📄 উসমান রা. জানতেন কী ঘটবে তার সঙ্গে
নিঃসন্দেহে উসমান রা.-এর হত্যাকাণ্ড বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে। তবে তার আগে আমাদের জেনে রাখা উচিত যে, উসমান রা. আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছিলেন যে, তিনি এই ফিতনায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে যাচ্ছেন। কেননা এ ব্যাপারে রাসুল পূর্বেই সুসংবাদ প্রদান করেছিলেন।
সহিহ বুখারিতে কাতাদা রহ. থেকে আনাস ইবনে মালেক রা.-এর সূত্রে বর্ণিত আছে, একবার রাসুল উহুদ পাহাড়ে উঠলেন। তার সঙ্গে ছিলেন আবু বকর রা., উমর রা. ও উসমান রা.। তখন উহুদ পাহাড় কেঁপে উঠলে রাসুল বলেন,
উহুদ, তুমি স্থির হও। তোমার ওপরে আছে একজন নবী, একজন সিদ্দিক এবং দুইজন শহিদ। (৮২)
অপর হাদিসে আবু মুসা আশআরি রা.-এর সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসুল -এর সঙ্গে মদিনার কোনো এক বাগানে ছিলাম। তখন একজন লোক এসে দরজা খোলার অনুরোধ করলেন। রাসুল বললেন, খুলে দাও এবং তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও। তখন আমি দেখি তিনি আবু বকর রা.। আমি দরজা খুললাম এবং তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিলাম। তারপর আরেক ব্যক্তি দরজা খোলার অনুরোধ করলেন। রাসুল বললেন, খুলে দাও এবং তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও। তখন আমি দেখলাম তিনি উমর রা.। আমি দরজা খুলে দিলাম এবং তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিলাম। তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন। তারপর আরেক ব্যক্তি দরজা খোলার অনুরোধ করলেন। তখন রাসুল বললেন, দরজা খুলে দাও এবং তাকে আসন্ন বিপদ- সহ জান্নাতের সুসংবাদ দাও। আমি গিয়ে দেখি তিনি উসমান ইবনে আফফান রা.। আমি দরজা খুলে তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিলাম এবং রাসুল যা বলেছেন তার বর্ণনা দিলাম। তখন উসমান রা. আল্লাহর প্রশংসা করার পর বললেন, আল্লাহ সহায় হোন। (৮৩)
আবদুল্লাহ ইবনে আবু কায়স রহ.-এর সূত্রে বর্ণিত আছে যে, নোমান ইবনে বশির রা. তাকে বলেছেন, একবার মুআবিয়া রা. একটি চিঠি লিখে আমাকে দিয়ে আয়েশা রা.-এর কাছে পাঠালেন। আমি আয়েশা রা.-এর কাছে এসে তাকে মুআবিয়া রা.-এর চিঠিটি দিলাম। তখন আয়েশা রা. আমাকে বললেন, বৎস, তোমাকে কি রাসুল থেকে শোনা একটি হাদিস শোনাব? আমি বললাম, অবশ্যই।
তিনি বললেন, একদিন আমি এবং হাফসা রা. রাসুল -এর কাছে বসা ছিলাম। তখন রাসুল বললেন, যদি কোনো লোক এসে আমাদের সঙ্গে কথা বলত।
আমি বললাম, আপনার পক্ষ থেকে কি আবু বকর রা.-এর কাছে সংবাদ পাঠাব? এ কথা শুনে তিনি চুপ রইলেন। আবার বললেন, যদি কোনো লোক এসে আমাদের সঙ্গে বলত।
তখন হাফসা রা. বললেন, তাহলে আপনার পক্ষ থেকে উমর রা.-এর কাছে সংবাদ পাঠাই? এ কথা শুনেও তিনি চুপ রইলেন। একটু পর বললেন, না। এরপর একজন লোককে ডেকে গোপনে কিছু বললেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই উসমান রা. এসে উপস্থিত হলেন। তখন রাসুল তার মুখোমুখি হয়ে কথা বলা শুরু করলেন। আমি শুনেছি, রাসুল তাকে বলেছেন, হে উসমান, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাকে সম্মানের পোশাক পরিধান করাবেন। যদি তারা এ পোশাক খুলে ফেলতে বলে, তবে তুমি খুলবে না। এ কথা তিনবার বলেন। (৮৪) শায়খ আলবানি রহ. হাদিসটিকে সহিহ (৮৫) বলেছেন।
