📘 ফিতনার ইতিহাস 📄 সংবাদ যখন আয়েশা রা.-এর কাছে পৌঁছল

📄 সংবাদ যখন আয়েশা রা.-এর কাছে পৌঁছল


উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা. ও রাসুল ﷺ-এর অন্য সকল স্ত্রীগণ তখন হজের সফরে ছিলেন। সেখান থেকে মদিনায় ফেরার পথে এ সংবাদ পৌঁছে তাদের কাছে। এ সংবাদ শুনে তারা পুনরায় মক্কায় ফিরে যান। উসমান রা.-এর মৃত্যু সংবাদ শুনে আয়েশা রা. বলেন, (প্রথমে) তোমরা তাকে ময়লা থেকে পরিচ্ছন্ন কাপড়ের মতো করে দিলে। এরপর তাকে আল্লাহর নিকটে পৌঁছে দিলে, দুম্বার মতো জবাই করে দিলে।

তখন বিশিষ্ট তাবেয়ি মাসরুক রহ. তাকে বলেন, এ তো আপনারই কাজ। আপনিই লোকদের কাছে চিঠি লিখে তাদেরকে উসমান রা.-এর বিরুদ্ধে নামতে বলেছেন। আয়েশা রা. আঁতকে উঠে বলেন, না। সেই সত্তার শপথ! যার প্রতি সকল মুমিন ঈমান এনেছে এবং কাফেররা যাকে অবিশ্বাস করেছে। আমি এই মজলিসে বসা পর্যন্ত তাদের উদ্দেশে সাদা কাগজে কালির একটি আঁচড়ও দিইনি।

আয়েশা রা.-এর এ কথা ছিল পুরোপুরি সত্য। আমাশ রহ. বলেন, তারা মনে করতেন এই চিঠি আয়েশা রা.-এর নাম ব্যবহার করে লেখা হয়েছে।

আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, ফিতনাবাজদের মূলহোতারা উসমান রা.-এর বিরুদ্ধে উসকানি দিয়ে মিথ্যা চিঠি লিখত এবং সেগুলো সাহাবিগণের নামে চালিয়ে দিত। এভাবেই তারা ফিতনার আগুন জ্বালিয়ে নিজেদের স্বার্থোদ্ধার করতে চাইত। মক্কায় ফিরে রাসুল ﷺ-এর স্ত্রীগণ পরিস্থিতি কী হয় তা পর্যবেক্ষণের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন।

টিকাঃ
১৮৫. আত-তবাকাতুল কুবরা, ৩/৬০; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২১৮

📘 ফিতনার ইতিহাস 📄 উসমান রা.-এর দাফন

📄 উসমান রা.-এর দাফন


৩৫ হিজরির ১৮ জিলহজ মাগরিবের নামাজের পূর্বে শহিদ হন উসমান রা.। তখন সাহাবিগণের একটি দল তার বাড়িতে আসেন। মাগরিব ও এশার মধ্যবর্তী সময়ে বাড়িতেই তার জানাজা পড়েন। সহিহ বর্ণনা অনুযায়ী এটিই প্রমাণিত। তবে কোনো কোনো বর্ণনা অনুযায়ী দ্বিতীয় দিনে জানাজা পড়ার কথা পাওয়া যায়। আবার কোনো কোনো বর্ণনার ভাষ্য হচ্ছে, এ বছর তৃতীয় দিনের কথাও বলা হয়েছে। তবে প্রথম বর্ণনাটিই সহিহ।

সাহাবিগণ উসমান রা.-কে বহন করে মদিনার বাইরে হাশ কাওকাব নামক স্থানে নিয়ে যান। মদিনার লোকজন তাদের কেউ মারা গেলে যেখানে দাফন করত, এটি সেই স্থান ছিল না। সাহাবিগণ আশঙ্কা করছিলেন যে, ফিতনাবাজরা হয়তো উসমান রা.-এর লাশ কবর থেকে বের করে টুকরো টুকরো করে ফেলতে পারে বা তার মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। যেমনটি তারা হত্যার পর চেষ্টা করেছে। তাই তারা উসমান রা.-এর লাশ এখানে নিয়ে আসেন।

