📄 মিশরের পরিস্থিতি
মিশর ছিল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দূরে। এ সময় আলি রা.-এর পক্ষ থেকে মিশরের গভর্নর ছিলেন মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা.। তবে তিনি মিশরের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। বিশেষ করে সিফফিনের যুদ্ধ এবং আলি রা.-এর বিরুদ্ধে খারেজিদের বিদ্রোহের পর মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা.-এর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মুআবিয়া রা. ও আমর ইবনুল আস রা-এর সমর্থকদের শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে। যাদের দাবি ছিল, প্রথমে উসমান রা.-এর খুনিদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে হবে, তারপর আলি রা.-এর হাতে বাইআত গ্রহণ করা হবে। মিশরে মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা.-এর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার কারণ ছিল দুটি।
এক. মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা. তখন ছিলেন অল্পবয়স্ক। মিশরের গভর্নর হিসাবে নিযুক্তির সময় তার বয়স ২৬-ও পার হয়নি।
দুই. মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা.-কে গভর্নর হিসাবে নিয়োগ দেওয়ার বাইআত গ্রহণের পূর্বে উসমান রা.-এর হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের পক্ষাবলম্বীদের মনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। কারণ, উসমান ইবনে আফফান রা কে যারা অবরুদ্ধ করে রেখেছিল, তাদের মধ্যে তিনিও ছিলেন। শুরুতে তিনি ফিতনাবাজদের সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু আমরা উল্লেখ করেছি, তিনি তার এ কাজের জন্য অনুতপ্ত হয়েছেন এবং উসমান রা.-এর সামনেই তওবা করেছেন। যখন উসমান রা. তাকে তার পিতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন, তখন তিনি কান্না শুরু করেন এবং নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হন। এরপর তিনি উসমান রা.-এর পক্ষ হয়ে ফিতনাবাজদের প্রতিরোধ করা শুরু করেন। কিন্তু তারা তাকে পরাজিত করে। অতঃপর উসমান রা.-এর ঘরে প্রবেশ করে তাকে হত্যা করে। উসমান রা.-এর স্ত্রী নায়েলা বিনতে ফারাফিসা রহ. এ কথার সাক্ষ্য দিয়েছেন।
তারা মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা.-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার কথা ভাবতে থাকে। তাদের শক্তি ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। অপরদিকে মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা.-এর নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই দুর্বল হতে থাকে। মিশরে উসমান রা.-এর হত্যার প্রতিশোধের দাবিদাররা নিজেদের নাম দিয়েছিল উসমানি। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন মুআবিয়া ইবনে হুদাইজ সাকুনি রা.। যিনি ছিলেন উসমান রা.-এর মৃত্যুর পূর্বে তার সাহায্যে প্রেরিত বাহিনীর অগ্রভাগের সেনাপতি। উসমান রা.-এর হত্যার সংবাদ শোনার পর তিনি মিশরে ফিরে এসেছিলেন।
মিশর আলি রা.-এর তুলনায় মুআবিয়া রা.-এর বেশি নিকটবর্তী ছিল। মুআবিয়া রা. যখন জানতে পারলেন যে, মিশরের ওপর মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা.-এর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল। তখনই তিনি আমর ইবনুল আস রা.-এর নেতৃত্বে ৬ হাজার সৈন্যের এক বাহিনী পাঠিয়ে দেন মিশরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের জন্য। আমর ইবনুল আস রা. মিশর সম্পর্কে পূর্ব থেকেই অবগত ছিলেন। তিনিই প্রথম এ অঞ্চল জয় করেন এবং আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারহ রা.-এর পূর্বে উমর রা. ও উসমান রা-এর পক্ষ থেকে দীর্ঘকাল মিশরের গভর্নর ছিলেন।