ইমাম তিরমিজি রহ. আবুল আশআস সানআনি রহ.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, একবার শামে কয়েকজন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন রাসুল-এর সাহাবি। সর্বশেষ মুররা ইবনে কাব নামক একজন সাহাবি দাঁড়িয়ে বললেন, আমি যদি রাসুল থেকে একটি হাদিস না শুনতাম তাহলে আজ দাঁড়াতাম না। রাসুল ফিতনার কথা উল্লেখ করেন এবং বলেন, শীঘ্রই তা সংঘটিত হবে। বর্ণনাকারী (আবুল আশআস সানআনি) বলেন, সে সময় এক ব্যক্তি কাপড় দিয়ে মুখমণ্ডল ঢেকে সেখান দিয়ে অতিক্রম করলে রাসুল (লোকটিকে ইঙ্গিত করে) বলেন, সে সময় এই লোকটি সৎপথে অটল থাকবে। বর্ণনাকারী (আবুল আশআস সানআনি) বলেন, আমি উঠে তার কাছে যাই; দেখি, তিনি উসমান ইবনে আফফান রা.। তারপর আমি তাকে নিয়ে রাসুল-এর কাছে এসে প্রশ্ন করলাম, ইনিই কি সেই (সৎপথে অটল) ব্যক্তি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। (৮৬)
ইমাম তিরমিজি রহ. হাদিসটিকে 'হাসান' 'সহিহ' (নির্ভরযোগ্য ও প্রমাণযোগ্য) আখ্যা দিয়েছেন। ইমাম ইবনে মাজাহ রহ.-ও হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। শায়খ আলবানি হাদিসটিকে সহিহ আখ্যা দিয়েছেন।
এসব হাদিসে পূর্ব থেকেই উসমান রা.-কে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছিল যে, এই ফিতনা শীঘ্রই সংঘটিত হবে। সে সময় উসমান রা. সঠিক পথে থাকবেন এবং হত্যাকাণ্ডের শিকার হবেন। ফলে তিনি প্রবেশ করবেন জান্নাতে। পরবর্তী ঘটনা পরিক্রমায় রাসুল-এর এসব ভবিষ্যদ্বাণী বেশ প্রভাব রেখেছিল। যা আমরা সামনে বিস্তারিত আলোচনার দেখতে পাব।
উসমান রা.-এর শাসনামলের অনেক উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। ইসলামি সাম্রাজ্যের ইতিহাসে তার শাসনামল ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। এসব কল্যাণ, কৃতিত্ব এবং অবদানসত্ত্বেও ঘটেছিল ফিতনার সেই মর্মান্তিক ঘটনা। তার খেলাফতের সময়ে মুসলিমরা সচ্ছলতায় দিন কাটাচ্ছিল, রিজিকের কোনো অভাব ছিল না। খলিফা নিজেই ডেকে বলতেন, তোমাদের ভাতা সংগ্রহ করো। মোটকথা, তার শাসনামল ছিল সচ্ছলতার স্বর্ণযুগ। এতৎসত্ত্বেও ফিতনা সংঘটিত হয়েছিল এবং তাকে বরণ করতে হয়েছিল নিদারুণ পরিণতি।
টিকাঃ
৮২. সহিহ বুখারি, ৩৬৭৫; সুনানু আবি দাউদ, ৪৬৫১; সুনানুত তিরমিজি, ৩৬৯৭
৮৩. সহিহ বুখারি, ৩৬৯৩; সুনানুত তিরমিজি, ৩৭১০; সহিহ ইবনি হিব্বান, ৬৯১০
৮৪. আল-মুসনাদ লিল ইমাম আহমাদ, ২৫১৬২; সুনানুত তিরমিজি, ৩৭০৫; সুনানু ইবনি মাজাহ, ১১২
৮৫. সহিহ হাদিস : সহিহ হাদিস নির্ভরযোগ্য হাদিসের একটি প্রকার। এ প্রকারের হাদিস নির্ভরযোগ্য সূত্রে নবীজি থেকে প্রমাণিত। এ ধরনের হাদিস দ্বারা শরিয়তের বিধিবিধান সাব্যস্ত হয়। বিস্তারিত দেখুন, তাদরিবুর রাবি, ১/১৭১-সম্পাদক
৮৬. সুনানুত তিরমিজি, ৩৭০৪