📄 বিদ্রোহীদের নেতৃত্বে ছিল যারা
প্রতিটি শহর থেকে চারটি করে দল বের হয়। বসরার চার দলের নেতৃত্বে ছিল হাকিম ইবনে জাবালা, বিশর ইবনে শুরাইহ, যুরাইহ ইবনে আব্বাদ এবং ইবনে মুহাররিক হানাফি। এদের সবার নেতৃত্বে ছিল হুরকুস ইবনে যুহাইর সাদি। এরা সংখ্যায় ছিল ৬০০ থেকে ১ হাজারের মতো।
কুফা থেকে বের হওয়া চার দলের নেতৃত্বে ছিল আশতার নাখায়ি, যায়দ ইবনে সাওহান, যিয়াদ ইবনে নাযর হারেসি এবং আবদুল্লাহ ইবনে আসাম্ম। এদের সকলের নেতৃত্বে ছিল আমর ইবনুল আসাম্ম। এরাও সংখ্যায় ছিল ৬০০ থেকে ১ হাজারের মতো।
মিশর থেকে যে দলটি বের হয়, এ দলের প্রধান নেতা ছিল গাফেকি ইবনে হারব আক্কি। তার অধীনে থাকা চারটি দলের নেতৃত্বে ছিল আবদুর রহমান ইবনে উদাইহু, কিনানা ইবনে বিশর, সাওদান ইবনে হুমরান এবং কুতাইরা সাকুনি। এরাও ছিল সংখ্যায় ৬০০ থেকে ১ হাজারের মতো।
সব মিলিয়ে কমপক্ষে ২ হাজার বিদ্রোহী মদিনা অভিমুখে যাত্রা করেছিল। প্রত্যেকেই নিজের শহর থেকে হজের কথা বলে বেরিয়েছিল। এর আড়ালে তাদের নিকৃষ্ট উদ্দেশ্যের কথা কেউই জানত না। তবে মিশরে নিযুক্ত গভর্নর আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারহ রা. তা ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন। মিশরের ভ্রান্ত বিদ্রোহীরা যখন মিশর থেকে বেরিয়ে পড়ে, তখন তিনি উসমান রা.-এর কাছে চিঠি পাঠিয়ে জানিয়ে দেন যে, বিদ্রোহীরা মিশর থেকে মদিনার উদ্দেশে বেরিয়ে গিয়েছে। এদের উদ্দেশ্য হজ নয়; বরং এদের উদ্দেশ্য হচ্ছে ফিতনা সৃষ্টি করা। কিন্তু এই চিঠি পৌঁছে কিছুটা দেরিতে।
এমনইভাবে আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারহ রা. মিশর থেকে সামরিক সাহায্য প্রদানের নিশ্চয়তা দিয়ে আরেকটি চিঠি প্রেরণ করেছিলেন।
বিদ্রোহীদের মূলহোতাদের মধ্যে ইতিপূর্বে আমরা আশতার নাখায়ি, হাকিম ইবনে জাবালা এবং সাওদান ইবনে হুমরান প্রমুখের কথা আলোচনা করেছি। হাকিম ইবনে জাবালা ছিল দুশ্চরিত্র এবং বসরার প্রসিদ্ধ চোর। সাওদান ইবনে হুমরান; যে মিশর থেকে বেরিয়েছিল, সে ছিল মূলত ইয়ামেনের সাকুন গোত্রের অধিবাসী। আশ্চর্যের কথা হচ্ছে, ১৪ হিজরিতে উমর রা. যখন জিহাদের উদ্দেশ্যে বের হওয়া গোত্রগুলোর খোঁজ নিচ্ছিলেন, তখন সাকুন গোত্র উমর রা.-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করে। সাওদান ইবনে হুমরান তখন এই গোত্রেই ছিল। উমর রা. তাদের দিকে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এরপর আবার তাদের দিকে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এভাবে তিনবার করলেন। এরপর তিনি বললেন, আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করছি। নিশ্চয় আমি এই গোত্র থেকে বারবার মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি। কারণ, আল্লাহর শপথ! এদের চেয়ে অধিক অপছন্দনীয় কোনো গোত্র আমার পাশ দিয়ে অতিক্রম করেনি।
সেদিন এদের মধ্যে থাকা সাওদান ইবনে হুমরান এবং খালিদ ইবনে মুলজিম প্রমুখ ব্যক্তি পরবর্তী সময়ে উসমান রা.-এর হত্যার ফিতনায় মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এই ঘটনার মাধ্যমে উমর রা.-এর দূরদর্শিতার বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মিশরের বিদ্রোহীদের নেতৃত্বে বাহ্যিকভাবে গাফেকি থাকলেও পেছন থেকে এদের কলকাঠি নাড়ছিল ইবনে সাবা। গাফেকি ইবনে হারব ছিল ইয়ামেনের অধিবাসী। মিশর বিজয়ের পর সেখানেই সে বসবাস শুরু করে। তার ছিল নেতৃত্ব ও মর্যাদার লোভ। তবে সে একজন মেধাবী এবং ধর্মীয় আলেমও ছিল।
টিকাঃ
১৪২. তারিখু মদিনাতি দিমাশক, ১৪/৩৮৪; তারিখুত তাবারি, ৩/৪৮৫; আল-কামিল ফিত তারিখ, ২/২৮৭
📄 বিদ্রোহীদের উদ্দেশ্যসমূহ
