📘 ফিতনার ইতিহাস 📄 উসমান রা.-এর হত্যাকাণ্ডের পর সাহাবিগণের অবস্থা

📄 উসমান রা.-এর হত্যাকাণ্ডের পর সাহাবিগণের অবস্থা


উসমান রা.-এর হত্যাকাণ্ডের পরে সাহাবিগণের প্রতিক্রিয়া কী ছিল, এ বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শিয়াদের গ্রন্থগুলোতে এ বিষয়টিকে খুবই কদর্যরূপে উপস্থাপন করা হয়। তারা বুঝাতে চায় যে, সাহাবিগণ উসমান রা.-এর মৃত্যুতে আনন্দিত হয়েছেন। কারণ, উসমান রা. সাহাবিগণের মতের বিরোধী ছিলেন। সাহাবিগণ চাইতেন না তিনি ক্ষমতায় স্থায়ী হন। এমন আরও ভ্রান্ত ও বানোয়াট কথা তাদের গ্রন্থগুলোতে রয়েছে।

সাহাবিগণ উসমান রা.-এর হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে জানতে পারেন। পাশাপাশি আরেকটি বিস্ময়কর বিষয়ও জানতে পারেন। তা হলো, হত্যাকারীরা তাদের এই ঘৃণ্য অপকর্মের পর মুসা আ.-এর জাতির মতো আচরণ প্রকাশ করতে থাকে। মুসা আ.-এর জাতি গোবৎস পূজার পর যেভাবে সেই কাজের ওপর অনুতপ্ত হয়েছিল, তেমনই হত্যাকারীরাও নিজেদের অত্যন্ত অনুতপ্ত এবং লজ্জিত হিসাবে প্রকাশ করতে থাকে। মুসা আ.-এর জাতি সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে জানাচ্ছেন— 'আর যখন তারা অনুতপ্ত হলো এবং বুঝতে পারল যে, তারা নিশ্চিত পথভ্রষ্ট হয়ে পড়েছে। তখন বলতে লাগল, আমাদের প্রতি যদি আমাদের প্রভু করুণা না করেন এবং আমাদের ক্ষমা না করেন তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।' [সুরা আরাফ: ১৪৯]

ওই সব হত্যাকারীদের অনেকেই উসমান রা.-এর রক্ত এবং তার দেহ মাটিতে লুটে পড়া অবস্থায় দেখে তাদের অপরাধ এবং মন্দ কাজ অনুভব করতে পারে। ফলে তারা এ কাজে নিজেদের লজ্জা এবং অনুশোচনা প্রকাশ করে।

📘 ফিতনার ইতিহাস 📄 উসমান রা.-এর হত্যাকাণ্ডের সংবাদ পৌঁছে গেল সাহাবিগণের কাছে

📄 উসমান রা.-এর হত্যাকাণ্ডের সংবাদ পৌঁছে গেল সাহাবিগণের কাছে


• যুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা. এ সংবাদ শুনে ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন পড়েন। তার জন্য রহমতের দোয়া করেন। এরপর তার কাছে সংবাদ আসে যে, যারা তাকে হত্যা করেছে তারা লজ্জিত ও অনুতপ্ত। তিনি বলেন, তারা ধ্বংস হোক। এ কথা বলে তিনি এই আয়াত তেলাওয়াত করেন, 'তারা কেবল একটা ভয়াবহ শব্দের অপেক্ষা করছে, যা তাদের পাকড়াও করবে তাদের বিতর্কে লিপ্ত থাকা অবস্থায়। তখন তারা কোনো অসিয়ত করতে পারবে না। এবং পারবে না তাদের পরিবার-পরিজনের কাছেও ফিরে যেতে।' [সুরা ইয়াসিন: ৪৯-৫০]

• আলি রা.-এর কাছে এ সংবাদ পৌঁছে। কোনো কোনো বর্ণনা মতে, যখন তার কাছে এ সংবাদ পৌঁছে তখন হাসান রা., হুসাইন রা., আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা. ও মুহাম্মাদ ইবনে তালহা রা. তার সামনে ছিলেন। তখন আলি রা. হুসাইন রা.-কে চড় মারেন। হাসান রা.-এর বুকে আঘাত করেন। আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা. ও মুহাম্মাদ ইবনে তালহা রা.-কে তিরস্কার করেন। তাদের উদ্দেশে বলেন, তোমাদের সামনে কীভাবে তাকে হত্যা করা হলো?

