📄 ইসলামে বিদ্রোহীদের বিধান
বিদ্রোহীদের মধ্যে যারা যুদ্ধ থেকে পলায়ন করে, তাদের হত্যা করা যাবে না। কেননা, তারা মুমিন। আল্লাহ তাআলা বিদ্রোহীদের আলোচনা করতে গিয়ে তাদের থেকে ঈমানের গুণ দূর করে দেননি; বরং তিনি বলেন, 'যখন মুমিনদের দুই পক্ষ পরস্পর লড়াইয়ে লিপ্ত হয়'। [সুরা হুজুরাত: ৯]
তাদের মধ্যে যারা আহত হয় তাদেরও হত্যা করা যাবে না। বরং তাদের ছেড়ে দিতে হবে অথবা চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের মধ্যে যারা বন্দি হয়েছে তাদেরও হত্যা করা যাবে না। তবে মুহারিব (ডাকাত) অথবা কাফের বন্দিদের হত্যা করা বৈধ। মুহারিব এবং কাফের বন্দিদের ফয়সালার ব্যাপারটি মুসলিমদের ইমাম তথা নেতার ওপর ন্যস্ত। চাইলে তিনি মুক্তিপণ ছাড়া অথবা কোনো সম্পদের বিনিময়ে কিংবা নিজেদের বন্দির বিনিময়ে তাদেরকে ছেড়ে দিতে পারেন। চাইলে মুসলিমদের শিক্ষা প্রদানের শর্তেও ছেড়ে দিতে পারেন, যেমনটি বদর যুদ্ধে রাসুল ﷺ করেছিলেন। আবার চাইলে তাদের হত্যাও করতে পারেন।
যদি মুসলিমরা শক্তিশালী হয় এবং শত্রুবাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে, তবে রাষ্ট্রপ্রধান কোনো মুক্তিপণ ছাড়াই বন্দিদের মুক্ত করে দিতে পারেন। রাসুল ﷺ এমনটি করেছিলেন মক্কাবাসীর সঙ্গে; ইসলামের প্রতি তাদের হৃদয়কে আকৃষ্ট করার জন্য ও তাদের ইসলাম গ্রহণে আশাবাদী হয়ে। উভয় পক্ষের মধ্যে বন্দি বিনিময় অথবা সম্পদের বিনিময়ে তাদের মুক্ত করে দেওয়ারও সুযোগ রয়েছে। যদি বিরোধী পক্ষের কাছে এমন কোনো জ্ঞান থাকে, যা মুসলিম পক্ষের নেই; তাহলে মুসলিমদের সেই জ্ঞান শিক্ষা দেওয়ার শর্তেও বন্দিদের মুক্ত করা যেতে পারে। তবে যদি বিরোধী পক্ষের তুলনায় মুসলিম বাহিনী দুর্বল হয় অর্থাৎ তাদের জনবল ও অস্ত্রবল মুসলিমদের তুলনায় বেশি থাকে, তাহলে তাদের মনে ভীতি সৃষ্টি করার জন্য বন্দিদের হত্যা করা হবে।
পারসিকদের ছিল অসংখ্য ও অগণিত সৈন্য। এক বাহিনী নিহত হলে মুহূর্তের মধ্যেই আরেক বাহিনী এসে হাজির হতো। তখন পারস্য ও রোম ছিল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনী। তাই বন্দিদের হেফাজতে রাখা ছিল খুবই কঠিন এবং তাদের পক্ষ থেকে ছিল সমূহ বিপদের সম্ভাবনা। তাই উমর ইবনুল খাত্তাব রা. তাদের হত্যার নির্দেশ প্রদান করেন। যেন পারসিকদের শক্তিমত্তাও হ্রাস পায় এবং তাদের সুরক্ষা দিতে মুসলিমদের যে শক্তি ব্যয় হতো, তাও সঞ্চয় হয়। তাই মুসলিমদের কল্যাণের প্রতি লক্ষ করে শাসকের জন্য বন্দি মুহারিবদের (ডাকাতদেরকে) হত্যা করা বৈধ। এটা হত্যার প্রতি লিপ্সা অথবা আকর্ষণের কারণে নয়; বরং সমস্ত মুসলিমের কল্যাণের লক্ষ্যেই তাদেরকে হত্যা করা হবে।
