📄 ফিতনাবিষয়ক নির্ভরযোগ্য আরও কিছু গ্রন্থ
ফিতনা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে এমন কিছু নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ নিম্নে উল্লেখ করা হলো—
১. কাজি আবু বকর ইবনুল আরাবি রহ. রচিত আল-আওয়াসিম মিনাল কাওয়াসিম। সাহাবিগণের সমালোচকদের জবাবে লিখিত উৎকৃষ্ট গ্রন্থাবলির মধ্যে এটি অন্যতম। তবে এটিকে যেন আল-আওয়াসিম ওয়াল কাওয়াসিম গ্রন্থ মনে না করা হয়। সেটি ভিন্ন গ্রন্থ। কাজি আবু বকর ইবনুল আরাবি পঞ্চম হিজরি শতাব্দীর শেষভাগে আন্দালুসের ইশবেলিয়া তথা বর্তমান স্পেনের সেভিলায় জন্মগ্রহণ করেন। পাঁচ বছর বয়সেই তিনি কুরআন হিফজ সমাপ্ত করেন। ১৬ বছর বয়সে কুরআনের ১০ কেরাত আয়ত্ব করেন। এরপর ইলম অন্বেষণের উদ্দেশ্যে একের পর এক অঞ্চল ভ্রমণ করতে থাকেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি আলজেরিয়া, মিশর, হিজায, শাম এবং ফিলিস্তিন প্রভৃতি অঞ্চলে সফর করেন। এই সময়ে তিনি অনেক প্রসিদ্ধ আলেমগণের সান্নিধ্য লাভ করেন এবং তাদের কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করেন। এরপর রচনা এবং লেখালেখিতে মনোযোগী হওয়ার জন্য ফিরে আসেন জন্মভূমিতে। ৩৫টিরও বেশি গ্রন্থ তার হাতে রচিত হয়েছে। তন্মধ্যে একটি তাফসিরুল কুরআন বিষয়ে লিখিত আনওয়ারুল ফজর ফি তাফসিরিল কুরআন। এটি ছিল ১ লক্ষ ৬০ হাজার পৃষ্ঠায় লিখিত। এই গ্রন্থটি বহন করা হতো উটের পিঠে করে। পঞ্চম হিজরি শতাব্দীর একেবারে শেষদিকে তিনি এই গ্রন্থ রচনা করেন। একাধিক স্থানে এই গ্রন্থকে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। অবশেষে অষ্টম হিজরিতে এই অমূল্য গ্রন্থটি বাদশাহর হস্তগত হয়। এরপর গ্রন্থটির আর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। কাজি আবু বকর ইবনুল আরাবি দীর্ঘ ২০ বছর সময় নিয়ে এই গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন। তার লিখিত সবচেয়ে চমৎকার গ্রন্থগুলোর একটি হচ্ছে আল-আওয়াসিম মিনাল কাওয়াসিম গ্রন্থটি। সামসময়িক প্রসিদ্ধ আলেম মুহিব্বুদ্দিন আল-খতিব রহ. এই গ্রন্থে টীকা সংযোজন করেছেন। আলোচ্য গ্রন্থের সঙ্গে তিনি আরও অনেক মূল্যবান আলোচনা সংযোজন করেছেন। যা পাঠকদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে তুলবে।
২. ইবনে তাইমিয়া রহ. রচিত মিনহাজুস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যা। প্রকৃতপক্ষেই তিনি শাইখুল ইসলাম উপাধির উপযুক্ত। তিনি ছিলেন বিদআতিদের বিরুদ্ধে সুন্নাহর উন্মুক্ত তরবারি। শিয়া ও কদরিয়্যা³⁸ আকিদা এবং ফিতনার ঘটনাবলি নিয়ে যারা জানতে চায়, তাদের জন্য এই গ্রন্থের বিকল্প নেই। গ্রন্থটি চার খণ্ডে লিখিত। সাহাবিগণের ওপর আরোপিত প্রশ্ন এবং অপবাদের জবাবে তিনি গ্রন্থটিতে মানতেক তথা তর্কশাস্ত্র এবং যুক্তির ব্যবহারও করেছেন।
৩. আল্লামা ইবনে কাসির রহ. রচিত আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া। এটিকে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য এবং উত্তম গ্রন্থসমূহের একটি বিবেচনা করা হয়। প্রত্যেক মুসলিমের জন্যই আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া সংগ্রহে রাখা উচিত। তবে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, ইবনে কাসির রহ. কিছু কিছু স্থানে ওয়াকিদি থেকে বর্ণনা করেছেন। এসব বর্ণনা নির্ভরযোগ্য নয়। তবে ইবনে কাসির রহ. বর্ণিত অনেক গ্রহণযোগ্য বর্ণনাও রয়েছে। তিনি ইমাম তবারি রহ. প্রণীত তারিখুল উমামি ওয়াল মুলুক থেকেও অনেক বর্ণনা এনেছেন।
৪. ইহসান ইলাহি জহির রচিত আশ-শিয়াতু ওয়াত তাশাইয়ু। এটি শিয়া এবং তাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে আলোকপাতকারী সবচেয়ে সুন্দর গ্রন্থের একটি। সাম্প্রতিক সময়ে রহস্যজনকভাবে লেখককে হত্যা করা হয়েছে। তার রচিত এই গ্রন্থটি শিয়া এবং শিয়া মতাদর্শ সম্পর্কে রচিত সর্বোত্তম গ্রন্থগুলোর একটি।
৫. আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতি রহ. রচিত তারিখুল খুলাফা। এ গ্রন্থে প্রত্যেক খলিফার ইতিহাস বিবৃত হয়েছে। যদিও ফিতনাসংক্রান্ত ঘটনার বর্ণনায় তিনি খুব বেশি সতর্কতা অবলম্বন করেননি। ইমাম সুয়ুতি ৯১১ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন।
৬. মোস্তফা নাজিব রচিত হুমাতুল ইসলাম। এটি সংক্ষিপ্ত হলেও খুবই মূল্যবান একটি গ্রন্থ। এ গ্রন্থের অধিকাংশই নির্ভরযোগ্য। গ্রন্থটির বিভিন্ন স্থানে লেখকের পক্ষ থেকে যে টীকা যুক্ত করা হয়েছে তাও খুব চমৎকার।
৭. আল্লামা ইবনে কাসির রহ. রচিত ইসতিশহাদুল হুসাইন।
৮. শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. রচিত রাঅসুল হুসাইন।
৯. নাসিরুদ্দিন শাহ রচিত আল-আকাইদুশ শিইয়্যা।
১০. সাইদ ইসমাইল রচিত হাকিকতুল খিলাফ বাইনা উলামায়িশ শিয়া ওয়া জুমহুরি উলামায়িল মুসলিমিন।
১১. আল্লামা মুহিব্বুদ্দিন আল-খতিব রহ. রচিত আল-উসুসুল্লাতি কামা আলাইহা দ্বীনুশ শিয়াতিল ইমামিয়্যাতিল ইসনা আশারিয়্যা।
আল্লামা মুহিব্বুদ্দিন আল-খতিব রহ. তার জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় করেছেন শিয়া এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর মধ্যে সামঞ্জস্যতার দাবিদারদের অপনোদন এবং তাদের নিয়ে গবেষণা করে। তিনি বলেন, আহলুস সুন্নাহ এবং শিয়াদের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নেই। শিয়া মতবাদ ইসলাম ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। শিয়াদের গ্রন্থসমূহে তাদের আকিদাগুলো অধ্যয়ন করলে এ বিষয়টি পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে যাবে।
এই আকিদাগুলো আমাদের ভালোভাবে বোঝা এবং আয়ত্ব করা উচিত। ফিতনাসংক্রান্ত এই স্পর্শকাতর বিষয়ে অধ্যয়ন করার সময় আমরা যেসব গ্রন্থ অধ্যয়ন করব, কিছুতেই কোনো লেখককে ত্রুটিমুক্ত মনে করব না। কারণ, শিয়ারা লোকদের বুঝাতে চায় যে, কেবল আবু বকর রা. এবং উমর রা.-এর সময়েই ইসলামি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছিল। এরপর ইসলামি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি। তাদের দাবি অনুযায়ী এরপর থেকে ইসলাম রক্তারক্তি এবং হানাহানির মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে। তাই ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার কোনো প্রয়োজন নেই। নয়তো আমাদের পরিণতি, তাদের পরিণতির মতোই হবে। তাদের দাবি অনুযায়ী, রাসুল ﷺ থেকে সরাসরি দীক্ষা গ্রহণকারী সাহাবিগণই যদি এমন সব অন্যায়কর্ম করে থাকেন, তাহলে অন্যরা কী করবে তা বলার অপেক্ষা রাখা না। এই কথাটি প্রতিষ্ঠিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। এ উদ্দেশ্যেই তারা এসব বানোয়াট এবং মিথ্যা বর্ণনা ছড়িয়ে থাকে।
অতএব, ফিতনাসংক্রান্ত ঘটনা পাঠ করার সময় আপনার জন্য উচিত হবে এ ঘটনা উল্লেখকারী উৎস এবং রেফারেন্সগুলো খতিয়ে দেখা এবং সেগুলোর বিশুদ্ধতা ও দুর্বলতা যাচাই করে নেওয়া।
টিকাঃ
৩৮. কদরিয়্যা: তাকদিরকে অস্বীকারকারী একটি কাফের দল। তাদের দাবি হলো, যেকোনো ঘটনা ঘটার পূর্বে আল্লাহ তাআলা সে সম্পর্কে জানেন না। নাউজুবিল্লাহ। এ দলটির উৎপত্তি হয় হিজরি প্রথম শতাব্দীতে। তুহফাতুল আহওয়াযি, ৬/৩০৩ (শামেলা)-সম্পাদক
📄 দুই নুরের অধিকারী উসমান ইবনে আফফান রা.
ইতিপূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি যে, ফিতনার ঘটনা অধ্যয়ন দ্বারা আমাদের প্রথম উদ্দেশ্য হচ্ছে সাহাবিগণের ওপর আরোপিত অপবাদ এবং আপত্তিসমূহের জবাব দেওয়া। এটি একটি মর্যাদাপূর্ণ কাজ। আমরা রাসুল ﷺ-এর সাহাবি জাবের রা.-এর হাদিসও উল্লেখ করেছি। তিনি বলেন, রাসুল ﷺ বলেছেন, যখন এ উম্মতের শেষাংশ প্রথমাংশের (সাহাবিগণের) ওপর (তাদের মর্যাদা সম্পর্কে অজ্ঞতাবশত) অভিসম্পাত করবে, তখন যারা এ বিষয়ে (তাদের মর্যাদার বিষয়ে) জানে তারা যেন তাদের জ্ঞান প্রকাশ করে। নয়তো এই জ্ঞান গোপন করার কারণে মুহাম্মাদ ﷺ-এর ওপর অবতীর্ণ জ্ঞানকে গোপন করার সমতুল্য অপরাধ হবে।³⁹
আমরা এ কথার কারণও উল্লেখ করেছি। নিশ্চয় ওই সকল সাহাবিগণ আমাদের কাছে রাসুল ﷺ থেকে কুরআন ও সুন্নাহ বর্ণনা করেছেন। তাই তাদেরকে যদি কাফের, ফাসেক, মিথ্যাবাদী অথবা খেয়ানতকারী বলা হয় এবং যারা এ সম্পর্কে জ্ঞান রাখে তারা চুপ থাকে, তাহলে এর অর্থ এই দাঁড়াবে যে, আমাদের কাছে তাদের বর্ণিত যা-কিছু আছে সেগুলো নির্ভরযোগ্য নয়, গ্রহণযোগ্যও নয়। এতে পুরো দ্বীনই ধ্বংস হয়ে যাবে এবং রাসুল ﷺ-এর ওপর যে জ্ঞান অবতীর্ণ করা হয়েছে তা গোপন করা হবে।
তাই এ ক্ষেত্রে আমাদের উচিত, সকল সাহাবির ন্যায়পরায়ণতা জোর দিয়ে প্রমাণ করা। কোনো অবস্থায়ই তাদের ওপর আরোপিত কোনো অপবাদ মেনে নেওয়া যাবে না। যদি তারা কোনো কথায় ভুলও করে ফেলেন তাহলে আমরা বলব যে, তিনি ইজতেহাদের ক্ষেত্রে ভুল করেছেন। এতেও তিনি সওয়াব পাবেন। আর তাদের যেসব বর্ণনার সূত্র বিশুদ্ধ সেগুলো সম্পূর্ণরূপে গ্রহণযোগ্য।
আল্লাহ তাআলা রাসুল ﷺ ও তাঁর জাতিকে সম্বোধন করে বলেন, 'তোমরাই সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি, তোমাদের আবির্ভাব ঘটানো হয়েছে মানবজাতির কল্যাণের জন্য।' [সুরা আলে ইমরান: ১১০]
তিনি আরও বলেন, 'এভাবেই আমি তোমাদের বানিয়েছি মধ্যপন্থী জাতি।' [সুরা বাকারা: ১৪৩]
আরও বলেন, 'আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন, যখন তারা গাছের নিচে আপনার কাছে বাইআত গ্রহণ করছিল। আল্লাহ অবগত ছিলেন সে সম্পর্কে যা তাদের অন্তরে ছিল। তাই তিনি তাদের প্রতি প্রশান্তি অবতীর্ণ করেছেন এবং তাদেরকে পুরস্কারস্বরূপ দিয়েছেন আসন্ন বিজয়।' [সুরা ফাতহ : ১৮]
আয়াতে উল্লেখিত বাইআতে (বাইআতে রিদওয়ানে) অংশগ্রহণকারী অনেক সাহাবির ওপরও অপবাদ আরোপ করা হয়েছে। শিয়ারা তাদের শুধু ফাসেক বলেই থেমে যায়নি, বরং কাফেরও আখ্যা দিয়েছে। আমরা এ থেকে আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'অগ্রগামী মুহাজির ও আনসারগণ এবং তাদেরকে যারা নিষ্ঠার সঙ্গে অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহ তাআলার প্রতি সন্তুষ্ট। তাদের জন্য আল্লাহ তাআলা প্রস্তুত করেছেন জান্নাত। যার তলদেশ দিয়ে বয়ে যায় প্রস্রবণধারা। তারা সেখানে হবে চিরস্থায়ী। এটিই বিরাট সফলতা।' [সূরা তাওবা : ১০০]
তিনি আরও বলেন, 'হে নবী, আপনার জন্য আল্লাহ তাআলা এবং যে-সকল মুমিন আপনার অনুসরণ করেছে তারাই যথেষ্ট।' [সূরা আনফাল : ৬৪]
আরও বলেন, 'এই ধনসম্পদ ওই সকল মুহাজির দরিদ্র ব্যক্তিদের জন্য, যাদেরকে নিজ ভিটেমাটি এবং সম্পদ থেকে উৎসাত করা হয়েছে। যারা আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ এবং সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করেন এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে সাহায্য করেন, তারাই প্রকৃত সত্যবাদী।' [সূরা হাশর : ৮]
আরও বলেন, 'তোমরা কেন আল্লাহ তাআলার পথে ব্যয় করছ না? অথচ আসমান এবং জমিনের সব মিরাস তাঁরই। তোমাদের মধ্যে যারা (মক্কা) বিজয়ের পূর্বে দান করেছে এবং জিহাদ করেছে তারা পরবর্তীদের সমান নয়। (মক্কা) বিজয়ের পর যারা দান করেছে এবং জিহাদ করেছে তাদের তুলনায় (মক্কা) বিজয়ের আগে যারা দান করেছে এবং জিহাদ করেছে তারা অধিক মর্যাদাবান। তবে আল্লাহ তাআলা তাদের প্রত্যেককেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা সম্যক অবগত।' [সূরা হাদিদ : ১০]
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. প্রিয় রাসুল ﷺ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন, সর্বোত্তম জাতি হচ্ছে আমার সময়কার লোকেরা, এরপর তাদের পরবর্তীগণ। এরপর তাদের পরবর্তী সময়ে যারা আসবে তারা। এই তিন সময়ের পর এমন কিছু লোকের আবির্ভাব হবে, যারা সাক্ষ্য দেওয়ার পূর্বেই শপথ করে নেবে এবং সাক্ষ্য দিতে বলার আগেই সাক্ষ্য দিয়ে বসবে।⁴⁰
হাদিসটি আবু হুরাইরা রা. এবং ইমরান ইবনে হুসাইন রা. থেকেও বর্ণিত হয়েছে। এ হাদিসটি সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম উভয় গ্রন্থেই উল্লেখ করা হয়েছে। আবু সাইদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল ﷺ বলেছেন, তোমরা আমার সাহাবিগণকে গালি দিয়ো না। তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও ব্যয় করে ফেলে, তবুও তাদের এক মুদ⁴¹ অথবা অর্ধেক মুদের সমান হবে না।⁴²
কিন্তু শিয়া আলেমদের মত হলো যে, প্রথম তিন খলিফা রাসুল-এর সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন। মাহদি আসকারি তার গ্রন্থে এমনটিই ব্যক্ত করেছে। এদিকে গণপ্রজাতন্ত্রী ইরানের ইসলামবিষয়ক মন্ত্রণালয় একটি নতুন পুস্তিকা প্রকাশ করেছে। যাতে সকল সাহাবিগণকে নিম্নোক্ত তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়েছে।
প্রথম শ্রেণি : যাদের প্রতি আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট হয়েছেন। মূলত যাদের প্রতি শিয়া আলেমগণ সন্তুষ্ট এখানে তাদের কথা বলা হচ্ছে। মাত্র পাঁচজন সাহাবিকে তারা এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করেছে। তারা হলেন, আলি ইবনে আবু তালেব রা., আম্মার ইবনে ইয়াসির রা., মিকদাদ ইবনে আমর রা., আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এবং সালমান ফারসি রা.।
দ্বিতীয় শ্রেণি : উক্ত পুস্তিকার বক্তব্য মতে তারা সবচেয়ে নিকৃষ্ট জাতি এবং তারা অবাধ্যদের অনুসরণে জীবন বিসর্জন দিয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-কে তাদের একজন বলা হয়েছে।
তৃতীয় শ্রেণি : পুস্তিকার বক্তব্য মতে এই শ্রেণির সাহাবিগণ তাঁদের মর্যাদা বিকিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের প্রতিটি হাদিসকে তারা দিনারের বিনিময়ে বিক্রি করেছেন। তাঁদের এই মত থেকে আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় চাইছি। আবু হুরাইরা রা. এবং আবু মুসা আশআরি রা. প্রমুখ সাহাবিকেও তারা এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করেছে।
আমরা জানি, আবু হুরাইরা রা. হলেন সবচেয়ে বেশি হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবি। যদি তিনি কয়েকটি দিরহামের বিনিময়ে ধর্ম বিক্রি করে থাকেন, তবে তাদের দাবি অনুযায়ী তাঁর বর্ণিত সব হাদিসই বাতিল হয়ে যাবে। এমনিভাবে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. একাই বর্ণনা করেছেন ৪ হাজার হাদিস। তাঁর হাদিসগুলোও তাদের মতে গ্রহণযোগ্য নয়। দেখা যাচ্ছে, ব্যাপারটি খুবই বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা.-কে তারা বলে বেপরোয়া। উসমান রা.-কে বলে সামাজিক প্রতিপত্তিশালী। আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা.-কে বলে সম্পদের পূজারি। সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা.-কে বলে তাকওয়াহীন।
অথচ উসমান রা., আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. এবং সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা. হলেন রাসুল ﷺ-এর মুখে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ জন সাহাবির অন্তর্ভুক্ত। তাহলে তারা কাদের মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে? সাহাবিগণকে নাকি রাসুল ﷺ-কে? খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা.-কে আমরা সাইফুল্লাহ তথা আল্লাহ তাআলার উন্মুক্ত তরবারি বলে জানি।
শিয়া নেতা খোমেনি তাঁর কাশফুল আসরার গ্রন্থে লিখেছেন, আবু বকর রা., উমর রা. এবং উসমান রা. রাসুল ﷺ-এর খলিফা ছিলেন না। বরং আরও আগ বাড়িয়ে তিনি লেখেন, তারা আল্লাহ তাআলার বিধানে পরিবর্তন সাধন করেছে। হারামকে হালাল করেছে। রাসুল ﷺ-এর বংশধরগণের ওপর অত্যাচার করেছে এবং ঐশী নিয়মকানুন ও ধর্মীয় বিধান সম্পর্কে তারা ছিল অজ্ঞ।⁴³
এই হলো সাহাবিগণকে নিয়ে তাদের মিথ্যা রটনার সমুদ্র থেকে সামান্য কয়েক ফোঁটা।
টিকাঃ
৩৯. আল-মুজামুল আওসাত লিত তবারানি, ৪৩০
৪০. সহিহ মুসলিম, ২৫৩৩; আস-সুনানুল কুবরা লিন নাসায়ি, ১১৭৫০; সহিহ ইবনি হিব্বান, ৭২২৩; সহিহ বুখারি, ২৬৫২
৪১. মুদ: একটি পরিমাপের নাম। এক মুদ = ৮১৭.৬৫ গ্রাম।
৪২. সহিহ বুখারি, ৩৬৭৩; সহিহ মুসলিম, ২৫৪১
৪৩. কাশফুল আসরার, পৃ. ১২০-১২৫
📄 সাহাবিগণের ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর আলেমগণের বক্তব্য
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেন, যখন তুমি কাউকে দেখো সে সাহাবিগণ সম্পর্কে মন্দ কথা বলছে, তবে মনে করো তার ইসলাম গ্রহণ মিথ্যা।⁴⁴
ইসহাক ইবনে রাহওইয়াহ রহ. বলেন, সাহাবিগণকে যে গালি দেয় তাকে কঠোর শাস্তি প্রদান করা হবে এবং বন্দি করা হবে।⁴⁵
ইমাম মালেক রহ. বলেন, যে ব্যক্তি রাসুল-কে গালি দেয় তাকে কুফরির কারণে হত্যা করা হবে। আর যে সাহাবিগণকে গালি দেয় তাকে সমুচিত শাস্তি দেওয়া হবে।⁴⁶
কাজি আবু ইয়ালা রহ. বলেন, সাহাবিগণকে গালমন্দ করার ব্যাপারে ফকিহগণের ঐক্যবদ্ধ মত হচ্ছে, যদি কেউ এ কাজকে বৈধ মনে করে তবে সে ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে। যদি বৈধ মনে না করে গালমন্দ করে তবে সে ফাসেক হয়ে যাবে।⁴⁷
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, যে ব্যক্তি দাবি করে যে, রাসুল ﷺ-এর মৃত্যুর পর দশের অধিক কিছু লোক ব্যতীত সকল সাহাবি মুরতাদ হয়ে গিয়েছে অথবা যে ব্যক্তি সকল সাহাবিকে ফাসেক আখ্যা দেয়, সে নিঃসন্দেহে কাফের।⁴⁸
আবু যুরয়া রাজি রহ. বলেন, যদি কোনো ব্যক্তিকে দেখো কোনো সাহাবিকে দোষারোপ করতে, জেনে নিয়ো সে জিন্দিক।⁴⁹
এসব কারণে আমাদের এই পাঠের উদ্দেশ্য হচ্ছে, সাহাবিগণের পক্ষে প্রতিরোধ করা। ওই সকল পথভ্রষ্ট মূর্খরা তাদের ওপর যেসব মিথ্যা অপবাদ আরোপ করেছে, সেগুলো থেকে তাদের পবিত্র প্রমাণিত করা। কিন্তু বড় আক্ষেপ এই যে, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর দাবিদার অনেক অজ্ঞ মুসলিম ওই সকল ভ্রান্তদের অনুসরণ করেছে এবং সাহাবিগণকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তারা রচনা করেছে অনেক গ্রন্থ। জানি না এসব কি তারা ইচ্ছাকৃত করেছে যে, তাদেরকে কাফের আখ্যা দেবো, নাকি অজ্ঞতাবশত করেছে যে, তাদেরকে ফাসেক বলব!
