📄 কেন এই মতভিন্নতা
পূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি যে, উসমান রা.-এর হত্যাকাণ্ডের পর সকল সাহাবি আলি রা.-এর কাছে সমবেত হন। তিনি খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণে স্পষ্ট অস্বীকৃতি জানান। এরপর অনেক চাপাচাপি এবং অনুরোধের কারণে তিনি খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণে বাধ্য হন। উসমান রা.-কে হত্যার পাঁচদিন পর তিনি খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা. ও যুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা.-ও আলি রা.-এর হাতে বাইআত গ্রহণ করেন।
এরপর অন্য সবাই আলি রা.-এর হাতে বাইআত গ্রহণ করে। কিছু লোক বিলম্ব করলেও পরবর্তী সময়ে বাইআত গ্রহণ করে নেয়। আলি রা. ইসলামি সাম্রাজ্যের অধীন প্রতিটি শহরে এ সংবাদ জানিয়ে চিঠি পাঠান। এ সময় পর্যন্ত মদিনার সার্বিক নিয়ন্ত্রণ ফিতনাবাজদের হাতেই ছিল। এর পেছনে রহস্য ছিল তাদের জনবল এবং সামরিক অস্ত্রশস্ত্র। আলি রা.-এর হাতে তখনও সে শক্তি ছিল না, যা প্রয়োগ করে তিনি বিভিন্ন শহরে কোনোরূপ ফিতনা ছাড়াই উসমান রা.-এর খুনিদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে পারবেন। এসব খুনিদের হত্যা করলে দ্রুতই সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সাম্প্রদায়িক বিদ্রোহ দেখা দিত। তাই আলি রা. সাম্রাজ্যের ভিত মজবুত হওয়া পর্যন্ত ওই সমস্ত খুনিদের বিচার স্থগিত রাখেন।
ফিতনাবাজদের যদি হত্যা করা হয়, তাহলে ওই সব গোত্র কী ঘটাতে পারে তা আলি রা.-এর জানার সুযোগ ছিল না। তারা সেনা একত্র করে মিশর, কুফা এবং বসরার বিভিন্ন প্রান্তে বিদ্রোহ করবে। ইসলামি সাম্রাজ্য হয়ে যাবে খণ্ডবিখণ্ড। তাই ইসলামের দাঁড়িপাল্লায় কোনটি বেশি ক্ষতিকর, বর্তমানের মতো ইসলামি সাম্রাজ্য বিভক্ত হয়ে প্রতিটি অঞ্চলের আলাদা আলাদা শাসক হওয়া, নাকি উসমান রা.-এর হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য কিছুদিন অপেক্ষা করা; অতঃপর যখন ইসলামি সাম্রাজ্যের প্রতিটি প্রান্ত আলি রা.-এর আনুগত্য স্বীকার করবে, তখন প্রত্যেককেই যথাযথ শাস্তি প্রদান করা?
মূলত, এসব বিষয় ছিল ইজতেহাদ তথা সাহাবিগণের গবেষণা প্রসূত। এ ক্ষেত্রে কে ঠিক আর কে বেঠিক, তা পূর্ণরূপে স্পষ্ট ছিল না। আলি রা.- কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে অনেক ভেবেচিন্তে এবং পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিতেন। এই ফিতনা সংঘটিত হয়েছে। তবে কেউই জানে না, এর পেছনে কী কল্যাণ নিহিত রয়েছে? এখানে ফিকহ সংশ্লিষ্ট এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যদি এই ফিতনা না হতো তবে আমরা তা কখনোই জানতে পারতাম না।
মুআবিয়া রা. ও তার সঙ্গীদের জন্য আলি রা.-এর বাইআত গ্রহণ করা ওয়াজিব বলে মত ব্যক্ত করেন। পরিস্থিতি যখন শান্ত হবে ও ক্ষমতা নিষ্কণ্টক হবে, তখন তিনি উসমান রা.-এর হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন। কিন্তু আমর ইবনুল আস রা. প্রথমে খুনিদের হত্যা অথবা তাদের হাতে সমর্পণ করার দাবি জানান। এ ব্যাপারে অনেক আলোচনা করেও যখন মীমাংসা হলো না, তখন তারা খেলাফতের বিষয়টি ছেড়ে দেন বেশ কিছু বিশিষ্ট সাহাবির ওপর। তাদের মধ্যে আলি রা.-ও ছিলেন।
সাক্ষীগণের উপস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, আগামী বছর দুমাতুল জান্দালে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ওই সকল বিশিষ্ট সাহাবি এখান থেকে গিয়ে এ ব্যাপারে চিন্তাভাবনা ও আলোচনা করবেন। এ ব্যাপারে সবচেয়ে উপযুক্ত কে হবেন তা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দেবেন। আলি রা.-ই যে এ ব্যাপারে সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি হবেন তারই ছিল জোর সম্ভাবনা। পুনরায় বৈঠকের সময় আসা পর্যন্ত আলি এবং মুআবিয়া রা. উভয়েই নিজ নিজ নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলসমূহ শাসন করবেন। নতুন খলিফা নির্বাচন করার পর সকলকেই তার অনুসরণ করতে হবে। চাই তিনি প্রথমে উসমান রা.-এর প্রতিশোধ নেন অথবা তা বিলম্বিত করেন। আলি রা.-এর কাছে এই সংবাদ পৌঁছলে তিনি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। এমনইভাবে মুআবিয়া রা.-ও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। সত্য তো সেটাই যে ব্যাপারে শত্রুও সাক্ষ্য দেয়।
টিকাঃ
২০৫. তারিখু ইবনি খালদুন, ২/৬১০
২০৬. এ কথাটি সঠিক নয়। কারণ, সহিহ সূত্রে বর্ণিত একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, তারা স্বেচ্ছায় উসমান রা.-এর হাতে বাইআত গ্রহণ করেছিলেন। সূত্র: সহিহু ওয়া যয়িফু তারিখিত তবারি (টীকা অংশ), ৩/৩৭২ (শামেলা)-সম্পাদক
২০৭. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২৫৬; তারিখু ইবনি খালদুন, ২/৬০৫