📘 ফিতনার ইতিহাস 📄 উসমান রা.-এর খেলাফতকালের অবদান ও ঘটনা

📄 উসমান রা.-এর খেলাফতকালের অবদান ও ঘটনা


উমর রা.-এর মৃত্যুর পর খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করে উসমান রা. পারস্য বিজয় অভিযান সম্পন্ন করার জন্য সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন।
কাম্পিয়ান সাগরের পূর্বে অবস্থিত রায় অঞ্চলে প্রেরণ করেন একটি বাহিনী। এ বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন প্রখ্যাত সাহাবি আবু মুসা আশআরি রা.। এ অভিযানে তিনি বিজয় লাভ করেন। এরপর রোমকদের বেশ কয়েকটি কেল্লা এবং দুর্গে আক্রমণ করেন।
এ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার একটি হচ্ছে উসমান রা. ২৪ হিজরিতে সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা.-কে কুফার গভর্নর হিসাবে নিয়োগ দেন। পূর্ব থেকেই এ শহর ছিল বিশৃঙ্খলাপূর্ণ। সবসময় তারা শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এসেছে। ২৫ হিজরিতে তারা নতুন করে সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা.-এর বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ ঘোষণা করে। উসমান রা. সাদ রা.-কে সরিয়ে ওয়ালিদ ইবনে উকবা ইবনে আবু মুইত রা.-কে তার স্থলাভিষিক্ত করেন।
২৬ হিজরিতে ওয়ালিদ ইবনে উকবা রা.-এর হাতেই বিজিত হয় কাস্পিয়ান সাগরের পশ্চিমে অবস্থিত আজারবাইজান এবং আর্মেনিয়া অঞ্চল।
এ সময় (২৬ হিজরিতে) উসমান রা. মসজিদে নববির সম্প্রসারণের কাজে হাত দেন।
এ বছরই (২৬ হিজরিতে) বিজিত হয় পারস্যের পূর্বাঞ্চলীয় সাবুর রাজ্য। যা ছিল ঘনবসতিপূর্ণ সমৃদ্ধশীল একটি ধনী রাজ্য। এ অঞ্চলের খারাজ (ট্যাক্স) ছিল ৩৩ লক্ষ দিরহাম। মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ব্যাপকভাবে কল্যাণের বাতাস বইতে শুরু করে এ সময়।
২৭ হিজরিতে বিজিত হয় পারস্যের আরজান (৭৭) অঞ্চল। মিশরের দায়িত্ব থেকে বরখাস্ত করা হয় আমর ইবনুল আস রা.-কে। তিনি উমর রা.-এর পক্ষ থেকে সেখানকার গভর্নর নিযুক্ত হয়েছিলেন। তাকে বরখাস্ত করার কারণ ছিল, তিনি মিশরের আহলে কিতাবদের জিযয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছিলেন এবং তাতেই সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। এ বছর বিজয় অভিযান সম্প্রসারিত হয় বুরকা শহর পর্যন্ত। যা বর্তমানে লিবিয়ার অন্তর্গত। মিশরের নতুন গভর্নর নিয়োগ করা হয় আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারহ রা.-কে। তিনি পুনরায় আমর ইবনুল আস রা.-এর শাসনকালের শুরুরদিকের মতো জিযয়া চালু করেন। এদিকে তিনি মিশর থেকে পশ্চিম অভিমুখে বিজয় অভিযান শুরু করেন এবং বর্তমান তিউনিসিয়া অভিমুখে বাহিনী প্রেরণ করেন। এ বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন উকবা ইবনে নাফে রা.।
