📄 মুআবিয়া রা.-এর অবস্থান
পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, মুআবিয়া রা.-এর কাছে উসমান রা.-এর হত্যাকাণ্ডের সংবাদ, রক্তে রঞ্জিত জামা এবং নায়েলা রহ.-এর কর্তিত আঙুল এবং হাতের কবজি পৌঁছেছিল। তাকে উদ্দেশ করে নায়েলা রহ. যে পত্র পাঠিয়েছিলেন, তাতে লিখেছিলেন, আপনিই এখন উসমান রা.-এর উত্তরসূরি।
প্রকৃতপক্ষেই তিনি উসমান রা.-এর উত্তরসূরি ছিলেন। কারণ, তিনিও ছিলেন বনু উমাইয়া বংশের লোক। তাই মুআবিয়া রা. আলি রা.-এর বাইআত গ্রহণ করেননি; বরং শর্ত দিয়েছিলেন উসমান রা.-এর রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণ করতে হবে। খুনিদের খুনের বদলে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। যদি কেউ এমনটি না করে তবে সে আল্লাহ তাআলার কুরআনকে নিরর্থক ঘোষণা করল এবং এমন ব্যক্তির ক্ষমতা গ্রহণও বৈধ হবে না। এই ছিল মুআবিয়া রা.-এর ইজতেহাদ। আবু দারদা রা. এবং উবাদা ইবনে সামিত রা.-এর মতো বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবি তার সঙ্গে সহমত পোষণ করেন।
এ বিষয়টি যদিও ইজতেহাদ ছিল, তবে এই ইজতেহাদে তারা ভুল করেছিলেন। এ সময় আলি রা.-এর মতই ছিল সঠিক এবং তার হাতে বাইআত গ্রহণই ছিল যথাযথ সিদ্ধান্ত। এরপর পরিস্থিতি শান্ত হয়ে গেলেই প্রতিশোধের ব্যবস্থা হতো। কিন্তু মুআবিয়া রা. বাইআত গ্রহণের পূর্বে প্রতিশোধ নেওয়ার পক্ষে অটল ছিলেন। যদি আলি রা. প্রতিশোধ গ্রহণ করেন তাহলে আপত্তি নেই। এখানে তাদের শাস্তি প্রদান করাটাই গুরুত্বপূর্ণ। তাই মুআবিয়া রা. বলেছিলেন, আলি রা. যদি খুনিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন তাহলে আমরা তার হাতে বাইআত গ্রহণ করব।
📄 আলি রা.-এর গভর্নর পরিবর্তন
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এসে আলি রা.-কে পরামর্শ দেন, তিনি যেন পরিস্থিতি শান্ত হওয়া পর্যন্ত কোনো অঞ্চলের গভর্নর পরিবর্তন না করেন; এতে ফিতনা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। কিন্তু আলি রা. গভর্নর পরিবর্তনের ব্যাপারে তার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তিনি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-কে ইয়ামেনের গভর্নর নিযুক্ত করেন। উসমান ইবনে হুনাইফ রা.-কে নিযুক্ত করেন বসরায়। কুফায় নিযুক্ত করেন উমারা ইবনে শিহাব রা.-কে, শামে নিযুক্ত করেন সাহল ইবনে হুনাইফ রা.-কে এবং মিশরে নিযুক্ত করেন কায়স ইবনে সাদ রা.-কে।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. ইয়ামেনে গিয়ে সেখানকার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। উসমান ইবনে হুনাইফ রা. বসরায় গিয়ে মিম্বরে আরোহণ করে সেখানকার অধিবাসীদের মুখোমুখি হন এবং নিজেকে গভর্নর হিসাবে ঘোষণা করেন। তখন বসরার লোকেরা বিভক্ত হয়ে যায়। কেউ তাকে মেনে নেয়। আবার কেউ বলে, উসমান রা.-এর প্রতিশোধ গ্রহণের পরেই আমরা আপনার নেতৃত্ব মেনে নেব।