এদের মধ্যে আবদুর রহমান শারকাবি এবং আয়েশা কাদুরা প্রমুখ ব্যক্তি হলো অন্যতম। আয়েশা কাদুরা, 'লেবানন ইউনিভার্সিটি'র সাহিত্য বিভাগের সাবেক ডিন। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা.-এর ওপর অত্যন্ত জঘন্য মিথ্যাচার সে করেছে। আরও মিথ্যাচার করেছে আলি রা., হাফসা রা., ফাতেমা রা. এবং উসমান রা.-কে নিয়ে।
উসমান রা.-এর কথাই বলা যাক। ইসলামের ইতিহাসে তিনি একজন মহান ব্যক্তি। রাসুল ﷺ-এর দুই মেয়ে উম্মে কুলসুম রা. ও রুকাইয়া রা.-কে বিয়ে করার কারণে তাকে দেওয়া হয়েছিল যুন নুরাইন তথা দুই নুরের অধিকারী উপাধি। অবশ্যই এটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ বিষয়। পৃথিবীর ইতিহাসে অন্য কোনো ব্যক্তির ভাগ্যলিপিতে কোনো নবীর দুই কন্যা বিয়ে করার মহাসৌভাগ্য লিখিত হয়নি। উম্মে কুলসুম রা.-এর মৃত্যুর পর রাসুল তাকে বলেছিলেন, আমার যদি তৃতীয় কোনো মেয়ে থাকত তবে তাকেও আমি তোমার সঙ্গেই বিয়ে দিতাম।
এই মজলুম খলিফার ওপর আরোপ করা হয়েছে অনেক অপবাদ। এমনকি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর অজ্ঞ কিছু লোক, যারা সম্যক জ্ঞান ও যাচাই-বাছাই ছাড়াই লেখালেখি করে, তারাও এই মহান সাহাবির ওপর মিথ্যাচার করেছে। ২৪ হিজরির শুরুভাগে উসমান রা. মুসলিম বিশ্বের খলিফা নির্বাচিত হন। ৩৫ হিজরিতে শহিদ হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি খেলাফতের আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তবে এর আগে কিছু নামধারী মুসলিম এবং এদের অনুসারীদের পক্ষ থেকে তার ওপর আরোপ করা হয়েছিল বহু মিথ্যা অপবাদ। অবশেষে তারা তাকে হত্যা করে। এরপর শিয়ারা এসে উসমান রা.-কে নিয়ে অপবাদের পাহাড় গড়তে থাকে। তারা দাবি করে, তিনি আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা.-এর সঙ্গে যোগসাজশ করে আলি রা. থেকে খেলাফত ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। তাদের এই দাবি থেকে আমরা আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় চাই।
টিকাঃ
৪৪. শরহু উসুলি ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ, ৭/১৩২; মাশিখাতু কাযিল মারিস্তান, ২/৮৬৫
৪৫. আকিদাতু আহলিস সুন্নাহ, ২/৮৬৫
৪৬. আশ-শিফা, ২/৫৮০
৪৭. ফাতাওয়াস সুবকি, ২/৫৮০
৪৮. আস-সারিমুল মাসলুল, পৃ. ৫৮৭
৪৯. আল-আওয়াসিম মিনাল কাওয়াসিম, পৃ. ৩৪
📄 ইবনে সাবার আত্মপ্রকাশ ও ফিতনার সূচনা
৩০ থেকে ৩১ হিজরির মাঝামাঝি সময়ে ইয়ামেনে আবদুল্লাহ ইবনে সাবার আত্মপ্রকাশ ঘটে। তার মা ছিল এক কৃষ্ণাঙ্গ বাঁদি। এজন্য তাকে ইবনুস সাওদা অর্থাৎ কালো বাঁদির ছেলে বলা হয়। সে ছিল ইহুদি। জীবনের দীর্ঘ সময় সে ইয়ামেনে কাটায়। ইসলাম আগমনের পূর্বে ইয়ামেন ছিল পারস্যের অন্তর্গত একটি প্রদেশ। ফলে আবদুল্লাহ ইবনে সাবা অগ্নিপূজারি পারসিকদের থেকে অনেক কিছুই শিখতে পারে। এই ইহুদিই ইসলাম ধর্ম এবং মুসলিম উম্মাহর ওপর আঘাত হানার হীন লালসা পোষণ করে ফিতনা সৃষ্টির প্রয়াস চালায়।
উসমান রা.-এর শাসনামলের শুরুতে সে বাহ্যত ইসলাম গ্রহণ করে এবং বিভিন্ন দেশে গিয়ে তার ইসলামবিদ্বেষী বিষাক্ত মতবাদ প্রচার করতে শুরু করে। প্রথমে সে যায় হিজাযে। সেখানকার পরিবেশ অনুকূল না হওয়ায় ইরাকের দিকে রওনা হয়ে বসরায় চলে যায়। যা আগে থেকেই ফিতনার ভূমি ছিল। এখানে তার সাক্ষাৎ ঘটে হাকিম ইবনে জাবালা নামক এক ব্যক্তির সঙ্গে। যদিও সে মুসলিম ছিল, তবে সে ছিল চোর। জিম্মিদের সম্পদ সে গ্রাস করে নিত। খলিফা তাকে গৃহবন্দি করে রাখতে আদেশ দিয়েছিলেন, যেন সে বসরা ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে না পারে। তার স্বভাবচরিত্রও ছিল খারাপ। ইবনে সাবা পেয়ে যায় তার উপযুক্ত শিষ্য। সে একটু একটু করে হাকিম ইবনে জাবালাকে ইহুদি এবং অগ্নিপূজারি মতবাদের সংমিশ্রণে তৈরি তার নব্য মতাদর্শে দীক্ষিত করতে শুরু করে। আবদুল্লাহ ইবনে সাবার এই মতাদর্শ থেকেই শিয়াদের আকিদা-বিশ্বাসের সূত্রপাত। শিয়ারা অনেক ভাগে বিভক্ত। সেসবের মধ্যে একদল সম্পূর্ণরূপে ইবনে সাবার অনুসরণ করেছে, যাদেরকে বর্তমানে শিয়ায়ে সাবাইয়্যাহ বলা হয়। আবার কোনো কোনো দল ইবনে সাবার আংশিক অনুসরণ করেছে। আবার কেউ অনুসরণ করেছে সামান্য কিছু ক্ষেত্রে। কিন্তু ব্যাপকভাবে সমস্ত শিয়াই আবদুল্লাহ ইবনে সাবার বিষাক্ত মতবাদ থেকে কিছু না কিছু গ্রহণ করেছে।
হাকিম ইবনে জাবালা তার কিছু বন্ধু এবং সগোত্রীয় কিছু লোক-সহ ইবনে সাবার অনুসরণ করে। এসব কাজ চলছিল গোপনে। শুরুতে সে প্রকাশ্যে এসব করার দুঃসাহস করেনি। এরপর সে বসরা থেকে চলে যায় কুফায়; যা ছিল ফিতনার আরেক ঘাঁটি, বিদ্রোহের স্বর্গরাজ্য। কুফাবাসীদের অনেকেই ইবনে সাবার অনুসরণ করে। কিন্তু সেখানেও তার কার্যক্রম গোপনেই চলছিল। ইবনে সাবার অনুসারীদের একজন ছিল আশতার নাখায়ি। তার ব্যাপারটি ছিল খুবই আশ্চর্যজনক। কারণ, সে ছিল ইয়ারমুক এবং পরবর্তী যুদ্ধসমূহে একজন সক্রিয় মুজাহিদ। কিন্তু আল্লাহ তাআলা যাকে চান তাকে দ্বীনের ওপর অটল রাখেন। আশতার নাখায়ি হয়তো নিজের অজ্ঞতাবশত কিংবা নেতৃত্বের লোভে কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ইবনে সাবার ডাকে সাড়া দেয়।
আশতার ছিল তার গোত্রে অত্যন্ত প্রভাবশালী। তাই সে তার গোত্রের মানুষদের কাছে নিজের মতাদর্শ প্রচার শুরু করে। কিছু ইতিহাসবিদ আশতারের এই সম্পৃক্ততার বিভিন্ন কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। তবে প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন মত প্রদান করেছেন। প্রথম কারণ হিসাবে বলা হয়, সে ছিল ধর্মীয় কিছু কিছু বিষয়ে খুবই কঠোর। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সে অতি বাড়াবাড়ি করে সেগুলোকে ভুল মনে করেছিল। দ্বিতীয় কারণ হিসাবে বলা হয়, তার মধ্যে নেতৃত্ব ও প্রতিপত্তির লোভ ছিল। তাই নিজের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে সে বিশৃঙ্খলাকারীদের সঙ্গে যোগ দেয়।
এরপর ইবনে সাবা চলে যায় মিশরে। সেখানে তার মতবাদ প্রচারের উর্বর ভূখণ্ড পেয়ে যায়। কারণ, তখন অধিকাংশ মুসলিম বেরিয়ে গিয়েছিলেন লিবিয়া এবং সুদানের বিভিন্ন অভিযানে। অল্প কিছু মুসলিম সেখানে ছিলেন। ফলে ইবনে সাবা অল্প কিছু লোককে তার পাশে সমবেত করতে সক্ষম হয় এবং মিশরেই স্থায়ী হয়ে যায়। মিশরে স্থায়ী হওয়া তার উদ্দেশ্য ছিল না। কেননা তার অভ্যাস ছিল যেখানেই যেত সেখানেই একটা সময় পর্যন্ত অবস্থান করত। এরপর সেখান থেকে চলে যেত অন্য কোনো স্থানে। সে যখন মিশরে অবস্থান করতে থাকে তখন ফিতনার সময় প্রায় ঘনিয়ে এসেছিল। তাই সে মিশর থেকে প্রস্থান করে।
ইবনে সাবার চিন্তাধারা
ইবনে সাবার চিন্তাধারা ও মূল লক্ষ্য ছিল ইসলামকে ধ্বংস করা এবং মুসলিমদের মনে ইসলামের ব্যাপারে সংশয় সৃষ্টি করা। তার ধ্বংসাত্মক কিছু চিন্তাধারা হচ্ছে—