এরপর তিনি বললেন, হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে নিজেকে উসমান রা.-এর রক্ত থেকে মুক্ত ঘোষণা করছি।

এরপর তাকে বলা হলো, হত্যাকারীরা নিজেদের কৃতকর্মে অনুতপ্ত হয়েছে। তখন আলি রা. বললেন, 'তাদের তুলনা হলো শয়তান, সে মানুষকে বলে কাফের হয়ে যা। এরপর যখন সে কাফের হয়ে যায়, তখন শয়তান বলে, তোমার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলাকে ভয় করি।' [সুরা হাশর : ১৬]

• সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা.-এর কাছে উসমান রা.-এর হত্যার সংবাদ পৌঁছলে তিনি তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেন এবং রহমতের দোয়া করেন। তিনিও হত্যাকারীদের উদ্দেশে এ আয়াত তেলাওয়াত করেন, 'বলুন, আমি কি তোমাদের সেসব লোকের সংবাদ দেবো, যারা কর্মের দিক দিয়ে সর্বাপেক্ষা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত? তারাই সেসব লোক, যাদের প্রচেষ্টা পার্থিবজীবনে বিভ্রান্ত হয়। অথচ তারা মনে করে যে, তারা সৎকর্ম করছে।' [সুরা কাহাফ : ১০৩-১০৪]

সাদ রা. বললেন, হে আল্লাহ, আপনি তাদের লজ্জিত করুন এবং পাকড়াও করুন।

সাদ রা. ছিলেন মুসতাজাবুদ দাওয়াহ (যার দোয়া কবুল হয়)। তার দোয়া কবুল হওয়ার ব্যাপারে রাসুল ﷺ দোয়া করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর এই দোয়া কবুল করেছেন। পূর্বসূরি একজন মনীষী শপথ করে বলেছেন, উসমান রা.-এর হত্যাকাণ্ডে যারা জড়িত ছিল, তাদের সবারই মৃত্যু হয়েছে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের শাসনকাল পর্যন্ত জীবিত থাকে ও তার হাতে নিহত হয়। তাদের কেউই হত্যার হাত থেকে বাঁচতে পারেনি। তারা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতের অনিষ্ট নিয়ে ফিরে গিয়েছে।

টিকাঃ
১৭৯. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২১১
১৮০. তারিখুল খুলাফা, পৃ. ১২৬
১৮১. তারিখুত তবারি, ৪/৩৯২, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২১১
১৮২. তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৩৯/৪৪০; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২১১

📘 ফিতনার ইতিহাস 📄 সংবাদ যখন শাম পৌঁছল

📄 সংবাদ যখন শাম পৌঁছল


উসমান রা.-এর হত্যাকাণ্ডের পর তার স্ত্রী নায়েলা বিনতে ফারাফিসা রহ. উসমান রা.-এর রক্তমাখা জামা এবং উসমান রা.-কে বাঁচাতে গিয়ে তার কেটে যাওয়া আঙুল ও কবজি একত্র করেন। এরপর সেগুলো নোমান ইবনে বশির রা.-এর হাতে দিয়ে বলেন, এগুলো মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রা.-এর কাছে নিয়ে যান। তিনিই এখন উসমান রা.-এর উত্তরসূরি।

