়েবকে হত্যা করার শাস্তিস্বরূপ আমর ইবনে বকরকে হত্যা করা হয়। এভাবে আল্লাহ তাআলা আমর ইবনুল আস রা.-কে বাঁচিয়ে দেন। লোকেরা বলতে থাকে, তার ইচ্ছা ছিল আমরকে হত্যা করা। কিন্তু আল্লাহ চেয়েছেন খারিজার মৃত্যু। অতঃপর এই কথাটি একটি প্রবাদে পরিণত হয়। যখন কেউ কোনো কাজের ইচ্ছা করে এবং আল্লাহর ইচ্ছা থাকে ভিন্ন, তখন এই কথাটি বলা হয়।

টিকাঃ
৩৪২. আল-কামিল ফিত তারিখ, ২/৭৪৩; তারিখু ইবনি খালদুন, ২/৬৪৭

📘 ফিতনার ইতিহাস 📄 হাসান রা. ও আমুল জামাআ

📄 হাসান রা. ও আমুল জামাআ


আলি রা.-এর হত্যাকাণ্ডের পর মুসলিমগণ হয়ে পড়েন খলিফাশূন্য। তখন তারা নতুন খলিফা নির্বাচনে চিন্তাভাবনা শুরু করে দেন। ইরাকের যখন এমন পরিস্থিতি, শামে তখন মুআবিয়া রা.-এর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। তার রাজত্ব ছিল বিশাল এবং তা ছিল যথেষ্ট শক্তিশালী ও সুরক্ষিত। ফলে তারা নিজেদের শক্তিমত্তা অনুভব করতে শুরু করে। আলি রা.-এর ইন্তেকালের পর ইরাকের অধিবাসীরা একত্র হয়ে হাসান রা.-এর হাতে বাইআত গ্রহণ করে তাকে খলিফা হিসাবে মেনে নেয়। তাদের এই খলিফা নির্বাচন অবশ্যই সঠিক ছিল। হাসান রা. ছিলেন একজন খোদাভীরু, পরহেজগার, আলেম ও মুজাহিদ। তিনি ছিলেন রাসুল ﷺ-এর ভাষায় রায়হানা (একটি সুগন্ধি ফুল)। রাসুল ﷺ তাঁকে সাইয়িদ তথা নেতা উপাধি দিয়েছিলেন। এজন্য তাঁকে সাইয়িদুল মুসলিমিন অর্থাৎ মুসলিমদের নেতা বলা হতো।

ইরাকবাসী হাসান রা.-এর হাতে বাইআত গ্রহণের জন্য একত্র হয়। কায়স ইবনে সাদ রা.-ও আসেন। তার অধীনে ছিল আজারবাইজান ও ৪০ হাজার সৈন্য। কায়স ইবনে সাদ রা. হাসান রা.-কে বলেন, আপনার হাত প্রসারিত করুন। আমরা বাইআত গ্রহণ করব। হাসান রা. তার কথার কোনো জবাব দেননি। তিনি কায়স ইবনে সাদ রা.-এর এ কথায় সন্তুষ্ট হননি এবং এমনটি কামনাও করেননি। কারণ, তিনি জানেন যে, এর পরে রয়েছে অনেক রক্ত। কিন্তু কায়স রা.-এর বারংবার পীড়াপীড়ির কারণে অবশেষে তিনি সম্মত হন। এ ছিল ৪০ হিজরির ১৭ রমজান, আলি রা.-এর ইন্তেকালের দিনের ঘটনা।

ইরাকে হাসান রা.-এর জন্য বাইআত সম্পন্ন হয়। এদিকে শামের অধিবাসীরা আলি রা.-এর ইন্তেকালের পর খলিফা হিসাবে মুআবিয়া রা.-এর কোনো বিকল্প দেখতে পায়নি। শামের অধিবাসীরা মুআবিয়া রা.-এর হাতে বাইআত গ্রহণ করে। ফলে মুসলিম ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একই সঙ্গে দুই খলিফা নির্বাচিত করার ঘটনা ঘটে। তাদের একজন শামে, আরেকজন ইরাকে। এমনটি শরিয়তসম্মত নয়।