এক. রজআতের বিশ্বাস (প্রত্যাবর্তনের বিশ্বাস) : শিয়াদের নিকট এটি খুবই দৃঢ় এক বিশ্বাস। যার ভিত্তি হচ্ছে অগ্নিপূজারি ধর্ম। ইহুদি ধর্মেও আল্লাহ তাআলার ওপর মিথ্যাচারমূলক এই আকিদার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ইহুদিরা নিজেদের হাতে বই লিখে বলে এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রেরিত। এই বিশ্বাসের কথা ইবনে সাবা এভাবে বলেছে, ঈসা আ. যদি পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারেন, তাহলে মুহাম্মাদ কেন নয়? তিনি অবশ্যই ফিরে আসবেন। শিয়ারা আরও আগ বাড়িয়ে বলে, শুধু মুহাম্মাদ-ই নয়; বরং আলি রা. ও অন্যরাও ফিরে আসবেন। কিন্তু এই বিশ্বাসের উৎস হচ্ছে অগ্নিপূজারি ধর্ম এবং ইহুদিদের মিথ্যাচার। ইবনে সাবা তার মতাদর্শ প্রচার করত অজ্ঞ এবং মুখদের মধ্যে। তারা তাকে সত্যায়ন করত। একদিন এক ব্যক্তি তাকে মুহাম্মাদ ﷺ-এর পুনরায় ফিরে আসাসংক্রান্ত দলিল জিজ্ঞাসা করে। তখন সে বলে, আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যিনি আপনার প্রতি কুরআনের দায়িত্বভার অর্পণ করেছেন, তিনি অবশ্যই আপনাকে প্রত্যাবর্তনস্থলে ফিরিয়ে আনবেন।’ [সুরা কাসাস : ৮৫] তার কথা অনুযায়ী এই প্রত্যাবর্তনস্থল হচ্ছে পৃথিবী। এ কথার মাধ্যমে সে কিছু অজ্ঞ মানুষকে প্রতারিত করেছে।⁸⁷
দুই. অসায়ার বিশ্বাস (অসিয়তের বিশ্বাস) : ইবনে সাবার বক্তব্য অনুযায়ী আদম আ. থেকে शुरू করে মুহাম্মাদ পর্যন্ত নবুয়ত, অসিয়তের মাধ্যমে চলমান ছিল। অর্থাৎ প্রত্যেক নবীই তার পরবর্তী নবীর জন্য অসিয়ত করে গিয়েছেন। এটি ছিল তার স্পষ্ট বিকৃতি এবং মিথ্যাচার। সে বলে, যেহেতু হাজার হাজার নবী তাদের পরবর্তী নবীর জন্য অসিয়ত করে গিয়েছেন তাহলে মুহাম্মাদ শেষ নবী হয়েও কেন তার পরবর্তী কারও জন্য অসিয়ত করবেন না? তিনিও কাউকে অসিয়ত করে গিয়েছেন। প্রথমে সে এতটুকু বলেই ক্ষান্ত হয়। এরপর সে এমন একজন লোক অনুসন্ধান করতে থাকে, যার নাম মানুষ প্রত্যাখ্যান করতে দ্বিধাবোধ করবে। এরপর সে বলে, মুহাম্মাদ নবুয়তের অসিয়ত করেছেন আলি রা.-কে। আমি তার কাছ থেকেই তা জেনেছি। এবার সে রাসুল ﷺ-এর নামে মিথ্যা হাদিস রচনা করে বলে, তিনি বলেছেন, আমি শেষ নবী, আর আলি সর্বশেষ অসিয়তপ্রাপ্ত অথবা সর্বশেষ অলি। এটি একটি বানোয়াট হাদিস। শায়খ আলবানি রহ. তা স্পষ্ট করেছেন।⁸⁸ এর সঙ্গে শিয়ারা আলি রা.-এর পর আরও কজন অসিয়তপ্রাপ্ত ব্যক্তি যোগ করে। এখান থেকেই অসিয়তের বিশ্বাস প্রকাশ পায়।
এরপর ইবনে সাবা তার অনুসারীদের বলে, তোমরা গভর্নরদের ওপর অপবাদ আরোপ করতে শুরু করো। এরপর সে আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারহ রা., ওয়ালিদ ইবনে উকবা রা., সাইদ ইবনুল আস রা. ও আবদুল্লাহ ইবনে আমের প্রমুখ রা., যাদেরকে উসমান রা. গভর্নর নিয়োগ করেছিলেন, তাদের ব্যাপারে নেতিবাচক কথা লিখে বিভিন্ন জনপদে চিঠি পাঠাতে শুরু করে। সে তার অনুসারীদের বলে, যখন তোমরা মানুষের কাছে এ বিষয়ের (গভর্নরদের ওপর মিথ্যাচারের) দাওয়াত নিয়ে যাবে, তখন বলবে, আমরা সৎ কাজের আদেশ করি এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করি। যেন তারা তোমাদের কথা প্রত্যাখ্যান করতে না পারে।⁸⁹
যারা ছিল ইবনে সাবার অনুসারী
বেশ কয়েকটি গোত্র এবং দল ইবনে সাবার অনুসরণ করে। তাদের মধ্যে একদল মুখে মুখে ইসলাম গ্রহণ করলেও ভেতরে লুকিয়ে রেখেছিল কুফর এবং নেফাক (কপটতা)। আরেকদল ছিল নেতৃত্ব এবং ক্ষমতালোভী, যাদেরকে উসমান রা. মন্দ স্বভাব কিংবা তাদের চেয়ে যোগ্য ব্যক্তি থাকার কারণে গভর্নর পদে নিয়োগ দেননি। আরেকদল হচ্ছে, যাদের ওপর অথবা তাদের নিকটস্থ কারও ওপর উসমান রা. শরয়ি শাস্তি প্রয়োগ করেছিলেন। ফলে তারা প্রতিশোধ গ্রহণে আগ্রহী ছিল। আরেকদল ছিল অজ্ঞ, যাদের ছিল জ্ঞানের স্বল্পতা। সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধের মুখরোচক স্লোগান দিয়ে ইবনে সাবা তাদের মন জয় করে নিয়েছিল, যেন সে উসমান রা.-এর হত্যাকল্পে সফল হতে পারে।
গভর্নরদের দোষারোপ করার পর সে স্বয়ং খলিফাকে দোষারোপ করতে শুরু করে। উসমান রা.-এর ব্যাপারে কিছু মিথ্যা দোষের কথা লিখে ইবনে সাবা বিভিন্ন শহর এবং জনপদে পাঠিয়ে দেয়। ব্যাপারটি মুসলিম গভর্নরবৃন্দ এবং খলিফার কাছেও পৌঁছায়। তখন তিনি বেশ কয়েকজন সাহাবিকে প্রেরণ করেন লোকদেরকে বিষয়টি বুঝিয়ে তাদের সন্দেহ দূর করার জন্য। মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা রা.-কে প্রেরণ করেন কুফায়। উসামা ইবনে যায়দ রা.-কে প্রেরণ করেন বসরায়, আম্মার ইবনে ইয়াসির রা.-কে প্রেরণ করেন মিশরে এবং আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-কে প্রেরণ করেন শামে। শামের লোকেরাই এই ফিতনার মাধ্যমে সবচেয়ে কম প্রভাবিত হয়েছিল। সেখানে মুআবিয়া রা. অত্যন্ত প্রজ্ঞা ও সহনশীলতার সঙ্গে লোকেদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন। লোকেরাও তাকে খুব পছন্দ করত। তাই সেখানকার লোকেরা ইবনে সাবার আহ্বানকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে।
এরপর সে আবু যর গিফারি রা.-এর নিকটে যায়। তিনি ছিলেন একজন মহান সাহাবি এবং একেবারেই দুনিয়াবিমুখ। যারা তার জীবনী পড়েছেন তারা সকলেই এ কথা জানেন। ইবনে সাবা একদিন আবু যর গিফারি রা.-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় বলে, হে আবু যর, শামের অধিবাসীরা তো দ্বীন ভুলে দুনিয়া এবং বিলাসিতায় ডুবে আছে। এ কথা বলে সে আবু যর রা.-কে উত্তেজিত করতে চেয়েছিল। আবু যর গিফারি রা. তখন মুআবিয়া রা.-এর কাছে গিয়ে বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ, ইহুদি পণ্ডিত ও খ্রিষ্টান সংসারবিরাগীদের অনেকে লোকদের মালামাল অন্যায়ভাবে ভোগ করে এবং আল্লাহর পথ থেকে লোকদের নিবৃত রাখে। আর যারা স্বর্ণ ও রুপা জমা করে রাখে এবং আল্লাহর পথে তা ব্যয় করে না, তাদেরকে কঠোর আজাবের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন।’ [সুরা তাওবা: ৩৪] তিনি এই আয়াতের মাধ্যমে বুঝাতে চেয়েছেন, কোনো মানুষের জন্য একদিনের বেশি খাবার সঞ্চয় করা বৈধ হবে না। তবে তার এই দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামের মূলনীতির বিপরীত। তখন মুআবিয়া রা. বললেন, আপনি মানুষের ওপর সাধ্যাতীত কাজ চাপিয়ে দিচ্ছেন। রাসুল ﷺ তো এমনটি বলেননি। তবুও আবু যর রা. তার মতের ওপর অটল থাকেন। ফলে মুআবিয়া রা. উসমান রা.-এর নিকট এ ব্যাপারে চিঠি লিখে জানালে উসমান রা. আবু যর রা.-কে ডেকে পাঠান। তাদের মধ্যে এ নিয়ে দীর্ঘক্ষণ আলাপচারিতা হয়। যার বিস্তারিত বিবরণ পরবর্তী সময়ে দেওয়া হবে। এ ব্যাপারেও উসমান রা.-কে দোষারোপ করা হয়ে থাকে। যেসব অপবাদের ক্ষেত্রে মানুষ ইবনে সাবার অনুসরণ করেছে তন্মধ্যে এটি একটি।
ইবনে সাবা আরেক বিশিষ্ট সাহাবি উবাদা ইবনে সামিত রা.-এর কাছেও যায় এবং তার সঙ্গেও একই আচরণ করে। তখন উবাদা ইবনে সামিত রা. ইবনে সাবাকে ধরে মুআবিয়া রা.-এর কাছে নিয়ে এসে বলেন, এই লোকই আপনার বিরুদ্ধে আবু যর গিফারি রা.-কে উত্তেজিত করেছে। তখন মুআবিয়া রা. ইবনে সাবার সঙ্গে কথা বলেন। মুআবিয়া রা. ছিলেন অত্যন্ত সহনশীল। তার কাছে ইবনে সাবা তার সমস্ত কথা প্রত্যাহার করে নেয়। কিন্তু মুআবিয়া রা. তার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হতে পারেননি। তাই তিনি ইবনে সাবাকে নির্বাসনে পাঠান। এরপর সে মিশরে গিয়ে আস্তানা গাড়ে।⁹⁰
উসমান রা. লোকদের বুঝানো এবং তাদের সন্দেহ দূর করার জন্য যে-সকল সাহাবিকে পাঠিয়েছিলেন তাদের মধ্যে আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. ব্যতীত সকলেই ফিরে আসেন। তিনি গিয়েছিলেন মিশরে। সেখানেই ছিল ইবনে সাবা, সাওদান ইবনে হুমরান এবং কিনানা ইবনে বিশরের অবস্থান। যারা ছিল এই ফিতনার মূলহোতা। তারা আম্মার ইবনে ইয়াসির রা.-এর সঙ্গে বসে তাকে গভর্নরবৃন্দ এবং উসমান রা.-এর ব্যাপারে দ্বিধায় ফেলে দেয়। তাই তিনি মদিনায় উসমান রা.-এর কাছে ফিরে যেতে বিলম্ব করেন। এদিকে মদিনার মুসলিমরা আশঙ্কা করেন, হয়তো তাকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু তখনই তাদের কাছে মিশরের গভর্নর আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারহ রা.-এর পত্র আসে। তিনি জানান, মিশরের লোকেরা আম্মার ইবনে ইয়াসির রা.-কে দ্বিধায় ফেলে দিয়েছে। তখন উসমান রা. আম্মার ইবনে ইয়াসির রা.-কে পত্র মারফত তিরস্কার করেন। উসমান রা.-এর চিঠি পড়ার পর তার কাছে সত্য উন্মোচিত হয়ে যায়। এরপর তিনি মদিনায় উসমান রা.-এর কাছে ফিরে আসেন এবং তার সামনেই নিজের ভুল ধারণার জন্য তওবা করেন।
