📘 ফিতনার ইতিহাস 📄 বিদ্রোহীরা মদিনায়

📄 বিদ্রোহীরা মদিনায়


ইতিমধ্যে আমরা উসমান রা. এবং বিভিন্ন প্রান্তে তার গভর্নরদের ব্যাপারে বিদ্রোহীদের উত্থাপিত অভিযোগগুলো খণ্ডন করেছি। বসরা, কুফা এবং মিশর থেকে সংগঠিত হয়ে এই কুচক্রী মহল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে মদিনা মুনাওয়ারার দিকে যাত্রা শুরু করে। বাহ্যিকভাবে উসমান রা.-এর কাছে এসব অভিযোগ উত্থাপন করে জবাবদিহিতা চাওয়ার আড়ালে তাদের উদ্দেশ্য ছিল, খেলাফতের রাজধানী মদিনা মুনাওয়ারায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা। মদিনা অভিমুখে যাত্রা শুরুর সময়ও তারা এ ঘোষণা দিয়েছিল যে, তারা হজের উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছে। যখন তারা মদিনার উদ্দেশ্যে পথ চলতে শুরু করে, তখনও তাদের বক্তব্য এটিই ছিল। সময়টা ছিল ৩৫ হিজরির শাওয়ালের শেষ এবং জিলকদের শুরু।

বিদ্রোহীদের নেতৃত্বে ছিল যারা
প্রতিটি শহর থেকে চারটি করে দল বের হয়। বসরার চার দলের নেতৃত্বে ছিল হাকিম ইবনে জাবালা, বিশর ইবনে শুরাইহ, যুরাইহ ইবনে আব্বাদ এবং ইবনে মুহাররিক হানাফি। এদের সবার নেতৃত্বে ছিল হুরকুস ইবনে যুহাইর সাদি। এরা সংখ্যায় ছিল ৬০০ থেকে ১ হাজারের মতো। কুফা থেকে বের হওয়া চার দলের নেতৃত্বে ছিল আশতার নাখায়ি, যায়দ ইবনে সাওহান, যিয়াদ ইবনে নাযর হারেসি এবং আবদুল্লাহ ইবনে আসাম্ম। এদের সকলের নেতৃত্বে ছিল আমর ইবনুল আসাম্ম। এরাও সংখ্যায় ছিল ৬০০ থেকে ১ হাজারের মতো। মিশর থেকে যে দলটি বের হয়, এ দলের প্রধান নেতা ছিল গাফেকি ইবনে হারব আক্কি। তার অধীনে থাকা চারটি দলের নেতৃত্বে ছিল আবদুর রহমান ইবনে উদাইহু, কিনানা ইবনে বিশর, সাওদান ইবনে হুমরান এবং কুতাইরা সাকুনি। এরাও ছিল সংখ্যায় ৬০০ থেকে ১ হাজারের মতো।

সব মিলিয়ে কমপক্ষে ২ হাজার বিদ্রোহী মদিনা অভিমুখে যাত্রা করেছিল। প্রত্যেকেই নিজের শহর থেকে হজের কথা বলে বেরিয়েছিল। এর আড়ালে তাদের নিকৃষ্ট উদ্দেশ্যের কথা কেউই জানত না। তবে মিশরে নিযুক্ত গভর্নর আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারহ রা. তা ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন। মিশরের ভ্রান্ত বিদ্রোহীরা যখন মিশর থেকে বেরিয়ে পড়ে, তখন তিনি উসমান রা.-এর কাছে চিঠি পাঠিয়ে জানিয়ে দেন যে, বিদ্রোহীরা মিশর থেকে মদিনার উদ্দেশে বেরিয়ে গিয়েছে। এদের উদ্দেশ্য হজ নয়; বরং এদের উদ্দেশ্য হচ্ছে ফিতনা সৃষ্টি করা। কিন্তু এই চিঠি পৌঁছে কিছুটা দেরিতে। একইভাবে আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারহ রা. মিশর থেকে সামরিক সাহায্য প্রদানের নিশ্চয়তা দিয়ে আরেকটি চিঠি প্রেরণ করেছিলেন।

বিদ্রোহীদের মূলহোতাদের মধ্যে ইতিপূর্বে আমরা আশতার নাখায়ি, হাকিম ইবনে জাবালা এবং সাওদান ইবনে হুমরান প্রমুখের কথা আলোচনা করেছি। হাকিম ইবনে জাবালা ছিল দুশ্চরিত্র এবং বসরার প্রসিদ্ধ চোর। সাওদান ইবনে হুমরান; যে মিশর থেকে বেরিয়েছিল, সে ছিল মূলত ইয়ামেনের সাকুন গোত্রের অধিবাসী। আশ্চর্যের কথা হচ্ছে, ১৪ হিজরিতে উমর রা. যখন জিহাদের উদ্দেশ্যে বের হওয়া গোত্রগুলোর খোঁজ নিচ্ছিলেন, তখন সাকুন গোত্র উমর রা.-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করে। সাওদান ইবনে হুমরান তখন এই গোত্রেই ছিল। উমর রা. তাদের দিকে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এরপর আবার তাদের দিকে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এভাবে তিনবার করলেন। এরপর তিনি বললেন, আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করছি। নিশ্চয় আমি এই গোত্র থেকে বারবার মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি। কারণ, আল্লাহর শপথ! এদের চেয়ে অধিক অপছন্দনীয় কোনো গোত্র আমার পাশ দিয়ে অতিক্রম করেনি।¹⁴²

সেদিন এদের মধ্যে থাকা সাওদান ইবনে হুমরান এবং খালিদ ইবনে মুলজিম প্রমুখ ব্যক্তি পরবর্তী সময়ে উসমান রা.-এর হত্যার ফিতনায় মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এই ঘটনার মাধ্যমে উমর রা.-এর দূরদর্শিতার বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। মিশরের বিদ্রোহীদের নেতৃত্বে বাহ্যিকভাবে গাফেকি থাকলেও পেছন থেকে এদের কলকাঠি নাড়ছিল ইবনে সাবা। গাফেকি ইবনে হারব ছিল ইয়ামেনের অধিবাসী। মিশর বিজয়ের পর সেখানেই সে বসবাস শুরু করে। তার ছিল নেতৃত্ব ও মর্যাদার লোভ। তবে সে একজন মেধাবী এবং ধর্মীয় আলেমও ছিল। তিন শহরের পৃথক পৃথক এই দলগুলো একত্রিত হওয়ার পর এদের সকলের আমির নিযুক্ত হন গাফেকি ইবনে হারব আক্কি। বিদ্রোহীরা মদিনার নিকটবর্তী হয়ে ঘাঁটি স্থাপন করে। আবদুল্লাহ ইবনে সাবা ছিল মিশর থেকে আগত দলের সদস্য। তবে সে তার নাম ঘোষণা করেনি।

বিদ্রোহীদের উদ্দেশ্যসমূহ
সকল বিদ্রোহীই উসমান রা.-কে বরখাস্ত করার ব্যাপারে ছিল একমত। তবে তার পরবর্তী সময়ে কে খলিফা হবেন এ নিয়ে তাদের মধ্যে মতানৈক্য ছিল। মিশরের অধিবাসীরা চেয়েছিল আলি রা.-কে খলিফা বানাতে। তারা ইতিমধ্যেই ইহুদি আবদুল্লাহ ইবনে সাবার মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে পড়ে এবং এই প্রবঞ্চনার শিকার হয় যে, রাসুল আলি রা.-এর পক্ষে অসিয়ত করে গিয়েছেন। তাই তিনিই খেলাফতের সবচেয়ে উপযুক্ত। এদিকে কুফাবাসীদের ইচ্ছা, যুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা.-কে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা। কারণ, তিনি একসময় কুফার শাসক ছিলেন। বসরার অধিবাসীদের পছন্দ ছিল তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা.-কে। কারণ, একসময় তিনি বসরাবাসীদের শাসক ছিলেন।

তারা যখন মদিনায় পৌঁছে এবং সাধারণ মুসলিমরা তাদের অসৎ উদ্দেশ্যের কথা জেনে যায়, তখন উসমান রা. প্রতিটি দলের সঙ্গে কথা বলার জন্য তাদের পছন্দনীয় ব্যক্তিকে পাঠিয়ে দেন। তারা প্রত্যেকে ওই দলের কাছে চলে যান, যারা তাকে খলিফা হিসাবে দেখতে চায়। আলি রা. যান মিশর থেকে আগত দলের কাছে। মদিনা থেকে কয়েক মাইল দূরে যখন তাদের সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ করেন, তখন তারা আলি রা.-কে উষ্ণ অভিবাদন জ্ঞাপন করে এবং তাকে নিজেদের আমির মেনে নিয়ে স্বাগত জানায়। কিন্তু আলি রা. তাদের কঠোর ভাষায় তিরস্কার করেন। তিনি বলেন, সৎ ব্যক্তিগণ অবগত আছেন যে, তোমরা মুহাম্মাদ ﷺ-এর ভাষায় অভিশপ্ত; তাই তোমরা ফিরে যাও। আল্লাহ যেন তোমাদের মঙ্গল না করেন। তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা. বসরা থেকে আগত দলকে এবং যুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা. কুফা থেকে আগত দলকে একই কথা বলেন।¹⁴³

বিদ্রোহীরা নিজেদের পছন্দের তিন সাহাবির কাছে অনুরোধ করে, তারা যেন উসমান রা.-এর সঙ্গে মুখোমুখি হতে পারে ও উসমান রা.-এর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো তার কাছে পেশ করতে পারে। এরপর (অনুরোধ গ্রহণ করার পর) তারা মদিনা মুনাওয়ারায় প্রবেশ করে উসমান রা.-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এবং তাকে বলে, কুরআন শরিফ খুলুন এবং নবম সুরাটি পাঠ করুন। অর্থাৎ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর পাণ্ডুলিপি অনুযায়ী সুরা ইউনুস পাঠ করতে বলা হয়। উসমান রা. মুখস্থ সুরা ইউনুস পড়তে শুরু করেন। যখন এই আয়াতে এসে পৌঁছান- ‘আল্লাহ তাআলা কি তোমাদের অনুমতি দিয়েছেন, নাকি তোমরা আল্লাহ তাআলার ওপরই মিথ্যাচার করছ?’ [সুরা ইউনুস: ৫৯] এই আয়াতে এসে উসমান রা.-কে থামতে বলা হয়। এরপর তারা উসমান রা.-কে বলে, আপনি যে চারণভূমি নির্ধারণ করেছেন, আল্লাহ তাআলা কি আপনাকে এর অনুমতি দিয়েছেন, নাকি আপনি আল্লাহ তাআলার ওপর মিথ্যাচার করছেন?

