📄 আয়েশা রা. ও তার বাহিনীর বসরায় পদার্পণ
মক্কা থেকে আয়েশা রা.-এর বাহিনী বসরায় পৌঁছে যায়। শহরে প্রবেশ করার পূর্বে তারা আলি রা.-এর পক্ষ থেকে নিযুক্ত বসরার গভর্নর উসমান ইবনে হুনাইফ রা.-এর কাছে কয়েকটি চিঠি প্রেরণ করে সামরিক সাহায্য সংগ্রহ এবং উসমান রা.-এর খুনিদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের লক্ষ্যে আয়েশা রা.-এর বাহিনীর জন্য বসরা শহর খালি করে দিতে বলেন। বসরার অধিবাসীদের মধ্য থেকে কারা উসমান রা.-এর হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল, কারা এর পক্ষে মত দিয়েছিল এবং কারা মত দেয়নি এ ব্যাপারে উসমান ইবনে হুনাইফ রা. কিছুই জানতেন না। তবে জানা যায় যে, উসমান রা.-কে হত্যা করার পর হত্যাকাণ্ডের অন্যতম মূলহোতা হাকিম ইবনে জাবালা মদিনা থেকে বসরায় পালিয়ে গিয়েছিল। একটি অজ্ঞাত স্থানে সে আত্মগোপন করেছিল। আর সে ছিল একটি বড় গোত্রের সদস্য এবং নিজ সম্প্রদায়ের সর্দার।
অতঃপর আয়েশা রা. এবং উসমান ইবনে হুনাইফ রা.-এর মধ্যে দূত মারফত কথাবার্তা চলতে থাকে। এ সময় আয়েশা রা.-এর সঙ্গে যুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা. ও তালহা রা.-ও ছিলেন। উসমান ইবনে হুনাইফ রা. জিজ্ঞাসা করেন, আপনারা কেন এসেছেন?
আয়েশা রা. বলেন, আমরা কেবল মীমাংসা ও শান্তি চাই।
অর্থাৎ, বসরায় আসার পেছনে তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করা। আর তারা মনে করেন যে, উসমান রা.-এর খুনিদের হত্যা করা ছাড়া কখনো মুসলিম উম্মাহ ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে না।
উসমান ইবনে হুনাইফ রা. তালহা রা. ও যুবায়ের রা.-কে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞাসা করেন, আপনারা কি আলি রা.-এর হাতে বাইআত গ্রহণ করেননি? তারা বলেন, আমরা অনিচ্ছায় বাইআত গ্রহণ করেছি। (২১০)
অতঃপর উসমান ইবনে হুনাইফ রা. মিম্বরে দাঁড়িয়ে লোকদের কাছে এ বিষয়ে পরামর্শ কামনা করেন। তখন আসওয়াদ ইবনে সুরাই নামক এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে যান। তিনি বলেন, উসমান রা.-এর হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য মক্কা থেকে আগত এই বাহিনীর সঙ্গে যদি বসরাবাসীরা ওই সকল খুনিদের বসরা থেকে নির্মূল করার লক্ষ্যে নিজেদের হাত মেলায়, তবে এতে আপত্তির কিছু দেখি না। এ কথা বলার পরপরই তার ওপর পাথর নিক্ষেপ শুরু হয়। তখন উসমান ইবনে হুনাইফ রা. বুঝে যান যে, বসরায় অবশ্যই খুনিদের সহযোগী রয়েছে। উসমান রা.-এর খুনিদের এ মুহূর্তে হত্যা করা হলে আলি রা. যেমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা করেছিলেন, তা প্রায় বাস্তবায়িত হয়ে যাচ্ছিল।
তখন বসরার গভর্নর উসমান ইবনে হুনাইফ রা. আয়েশা রা.-এর বাহিনীকে বসরায় প্রবেশ করতে নিষেধ করেন। আয়েশা রা.-এর বাহিনী থেকে জানানো হয়, তারা তাহলে জোরপূর্বক বসরায় প্রবেশ করবেন। তখন উসমান ইবনে হুনাইফ রা. তার বাহিনী নিয়ে বসরার সীমান্তে অবস্থান করেন। অতঃপর তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা. দাঁড়িয়ে লোকদেরকে উসমান রা. হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। এরপর যুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা. লোকদের উদ্দেশে বক্তব্য প্রদান করেন। কিন্তু তাদের অবস্থা পূর্বের মতোই থেকে যায়। অতঃপর আয়েশা রা. দাঁড়িয়ে এক জ্বালাময়ী বক্তব্য প্রদান করেন, ফলে উসমান রা.