৩৩ হিজরি সনে প্রথমবারের মতো ফিতনার প্রকাশ ঘটে কুফা নগরীতে। সেখানে আশতার নাখায়ি ৯/১০জন লোককে নিজের সঙ্গে জুটিয়ে দিনের আলোয় প্রকাশ্যে উসমান রা.-এর ওপর বিভিন্ন দোষারোপ করা শুরু করে। কুফার গভর্নর সাইদ ইবনুল আস রা. উসমান রা.-এর কাছ থেকে এ ব্যাপারে জানতে পারেন। তিনি আশতার ও তার সহচরদের এ থেকে নিষেধও করেন। এরপর সাইদ ইবনুল আস রা. উসমান রা.-কে আশতার এবং তার সাঙ্গপাঙ্গদের অবস্থা জানালে তিনি সাইদ ইবনুল আস রা.-কে আশতার এবং তার সহচরদের শামে মুআবিয়া রা.-এর কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আমরা আগেই বলেছি, মুআবিয়া রা. ছিলেন অত্যন্ত সহনশীল। তারা বেশ কয়েকবার প্রকাশ্যে তাকে গালি দিয়েছে। কিন্তু তিনি তাদের সঙ্গে কোমল এবং নম্র আচরণ করেন। তাদের সঙ্গে কোনোরূপ কঠোরতা করার চেষ্টা করেননি। তিনি তাদের পাঠিয়ে দেন হোমসের গভর্নর আবদুর রহমান ইবনে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা.-এর কাছে। যিনি ছিলেন পিতা খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের মতোই তেজস্বী। তার মতোই সিংহপুরুষ। তিনি তাদের কঠোরভাবে তিরস্কার করেন। তারা এর জবাব দেওয়ার দুঃসাহস দেখালে তিনি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করেন। তাদেরকে বন্দি করলে তারা তওবার কথা জানায়। তখন তিনি উসমান রা.-কে জানিয়ে দেন যে, তারা তওবা করে নিয়েছে। উসমান রা. তাদের একজনকে তার কাছে পাঠাতে বলেন, ফলে আশতার নাখায়িকে উসমান রা.-এর কাছে পাঠানো হয়। সে উসমান রা.-এর সামনে প্রকাশ্যে তওবা করে। উসমান রা. তাকে শামে পাঠিয়ে দেন। সে তখন সহচরদের সঙ্গে সেখানেই থেকে যায়।
শামে অবস্থানকালে তাদের কাছে বসরা থেকে ইয়াজিদ ইবনে কায়স নামক এক লোকের চিঠি আসে। চিঠিতে জানানো হয়, সে অচিরেই বসরায় প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে যাচ্ছে। তাই সাহায্য চেয়ে সে তাদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠি হস্তগত হওয়ার পর তারা বিদ্রোহের ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। আশতার নাখায়ি তাদেরকে এ ব্যাপারে পীড়াপীড়ি করতে থাকে। একমতে তারা আশতার নাখায়ির সঙ্গে কুফায় ফিরে গিয়েছিল। আরেক মতে তারা ফিরে যায়নি। কিন্তু আশতার নাখায়ি শাম থেকে কুফায় ফিরে যায়। আগেই বলেছি আশতার নাখায়ি তার গোত্রের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের একজন ছিল।
এ সময় উসমান রা. তার গভর্নরদের কাছে ফিতনার বিষয়ে পরামর্শের আহ্বান জানিয়ে সংবাদ পাঠান। শামের গভর্নর মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রা., বসরার গভর্নর আবদুল্লাহ ইবনে আমের রা., কুফার গভর্নর সাইদ ইবনুল আস রা. এবং মিশরের গভর্নর আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারহ রা., তারা সকলেই মদিনা মুনাওয়ারায় উসমান রা.-এর কাছে আসেন। তাদের কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করার পর তারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ মত ব্যক্ত করেন। আবদুর রহমান ইবনে আমের রা. লোকদের জিহাদে পাঠিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন; যেন এ ধরনের কাজের সুযোগ না পায়। সাইদ ইবনুল আস রা. বিশৃঙ্খলাকারীদের উচিত শিক্ষা দিয়ে তাদের মূলোৎপাটন করার পরামর্শ দেন। মুআবিয়া রা. প্রত্যেক গভর্নরকে নিজ নিজ শহরে পাঠিয়ে দেওয়ার মত দেন এবং বলেন, তাদের প্রতিরোধ করার জন্য এটিই যথেষ্ট হবে। আর আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারহ রা. সম্পদ প্রদানের মাধ্যমে তাদের আকৃষ্ট করার মত ব্যক্ত করেন।
উসমান রা. এসব মতের মধ্যে সমন্বয়সাধন করেছিলেন। কিছু লোককে যুদ্ধের জন্য পাঠিয়েছিলেন, কিছু লোককে দিয়েছিলেন সম্পদ এবং প্রত্যেক গভর্নরকে দায়িত্ব দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন নিজ নিজ শহরে। কিন্তু তিনি বিশৃঙ্খলাকারীদের মূলোৎপাটন করেননি। এ সময় পর্যন্ত ফিতনার বিষয়টি গোপনেই চলতে থাকে। কুফায় আশতার নাখায়ি, তার সহচররা এবং বসরায় ইয়াজিদ ইবনে কায়স ব্যতীত কেউ তখনও প্রকাশ্যে আসেনি। উসমান রা.-এর কাছ থেকে গভর্নরগণ নিজ নিজ শহরে ফিরে যান। সাইদ ইবনুল আস রা. কুফায় ফিরে দেখেন, আশতার নাখায়ি কল্পনাতীত কাণ্ড করে বসেছে। সে বিশাল জনবল একত্র করে বিরাট বিদ্রোহ এবং বিশৃঙ্খলা শুরু করেছে। তাদের মধ্যে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে ফিতনার অগ্নিশিখা। তারা সাইদ ইবনুল আস রা.-কে কুফায় প্রবেশে বাধা প্রদান করে এবং এই সিদ্ধান্তে অটল থাকে। সাইদ ইবনুল আস রা. এই ফিতনা দমন করাকে প্রাধান্য দিয়ে তাদের সঙ্গে যুদ্ধে যাননি; বরং তিনি উসমান রা.-এর কাছে ফিরে এসে তাকে সবকিছু অবগত করেন। উসমান রা. মধ্য ও উত্তর পারস্যে বিস্তৃত এই শহরটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠাকে প্রাধান্য দিয়ে কুফাবাসীর সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে আবু মুসা আশআরি রা.-কে নতুন গভর্নর হিসাবে নিয়োগ দেন।
ঘটনাটি ঘটেছিল ৩৪ হিজরিতে। দিনদিন উসমান রা.-এর ওপর মিথ্যা দোষারোপের মাত্রা বাড়তেই থাকে। জনপদের পর জনপদে বিস্তার লাভ করতে থাকে ইবনে সাবার বিষাক্ত চিন্তাধারা। বিভিন্ন অঞ্চলে এ ফিতনার শেকড় মজবুত হতে থাকে। ইয়াজিদ ইবনে কায়স বসরায়, আশতার নাখায়ি ও হাকিম ইবনে জাবালা কুফায় এবং ফিতনার মূলহোতা আবদুল্লাহ ইবনে সাবা ছিল মিশরে। তার সঙ্গে ছিল কিনানা ইবনে বিশর এবং সাওদান ইবনে হুমরান-সহ বেশ কজন কুচক্রী। মূলহোতারা ফিতনার অগ্নিশিখাকে আরও ছড়িয়ে দিয়ে ইসলামি সাম্রাজ্যকে খণ্ডবিখণ্ড করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। আগের চেয়ে অধিক হারে তারা উসমান রা.-এর ওপর অপবাদ আরোপ করতে থাকে। সাহাবিগণের স্বাক্ষর জাল করে মিথ্যা ও অবান্তর অভিযোগ, পত্র মারফত বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচার করতে থাকে। এসব পত্রে তারা তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা., যুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা. ও উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা.-এর ভুয়া স্বাক্ষর ব্যবহার করত।
দূরত্ব এবং যোগাযোগব্যবস্থা কঠিন হওয়ায় মানুষের কাছে তাদের মিথ্যা পত্র এবং সাহাবিগণের স্বাক্ষর জাল করার বিষয়টি স্পষ্ট করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে আরও কিছু মানুষ সাড়া দেয় ফিতনার আহ্বানে। কিছু মানুষ বিষয়টিকে স্পর্শকাতর মনে করে যাচাই করার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। ফিতনার আগুন প্রজ্বলিতকারী ওই সব অপবাদ এখনো শিয়াদের গ্রন্থাবলিতে বিদ্যমান। উসমান রা.-কে গালমন্দ এবং অপবাদ আরোপ করার সময় তারা ইসলামদ্রোহীদের এসব মিথ্যা ও বানোয়াট কথা উল্লেখ করে থাকে। এগুলোকে সত্য হিসাবে প্রচার করে। জাহিয়া কাদুরার মতো কিছু অজ্ঞ তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগুলোকে সত্য বলে মেনেও নেয়। উসমান রা. ও আয়েশা রা.-এর ব্যাপারে অপবাদ আরোপ করে। জাহিয়া কাদুরা তার বইয়ে লিখেছে যে, আয়েশা রা. মানুষজনকে উসমান রা.-এর বিরুদ্ধে উসকানি দিয়েছিলেন। সে বুঝাতে চায় যে, বিশৃঙ্খলাকারীদের পক্ষ থেকে যেসব চিঠি প্রেরণ করা হয়েছিল সেগুলো সত্যি সত্যিই আয়েশা রা. প্রেরণ করেছিলেন।