হাসান ইবনে আলি রা. লড়াই পছন্দ করতেন না। তিনি তার পিতা আলি রা.-কে সিফফিনের উদ্দেশে যাত্রা করা থেকে নিষেধ করেছিলেন। তাই খেলাফত গ্রহণের পর থেকেই হাসান রা. লড়াই ও রক্তপাত এড়িয়ে লোকদের নিরাপত্তার প্রতি আগ্রহী হন। কিন্তু ইরাকের অধিবাসীরা শামের অধিবাসীদের সঙ্গে লড়াই ও ইরাকের নেতৃত্বের জেদে অটল থাকে। হাসান রা. তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। শামের অধিবাসীদের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য কয়েক হাজার লোক সমবেত হয়। হাসান রা. নিজের অপছন্দসত্ত্বেও শামের অধিবাসীদের সঙ্গে লড়াই করার উদ্দেশ্যে বাহিনী নিয়ে বের হতে বাধ্য হন। মুআবিয়া রা. এ সংবাদ শুনতে পেয়ে তিনিও তার বাহিনী নিয়ে বেরিয়ে পড়েন।

দুই বাহিনী যতই নিকটবর্তী হচ্ছিল হাসান রা.-এর মনের অস্থিরতা কেবলই বেড়ে যাচ্ছিল। তিনি চাইলেন মুআবিয়া রা.-এর কাছে কয়েকটি চিঠি পাঠিয়ে তাকে তার মত থেকে ফিরে আসার আহ্বান করতে। কিন্তু মুআবিয়া রা. দেখলেন, উসমান রা.-কে হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের এমন সুবর্ণ সুযোগ হয়তো আর কখনো আসবে না। এদিকে হাসান রা.-এর সঙ্গে আগত ইরাকি বাহিনী সংখ্যায় ছিল বিশাল এবং তারা ছিল লড়াইয়ের জন্য উদ্‌গ্রীব। হাসান বসরি রহ. বলেন, হাসান রা. মুআবিয়া রা.-এর মুখোমুখি হলেন পর্বতসম সেনাবাহিনী নিয়ে। আমর ইবনুল আস রা. তাদের দেখে বললেন, আমি এমন এক বাহিনী দেখতে পাচ্ছি যারা তাদের প্রতিপক্ষকে হত্যা না করে পশ্চাদ্গমন করবে না। মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রা. বললেন, যদি তারা নিহত হয় তাহলে আমার হয়ে লোকদের দেখভাল কারা করবে? মুআবিয়া রা. নিজেও যুদ্ধবিগ্রহ অপছন্দ করতেন।

তখন তিনি হাসান রা.-এর সঙ্গে পরামর্শ ও আলাপ করার জন্য দুইজন দূত প্রেরণ করার সিদ্ধান্ত নেন। আবদুর রহমান ইবনে সামুরা রা. ও আবদুল্লাহ ইবনে আমের রা.-কে দূত হিসাবে প্রেরণ করা হয়। তারা হাসান রা.-এর সঙ্গে বৈঠকে বসেন। হাসান রা. বলেন, নিশ্চয় এই উম্মত তাদের রক্ত নিয়ে সর্বনাশে মত্ত হয়ে গিয়েছে। তখন আগত দূতদ্বয় তাকে বলেন, মুআবিয়া রা. আপনাকে এই প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি আপনার কাছে এমনটি কামনা করেন এবং আপনার সঙ্গে সন্ধি করতে চান। হাসান রা. বলেন, আমাকে এ কথার নিশ্চয়তা কে দেবে? তারা দুজন বললেন, আমরা আপনাকে এই নিশ্চয়তা দিচ্ছি। হাসান রা. এতে খুবই আনন্দিত হন।