-এর হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য লোকদের অন্তর বিগলিত হয়ে যায়। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত কোনো হদ প্রয়োগে বিলম্ব করে, সেই হদ বাস্তবায়ন করার পরই তার হাতে বাইআত গ্রহণ ওয়াজিব হবে। আমরা এই হদ বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যেই এসেছি। যদি আলি এই হদ বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেন এবং অপরাধীদের ওপর হদ প্রয়োগ করেন, তাহলে আমরা তার বাইআত গ্রহণ করব।
আয়েশা রা.-এর বক্তব্যের পর উসমান ইবনে হুনাইফ রা.-এর বাহিনী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একদল চলে যায় আয়েশা রা. এবং তার বাহিনীর সঙ্গে। আরেকদল থেকে যায় উসমান ইবনে হুনাইফ রা.-এর সঙ্গে। এতে আয়েশা রা.-এর পক্ষ শক্তিশালী হয়ে যায় এবং উসমান ইবনে হুনাইফ রা. এবং তার সঙ্গে থাকা আলি রা.-এর অনুগত বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে। এদের মধ্যে অনেকেই ছিল উসমান রা.-এর হত্যার সমর্থক। তাদের গোত্র থেকে অনেকেই উসমান রা.-এর হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছিল। যদিও এরা সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেনি, কিন্তু তারাও নিজেদের হাতে ক্ষমতার চাবিকাঠি দেখতে চাইত। পরিস্থিতি দেখার পর উসমান ইবনে হুনাইফ রা. সামনে কী করবেন তা নিয়ে ভাবতে থাকেন। তিনি কি ফিতনা নির্মূল করার লক্ষ্যে সন্ধিস্থাপন করবেন নাকি আলি রা.-এর কাছে চিঠি পাঠাবেন।
ফিতনাবাজরা সন্ধির ব্যাপারে চিন্তা করে শঙ্কিত হয়ে ওঠে। কারণ, এমনটি তাদের জন্য মঙ্গলজনক হবে না। তখন হাকিম ইবনে জাবালা এবং তার গোত্রের কিছু লোক যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটায়। তারা আয়েশা রা.-এর বাহিনীর ওপর তির নিক্ষেপ শুরু করে। আয়েশা রা.-এর বাহিনীও দিতে থাকে পাল্টা জবাব। এভাবেই দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ চলতে থাকে এবং বাড়তে থাকে হতাহতের সংখ্যা। উসমান ইবনে হুনাইফ রা. এই পরিস্থিতি দেখে সন্ধি এবং সমঝোতা করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যান। তখন আয়েশা রা.-এর বাহিনীতে থাকা সাহাবিগণ লড়াই থামিয়ে দেন। অতঃপর আয়েশা রা. এবং উসমান ইবনে হুনাইফ রা.-এর বাহিনী বসরা থেকে মদিনার উদ্দেশে দূত প্রেরণ করতে একমত হয় এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করার জন্য যে, তালহা রা. ও যুবায়ের রা. সত্যিই অনিচ্ছায় বাইআত গ্রহণ করেছিলেন কি না।
তারা যদি অনিচ্ছায় বাইআত গ্রহণ করে থাকেন তাহলে উসমান ইবনে হুনাইফ রা. বসরাকে আয়েশা রা.-এর বাহিনীর জন্য উন্মুক্ত করে দেবেন। আর যদি তারা দুজন স্বেচ্ছায় বাইআত গ্রহণ করে থাকেন তবে তারা বসরা ছেড়ে মক্কায় ফিরে যাবেন। বসরার বিচারক কাব ইবনে সাওর রহ.-কে মদিনার উদ্দেশে প্রেরণ করা হয়। তিনি মদিনায় পৌঁছে লোকদের সামনে দাঁড়িয়ে বসরায় যা ঘটেছে তার ইতিবৃত্ত বর্ণনা করেন। সেদিন ছিল জুমার দিন। তিনি লোকদের জিজ্ঞাসা করেন, তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ এবং যুবায়ের ইবনুল আওয়াম কি স্বেচ্ছায় বাইআত গ্রহণ করেছিলেন নাকি অনিচ্ছায়?