এভাবেই বিদ্রোহীরা তাদের আরোপিত অভিযোগগুলো উত্থাপন করতে শুরু করে। আমরা পূর্বে যেগুলোর খণ্ডন করে এসেছি। তারা অভিযোগ করছিল আর উসমান রা. জবাব দিচ্ছিলেন। তিনি তাদেরকে বলেন, উক্ত আয়াত চারণভূমির ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়নি। এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে মুশরিকদের ব্যাপারে। চারণভূমির সীমানা উমর রা. বৃদ্ধি করেছিলেন। উটের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় আমিও চারণভূমির সীমানা বৃদ্ধি করেছি।¹⁴⁴ এভাবে তারা একের পর এক অভিযোগ উত্থাপন করতে থাকে আর উসমান রা. জবাব দিতে থাকেন। বর্ণনাকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী উসমান রা. তাদের ওপরে বিজয়ী হন এবং সব প্রশ্নের স্পষ্ট জবাব দিয়ে তাদেরকে নিশ্চুপ করে দেন। জবাব পাওয়ার পর তারা আর কিছু বলতে সক্ষম হয়নি। কথোপকথন শেষ হওয়ার পর উসমান রা. তাদের বলেন, তোমরা কী চাও?

তারা বলল, যাদের নির্বাসিত করা হয়েছে তারা ফিরে আসবে। বঞ্চিতদের দান করা হবে। বিশ্বস্ত এবং যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হবে এবং বণ্টনে সমতা বিধান করতে হবে। যদিও উসমান রা. পূর্বে কখনো তাদের উত্থাপনকৃত এসব বিষয়ে সামান্য পরিমাণও সীমালঙ্ঘন করেননি। তার শাসনামলে কাউকে বঞ্চিত বা নির্বাসিত করা হয়নি, তবুও তিনি তাদের কথায় সম্মত হন এবং তা চুক্তিনামায় লিপিবদ্ধ করে রাখেন।¹⁴⁵ এসব দাবির পাশাপাশি মিশর থেকে আগত বিদ্রোহীরা আরও দাবি করে, আপনি আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারহ রা.-কে বরখাস্ত করবেন এবং মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা.-কে গভর্নর নিযুক্ত করবেন। আশ্চর্যের কথা হচ্ছে, মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা. আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর পুত্র হওয়া সত্ত্বেও মিশরে উসমান রা.-এর বিরুদ্ধে চক্রান্তকারীদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। আগত বিদ্রোহীদের মধ্যে তিনিও ছিলেন।

উসমান রা. মিশরীয় বিদ্রোহীদের এই দাবিতেও সম্মত হন। মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা.-কে মিশরের গভর্নর পদে নিয়োগ দিয়ে কাগজে স্বাক্ষর করে দেন এবং আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারহ রা.-কে বরখাস্ত করেন। তবে শর্ত প্রদান করেন যে, তাদের নামে যেন কখনো অবাধ্যতার অভিযোগ না আসে। তারা যেন মুসলিমদের মধ্যে ফাটল সৃষ্টি না করে। তারা এ বিষয়ে উসমান রা.-কে প্রতিশ্রুতি দেয় এবং সন্তুষ্টচিত্তে মদিনা থেকে চলে যায়।¹⁴⁶ মদিনার মুসলিমগণ মনে করেন, ফিতনার আগুন এখন পুরোপুরি নিভে গিয়েছে। দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে চলতে থাকা ফিতনার আগুন নিভে যাওয়ার পর মদিনায় ফিরে আসে প্রশান্তিময় রাত।

আমরা সেই বিদ্রোহীদের দিকে তাকালে দেখতে পাই, তাদের মধ্যে থাকা আবদুল্লাহ ইবনে সাবার মতো আরও অনেকেরই উদ্দেশ্য ছিল, ইসলামের ওপর আঘাত করা এবং ইসলামের ধ্বংস দেখা। কেউ কেউ ছিল নিজের গোত্রীয় উন্মাদনায় মত্ত। বিশেষত ইয়ামেনের গোত্রগুলো, যারা কুরাইশের মতো সম্মান, মর্যাদা অর্জন করতে না পারায় হিংসায় জ্বলে-পুড়ে মরছিল। এদের সংখ্যা ছিল তুলনামূলক বেশি। এদের অধিকাংশই ইয়ামেনের সাকুন গোত্রের লোক ছিল। বিদ্রোহীদের মধ্যে কিছু লোক উসমান রা.-এর ওপর এই কারণে ক্ষিপ্ত ছিল যে, উসমান রা. তাদের ওপর অথবা তাদের আত্মীয়স্বজনের ওপর শরয়ি হদ প্রয়োগ করেছেন। ফলে তারা উসমান রা.-এর ওপর প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে। তাদের কাউকে কাউকে উসমান রা. ব্যক্তিগতভাবে শান্তি দিয়েছিলেন। তাই তারা প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য এসেছে। তাদের মধ্যে ছিল গাফেকি, আশতার নাখায়ির মতো ব্যক্তি। এরা ছিল শক্তিশালী মেধাবী এবং বাগ্মী। কিন্তু নেতৃত্বের লোভ তাদের এই ঘৃণ্য চক্রান্তে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

নিজেদের যোগ্যতায় আত্মতৃপ্ত হয়ে তারা ভেবেছে যে, এসব যোগ্যতাই তাদের নেতৃত্ব লাভের জন্য যথেষ্ট। ফলে তাদেরকে শাসনক্ষমতায় নিয়োগ প্রদান না করায় তারা বিস্ময় প্রকাশ করে। তাদের মধ্যে এমন লোকও ছিল যাদেরকে উসমান রা. খুবই সম্মান এবং সমাদর করতেন। কিন্তু এতেও তাদের মন ভরেনি। তারা আরও বেশি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করে বসে। প্রত্যাশা করে উসমান রা. তাদেরকে গভর্নর নিয়োগ করবেন। কিন্তু তাদেরকে গভর্নর হিসাবে নিয়োগ না দেওয়ায় তারা প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে। যেমন মুহাম্মাদ ইবনে আবু হুজাইফা। সে ছিল উসমান রা.-এর পালকপুত্র। শৈশবকালে উসমান রা. তার পেছনে অনেক সম্পদ ব্যয় করেছেন। কিন্তু সে উসমান রা.-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। উসমান রা.-এর বিরুদ্ধে গোপনে গোপনে মানুষকে উসকানি দিতে শুরু করে। সাহাবিগণের নামে যারা মিথ্যা চিঠি লিখেছিল, তাদের মধ্যে সে ছিল অন্যতম। সে তার নিকটস্থ লোকদের এসব মিথ্যা চিঠি দিয়ে নিকটবর্তী জনপদে পাঠাত। পাঠানোর আগে সে চিঠিবাহকদের দীর্ঘক্ষণ সূর্যের আলোয় দাঁড় করিয়ে রাখত। ফলে লোকেরা মনে করত যে তারা অনেক দূর থেকে সফর করে এসেছে। এভাবে ওই সব চিঠির মাধ্যমে তারা ধোঁকায় পড়ে যেত। উল্লিখিত অপরাধী এবং মুনাফেকরা ছিল ফিতনার মূলহোতা এবং নেতৃস্থানীয় পর্যায়ের।

এ ছাড়া অন্যান্য যারা ছিল তাদের মধ্যে ছিল দুই ধরনের লোক।
এক. যারা দ্বীনের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করে। সামান্য ভুলকে বিরাট আকারে উপস্থাপন করে। এমনকি ছোটখাটো ভুলের ব্যাপারেও ছাড় দেয় না। এরা মনে করে, উসমান রা. ভুল করেছেন তাই তাকে বরখাস্ত করতে হবে। তা না হলে ব্যাপারটি হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত গড়াবে।