সকল বিদ্রোহীই উসমান রা.-কে বরখাস্ত করার ব্যাপারে ছিল একমত। তবে তার পরবর্তী সময়ে কে খলিফা হবেন এ নিয়ে তাদের মধ্যে মতানৈক্য ছিল। মিশরের অধিবাসীরা চেয়েছিল আলি রা.-কে খলিফা বানাতে। তারা ইতিমধ্যেই ইহুদি আবদুল্লাহ ইবনে সাবার মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে পড়ে এবং এই প্রবঞ্চনার শিকার হয় যে, রাসুল আলি রা.-এর পক্ষে অসিয়ত করে গিয়েছেন। তাই তিনিই খেলাফতের সবচেয়ে উপযুক্ত। এদিকে কুফাবাসীদের ইচ্ছা, যুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা.-কে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা। কারণ, তিনি একসময় কুফার শাসক ছিলেন। বসরার অধিবাসীদের পছন্দ ছিল তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা.-কে। কারণ, একসময় তিনি বসরাবাসীদের শাসক ছিলেন।
তারা যখন মদিনায় পৌঁছে এবং সাধারণ মুসলিমরা তাদের অসৎ উদ্দেশ্যের কথা জেনে যায়, তখন উসমান রা. প্রতিটি দলের সঙ্গে কথা বলার জন্য তাদের পছন্দনীয় ব্যক্তিকে পাঠিয়ে দেন। তারা প্রত্যেকে ওই দলের কাছে চলে যান, যারা তাকে খলিফা হিসাবে দেখতে চায়।
আলি রা. যান মিশর থেকে আগত দলের কাছে। মদিনা থেকে কয়েক মাইল দূরে যখন তাদের সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ করেন, তখন তারা আলি রা.-কে উষ্ণ অভিবাদন জ্ঞাপন করে এবং তাকে নিজেদের আমির মেনে নিয়ে স্বাগত জানায়। কিন্তু আলি রা. তাদের কঠোর ভাষায় তিরস্কার করেন। তিনি বলেন, সৎ ব্যক্তিগণ অবগত আছেন যে, তোমরা মুহাম্মাদ ﷺ-এর ভাষায় অভিশপ্ত; তাই তোমরা ফিরে যাও। আল্লাহ যেন তোমাদের মঙ্গল না করেন।
তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা. বসরা থেকে আগত দলকে এবং যুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা. কুফা থেকে আগত দলকে একই কথা বলেন।
বিদ্রোহীরা নিজেদের পছন্দের তিন সাহাবির কাছে অনুরোধ করে, তারা যেন উসমান রা.-এর সঙ্গে মুখোমুখি হতে পারে ও উসমান রা.-এর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো তার কাছে পেশ করতে পারে। এরপর তারা মদিনা মুনাওয়ারায় প্রবেশ করে উসমান রা.-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এবং তাকে বলে, কুরআন শরিফ খুলুন এবং নবম সুরাটি পাঠ করুন। অর্থাৎ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর পাণ্ডুলিপি অনুযায়ী সুরা ইউনুস পাঠ করতে বলা হয়। উসমান রা. মুখস্থ সুরা ইউনুস পড়তে শুরু করেন। যখন এই আয়াতে এসে পৌঁছান— 'আল্লাহ তাআলা কি তোমাদের অনুমতি দিয়েছেন, নাকি তোমরা আল্লাহ তাআলার ওপরই মিথ্যাচার করছ?' [সুরা ইউনুস: ৫৯]
এই আয়াতে এসে উসমান রা.-কে থামতে বলা হয়। এরপর তারা উসমান রা.-কে বলে, আপনি যে চারণভূমি নির্ধারণ করেছেন, আল্লাহ তাআলা কি আপনাকে এর অনুমতি দিয়েছেন, নাকি আপনি আল্লাহ তাআলার ওপর মিথ্যাচার করছেন?
এভাবেই বিদ্রোহীরা তাদের আরোপিত অভিযোগগুলো উত্থাপন করতে শুরু করে। আমরা পূর্বে যেগুলোর খণ্ডন করে এসেছি। তারা অভিযোগ করছিল আর উসমান রা. জবাব দিচ্ছিলেন। তিনি তাদেরকে বলেন, উক্ত আয়াত চারণভূমির ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়নি। এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে মুশরিকদের ব্যাপারে। চারণভূমির সীমানা উমর রা. বৃদ্ধি করেছিলেন। উটের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় আমিও চারণভূমির সীমানা বৃদ্ধি করেছি।
বর্ণনাকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী উসমান রা. তাদের ওপরে বিজয়ী হন এবং সব প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব দিয়ে তাদেরকে নিশ্চুপ করে দেন। জবাব পাওয়ার পর তারা আর কিছু বলতে সক্ষম হয়নি। কথোপকথন শেষ হওয়ার পর উসমান রা. তাদের বলেন, তোমরা কী চাও?