নোমান ইবনে বশির রা. এই আমানত শামে মুআবিয়া রা.-এর কাছে পৌঁছে দেন। মুআবিয়া রা. এগুলো মসজিদের মিম্বরের ওপর ঝুলিয়ে দেন এবং কেঁদে কেঁদে প্রতিশোধ গ্রহণের শপথ করেন। শামের অধিবাসীরা মুআবিয়া রা.-এর সঙ্গে সহমত পোষণ করে। তাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন সাহাবি। আবু দারদা রা., উবাদা ইবনে সামিত রা. প্রমুখ বিখ্যাত সাহাবিগণ তখন শামেই অবস্থান করছিলেন। আবু দারদা রা. ছিলেন শামের বিচারক ও সেখানকার সবচেয়ে বিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। তিনি উসমান রা.-এর হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধগ্রহণ ওয়াজিব বলে ফতোয়া প্রদান করেন। ফলে উসমান রা.-এর রক্তমাখা জামার নিচে বসে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ কাঁদতে কাঁদতে তার মৃত্যুর প্রতিশোধ গ্রহণের শপথ নেয়।

যারা প্রতিশোধ গ্রহণের ফতোয়ার সঙ্গে সহমত পোষণ করেছিলেন তাদের মধ্যে আবু মুসলিম খাওলানি রহ. ছিলেন অন্যতম। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট তাবেয়ি। বলা হয়ে থাকে যে, আবু দারদা রা.-এর পর তিনিই ছিলেন শামের সবচেয়ে বিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব।

টিকাঃ
১৮৩. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২৫৫; তারিখ ইবনি খালদুন, ২/৬২৫

📘 ফিতনার ইতিহাস 📄 সংবাদ যখন আয়েশা রা.-এর কাছে পৌঁছল

📄 সংবাদ যখন আয়েশা রা.-এর কাছে পৌঁছল


উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা. ও রাসুল ﷺ-এর অন্য সকল স্ত্রীগণ তখন হজের সফরে ছিলেন। সেখান থেকে মদিনায় ফেরার পথে এ সংবাদ পৌঁছে তাদের কাছে। এ সংবাদ শুনে তারা পুনরায় মক্কায় ফিরে যান। উসমান রা.-এর মৃত্যু সংবাদ শুনে আয়েশা রা. বলেন, (প্রথমে) তোমরা তাকে ময়লা থেকে পরিচ্ছন্ন কাপড়ের মতো করে দিলে। এরপর তাকে আল্লাহর নিকটে পৌঁছে দিলে, দুম্বার মতো জবাই করে দিলে।

তখন বিশিষ্ট তাবেয়ি মাসরুক রহ. তাকে বলেন, এ তো আপনারই কাজ। আপনিই লোকদের কাছে চিঠি লিখে তাদেরকে উসমান রা.-এর বিরুদ্ধে নামতে বলেছেন। আয়েশা রা. আঁতকে উঠে বলেন, না। সেই সত্তার শপথ! যার প্রতি সকল মুমিন ঈমান এনেছে এবং কাফেররা যাকে অবিশ্বাস করেছে। আমি এই মজলিসে বসা পর্যন্ত তাদের উদ্দেশে সাদা কাগজে কালির একটি আঁচড়ও দিইনি।

আয়েশা রা.-এর এ কথা ছিল পুরোপুরি সত্য। আমাশ রহ. বলেন, তারা মনে করতেন এই চিঠি আয়েশা রা.-এর নাম ব্যবহার করে লেখা হয়েছে।

আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, ফিতনাবাজদের মূলহোতারা উসমান রা.-এর বিরুদ্ধে উসকানি দিয়ে মিথ্যা চিঠি লিখত এবং সেগুলো সাহাবিগণের নামে চালিয়ে দিত। এভাবেই তারা ফিতনার আগুন জ্বালিয়ে নিজেদের স্বার্থোদ্ধার করতে চাইত। মক্কায় ফিরে রাসুল ﷺ-এর স্ত্রীগণ পরিস্থিতি কী হয় তা পর্যবেক্ষণের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন।

টিকাঃ
১৮৫. আত-তবাকাতুল কুবরা, ৩/৬০; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২১৮

ফন্ট সাইজ
15px
17px