তবে বিদ্রোহী বন্দিদের হত্যা করা বৈধ হবে না এবং তাদের সম্পদকে গনিমত তথা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসাবেও গণ্য করা যাবে না। জঙ্গে জামালের পর আলি রা.-এর বাহিনীর মুসলিমরা আয়েশা রা.-এর বাহিনীর অনেক সম্পদ দখল করে নেয়। তখন আলি রা. সেগুলো বসরার মসজিদে নিয়ে রাখার আদেশ দেন এবং বলেন, যদি কেউ তার সম্পদ চিনতে পারে, তবে সে যেন তা এসে নিয়ে যায়। এসব সম্পদকে গনিমত গণ্য করা যাবে না। কেননা উভয় পক্ষই মুসলিম। তখন সেনাবাহিনীর মধ্যে কেউ কেউ বলে, যদি আমাদের জন্য তাদের সম্পদ বৈধ না হয়ে থাকে, তাহলে তাদের হত্যা করা কীভাবে বৈধ হবে? ফিতনাবাজদের লাগাতার পীড়াপীড়ির কারণে অবশেষে আলি রা. বলতে বাধ্য হন, তবে চলো, গনিমতের সম্পদ বণ্টন করি। এখন বলো, আয়েশা রা. কার ভাগে যাবে? এ কথায় তারা হতভম্ব হয়ে যায় এবং সেখান থেকে প্রস্থান করে। (২৮০)
যুদ্ধের মধ্যে বিদ্রোহীরা প্রাণ অথবা সম্পদের ক্ষতি করে থাকলে এর ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না। তাদের নিহত মুমিন ব্যক্তিদের গোসল দেওয়া হবে, কাফন পরানো হবে এবং জানাজার নামাজ আদায় করে দাফন সম্পন্ন করা হবে। বিদ্রোহী দল এবং সঠিক পথের অনুসারী দলের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য এটিই। সঠিক পথের অনুসারী দলের ব্যক্তিরা শহিদ হিসাবে গণ্য হবে। তাদের গোসল দেওয়া হবে না, কাফন পরানো হবে না এবং জানাজার নামাজও আদায় করা হবে না। (২৮১)
এসব বিধিবিধান ফিতনার ঘটনার পরেই জানা যায়। আর যারা কোনো গ্রহণযোগ্য সঠিক ব্যাখ্যা ছাড়াই ন্যায়পরায়ণ শাসকের বিরোধিতা করে, ওই সকল মুহারিব (ডাকাত) সম্পর্কে আল্লাহ তাআলার এই কথাটিই যথেষ্ট— 'যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং জমিনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তাদের শাস্তি হচ্ছে এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে অথবা তাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে দেওয়া হবে অথবা তাদের নির্বাসিত করা হবে। এটি হলো তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে মহা শান্তি। তবে সেই সকল লোক ব্যতিক্রম, যারা তোমাদের আয়ত্তে আসার আগেই তওবা করে। এরূপ ক্ষেত্রে জেনে রাখো আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' [সুরা মায়িদা: ৩৩-৩৪]
শাস্তিগুলো হলো— ১. সরাসরি হত্যা। ২. শূলে চড়ানো। ৩. তাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে দেওয়া। ৪. তাদেরকে দেশ থেকে নির্বাসিত করে দেওয়া।
আলি রা. মুআবিয়া রা.-কে মুহারিব (ডাকাত) মনে করতেন না; বরং তাকে বিদ্রোহী মনে করতেন। সিফফিনের যুদ্ধের সময় রাত নামার সঙ্গে সঙ্গেই উভয় পক্ষ অপর পক্ষের সামরিক ঘাঁটিতে প্রবেশ করে কোনোরূপ সংঘাত ছাড়াই তাদের আহত এবং নিহত ব্যক্তিদের নিয়ে আসতেন। মুআবিয়া রা. ও তার বাহিনী তাদের নিহত ব্যক্তিদের জানাজার নামাজ পড়তেন না। নিজেদের ইজতেহাদ অনুযায়ী তাদের শহিদ বলেই গণ্য করতেন।
টিকাঃ
২৮০. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২৭৩
২৮১. হানাফি মাজহাব মতে শহিদের জানাজা পড়া হবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক সাহাবি শহিদ হওয়ার পর তার জানাজা পড়েছিলেন। সুনানুন নাসায়ি, ১৯৫৩ (শামেলা)-সম্পাদক
📄 সাহল ইবনে হুনাইফ রা.-এর বক্তব্য