তারা বলল, যাদের নির্বাসিত করা হয়েছে তারা ফিরে আসবে। বঞ্চিতদের দান করা হবে। বিশ্বস্ত এবং যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হবে এবং বণ্টনে সমতা বিধান করতে হবে।
যদিও উসমান রা. পূর্বে কখনো তাদের উত্থাপনকৃত এসব বিষয়ে সামান্য পরিমাণও সীমালঙ্ঘন করেননি। তার শাসনামলে কাউকে বঞ্চিত বা নির্বাসিত করা হয়নি, তবুও তিনি তাদের কথায় সম্মত হন এবং তা চুক্তিনামায় লিপিবদ্ধ করে রাখেন। এসব দাবির পাশাপাশি মিশর থেকে আগত বিদ্রোহীরা আরও দাবি করে, আপনি আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারহ রা.-কে বরখাস্ত করবেন এবং মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা.-কে গভর্নর নিযুক্ত করবেন। আশ্চর্যের কথা হচ্ছে, মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা. আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর পুত্র হওয়া সত্ত্বেও মিশরে উসমান রা.-এর বিরুদ্ধে চক্রান্তকারীদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। আগত বিদ্রোহীদের মধ্যে তিনিও ছিলেন।
উসমান রা. মিশরীয় বিদ্রোহীদের এই দাবিতেও সম্মত হন। মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা.-কে মিশরের গভর্নর পদে নিয়োগ দিয়ে কাগজে স্বাক্ষর করে দেন এবং আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারহ রা.-কে বরখাস্ত করেন। তবে শর্ত প্রদান করেন যে, তাদের নামে যেন কখনো অবাধ্যতার অভিযোগ না আসে। তারা যেন মুসলিমদের মধ্যে ফাটল সৃষ্টি না করে। তারা এ বিষয়ে উসমান রা.-কে প্রতিশ্রুতি দেয় এবং সন্তুষ্টচিত্তে মদিনা থেকে চলে যায়।
মদিনার মুসলিমগণ মনে করেন, ফিতনার আগুন এখন পুরোপুরি নিভে গিয়েছে। দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে চলতে থাকা ফিতনার আগুন নিভে যাওয়ার পর মদিনায় ফিরে আসে প্রশান্তিময় রাত।
আমরা সেই বিদ্রোহীদের দিকে তাকালে দেখতে পাই, তাদের মধ্যে থাকা আবদুল্লাহ ইবনে সাবার মতো আরও অনেকেরই উদ্দেশ্য ছিল, ইসলামের ওপর আঘাত করা এবং ইসলামের ধ্বংস দেখা। কেউ কেউ ছিল নিজের গোত্রীয় উন্মাদনায় মত্ত। বিশেষত ইয়ামেনের গোত্রগুলো, যারা কুরাইশের মতো সম্মান, মর্যাদা অর্জন করতে না পারায় হিংসায় জ্বলে-পুড়ে মরছিল। এদের সংখ্যা ছিল তুলনামূলক বেশি। এদের অধিকাংশ ছিল ইয়ামেনের সাকুন গোত্রের লোক ছিল। বিদ্রোহীদের মধ্যে কিছু লোক উসমান রা.-এর ওপর এই কারণে ক্ষুব্ধ ছিল যে, উসমান রা. তাদের ওপর অথবা তাদের আত্মীয়স্বজনের ওপর শরয়ি হদ প্রয়োগ করেছেন। ফলে তারা উসমান রা.-এর ওপর প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে। তাদের কাউকে কাউকে উসমান রা. ব্যক্তিগতভাবে শান্তি দিয়েছিলেন। তাই তারা প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য এসেছে। তাদের মধ্যে ছিল গাফেকি, আশতার নাখায়ির মতো ব্যক্তি। এরা ছিল শক্তিশালী মেধাবী এবং বাগ্মী। কিন্তু নেতৃত্বের লোভ তাদের এই ঘৃণ্য চক্রান্তে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
নিজেদের যোগ্যতায় আত্মতৃপ্ত হয়ে ভেবেছে যে, এসব যোগ্যতাই তাদের নেতৃত্ব লাভের জন্য যথেষ্ট। ফলে তাদেরকে শাসনক্ষমতায় নিয়োগ প্রদান না করায় তারা বিস্ময় প্রকাশ করে। তাদের মধ্যে এমন লোকও ছিল যাদেরকে উসমান রা. খুবই সম্মান এবং সমাদর করতেন। কিন্তু এতেও তাদের মন ভরেনি। তারা আরও বেশি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করে বসে। প্রত্যাশা করে উসমান রা. তাদেরকে গভর্নর নিয়োগ করবেন। কিন্তু তাদেরকে গভর্নর হিসাবে নিয়োগ না দেওয়ায় তারা প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে। যেমন মুহাম্মাদ ইবনে আবু হুজাইফা। সে ছিল উসমান রা.-এর পালকপুত্র। শৈশবকালে উসমান রা. তার পেছনে অনেক সম্পদ ব্যয় করেছেন। কিন্তু সে উসমান রা.-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে।