২৮ হিজরিতে বিজিত হয় সাইপ্রাস অঞ্চল। তৎকালীন ইসলামি সাম্রাজ্যের জন্য এ ছিল বিরাট অগ্রগতি। কারণ, ইতিপূর্বে মুসলিমদের কোনো নৌবহর ছিল না। উমর ইবনুল খাত্তাব রা. নৌযুদ্ধে সম্মত ছিলেন না। তিনি মুসলিমদের জন্য নৌযুদ্ধকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করতেন। তবে মুআবিয়া রা. এ ব্যাপারে বেশ জোর দেন এবং উসমান রা.-এর কাছে বারংবার নৌবাহিনী গঠনের প্রস্তাব পেশ করেন। অবশেষে উসমান রা. তার প্রস্তাব মেনে নেন। ইসলামি নৌবাহিনীর প্রথম অভিযান ছিল সাইপ্রাস অঞ্চলে। এই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রা. এবং মিশরের গভর্নর আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারহ রা.। তারা দুজন সাইপ্রাস অবরোধ করেন। অবশেষে তা বিজিত হয়। এ সময় আফ্রিকা বিজয় সম্পন্ন হয় এবং পূর্ব ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে ইসলামি সাম্রাজ্যের স্তম্ভ শক্তিশালী হয়।
২৯ হিজরিতে পারস্যের এস্তাখার নামক অঞ্চল বিদ্রোহ করে মুসলিমদের সঙ্গে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করে। উসমান রা. তখন এ শহর অভিমুখে বাহিনী প্রেরণ করেন এবং তা পুনরায় বিজিত হয়।
এ বছরই (২৯ হিজরিতে) দ্বিতীয়বারের মতো মসজিদে নববিকে সম্প্রসারণ করা হয়।
৩০ হিজরিতে বিজিত হয় খোরাসান, নিশাপুর এবং কোস শহর। ফলে ইসলামি সাম্রাজ্যের ট্যাক্স বৃদ্ধি পায় ব্যাপক হারে। নিজেদের চিরায়ত অভ্যাস অনুযায়ী কুফাবাসী আবার বিদ্রোহ ঘোষণা করে বসে ওয়ালিদ ইবনে উকবা রা.-এর বিরুদ্ধে। ফলে সেখান থেকে তাকে সরিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয় সাইদ ইবনুল আস রা.-কে।
হাসান বসরি রহ. ছিলেন সেই সময়ের প্রসিদ্ধ একজন তাবেয়ি। তিনি উসমান রা.-এর শাসনামলের এ সময় সম্পর্কে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, উসমান রা.-এর ওপর বিদ্বেষীরা কী কারণে ক্ষুব্ধ হয়েছে আমি তা বুঝতে পারি। তার সময়ে এমন দিন খুব কমই ছিল, যেদিন লোকেরা ধনসম্পদ ভাগাভাগি করে নেয়নি। তিনি বলতেন, হে মুসলিমগণ, তোমাদের ভাতা সংগ্রহ করো। এরপর তারা সেখান থেকে পূর্ণরূপে গ্রহণ করতেন। তিনি পুনরায় বলতেন, তোমাদের ভাতা সংগ্রহ করো। তারা সেখান থেকেও পূর্ণরূপে গ্রহণ করতেন। তিনি বলতেন, ঘি ও মধু গ্রহণ করুন। এভাবে মুসলিমদের ভাতা অব্যাহত ছিল। শত্রুরা ছিল দূরে। মুসলিমদের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল সুন্দর। কল্যাণের প্রাচুর্য ছিল। কোনো মুসলিম অপর মুসলিম ভাইকে ভয় পেত না। তাদের সকলের মধ্যেই ছিল ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। (৭৮) তখন মুসলিমরা ছিলেন খুবই সচ্ছল। ইতিপূর্বে কখনো তারা এতটা সচ্ছল ছিলেন না।
এ সময় উসমান রা. হাত দেন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজে। ব্রতী হন এক মলাটে কুরআন সংরক্ষণের প্রতি। এর কারণ, তখন পুরো শাম এবং রোম সাম্রাজ্য বিজয় অভিযানে শাম ও ইরাকের মুসলিমরা যোগ দিয়েছিলেন। সেসব অভিযানে অংশ নেওয়া হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান রা. লোকেদের কুরআন তেলাওয়াতে ব্যাপক পার্থক্য দেখতে পান। প্রত্যেক অঞ্চলের মানুষ কুরআন তেলাওয়াত করত ভিন্ন ভিন্ন কেরাত অনুযায়ী। শাম তথা বৃহত্তর সিরিয়ার অধিবাসীরা তেলাওয়াত করত মিকদাদ ইবনে আমর রা. এবং আবু দারদা রা.-এর কেরাত অনুযায়ী। ইরাকের অধিবাসীরা তেলাওয়াত করত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এবং উবাই ইবনে কাব রা.-এর কেরাত অনুযায়ী। সে সময় কিছু অজ্ঞ—যারা জানত না যে কুরআন সাত হরফে (৭৯) অবতীর্ণ হয়েছে—তারা একে অপরের কেরাতকে ভুল আখ্যা দিতে শুরু করে। এমনকি ব্যাপারটা একে অপরকে কাফের সাব্যস্ত করা পর্যন্ত গড়িয়ে যায়।