আল্লামা ইবনে কাসির রহ. উল্লেখ করেন, আবু মুআবিয়া রহ. আমাশ রহ. থেকে, আমাশ রহ. খাইসামা রহ. থেকে এবং খাইসামা রহ. মাসরুক রহ. থেকে বর্ণনা করে বলেন, উসমান রা.-কে যখন হত্যা করা হলো, তখন আয়েশা রা. বলেন, তোমরা তাকে ময়লা থেকে পরিচ্ছন্নকৃত কাপড়ের মতো করে তারপর হত্যা করলে? অপর বর্ণনায় আছে, তোমরা তাকে প্রথমে ময়লামুক্ত পরিচ্ছন্ন কাপড়ের মতো বানিয়ে তার নিকটে গেলে, অতঃপর তাকে দুম্বার মতো হত্যা করলে? তখন মাসরুক রহ. আয়েশা রা.-কে বললেন, এটা তো আপনারই কাজ। আপনিই তো মানুষকে চিঠি লিখে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে বলেছেন। আয়েশা রা. বললেন, না। ওই সত্তার শপথ! যার প্রতি বিশ্বাসীরা ঈমান এনেছে আর কাফেররা করেছে অস্বীকার। আমি এ পর্যন্ত তাদের জন্য সাদা কাগজে একটি কালো ফোঁটাও লিখিনি। আমাশ রহ. বলেন, তারা মনে করত যে, ইবনে সাবা আয়েশা রা.-এর কাছ থেকে শুনে এসব লিখেছে।⁹¹ আয়েশা রা. পর্যন্ত এ বর্ণনাটির সূত্র সহিহ। এ ধরনের উদাহরণ থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ওই সকল নিকৃষ্ট খারেজি⁹² সাহাবিগণের নাম ব্যবহার করে মিথ্যা পত্র লিখে বিভিন্ন প্রান্তে পাঠিয়ে লোকদেরকে উসমান রা.-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে প্ররোচিত করেছে।
উসমান রা.-এর ওপর আরোপিত যত অপবাদ
ওই সকল নিকৃষ্ট ইসলামদ্রোহী চক্র উসমান রা.-এর ওপর যেসব অপবাদ আরোপ করেছে, সেগুলো আজও কিছু অজ্ঞ মুসলিম এবং কিছু দলের মুখে মুখে চর্চিত হয়ে আসছে। সেগুলো হচ্ছে—
প্রথম অপবাদ : উসমান রা. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-কে আঘাত করেছিলেন। ফলে তার হাড় ভেঙে যায়। এমনকি তিনি তার ভাতাও বন্ধ করে দেন।
দ্বিতীয় অপবাদ : তিনি আম্মার ইবনে ইয়াসির রা.-কে আঘাত করে তার নাড়িভুঁড়ি বের করে ফেলেন।
তৃতীয় অপবাদ : তিনি কুরআন সংকলন করে বিদআত করেছেন এবং কুরআন পুড়িয়ে ফেলেছেন।
চতুর্থ অপবাদ : তিনি নিজের জন্য চারণভূমি সংরক্ষণ করেছেন। তাদের দাবি অনুযায়ী, তিনি সেখানে শুধু নিজের উটের পাল চরানোর অনুমতি দিয়েছেন।
পঞ্চম অপবাদ : তিনি আবু যর গিফারি রা.-কে শাম থেকে উত্তরে রবাযা অঞ্চলে নির্বাসিত করেছেন।
ষষ্ঠ অপবাদ : তিনি আবু দারদা রা.-কে শাম থেকে বিতাড়িত করেছেন।
সপ্তম অপবাদ : রাসুল নির্বাসিত করার পরও তিনি হাকাম ইবনে আবুল আসকে ফিরিয়ে এনেছেন।
অষ্টম অপবাদ : তিনি সফরে নামাজ কসর⁹³ করার সুন্নাহ রহিত করেছেন। কারণ, তিনি হজে গিয়ে মিনায় পূর্ণ নামাজ পড়েছেন।
নবম অপবাদ : তিনি মুআবিয়াকে গভর্নর পদে নিয়োগ দিয়েছেন। কারণ, তিনি ছিলেন তার নিকটাত্মীয়।
দশম অপবাদ : একই কারণে আবদুল্লাহ ইবনে আমেরকেও নিয়োগ দেন বসরার গভর্নর হিসাবে।
একাদশ অপবাদ : একই কারণে নিয়োগ দেন মারওয়ান ইবনে হাকামকে।
দ্বাদশ অপবাদ : তিনি ওয়ালিদ ইবনে উকবাকে কুফার গভর্নর নিয়োগ দিয়েছেন, অথচ সে ছিল ফাসেক।
ত্রয়োদশ অপবাদ : তিনি মারওয়ান ইবনে হাকামকে আফ্রিকা অঞ্চল থেকে অর্জিত গনিমতের (যুদ্ধলব্ধ সম্পদের) এক-পঞ্চমাংশ প্রদান করেছেন।
চতুর্দশ অপবাদ : উমর রা. ছোট লাঠি দিয়ে প্রহার করতেন। কিন্তু উসমান প্রহার করেন বড় লাঠি দিয়ে।
পঞ্চদশ অপবাদ : তিনি মিম্বরে রাসুল ﷺ-এর সিঁড়িতে বসেন, অথচ আবু বকর এবং উমর বসেছিলেন নিচের সিঁড়িতে।
ষোড়শ অপবাদ : তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি।
সপ্তদশ অপবাদ : উহুদের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পলায়ন করেছিলেন।
অষ্টাদশ অপবাদ : বাইআতে রিদওয়ানে তিনি ছিলেন অনুপস্থিত।
উনবিংশতম অপবাদ : তিনি উবাইদুল্লাহ ইবনে উমরকে হুরমুযান হত্যার বদলায় হত্যা করেননি।
বিংশতম অপবাদ : তিনি কেবল তার নিকটাত্মীয়দের দান করেন। সাধারণ মুসলিমদের দান করেন না।
এসব অপবাদ একটা বর্ণনাতেই পাওয়া গিয়েছে। অন্যান্য কিছু বর্ণনায় আরও কিছু অপবাদের কথা উল্লেখ রয়েছে, যা শুধু শিয়াদের গ্রন্থাবলিতেই নয়; বরং কিছু অজ্ঞ মুসলিমের রচনায়ও এগুলোর অস্তিত্ব পাওয়া যায়, যারা শিয়া কিংবা ইসলাম বিরোধীদের বানোয়াট বর্ণনা নকল করে থাকে। এগুলো যে বানোয়াট কথা তা বোঝার জ্ঞানও তাদের নেই। এরা চায় না, পৃথিবীতে কোনো ইসলামি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হোক। এদের দাবি হচ্ছে, যদি ইসলামি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে আবারও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। যেখানে সাহাবিগণের সময়েই এমন বিশৃঙ্খলা হয়েছে, সেখানে বর্তমান সময়ে এসে কীভাবে ইসলামি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব? এসব মিথ্যা অপবাদ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। একমাত্র শাম ব্যতীত অন্য কোনো অঞ্চল এই ফিতনার ছোবল থেকে মুক্ত ছিল না। লোকেরা নিজেদের সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধকারী দাবি করে উসমান রা.-কে ক্ষমতা থেকে অপসারণের ষড়যন্ত্র শুরু করে। কারণ, তাদের দাবি অনুযায়ী তিনি এসব অন্যায় কাজ করেছিলেন।
উসমান রা.-এর ওপর আরোপিত অপবাদসমূহের জবাব
প্রথম অপবাদের জবাব: উসমান রা.-এর ব্যাপারে শিয়াদের প্রথম অপবাদ হচ্ছে, উসমান রা. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-কে আঘাত করেছিলেন। ফলে তার হাড় ভেঙে যায়। এমনকি উসমান রা. তার ভাতাও বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এ বর্ণনাটি বানোয়াট। এর কোনো ভিত্তি নেই। যখন উসমান রা.-এর জন্য বাইআত গ্রহণ করা হয়েছিল, তখন আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেছিলেন, আমাদের মধ্যকার সর্বোত্তম ব্যক্তির হাতে বাইআত গ্রহণ করলাম। তার অনুসরণে আমরা কোনো ত্রুটি করব না। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. তখন সবচেয়ে উত্তম মনে করতেন উসমান রা.-কে। তিনি উসমান রা.-এর পক্ষ থেকে কুফার বায়তুল মালের রক্ষণাবেক্ষণকারী হিসাবে নিযুক্ত ছিলেন। সে সময় কুফার গভর্নর ছিলেন সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা.। তাদের দুজনের মধ্যে একবার একটি বিষয় নিয়ে বিরোধ দেখা দিয়েছিল। সাদ রা. বায়তুল মাল থেকে কিছু সম্পদ ঋণ নিয়েছিলেন। তবে তিনি নির্দিষ্ট সময়ে তা পরিশোধ করতে পারেননি। এ কারণে তাদের দুজনের মধ্যে তর্ক হয়। তখন কুফাবাসী তাদের চিরায়ত অভ্যাস অনুযায়ী বিদ্রোহ করে বসে। জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০জন সাহাবির একজন এবং রাসুল ﷺ-এর শ্রদ্ধেয় মামা সাদ রা.-এর মর্যাদার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করেই তারা তাকে অপসারণ করার জন্য উঠে পড়ে লাগে। তখন উসমান রা. গভর্নরের পদ থেকে সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা.-কে অপসারণ করেন এবং আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-কে কুফার বায়তুল মালের রক্ষক পদে বহাল রাখেন।