তখন রাসুল ﷺ-এর প্রিয়পাত্র এবং প্রিয়পাত্রের পুত্র উসামা ইবনে যায়দ রা. দাঁড়িয়ে বলেন, তারা অনিচ্ছায় বাইআত গ্রহণ করেছিলেন। তখন মদিনায় অবস্থানরত ফিতনাবাজরা তাকে প্রায় মেরেই ফেলতে চেয়েছিল। সুহাইব ইবনে সিনান রুমি রা. ও আবু আইয়ুব আনসারি রা. দুজন তাকে উদ্ধার করেন এবং বলেন, আমরা যেভাবে নীরব ছিলাম, তুমি কি সেভাবে নীরব থাকতে পারতে না? কাব ইবনে সাওর রহ. বসরায় ফিরে গিয়ে লোকদের জানিয়ে দেন যে, তালহা এবং যুবায়ের রা. অনিচ্ছায় বাইআত গ্রহণ করেছেন। (২১২)
আলি রা. কাব ইবনে সাওর রহ.-এর আগমন এবং এই খবর নিয়ে প্রস্থানের ব্যাপারে জানতে পারেন। তখন তিনি উসমান ইবনে হুনাইফ রা.-এর কাছে চিঠি পাঠিয়ে এই সন্ধির ফিকহি দিকগুলো স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন যে, এমনটি করা কিছুতেই জায়েজ হবে না। যদিও তারা দুজন অনিচ্ছায় বাইআত গ্রহণ করেছে, তবুও তাদের হাতে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। খলিফাকে অনুসরণ করাই হচ্ছে সঠিক পন্থা। উসমান ইবনে হুনাইফ রা. তার বাহিনীর দুর্বলতা দেখে বাধ্য হয়েই সন্ধি স্থাপনে রাজি হয়েছিলেন। এবার তিনি আয়েশা রা.-এর বাহিনীর হাতে বসরা সমর্পণ না করার সিদ্ধান্তেই অটল থাকেন। ফলে আবারও সংঘর্ষ বেধে যায়। এতে হাকিম ইবনে জাবালা এবং বসরার ৬০০ লোক নিহত হয়। উসমান ইবনে হুনাইফ রা.-কে বন্দি করা হয়। তবে পরে তাকে হত্যা না করে মুক্ত করে দেওয়া হয়।
এ সংবাদ জানতে পেরে আলি রা. ৯০০ সেনার এক বাহিনী নিয়ে বসরার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন। তাদের নিয়ে তিনি যিকার নামক স্থানের উদ্দেশে রওনা হন। তখন ইবনে আবি রিফাআ নামক এক ব্যক্তি আলি রা.-এর মুখোমুখি হয়ে বলেন, হে আমিরুল মুমিনিন, আপনি কী চান এবং আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?
আলি রা. তাকে বললেন, আমি চাই মীমাংসা করতে, যদি তারা আমার প্রস্তাবে সাড়া দেয়।
ইবনে আবি রিফাআ বললেন, যদি তারা সম্মত না হয়?