কিন্তু অধিকাংশ লোক তার পক্ষে থাকায় ক্ষমতা তার হাতে চলে যায় এবং তিনি বসরার নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হন। এদিকে কুফার প্রবেশদ্বারে তালহা ইবনে খুয়াইলিদ উমারা ইবনে শিহাব রা-এর মুখোমুখি হন। তিনি উমারা ইবনে শিহাব রা.-কে জোরপূর্বক কুফায় প্রবেশ করতে বাধা দেন এবং আলি রা.-এর কাছে ফেরত পাঠিয়ে দেন। কুফার পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে। আলি রা. নিয়োগপ্রাপ্ত গভর্নরের ক্ষমতা দৃঢ় করার জন্য চিঠি প্রেরণ করেন। তখন আবু মুসা আশআরি রা.-এর পক্ষ থেকে প্রেরিত চিঠি এসে পৌঁছে। তাতে জানানো হয় যে, কুফার অধিকাংশ অধিবাসী আলি রা.-এর পক্ষে আছেন।
এদিকে সাহল ইবনে হুনাইফ রা. শামের এক প্রান্তে মুআবিয়া রা.-এর অশ্বারোহী বাহিনীর মুখোমুখি হন। তারা সাহল ইবনে হুনাইফ রা.-কে জিজ্ঞাসা করেন, কে আপনি? তিনি বলেন, সাহল ইবনে হুনাইফ। তারা জিজ্ঞাসা করে, কেন এসেছেন? তিনি বলেন, আমি গভর্নর হিসাবে এসেছি। তারা তখন বলে, আপনি যদি উসমান রা.-এর পক্ষ থেকে আসেন তবে স্বাগত জানাচ্ছি। কিন্তু যদি আলি রা.-এর পক্ষ থেকে আসেন তাহলে ফিরে যান। শামে প্রবেশ করতে হলে আপনাকে আমাদের রক্ত মাড়িয়েই প্রবেশ করতে হবে।
তখন সাহল ইবনে হুনাইফ রা. মদিনায় ফিরে যান। এদিকে মিশরের গভর্নর কায়স ইবনে সাদ রা. মিশরে পৌঁছে দায়িত্ব বুঝে নিতে সক্ষম হন। তখন মিশরের জনগণ তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। তাদের অধিকাংশই কায়স ইবনে সাদ রা.-এর হাতে বাইআত গ্রহণ করে। কিছু লোক কোনো মতামত দেয়নি, আর কিছু লোক বলেছিল, যারা উসমান রা.-এর রক্তের মূল্য আদায় করবে আমরা তাদের পক্ষে।
টিকাঃ
১৯৫. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২৫৫
১৯৬. সঠিক মতানুযায়ী আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-কে ইয়ামেনের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি; বরং ইয়ামেনের দায়িত্ব দেওয়া হয় উবাইদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-কে। সূত্র: আমিরুল মুমিনিন আলি ইবনে আবু তালিব রা., ড. আলি সাল্লাবি, পৃ. ৩৭৫-সম্পাদক
১৯৭. তারিখু ইবনি খালদুন, ২/৬০৪
১৯৮. তারিখুত তবারি, ৪/৪৪২; আল-কামিল ফিত তারিখ, ২/৫৬৫
১৯৯. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২৫৬
📄 শামের উদ্দেশে আলি রা.
