📘 ফিতনার ইতিহাস 📄 কাকা ইবনে আমর রা. ও সন্ধির সুসংবাদ

📄 কাকা ইবনে আমর রা. ও সন্ধির সুসংবাদ


যিকারে সমবেত হওয়ার পর আলি রা.-এর বাহিনী বসরা অভিমুখী হয়। এ সময়ের মধ্যে আলি রা.-এর সমর্থকগণ তার কাতারে এসে সমবেত হতে থাকেন এবং আয়েশা রা.-এর সমর্থকগণ সমবেত হতে থাকেন তার বাহিনীর কাতারে। এভাবে আলি রা.-এর বাহিনীর সদস্যসংখ্যা দাঁড়ায় ২০ হাজার এবং আয়েশা রা.-এর বাহিনীর সদস্য হয়ে যায় ৩০ হাজার। অতঃপর উভয় বাহিনীই বসরার নিকটবর্তী হয়ে যায়। দুইপক্ষের কোনো পক্ষই লড়াইয়ে আগ্রহী ছিল না। তখন আলি রা. কাকা ইবনে আমর রা.-কে প্রেরণ করেন আয়েশা রা., তালহা রা. ও যুবায়ের রা.-এর সঙ্গে সমঝোতা এবং সন্ধিচুক্তি নিয়ে কথা বলার জন্য। কাকা ইবনে আমর রা. আয়েশা রা.-কে বলেন, উম্মুল মুমিনিন, কেন আপনি এই শহরে এলেন?
আয়েশা রা. বললেন, বৎস, আমি এসেছি লোকদের কল্যাণ এবং মীমাংসার উদ্দেশ্যে।

অতঃপর কাকা ইবনে আমর রা. আয়েশা রা.-কে তালহা রা. ও যুবায়ের রা.-কে ডাকার অনুরোধ করলেন। তিনি তাদের সংবাদ পাঠালে তারা এসে উপস্থিত হন। কাকা ইবনে আমর রা. তাদের উদ্দেশে বলেন, আমি উম্মুল মুমিনিনকে তার এখানে আগমনের কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি। তিনি জবাব দিয়েছেন যে, তিনি লোকদের কল্যাণ ও মীমাংসার লক্ষ্যেই এসেছেন। তারা দুজন বললেন, আমাদেরও একই উদ্দেশ্য।

তখন কাকা ইবনে আমর রা. বললেন, তাহলে সেই মীমাংসার পদ্ধতি কী? কীভাবে তা সম্ভব হতে পারে? আল্লাহর শপথ! যদি আমরা সেটাকে মীমাংসা ও সমাধানের সঠিক পদ্ধতি মনে করি তবে আমরা সন্ধি করব, আর যদি সেটাকে সঠিক পদ্ধতি মনে না করি তবে সন্ধি করব না। তারা দুজন বললেন, উসমান রা.-এর খুনিদের শাস্তি দিতে হবে। যদি এই শাস্তি প্রদান না করা হয় তাহলে কুরআনকে অমান্য করা হবে।

কাকা ইবনে আমর রা. বললেন, আপনারা বসরায় উসমান রা.-এর যে-সকল খুনি ছিল তাদের হত্যা করেছেন। আর ইতিপূর্বে আপনারা আজকের চেয়ে অধিক দৃঢ় ছিলেন। আপনারা ৬০০জনকে হত্যা করেছেন। এ কারণে ৬ হাজার লোক আপনাদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে আপনাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে। আপনারা হুরকুস ইবনে যুহাইরকে তলব করেছেন। কিন্তু ৬ হাজার লোক তাকে নিরাপত্তা দিচ্ছে। এখন যদি আপনারা তাকে ছেড়ে দেন, তাহলে আপনাদের কথামতো আপনারাই কুরআন অমান্য করলেন। আর যদি আপনারা তাদের সঙ্গে লড়াই করেন এবং ক্ষিপ্ত লোকেরা আপনাদের শত্রুপক্ষকে সাহায্য করে, তবে আপনারা যে বিভেদ এড়াতে চাচ্ছেন তাই সৃষ্টি হবে; বরং বিশৃঙ্খলা আরও বৃদ্ধি পাবে।

অর্থাৎ, উসমান রা.-এর খুনিদের হত্যার মাধ্যমে আপনারা মীমাংসা এবং কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন ঠিকই, কিন্তু এমনটি করলে এর ফলাফল কল্যাণকর না হয়ে অধিক ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে। যেমনইভাবে ৬ হাজার লোকের প্রতিরোধের কারণে আপনারা হুরকুস ইবনে যুহাইরের ওপর প্রতিশোধ নিতে পারেননি, তেমনইভাবে আলি রা.-ও এ কারণেই এ সময়ে উসমান রা.-এর খুনিদের ছাড় দিচ্ছেন। তিনি পূর্ণ ক্ষমতালাভের আগ পর্যন্ত উসমান রা.-এর শাস্তি বিলম্বিত করছেন। এখন সাম্রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তেই লোকেরা বিভিন্ন ধরনের কথা বলছে। অতঃপর তিনি তাদের জানিয়ে দিলেন যে, রবিআ এবং মুজার গোত্রের কিছু লোক বসরার লোকদের হত্যা করার কারণে তাদের সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য সমবেত হয়েছে।