সিফফিনের সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। ৭০ হাজার মুসলিমের রক্তের বিনিময়ে যে মর্মান্তিক যুদ্ধের মূল্য চুকাতে হয়েছিল। সে যুদ্ধ থেমে যাওয়ার পর বিশিষ্ট সাহাবি সাহল ইবনে হুনাইফ রা. দেখতে পেলেন, কিছু লোকের মনে এ লড়াই নিয়ে দ্বিধা ও সন্দেহ রয়েছে। তখন সাহল ইবনে হুনাইফ রা. তাদের উদ্দেশে কিছু কথা বলেন। তিনি বলেন, হে লোকসকল, আপনারা দ্বীনের ব্যাপারে নিজেদের মতকে প্রশ্নবিদ্ধ মনে করুন।
তিনি দেখছিলেন যে, কিছু লোক শরিয়তের বিরোধী মত পোষণ করেও এটিকে সঠিক বলে মনে করছে। তাই তিনি বলেন, আবু জান্দালের দিন (হুদাইবিয়ার সন্ধির দিন) যখন রাসুল ﷺ মক্কার কাফেরদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করছিলেন, আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। এই চুক্তির একটি শর্ত ছিল এই যে, কুরাইশ অথবা তার মিত্র গোত্রসমূহ থেকে যারা মুসলিম হয়ে মদিনায় যাবে, মুসলিমরা তাদেরকে তাদের গোত্রে ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু এ শর্তটি ছিল বৈষম্যমূলক। মুসলিমগণ নিজেদের ধর্মের ক্ষেত্রে এ হীনতা কীভাবে মেনে নেবেন, যেমন উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলেছিলেন। তাদের অনেকেই বিশ্বাস করতেন যে, এই শর্ত মেনে না নেওয়াটাই সঠিক। কিন্তু রাসুল ﷺ ছিলেন এই শর্ত মেনে নেওয়ার ব্যাপারে অটল। নিশ্চয় এটি আল্লাহ তাআলারই নির্দেশ ছিল।
তখন মুশরিকদের মধ্য থেকে আবু জান্দাল নামক এক ব্যক্তি এসে ইসলাম গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করে। (২৮২) আবু জান্দাল ছিলেন সুহাইল ইবনে আমরের পুত্র। তখন সুহাইল ইবনে আমর বলেন, এর মাধ্যমেই আমরা চুক্তির অনুসরণ শুরু করতে পারি। আবু জান্দালকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিন। তখন রাসুল ﷺ আবু জান্দালের ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিয়ে কাফেরদের কাছে তাকে ফিরিয়ে দেন। তখন আবু জান্দাল রা. বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, তারা আমাকে আমার ধর্মকর্ম নিয়ে বিপদে ফেলবে জেনেও আপনি আমাকে তাদের হাতে ছেড়ে দিচ্ছেন? (২৮৩)
সকল সাহাবিগণের পক্ষে এ বিষয়টি মেনে নেওয়া ছিল খুবই কঠিন। এমনকি উমর ইবনুল খাত্তাব রা. তার তরবারিটি আবু জান্দাল রা.-এর হাতে তুলে দেন এবং বলেন, আপনিও একজন পুরুষ এবং সে-ও একজন পুরুষ। (২৮৪) এই বলে তিনি আবু জান্দাল রা.-কে নিজের পিতাকে হত্যা করার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। এতৎসত্ত্বেও ওই সব শর্ত ও আবু জান্দাল রা.-এর এই ঘটনা ছিল মুসলিমদের জন্য এক মহাবিজয়ের উপক্রমণিকা।
তাই সাহল ইবনে হুনাইফ রা. বলেন, হে লোকসকল, আপনারা দ্বীনের ব্যাপারে নিজেদের মতকে প্রশ্নবিদ্ধ মনে করুন। আবু জান্দালকে ফিরিয়ে দেওয়ার দিন আমি উপস্থিত ছিলাম। আমার যদি ক্ষমতা থাকত, তাহলে রাসুল ﷺ-কে এ কাজ থেকে ফিরিয়ে দিতাম। আল্লাহর শপথ! ইসলাম গ্রহণের পর আমরা যতবার কোনো কারণে যুদ্ধ করেছি ততবারই এর সমাধান খুঁজে পেয়েছি। তবে বর্তমান এ বিষয়ে কোনো সমাধান খুঁজে পাচ্ছি না। একদিক রক্ষা করতে গেলে অন্যদিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কীভাবে এর সমাধান করব তা আমাদের জানা নেই। (২৮৫)