আলি রা. মুআবিয়া রা.-এর কাছে তিনটি চিঠি পাঠান। মুআবিয়া রা. একটিরও জবাব লিখে পাঠাননি। তবে আলি রা.-এর কাছে একটি খালি চিঠি প্রেরণ করেন মুআবিয়া রা.। যেন চিঠিটি খোলার পর ফিতনাবাজরা চিঠিবাহককে হত্যা না করে। চিঠি বাহক আলি রা.-এর কাছে প্রবেশ করেই হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে বুঝিয়ে দেন যে, মুআবিয়া রা. বাইআত করবেন না। চিঠিবাহক আলি রা.-কে বলেন, আমি আপনার কাছে নিরাপত্তা চাচ্ছি। তখন আলি রা. তাকে নিরাপত্তা প্রদান করেন। এরপর চিঠিবাহক আলি রা.-কে বলেন, মুআবিয়া রা. আপনাকে বলেছেন যে, তিনি উসমান রা.-এর খুনিদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের পরই বাইআত গ্রহণ করবেন। হয়তো আপনি প্রতিশোধ গ্রহণ করুন, নয়তো আমরাই প্রতিশোধ গ্রহণ করব। আলি রা. তার এ কথায় অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, নিশ্চয় মুআবিয়া রা. খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে। যারা বিদ্রোহ করে তাদেরকে খেলাফতের অনুগত বাহিনীর মাধ্যমে দমন করা হবে। অর্থাৎ, আলি রা. তার অনুগত বাহিনীর সহায়তায় বিরুদ্ধচারণকারীদের দমন করতে চান।
আলি রা. সেনাবাহিনী প্রস্তুত করে শাম অভিমুখে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। মুআবিয়া রা. যদি বাইআত গ্রহণ না করে তবে তার সঙ্গে লড়াই হবে। পরিস্থিতির বিবেচনায় তার এই ইজতেহাদ ছিল সঠিক। তাই আলি রা. মুসলিমদের কাছে সহায়তা কামনা শুরু করেন। কুফায় আবু মুসা আশআরি রা., বসরায় উসমান ইবনে হুনাইফ রা., মিশরে কায়স ইবনে সাদ রা. ও ইয়ামেনে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর কাছে চিঠি প্রেরণ করে তাদের কাছে এ বিষয়ে সাহায্য চান। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. তার এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। কিন্তু আলি রা. নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তখন হাসান রা. এসে আলি রা.-কে বলেন, বাবা, আপনি এমনটি করা থেকে বিরত হোন। এতে মুসলিমদেরই রক্তপাত হবে এবং তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হবে। আলি রা. তার এ কথা না মেনে যুদ্ধের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন এবং শামের উদ্দেশ্যে সেনাবাহিনী প্রস্তুত করতে শুরু করেন।
আলি রা. তার চাচাতো ভাই কুসাম ইবনে আব্বাস রা.-কে মদিনায় তার স্থলাভিষিক্ত করে শামে গমনের জন্য বাহিনী প্রস্তুত করে ফেলেন। বাহিনীর ডান ভাগে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.। মতের অমিল থাকা সত্ত্বেও তিনি আলি রা.-এর সঙ্গে বের হওয়া থেকে বিরত থাকেননি। বাহিনীর বামদিকের নেতৃত্বে ছিলেন উমর ইবনে আবি সালামা রা. এবং অগ্রভাগে ছিলেন আবু লায়লা ইবনে আমর জাররাহ। তিনি ছিলেন আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রা.-এর ভাতিজা।
আলি রা. যখন তার বাহিনী নিয়ে মদিনা থেকে শাম অভিমুখে বেরিয়ে পড়েছিলেন, তখন মক্কায় এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যায়। ফলে আলি রা. তার পরিকল্পনা সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তন করে ফেলেন। আয়েশা রা. এবং রাসুল ﷺ-এর অন্যান্য স্ত্রীগণ তখন মক্কায় অবস্থান করছিলেন। শুধু উম্মে হাবিবা রা. অবস্থান করছিলেন মদিনায়। এদিকে তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা., যুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা. ও মুগিরা ইবনে শুবা রা. প্রমুখ বিশিষ্ট সাহাবিগণও তখন মক্কায় ছিলেন। উসমান রা.