📄 কথা সত্য মতলব খারাপ
আলি রা. কুফায় পৌঁছার পর খারেজিদের স্লোগান ছিল, আমরা আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে মানুষের ফয়সালা মানি না। ফয়সালা দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহর। তারা ছিল হারুরা নামক এলাকার অধিবাসী। রাসুল ﷺ বলেছিলেন, যখন মুসলিমদের মধ্যে কলহ ও মতভেদ সৃষ্টি হবে তখন একদল লোক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং এ দুই দলের মধ্যে যারা সত্যের অধিক নিকটবর্তী তারা সেই বিচ্ছিন্ন দলকে হত্যা করবে। (৩০০)
সহিহ বুখারি-তে আবু সাইদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত আছে, রাসুল ﷺ বলেছেন, পূর্বদিক থেকে এমন কিছু লোকের প্রকাশ ঘটবে, যারা কুরআন পাঠ করবে, কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালি অতিক্রম করবে না। তাদের চিহ্ন হচ্ছে মাথা মুণ্ডানো। (৩০১) আলি রা. বলেছেন, আমি রাসুল ﷺ-কে বলতে শুনেছি, শেষ যুগে এমন এক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে যারা হবে অল্পবয়স্ক যুবক ও নির্বোধ। তারা দ্বীন থেকে এমনভাবে বেরিয়ে যাবে, যেমনইভাবে তির শিকার থেকে বেরিয়ে যায়। তোমরা তাদের যেখানেই পাবে সেখানেই হত্যা করবে। (৩০৩)
আলি রা. তাদের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য বের হন। তিনি তাদের বলেন, আল্লাহ তাআলা কুরআনে স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপারে সালিশ পাঠানোর কথা বলেছেন। তিনি আরও বলেন, আমি 'আমিরুল মুমিনিন' উপাধি মুছতে সম্মত হয়েছি যেমন রাসুল ﷺ হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় করেছিলেন। (৩০৪) এ কথা শুনেও তাদের মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। আলি রা. তাদের কাছে পাঠান আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-কে।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. তাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য এলেন। ইবনে কাওয়া নামক এক ব্যক্তি তাকে তিরস্কার করে। তখন তাদের মধ্যে কিছু লোক বলল, আল্লাহর শপথ! অবশ্যই আমরা তার সঙ্গে কথা বলব। (৩০৫) অতঃপর আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. সেখানে তিন দিন অবস্থান করেন। তিন দিনব্যাপী এই আলোচনার পর ৪ হাজার লোক নিজেদের মত থেকে ফিরে আসেন এবং ইবনে আব্বাস রা.-এর হাতে তওবা করেন। (৩০৬)
বাকি যারা নিজেদের মতের ওপর অটল থাকে, তাদের মধ্যে চারদিক থেকে স্লোগান ওঠে— ফয়সালা দেওয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহ তাআলার। তখন আলি রা.-এর মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয় একটি ঐতিহাসিক বাক্য। তিনি বলেন, এই কথাটি সত্য, কিন্তু মতলব খারাপ। তিনি আরও বলেন, আমি আপনাদের ওপর আক্রমণ করব না যতক্ষণ আপনারা লড়াই শুরু না করেন। (৩০৭) এরপর তারা কুফা ত্যাগ করে নাহরাওয়ান নামক স্থানে আশ্রয় নেয়। আলি রা. তাদের কাছে দূত পাঠিয়ে বলেন, আপনাদের আর আমাদের মধ্যে এ চুক্তি রইল যে, আপনারা কোনো রক্তপাত করবেন না। (৩০৯)
৩৭ হিজরির রমজান মাসে আলি রা. ৪০০ সৈন্যের এক বাহিনী পাঠান দুমাতুল জান্দালের উদ্দেশে। সঙ্গে ছিলেন আবু মুসা আশআরি রা. ও আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.। মুআবিয়া রা.-ও ৪০০ সৈন্যের এক বাহিনী পাঠান। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-ও ছিলেন তাদের সঙ্গে। (৩১০)
টিকাঃ
৩০০. সহিহ মুসলিম, ১০৬৪; সুনানু আবি দাউদ, ৪৬৬৭
৩০১. সহিহ বুখারি, ৭৫৬২; আল-মুসনাদ লিল ইমাম আহমাদ, ১১৬১৪
৩০৩. সহিহ বুখারি, ৩৬১১; সহিহ মুসলিম, ১০৬৬
৩০৪. তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ২৯/১৪৩; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩১১
৩০৫. তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ২৭/১০৩; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩১১