二. যারা প্রকৃতপক্ষেই অজ্ঞ এবং নির্বোধ ছিল। ফিতনার মূলহোতারা তাদের যা বলেছে, ধোঁকায় পড়ে তা-ই তারা মেনে নিয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় এসব ভ্রান্ত ধারণা দূর করার মতো পর্যাপ্ত উপায়-উপকরণ তখন তাদের ছিল না। এর পাশাপাশি তাদের অবস্থান ছিল বিভিন্ন দূরবর্তী স্থানে। সাহাবি, আলেম এবং ফকিহগণের আবাসস্থল মদিনা মুনাওয়ারা থেকেও অনেক দূরে। এসব মানুষ সাহাবিগণ এবং উসমান রা.-এর সঙ্গে কথা বলে নিজেদের এতদিনের ভুল স্বীকার করে সন্তুষ্টচিত্তে নিজেদের বাসস্থানে ফিরে যেতে শুরু করে। কিন্তু ফিতনার মূলহোতা যারা ছিল, তারা মূলত উসমান রা. এবং বিশিষ্ট সাহাবিগণের কথায় বশ্যতা মেনে নিতে আসেনি। তারা এসেছে ফিতনার উদ্দেশ্যে।

মিথ্যা চিঠি ও বিদ্রোহীদের প্রত্যাবর্তন
বিদ্রোহীরা সবাই মদিনা থেকে নিজ নিজ দেশের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ে। শুধু আশতার নাখায়ি এবং হাকিম ইবনে জাবালা মদিনায় থেকে যায়। সবার সঙ্গে ফিরে না গিয়ে এ দুই ব্যক্তির মদিনায় থেকে যাওয়ার বিষয়টি অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। মিশর থেকে আগত দল উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল দিয়ে ফেরার পথ ধরে। অপরদিকে কুফা ও বসরা থেকে আগত দল ফিরে যায় উত্তর-পূর্ব দিক দিয়ে। এভাবে যাত্রাপথে তারা ক্রমেই একে অপরের থেকে দূরে সরতে থাকে। ইত্যবসরে মিশরীয় দলের পথে এক উষ্ট্রারোহী ব্যক্তির দেখা পাওয়া যায়। বেশ কয়েক বার সে মিশরীয় দলের কাছে ঘেঁষে আবার পৃথক হয়ে যায়। ফলে মিশরীয়দের মধ্যে লোকটিকে নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়। তখন তারা লোকটিকে থামিয়ে তার পরিচয় জিজ্ঞাসা করে। সে বলে, আমি আমিরুল মুমিনিনের পক্ষ থেকে তার মিশরীয় গভর্নরের নিকট প্রেরিত দূত।

এ কথা স্পষ্ট যে, লোকটির এমন আচরণের কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে। মিশরীয়দের কাছে কোনো বিষয় ব্যাখ্যা করতে চাচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে সে খলিফার দূত নয়। কারণ, বর্ণনা অনুযায়ী সে বারবার মিশরীয়দের কাছে ঘেঁষে আবার দূরে চলে যেত। খলিফার দূত পরিচয় দেওয়ায় তাকে তল্লাশি করা হয়। তার সঙ্গে একটি চিঠি পাওয়া যায়। যাতে উসমান রা.-এর পক্ষ থেকে ফিতনাবাজদের কিছু ব্যক্তিকে হত্যা করতে আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারহ রা.-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে ওই সব লোকদের নামও উল্লেখ করা ছিল। এদের কাউকে হত্যা, কাউকে শূলে চড়ানো এবং কারও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে দেওয়ার নির্দেশ ছিল। একই সঙ্গে মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা.-কে হত্যার নির্দেশ ছিল।¹⁴৭ চিঠিতে উসমান রা.-এর সিলমোহরের ছাপও ছিল। তাই চিঠিটি পড়ার পর মিশরীয়দের অবাধ্যতা পুনরায় মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। তারা পুনরায় মদিনার পথে যাত্রা শুরু করে। ৩৫ হিজরির জিলকদ মাসের মাঝামাঝিতে এ ঘটনা ঘটে। মদিনায় ফেরার পথেই আলি ইবনে আবু তালেব রা.-এর পক্ষ থেকে তাদের কাছে আরেকটি চিঠি আসে। সে চিঠিতে তাদের মদিনায় আগমনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

নিজ নিজ দেশের উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর তাদের পুনরায় ফিরে আসতে দেখে মদিনার মুসলিমরা খুবই অবাক হন। তখন আলি রা. তাদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য বের হন। তারা আলি রা.-কে বলে, এই দেখুন আল্লাহর শত্রু (উসমান রা.-কে উদ্দেশ্য করে) আমাদের অমুক অমুকের ব্যাপারে কী লিখেছে! এই বলে তাকে চিঠিটি দেখায়। এরপর বলে, আল্লাহ তাআলা তার রক্তকে বৈধ করে দিয়েছেন। তাই আপনিও আমাদের সঙ্গে তার কাছে চলুন। আলি রা. বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি কখনোই তোমাদের সঙ্গে এমন কাজে যাব না। তখন তারা বলে, তাহলে আপনি আমাদের কাছে চিঠি লিখে পাঠালেন কেন? আলি রা. বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি তো তোমাদের কাছে কিছুই লিখে পাঠাইনি।¹⁴⁸

তখন মিশরীয়রা আশ্চর্য হয়ে একে অপরের দিকে তাকাতে থাকে। প্রতিটি গ্রন্থেই এই বর্ণনা রয়েছে। এতে প্রমাণ হয় যে, বিদ্রোহীরা একে অপরের মাধ্যমে প্রবঞ্চনার শিকার হতো। তারা জানত না কীভাবে এই ষড়যন্ত্র পরিচালিত হচ্ছে। এও প্রমাণিত হয় যে, তাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ চিঠি লিখে সাহাবিগণের স্বাক্ষর নকল করে চালিয়ে দিত; ফিতনার অগ্নি প্রজ্বলনের জন্য যা ছিল যথেষ্ট কার্যকর। একইভাবে এসব ঘটনার মাধ্যমে জানা যায় যে, আলি রা. সবসময় এসব বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ছিলেন। প্রথমবার তারা যখন এসেছিল, তখন তিনি তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়েছিলেন। দ্বিতীয়বার যখন তারা ফিরে এলো, তিনি তখন তাদের তিরস্কার করেন এবং মদিনা থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করেন। অথচ বানোয়াট বর্ণনাগুলোর ভাষ্য হচ্ছে, আলি রা. কিছু কারণে উসমান রা.-এর ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। তাই তিনি উসমান রা.-এর প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত না হয়ে তাকে একা ছেড়ে আসেন। বিদ্রোহীদের দমনে তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি। এমনটি বলার মাধ্যমে উসমান রা. ও আলি রা. উভয়ের ওপরেই অপবাদ আরোপ করা হয়। যে ব্যক্তি এসব অনির্ভরযোগ্য গ্রন্থগুলো পাঠ করবে সে এমন আরও অনেক বানোয়াট বিষয় দেখতে পাবে।

মিশরীয়রা যখন আলি রা.-এর সঙ্গে উসমান রা.-এর নাম দিয়ে প্রেরিত এই অদ্ভুত চিঠি নিয়ে তর্ক করছিল, তখন কুফা এবং বসরার দলদুটিও মদিনার প্রবেশদ্বারের কাছাকাছি চলে আসে। ফলে বেশ কয়েকজন সাহাবি তাদের জিজ্ঞাসা করেন, তোমরা আবার ফিরে এলে কেন? তারা বলল, আমরা এসেছি আমাদের মিশরীয় ভাইদের সাহায্য করার জন্য। আলি রা. তাদের বললেন, মিশরীয়দের সম্পর্কে তোমরা কীভাবে জানলে, তোমরা তো তাদের থেকে অনেক দূরে ছিলে? আল্লাহর শপথ! নিশ্চয় এটি এমন এক ষড়যন্ত্র, মদিনা থেকেই যা পরিচালিত হচ্ছে।¹⁴৯ আলি রা. যেন আশতার নাখায়ি এবং হাকিম ইবনে জাবালার মদিনায় থেকে যাওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করছিলেন। যেন তারা দুজনই এই চিঠিগুলো লিখেছে। এমনটি হওয়া খুবই স্বাভাবিক ছিল।

কুফা এবং বসরার বিদ্রোহীরা তখন বলল, আপনারা যাই বলুন না কেন, এই ব্যক্তি যেন নিজ থেকে অব্যাহতি নেয়, নয়তো আমরা তাকে অপসারণ করব। এ সময় সাহাবিগণ উসমান রা.-এর সিলমোহরযুক্ত চিঠি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য বিদ্রোহীদের নিয়ে উসমান রা.-এর কাছে যান এবং তাকে চিঠিটা দেখান। তখন উসমান রা. বলেন, তোমরা এর স্বপক্ষে প্রমাণ দাও। আল্লাহর শপথ! আমি এই চিঠি লিখিনি এবং কাউকে দিয়ে লেখাইনি। এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। আর সিলমোহরের অনুকরণে মিথ্যা সিলমোহর বানানো যায়।¹⁵⁰ তখন বিদ্রোহীদের কেউ কেউ বলল, তাহলে এই চিঠি মারওয়ান ইবনে হাকাম লিখেছে। তারা চাইল, মারওয়ান ইবনে হাকামকে যেন তাদের কাছে সমর্পণ করা হয়। উসমান রা. আশঙ্কা করলেন, যদি তাদের হাতে দেওয়া হয়, তাহলে তারা মারওয়ানকে হত্যা করতে পারে। তাই তিনি তাদের এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তখন কেউ কেউ তার কথা সত্যায়ন করে এবং অন্যরা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। এভাবেই বেশ কয়েক দিন ধরে উসমান রা. এবং বিদ্রোহীদের মধ্যকার সংলাপ চলতে থাকে। বিদ্রোহীরা ঘোষণা করে দেয়, যারা নিজের হাতকে সংযত রাখবে তারা নিরাপদ।

