📘 ফিতনার ইতিহাস 📄 আম্মার ইবনে ইয়াসির রা.-এর শাহাদাতবরণ

📄 আম্মার ইবনে ইয়াসির রা.-এর শাহাদাতবরণ


এ দিন এশার নিকটবর্তী সময়ে এসে শাহাদাতবরণ করেন বিশিষ্ট সাহাবি আম্মার ইবনে ইয়াসির রা.। তিনি ছিলেন আলি রা.-এর বাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তার সঙ্গে একই সময়ে শহিদ হন হাশেম ইবনে উতবা ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা.।

আবু আবদুর রহমান সুলামি রহ. বলেন, সেদিন আম্মার রা.-কে দেখেছি যখনই তিনি সিফফিন প্রান্তরের কোনো উপত্যকা অতিক্রম করছেন, তার সঙ্গে থাকা সাহাবিগণ তাকে অনুসরণ করছেন। দেখেছি তিনি আলি রা.-এর বাহিনীর পতাকাধারী হাশেম ইবনে উতবা রা.-এর কাছে গমন করেন এবং তাকে বলেন, হে হাশেম, এগিয়ে এসো। তরবারির ছায়াতলেই আছে জান্নাত। আর মৃত্যু আমাদের দাঁতের প্রান্তে এসে উপনীত হয়েছে। জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে গিয়েছে। ডাগর ডাগর চোখের হুরেরা সজ্জিত হয়েছে। আজ আমি সাক্ষাৎ করব প্রিয় মুহাম্মাদ ﷺ ও তাঁর দলের সঙ্গে।

এরপর তিনি এবং হাশেম রা. উভয়েই তরবারি উত্তোলন করে একযোগে হামলা করেন। অতঃপর উভয়েই পান করেন শাহাদাতের সুধা। তাদের মৃত্যুতে উভয় পক্ষেই বিরাট প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং উভয় পক্ষই প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। তবে আলি রা.-এর বাহিনীর উৎসাহ এবং উদ্দীপনা আগের চেয়ে বেড়ে যায়। কারণ, এখন তারা পূর্ণ নিশ্চিত হয়ে গিয়েছেন যে, তারাই সত্যের ওপর আছেন। কারণ, রাসুল ﷺ বলেছেন, 'আম্মারের জন্য দুঃখ হয়, তাকে হত্যা করবে বিদ্রোহী দল।' ফলে তারা নিশ্চিত হয়ে যান যে, তারাই সুস্পষ্ট সত্যের ওপর আছেন এবং তারাই বিজয়ী দল। এদিকে অপর পক্ষের সৈন্যরা ভীত হয়ে পড়ে। কারণ, তারা বিদ্রোহী প্রমাণিত হয়ে গিয়েছে। তখন মুআবিয়া রা.-এর বাহিনীর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ আমর ইবনুল আস রা., আবুল আওয়ার সুলামি রা., আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. ও মুআবিয়া রা. বিষয়টি নিয়ে পরামর্শে বসেন।

টিকাঃ
২৭০. তারিখুত তবারি, ৫/৪১; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২৯৯

📘 ফিতনার ইতিহাস 📄 আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. ও বিদ্রোহী দল

📄 আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. ও বিদ্রোহী দল


আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. নিহত হওয়ার পর উভয় পক্ষেই বিরাট প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং ব্যথার ঝড় ওঠে। আলি রা.-এর বাহিনী আম্মার রা.-কে অত্যন্ত সম্মান এবং শ্রদ্ধা করত। তিনি ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ একজন সাহাবি। তার বয়স ছিল তখন ৯০-এরও বেশি। ইসলামের প্রথমদিকেই তিনি ঈমানের পরশ লাভ করেছিলেন। তিনি ইসলামের সূচনালগ্নের সঙ্গী ছিলেন। তিনি ও তার পরিবার আল্লাহ তাআলার পথে অনেক কষ্টের শিকার হয়েছেন। ইসলামে রয়েছে তার বিশেষ অবস্থান ও মর্যাদা। আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল ﷺ বলেছেন, তিনজন ব্যক্তির জন্য জান্নাত উদ্‌গ্রীব হয়ে আছে। (তারা হলো) আলি, আম্মার এবং সালমান। হাকেম রহ. বলেন, এই হাদিসটির সনদ (সূত্র) সহিহ। তবে ইমাম বুখারি রহ. ও মুসলিম রহ. হাদিসটি উল্লেখ করেননি।