৩০৬. তারিখুল ইসলাম, ৩/১৭৫। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩১১
৩০৭. তারিখুত তবারি, ৫/৭৪; তারিখু ইবনি খালদুন, ২/৬৩৭
৩০৯. তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ২৯/১৪৩; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩১১
৩১০. তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ২৩/৬৭
📄 সালিশ নির্ধারণের অদৃশ্য রহস্য
সালিশ নির্ধারণের বিষয়টি নিয়ে শিয়াদের যে বানোয়াট ও মিথ্যা বর্ণনাগুলো ছড়িয়েছে, সেগুলোর কথা মনে হলে কপাল ঘর্মাক্ত হয়ে যায়। উমাইয়া খেলাফতের সমাপ্তির পর আব্বাসীয় খেলাফতকালে শিয়ারা যখন বেশ শক্তিশালী অবস্থানে ছিল, তখন সেসব বর্ণনাগুলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। একমাত্র এ ধরনের বর্ণনাগুলোই বইপত্রে স্থান পায়। এমনকি বর্তমানেও বিষয়টি অনেকাংশে এমনই। এ ব্যাপারে যেসব শিয়া-বর্ণনা রচিত হয়েছে তার অধিকাংশ ছিল আবু মিখনাফ লুত ইবনে ইয়াহইয়ার হাতে।
📄 আবু মিখনাফের বানোয়াট বর্ণনা
আবু মিখনাফের বর্ণনায় পাওয়া যায়, তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, মুআবিয়া ও আলি উভয়কেই অপসারণ করা হবে এবং বিষয়টি লোকদের পরামর্শের ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে। আবু মুসা আশআরি রা. বলেন, অতএব আমি আলি এবং মুআবিয়াকে অপসারণ করলাম। কোনো কোনো বর্ণনায় আরও মিথ্যা পাওয়া যায়। যেমন, আবু মুসা রা. বলেছেন, আমি তাকে সরিয়ে দিলাম, যেভাবে আমার আঙুল থেকে আংটি সরিয়ে দিই। এরপর আমর ইবনুল আস রা. আসেন। তিনি বলেন, আবু মুসা আশআরি রা. যা বলেছেন তা তো আপনারা শুনেছেন। তিনি তার সাথিকে অপসারণ করেছেন। আমিও তাকে অপসারণ করলাম এবং মুআবিয়াকে বহাল রাখলাম।
এ কথা শুনে আলি রা.-এর বাহিনী থেকে শুরাইহ ইবনে হানি নামক ব্যক্তি আমর ইবনুল আস রা.-এর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। আবু মিখনাফ আরও বর্ণনা করে যে, আলি রা. ও মুআবিয়া রা. একে অপরকে অভিশাপ দিতেন। আবু মিখনাফের এই বর্ণনার পুরোটাই বানোয়াট ও মিথ্যা। ইবনে কাসির রহ. বলেন, এই বর্ণনা সহিহ নয়। (৩১১) শিয়া, ওরিয়েন্টালিস্ট ও তাদের হাতে দীক্ষাপ্রাপ্ত মুসলিমদের গ্রন্থে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, এই লড়াই হয়েছিল রাজত্ব ও শাসনক্ষমতার জন্য, তা কোনোভাবেই ঠিক নয়।
টিকাঃ
৩১১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩১৫
📄 দুই সালিশের প্রকৃত ঘটনা
অনেক পরামর্শ, আলোচনা ও মতানৈক্যের পর আবু মুসা আশআরি রা. আলি রা.-এর পক্ষকেই সমর্থন করেন। মুআবিয়া রা. ও তার সঙ্গীদের জন্য আলি রা.-এর বাইআত গ্রহণ করা ওয়াজিব বলে মত ব্যক্ত করেন। কিন্তু আমর ইবনুল আস রা. প্রথমে খুনিদের হত্যা অথবা তাদের হাতে সমর্পণ করার দাবি জানান। এ ব্যাপারে অনেক আলোচনা করেও যখন মীমাংসা হলো না, তখন তারা খেলাফতের বিষয়টি ছেড়ে দেন বেশ কিছু বিশিষ্ট সাহাবির ওপর। সাক্ষীগণের উপস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, আগামী বছর দুমাতুল জান্দালে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
পুনরায় বৈঠকের সময় আসা পর্যন্ত আলি এবং মুআবিয়া রা. উভয়েই নিজ নিজ নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলসমূহ শাসন করবেন। নতুন খলিফা নির্বাচন করার পর সকলকেই তার অনুসরণ করতে হবে। এ কথা স্পষ্ট যে, বাহ্যিকভাবে এই সিদ্ধান্তটি আলি রা.-এর অনুকূলেই ছিল। মুসলিমরা এ বিষয়টি নিয়ে বিভক্ত থাকলেও বিশিষ্ট সাহাবিগণ কর্তৃক নতুন খলিফা নির্বাচনের সিদ্ধান্তে তারা সকলেই সন্তুষ্ট হন। আলি রা.-এর কাছে এই সংবাদ পৌঁছলে তিনি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। এমনইভাবে মুআবিয়া রা.-ও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।