রাসুল ﷺ-এর হাদিস থেকে জানা যায়, যা সহিহ মুসলিমে আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে। (২৮৬) আম্মার ইবনে ইয়াসির রা.-কে সিফফিনের যুদ্ধ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, এটি কি রাসুল ﷺ-এর কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নাকি আপনাদের নিজস্ব ইজতেহাদ? তিনি বলেন, রাসুল ﷺ আমাদের শুধু এটির কথাই বলে গিয়েছেন। এ বলে তিনি কুরআনের দিকে ইশারা করেছেন। সুতরাং পুরো বিষয়টিই ছিল ইজতেহাদের ওপর নির্ভরশীল।
টিকাঃ
২৮২. আবু জান্দাল রা. এ সন্ধিচুক্তির আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১/১৯২ (শামেলা)-সম্পাদক
২৮৩. আল-মুসনাদ লিল ইমাম আহমাদ, ১৮৯১০; আস-সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকি, ১৮৮৩১
২৮৪. ফাতহুল বারি, ৫/৩৪৯
২৮৫. সহিহ বুখারি, ৪১৮৯; আল-মুসনাদ লিল ইমাম আহমাদ, ১৫৯৭৪
২৮৬. সহিহ মুসলিম, ২৮৮৬; আস-সুনানুল কুবরা লিল বাইহাকি, ১৬৮৭৮
📄 সালিশ নির্ধারণ ও ফলাফল
সিফফিনের যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে, সারা রাত তুমুল লড়াই চলতে থাকে। বিজয়ের পাল্লা ক্রমেই ঝুঁকতে থাকে আলি রা.-এর বাহিনীর দিকে। এমন সময় আমর ইবনুল আস রা. মুআবিয়া রা.-কে এমন একটি পরামর্শ দেন, যার মাধ্যমে শামের বাহিনীকে সুনিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে উদ্ধার করা যাবে। আমর ইবনুল আস রা. মুআবিয়া রা.-কে বললেন, আমার পরামর্শ হচ্ছে, আমরা এখন কুরআন উত্তোলন করে তাদেরকে এর দিকে আহ্বান করব। এই পরামর্শে মুআবিয়া রা. খুবই মুগ্ধ হন এবং তার বাহিনীর কিছু লোকদের ডেকে কুরআন উত্তোলনের নির্দেশ দেন। তখন তারা কুরআন উত্তোলন করে বলে, হে ইরাকবাসী, তোমাদের ও আমাদের মধ্যে কুরআনকে ফয়সালাকারী হিসাবে তুলে ধরছি। (২৮৭)
আলি রা.-এর বাহিনী যখন এ কথা শোনে তখন আলি রা.-সহ অধিকাংশ লোকই কুরআনকে ফয়সালাকারী হিসাবে মেনে নিতে সম্মত হন। মুআবিয়া রা.-এর বাহিনী সর্বসম্মতিক্রমে আমর ইবনুল আস রা.-কে এ কাজের জন্য নির্বাচিত করে। রাসুল ﷺ বলেছিলেন, লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করেছে, আর আমর ইবনুল আস ঈমান এনেছে। (২৮৮) আরেক সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে, আমর ইবনুল আস হচ্ছে কুরাইশের সৎ লোকদের অন্তর্ভুক্ত। (২৮৯)
এদিকে আলি রা.-এর বাহিনীতে যখন এ কাজের জন্য আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর ব্যাপারে প্রস্তাব দেওয়া হয়, তখন সবাই তা প্রত্যাখ্যান করে। তারা এ কাজের জন্য আবু মুসা আশআরি রা.-কে পাঠানোর দাবি করে। (২৯০) আবু মুসা আশআরি রা. ছিলেন একাধারে একজন ফকিহ, আলেম ও অভিজ্ঞ বিচারক। আবু মুসা আশআরি রা. এবং আমর ইবনুল আস রা. সিফফিনে একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অতঃপর প্রাথমিক পর্যায়ে চুক্তিনামায় আলি রা. আমিরুল মুমিনিন শব্দটি মুছে দিয়ে শুধু আলি ইবনে আবু তালেব লিখতে বলেন। আমর ইবনুল আস রা. তার ইজতেহাদের মাধ্যমে নিশ্চিত ছিলেন যে, আলি রা. মুমিনদের আমির নন।