এই ৬ হাজার সৈন্যের সঙ্গে যোগ হয় মিশরের মুআবিয়া ইবনে হুদাইজ রা.- এর নেতৃত্বাধীন ১০ হাজার সৈন্য। ফলে তাদের বাহিনীর সেনা সংখ্যা পৌঁছে যায় ১৬ হাজারে। মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা. মিশরের অধিবাসীদের কাছে লড়াইয়ের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার আহ্বান করেন। তাদের মধ্যে অনেকেই ছিল ইয়ামেনের অধিবাসী, যারা মিশরে বসবাস করত। তারা মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা.-এর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। এরপরও তিনি তাদের জিহাদের জন্য উদ্বুদ্ধ করলে সাকুল্যে ২ হাজার লোক তার আহ্বানে সাড়া দেয়। আলি রা. এ খবর জানতে পেরে মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা.- এর সাহায্যে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। আশতার নাখায়িও সেই বাহিনীতে ছিল। মিশরের কুলযুম নামক স্থানে পৌঁছলে আশতার নাখায়ির সঙ্গে জনৈক লোকের সাক্ষাৎ হয়। লোকটি আশতার নাখায়িকে মধু পান করায়। পান করা মাত্রই বিষক্রিয়ায় আশতার নাখায়ি মারা যায়।
বর্ণিত আছে, আশতার নাখায়িকে বিষাক্ত মধু পান করানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রা.। তবে এই বর্ণনায় সন্দেহ ও দুর্বলতা রয়েছে। আর যদি তা সহিহও হয়ে থাকে তবে এতে মুআবিয়া রা.- এর শক্ত দলিল রয়েছে। তিনি উসমান রা.-এর হত্যায় যারা জড়িত ছিল তাদের সকলকে হত্যা করা বৈধ মনে করতেন। এসব যুদ্ধবিগ্রহ ঘটার পেছনে এটিই তো ছিল একমাত্র কারণ। আর আশতার নাখায়ি ছিল উসমান রা.-কে অবরোধকারীদের একজন। এ ব্যাপারে সে লোকদের যথেষ্ট উৎসাহিত করেছে।
আশতার নাখায়ির মৃত্যুতে মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা.-এর শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ, আশতার ছিল প্রভাবশালী ও দূরদর্শী। সমরবিদ্যায় সে ছিল খুবই পারদর্শী। মুআবিয়া রা. ও আমর ইবনুল আস রা.-এর কাছে যখন আশতারের মৃত্যু সংবাদ পৌঁছে, তখন তারা বলেন, সুবহানাল্লাহ, মধুও আল্লাহ তাআলার সৈনিকের কাজ করে।
আমর ইবনুল আস রা. চাইতেন, যেন লড়াই ছাড়াই সব কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়। তাই তিনি মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা.-এর কাছে চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি লেখেন, আমি চাই না আমার পক্ষ থেকে তোমার ওপর একটি নখের আঁচড়ও লাগুক। এ দেশের লোকেরা তোমার বিরুদ্ধে ও আমার নেতৃত্ব মেনে নিতে একমত হয়েছে এবং তোমার আনুগত্য করাকে নিজেদের জন্য লজ্জাজনক মনে করছে। তাই আমরা মুখোমুখি হলে তারা তোমাকে আমাদের হাতে তুলে দেবে। তাই তুমি মিশর থেকে বেরিয়ে পড়ো। নিশ্চয় আমি তোমার একজন শুভাকাঙ্ক্ষী।
কিন্তু মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা. তার কথা শোনেননি। ফলে উভয় পক্ষ লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। আমর ইবনুল আস রা.-এর পক্ষ বিজয়ী হয় আর মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা.-এর সঙ্গে থাকা অল্পসংখ্যক কিছু লোকের বাহিনী হয় পরাজিত। মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা. যুদ্ধে শহিদ হন। কথিত আছে, যুদ্ধের পরে শামের বাহিনীর কয়েকজন তার পিছু নেয় এবং যুদ্ধক্ষেত্রের কাছেই একটি বিরান জায়গায় তাকে হত্যা করে।
মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা.-এর হত্যার ঘটনায় আলি রা. খুবই ব্যথিত হন। তিনিই তাকে লালনপালন করে বড় করেছিলেন। আবু বকর রা.-এর মৃত্যুর পর তার স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস রা.-এর ইদ্দত পালন শেষে আলি রা.-এর সঙ্গে তার বিয়ে হয় এবং আলি রা. মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা.-কে লালনপালন করেন।
এমনইভাবে আয়েশা রা.-ও তার মৃত্যুতে শোকাহত হন এবং তার সন্তানদের লালনপালনের জন্য নিজের কাছে নিয়ে আসেন। এভাবেই মিশরে আমর ইবনুল আস রা.-এর কার্যকরী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয় এবং তিনি মুআবিয়া রা.-এর পক্ষ থেকে সেখানকার গভর্নর নিযুক্ত হন। এর ফলে শাম ও মিশর মুআবিয়া রা.-এর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