এ সময় বিদ্রোহীদের সংখ্যা ছিল অন্তত ২ হাজার। মদিনায় বিদ্যমান সাহাবিগণ ছিলেন সংখ্যায় ৭০০ জন। বিদ্রোহীদের প্রতিরোধ করার জন্য মদিনায় তখন কোনো সেনাবাহিনীও ছিল না। কারণ, মুসলিম বাহিনীর অধিকাংশই তখন রোম, পারস্য, আফ্রিকা ইত্যাদি বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। মদিনায় বিশেষ কোনো নিরাপত্তা বাহিনী ছিল না। কারণ, মদিনার মানুষ একে অপরের ব্যাপারে ছিল নিরাপদ এবং নিশ্চিন্ত। যেমন, হাসান বসরি রহ. বলেন, এক মুমিন অপর মুমিনের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বসুলভ মনোভাব নিয়েই সাক্ষাৎ করত। এ ছাড়াও ওই সব বিদ্রোহীরা মদিনায় এসেছিল হজের মৌসুমে। তখন মদিনার অনেক মুসলিম হজ আদায়ের লক্ষ্যে বেরিয়ে পড়েছিলেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. উসমান রা.-এর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে হজে যাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রতীক্ষমাণ ছিলেন। পরিস্থিতি কী হয় তা দেখার জন্য তিনি মদিনায় অবস্থান করছিলেন। অপরদিকে উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা. তখন হজের উদ্দেশ্যে মদিনা ছেড়ে গিয়েছিলেন।

গৃহবন্দি হলেন উসমান রা.
এ সময় পর্যন্ত খলিফা উসমান রা. স্বাভাবিকভাবেই চলছিলেন। মুহাজির এবং আনসার সকল সাহাবিই তার পেছনে নামাজ আদায় করছিলেন। এমনকি বিদ্রোহীরাও তার পেছনেই নামাজ পড়ত। এরই মধ্যে জুমার দিন চলে আসে। উসমান রা. দাঁড়িয়ে জুমার খুতবা প্রদান করেন। নামাজ শেষে তিনি পুনরায় মিম্বরে আরোহণ করেন এবং বলেন, বহিরাগত লোকসকল, আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহর শপথ! নিশ্চয় মদিনাবাসীরা জানে যে, তোমরা হলে রাসুল- এর ভাষায় অভিশপ্ত। তাই নেক কাজের মাধ্যমে তোমাদের ভুলগুলো মুছে ফেলো। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা মন্দকে মুছে দেন একমাত্র নেককাজের মাধ্যমে। তখন বিশিষ্ট সাহাবি মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা রা. দাঁড়িয়ে বলেন, আমি এর পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছি। হাকিম ইবনে জাবালা তার পাশেই ছিল। সে জোরপূর্বক তাকে বসিয়ে দেয় এবং গালমন্দ করে। তখন যায়দ ইবনে সাবেত আনসারি রা. বলেন, নিশ্চয় এ কথা কুরআনে রয়েছে।¹⁵¹

তখন ফিতনাবাজদের মধ্যে মুহাম্মাদ ইবনে আবি মুরাইরা নামক এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে যায়দ রা.-কে টানাহ্যাঁচড়া ও গালমন্দ করে। এরপর জাহজাহ গিফারি নামক অপর এক ফিতনাবাজ দাঁড়িয়ে উসমান রা.-কে সম্বোধন করে কথা বলতে থাকে। তার দিকে এগিয়ে গিয়ে হাতের লাঠিটি কেড়ে নেয়, যে লাঠিতে ভর দিয়ে তিনি খুতবা দিতেন। এটি ছিল রাসুল ﷺ-এর লাঠি। তিনি এ লাঠিতে ভর দিয়ে খুতবা দিতেন। পরবর্তী সময়ে আবু বকর রা. ও উমর রা. এই লাঠি ব্যবহার করেছেন। কিন্তু জাহজাহ নামক নরাধম এই পবিত্র লাঠিটি ছিনিয়ে নিয়ে হাঁটু দিয়ে ভেঙে ফেলে এবং উসমান রা.-কে বলে, হে আহাম্মক, তুই এই মিম্বর থেকে নেমে যা।¹⁵২ এই প্রথম উসমান রা.-কে জনসম্মুখে গালি দেওয়া হলো। নরাধম জাহজাহের এই কথা বলার পর সব বিদ্রোহীরা দাঁড়িয়ে সাহাবিগণ এবং উসমান রা.-এর ওপর পাথর নিক্ষেপ করতে শুরু করে। উসমান রা. তখনও মিম্বরে অবস্থান করছিলেন। তার গায়ের জামা রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায়। কয়েকজন সাহাবি তাকে ধরে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসেন। এরপর তিনি বাড়ি থেকে আর বের হতে পারেননি। ফিতনাবাজরা তার বাড়ি অবরোধ করে রাখে।¹⁵³ মুসলিমদের নামাজ পড়ানোর দায়িত্ব আসে আবু হুরাইরা রা.-এর কাঁধে। তবে বেশ কিছু দুর্বল বর্ণনায় পাওয়া যায়, উসমান রা.-কে হত্যার আগ পর্যন্ত নামাজের ইমামতি করত গাফেকি। তবে বিশুদ্ধ মতে এ সময় আবু হুরাইরা রা. ইমামতি করেছেন।

উসমান রা. পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে বুঝতে পারলেন যে, এসব বিদ্রোহীদের সঙ্গে নম্রতায় কোনো কাজ হবে না, তাই তিনি বিভিন্ন প্রান্তে নিয়োজিত গভর্নরদের কাছে চিঠি পাঠান। যেন তারা সৈন্যদল পাঠিয়ে উদ্ভূত জটিলতার সমাধান করেন। শামে নিযুক্ত মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রা., কুফায় নিযুক্ত আবু মুসা আশআরি রা. এবং বসরায় নিযুক্ত আবদুল্লাহ ইবনে আমের ইবনে কুরাইজ রা.-এর কাছে চিঠি প্রেরণ করা হয়। কিন্তু মদিনা থেকে এসব অঞ্চলের দূরত্ব আমরা সকলেই জানি। তাই চিঠি পৌঁছতে দেরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। এ সময় পর্যন্ত উসমান রা.-কে হত্যা করার কথা কেউ বলেনি; বরং তারা তাকে শুধু বরখাস্ত করতে চেয়েছিল। হত্যার কথা তখনও কেউ প্রকাশ্যে আনেনি। এ সময় উসমান রা. ঘরের জানালা দিয়ে বিদ্রোহীদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন। তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, তোমাদের মধ্যে কি আলি ইবনে আবু তালেব, যুবায়ের, তালহা, সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস নেই? এসব মহান সাহাবি লোকদের সঙ্গে সেখানেই ছিলেন। তারা উসমান রা.-কে রেখে ফিরে যেতে চাননি। তাই ওই সব মহান সাহাবি নিজেদের অবস্থান দেখিয়ে বলেন, আমরা এখানেই আছি।

উসমান রা. তাদের বলেন, আমি তোমাদেরকে আল্লাহ তাআলার দোহাই দিয়ে বলছি, তোমরা জানো যে, রাসুল বলেছেন, যে ব্যক্তি অমুক গোত্রের আত্মাবল ক্রয় করে দেবে, আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দেবেন। এরপর আমি তা ক্রয় করে রাসুল-এর কাছে গিয়ে বলেছি, আমি তা ক্রয় করে নিয়েছি। তখন রাসুল বললেন, তুমি তা আমাদের মসজিদের জন্য দিয়ে দাও, এর সওয়াব তুমি পাবে। তিনি কি এ কথা বলেননি? সাহাবিগণ বললেন, হ্যাঁ, তিনি বলেছিলেন।

উসমান রা. বললেন, আমি তোমাদেরকে ওই আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তোমরা জানো যে, রাসুল বলেছেন, বিরে রুমা (রুমা নামক কূপ) কে ক্রয় করে দেবে? আমি তা এত দিনার দিয়ে ক্রয় করে রাসুল-কে বললাম, আমি তা ক্রয় করে নিয়েছি। তিনি বললেন, মুসলিমদের পানি পানের জন্য তা দান করে দাও, তুমি এর সওয়াব পাবে। আমি কি তা করিনি? সাহাবিগণ বললেন, হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি। এরপর তিনি বললেন, আমি তোমাদেরকে ওই আল্লাহ তাআলার দোহাই দিয়ে বলছি, যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; তোমরা জানো যে, তাবুক যুদ্ধের বাহিনী প্রস্তুত করার দিনে রাসুল লোকদের দিকে তাকিয়ে বললেন, যে ব্যক্তি তাদেরকে যুদ্ধসরঞ্জামাদি দিয়ে প্রস্তুত করে দেবে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন। আমি তাদেরকে যুদ্ধসরঞ্জামাদি দিয়েছি। এমনকি একটি লাগাম ও রশি পর্যন্তও বাদ রাখিনি। তোমরা কি তা দেখোনি? সাহাবিগণ বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন! আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন! আল্লাহ আপনি সাক্ষী থাকুন! এরপর তিনি ফিরে যান।¹⁵⁴