আলি রা. বললেন, তবে তাদের বিশ্বাসঘাতকতার ওপরেই তাদের ছেড়ে দেবো। তাদের হক তাদের প্রদান করব এবং ধৈর্যধারণ করব।
ইবনে আবি রিফাআ বললেন, যদি এতেও তারা সম্মত না হয়?
আলি রা. বললেন, আমরা তাদের ছেড়ে দেবো, যদি তারা আমাদেরও ছেড়ে দেয়।
ইবনে আবি রিফাআ বললেন, যদি তারা আমাদের না ছাড়ে?
আলি রা. বললেন, তবে তরবারির মাধ্যমে তাদের প্রতিরোধ করব।
ইবনে আবি রিফাআ বললেন, তাহলে ঠিক আছে। এই বলে তিনিও তাদের সাথে রওনা হন।
হাজ্জাজ ইবনে গাজিয়্যা আনসারি রা. আলি রা.-কে বলেন, যেভাবে আপনি আমাকে কথার মাধ্যমে সন্তুষ্ট করেছেন, তেমনইভাবে আমি আপনাকে কাজের মাধ্যমে সন্তুষ্ট করব। অবশ্যই আল্লাহ তাআলা আমাদের সাহায্য করবেন, যেভাবে তিনি আমাদের নাম দিয়েছেন আনসার তথা সাহায্যকারী। (২১৩)
যিকারে পৌঁছার পূর্বে উসমান ইবনে হুনাইফ রা. আলি রা.-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বসরায় ৬০০-এর অধিক লোক নিহত হওয়ার ব্যাপারে তাকে অবহিত করেন। তখন আলি রা. বলে ওঠেন, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তখন তিনি তার পুত্র হাসান রা., কাকা ইবনে আমর রা. এবং আম্মার ইবনে ইয়াসির রা.-কে কুফায় সাহায্য চাওয়ার উদ্দেশ্যে পাঠান।
কুফার গভর্নর আবু মুসা আশআরি রা. ছিলেন ইবনে উমর রা.-এর মতো ফিতনা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা থাকার পক্ষে। তিনি মনে করতেন, মুসলিমগণ একে অপরকে তরবারি দিয়ে আঘাত করা কিছুতেই সমীচীন হবে না। তখন হাসান রা., কাকা ইবনে আমর রা. এবং আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. কুফার মসজিদে দাঁড়িয়ে লোকদের তাদের সঙ্গে বের হওয়ার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। কিন্তু এর আগেই আবু মুসা আশআরি রা. লোকদের বলেছিলেন, এ ব্যাপারে নীরব থাকা এবং দুই দলের কারও পক্ষাবলম্বন না করাই উত্তম। এ সময় কুফার এক ব্যক্তি আগত তিনজন সাহাবিকে খুশি করার উদ্দেশ্যে আয়েশা রা.-কে গালিগালাজ করতে শুরু করে। সে ভেবেছিল এতে তারা সন্তুষ্ট হবেন। তখন আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. ওই ব্যক্তিকে বললেন, চুপ কর, হে নরাধম ও নিকৃষ্ট। অতঃপর তিনি বললেন, নিশ্চয় আমি জানি, তিনি দুনিয়া ও আখেরাতে রাসুল ﷺ-এর সহধর্মিণী। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আপনাদের পরীক্ষায় ফেলেছেন যে, আপনারা আলির অনুসরণ করেন নাকি আয়েশার। (২১৪) সহিহ বুখারি-তে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে।