এ অবস্থা দেখে হুজাইফা রা. উসমান রা.-এর কাছে এসে বলেন, মুসলিম উম্মাহর লাগাম টেনে ধরুন।
এ সময় উসমান রা. যায়দ ইবনে সাবেত রা.-কে তলব করেন। তিনি আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর আমলে কুরআন সংকলনের কাজ করেছিলেন। উসমান রা. তাকে তার সংকলিত কুরআনের পাণ্ডুলিপিগুলো একত্র করতে বলেন। এগুলো প্রথমে ছিল আবু বকর রা.-এর কাছে। এরপর আসে উমর রা.-এর কাছে। তিনি ইন্তেকালের সময় তার মেয়ে উম্মুল মুমিনিন হাফসা রা.-এর কাছে এই পাণ্ডুলিপিগুলো রেখে যান। যায়দ ইবনে সাবেত রা. তখনই হাফসা রা.-এর কাছ থেকে পাণ্ডুলিপিগুলো নিয়ে আসেন।
সাইদ ইবনুল আস উমাবি রা., যায়দ ইবনে সাবেত আনসারি রা., আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের ইবনুল আওয়াম আসাদি রা. এবং আবদুর রহমান ইবনে হারেস ইবনে হিশাম মাখযুমি রহ. এই চারজনকে উসমান রা. নিয়োগ দেন। আবু বকর রা.-এর যুগে যায়দ ইবনে সাবেত রা. যে কেরাতে কুরআন একত্র করেছেন সেই কেরাতেই কুরআনের একটি পাণ্ডুলিপি লিপিবদ্ধ করার আদেশ দেন। সুতরাং উসমান রা. নতুন কোনো কেরাত সংযুক্ত করেননি। বরং ইতিপূর্বে আবু বকর রা.-এর সময়ে যেভাবে সংকলন করা হয়েছিল সেগুলোকেই তিনি নতুনভাবে সংকলন করেন।
সাইদ ইবনুল আস রা. তেলাওয়াত করতেন, যায়দ ইবনে সাবেত রা. তা শুনে শুনে লিখতেন আর আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা. এবং আবদুর রহমান ইবনে হারিস রহ. তখন উপস্থিত থেকে যাবতীয় বিষয়ের তদারকি করতেন। এভাবেই পূর্ণ কুরআন লিপিবদ্ধের কাজ সম্পন্ন হয় এবং এর সাতটি কপি করা হয়।
অন্যান্য সাহাবিগণের কাছে যেসব পাণ্ডুলিপি ছিল (৮০) এবং যেগুলোর বিন্যাস রাসুল -এর মৃত্যুর কয়েক মাস পূর্বে দশম হিজরির রমজান মাসে যেভাবে তিনি ও জিবরাইল আ. একে অপরকে কুরআন শুনিয়েছিলেন সে বিন্যাসের চেয়ে ভিন্ন ছিল, সেগুলোকে উসমান রা. পুড়িয়ে ফেলেন। এটি ছিল খুবই কষ্টকর একটি কাজ।
উসমান রা. যে কুরআন সংকলন করেছিলেন সেগুলোর একেকটি পাণ্ডুলিপির আয়তন ছিল ৮০×৬০ সেন্টিমিটার। একটি পাণ্ডুলিপি বহন করতে একদল লোকের প্রয়োজন হতো। উসমান রা. সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে একটি করে কপি পাঠিয়ে দেন। মদিনা মুনাওয়ারায় রাখেন এক কপি। এক কপি পাঠান মক্কায়। তৃতীয় কপি মিশরে, চতুর্থ কপি শামে, পঞ্চম কপি কুফায়, ষষ্ঠ কপি বসরায় এবং সপ্তম কপি পাঠান ইয়ামেনে।
এভাবেই সকল মুসলিমের জন্য এক কেরাতে কুরআন সংকলন করা হয়। কুরআনের এই সংকলিত পাণ্ডুলিপিকে বলা হয় মুসহাফে উসমানি। যদিও উসমান রা. তাতে একটি হরফও (বর্ণও) লেখেননি; বরং তিনি তা সংকলন এবং পাণ্ডুলিপি আকারে তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন মাত্র। (৮১)