এদিকে ইরাকের মাটিতে আলি রা.-এর বিরুদ্ধে লোকদের বিরুদ্ধাচারণ দিনদিন বাড়তেই থাকে। ফলে আলি রা. অত্যন্ত রাগান্বিত হন এবং তাদের সামনে একটি দীর্ঘ বক্তব্য পেশ করেন। বলেন, আল্লাহর শপথ! ধোঁকাগ্রস্ত তো তারা, যাদের তোমরা ধোঁকা দিয়েছ। যারা তোমাদের ছেড়ে গিয়েছে তারা তাদের প্রাপ্য অংশ পেয়ে গিয়েছে। যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য ডাকি, তখন কোনো ভালো মানুষ পাই না। আর যখন একান্তে কথা বলি, তখন কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তি পাই না। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আমি তোমাদের কাছ থেকে কী আশা করেছিলাম আর কী পেলাম! তোমরা অন্ধ, কিছুই দেখতে পাও না। মুক, কিছুই বলতে পারো না এবং বধির, কিছুই শুনতে পারো না। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
ইবনে কাসির রহ. এ ব্যাপারে বলেন, একদিকে শামবাসীদের শক্তি যতই বৃদ্ধি পাচ্ছিল, অপরদিকে ইরাকবাসীদের শক্তি ততই দুর্বল হচ্ছিল। অথচ তাদের নেতা আলি রা. ছিলেন তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ, সবচেয়ে বেশি ইবাদতকারী, সবচেয়ে দুনিয়াবিমুখ, সবচেয়ে জ্ঞানী ও সবচেয়ে খোদাভীরু ব্যক্তি। এতৎসত্ত্বেও তারা তাকে এতই লাঞ্ছিত করে যে, তিনি জীবনকে ঘৃণা করতে শুরু করেন। মৃত্যু কামনা করতে থাকেন। ক্রমাগত বাড়তে থাকা ফিতনা ও বিপর্যয় তার মনে জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্ম দিয়েছিল। তিনি প্রায়ই বলতেন, সেই দুর্ভাগাকে কে রুখে দিয়েছে? সে কীসের প্রতীক্ষায় আছে?
টিকাঃ
৩২৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩৪৩; আল-কামিল ফিত তারিখ, ২/৭২২
৩২৯. তারিখুত তবারি, ৪/১৩৩; আল-কামিল ফিত তারিখ, ২/৩৯৭; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩৪৬; আন-নুজুমুয যাহিরা, ১/১০৪
৩৩০. তারিখুত তবারি, ৫/১০১; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩৪৮
৩৩১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩৪৯
৩৩২. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩৫৮
৩৩৩. আল-মুসনাদ লিল ইমাম আহমাদ, ৭০৩; আল-মুসতাদরাক লিল হাকিম, ৪৬৮৭
📄 আলি রা.-কে হত্যার ব্যাপারে তিনজনের ষড়যন্ত্র
খারেজিরা কিছুতেই থেমে ছিল না। যতবার তারা আলি রা.-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, ততবারই তাদের দলের বহু মানুষকে গ্রহণ করতে হয়েছে মৃত্যুর স্বাদ। তবুও তারা থেমে থাকত না। একের পর এক বিদ্রোহ ঘোষণা করতেই থাকত। ইরাকের অবস্থা এমন দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্য দিয়েই চলতে থাকে। অপরদিকে শামের পরিস্থিতি ছিল শান্ত। সেখানকার সবাই ছিল মুআবিয়া রা.-এর প্রতি পূর্ণ অনুগত।
এ সময়ে খারেজিদের তিনজন ব্যক্তি একত্র হয়। প্রথমজনের নাম ছিল আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম কিন্দি। অধিক ইবাদতের কারণে তার চেহারায় দাগ পড়ে গিয়েছিল। এজন্য সে প্রসিদ্ধও ছিল। অপর দুজনের নাম ছিল বারক ইবনে আবদুল্লাহ তামিমি ও আমর ইবনে বকর তামিমি। এখন তাদের কী করা উচিত এ নিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে। তারা সালিশ নির্ধারণের বিষয়টি কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। আলি রা., মুআবিয়া রা. ও আমর ইবনুল আস রা.-সহ সালিশ নির্ধারণে সম্মত সকলকেই তারা কাফের সাব্যস্ত করে। নাহরাওয়ানের যুদ্ধ ও পরবর্তী যুদ্ধগুলোতে তাদের যে-সকল ভাই নিহত হয়েছে, তাদের জন্য রহমতের দোয়া করে।
তারা বলে, তাদের মৃত্যুর পর এখন আমরা বেঁচে থেকে কী করব। তারা বেঁচে থাকতে আল্লাহর পথে কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া করত না। তারা আরও বলে, যদি আমরা এই পৃথিবী থেকে আমাদের প্রাণকে ক্রয় করে নিয়ে ওই সকল ভ্রান্ত নেতাদের কাছে গিয়ে তাদের হত্যা করতে পারতাম! যদি আমরা এদের হাত থেকে দেশসমূহকে নিষ্কৃতি দিতে পারতাম এবং এদের কাছ থেকে আমাদের ভাই হত্যার প্রতিশোধ নিতে পারতাম!