অতঃপর হুজর ইবনে আদি রা. দাঁড়িয়ে কুফার লোকদের বলেন, আপনারা সকলেই হালকা অথবা ভারী রণসম্ভার নিয়ে আমিরুল মুমিনিনের সাহায্যের জন্য বের হন এবং নিজেদের জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় তার পক্ষে লড়াই করুন। এটিই আপনাদের জন্য উত্তম, যদি আপনারা বুঝাতে পারেন। কুফার লোকেরা আগত তিনজন সাহাবির সঙ্গে সহমত পোষণ করতে শুরু করে। অতঃপর তারা ১২ হাজার লোক সঙ্গে নিয়ে কুফা থেকে বেরিয়ে পড়েন। (২১৫)
যিকারের উদ্দেশে যাত্রাপথে কুফার লোকদের সাক্ষাৎ হয় আলি রা.-এর প্রধান উপদেষ্টা আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর সঙ্গে। তিনি লোকদের উদ্দেশে বলেন, হে কুফাবাসী, আপনারা অনারব পারস্যের রাজাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন এবং তাদের চূর্ণ করে দিয়েছেন। আমরা আপনাদের তলব করেছি আমাদের সঙ্গে বসরার ভাইদের মুখোমুখি বসার জন্য। যদি তারা ফিরে যান তবে ভালো। আমাদের উদ্দেশ্য এটিই। আর যদি তারা অস্বীকৃতি জানান তাহলে নম্রতার সঙ্গে তাদের আমরা আহ্বান করব, যতক্ষণ না তারা আমাদের ওপর অত্যাচার শুরু করে। যে কাজে ফিতনার আশঙ্কা রয়েছে সেই তুলনায় যে কাজে কল্যাণ রয়েছে সেটিকেই আমরা প্রাধান্য দেবো। ইনশাআল্লাহ। অতঃপর সকলেই তার এ কথায় একমত হয়। (২১৬)
টিকাঃ
২০৯. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২৫৮
২১০. তারিখ ইবনি খালদুন, ২/৬০৯
২১২. আল-কামিল ফিত তারিখ, ২/৫৭৬
২১৩. তারিখুত তবারি, ৪/৪৮৪; তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৪৪/৪৩৬-৪৩৭; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২৬২
২১৪. সহিহ বুখারি, ৭১০০, ৩৭৭২; সুনানুত তিরমিজি, ৩৮৮৮; আল-মুসতাদরাক লিল হাকিম, ৫৬৮৪
২১৫. তারিখুত তবারি, ৪/৪৮৫; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২৬৪
২১৬. তারিখুত তবারি, ৪/৪৭৮; আল-কামিল ফিত তারিখ, ২/৫৯১; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২৬৪
📄 কাকা ইবনে আমর রা. ও সন্ধির সুসংবাদ
যিকারে সমবেত হওয়ার পর আলি রা.-এর বাহিনী বসরা অভিমুখী হয়। এ সময়ের মধ্যে আলি রা.-এর সমর্থকগণ তার কাতারে এসে সমবেত হতে থাকেন এবং আয়েশা রা.-এর সমর্থকগণ সমবেত হতে থাকেন তার বাহিনীর কাতারে। এভাবে আলি রা.-এর বাহিনীর সদস্যসংখ্যা দাঁড়ায় ২০ হাজার এবং আয়েশা রা.-এর বাহিনীর সদস্য হয়ে যায় ৩০ হাজার। অতঃপর উভয় বাহিনীই বসরার নিকটবর্তী হয়ে যায়। দুইপক্ষের কোনো পক্ষই লড়াইয়ে আগ্রহী ছিল না। তখন আলি রা. কাকা ইবনে আমর রা.-কে প্রেরণ করেন আয়েশা রা., তালহা রা. ও যুবায়ের রা.-এর সঙ্গে সমঝোতা এবং সন্ধিচুক্তি নিয়ে কথা বলার জন্য। কাকা ইবনে আমর রা. আয়েশা রা.-কে বলেন, উম্মুল মুমিনিন, কেন আপনি এই শহরে এলেন?