• ৩১ হিজরিতে মুসলিম বাহিনী এক ঐতিহাসিক নৌ-অভিযানে অংশগ্রহণ করে। যা যাতুস সাওয়ারি নামে প্রসিদ্ধ।
• ৩৪ হিজরিতে অনেক প্রসিদ্ধ সাহাবি ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ফিতনায় জড়িয়ে পড়ার অনিষ্ট থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, আব্বাস ইবনে আবদিল মুত্তালিব রা., আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা., আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা., আবু দারদা রা., আবু যর রা. এবং যায়দ ইবনে আবদি রাব্বিহ রা. প্রমুখ। শেষোক্ত সাহাবি স্বপ্নে আজানের বাক্যগুলো শুনেছিলেন। রাসুল -এর কাছে গিয়ে তার স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করেছিলেন। তখন রাসুল -ও তার সঙ্গে একমত হয়েছিলেন।
• উসমান রা.-এর শাসনামলে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের কিছু অংশও বিজিত হয়। তবে মুআবিয়া রা.-এর শাসনামলে এসব অঞ্চল পরিপূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আসে।
• ৩৩ হিজরিতে বিজিত হয় হাবাশা অঞ্চল অর্থাৎ সুদানের কিছু অংশ।
• ৩৪ হিজরিতে কুফাবাসী পুনরায় বিদ্রোহ ঘোষণা করে গভর্নর সাইদ ইবনুল আস রা.-এর বিরুদ্ধে। তখন কুফিবাসীদের আগ্রহে সেখানে নিয়োগ দেওয়া হয় আবু মুসা আশআরি রা.-কে। উসমান রা. তাদের আগ্রহের সঙ্গে একমত হয়েছিলেন। এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ।
• ৩৪ হিজরিতেই ফিতনার বড় বড় পর্বগুলো (ক্রমেই) স্পষ্ট আকার ধারণ করতে শুরু করে। এর প্রেক্ষিতেই ৩৫ হিজরিতে উসমান রা. পান করেন শাহাদাতের অমীয় সুধা। এর মাধ্যমেই সমাপ্ত হয় উসমান রা.-এর বর্ণাঢ্য জীবন। যে জীবন তিনি ব্যয় করেছিলেন আল্লাহ তাআলার প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে। যার কারণে জীবদ্দশাতেই রাসুল তাকে দিয়েছিলেন জান্নাতের সুসংবাদ।

টিকাঃ
৭৭. খ্রিষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীতে এ শহর ধ্বংস হয়ে যায়। এ অঞ্চলের বর্তমান নাম বেবাহ। যা ইরানের খুজেস্তান প্রদেশে অবস্থিত।-অনুবাদক
৭৮. আল-ইসতিয়াব, ৩/১০৪১; তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৩৯/২২৭; তাহযিবুল কামাল, ১৯/৪৫১
৭৯. সাত হরফ: এর ব্যাখ্যা নিয়ে মুফাসসিরগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। আবু উবাইদ রহ. প্রমুখ মুফাসসিরের মতে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে সাত গোত্রের সাতটি ভাষা। কোনো কোনো মুফাসসিরের মতে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রসিদ্ধ সাত কেরাত। এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসবে।
৮০. সাহাবিগণের একক সূত্রে বর্ণিত কুরআনের আয়াত বা সাহাবিগণকর্তৃক কুরআনের ব্যাখ্যামূলক কথা সম্বলিত কপিগুলোই মূলত পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। মানাহিলুল ইরফান, ১/২৬০-২৬১; (শামেলা)-সম্পাদক
৮১. তারিখু ইবনি খালদুন, ২/৫৮৩

📘 ফিতনার ইতিহাস 📄 উসমান রা. জানতেন কী ঘটবে তার সঙ্গে