এরপর হাসান ইবনে আলি ইবনে আবু তালেব রা. ইসলামি ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক একটি পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি সম্পূর্ণ সন্তুষ্টির সঙ্গে মুআবিয়া রা.-এর কাছে খেলাফত ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মুসলিমদের রক্তপাতের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য মুআবিয়া রা.-এর কাছে খেলাফত ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। হাসান রা. মুআবিয়া রা.-এর কাছে চিঠি পাঠান। তিনি এ শর্তে খেলাফত থেকে সরে দাঁড়াবেন-যে, মুসলিমদের মধ্যে কোনো রক্তপাত হবে না এবং তার বাহিনী লড়াই ছাড়াই প্রত্যাবর্তন করবে। এভাবেই হাসান রা.-এর ৬ মাসব্যাপী খেলাফতের পর মুআবিয়া রা. শরয়ি খলিফা হিসাবে নির্বাচিত হন।

হাসান রা.-এর খেলাফত ছেড়ে দেওয়া ও এর মাধ্যমে লোকদের মধ্যে মীমাংসা করে দেওয়া রাসুল ﷺ-এর নবুয়তের দলিলসমূহের একটি। সহিহ বুখারি-তে বর্ণিত আছে, আবু বাকরা রা. প্রায়ই বলতেন, আমি দেখেছি রাসুল ﷺ মিম্বরে উপবিষ্ট আর হাসান রা. তাঁর পাশেই বসা। তিনি বলেন, আমার এই সন্তান একজন নেতা। অচিরেই আল্লাহ তাআলা তার মাধ্যমে মুসলিমদের দুই বিরাট দলের মধ্যে মীমাংসা করবেন। (৩৪৬)

হাসান রা.-ই ছিলেন ইরাক ও শামের দুই বাহিনীর মধ্যে মীমাংসার মাধ্যম। ৪১ হিজরির সেই বছরকে আমুল জামাআ অর্থাৎ ঐক্যবদ্ধতার বছর নামে অভিহিত করা হয়। মুসলিমদের জন্য এ বছর ছিল খুবই সৌভাগের। দীর্ঘ সময়ের বিভেদের পর এ বছরেই তাদের বিরোধ মিটে যায় এবং তারা এক কাতারে ঐক্যবদ্ধ হয়। কিন্তু ইরাকের স্বভাবজাত বিদ্রোহীরা হাসান রা.-এর এই সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হয়। সাফিনা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুল ﷺ-কে বলতে শুনেছি, খেলাফত হবে ৩০ বছর। এরপর হবে রাজত্ব। (৩৪৭)

সাফিনা রা. বলেন, আবু বকর রা.-এর খেলাফত ছিল দুই বছর, উমর রা.-এর খেলাফত ১০ বছর, উসমান রা.-এর খেলাফত ১২ বছর এবং আলি রা.-এর খেলাফত ছিল ছয় বছর। হাসান রা. যে ছয় মাস খেলাফতের দায়িত্বে ছিলেন তার মাধ্যমে খেলাফতে রাশেদা সমাপ্ত হয় এবং মুআবিয়া রা.-এর মাধ্যমে শুরু হয় সেই রাজত্ব, যার সংবাদ রাসুল ﷺ দিয়ে গিয়েছিলেন। হাসান রা.-এর খেলাফতের মাধ্যমে ৩০ বছর পূর্ণ হয়ে যায়। ছয় বছরব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর প্রথমবারের মতো যুদ্ধের আগুন নিভে যায়। মুসলিমরা আবার একতাবদ্ধ হয় একজন শাসকের অধীনে।

টিকাঃ
৩৪৩. তারিখু ইবনি খালদুন, ২/৬৪৮
৩৪৪. তারিখু ইবনি খালদুন, ২/৬৪৮
৩৪৫. তাহযিবুল কামাল, ৬/২৪৯; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮/১৯
৩৪৬. সহিহ বুখারি, ২৭০৪; সহিহ ইবনি হিব্বান, ৬৯৬৪; আল-মুসতাদরাক লিল হাকিম, ৪৮১০
৩৪৭. আল-মুসনাদ লিল ইমাম আহমাদ, ২১৯১৯

ফন্ট সাইজ
15px
17px