তখন আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম বলে ওঠে, আলিকে হত্যা করার জন্য আমিই যথেষ্ট।
বারক বলে, আমি মুআবিয়াকে হত্যার জন্য যথেষ্ট।
আমর ইবনে বকর বলে, আমি আমর ইবনুল আসকে হত্যার জন্য যথেষ্ট।
অতঃপর তারা এ ব্যাপারে শপথ গ্রহণ করে। তাদের কেউই এই শপথ ভঙ্গ করবে না এই মর্মে একমত হয়। অচিরেই তারা তাদের হত্যা করার জন্য অথবা নিজেরা মৃত্যুবরণ করার জন্য রওনা হবে। তারা ঠিক করে রমজান মাসে তাদের হত্যা করা হবে। অল্প কিছু লোক ব্যতীত অন্য সবার কাছে তারা বিষয়টি গোপন রাখে। ওই অল্পসংখ্যক লোকের মধ্য থেকেই কেউ কেউ পরবর্তী সময়ে তওবা করে নেয় এবং এই ষড়যন্ত্রের কথা বর্ণনা করে।
বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত আছে, কিতাম বিনতে সিজনা নামক এক সুন্দরী নারীর পিতা ও ভাই নাহরাওয়ানের যুদ্ধে নিহত হয়েছিল। আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম যখন কিছু লোকের সঙ্গে আলি রা.-এর হত্যার ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করছিল, তখন কিতাম বিনতে সিজনা তার কাছে আসে। আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম কিতামকে দেখে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালে কিতাম ৩ হাজার দিরহাম, একটি গোলাম, একটি বাঁদি ও আলি রা.-কে হত্যা করার শর্ত করে। তখন আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম বলে, আমি তো এ কাজের জন্যই কুফায় এসেছি। কিতাম আবদুর রহমান ইবনে মুলজিমকে এ কাজের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। অতঃপর সে কিতামকে বিয়ে করে। ফলে আলি রা.-কে হত্যা করার ইচ্ছা তার আরও দৃঢ় হয়।
আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম শাবিব ইবনে নাজদা শিজয়ি নামক অপর এক ব্যক্তির কাছে গিয়ে বলে, দুনিয়া ও আখেরাতের সম্মানের প্রতি আপনার কোনো আগ্রহ আছে কী?
শাবিব বলে, তা কীভাবে?
আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম বলে, আলিকে হত্যা করার মাধ্যমে।
তখন শাবিব বলে, তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক! কতই-না নিকৃষ্ট কথা বললে তুমি। এটা কীভাবে সম্ভব?
শাবিব আবদুর রহমান ইবনে মুলজিমের এ পরিকল্পনার কারণে তাকে তিরস্কার করে। কারণ, আলি রা. হলেন একজন শক্তিশালী, বাহাদুর ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। বিভিন্ন যুদ্ধে তার রয়েছে বিশাল অবদান ও অতুলনীয় বীরত্বের দৃষ্টান্ত। এরপর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, তিনি হলেন আমিরুল মুমিনিন।
আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম বলে, আমি তার জন্য মসজিদে ওত পেতে থাকব। সে যখন আগামীকাল ফজরের নামাজের জন্য বের হবে আমরা তার ওপর হামলা করে তাকে হত্যা করব। যদি আমরা সফল হই তবে আমরা নিজেরাও বেঁচে যাব এবং আমাদের প্রতিশোধও নেওয়া হবে। আর যদি মরে যাই তবে এর চেয়ে উত্তম আর কী হতে পারে?