অতঃপর লেখা হয়, আলি ইবনে আবু তালেব এবং মুআবিয়া এই মর্মে চুক্তি করছেন যে, আমরা সকলেই আল্লাহ তাআলার বিধান ও কুরআনের সামনে আত্মসমর্পন করব। উভয় সালিশ কুরআনে যে সমাধান পাবেন সে অনুযায়ীই আমল করবেন। আর যে সমাধান কুরআনে পাবে না, তার জন্য রাসুল ﷺ-এর সুন্নাহর মুখাপেক্ষী হবেন। (২৯৩) তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এ বছরের রমজান মাসে তারা এ বিষয়ে ফয়সালা করার জন্য বসবেন। উভয় পক্ষ থেকে ১০জন এ মজলিসে উপস্থিত ছিলেন। যারা উপস্থিত ছিলেন তাদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা., হাবিব ইবনে মাসলামা রা., আবদুর রহমান ইবনে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা. ও আবুল আওয়ার সুলামি রা. ছিলেন অন্যতম। (২৯৪) আশআস ইবনে কায়স রহ. উভয় পক্ষের সামনে চুক্তিনামা পাঠ করেন। (২৯৫) ইমাম যুহরি রহ. উল্লেখ করেন, নিহত এবং শহিদের সংখ্যা এতই অধিক ছিল যে, এক কবরে ৫০জন করে দাফন করা হয়। (২৯৬) অতঃপর আলি রা. তার বাহিনী নিয়ে কুফার দিকে রওনা হয়ে যান। শামের কিছু লোক তার কাছে বন্দি ছিল। তিনি তাদের মুক্ত করে দেন।
টিকাঃ
২৮৭. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩০২
২৮৮. সুনানুত তিরমিজি, ৩৮৪৪; আল-মুসনাদ লিল ইমাম আহমাদ, ১৭৪১২
২৮৯. সুনানুত তিরমিজি, ৩৮৪৫; মুসনাদু আবি ইয়ালা, ৬৪৫; আল-মুজামুল কাবির লিত তবারানি, ২০৮; আল-আহাদিসুল মুখতারা লিল মাকদিসি, ৮৪৪
২৯০. তারিখুত তবারি, ৫/৫৭১; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩০৬
২৯৩. আল-কামিল ফিত তারিখ, ২/৬৭১; তারিখু ইবনি খালদুন, ২/৬৩৩
২৯৪. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩০৭
২৯৫. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩০৭
২৯৬. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩০৭
📄 ধর্মীয় বিষয়ে কোনো ব্যক্তিকে সালিশ নির্ধারণ
আশআস ইবনে কায়স রহ. যখন আলি রা.-এর বাহিনীর কাছে চুক্তিনামা পাঠ করতে যান, তখন তিনি বনু তামিম গোত্রের একদলের পাশ দিয়ে অতিক্রম করেন। চুক্তিনামা পাঠ করার পর বনু তামিমের শাখাগোত্র রবিয়া থেকে উরওয়া ইবনে জারির নামক এক ব্যক্তি উঠে দাঁড়ায় এবং আশআস ইবনে কায়স রহ.-কে বলে, আপনারা আল্লাহ তাআলার দ্বীনের ক্ষেত্রে মানুষকে ফয়সালাকারী নির্ধারণ করছেন! (২৯৭)
এই লোক মনে করত যে, এ ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার বিধান পুরোপুরি স্পষ্ট ও মুআবিয়া রা.-এর বাহিনীর সঙ্গে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়া আবশ্যক। অতঃপর সে তার তরবারি দিয়ে আশআস ইবনে কায়স রহ.-এর বাহনজন্তুর পেছনে আঘাত করে। এতে আশআস রা. খুবই ক্ষিপ্ত হন। আহনাফ ইবনে কায়স রা. ও অন্যান্য নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এসে বিষয়টি মীমাংসা না করলে তখনই আলি রা.-এর বাহিনীর মধ্যে ফাটল সৃষ্টি হয়ে যেত।
টিকাঃ
২৯৭. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩০৮