আয়েশা রা. বললেন, বৎস, আমি এসেছি লোকদের কল্যাণ এবং মীমাংসার উদ্দেশ্যে।
অতঃপর কাকা ইবনে আমর রা. আয়েশা রা.-কে তালহা রা. ও যুবায়ের রা.-কে ডাকার অনুরোধ করলেন। তিনি তাদের সংবাদ পাঠালে তারা এসে উপস্থিত হন। কাকা ইবনে আমর রা. তাদের উদ্দেশে বলেন, আমি উম্মুল মুমিনিনকে তার এখানে আগমনের কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি। তিনি জবাব দিয়েছেন যে, তিনি লোকদের কল্যাণ ও মীমাংসার লক্ষ্যেই এসেছেন। তারা দুজন বললেন, আমাদেরও একই উদ্দেশ্য।
তখন কাকা ইবনে আমর রা. বললেন, তাহলে সেই মীমাংসার পদ্ধতি কী? কীভাবে তা সম্ভব হতে পারে? আল্লাহর শপথ! যদি আমরা সেটাকে মীমাংসা ও সমাধানের সঠিক পদ্ধতি মনে করি তবে আমরা সন্ধি করব, আর যদি সেটাকে সঠিক পদ্ধতি মনে না করি তবে সন্ধি করব না। তারা দুজন বললেন, উসমান রা.-এর খুনিদের শাস্তি দিতে হবে। যদি এই শাস্তি প্রদান না করা হয় তাহলে কুরআনকে অমান্য করা হবে।
কাকা ইবনে আমর রা. বললেন, আপনারা বসরায় উসমান রা.-এর যে-সকল খুনি ছিল তাদের হত্যা করেছেন। আর ইতিপূর্বে আপনারা আজকের চেয়ে অধিক দৃঢ় ছিলেন। আপনারা ৬০০জনকে হত্যা করেছেন। এ কারণে ৬ হাজার লোক আপনাদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে আপনাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে। আপনারা হুরকুস ইবনে যুহাইরকে তলব করেছেন। কিন্তু ৬ হাজার লোক তাকে নিরাপত্তা দিচ্ছে। এখন যদি আপনারা তাকে ছেড়ে দেন, তাহলে আপনাদের কথামতো আপনারাই কুরআন অমান্য করলেন। আর যদি আপনারা তাদের সঙ্গে লড়াই করেন এবং ক্ষিপ্ত লোকেরা আপনাদের শত্রুপক্ষকে সাহায্য করে, তবে আপনারা যে বিভেদ এড়াতে চাচ্ছেন তাই সৃষ্টি হবে; বরং বিশৃঙ্খলা আরও বৃদ্ধি পাবে।
অর্থাৎ, উসমান রা.-এর খুনিদের হত্যার মাধ্যমে আপনারা মীমাংসা এবং কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন ঠিকই, কিন্তু এমনটি করলে এর ফলাফল কল্যাণকর না হয়ে অধিক ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে। যেমনইভাবে ৬ হাজার লোকের প্রতিরোধের কারণে আপনারা হুরকুস ইবনে যুহাইরের ওপর প্রতিশোধ নিতে পারেননি, তেমনইভাবে আলি রা.-ও এ কারণেই এ সময়ে উসমান রা.-এর খুনিদের ছাড় দিচ্ছেন। তিনি পূর্ণ ক্ষমতালাভের আগ পর্যন্ত উসমান রা.-এর শাস্তি বিলম্বিত করছেন। এখন সাম্রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তেই লোকেরা বিভিন্ন ধরনের কথা বলছে। অতঃপর তিনি তাদের জানিয়ে দিলেন যে, রবিআ এবং মুজার গোত্রের কিছু লোক বসরার লোকদের হত্যা করার কারণে তাদের সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য সমবেত হয়েছে।
উপস্থিত লোকেরা কাকা ইবনে আমর রা.-এর কথায় প্রভাবিত হতে শুরু করে। তখন আয়েশা রা. তাকে বলেন, এ ব্যাপারে তোমার কী অভিমত?