ইমাম মালেক রহ. বর্ণনা করেন, উসমান ইবনে আফফান রা. হাশ কাওকাব এলাকার পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে বলতেন, এখানে একজন নেককার লোককে দাফন করা হবে।

সাহাবিগণ উসমান রা.-কে গোসল করানোর পর কাফনের কাপড় পরিয়ে জানাজা পড়েন। কোনো কোনো বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, তাকে গোসল দেওয়া হয়নি। আবু হুরাইরা রা. অথবা মিসওয়ার ইবনে মাখরামা রা., অথবা তৃতীয় কোনো সাহাবি জানাজার নামাজের ইমামতি করেন।

উসমান রা.-কে দাফন করার পর সাহাবিগণ তার নিহত দুই দাসকে তার পাশেই দাফন করেন। ওই সব পাপিষ্ঠদের মনে খলিফাতুল মুসলিমিন উসমান রা.-এর প্রতি কী পরিমাণ বিদ্বেষ ছিল তা বোঝানোর জন্য একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। মুহাম্মাদ ইবনে সিরিন রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার আমি কাবা শরিফ তাওয়াফ করছিলাম। তখন শুনতে পেলাম এক লোক বলছে, হে আল্লাহ, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। কিন্তু আমার মনে হয় না আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর বান্দা, আমি কাউকেই তোমার মতো এমন কথা বলতে শুনিনি। লোকটি বলল, আমি আল্লাহ তাআলার কাছে অঙ্গীকার করেছিলাম, যদি উসমান রা.-কে কখনো চড় মারার সুযোগ পাই, তাহলে অবশ্যই আমি তাকে চড় মারব। অতঃপর যখন তাকে হত্যা করার পর তার লাশ খাটিয়ায় রাখা হলো এবং লোকেরা তার জানাজার নামাজ পড়ার জন্য আসছিল, তখন আমিও জানাজার নামাজ পড়ার ভান করে সেখানে গেলাম। একসময় দেখলাম, খাটিয়ার পাশে কেউ নেই। তখন আমি তার চেহারা এবং দাড়ি থেকে কাপড় সরিয়ে চড় মেরে বসলাম। সেই থেকে আমার ডানহাত শুকিয়ে অচল হয়ে গিয়েছে। ইবনে সিরিন রহ. বলেন, আমি তার হাত দেখতে পেলাম, যেন তা শুকনো কাঠ।

উসমান রা. তার ঘরে অসিয়তনামা লিখে গিয়েছিলেন। তাতে লেখা ছিল, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। উসমান ইবনে আফফান সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলা ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। তিনি একক। তাঁর কোনো অংশীদার নেই এবং নিশ্চয় মুহাম্মাদ তাঁর রাসুল। নিশ্চয় জান্নাত সত্য। জাহান্নাম সত্য। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা কবরবাসীদের সেদিন পুনরুত্থিত করবেন, যেদিনের ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করেন না। এ সাক্ষ্যের ওপরই আমার জীবন এবং এর ওপরই আমার মরণ। ইনশাআল্লাহ, এই সাক্ষ্যের ওপরই আমার পুনরুত্থান হবে।

টিকাঃ
১৮৫. হাশ কাওকাব: মদিনার বাইরের কোনো এলাকা নয়; বরং মদিনার বাকিউল গারকাদ নামক কবরস্থানের পূর্বেদিকে অবস্থিত একটি স্থান। (উইকিপিডিয়া)-সম্পাদক
১৮৬. তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৩৯/৫১৬; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৬/২২৯
১৮৭. আল-ইসতিয়াব, ১৯/১০৪৮; তাহযিবুল কামাল, ১৯/৪৫৭
১৮৮. তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৩৯/৪৪৭; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২১৩
১৮৯. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২০৫

ফন্ট সাইজ
15px
17px