📄 উসমান রা. জানতেন কী ঘটবে তার সঙ্গে


নিঃসন্দেহে উসমান রা.-এর হত্যাকাণ্ড বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে। তবে তার আগে আমাদের জেনে রাখা উচিত যে, উসমান রা. আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছিলেন যে, তিনি এই ফিতনায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে যাচ্ছেন। কেননা এ ব্যাপারে রাসুল পূর্বেই সুসংবাদ প্রদান করেছিলেন।
সহিহ বুখারিতে কাতাদা রহ. থেকে আনাস ইবনে মালেক রা.-এর সূত্রে বর্ণিত আছে, একবার রাসুল উহুদ পাহাড়ে উঠলেন। তার সঙ্গে ছিলেন আবু বকর রা., উমর রা. ও উসমান রা.। তখন উহুদ পাহাড় কেঁপে উঠলে রাসুল বলেন,
উহুদ, তুমি স্থির হও। তোমার ওপরে আছে একজন নবী, একজন সিদ্দিক এবং দুইজন শহিদ। (৮২)
অপর হাদিসে আবু মুসা আশআরি রা.-এর সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসুল -এর সঙ্গে মদিনার কোনো এক বাগানে ছিলাম। তখন একজন লোক এসে দরজা খোলার অনুরোধ করলেন। রাসুল বললেন, খুলে দাও এবং তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও। তখন আমি দেখি তিনি আবু বকর রা.। আমি দরজা খুললাম এবং তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিলাম। তারপর আরেক ব্যক্তি দরজা খোলার অনুরোধ করলেন। রাসুল বললেন, খুলে দাও এবং তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও। তখন আমি দেখলাম তিনি উমর রা.। আমি দরজা খুলে দিলাম এবং তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিলাম। তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন। তারপর আরেক ব্যক্তি দরজা খোলার অনুরোধ করলেন। তখন রাসুল বললেন, দরজা খুলে দাও এবং তাকে আসন্ন বিপদ- সহ জান্নাতের সুসংবাদ দাও। আমি গিয়ে দেখি তিনি উসমান ইবনে আফফান রা.। আমি দরজা খুলে তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিলাম এবং রাসুল যা বলেছেন তার বর্ণনা দিলাম। তখন উসমান রা. আল্লাহর প্রশংসা করার পর বললেন, আল্লাহ সহায় হোন। (৮৩)
আবদুল্লাহ ইবনে আবু কায়স রহ.-এর সূত্রে বর্ণিত আছে যে, নোমান ইবনে বশির রা. তাকে বলেছেন, একবার মুআবিয়া রা. একটি চিঠি লিখে আমাকে দিয়ে আয়েশা রা.-এর কাছে পাঠালেন। আমি আয়েশা রা.-এর কাছে এসে তাকে মুআবিয়া রা.-এর চিঠিটি দিলাম। তখন আয়েশা রা. আমাকে বললেন, বৎস, তোমাকে কি রাসুল থেকে শোনা একটি হাদিস শোনাব? আমি বললাম, অবশ্যই।
তিনি বললেন, একদিন আমি এবং হাফসা রা. রাসুল -এর কাছে বসা ছিলাম। তখন রাসুল বললেন, যদি কোনো লোক এসে আমাদের সঙ্গে কথা বলত।
আমি বললাম, আপনার পক্ষ থেকে কি আবু বকর রা.-এর কাছে সংবাদ পাঠাব? এ কথা শুনে তিনি চুপ রইলেন। আবার বললেন, যদি কোনো লোক এসে আমাদের সঙ্গে বলত।
তখন হাফসা রা. বললেন, তাহলে আপনার পক্ষ থেকে উমর রা.-এর কাছে সংবাদ পাঠাই? এ কথা শুনেও তিনি চুপ রইলেন। একটু পর বললেন, না। এরপর একজন লোককে ডেকে গোপনে কিছু বললেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই উসমান রা. এসে উপস্থিত হলেন। তখন রাসুল তার মুখোমুখি হয়ে কথা বলা শুরু করলেন। আমি শুনেছি, রাসুল তাকে বলেছেন, হে উসমান, নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাকে সম্মানের পোশাক পরিধান করাবেন। যদি তারা এ পোশাক খুলে ফেলতে বলে, তবে তুমি খুলবে না। এ কথা তিনবার বলেন। (৮৪) শায়খ আলবানি রহ. হাদিসটিকে সহিহ (৮৫) বলেছেন।