উসমান রা.-এর বিরুদ্ধে গোপনে গোপনে মানুষকে উসকানি দিতে শুরু করে। সাহাবিগণের নামে যারা মিথ্যা চিঠি লিখেছিল, তাদের মধ্যে সে ছিল অন্যতম। সে তার নিকটস্থ লোকদের এসব মিথ্যা চিঠি দিয়ে নিকটবর্তী জনপদে পাঠাত। পাঠানোর আগে সে চিঠিবাহকদের দীর্ঘক্ষণ সূর্যের আলোয় দাঁড় করিয়ে রাখত। ফলে লোকেরা মনে করত যে তারা অনেক দূর থেকে সফর করে এসেছে। এভাবে ওই সব চিঠির মাধ্যমে তারা ধোঁকায় পড়ে যেত। উল্লিখিত অপরাধী এবং মুনাফেকরা ছিল ফিতনার মূলহোতা এবং নেতৃত্বস্থানীয় পর্যায়ের। এ ছাড়া অন্যান্য যারা ছিল তাদের মধ্যে ছিল দুই ধরনের লোক।
এক. যারা দ্বীনের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে। সামান্য ভুলকে বিরাট আকারে উপস্থাপন করে। এমনকি ছোটখাটো ভুলের ব্যাপারেও ছাড় দেয় না। এরা মনে করে, উসমান রা. ভুল করেছেন তাই তাকে বরখাস্ত করতে হবে। তা না হলে ব্যাপারটি হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত গড়াবে।
দুই. যারা প্রকৃতপক্ষেই অজ্ঞ এবং নির্বোধ ছিল। ফিতনার মূলহোতারা তাদের যা বলেছে, ধোঁকায় পড়ে তা-ই তারা মেনে নিয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় এসব ভ্রান্ত ধারণা দূর করার মতো পর্যাপ্ত উপায়-উপকরণ তখন তাদের ছিল না। এর পাশাপাশি তাদের অবস্থান ছিল বিভিন্ন দূরবর্তী স্থানে। সাহাবি, আলেম এবং ফকিহগণের আবাসস্থল মদিনা মুনাওয়ারা থেকেও অনেক দূরে।
এসব মানুষ সাহাবিগণ এবং উসমান রা.-এর সঙ্গে কথা বলে নিজেদের এতদিনের ভুল স্বীকার করে সন্তুষ্টচিত্তে নিজেদের বাসস্থানে ফিরে যেতে শুরু করে। কিন্তু ফিতনার মূলহোতা যারা ছিল, তারা মূলত উসমান রা. এবং বিশিষ্ট সাহাবিগণের কথায় বশ্যতা মেনে নিতে আসেনি। তারা এসেছে ফিতনার উদ্দেশ্যে।
টিকাঃ
১৪৩. তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৩৯/৩১৯; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১৯৪; তারিখুল ইসলাম, ৩/১২০
১৪৪. তারিখু খলিফা ইবনি খাইয়াত, ১/১৬৯; তারিখুত তবারি, ৪/৩৫৪
১৪৫. তারিখুল ইসলাম, ৩/১২২
১৪৬. তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৩৯/৩২৪
📄 মিথ্যা চিঠি ও বিদ্রোহীদের প্রত্যাবর্তন
বিদ্রোহীরা সবাই মদিনা থেকে নিজ নিজ দেশের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ে। শুধু আশতার নাখায়ি এবং হাকিম ইবনে জাবালা মদিনায় থেকে যায়। সবার সঙ্গে ফিরে না গিয়ে এ দুই ব্যক্তির মদিনায় থেকে যাওয়ার বিষয়টি অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। মিশর থেকে আগত দল উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল দিয়ে ফেরার পথ ধরে। অপরদিকে কুফা ও বসরা থেকে আগত দল ফিরে যায় উত্তর-পূর্ব দিক দিয়ে। এভাবে যাত্রাপথে তারা ক্রমেই একে অপরের থেকে দূরে সরতে থাকে।
এ কারণেই আরও কিছু মানুষ সাড়া দেয় ফিতনার আহ্বানে। কিছু মানুষ বিষয়টিকে স্পর্শকাতর মনে করে যাচাই করার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। ফিতনার আগুন প্রজ্বলিতকারী ওই সব অপবাদ এখনো শিয়াদের গ্রন্থাবলিতে বিদ্যমান। উসমান রা.-কে গালমন্দ এবং অপবাদ আরোপ করার সময় তারা ইসলামদ্রোহীদের এসব মিথ্যা ও বানোয়াট কথা উল্লেখ করে থাকে। এগুলোকে সত্য হিসাবে প্রচার করে। জাহিয়া কাদুরার মতো কিছু অজ্ঞ তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগুলোকে সত্য বলে মেনেও নেয়। উসমান রা. ও আয়েশা রা.-এর ব্যাপারে অপবাদ আরোপ করে। জাহিয়া কাদুরা তার বইয়ে লিখেছে যে, আয়েশা রা. মানুষজনকে উসমান রা.-এর বিরুদ্ধে উসকানি দিয়েছিলেন। সে বুঝাতে চায় যে, বিশৃঙ্খলাকারীদের পক্ষ থেকে যেসব চিঠি প্রেরণ করা হয়েছিল সেগুলো সত্যি সত্যিই আয়েশা রা. প্রেরণ করেছিলেন।
আল্লামা ইবনে কাসির রহ. উল্লেখ করেন, আয়েশা রা. পর্যন্ত এ বর্ণনাটির সূত্র সহিহ। এ ধরনের উদাহরণ থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ওই সকল নিকৃষ্ট খারেজিরা বিশিষ্ট সাহাবিগণের নাম ব্যবহার করে মিথ্যা পত্র লিখে বিভিন্ন প্রান্তে পাঠিয়ে লোকদেরকে উসমান রা.-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে প্ররোচিত করেছে।
ইত্যবসরে মিশরীয় দলের পথে এক উষ্ট্রারোহী ব্যক্তির দেখা পাওয়া যায়। বেশ কয়েক বার সে মিশরীয় দলের কাছে ঘেঁষে আবার পৃথক হয়ে যায়। ফলে মিশরীয়দের মধ্যে লোকটিকে নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়। তখন তারা লোকটিকে থামিয়ে তার পরিচয় জিজ্ঞাসা করে। সে বলে, আমি আমিরুল মুমিনিনের পক্ষ থেকে তার মিশরীয় গভর্নরের নিকট প্রেরিত দূত।