-এর পক্ষ থেকে নিযুক্ত ইয়ামেনের গভর্নর ইয়ালা ইবনে উমাইয়া তামিমি রা.-ও ফিতনার ঘটনার সময় মক্কায় চলে এসেছিলেন। তারা সকলে মিলে সার্বিক অবস্থা বিবেচনার পর, আলি রা.-এর হাতে বাইআত গ্রহণ করা সত্ত্বেও এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, উসমান রা.-এর হত্যার প্রতিশোধগ্রহণের বিষয়টি প্রাধান্য দিতে হবে। কোনোভাবেই এই বিষয়ে বিলম্ব করা ঠিক হবে না। দুজন বিশিষ্ট সাহাবি তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা. ও যুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা. ছিলেন এই মতের পক্ষপাতীদের প্রধান। এ বিষয়টিই জঙ্গে জামাল তথা উটের যুদ্ধের ভূমিকা হিসাবে কাজ করেছিল।
টিকাঃ
২০০. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২৫৬
২০১. আমর: তার নাম আমর নয়, বরং উমর।-সম্পাদক
২০২. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২৫৭
📄 গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নোত্তর
এক নং প্রশ্ন: বর্তমানে আমাদের কাছে সবকিছু স্পষ্ট। আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারি অমুক সত্যের ওপর রয়েছে, আর অমুক রয়েছে ভুলের ওপর। তাই কখনো আমরা নিজেদের প্রশ্ন করি, অমুক সাহাবি এই মত কেন গ্রহণ করলেন না, আমাদের দৃষ্টিতে তো স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে যে, এই মত সঠিক ছিল।
উত্তর: সাহাবিগণের ক্ষেত্রে এমনটি বলা মোটেই সমীচীন নয়। নিশ্চয় প্রত্যেক সাহাবির জন্যই ইসলামে রয়েছে বিশেষ অবস্থান, সম্মান ও মর্যাদা। আলি ইবনে আবু তালেব রা. ছিলেন সে সময়ে উম্মাহর সবচেয়ে বিজ্ঞ ও দূরদর্শী ব্যক্তি। যুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা. ছিলেন রাসুল ﷺ-এর সহচর। এমনইভাবে তালহা রা.-এরও রয়েছে বিশেষ মর্যাদা ও অবস্থান। তাকে বলা হতো 'তালহাতুল খাইর' অর্থাৎ কল্যাণময় তালহা। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা.-ও ছিলেন বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। তার মতেরও ছিল গ্রহণযোগ্যতা। আমরা দেখতে পাই যে, প্রত্যেক যুগেই যারা বিজ্ঞ, প্রাজ্ঞ এবং দূরদর্শী ছিলেন। তারা সকলেই নিজ নিজ চিন্তাভাবনা ও গবেষণা অনুযায়ী মত প্রকাশ করতেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আলি রা., যুবায়ের রা., তালহা রা. ও আয়েশা রা. প্রমুখ সাহাবি ছিলেন তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে খোদাভীরু ব্যক্তি।
তাদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা, খোদাভীরুতা ও অন্যান্য প্রশংসনীয় গুণাবলি থাকার পাশাপাশি প্রত্যেকেই বিষয়টি নিজস্ব চিন্তা-চেতনা, বুদ্ধি ও পর্যবেক্ষণের আলোকে বিচার করেছেন। ফলে তাদের সামসময়িকদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। কিন্তু আমাদের এ কী অবস্থা! আমরা একটি ঘটনা সংঘটিত হওয়ার ১৪শ বছর পরে এসেও সেই ঘটনার ওপর রায় প্রদান করতে দ্বিধাবোধ করি না। এ ক্ষেত্রে আমি বলতে চাই, যদি আপনি কোনো বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত হতে না পারেন, তবে ধরে নিন যে, এ ক্ষেত্রে কিছু বিষয় আপনি এখনো জানেন না। কিন্তু কখনোই এমনটি মনে করবেন না যে, ওই সকল মহান সাহাবি ইচ্ছা করেই এমন ফিতনার সূত্রপাত ঘটিয়েছেন অথবা তারা রাজত্ব, নেতৃত্ব, সম্পদ কিংবা দুনিয়ার লোভে পরস্পর লড়াই করেছেন।
দুই নং প্রশ্ন: কেউ কেউ প্রশ্ন করেন যে, এই সংকটপূর্ণ মুহূর্তেও উসমান রা. সাহাবিদেরকে তার পক্ষে প্রতিরোধ করার অনুমতি দিলেন না কেন?