তিনি বললেন, আমার মত হচ্ছে, যা ঘটে গিয়েছে এর একমাত্র প্রতিষেধক হচ্ছে সবার শান্ত হয়ে যাওয়া। পরিস্থিতি শান্ত হয়ে গেলেই প্রতিকারের ব্যবস্থা হবে। যদি আপনারা আমাদের সঙ্গে বাইআত গ্রহণ করেন তবে তা উত্তম ও কল্যাণকর। এতেই প্রতিশোধ গ্রহণ সম্ভব। কিন্তু আপনারা যদি অস্বীকার করেন তবে বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে দাঁড়াবে। এটি হবে আমাদের জন্য অনিষ্টকর এবং এই সাম্রাজ্যের পতনের কারণ। তাই আপনারা নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিন। অবশ্যই আপনাদের তা দেওয়া হবে। এভাবেই আপনারা হয়ে উঠুন কল্যাণের উৎস, যেমনইভাবে ইতিপূর্বে কল্যাণের উৎস হয়ে ছিলেন। আমাদের কোনো বিপদের মুখোমুখি করবেন না। না হয় আপনারাও বিপদের মুখোমুখি হবেন। আল্লাহ তাআলা আমাদের এবং আপনাদের সংঘর্ষের মুখোমুখি করবেন। আল্লাহর শপথ! নিশ্চয় এ কথা বলার মাধ্যমে আমি আপনাদের এই সমাধানের দিকে উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি। আমি আশঙ্কা করছি, যদি এমনটি সম্পন্ন না হয় তাহলে আল্লাহ তাআলা এই উম্মত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন।
তখন সবাই বললেন, আপনি সঠিক এবং সুন্দর কথা বলেছেন। এখন যদি আলি রা. আসেন এবং তিনিও আপনার মতোই অভিমত প্রকাশ করেন, তবে বিষয়টি সমাধান হয়ে যাবে। (২১৮)
কাকা ইবনে আমর রা. আলি রা.-কে এই সংবাদ দিলে তিনি খুবই আনন্দিত হন। অতঃপর উভয় পক্ষ সন্ধির জন্য সম্মত হয়ে যায়। যারা অপছন্দ করার তারা এই সন্ধিকে অপছন্দ করে, আর যারা সন্তুষ্ট হওয়ার তারা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেন। আয়েশা রা. চিঠির মাধ্যমে আলি রা.-কে জানিয়ে দেন যে, তিনি এই মীমাংসা এবং সন্ধির লক্ষ্যেই এসেছিলেন। তখন উভয় পক্ষই আনন্দিত হন। আলি রা. লোকদের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তব্য প্রদান করেন। আলি রা. বলেন, আমি আমার লোকদের নিয়ে তাদের কাছে সন্ধির লক্ষ্যে যাচ্ছি। সুতরাং উসমান রা.-এর হত্যায় যাদের হাত আছে তারা যেন আমাদের অনুসরণ না করে। তখন ২ হাজার ৫০০ লোক ব্যতীত সকলেই আলি রা.-এর সঙ্গে চলে যায়। এই লোকেরাই উসমান রা.-এর হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল এবং তার মৃত্যুতে সন্তুষ্ট হয়েছিল। এখন তারা তা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে দিলো। (২১৯)
ঐ সকল খুনিরা তাদের প্রতি আলি রা.-এর ক্রোধের কথা অনুধাবন করে নিজেদের নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। আলি রা. তার লোকদের নিয়ে আয়েশা রা. এবং তার বাহিনীর কাছে যান। ইতিমধ্যেই রাত নেমে আসে। দীর্ঘদিন পর মুসলিমদের জীবনে আসে এমন স্বস্তির রাত। কিন্তু ফিতনাবাজদের জন্য এ রাত ছিল কঠিন। তারা নির্ঘুম চোখে ভাবতে থাকে, কীভাবে তারা এই সন্ধির হাত থেকে বাঁচতে পারে। এই সন্ধি হয়ে গেলে অচিরেই তাদের গর্দানগুলো এর বিনিময় হতে যাচ্ছে। তাই তারা নতুন করে ফিতনা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র আঁটতে শুরু করে।
টিকাঃ
২১৭. হুরকুস ইবনে যুহাইর: সে ছিল খারেজিদের একজন। ৩৭ হিজরিতে মারা যায়।-সম্পাদক
২১৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২৬৫
২১৯. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২৬৫