এরপর তিনি আরেকবার অবরুদ্ধ ঘর থেকে উঁকি দিয়ে বললেন, আমি তাদেরকে আল্লাহ তাআলার দোহাই দিয়ে বলছি, যারা রাসুল-কে হেরা পাহাড়ে যাওয়ার দিন দেখেছেন। সেদিন পাহাড় কেঁপে উঠলে রাসুল পাহাড়ে পা রেখে বলেন, হেরা পাহাড়, শান্ত হও। তোমার ওপর একজন নবী, একজন সিদ্দিক এবং একজন শহিদ রয়েছেন। তখন আমি তার সঙ্গে ছিলাম। বেশ কয়েকজন সাহাবি তার এ কথার পক্ষে সাক্ষ্য দিলেন। তিনি বলেন, আমি তাদেরকে আল্লাহ তাআলার শপথ দিয়ে বলছি, যারা বাইআতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণ করেছেন। সেদিন রাসুল ﷺ আমাকে মক্কার মুশরিকদের উদ্দেশে পাঠিয়েছিলেন। তখন তিনি নিজের এক হাতে আরেক হাত রেখে বলেছিলেন, এটি আমার হাত, অপরটি উসমানের হাত। এই বলে তিনি আমার পক্ষ থেকে বাইআত গ্রহণ করেছিলেন। বেশ কয়েকজন সাহাবি তার এ কথার পক্ষেও সাক্ষ্য দেন। এরপর তিনি বলেন, আমি তাদেরকে আল্লাহ তাআলার শপথ দিয়ে বলছি, যারা রাসুল ﷺ-কে বলতে শুনেছে যে, যে ব্যক্তি আমাদের জন্য এই ঘরের মাধ্যমে মসজিদকে সম্প্রসারিত করবে, তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করা হবে। তখন আমি নিজের সম্পদ থেকে সেই ঘর ক্রয় করে তা দিয়ে মসজিদ সম্প্রসারণ করেছি। বেশ কয়েকজন সাহাবি তার এ কথার পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করেন।

তিনি আবার বলেন, আমি তাদেরকে আল্লাহর শপথ দিয়ে বলছি, তাবুক যুদ্ধের বাহিনী প্রস্তুত করতে যেদিন কষ্ট হচ্ছিল সেদিন যারা রাসুল ﷺ-কে বলতে শুনেছে, কে আজ এমন দান করবে, যা কবুল হবে? সেদিন কি আমি আমার সম্পদ থেকে বাহিনীর অর্ধেক সদস্যের যুদ্ধসরঞ্জাম প্রস্তুত করে দিইনি? বেশ কয়েকজন সাহাবি তার পক্ষে সাক্ষ্য দিলেন। তিনি বললেন, আমি তাদেরকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলেছি, যারা রুমা কূপ থেকে মুসাফিরদের পানি ক্রয় করে পান করতে দেখেছে। আমি কি তা নিজের সম্পদ থেকে ক্রয় করে মুসাফিরদের জন্য উন্মুক্ত করে দিইনি? তার এ কথার পক্ষেও অনেকে সাক্ষ্য দিলেন।¹⁵⁵

এ পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে শান্তিপূর্ণভাবেই আলাপ চলতে থাকে। কিন্তু এরই মধ্যে বিদ্রোহীদের থেকে হত্যার মত আসতে শুরু করে। তারা উসমান রা.-কে বরখাস্ত অথবা হত্যার যেকোনো একটি বেছে নিতে বলেন। উসমান রা. এবং অন্যান্য সাহাবিগণের জন্য এটি ছিল খুবই কঠিন পরিস্থিতি।

সাহাবিগণের অবস্থান
উসমান রা.-এর অবরোধের সময় সাহাবিগণের অবস্থান সম্পর্কে অনেক মিথ্যা ও বানোয়াট বর্ণনা রয়েছে। সেসব বর্ণনায় বলা হয়েছে, সাহাবিগণ এই কঠিন বিপদের সময় উসমান রা.-কে ছেড়ে গিয়েছিলেন। তার পক্ষে প্রতিরোধ করেননি। কারণ, তারা উসমান রা.-এর নীতিতে সন্তুষ্ট ছিলেন না। সাহাবিগণ সম্পর্কে এটি খুবই গুরুতর একটি অপবাদ। ফিতনার প্রাথমিক পর্যায়ে সাহাবিগণ উসমান রা.-এর কাছে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে আলি রা., তালহা রা., যুবায়ের রা. এবং সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা. প্রমুখ বিশিষ্ট সাহাবি ছিলেন। কিন্তু উসমান রা. চাচ্ছিলেন না, তারা মদিনা থেকে অস্ত্রের মাধ্যমে বিদ্রোহীদের সরিয়ে দিক। তিনি চেয়েছিলেন এই সংকট রক্তপাতহীন সমাধান করতে।

পরিস্থিতি গুরুতর আকার ধারণ করার পর যুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা. উসমান রা.-এর কাছে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন, আমি আপনার জন্য বনু আমর ইবনে আউফকে সংগঠিত করতে পারব। এটি ছিল মদিনা থেকে কয়েক মাইল দূরত্বে অবস্থিত অনেক বড় একটি গোত্র। তখন উসমান রা. জবাব দিয়েছিলেন, যদি এমনটি সম্ভব হয় তবে তাই করুন। তখন উসমান রা. চিন্তিত মদিনাবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে। বিদ্রোহীদের তুলনায় সংখ্যায় তারা খুবই কম। যদি দুই পক্ষে যুদ্ধ বেধে যায়, তাহলে সাহাবিগণের রক্তপাত হবে। যদি বিদ্রোহীদের পরাজিত করতে সক্ষম বাহিনীর ব্যবস্থা হয় তবে তিনি শক্তির মাধ্যমে বিদ্রোহীদের দমনে সম্মত ছিলেন। তিনি তার প্রাণ উৎসর্গ করে দিতে প্রস্তুত ছিলেন। তবে ওই সব বিদ্রোহীদের হাতে মদিনার সাহাবিগণের রক্তপাত হোক, তা কখনো কামনা করেননি। নিশ্চয় এমন বীরত্বের পুনরাবৃত্তি আর কখনো হবে না। একজন নেতা তার জাতির জন্য নিজের প্রাণ উৎসর্গ করে দেবেন, এমন দৃশ্য খুবই বিরল; বরং আমরা দেখি যে, অনেক নেতা নিজেদের বিলাসিতার জন্য সেনাবাহিনী এবং সাধারণ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। কিন্তু সমগ্র ইসলামি সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন যিনি, তিনি মদিনাবাসীদের নিরাপত্তার স্বার্থে নিজের জীবনকেই উৎসর্গ করে দিচ্ছেন।

যায়েদ ইবনে সাবেত আনসারি রা. দাঁড়িয়ে উসমান রা.-কে বলেছিলেন, নিশ্চয় আনসাররা আপনার দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। তারা বলছে, আপনি চাইলে আমরা আনসারুল্লাহ তথা আল্লাহর সহযোগী হয়ে দাঁড়িয়ে যাব। এ কথা তিনি দুইবার বললেন। তখন উসমান রা. বললেন, আমার এর কোনো প্রয়োজন নেই। তোমরা নিজেদের হাত গুটিয়ে নাও।¹⁵⁶ হজের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার আগে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. উসমান রা.-এর কাছে এসে বলেছিলেন, আপনার দরজায় দাঁড়িয়ে আপনাকে নিরাপত্তা দেওয়া আমার জন্য হজ থেকেও উত্তম। উসমান রা. তাকে বলেছিলেন, আমার এর কোনো প্রয়োজন নেই। এই বলে তিনি তাকে হজ কাফেলার আমির নিযুক্ত করে হজে যাওয়ার নির্দেশ দেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. তার সেই নির্দেশ পালন করেন।

একদল সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে উসমান রা-এর বাড়িতে যান আবু হুরাইরা রা.। তখন আবু হুরাইরা রা. বলেছিলেন, আমি আমার দুই কানে রাসুল ﷺ-কে বলতে শুনেছি, আমার মৃত্যুর পর ফিতনা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তাহলে কীভাবে তা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে? তিনি বললেন, শাসক এবং তার অনুগত দলের মাধ্যমে। এ বলে তিনি উসমান রা.-এর দিকে ইঙ্গিত করেন। উপস্থিত সাহাবিগণ উসমান রা.-কে বললেন, আপনি আমাদের অনুমতি দিন। আমরা তাদের সঙ্গে লড়াই করব। আমরা তো স্বচক্ষে সবই দেখতে পাচ্ছি। উসমান রা. অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলে দিলেন, যাদের ওপর আমার আনুগত্য করা আবশ্যক, তাদের প্রত্যেকের প্রতি আমার জোর নির্দেশ হচ্ছে, তারা যেন লড়াই না করে।¹⁵⁷ আবু হুরাইরা রা. বললেন, আমিরুল মুমিনিন, এখন আপনার সঙ্গে থেকে লড়াই করাই উত্তম। এই মুহূর্তে এটিই জিহাদ। উসমান রা. তাকে বললেন, আমি আপনাকে চলে যাওয়ার জন্য জোর নির্দেশ দিচ্ছি। আবু হুরাইরা রা. সেখান থেকে চলে এলেন।