শাবিব বলে, তুমি ধ্বংস হও। আলি ছাড়া যদি অন্য কেউ হতো তবে আমার জন্য তা সহজ হতো। ইসলামে তার অগ্রগামীতা ও রাসুল ﷺ-এর নিকটবর্তিতার কথা আমি জানি। তাকে হত্যা করার জন্য আমার মন সায় দেয় না।
আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম বলে, তুমি কি জানো না সে নাহরাওয়ানের যুদ্ধে আমাদের ভাইদের হত্যা করেছে? আমরা তাদের হত্যার বিনিময়েই তাকে হত্যা করব।
এভাবে সে অনুপ্রাণিত করতে থাকলে একপর্যায়ে শাবিব তাকে সহযোগিতা করার আশ্বাস দেয়।
টিকাঃ
৩৩৪. মুসনাদু আবি ইয়ালা, ৪৮৫; আল-মুজামুল কাবির লিত তবারানি, ৭৩১১
৩৩৫. তারিখুত তবারি, ৫/১৪৪; আল-কামিল ফিত তারিখ, ২/৫৩৮; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩৬১
৩৩৬. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩৬১
৩৩৭. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩৬২
📄 আলি রা.-এর শাহাদাতবরণ
১৭ রমজান ফজরের সময় আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম আলি রা.-এর অপেক্ষায় ওত পেতে থাকে। আলি রা. নিজের ঘর থেকে ফজরের নামাজ পড়ার জন্য বের হন এবং সবাইকে নামাজের জন্য জাগ্রত করতে থাকেন। তার সঙ্গে কোনো প্রহরী থাকত না। মসজিদের কাছাকাছি যেতেই শাবিব ইবনে নাজদা তাকে সজোরে আঘাত করে। ফলে তিনি মাটিতে পড়ে যান। তবে এই আঘাতে তার মৃত্যু হয়নি। অতঃপর পাষণ্ড আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম এসে বিষমাখা তরবারি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে। তার দাড়ির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে যায় রক্ত।
এই আঘাতের পর পাষণ্ড আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম বলে ওঠে, আলি, ফয়সালা দেওয়ার অধিকার তোমার নেই, অধিকার রয়েছে একমাত্র আল্লাহর। সে কুরআনের এই আয়াত তেলাওয়াত করতে থাকে, 'কিছু মানুষ এমন আছে, যারা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির বিনিময়ে নিজেকে বিক্রি করে দেয়। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার প্রতি দয়াশীল।' [সুরা বাকারা : ২০৭]
আলি রা. চিৎকার করে বলতে থাকেন, এই লোকটিকে ধরো। লোকজন এসে আবদুর রহমান ইবনে মুলজিমকে আটকে ফেলে। আর শাবিব পালিয়ে যায়। অতঃপর আলি রা. ফজরের নামাজ পড়ানোর জন্য জাদা ইবনে হুবাইরা রা.-কে এগিয়ে দেন। লোকেরা তাকে ধরে বাড়িতে নিয়ে যায়। আলি রা. বুঝতে পারেন এই তরবারিটি ছিল বিষমাখা ও অচিরেই তিনি ইন্তেকাল করতে যাচ্ছেন। তখন তিনি আবদুর রহমান ইবনে মুলজিমকে ডাকেন। তাকে হাত বাঁধা অবস্থায় উপস্থিত করা হয়। আলি রা. বলেন, আল্লাহর শত্রু, আমি কি তোমার প্রতি সদাচারণ করিনি?
সে বলে, হ্যাঁ।
আলি রা. বলেন, তাহলে তুমি এমনটি কেন করলে?