এ কথা স্পষ্ট যে, লোকটির এমন আচরণের কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে। মিশরীয়দের কাছে কোনো বিষয় ব্যাখ্যা করতে চাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে সে খলিফার দূত নয়। কারণ, বর্ণনা অনুযায়ী সে বারবার মিশরীয়দের কাছে ঘেঁষে আবার দূরে চলে যেত। খলিফার দূত পরিচয় দেওয়ায় তাকে তল্লাশি করা হয়। তার সঙ্গে একটি চিঠি পাওয়া যায়। যাতে উসমান রা.-এর পক্ষ থেকে ফিতনাবাজদের কিছু ব্যক্তিকে হত্যা করতে আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারহ রা.-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে ওই সব লোকদের নামও উল্লেখ করা ছিল। এদের কাউকে হত্যা, কাউকে শূলে চড়ানো এবং কারও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে দেওয়ার নির্দেশ ছিল। একই সঙ্গে মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা.-কে হত্যার নির্দেশ ছিল।
চিঠিতে উসমান রা.-এর সিলমোহরের ছাপও ছিল। তাই চিঠিটি পড়ার পর মিশরীয়দের অবাধ্যতা পুনরায় মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। তারা পুনরায় মদিনার পথে যাত্রা শুরু করে। ৩৫ হিজরির জিলকদ মাসের মাঝামাঝিতে এ ঘটনা ঘটে। মদিনায় ফেরার পথেই আলি ইবনে আবু তালেব রা.-এর পক্ষ থেকে তাদের কাছে আরেকটি চিঠি আসে। সে চিঠিতে তাদের মদিনায় আগমনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
নিজ নিজ দেশের উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর তাদের পুনরায় ফিরে আসতে দেখে মদিনার মুসলিমরা খুবই অবাক হন। তখন আলি রা. তাদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য বের হন। তারা আলি রা.-কে বলে, এই দেখুন আল্লাহর শত্রু (উসমান রা.-কে উদ্দেশ্য করে) আমাদের অমুক অমুকের ব্যাপারে কী লিখেছে! এই বলে তাকে চিঠিটি দেখায়। এরপর বলে, আল্লাহ তাআলা তার রক্তকে বৈধ করে দিয়েছেন। তাই আপনিও আমাদের সঙ্গে তার কাছে চলুন।
আলি রা. বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি কখনোই তোমাদের সঙ্গে এমন কাজে যাব না।
তখন তারা বলে, তাহলে আপনি আমাদের কাছে চিঠি লিখে পাঠালেন কেন?
আলি রা. বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি তো তোমাদের কাছে কিছুই লিখে পাঠাইনি।
তখন মিশরীয়রা আশ্চর্যান্বিত হয়ে একে অপরের দিকে তাকাতে থাকে। প্রতিটি গ্রন্থেই এই বর্ণনা রয়েছে। এতে প্রমাণ হয় যে, বিদ্রোহীরা একে অপরের মাধ্যমে প্রবঞ্চনার শিকার হতো। তারা জানত না কীভাবে এই ষড়যন্ত্র পরিচালিত হচ্ছে। এও প্রমাণিত হয় যে, তাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ চিঠি লিখে সাহাবিগণের স্বাক্ষর নকল করে চালিয়ে দিত; ফিতনার অগ্নি প্রজ্বলনের জন্য যা ছিল যথেষ্ট কার্যকর। এমনইভাবে এসব ঘটনার মাধ্যমে জানা যায় যে, আলি রা. সবসময় এসব বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ছিলেন। প্রথমবার তারা যখন এসেছিল, তখন তিনি তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়েছিলেন। দ্বিতীয়বার যখন তারা ফিরে এলো, তিনি তখন তাদের তিরস্কার করেন এবং মদিনা থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। অথচ বানোয়াট বর্ণনাগুলোর ভাষ্য হচ্ছে, আলি রা. কিছু কারণে উসমান রা.-এর ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। তাই তিনি উসমান রা.-এর প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত না হয়ে তাকে একা ছেড়ে আসেন। বিদ্রোহীদের দমনে তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি। এমনটি বলার মাধ্যমে উসমান রা. ও আলি রা. উভয়ের ওপরেই অপবাদ আরোপ করা হয়। যে ব্যক্তি এসব অনির্ভরযোগ্য গ্রন্থগুলো পাঠ করবে সে এমন আরও অনেক বানোয়াট বিষয় দেখতে পাবে।
মিশরীয়রা যখন আলি রা.-এর সঙ্গে উসমান রা.-এর নাম দিয়ে প্রেরিত এই অদ্ভুত চিঠি নিয়ে তর্ক করছিল, তখন কুফা এবং বসরার দলদুটিও মদিনার প্রবেশদ্বারের কাছাকাছি চলে আসে। ফলে বেশ কয়েকজন সাহাবি তাদের জিজ্ঞাসা করেন, তোমরা আবার ফিরে এলে কেন?