তাই আলি রা.-এর বাহিনীর জন্য আম্মার ইবনে ইয়াসির রা.-এর শাহাদাত ছিল খুবই পীড়াদায়ক। কিন্তু মুআবিয়া রা.-এর বাহিনীর জন্য তা ছিল আরও কঠিন ব্যাপার। কারণ, রাসুল ﷺ বলেছেন যে, আম্মার রা.-কে বিদ্রোহী দল হত্যা করবে। আম্মার রা. তাদের হাতেই নিহত হলেন। এতে প্রমাণিত হয়, তারাই সেই বিদ্রোহী দল এবং তারা সত্যের ওপর নেই। আলি রা.-এর বাহিনীর সদস্য আবু আবদুর রহমান সুলামি রহ. আম্মার রা.- এর হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন। তিনি সে রাতে মুআবিয়া রা.-এর বাহিনীর ঘাঁটিতে প্রবেশ করেন এবং শামের বাহিনীর চার নেতার কথোপকথন শুনতে পান। তারা হলেন, মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রা., আমর ইবনুল আস রা.. তার পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. ও আবুল আওয়ার সুলামি রা।

তাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রাজ্ঞ সাহাবি, সাহাবিগণের মধ্যে যিনি ছিলেন অত্যন্ত মর্যাদাবান এবং আবদুল্লাহ নামবিশিষ্ট চার ফকিহ সাহাবির একজন আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. বলেন, বাবা, আপনারা আজ এই ব্যক্তিকে হত্যা করলেন, অথচ রাসুল ﷺ তার ব্যাপারে কী ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন তা কি জানেন? তখন আমর ইবনুল আস রা. জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি কী বলেছেন? তিনি বললেন, যখন আমরা মসজিদ নির্মাণ করছিলাম তখন আম্মার রা. আমাদের সঙ্গেই ছিলেন। সবাই একটি করে ইট ও পাথর নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু আম্মার রা. নিচ্ছিলেন দুটি করে। তখন রাসুল ﷺ এসে তার চেহারা থেকে ধুলো মুছে দেন এবং বলেন, সুমাইয়ার পুত্র, তোমার জন্য দুঃখ হয়, তোমাকে হত্যা করবে বিদ্রোহী দল।

আমর ইবনুল আস রা. তার পুত্রের কাছ থেকে এ কথা শুনে চলে যান মুআবিয়া রা.-এর কাছে। গিয়ে বলেন, হে মুআবিয়া, আবদুল্লাহ কী বলেছে তা কি আপনি শুনেছেন? মুআবিয়া রা. বলেন, কী বলেছে? এরপর আমর ইবনুল আস রা. তাকে হাদিসটি শুনান। তখন মুআবিয়া রা. বলেন, নিশ্চয় আপনি একজন আনাড়ি বৃদ্ধ। আমরা কি আম্মার রা.-কে হত্যা করেছি? তাকে যারা এখানে নিয়ে এসেছে তারাই হত্যা করেছে।

এতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মুআবিয়া রা. সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিত ছিলেন যে, তিনি কোনো বিদ্রোহী নন। তিনি লড়াই করছেন আল্লাহ তাআলার একটি বিধান প্রতিষ্ঠা করার জন্য, যে বিধান বাস্তবায়নে আলি রা. বিলম্ব করছেন। উসমান রা.-এর খুনিদের শান্তির ব্যবস্থা তিনি করেননি। তিনি ইজতেহাদ করার পরই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু আলি রা. ইজতেহাদ করেছিলেন সাম্রাজ্য স্থিতিশীল হওয়া পর্যন্ত তিনি উসমান রা.-এর হত্যার বিচার বিলম্বিত করবেন। আর এটিই সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। তাদের প্রত্যেকেই সওয়াব পাবেন। যার ইজতেহাদ সঠিক, তিনি পাবেন দুটি সওয়াব। আর যার ইজতেহাদ ভুল, তিনি পাবেন একটি সওয়াব।