উসমান রা. যখন সকল মানুষের জন্য এক কেরাতের কুরআন সংকলন করতে চাইলেন, তখন তিনি যায়দ ইবনে সাবেত রা.-কে এ কাজের জন্য নির্বাচন করেন। ইতিপূর্বে আবু বকর রা. এবং উমর রা. তাঁকেই প্রথমবার কুরআন সংকলনের কাজের জন্য নির্বাচন করেছিলেন। এর কারণ ছিল, রাসুল ﷺ-এর মৃত্যুর কয়েক মাস পূর্বে দশম হিজরির রমজান মাসে যেভাবে তিনি ও জিবরাইল আ. একে অপরকে কুরআন শুনিয়েছিলেন, যায়দ রা. ঠিক সেভাবেই রাসুল ﷺ থেকে কুরআন শুনেছিলেন। কিন্তু কুরআনের অন্যান্য পাণ্ডুলিপিগুলো এ ধারাবাহিকতায় এভাবে লেখা হয়েছিল যে, যখনই কুরআনের কিছু অংশ অবতীর্ণ হতো, তখন সেই অংশটুকু পাণ্ডুলিপিতে লেখা হতো।
তখন আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর কাছে কুরআনের যে পাণ্ডুলিপিটি ছিল, তার বিন্যাস যায়দ ইবনে সাবেত রা.-এর পাণ্ডুলিপির বিন্যাস থেকে ভিন্ন ছিল। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর পাণ্ডুলিপির বিন্যাসের প্রতি লক্ষ করলে দেখা যায়, সেখানে সুরার বিন্যাস অনেক ব্যতিক্রম। কিছু সুরার মধ্যে আয়াতের বিন্যাসেও ব্যতিক্রম রয়েছে। কিছু শব্দেও রয়েছে পার্থক্য। এমনকি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর পাণ্ডুলিপিতে সুরা ফাতেহা, সুরা নাস এবং সুরা ফালাকের মতো সুরাগুলো ছিল না। এদিকে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর উচ্চারণ ছিল হুজাইল গোত্রীয়; কুরাইশ গোত্রীয় ছিল না। সিদ্ধান্ত হয়েছিল ঐক্যবদ্ধভাবে কুরআন লিপিবদ্ধ করা হবে। যদি কোথাও ভিন্নতা দেখা দেয়, তবে কুরাইশ গোত্রের উচ্চারণকেই প্রাধান্য দেওয়া হবে। কারণ, কুরআন অবতীর্ণ হয়েছিল কুরাইশ গোত্রের ভাষায়। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. যখন জানতে পারলেন যে, যায়দ ইবনে সাবেত রা.-এর কেরাত অনুযায়ী কুরআন সংকলন করা হবে এবং তাঁর পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলা হবে, তখন তিনি খুবই ক্রুদ্ধ হন। কুফার মিম্বরে দাঁড়িয়ে পাঠ করেন, ‘যে গোপন করে সে কেয়ামতের দিন যা গোপন করেছে তা নিয়েই উপস্থিত হবে।’ [সুরা আলে ইমরান : ১৬১] নিশ্চয় আমি আমার সহিফাকে গোপন করে রাখব। তিনি আয়াতের ব্যাখ্যা এভাবে করেছেন।
অবশ্য আয়াতে বর্ণিত গোপন করার অর্থ হচ্ছে গনিমত তথা যুদ্ধলব্ধ সম্পদকে গোপন করা। যা সর্বসম্মতিক্রমে নিষিদ্ধ; বরং কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। উক্ত আয়াত এবং অন্য দলিল-প্রমাণ থেকে তা প্রমাণিত। কিন্তু আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলতে চেয়েছেন, তিনি তার কাছে থাকা কুরআনের পান্ডুলিপি সংরক্ষণ করবেন, তা পুড়িয়ে ফেলতে সম্মত হবেন না। এরপর কেয়ামতের দিন অবশ্যই তিনি তা নিয়ে আল্লাহ তাআলার কাছে উপস্থিত হবেন। তিনি কুরআন সংকলনে দায়িত্বপ্রাপ্ত সাহাবিগণের মধ্যে থাকতে চেয়েছিলেন। কারণ, রাসুল যাদের কেরাতের প্রশংসা করেছিলেন, তিনিও তাদের একজন। কিন্তু আগেই বলেছি, তার উচ্চারণ ছিল হুজাইল গোত্রের, যা কুরাইশ গোত্রের উচ্চারণের চেয়ে ভিন্ন ছিল। রাসুল তাকে হুজাইল গোত্রের উচ্চারণে কুরআন তেলাওয়াতের অনুমতি দিয়েছিলেন। কিন্তু যখন সমস্ত মানুষের জন্য একই কেরাত নির্ধারণ করা হবে, তখন কুরআন যেভাবে অবতীর্ণ হয়েছে সেভাবেই সংকলন করা আবশ্যক। কুরআন অবতীর্ণ হয়েছিল কুরাইশের ভাষায়। তাই স্বাভাবিকভাবে কুরাইশের ভাষায় কুরআন সংকলন করা হবে।
এ ঘটনার পর উসমান রা. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর ওপর পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। তখন তিনি মদিনায় এসে উসমান রা.-সহ সকল সাহাবির সঙ্গে এ নিয়ে তর্কে লিপ্ত হন। বিশিষ্ট সাহাবিগণ একত্র হয়ে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-কে বুঝাতে সক্ষম হন যে, এতেই মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ নিহিত রয়েছে। অবশেষে বুঝতে পেরে তিনি তার মত প্রত্যাহার করে নেন এবং উসমান রা.-এর সামনে এজন্য তওবা করেন। তাদের মধ্যকার সম্পর্ক পুনরায় আগের মতো হয়ে যায়। এ কথাগুলো এ ঘটনার সর্বসম্মত বর্ণনামতে প্রমাণিত।⁹⁴
আমরা যদি ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করি তাহলে দেখতে পাব যে, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর জন্য শুরুতে এ সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া কষ্টকর ছিল। যে পাণ্ডুলিপিতে তিনি ২০ বছর ধরে রাসুল-এর কাছ থেকে শ্রবণ করে পবিত্র কুরআনের বাণী লিখে গিয়েছেন, তা পুড়িয়ে ফেলতে তার মন সায় দিচ্ছিল না। এই পাণ্ডুলিপিটি ছিল তার জীবনের অন্যতম অর্জন। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল রাসুল ﷺ এবং অন্যান্য সাহাবিগণের অগণিত স্মৃতি। এটি হয়ে গিয়েছিল তার জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ কারণেই তিনি শুরুতে এ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু যখন তিনি সত্য জেনেছেন ও তা মনেপ্রাণে মেনে নিয়েছেন, তখন নিজের মতকে প্রত্যাহার করে অনুতপ্ত হয়ে তওবা করেছেন। মোটকথা, উসমান রা. কোনোভাবেই তার ওপর অত্যাচার করেননি। তাকে আঘাত করা কিংবা তার ভাতা বন্ধ করে দেওয়ার কথা একেবারেই অবিশ্বাস্য।
দ্বিতীয় অপবাদের জবাব: দ্বিতীয় অপবাদ হলো, উসমান রা. আম্মার ইবনে ইয়াসির রা.-কে আঘাত করে তার নাড়িভুঁড়ি বের করে ফেলেছিল। যদি সত্যিই এমনটি ঘটত, তাহলে এ ঘটনার পর তো আম্মার রা. জীবিত থাকতেন না। কিন্তু আম্মার রা.-এরপরও জঙ্গে সিফফিনের সময় পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। এতেই বোঝা যায়, উসমান রা.-কর্তৃক আম্মার রা.-কে আঘাত করা এবং তার নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা আদৌ ঘটেনি। তবে একবার তাকে শুধু প্রহার করা হয়েছিল। এর কারণ ছিল, আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. এবং আব্বাস ইবনে উতবা ইবনে আবি লাহাব রা.-এর মধ্যে একবার কোনো বিষয় নিয়ে বিরোধ হয়েছিল। তখন তারা একে অপরের ওপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করায় উসমান রা. উভয়কেই প্রহারের শাস্তি দিয়েছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, তাদের উভয়েই একে অপরের ক্ষেত্রে অন্যায় করেছে। এ ঘটনায় সাহাবিগণের অন্তরে একটুও প্রতিক্রিয়া অথবা ক্ষত সৃষ্টি হয়নি।
বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় এ ঘটনার দ্বারা যে, যখন উসমান রা. জনগণের সন্দেহ দূর করার জন্য বিশিষ্ট কিছু সাহাবিকে নির্বাচন করেছিলেন, তখন তিনি আম্মার ইবনে ইয়াসির রা.-কে মিশরে পাঠানোর জন্য নির্বাচন করেছিলেন। পূর্বেই উল্লেখ করেছি, মিশরে অবস্থানরত ফিতনার মূলহোতারা আম্মার রা.-কে দ্বিধাগ্রস্ত করে ফেলেছিল। তাই তিনি মিশর থেকে ফিরে আসতে বিলম্ব করেন। এদিকে উসমান রা. এবং মদিনার অন্যান্য মুসলিমগণের মনে আম্মার রা.-এর শহিদ হওয়ার আশঙ্কা জাগে, তখনই উসমান রা.-এর কাছে পৌছে মিশরের গভর্নর আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারহ রা.-এর চিঠি। তিনি জানান, এখানকার লোকেরা আম্মার রা.-কে দ্বিধাগ্রস্ত করে ফেলেছে। এরপর উসমান রা. আম্মার রা.-এর কাছে চিঠি লিখে পাঠান। তিনি ফিরে এসে উসমান রা.-কে সেখানে যা ঘটেছে তার বিবরণ জানান। উসমান রা. তাকে বলেন, আপনাকে অপবাদ দিয়েছে তাই আপনিও ইবনে আবি লাহাবকে অপবাদ দিয়েছেন। উভয়কে প্রাপ্য শাস্তি দিয়েছি বলে আমার ওপর রাগ করেছেন। হে আল্লাহ, আমি আমার প্রজাদের ওপর কোনো জুলুম করে থাকলে আমাকে ক্ষমা করুন। হে আল্লাহ, নিশ্চয় আমি প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই আপনার বিধান প্রয়োগ করে আপনার নিকটবর্তী হচ্ছি। কাউকেই পরোয়া করি না। আম্মার, আপনি আমার কাছ থেকে চলে যান।⁹⁵