তারা বলল, আমরা এসেছি আমাদের মিশরীয় ভাইদের সাহায্য করার জন্য।
আলি রা. তাদের বললেন, মিশরীয়দের সম্পর্কে তোমরা কীভাবে জানলে, তোমরা তো তাদের থেকে অনেক দূরে ছিলে? আল্লাহর শপথ! নিশ্চয় এটি এমন এক ষড়যন্ত্র, মদিনা থেকেই যা পরিচালিত হচ্ছে। আলি রা. যেন আশতার নাখায়ি এবং হাকিম ইবনে জাবালার মদিনায় থেকে যাওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করছিলেন। যেন তারা দুজনই এই চিঠিগুলো লিখেছে। এমনটি হওয়া খুবই স্বাভাবিক ছিল।
কুফা এবং বসরার বিদ্রোহীরা তখন বলল, আপনারা যাই বলুন না কেন, এই ব্যক্তি যেন নিজ থেকে অব্যাহতি নেয়, নয়তো আমরা তাকে অপসারণ করব। এ সময় সাহাবিগণ উসমান রা.-এর সিলমোহরযুক্ত চিঠি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য বিদ্রোহীদের নিয়ে উসমান রা.-এর কাছে যান এবং তাকে চিঠিটা দেখান।
তখন উসমান রা. বলেন, তোমরা এর স্বপক্ষে প্রমাণ দাও। আল্লাহর শপথ! আমি এই চিঠি লিখিনি এবং কাউকে দিয়ে লেখাইনি। এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। আর সিলমোহরের অনুকরণে মিথ্যা সিলমোহর বানানো যায়।
তখন বিদ্রোহীদের কেউ কেউ বলল, তাহলে এই চিঠি মারওয়ান ইবনে হাকাম লিখেছে। তারা চাইল, মারওয়ান ইবনে হাকামকে যেন তাদের কাছে সমর্পণ করা হয়। উসমান রা. আশঙ্কা করলেন, যদি তাদের হাতে দেওয়া হয়, তাহলে তারা মারওয়ানকে হত্যা করতে পারে। তাই তিনি তাদের এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তখন কেউ কেউ তার কথা সত্যায়ন করে এবং অন্যরা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে।
এভাবেই বেশ কয়েক দিন ধরে উসমান রা. এবং বিদ্রোহীদের মধ্যকার সংলাপ চলতে থাকে। বিদ্রোহীরা ঘোষণা করে দেয়, যারা নিজের হাতকে সংযত রাখবে তারা নিরাপদ।
টিকাঃ
১৪৭. তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৩৯/৩২৪; তারিখু খলিফা ইবনি খইয়াত, ১/১৬৯; তারিখুত তবারি, ৪/৩৫৫
১৪৮. তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৩৯/৩২৪
১৪৯. তারিখুত তবারি, ৪/৩৫১; তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৩৯/৩১৯
১৫০. তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৩৯/৩২৪; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২০৮
📄 গৃহবন্দি হলেন উসমান রা.