বুঝাই যাচ্ছে পরিস্থিতি কতটা নাজুক ছিল তখন। উসমান রা. নিশ্চিতভাবেই জানতেন যে, এই অল্পসংখ্যক সাহাবি বিদ্রোহীদের সামনে টিকতে পারবেন না। তাই তিনি শাম, বসরা এবং কুফা থেকে আগত বাহিনীর সাহায্যের অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু দূরত্ব বেশি থাকায় তাদের পৌঁছতে বিলম্ব হয়। এদিকে যুবায়ের রা.-এর গোত্র বনু আমর ইবনুল আউফের সংঘবদ্ধ হওয়ার অপেক্ষাও করছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তারা সংঘবদ্ধ হতে পারেনি।

উসমান রা. দেখতেই পাচ্ছিলেন, মদিনায় বিদ্যমান সাহাবিগণ কিছুতেই বিদ্রোহীদের দমনে যথেষ্ট নন। তাই লড়াইয়ের কথা বলার কোনো অর্থই হয় না। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে, উসমান ইবনে আফফান রা. পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাস করতেন যে, তিনি শহিদ হয়েই আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। বিশ্বাস করতেন, নিশ্চয় তিনি কোনো বিপদ অথবা ফিতনার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করবেন। ফলে তিনি অচিরেই জান্নাতে প্রবেশ করবেন। তিনি রাসুল থেকে নিজ কানে এ ব্যাপারে বলতে শুনেছিলেন। রাসুল-এর ব্যাপারে কুরআনের সাক্ষ্য হচ্ছে, ‘তিনি মনগড়া কিছু বলেন না।’ [সুরা নাজম: ৩] সহিহ বুখারিতে কাতাদা রহ.-এর সূত্রে বর্ণিত আছে, আনাস ইবনে মালেক রা. তাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, একবার রাসুল ﷺ, আবু বকর রা., উমর রা. এবং উসমান রা. উহুদ পাহাড়ে উঠলেন। তখন পাহাড় তাদেরকে নিয়ে কেঁপে উঠলে রাসুল বলেন, ‘উহুদ, তুমি স্থির হও। নিশ্চয় তোমার ওপর রয়েছে একজন নবী, একজন সিদ্দিক ও দুজন শহিদ।’¹⁵⁸

সহিহ বুখারিতে আবু মুসা আশআরি রা.-এর সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, মদিনার কোনো এক বাগানে আমি একবার রাসুল-এর সঙ্গে ছিলাম। তখন একজন লোক এসে ভেতরে আসার অনুমতি প্রার্থনা করেন। রাসুল বলেন, দরজা খুলে দাও এবং তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও। আমি দরজা খুলে দেখলাম আবু বকর রা. দাঁড়িয়ে আছেন। রাসুল-এর কাছ থেকে শোনা সুসংবাদ আমি তাকে শুনিয়ে দিলাম। তিনি আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করলেন। এরপর আরেক ব্যক্তি এসে অনুমতি চাইলেন। রাসুল এবারও বললেন, দরজা খুলে দাও এবং তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও। আমি দরজা খুলে দেখলাম উমর রা. দাঁড়িয়ে আছেন। তাকে আমি রাসুল-এর কাছ থেকে শোনা সুসংবাদ শুনিয়ে দিলাম। তিনি আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করলেন। এরপর আরেক ব্যক্তি এসে অনুমতি চাইলেন। রাসুল এবার বললেন, দরজা খুলে দাও এবং তাকে আসন্ন বিপদ-সহ জান্নাতের সুসংবাদ দাও। এবার দেখলাম উসমান রা. দাঁড়িয়ে আছেন। রাসুল যা বলেছেন আমি তাকে শুনালাম। তিনি আল্লাহ তাআলার প্রশংসা করে বললেন, আল্লাহ তাআলাই একমাত্র সহায়।¹⁵৯

উসমান রা. মনে করতেন যে, যেহেতু তার জীবন উৎসর্গই এই ফিতনার সমাধান; তাই তিনি ব্যক্তিগতভাবে পরিস্থিতি সমাধানের জন্য এটিকেই অধিক উপযুক্ত মনে করেছেন। তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে, এই ফিতনার কারণেই তার জীবননাশ হবে। তাই মদিনার ৭০০ মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে তার জীবন বিসর্জন দিতে কোনো সমস্যা নেই। উসমান রা.-এর মৃত্যুর পর তারাই হবেন উম্মাহর কাণ্ডারি। এরপর সেই পাপিষ্ঠ বিদ্রোহীরা আর ক্ষমতায় বসতে সক্ষম হবে না। বিদ্রোহীরা তখন পর্যন্ত উসমান রা.-এর স্থলে আলি রা., তালহা রা. ও যুবায়ের রা.-এর মধ্যে যেকোনো একজনকে চাচ্ছিল। তারা সকলেই ছিলেন উত্তম এবং যোগ্য। জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০জন সাহাবির অন্তর্ভুক্ত। তাই তারা লড়াই করে নিহত হওয়া এবং গুটিকয়েক বিদ্রোহীর হাতে শাসনক্ষমতা চলে যাওয়ার চেয়ে তাদের জীবিত থাকাই হবে সবচেয়ে উত্তম।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উসমান রা. ছিলেন সকল মুসলিমের খলিফা। প্রত্যেক মুসলিমের জন্য তার আনুগত্য করা আবশ্যক। তাই তিনি যদি তাদের বলেন, যাদের ওপর আমার অনুসরণ আবশ্যক, তাদের আমি আল্লাহর নামের শপথ দিয়ে নির্দেশ দিচ্ছি, তারা যেন লড়াই না করে। এ কথার পর যদি কেউ লড়াইয়ে লিপ্ত হয় তাহলে তা হবে উসমান রা.-এর নির্দেশের অবাধ্যতা। উসমান রা. তাদেরকে খুবই জটিল এক বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন। কেউ যদি তার পক্ষে লড়াই করে তবে তা হবে অবাধ্যতা। আর অবাধ্যতা করা মানে বিদ্রোহ করা। উসমান রা. এই মত পোষণ করতেন। সাহাবিগণ ইসলাম ধর্মে উসমান রা.-এর মর্যাদা এবং শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে অবগত ছিলেন। নিশ্চিতভাবেই তারা জানতেন উসমান রা.-এর রয়েছে প্রজ্ঞাপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। যদি কখনো তিনি এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেন যা তাদের কাছে বোধগম্য নয় অথবা তাদের কাছে বাহ্যিকভাবে ভুল মনে হয়, তবুও এ ক্ষেত্রে আনুগত্য আবশ্যক। যদি না এতে আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা হয়। কারণ, তিনি হচ্ছেন খলিফা।

জঙ্গে জামালের পর আলি ইবনে আবু তালেব রা. এবং সাইদ খুজায়ি নামক এক তাবেয়ির মধ্যকার কথোপকথন আমাদের কাছে বর্ণিত হয়েছে। সাইদ রহ. আলি রা.-কে বললেন, উসমান রা. এবং আপনার মধ্যকার একটি বিষয় নিয়ে আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করতে চাই। আলি রা. বললেন, তোমার যা ইচ্ছা হয় জিজ্ঞাসা করো। সাইদ রহ. বললেন, যখন উসমান রা.-কে হত্যা করা হচ্ছিল তখন কোন ঘর আপনাকে আটকে রেখেছিল যে, তাকে সাহায্য করতে পারলেন না? আলি রা. জবাব দিলেন, উসমান রা. ছিলেন আমাদের নেতা। তিনিই আমাদের লড়াই করতে নিষেধ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যে ব্যক্তি তরবারি উন্মুক্ত করবে সে আমার অনুসারী নয়। যদি এরপরও আমরা লড়াই করতাম তবে তার অবাধ্যতা হতো। সাইদ রহ. বললেন, তিনি যখন আত্মসমর্পণ করেছিলেন তখন কীসের ওপর ভরসা করেছিলেন? আলি রা. জবাব দিলেন, আদম আ.-এর ছেলে যার ওপর ভরসা করে তার ভাইকে বলেছিলেন, ‘তুমি যদি হত্যা করার জন্য আমার দিকে হাত বাড়াও, তাহলে তোমাকে হত্যা করার জন্য আমি হাত বাড়াব না। নিশ্চয় আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলাকে ভয় করি।’ [সুরা মায়েদা : ২৮] এ কথা শুনে সাইদ খুজায়ি রহ. নীরব হয়ে গেলেন।¹⁶⁰

কেউ কেউ প্রশ্ন করে থাকে যে, তাহলে উসমান রা. আলি রা., তালহা রা. অথবা যুবায়ের রা.-এর মধ্যে কারও হাতে ক্ষমতা দিয়ে সরে গেলেন না কেন? তাদের সকলেই তো ছিলেন বিশিষ্ট সাহাবি?