সে বলে, আমি ৪০ দিন ধরে প্রতি সকালে তরবারিটি ধার দিয়েছি এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছি, যেন এর মাধ্যমে তার সবচেয়ে নিকৃষ্ট সৃষ্টিজীবকে হত্যা করা হয়।
আলি রা. বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি তোমার মৃত্যু দেখতে পাচ্ছি। আল্লাহ তাআলা তোমার দোয়া কবুল করে নিয়েছেন। এরপর তিনি বলেন, আমি যদি মারা যাই তবে তাকে হত্যা করো। যদি আমি বেঁচে থাকি তবে তার সঙ্গে কী করা উচিত, তা আমিই ভালো বুঝব।
মৃত্যু ঘনিয়ে এলে আলি রা. বেশি বেশি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করতে থাকেন। যেন এটিই হয় তার শেষ কথা। অতঃপর তিনি হাসান রা. ও হুসাইন রা.-কে অসিয়ত করেন। তারা তা লিপিবদ্ধ করে রাখেন—
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
এই হচ্ছে আলি ইবনে আবু তালেবের অসিয়ত। নিশ্চয় সে সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলা ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই ও তিনি অদ্বিতীয় এবং মুহাম্মাদ আল্লাহ তাআলার বান্দা ও রাসুল। তিনি তাঁকে সঠিক পথের দিশা ও সত্য ধর্ম দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যেন তিনি অন্য সব ধর্মের ওপর বিজয়ী হতে পারেন; যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে। 'বলুন, আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন-মরণ সবই বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহ তাআলারই জন্য। তাঁর কোনো শরিক নেই, আমাকে এরই আদেশ করা হয়েছে এবং আমিই প্রথম তাঁর আনুগত্য স্বীকারকারী।' [সুরা আনআম: ১৬২-১৬৩]
হাসান, আমি তোমাকে ও আমার সকল সন্তানকে—যাদের কাছে এই লেখা পৌঁছবে—অসিয়ত করছি যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলাকে ভয় করবে এবং মুসলিম অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করবে। সকলে মিলে আল্লাহর রজ্জু আঁকড়ে ধরবে এবং বিভক্ত হবে না। আমি রাসুল ﷺ-কে বলতে শুনেছি যে, দুই বিবদমান ব্যক্তির মধ্যে মীমাংসা করে দেওয়া সাধারণ নামাজ ও রোজা থেকে উত্তম। তোমাদের নিকটাত্মীয়দের প্রতি লক্ষ রাখবে এবং আত্মীয়তা বজায় রাখবে। এতে আল্লাহ তাআলা তোমাদের হিসাবকে সহজ করবেন। এতিমদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। তাদের তোমরা বঞ্চিত করো না এবং তোমাদের উপস্থিতিতে তারা যেন লাঞ্ছিত না হয়। তোমাদের প্রতিবেশীদের ব্যাপারেও আল্লাহকে ভয় করো। কারণ, এটি তোমাদের নবীর নির্দেশ। তিনি সর্বদা এ নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি আমরা ধারণা করেছি, তিনি প্রতিবেশীদের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে দেবেন।
আমি তোমাদের সতর্ক করছি কুরআনের ব্যাপারে। কুরআনের প্রতি আমলে কেউ যেন তোমাদের চেয়ে অগ্রবর্তী হতে না পারে। সতর্ক করছি নামাজের ব্যাপারে। নামাজ তোমাদের দ্বীনের স্তম্ভ। সতর্ক করছি তোমাদের প্রভুর গৃহের (মসজিদের) ব্যাপারে। তোমরা বেঁচে থাকতে তা যেন খালি না হয়। যদি তাকে ছেড়ে দাও, তাহলে তোমাদের প্রতিও ভ্রুক্ষেপ করা হবে না। সতর্ক করছি রমজান মাসের ব্যাপারে। নিশ্চয় রমজানের রোজা হচ্ছে জাহান্নাম থেকে বাঁচার ঢালস্বরূপ।