ইমাম তিরমিজি রহ. আবুল আশআস সানআনি রহ.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, একবার শামে কয়েকজন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন রাসুল-এর সাহাবি। সর্বশেষ মুররা ইবনে কাব নামক একজন সাহাবি দাঁড়িয়ে বললেন, আমি যদি রাসুল থেকে একটি হাদিস না শুনতাম তাহলে আজ দাঁড়াতাম না। রাসুল ফিতনার কথা উল্লেখ করেন এবং বলেন, শীঘ্রই তা সংঘটিত হবে। বর্ণনাকারী (আবুল আশআস সানআনি) বলেন, সে সময় এক ব্যক্তি কাপড় দিয়ে মুখমণ্ডল ঢেকে সেখান দিয়ে অতিক্রম করলে রাসুল (লোকটিকে ইঙ্গিত করে) বলেন, সে সময় এই লোকটি সৎপথে অটল থাকবে। বর্ণনাকারী (আবুল আশআস সানআনি) বলেন, আমি উঠে তার কাছে যাই; দেখি, তিনি উসমান ইবনে আফফান রা.। তারপর আমি তাকে নিয়ে রাসুল-এর কাছে এসে প্রশ্ন করলাম, ইনিই কি সেই (সৎপথে অটল) ব্যক্তি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। (৮৬)
ইমাম তিরমিজি রহ. হাদিসটিকে 'হাসান' 'সহিহ' (নির্ভরযোগ্য ও প্রমাণযোগ্য) আখ্যা দিয়েছেন। ইমাম ইবনে মাজাহ রহ.-ও হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। শায়খ আলবানি হাদিসটিকে সহিহ আখ্যা দিয়েছেন।
এসব হাদিসে পূর্ব থেকেই উসমান রা.-কে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছিল যে, এই ফিতনা শীঘ্রই সংঘটিত হবে। সে সময় উসমান রা. সঠিক পথে থাকবেন এবং হত্যাকাণ্ডের শিকার হবেন। ফলে তিনি প্রবেশ করবেন জান্নাতে। পরবর্তী ঘটনা পরিক্রমায় রাসুল-এর এসব ভবিষ্যদ্বাণী বেশ প্রভাব রেখেছিল। যা আমরা সামনে বিস্তারিত আলোচনার দেখতে পাব।
উসমান রা.-এর শাসনামলের অনেক উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। ইসলামি সাম্রাজ্যের ইতিহাসে তার শাসনামল ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। এসব কল্যাণ, কৃতিত্ব এবং অবদানসত্ত্বেও ঘটেছিল ফিতনার সেই মর্মান্তিক ঘটনা। তার খেলাফতের সময়ে মুসলিমরা সচ্ছলতায় দিন কাটাচ্ছিল, রিজিকের কোনো অভাব ছিল না। খলিফা নিজেই ডেকে বলতেন, তোমাদের ভাতা সংগ্রহ করো। মোটকথা, তার শাসনামল ছিল সচ্ছলতার স্বর্ণযুগ। এতৎসত্ত্বেও ফিতনা সংঘটিত হয়েছিল এবং তাকে বরণ করতে হয়েছিল নিদারুণ পরিণতি।

টিকাঃ
৮২. সহিহ বুখারি, ৩৬৭৫; সুনানু আবি দাউদ, ৪৬৫১; সুনানুত তিরমিজি, ৩৬৯৭
৮৩. সহিহ বুখারি, ৩৬৯৩; সুনানুত তিরমিজি, ৩৭১০; সহিহ ইবনি হিব্বান, ৬৯১০
৮৪. আল-মুসনাদ লিল ইমাম আহমাদ, ২৫১৬২; সুনানুত তিরমিজি, ৩৭০৫; সুনানু ইবনি মাজাহ, ১১২
৮৫. সহিহ হাদিস : সহিহ হাদিস নির্ভরযোগ্য হাদিসের একটি প্রকার। এ প্রকারের হাদিস নির্ভরযোগ্য সূত্রে নবীজি থেকে প্রমাণিত। এ ধরনের হাদিস দ্বারা শরিয়তের বিধিবিধান সাব্যস্ত হয়। বিস্তারিত দেখুন, তাদরিবুর রাবি, ১/১৭১-সম্পাদক
৮৬. সুনানুত তিরমিজি, ৩৭০৪

ফন্ট সাইজ
15px
17px