জবাবে বলব, তিনি যদি এমনটি করতেন তবে তা হতো শরিয়ত ও রাসুল ﷺ-এর হাদিসের স্পষ্ট বিরোধিতা। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল বলেন, হে উসমান, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাকে সম্মানের পোশাক পরিধান করাবেন। যদি তারা এ পোশাক খুলে ফেলতে বলে, তবে তুমি খুলবে না। এ কথা তিনি তিনবার বলেন। এই হাদিসের মাধ্যমে স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়, রাসুল তাকে ক্ষমতা ধরে রাখার এবং ওই সকল মুনাফেকফের কথা না মানার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাই ক্ষমতা থেকে নেমে যাওয়া হতো রাসুল ﷺ-এর হাদিসের বিরোধিতা। ইমাম তিরমিজি রহ., ইবনে মাজাহ রহ., আহমদ রহ. এবং হাকিম রহ. প্রমুখ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।¹⁶¹

কোনো কোনো সাহাবি এই বিশাল ফিতনার বিষয়টি নিয়ে খুবই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিলেন; যে ফিতনার কথা ভাবলে অতি সহনশীল ব্যক্তিও পেরেশান হয়ে পড়ে। তখন মুররা ইবনে কাব রা. তাদের মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিম্নোক্ত হাদিসটি। ইমাম তিরমিজি রহ. নিজ সূত্রে আবুল আশআস সানআনি রহ. থেকে বর্ণনা করেন, শামে কয়েকজন বক্তা দাঁড়িয়ে গেলেন। তাদের মধ্যে রাসুল-এর কয়েকজন সাহাবিও ছিলেন। সর্বশেষ যে ব্যক্তিটি দাঁড়ালেন তিনি হলেন মুররা ইবনে কাব রা.। তিনি বললেন, আমি যদি রাসুল থেকে এই হাদিসটি না শুনতাম তাহলে দাঁড়াতাম না। তিনি ফিতনা প্রসঙ্গে কথা বলেন যে, তা অতি নিকটবর্তী। তখন কাপড় দিয়ে আবৃত এক ব্যক্তি পাশ দিয়ে অতিক্রম করেন। রাসুল তাকে দেখে বলেন, এই ব্যক্তি সেদিন সঠিক পথে থাকবে। আমি তার কাছে গিয়ে দেখলাম তিনি হলেন উসমান ইবনে আফফান রা.। মুররা ইবনে কাব রা. বলেন, আমি তাকে নিয়ে রাসুল -এর কাছে এসে বললাম, ইনিই? তিনি বললেন, হ্যাঁ।¹⁶² ইমাম তিরমিজি রহ. বলেন, এই হাদিসটি সহিহ। ইমাম ইবনে মাজাহ রহ.-ও হাদিসটি বর্ণনা করেছেন এবং শায়খ আলবানি রহ. হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন।

সুতরাং বোঝা গেল যে, যদিও তখন মতপার্থক্য ছিল, তবে উসমান রা.-ই ছিলেন সঠিক। যা রাসুল-এর হাদিসের সাক্ষ্য অনুযায়ী প্রমাণিত। আর তিনি কোনো মনগড়া কথা বলেন না। সাহাবিগণের জন্য এ ছিল খুবই জটিল এক পরিস্থিতি। কীভাবে তারা পারবেন উসমান রা.-কে একা ছেড়ে দিতে? অথচ রাসুল, আবু বকর রা. এবং উমর রা.-এর ইন্তেকালের পর তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। রাসুল নিজের দুই মেয়েকে তার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন। ওই সময় দুঃখকষ্টে সাহাবিগণের হৃদয় ছেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তবুও তারা উসমান রা.-এর পক্ষে কিছুই করতে পারছেন না। যেন তার অবাধ্যতা না হয়। এরপর সাহাবিগণ নিজ নিজ ঘরে ফিরে আসেন এবং বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, 'তিনি তো আমাদেরকে আল্লাহর নামের শপথ দিয়ে নির্দেশ দিয়েছেন, আমরা যেন তার পক্ষে প্রতিরোধ না করি। কিন্তু তিনি তো আমাদের পুত্রদেরকে শপথ দিয়ে কোনো নির্দেশ দেননি।

তখন আলি রা. পাঠিয়ে দেন হাসান রা. ও হুসাইন রা.-কে। যারা দাবি করে, উসমান রা.-এর নীতিতে আলি রা. অসন্তুষ্ট থাকায় তার থেকে সরে গিয়েছেন, তাদের বিপক্ষে এটি খুবই শক্তিশালী দলিল। এই দেখুন, তিনি উসমান রা. এর পক্ষে প্রতিরোধ করার জন্য নিজের কলিজার টুকরা দুই ছেলেকে পাঠিয়ে দিলেন। যুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা. পাঠিয়ে দিলেন ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা.-কে। তালহা রা. পাঠিয়ে দিলেন ছেলে মুহাম্মাদ ইবনে তালহা রা.-কে। এভাবে অনেক সাহাবিই এমনটি করেছেন। সাহাবিগণের পুত্রগণ উসমান রা.-এর বাড়িতে এসে সমবেত হন এবং আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা.-কে তাদের আমির নির্ধারণ করে উসমান রা.-এর পক্ষে প্রতিরোধ শুরু করেন।

এ সময় আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. উসমান রা.-এর কাছে যান। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-ও উসমান রা.-এর মতো ওই সব বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংঘর্ষে না জড়ানোর পক্ষে ছিলেন; এতে যদিও উসমান রা.-কে নিহত হতে হয়। উসমান রা. তাকে বললেন, দেখো এসব লোকের দিকে। তারা আমাকে বলছে, আপনি ক্ষমতা থেকে সরে যান, নচেৎ আমরা আপনাকে হত্যা করব। তখন আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, আপনি কি দুনিয়ায় চিরস্থায়ী হতে পারবেন? উসমান রা. বললেন, না। ইবনে উমর রা. বললেন, তারা কি আপনাকে হত্যার চেয়ে বেশি কিছু করতে পারবে? উসমান রা. বললেন, না। ইবনে উমর রা. বললেন, তারা কি জান্নাত অথবা জাহান্নাম দিতে পারবে? উসমান রা. বললেন, না। তখন ইবনে উমর রা. বললেন, তাহলে আল্লাহ আপনাকে যে সম্মানের পোশাক পরিয়েছেন তা আপনি খুলবেন না। আপনি যদি এমনটি করেন তবে এটি রীতি হয়ে দাঁড়াবে। যখনই কোনো জাতি তাদের খলিফাকে অপছন্দ করবে, তাকে সরিয়ে দেবে অথবা হত্যা করবে।¹⁶³

বিদ্রোহীরা যখন প্রকাশ্যে উসমান রা.-কে ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়া অথবা মৃত্যুকে বরণ করে নেওয়ার যেকোনো একটি বেছে নিতে বলে, তখন তিনি ঘরের জানালা দিয়ে তাদের কাছে বলেন, তোমরা আমাকে কী অপরাধে হত্যা করবেন? নিশ্চয় আমি রাসুল ﷺ-কে বলতে শুনেছি, তিনটি অপরাধের কারণে কারও রক্ত বৈধ হবে। যে ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তাকে পাথর নিক্ষেপ করে মারা হবে। যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করে, তার কাছ থেকে কিসাস¹⁶৪ গ্রহণ করা হবে। যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণের পর ধর্মত্যাগ করে, তাকে হত্যা করা হবে। আল্লাহর শপথ! আমি কখনো ব্যভিচারে লিপ্ত হইনি। জাহেলি যুগেও না, ইসলামি যুগেও না। আমি কাউকে হত্যাও করিনি যে, আমার কাছ থেকে কিসাস গ্রহণ করবে। আর ইসলাম গ্রহণ করার পর আমি কখনো ধর্মত্যাগ করিনি। নিশ্চয় আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কোনো উপাস্য নেই এবং নিশ্চয় মুহাম্মাদ আল্লাহ তাআলার বান্দা এবং রাসুল। তাহলে কী অপরাধে তোমরা আমাকে হত্যা করতে চাও?¹⁶⁵ ইমাম নাসায়ি রহ. হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। প্রায় কাছাকাছি শব্দে একটি বর্ণনা সুনানু আবি দাউদ এবং সুনানুত তিরমিজিতেও এসেছে। ইমাম তিরমিজি রহ. হাদিসটিকে হাসান¹⁶⁶ বলেছেন।

বিদ্রোহীরা ফিরে যায়নি; বরং প্রবৃত্তি ও শয়তানের প্রবঞ্চনা তাদের অন্তরে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। আরেকদিন উসমান রা. তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আল্লাহর শপথ করে বলছি, যদি তোমরা আমাকে হত্যা করো তাহলে এরপর কখনোই তোমরা একে অপরকে ভালোবাসতে পারবে না। একসঙ্গে কখনোই সম্প্রীতি রক্ষা করতে পারবে না। একসঙ্গে কখনোই শত্রুর সঙ্গে লড়াই করতে পারবে না।¹⁶৭ উসমান রা. সেদিন সত্যিই বলেছিলেন। তাকে হত্যা করার পর থেকেই খুলে যায় ফিতনার দুয়ার। সেই সময় থেকে ফিতনার যে চক্র শুরু হয়েছে, তার আবর্তে আজও ঘুরপাক খাচ্ছে মুসলিম উম্মাহ।