উত্তর: শরিয়তের নিয়ম হলো, একজন ব্যক্তির কর্তব্য হচ্ছে দুটি ক্ষতির মধ্যে অপেক্ষাকৃত বড় ক্ষতিকে দূর করতে এবং দুটি উপকারী বস্তুর মধ্যে থেকে অধিক উপকারী বস্তুটি অর্জন করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করা। এই নিয়মের ওপর ভিত্তি করেই উসমান রা. উপকার এবং ক্ষতির দিকটি তুলনা করেছেন। তখন তিনি দেখতে পেয়েছেন যে, যদি বিষয়টি তাকে হত্যা করা পর্যন্ত গড়ায় এবং এর বিনিময়ে অন্য সকল সাহাবিকে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে ইসলাম এবং মুসলিম উম্মাহর জন্য এটিই অধিক উত্তম। তাই তিনি নিজেকে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত স্থির করে নেন। আলি রা.-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আপনি কীভাবে পারলেন উসমান রা.-কে মৃত্যুর মুখে ছেড়ে আসতে, তখন তিনি উত্তর দিয়েছিলেন— তিনি বলেছিলেন, যদি আমরা তার পক্ষে প্রতিরোধ করতাম তবে এতে তারই অবাধ্যতা করা হতো। কারণ তিনি বলেছিলেন, যে তরবারি উন্মুক্ত করবে সে আমার কেউ নয়।
তিন নং প্রশ্ন: কেউ কেউ বলেন যে, এত কিছু করেও তো সেই ফিতনার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়নি। জামাল এবং সিফফিনের যুদ্ধে মুসলিমদের রক্ত ঝরেছে!
উত্তর: আমরা বলব, এগুলো উসমান রা.-এর ধারণায় ছিল না। উসমান রা. তার স্বভাবসুলভ মানবিক বিবেচনা থেকে ভেবেছিলেন যে, তিনি যে সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন তা শুরুতেই ফিতনাকে থামিয়ে দেবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি এমনভাবে মোড় নেয়, যা ছিল সাহাবিগণের প্রত্যাশার সম্পূর্ণ বিপরীত। 'আর আল্লাহ তাআলার বিধান সুনির্ধারিত'। [সুরা আহযাব: ৩৮]
চার নং প্রশ্ন: কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, তাহলে উসমান রা. ক্ষমতা থেকে সরে গেলেই ফিতনা শেষ হয়ে যেত; তিনি তা কেন করলেন না?
উত্তর: পূর্বেই আমরা আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত সহিহ হাদিস উল্লেখ করেছি। তিনি বলেন, রাসুল ﷺ বলেছেন, হে উসমান, যদি আল্লাহ তাআলা কখনো তোমার হাতে এই ক্ষমতা সঁপে দেন, অতঃপর মুনাফেকরা তোমার শরীর থেকে আল্লাহপ্রদত্ত এই সম্মানের পোশাক খুলে ফেলতে চায়, তবে তুমি খুলবে না। এ কথা তিনি তিনবার বলেন। এই হাদিসের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, রাসুল ﷺ তাকে ক্ষমতা ধরে রাখার এবং ওই সকল মুনাফেকদের কথা না শোনার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
উসমান রা. দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন রাসুল ﷺ যা বলেছেন তা সত্য। অবশ্যই তার অনুসরণ করা উচিত। রাসুল ﷺ-এর পক্ষ থেকে এ ছিল স্পষ্ট নির্দেশ। আর উসমান রা. কর্তৃক এই নির্দেশের অনুসরণ নিঃসন্দেহে তার খাঁটি ঈমানের প্রমাণ বহন করে। রাসুল ﷺ অদৃশ্যের যে সংবাদ দিয়েছেন তার ওপর নিশ্চিতভাবে ঈমান আনতে হবে। রাসুল ﷺ কীভাবে জানতেন যে, এই ফিতনা উসমান রা.-এর সময়ে ঘটবে? 'নিশ্চয় এটি ছিল আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে ওহি।' [সুরা নাজম : ৪]
টিকাঃ
২০৩. আল-ইকদুল ফারিদ, ৫/৫৩
২০৪. সহিহ ইবনি হিব্বান, ৬৯১৫; আল-মুসতাদরাক লিল হাকিম, ৪৫৪৪; সুনানুত তিরমিজি, ৩৭০৫; সুনানু ইবনি মাজাহ, ১১২