এ সময় পর্যন্ত খলিফা উসমান রা. স্বাভাবিকভাবেই চলছিলেন। মুহাজির এবং আনসার সকল সাহাবিই তার পেছনে নামাজ আদায় করছিলেন। এমনকি বিদ্রোহীরাও তার পেছনেই নামাজ পড়ত। এরই মধ্যে জুমার দিন চলে আসে। উসমান রা. দাঁড়িয়ে জুমার খুতবা প্রদান করেন। নামাজ শেষে তিনি পুনরায় মিম্বরে আরোহণ করেন এবং বলেন, বহিরাগত লোকসকল, আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহর শপথ! নিশ্চয় মদিনাবাসীরা জানে যে, তোমরা হলে রাসুল ﷺ-এর ভাষায় অভিশপ্ত। তাই নেক কাজের মাধ্যমে তোমাদের ভুলগুলো মুছে ফেলো। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা মন্দকে মুছে দেন একমাত্র নেককাজের মাধ্যমে।
তখন বিশিষ্ট সাহাবি মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা রা. দাঁড়িয়ে বলেন, আমি এর পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছি। হাকিম ইবনে জাবালা তার পাশেই ছিল। সে জোরপূর্বক তাকে বসিয়ে দেয় এবং গালমন্দ করে। তখন যায়দ ইবনে সাবেত আনসারি রা. বলেন, নিশ্চয় এ কথা কুরআনে রয়েছে।
তখন ফিতনাবাজদের মধ্যে মুহাম্মাদ ইবনে আবি মুরাইরা নামক এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে যায়দ রা.-কে টানাহ্যাঁচড়া ও গালমন্দ করে। এরপর জাহজাহ গিফারি নামক অপর এক ফিতনাবাজ দাঁড়িয়ে উসমান রা.-কে সম্বোধন করে কথা বলতে থাকে। তার দিকে এগিয়ে গিয়ে হাতের লাঠিটি কেড়ে নেয়, যে লাঠিতে ভর দিয়ে তিনি খুতবা দিতেন। এটি ছিল রাসুল ﷺ-এর লাঠি। তিনি এ লাঠিতে ভর দিয়ে খুতবা দিতেন। পরবর্তী সময়ে আবু বকর রা. ও উমর রা. এই লাঠি ব্যবহার করেছেন। কিন্তু জাহজাহ নামক নরাধম এই পবিত্র লাঠিটি ছিনিয়ে নিয়ে হাঁটু দিয়ে ভেঙে ফেলে এবং উসমান রা.-কে বলে, হে আহাম্মক, তুই এই মিম্বর থেকে নেমে যা।
এই প্রথম উসমান রা.-কে জনসম্মুখে গালি দেওয়া হলো। নরাধম জাহজাহের এই কথা বলার পর সব বিদ্রোহীরা দাঁড়িয়ে সাহাবিগণ এবং উসমান রা.-এর ওপর পাথর নিক্ষেপ করতে শুরু করে। উসমান রা. তখনও মিম্বরে অবস্থান করছিলেন। তার গায়ের জামা রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায়। কয়েকজন সাহাবি তাকে ধরে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসেন। এরপর তিনি বাড়ি থেকে আর বের হতে পারেননি। ফিতনাবাজরা তার বাড়ি অবরোধ করে রাখে। মুসলিমদের নামাজ পড়ানোর দায়িত্ব আসে আবু হুরাইরা রা.-এর কাঁধে। তবে বেশ কিছু দুর্বল বর্ণনায় পাওয়া যায়, উসমান রা.-কে হত্যার আগ পর্যন্ত নামাজের ইমামতি করত গাফেকি। তবে বিশুদ্ধ মতে এ সময় আবু হুরাইরা রা. ইমামতি করেছেন।
উসমান রা. পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে বুঝতে পারলেন যে, এসব বিদ্রোহীদের সঙ্গে নম্রতায় কোনো কাজ হবে না, তাই তিনি বিভিন্ন প্রান্তে নিয়োজিত গভর্নরদের কাছে চিঠি পাঠান। যেন তারা সৈন্যদল পাঠিয়ে উদ্ভূত জটিলতার সমাধান করেন। শামে নিযুক্ত মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রা., কুফায় নিযুক্ত আবু মুসা আশআরি রা. এবং বসরায় নিযুক্ত আবদুল্লাহ ইবনে আমের ইবনে কুরাইজ রা.-এর কাছে চিঠি প্রেরণ করা হয়। কিন্তু মদিনা থেকে এসব অঞ্চলের দূরত্ব আমরা সকলেই জানি। তাই চিঠি পৌঁছতে দেরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। এ সময় পর্যন্ত উসমান রা.-কে হত্যা করার কথা কেউ বলেনি; বরং তারা তাকে শুধু বরখাস্ত করতে চেয়েছিল। হত্যার কথা তখনও কেউ প্রকাশ্যে আনেনি।
এ সময় উসমান রা. ঘরের জানালা দিয়ে বিদ্রোহীদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন। তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, তোমাদের মধ্যে কি আলি ইবনে আবু তালেব, যুবায়ের, তালহা, সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস নেই? এসব মহান সাহাবি লোকদের সঙ্গে সেখানেই ছিলেন। তারা উসমান রা.-কে রেখে ফিরে যেতে চাননি। তাই ওই সব মহান সাহাবি নিজেদের অবস্থান দেখিয়ে বলেন, আমরা এখানেই আছি।
উসমান রা. তাদের বলেন, আমি তোমাদেরকে আল্লাহ তাআলার দোহাই দিয়ে বলছি, তোমরা জানো যে, রাসুল ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি অমুক গোত্রের আত্মাবল ক্রয় করে দেবে, আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দেবেন। এরপর আমি তা ক্রয় করে রাসুল ﷺ-এর কাছে গিয়ে বলেছি, আমি তা ক্রয় করে নিয়েছি। তখন রাসুল ﷺ বললেন, তুমি তা আমাদের মসজিদের জন্য দিয়ে দাও, এর সওয়াব তুমি পাবে। তিনি কি এ কথা বলেননি?
সাহাবিগণ বললেন, হ্যাঁ, তিনি বলেছিলেন।
উসমান রা. বললেন, আমি তোমাদেরকে ওই আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তোমরা জানো যে, রাসুল ﷺ বলেছেন, বিরে রুমা (রুমা নামক কূপ) কে ক্রয় করে দেবে? আমি তা এত দিনার দিয়ে ক্রয় করে রাসুল ﷺ-কে বললাম, আমি তা ক্রয় করে নিয়েছি। তিনি বললেন, মুসলিমদের পানি পানের জন্য তা দান করে দাও, তুমি এর সওয়াব পাবে। আমি কি তা করিনি?