২৫ হিজরির ১৫ থেকে ১৮ জিলকদ। এই সময়টাতে বিদ্রোহীরা নতুন পদক্ষেপ নিতে শুরু করে। বন্ধ করে দেয় উসমান রা.-এর খাবার ও পানীয়। এ কথা জানতে পেরে উসমান রা. ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন এবং তাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, আমি তোমাদেরকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, তোমরা কি জানো, রাসুল যখন মদিনায় এলেন, তখন মুসল্লিদের জন্য মসজিদের জায়গা সংকীর্ণ হয়ে গেল। তিনি বললেন, কে তার নিজস্ব সম্পদ থেকে এই জায়গাটি ক্রয় করে সকল মুসলিমের জন্য উন্মুক্ত করে দেবে? সে জান্নাতে এর চেয়ে উত্তম জায়গা লাভ করবে। তখন আমি নিজের সম্পদ থেকে সেই জমি ক্রয় করে মুসলিমদের জন্য ওয়াকফ করে দিয়েছি। অথচ তোমরা সেই মসজিদেই আমাকে দুই রাকাত নামাজ আদায় করতে দিচ্ছ না? আমি তোমাদের আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, তোমরা কি জানো, রাসুল যখন মদিনায় এলেন, তখন এখানে বিরে রুমা ব্যতীত অন্য কোনো মিষ্টি পানির কূপ ছিল না। রাসুল বলেছিলেন, কে তার নিজস্ব সম্পদ থেকে এই কূপ ক্রয় করে সকল মুসলিমের জন্য উন্মুক্ত করে দেবে? তাতে তার ততটুকু অধিকারই থাকবে, যতটুকু অন্যান্য মুসলিমের থাকবে এবং সে জান্নাতে এর চেয়ে উত্তম বিনিময় লাভ করবে। তখন আমি আমার ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে সেই কূপ ক্রয় করে মুসলিমদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছি। আর তোমরা সেই কূপ থেকে আমাকে পানি পান করতে দিচ্ছ না? তখন তিনি বললেন, তোমরা কি জানো, যেদিন মুসলিম বাহিনীর যুদ্ধের সরঞ্জাম ছিল না, সেদিন আমি যুদ্ধের সরঞ্জামের ব্যবস্থা করেছিলাম? তারা বলল, হ্যাঁ। উসমান রা. বললেন, হে আল্লাহ, আপনি সাক্ষী থাকুন। এ কথা বলে তিনি পুনরায় নিজের ঘরে চলে যান। ইমাম তিরমিজি রহ. ও নাসায়ি রহ. হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।¹⁶⁸

কোনো কোনো সাহাবি বিদ্রোহীদের এই নির্দয়তায় খুবই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। কিভাবে তারা মুসলিমদের সম্মানিত খলিফার খাবার এবং পানীয় বন্ধ করে দিতে পারে? তখন আলি রা. নিজের মশকে করে পানি নিয়ে খচ্চরের পিঠে উঠে বসেন এবং বিদ্রোহীদের কাতারের মাঝ দিয়ে ঢুকে এগোতে থাকেন। তারা আলি রা.-কে নানা কটু কথা শোনাতে থাকে। তিনি তাদের ধমক দিয়ে এ থেকে নিষেধ করতে থাকেন। এমনকি তিনি তাদের বলেন, আল্লাহর শপথ! নিশ্চয় পারসিক এবং রোমকরাও তাদের কোনো বন্দির সঙ্গে এমনটি করে না, যেমনটি তোমরা করছ। আল্লাহর শপথ! পারসিক এবং রোমকরাও তাদের বন্দিদের খাবার এবং পানীয় প্রদান করে।¹⁶৯

উম্মুল মুমিনিন উম্মে হাবিবা রা. তার কাপড়ে পানি নিয়ে লুকিয়ে রাখেন। এরপর খচ্চরের পিঠে চড়ে বের হন উসমান রা.-কে পানি পান করানোর জন্য। তখন বিদ্রোহীরা তাকে ঘিরে ধরে এবং বলে, আপনি কেন এসেছেন? তিনি বলেন, উসমান রা.-এর কাছে এতিম ও বিধবাদের জন্য বনু উমাইয়ার পক্ষ থেকে অসিয়তকৃত সম্পদ রয়েছে। তাই আমি তাকে এ কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাচ্ছি। বিদ্রোহীরা উম্মে হাবিবা রা.-এর এ কথাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে তাকে ধাক্কা দেয়। তখন পানি পড়ে যায়। তারা খচ্চরের লাগাম কেটে দেয়, ফলে উম্মে হাবিবা রা. খচ্চরের পিঠ থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হন। অপর এক বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি পড়ে যান এবং নিহত হওয়ার উপক্রম হন। যদি একদল লোক এসে তাকে উদ্ধার না করত তবে ওই নরাধমরা তাকে মেরেই ফেলত।¹⁷⁰

ওই সব পাপিষ্ঠদের মনে শয়তান শক্তভাবে বাসা বেঁধে নিয়েছিল। তাই তারা উসমান রা.-এর কাছে পানি পর্যন্তও পৌঁছতে দেয়নি। অবরোধের প্রথম দুদিন কেবল প্রতিবেশী আমর ইবনুল হিজাম রা.-এর ঘর থেকে তার কাছে পানি পৌঁছত। তৃতীয় দিন থেকে তারা সেই পথও বন্ধ করে দেয়। সেদিনটি ছিল ৩৫ হিজরির ১৭ জিলহজ। এ দিন বিদ্রোহীরা জানতে পারে যে, শাম, বসরা এবং কুফা থেকে আগত সৈন্যদল মদিনার কাছাকাছি চলে এসেছে। ফলে তারা তটস্থ হয়ে পড়ে। আগত সেনাবাহিনী ছিল বিশাল। মুআবিয়া রা. হাবিব ইবনে মাসলামা রা.- এর নেতৃত্বে পাঠিয়েছিলেন শামের সৈন্যদল। কুফার বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন কাকা ইবনে আমর তামিমি রা.। বসরার বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন মুজাশি ইবনে মাসউদ রা.। মিশর থেকে আগত বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন মুআবিয়া ইবনে হুবাইশ রহ.। এ সময় গভর্নরগণ নিজেদের শাসিত অঞ্চলেই অবস্থান করেন। যেন তাদের অনুপস্থিতিতে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়। বিদ্রোহীরা এ সংবাদ জানতে পেরে এই বাহিনী মদিনায় পৌঁছার পূর্বেই উসমান রা.-কে শেষ করে দেওয়ার দৃঢ়সংকল্প করে।

টিকাঃ
১৪২. তারিখু মদিনাতি দিমাশক, ১৪/৩৮৪; তারিখুত তাবারি, ৩/৪৮৫; আল-কামিল ফিত তারিখ, ২/২৮৭
১৪৩. তারিখ মাদিনাতি দিমাশক, ৩৯/৩১৯; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১৯৪; তারিখুল ইসলাম, ৩/১২০
১৪৪ তারিখু খলিফা ইবনি খাইয়াত, ১/১৬৯; তারিখুত তবারি, ৪/৩৫৪
১৪৫, তারিখুল ইসলাম, ৩/১২২
১৪৬. তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৩৯/৩২৪
১৪৭. তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৩৯/৩২৪; তারিখু খলিফা ইবনি খইয়াত, ১/১৬৯; তারিখুত তবারি, ৪/৩৫৫
১৪৮. তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৩৯/৩২৪
১৪৯. তারিখুত তবারি, ৪/৩৫১; তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৩৯/৩১৯
১৫০. তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৩৯/৩২৪; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২০৮
১৫১. আল-কামিল ফিত তারিখ, ২/৫৩১; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১৯৭; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১/১৯৩
১৫২. তারিখুত তবারি, ৪/৩৬৬; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১৯৬
১৫৩. তারিখুল ইসলাম, ৩/১২১; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১৯৭
১৫৪. সহিহ ইবনি হিব্বান, ৬৯২০; সহিহ ইবনি খুজাইমা, ২৪৮৭
১৫৫. সুনানুন নাসায়ি, ৩৬০৯; আল-মুসনাদ লিল ইমাম আহমাদ, ৪২০; সুনানুদ দারাকুতনি, ৪৪৪৩
১৫৬. তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৩৯/৩৯৬; তারিখু খলিফা ইবনি খয়্যাত, ১/১৭৩
১৫৭. শারহু উসুলি ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ, ۷/১৪৩
১৫৮. সহিহ বুখারি, ৩৬৮৯; সহিহ ইবনি হিব্বান, ৬৮৬৫
১৫৯. সহিহ বুখারি, ৩৬৯৩; সহিহ মুসলিম, ২৪০৩
১৬০. আল-ইকদুল ফারিদ, ৫/৫৩
১৬১. সুনানু ইবনি মাজাহ, ১১২; আল-মুসনাদ লিল ইমাম আহমাদ, ২৪৫৬৬; সুনানুত তিরমিজি, ৩৭০৫; আল-মুসতাদরাক লিল হাকিম, ৪৫৪৪
১৬২. সুনানুত তিরমিজি, ৩৭০৪
১৬৩. তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৩৯/৩৫৮; তারিখু খলিফা ইবনি খইয়াত, ১/১৭০
১৬৪. কিসাস: হত্যার বিনিময়ে হত্যা।-সম্পাদক
১৬৫. সুনানুন নাসায়ি, ৪০১৯; সুনানুত তিরমিজি, ২১৫৮; সুনানু আবি দাউদ, ৪৫০২; সুনানু ইবনি মাজাহ, ২৫৩৩
১৬৬. হাসান হাদিস: সহিহ হাদিসের মতোই নির্ভরযোগ্য হাদিসের একটি প্রকার এবং নবীজি থেকে প্রমাণিত। এ প্রকারের হাদিস দ্বারাও শরিয়তের সব ধরনের বিধিবিধান সাব্যস্ত হয়।-সম্পাদক
১৬৭. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২০২
১৬৮. সুনানুত তিরমিজি, ৩৭০৩; সুনানুন নাসায়ি, ৩৬০৮
১৬৯. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২০৯
১৭০. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২০৯

ফন্ট সাইজ
15px
17px