উপস্থিত লোকেরা কাকা ইবনে আমর রা.-এর কথায় প্রভাবিত হতে শুরু করে। তখন আয়েশা রা. তাকে বলেন, এ ব্যাপারে তোমার কী অভিমত?
তিনি বললেন, আমার মত হচ্ছে, যা ঘটে গিয়েছে এর একমাত্র প্রতিষেধক হচ্ছে সবার শান্ত হয়ে যাওয়া। পরিস্থিতি শান্ত হয়ে গেলেই প্রতিকারের ব্যবস্থা হবে। যদি আপনারা আমাদের সঙ্গে বাইআত গ্রহণ করেন তবে তা উত্তম ও কল্যাণকর। এতেই প্রতিশোধ গ্রহণ সম্ভব। কিন্তু আপনারা যদি অস্বীকার করেন তবে বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে দাঁড়াবে। এটি হবে আমাদের জন্য অনিষ্টকর এবং এই সাম্রাজ্যের পতনের কারণ। তাই আপনারা নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিন। অবশ্যই আপনাদের তা দেওয়া হবে। এভাবেই আপনারা হয়ে উঠুন কল্যাণের উৎস, যেমনইভাবে ইতিপূর্বে কল্যাণের উৎস হয়ে ছিলেন। আমাদের কোনো বিপদের মুখোমুখি করবেন না। না হয় আপনারাও বিপদের মুখোমুখি হবেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের এবং আপনাদের সংঘর্ষের মুখোমুখি করবেন। আল্লাহর শপথ! নিশ্চয় এ কথা বলার মাধ্যমে আমি আপনাদের এই সমাধানের দিকে উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি। আমি আশঙ্কা করছি, যদি এমনটি সম্পন্ন না হয় তাহলে আল্লাহ তাআলা এই উম্মত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন।

তখন সবাই বললেন, আপনি সঠিক এবং সুন্দর কথা বলেছেন। এখন যদি আলি রা. আসেন এবং তিনিও আপনার মতোই অভিমত প্রকাশ করেন, তবে বিষয়টি সমাধান হয়ে যাবে। (২১৮)

কাকা ইবনে আমর রা. আলি রা.-কে এই সংবাদ দিলে তিনি খুবই আনন্দিত হন। অতঃপর উভয় পক্ষ সন্ধির জন্য সম্মত হয়ে যায়। যারা অপছন্দ করার তারা এই সন্ধিকে অপছন্দ করে, আর যারা সন্তুষ্ট হওয়ার তারা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেন। আয়েশা রা. চিঠির মাধ্যমে আলি রা.-কে জানিয়ে দেন যে, তিনি এই মীমাংসা এবং সন্ধির লক্ষ্যেই এসেছিলেন। তখন উভয় পক্ষই আনন্দিত হন। আলি রা. লোকদের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তব্য প্রদান করেন। আলি রা. বলেন, আমি আমার লোকদের নিয়ে তাদের কাছে সন্ধির লক্ষ্যে যাচ্ছি। সুতরাং উসমান রা.-এর হত্যায় যাদের হাত আছে তারা যেন আমাদের অনুসরণ না করে। তখন ২ হাজার ৫০০ লোক ব্যতীত সকলেই আলি রা.-এর সঙ্গে চলে যায়। এই লোকেরাই উসমান রা.-এর হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল এবং তার মৃত্যুতে সন্তুষ্ট হয়েছিল। এখন তারা তা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে দিলো। (২১৯)

ঐ সকল খুনিরা তাদের প্রতি আলি রা.-এর ক্রোধের কথা অনুধাবন করে নিজেদের নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। আলি রা. তার লোকদের নিয়ে আয়েশা রা. এবং তার বাহিনীর কাছে যান। ইতিমধ্যেই রাত নেমে আসে। দীর্ঘদিন পর মুসলিমদের জীবনে আসে এমন স্বস্তির রাত। কিন্তু ফিতনাবাজদের জন্য এ রাত ছিল কঠিন। তারা নির্ঘুম চোখে ভাবতে থাকে, কীভাবে তারা এই সন্ধির হাত থেকে বাঁচতে পারে। এই সন্ধি হয়ে গেলে অচিরেই তাদের গর্দানগুলো এর বিনিময় হতে যাচ্ছে। তাই তারা নতুন করে ফিতনা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র আঁটতে শুরু করে।

টিকাঃ
২১৭. হুরকুস ইবনে যুহাইর: সে ছিল খারেজিদের একজন। ৩৭ হিজরিতে মারা যায়।-সম্পাদক
২১৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২৬৫
২১৯. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২৬৫

ফন্ট সাইজ
15px
17px