সাহাবিগণ বললেন, হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি।
এরপর তিনি বললেন, আমি তোমাদেরকে ওই আল্লাহ তাআলার দোহাই দিয়ে বলছি, যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; তোমরা জানো যে, তাবুক যুদ্ধের বাহিনী প্রস্তুত করার দিনে রাসুল ﷺ লোকদের দিকে তাকিয়ে বললেন, যে ব্যক্তি তাদেরকে যুদ্ধসরঞ্জামাদি দিয়ে প্রস্তুত করে দেবে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন। আমি তাদেরকে যুদ্ধসরঞ্জামাদি দিয়েছি। এমনকি একটি লাগাম ও রশি পর্যন্তও বাদ রাখিনি। তোমরা কি তা দেখোনি?
সাহাবিগণ বললেন, হ্যাঁ।
তিনি বললেন, আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন! আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন! আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন! এরপর তিনি ফিরে যান।
এরপর তিনি আরেকবার অবরুদ্ধ ঘর থেকে উঁকি দিয়ে বললেন, আমি তাদেরকে আল্লাহ তাআলার দোহাই দিয়ে বলছি, যারা রাসুল ﷺ-কে হেরা পাহাড়ে যাওয়ার দিন দেখেছেন। সেদিন পাহাড় কেঁপে উঠলে রাসুল ﷺ পাহাড়ে পা রেখে বলেন, হেরা পাহাড়, শান্ত হও। তোমার ওপর একজন নবী, একজন সিদ্দিক এবং একজন শহিদ রয়েছেন। তখন আমি তার সঙ্গে ছিলাম। বেশ কয়েকজন সাহাবি তার এ কথার পক্ষে সাক্ষ্য দিলেন।
তিনি বলেন, আমি তাদেরকে আল্লাহ তাআলার শপথ দিয়ে বলছি, যারা বাইআতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণ করেছেন। সেদিন রাসুল ﷺ আমাকে মক্কার মুশরিকদের উদ্দেশে পাঠিয়েছিলেন। তখন তিনি নিজের এক হাতে আরেক হাত রেখে বলেছিলেন, এটি আমার হাত, অপরটি উসমানের হাত। এই বলে তিনি আমার পক্ষ থেকে বাইআত গ্রহণ করেছিলেন। বেশ কয়েকজন সাহাবি তার এ কথার পক্ষেও সাক্ষ্য দেন।
এরপর তিনি বলেন, আমি তাদেরকে আল্লাহ তাআলার শপথ দিয়ে বলছি, যারা রাসুল ﷺ-কে বলতে শুনেছে যে, যে ব্যক্তি আমাদের জন্য এই ঘরের মাধ্যমে মসজিদকে সম্প্রসারিত করবে, তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করা হবে। তখন আমি নিজের সম্পদ থেকে সেই ঘর ক্রয় করে তা দিয়ে মসজিদ সম্প্রসারণ করেছি। বেশ কয়েকজন সাহাবি তার এ কথার পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করেন।
তিনি আবার বলেন, আমি তাদেরকে আল্লাহর শপথ দিয়ে বলছি, তাবুক যুদ্ধের বাহিনী প্রস্তুত করতে যেদিন কষ্ট হচ্ছিল সেদিন যারা রাসুল ﷺ-কে বলতে শুনেছে, কে আজ এমন দান করবে, যা কবুল হবে? সেদিন কি আমি আমার সম্পদ থেকে বাহিনীর অর্ধেক সদস্যের যুদ্ধসরঞ্জাম প্রস্তুত করে দিইনি? বেশ কয়েকজন সাহাবি তার পক্ষে সাক্ষ্য দিলেন।
তিনি বললেন, আমি তাদেরকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলেছি, যারা রুমা কূপ থেকে মুসাফিরদের পানি ক্রয় করে পান করতে দেখেছে। আমি কি তা নিজের সম্পদ থেকে ক্রয় করে মুসাফিরদের জন্য উন্মুক্ত করে দিইনি?
তার এ কথার পক্ষেও অনেকে সাক্ষ্য দিলেন। এ পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে শান্তিপূর্ণভাবেই আলাপ চলতে থাকে। কিন্তু এরই মধ্যে বিদ্রোহীদের থেকে হত্যার মত আসতে শুরু করে। তারা উসমান রা.-কে বরখাস্ত অথবা হত্যার যেকোনো একটি বেছে নিতে বলেন। উসমান রা. এবং অন্যান্য সাহাবিগণের জন্য এটি ছিল খুবই কঠিন পরিস্থিতি।
টিকাঃ
১৫১. আল-কামিল ফিত তারিখ, ২/৫৩১; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১৯৭; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১/১৯৩
১৫২. তারিখুত তবারি, ৪/৩৬৬; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১৯৬
১৫৩. তারিখুল ইসলাম, ৩/১২১; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১৯৭
১৫৪. সহিহ ইবনি হিব্বান, ৬৯২০; সহিহ ইবনি খুজাইমা, ২৪৮৭
১৫৫. সুনানুন নাসায়ি, ৩৬০৯; আল-মুসনাদ লিল ইমাম আহমাদ, ৪২০; সুনানুদ দারাকুতনি, ৪৪৪৩