মুআবিয়া রা.-এর দৃষ্টিতে বিদ্রোহী দল ছিল যারা আম্মার রা.-কে নিয়ে এসেছে তারাই। তাদের কারণেই তিনি শহিদ হয়েছেন। আর বিশেষ কথা হচ্ছে, মুআবিয়া রা. তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে বের হননি, বরং তারাই যুদ্ধ করার জন্য এসেছেন। লোকেরা মুআবিয়া রা.-এর এ কথা শুনে গুঞ্জন শুরু করে দেয়। আবু আবদুর রহমান সুলামি রহ. বলেন, আমি জানি না, তারা বেশি আশ্চর্যান্বিত হয়েছে নাকি তিনি নিজেই।

ফিতনা এবং শিয়াদের ইতিহাসে ব্যুৎপত্তি অর্জনকারী আলেম মুহিব্বুদ্দিন খতিব রহ. আল-আওয়াসিম মিনাল কাওয়াসিম গ্রন্থের টীকায় বলেন, 'আম্মার ইবনে ইয়াসির রা.-কে হত্যাকারী বিদ্রোহী দলই মূলত উসমান রা.-এর হত্যাকারী। কারণ, জঙ্গে জামালের পূর্বে, জঙ্গে জামালে, সিফফিনের যুদ্ধে ও এর পরবর্তী সময়ে মুসলিমদের যত রক্ত ঝরেছে এগুলোর দায়ভার তাদের ওপরেই বর্তাবে। ফিতনাবাজদের কারণে মুসলিম উম্মাহর ওপর যে বিপর্যয় ও দুর্যোগ এসেছে এর পাপের বোঝা তাদের কাঁধেই দেওয়া হবে।'

আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. যেদিন নিহত হন সেদিনও লড়াই থামেনি; বরং রাতেও লড়াই চলেছে। রাত থেকে নিয়ে পরদিন জোহর পর্যন্ত এ লড়াই চলতে থাকে। মুসলিমরা মাগরিব, এশা ও ফজরের নামাজ ঘোড়া অথবা উটের ওপর বসে কিংবা হেঁটে হেঁটে ইশারার মাধ্যমে আদায় করে। এই রাতকে লাইলাতুল হারির নামে অভিহিত করা হয়। এর আগে কাদিসিয়ার যুদ্ধের শেষ রাতটিকেও এ নাম দেওয়া হয়েছিল, যে যুদ্ধে মুসলিমরা পারসিকদের সঙ্গে লড়াই করেছিল। কিন্তু দুই লড়াইয়ের মধ্যে কত পার্থক্য! একটিতে মুসলিমরা লড়াই করেছিল আল্লাহ তাআলার শত্রুর বিরুদ্ধে ও আল্লাহ তাআলার দীনের জন্য পারস্য জয় করতে। আর এ যুদ্ধে মুসলিমরা পরস্পর শত্রু হয়ে যুদ্ধ করছে। সারারাত ভয়ানক যুদ্ধ চলতে থাকে। বিজয়ের পাল্লা ক্রমেই ঝুঁকতে থাকে আলি রা.-এর বাহিনীর দিকে। আর মুআবিয়া রা.-এর বাহিনীর আকাশে জমতে থাকে পরাজয়ের কালো মেঘ। আলি রা.-এর বাহিনীর জন্য বিজয় ছিল অত্যাসন্ন।

টিকাঃ
২৭১. আল-মুসতাদরাক লিল হাকিম, ৪৬৬৬
২৭২. তারিখুত তবারি, ৫/৪১; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২৯৯
২৭৩. আত-তালিক আলাল আওয়াসিম মিনাল কাওয়াসিম, পৃ. ১৭০

📘 ফিতনার ইতিহাস 📄 কুরআন উত্তোলনের কৌশল

📄 কুরআন উত্তোলনের কৌশল


মুআবিয়া রা.-এর বাহিনী যখন পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে, তখন আমর ইবনুল আস রা. মুআবিয়া রা.-কে এমন একটি পরামর্শ দেন, যার মাধ্যমে শামের বাহিনীকে সুনিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে উদ্ধার করা সম্ভব। তখন পর্যন্তও তারা নিশ্চিতভাবেই বিশ্বাস করতেন যে, তারা সত্যের ওপর আছেন, সত্যের পথেই লড়াই করছেন এবং যারা উসমান রা.-এর খুনিদের আশ্রয় দিয়েছে তাদের সঙ্গে লড়াই অব্যাহত রাখা আবশ্যক।