তোমাদের সতর্ক করছি নিজেদের জানমাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে যাওয়ার ব্যাপারে। সতর্ক করছি জাকাতের ব্যাপারে। নিশ্চয় তা প্রভুর ক্রোধ নিভিয়ে দেয়। সতর্ক করছি তোমাদের নবীর প্রতি দায়িত্ব নিয়ে। তোমাদের সামনে কেউ যেন তা লঙ্ঘন করতে না পারে। সতর্ক করছি রাসুল-এর সাহাবিগণের ব্যাপারে। কারণ, নবীজি সাহাবিগণের ব্যাপারে অসিয়ত করেছেন। সতর্ক করছি অসহায় ও দরিদ্রদের ব্যাপারে। তাদেরকে তোমাদের জীবিকায় শরিক করে নেবে। সতর্ক করছি তোমাদের মালিকানাধীন গোলাম-বাঁদি সম্পর্কে। কারণ, রাসুল-এর শেষ কথা ছিল এই, 'তোমাদেরকে দুর্বল দুই শ্রেণি অর্থাৎ তোমাদের স্ত্রী ও বাঁদিদের প্রতি লক্ষ রাখার অসিয়ত করছি।'
নামাজের প্রতি গুরুত্ব দেবে। আল্লাহর পথে কোনো নিন্দুকের নিন্দাকে পরোয়া করবে না। তারা তোমাদেরকে নিজেদের সংকল্প থেকে দূরে ঠেলে শেষে বিরোধিতা করবে। আল্লাহ তাআলার নির্দেশ অনুযায়ী লোকদের সঙ্গে উত্তম পন্থায় আলোচনা করবে। সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা থেকে কখনো বিরত হবে না। এমনটি হলে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে মন্দ ব্যক্তিরা ক্ষমতা দখল করে নেবে। অতঃপর তোমরা দোয়া করবে কিন্তু তা কবুল হবে না। তোমরা পরস্পর সম্প্রীতি রক্ষা করবে। একে অন্যের জন্য খরচ করবে। মানুষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, সম্পর্ক ছিন্ন করা ও বিভক্তি থেকে দূরে থাকবে। সৎ কাজ ও খোদাভীরুতায় একে অপরকে সহযোগিতা করবে। গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সহযোগিতা করবে না। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা কঠিন শান্তিদাতা। আল্লাহ তাআলা তোমাদের মাধ্যমে তোমাদের পরিবার এবং তোমাদের নবীর সম্মান সংরক্ষণ করুন। আমি তোমাদেরকে আল্লাহ তাআলার হাতে সোপর্দ করছি এবং তোমাদের প্রতি শান্তি ও রহমত বর্ষণ কামনা করছি।
এরপর আলি রা. লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করা ব্যতীত অন্য কোনো কথা বলেননি। অতঃপর শেষ মুহূর্তে এসে তিনি তেলাওয়াত করেন,
'যে অণু পরিমাণ নেক আমল করবে তা দেখতে পাবে। আর যে অণু পরিমাণ মন্দ আমল করবে তা-ও দেখতে পাবে।' [সুরা যিলযাল : ৭-৮]
অতঃপর তিনি শহিদ হয়ে মহান প্রভুর সান্নিধ্যে গমন করেন, যিনি ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০জন সাহাবির একজন। রাসুল -এর জামাতা ও চাচাতো ভাই। দুই পুত্র হাসান রা., হুসাইন রা. ও ভ্রাতুষ্পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে জাফর রা. তাকে গোসল করান। হাসান রা. তার জানাজার নামাজে ইমামতি করেন। এরপর আবদুর রহমান ইবনে মুলজিমকে নিয়ে আসা হয় এবং শরয়ি বিধান অনুযায়ী তাকে হত্যা করা হয়।
টিকাঃ
৩৩৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩৬২; তারিখু ইবনি খালদুন, ২/৬৪৬
৩৩৯. আল-মুজামুল কাবির লিত তবারানি, ১৬৭; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩৬৩
৩৪০. তারিখুল খুলাফা, পৃ. ১৩৬
📄 মুআবিয়া রা.-কে হত্যার চেষ্টা
এদিকে মুআবিয়া রা.-এর অপেক্ষায় ওত পেতে থাকা বারক ইবনে আবদুল্লাহ তার ওপর বিষাক্ত তরবারি দিয়ে আঘাত করে। মুআবিয়া রা. সেই আঘাত থেকে বেঁচে গেলেও তার উরুতে আঘাত লাগে। লোকেরা তাকে ধরে বাড়িতে নিয়ে যায় এবং বারক ইবনে আবদুল্লাহকে আটক করে। এরপর মুআবিয়া রা.-এর চিকিৎসা করা হয়। আল্লাহ তাকে আরোগ্য দান করেন।
টিকাঃ
৩৪১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২৬৪