আমর ইবনুল আস রা. মুআবিয়া রা.-কে বললেন, আমি এমন একটি বিষয় ভেবেছি, এই মুহূর্তে যার মাধ্যমে আমরা সবচেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ হতে পারি এবং তাদের মধ্যে বিভেদ বেড়ে যেতে পারে। আমার পরামর্শ হচ্ছে, আমরা এখন কুরআন উত্তোলন করে তাদেরকে আমাদের দিকে আহ্বান করব। যদি তারা সকলেই সাড়া দেয় তাহলে লড়াই থেমে যাবে। আর যদি তারা মতানৈক্য করে; কেউ বলে সাড়া দেবে, আর কেউ বলে সাড়া দেবে না, তবে তারা ব্যর্থ হবে এবং তাদের শক্তি খর্ব হবে।

এই পরামর্শে মুআবিয়া রা. খুবই মুগ্ধ হন এবং তার বাহিনীর কিছু লোকদের ডেকে কুরআন উত্তোলন করার নির্দেশ দেন। তখন তারা কুরআন উত্তোলন করে বলে, হে ইরাকবাসী, তোমাদের ও আমাদের মধ্যে কুরআনকে ফয়সালাকারী হিসাবে তুলে ধরছি। অনেক মানুষ ইতিমধ্যে নিহত হয়ে গিয়েছে। তাহলে কারা সীমান্ত রক্ষা করবে? মুশরিক ও কাফেরদের সঙ্গে কারা লড়াই করবে?

এ কথা শুনে আলি রা.-এর বাহিনী বিভক্ত হয়ে যায়। কেউ বলে, আমরা আল্লাহ তাআলার কুরআনকেই ফয়সালাকারী হিসাবে মেনে নেবো। অপর লোকেরা বলে, আমরাই সত্যের ওপর আছি। তাই লড়াই চালিয়ে যাওয়াই বাঞ্ছনীয়।

এই ঘটনার ব্যাপারে শিয়াদের অনেক ভ্রান্ত এবং মিথ্যা বর্ণনা রয়েছে। যেগুলোতে চিত্রায়ন করা হয়েছে যে, আলি রা. শামের বাহিনীকে তিরস্কার ও গালমন্দ করে তাদের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। বানোয়াট ও মিথ্যা বর্ণনা রচয়িতা শিয়া মতাবলম্বী আবু মিখনাফ লুত ইবনে ইয়াহইয়ার একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, আলি রা. সেদিন বলেছিলেন, আল্লাহর বান্দারা, তোমরা সত্যের ওপর এবং তোমাদের শত্রুদের সঙ্গে লড়াই করার ওপর সুদৃঢ় থাকো। নিশ্চয় মুআবিয়া, আমর ইবনুল আস, ইবনে আবু মুইত, হাবিব ইবনে মাসলামা, ইবনে আবু সারহ ও যাহহাক প্রমুখ ব্যক্তি দ্বীন এবং কুরআনের ধারক নয়। তোমাদের চেয়ে আমি তাদের বেশি চিনি। সেই শিশুকাল থেকে আমি তাদের সঙ্গে মিশেছি, প্রাপ্তবয়সেও তাদের সঙ্গে মিশেছি। তারা শিশুকালেও মন্দ ছিল এবং প্রাপ্তবয়সেও মন্দ ছিল। তোমরা যদি লড়াই না করো তবে তোমাদের জন্য দুর্ভোগ। তারা কুরআন তেলাওয়াত করে ঠিকই, কিন্তু এর মর্ম বোঝে না। তারা আমাদের ধোঁকা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই চক্রান্ত করে কুরআন উত্তোলন করেছে।

এমনটি কখনোই ঘটেনি। আলি রা. কখনোই এমন কথা বলেননি। মিথ্যাবাদী শিয়া আবু মিখনাফ লুত ইবনে ইয়াহইয়া এই মিথ্যা বর্ণনা রচনা করেছে। আলি রা. ছিলেন কুরআনকে ফয়সালাকারী হিসাবে মেনে নেওয়ার পক্ষে। শামের বাহিনীর এই প্রস্তাবে তিনি সম্মত হন এবং এ বিষয় নিয়ে কাকে মুআবিয়া রা.-এর কাছে পাঠাবেন তা ভাবতে থাকেন।

টিকাঃ
২৭৪, আল-কামিল ফিত তারিখ, ২/৬৬৮; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/৩০২

ফন্ট সাইজ
15px
17px