এই ছিল আম্মার রা.-এর প্রতি উসমান রা.-এর তিরস্কার। আম্মার রা. ফিতনাবাজদের কথার প্রতি তার আকৃষ্ট হওয়ার ব্যাপারে অপারগতা প্রকাশ করেন। উসমান রা. এবং বড় বড় সাহাবিগণের সামনে প্রকাশ্যে তওবা করে তিনি তার এই মত প্রত্যাহার করে নেন। এসবের দ্বারা বোঝা যায় যে, আম্মার রা.-কে আঘাত করা এবং তার নাড়িভুঁড়ি বের করে ফেলার ঘটনা সম্পূর্ণ মিথ্যা; বরং আমরা যা বর্ণনা করলাম এটিই প্রকৃত ঘটনা। উসমান রা. যে তাদের দুজনকে প্রহার করেছেন, এটি তাদের জন্য দোষণীয় কিছু নয়। কারণ, আল্লাহ তাআলার প্রিয় বান্দাদের কাছ থেকেও কখনো এমন কিছু অপরাধ প্রকাশ পেয়ে যায়, যার কারণে তারা হদের উপযুক্ত হয়ে যান। আর তাযিরের উপযুক্ত তো হতেই পারেন। উমর রা.-ও এমনটি করেছিলেন। তিনি একবার নিজস্ব কেরাতে কুরআন তেলাওয়াতকারী বিশিষ্ট সাহাবি উবাই ইবনে কাব রা.-কে প্রহার করেছিলেন। কারণ, তিনি মদিনার পথে হাঁটছিলেন আর লোকেরা পিছু পিছু তার অনুসরণ করছিল। তখন উমর রা. তাকে বেত্রাঘাত করেন এবং বলেন, নিশ্চয় এমনটি করা অনুসারীদের জন্য অপদস্থতা এবং অনুসৃত ব্যক্তির জন্য ফিতনাস্বরূপ। উবাই ইবনে কাব রা.-কে নির্দেশ দেন, কেউ যেন তার পিছু অনুসরণ না করে।
একইভাবে একবার রাসুল ﷺ-ও এক সাহাবিকে প্রহার করেছিলেন। সেই সাহাবি খাইবারের যুদ্ধে মদ পান করেছিলেন। তখন রাসুল ﷺ তাঁকে ৪০টি বেত্রাঘাত করেন। কেউ বলেছেন তিনি ৪০টি জুতার আঘাত করেছিলেন। এই প্রহারের পর যখন অন্য এক সাহাবি সেই সাহাবিকে তার কাজের জন্য অভিশাপ দেয়, তখন রাসুল ﷺ রেগে যান এবং বলেন, সে কি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবাসে না? এই প্রহার তাদের মর্যাদায় কোনো ঘাটতি সৃষ্টি করেনি। নিশ্চয় তারা সকলে জান্নাতে যাবেন। এতে কোনো দ্বিমত নেই। তাযির দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, যে ব্যাপারে শরিয়ত নির্ধারিত কোনো হদ এবং কাফফারা বা জরিমানা নেই, সে ব্যাপারে কাউকে শাস্তি দিয়ে শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া। শান্তির দিক দিয়ে গুনাহ তিন প্রকার—
প্রথম প্রকার : যে গুনাহের কারণে শরয়ি হদ তথা শরিয়ত নির্ধারিত শাস্তি প্রয়োগ করা হয়। যেমন, চুরি এবং ব্যভিচার।
দ্বিতীয় প্রকার : যে গুনাহের কারণে শান্তি নয়; বরং কাফফারা বা জরিমানা আরোপ করা হয়। যেমন, রমজানে দিনের বেলায় অথবা ইহরাম অবস্থায় সহবাস করা।
তৃতীয় প্রকার : যে গুনাহের কারণে হদ এবং কাফফারা কোনোটিই প্রয়োগ করা হয় না; বরং তাযির প্রয়োগ করা হয়। যেমন, কাউকে গালি দেওয়া। তবে কাউকে ব্যভিচারের অপবাদ দিলে শরিয়ত নির্ধারিত হদ তথা শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। অনুরূপভাবে এই পরিমাণ সম্পদ চুরি করা, যার ফলে হদ আবশ্যক হয়।⁹⁹ এমনইভাবে মিথ্যা কথার ব্যাপারেও তাযির প্রয়োগ করা যেতে পারে। ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক এবং ইমাম আহমাদ রহ.-এর মতে তাযির প্রয়োগ করা ওয়াজিব। ইমাম শাফেয়ি রহ.-এর মতে মুস্তাহাব। হদ এবং তাযির উভয়টিই শান্তি। উভয়টির উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের অন্তরকে পবিত্র করা, গুনাহ থেকে বিরত রাখা, যেন হদ, তাযির ও কাফফারার মাধ্যমে গুনাহমুক্ত হয়ে মানুষ কেয়ামতের দিন উপস্থিত হয়।
হদ এবং তাযিরের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, হদের ক্ষেত্রে সকল মানুষই সমান। কিন্তু তাযির মানুষের ভিন্নতা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। একজন খোদাভীরু এবং সৎ ব্যক্তি যদি ভুল করে, তবে তাকে ফাসেক এবং পাপাচারে লিপ্ত ব্যক্তির মতো শাস্তি দেওয়া হবে না। তাদের তুলনায় লঘু শাস্তি দেওয়া হবে। হদের ক্ষেত্রে কোনো সুপারিশ ধর্তব্য হবে না। তবে তাযিরের ক্ষেত্রে সুপারিশ বৈধ। তাযির প্রয়োগ করার সময় যদি কেউ মারা যায়, তাহলে দিয়ত তথা রক্তপণ আদায়ের মতো সেটারও জরিমানা দিতে হবে। কিন্তু হদ প্রয়োগ করার সময় যদি কেউ মারা যায়, তাহলে কোনো জরিমানা দিতে হবে না। তবে কোনো কোনো ফকিহের মতে তাযিরের সময় মারা গেলেও কোনো জরিমানা নেই।
তাযিরের ধরন একাধিক হতে পারে। ধমকি, উপদেশ, বন্দি করা, প্রহার করা, নির্বাসনে পাঠানো, কাজ থেকে বরখাস্ত করা ইত্যাদি। তাযির প্রদানের ক্ষমতা শাসক অথবা বিচারকের হাতে। তিনি যেভাবে চান সেভাবে তাযির প্রয়োগ করতে পারেন। তবে এ নিয়ে ফকিহগণের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, ১০ বেত্রাঘাতের বেশি তাযির হতে পারবে না। কেউ বলেন, ৮০ বেত্রাঘাতের বেশি হতে পারবে না। কেউ বলেন, তাযির নির্ধারণ করবে শাসক কিংবা বিচারক। আম্মার ইবনে ইয়াসির রা. এবং আব্বাস ইবনে উতবা রা. যখন একে অপরের ওপর অপবাদ আরোপ করেছিলেন, তখন উসমান রা. তাদের সঙ্গে এমনটিই করেছিলেন। পিতার জন্যও তাযির প্রয়োগের অধিকার রয়েছে। তিনি তার সন্তানের ওপর তাযির প্রয়োগ করতে পারবেন। তবে সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হলে কোনো পিতা সন্তানকে প্রহার করতে পারবে না।¹⁰⁰ একজন মনিবের জন্যও রয়েছে তার গোলামের ওপর তাযির প্রয়োগ করার অধিকার। চাইলে মনিব গোলামকে প্রহার করতে পারে অথবা বন্দি রাখতে পারে। আবার ভিন্ন কোনো শাস্তিও প্রয়োগ করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো বাড়াবাড়ি এবং অত্যাচার করা যাবে না। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা সবকিছুই দেখছেন। উসমান রা.-এর জন্য তাযির প্রয়োগ করার অধিকার ছিল। তা ছাড়া কোনো সাহাবিই উসমান রা.-এর এ বিষয়টিকে অপছন্দ করেননি কিংবা এ কাজের নিন্দা বা সমালোচনা করেননি।
তৃতীয় অপবাদের জবাব : উসমান রা.-এর ওপর আরোপিত তৃতীয় অপবাদটি হচ্ছে, তিনি কুরআন সংকলন করে বিদআত করেছেন এবং কুরআন পুড়িয়ে ফেলেছেন। ফিতনাবাজরা এভাবেই নেকির কাজকে মন্দ কাজ বলে চালিয়ে দিচ্ছে। অধিকাংশ আলেমের মতে কুরআন সংকলন ছিল উসমান রা.-এর জীবনের সবচেয়ে বড় নেক আমল। আলেমগণ বলেন, তিনি যে ইতিপূর্বে রুমা কূপ খনন করেছিলেন, এর চেয়েও অধিক নেকির কাজ ছিল এটি। তিনি যে সেনাবাহিনী প্রস্তুত করার জন্য হাজার হাজার উট দান করেছিলেন তার চেয়েও মূল্যবান নেক আমল এটি। কারণ, কেয়ামত দিবস পর্যন্ত এই আমলের প্রভাব বিদ্যমান থাকবে। সকল সাহাবিই কুরআন সংকলনের ব্যাপারে একমত হয়েছিলেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. শুরুতে সম্মত হননি। তবে পরবর্তী সময় তার মত প্রত্যাহার করে উসমান রা. এবং সকল সাহাবির সিদ্ধান্তে সম্মতি প্রকাশ করেছেন। নিশ্চয় সাহাবিগণ কোনো ভ্রান্ত বিষয়ে একমত হবেন না। এমনকি আলি রা. তার খেলাফতকালে বলেছিলেন, উসমান রা. যদি কুরআন সংকলন না করতেন, তবে আমি অবশ্যই করতাম। শিয়াদের গ্রন্থেও এমন বর্ণনা এসেছে, যা এ বিষয়ে সাহাবিগণের ঐকমত্যকে সমর্থন করে। এ ক্ষেত্রে শত্রুদের মুখ থেকেও সত্য কথা বেরিয়ে গিয়েছে। শিয়াদের অন্যতম প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ সাদুস সুউদ-এ ইবনে তাউস শাহরাস্তানি থেকে বর্ণিত আছে, তিনি সুওয়াইদ ইবনে আলকামা থেকে বর্ণনা করে বলেন, আমি আলি রা.-কে এ কথা বলতে শুনেছি যে,
‘হে লোকসকল, আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা উসমান রা.-এর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি এবং তার কুরআন পুড়িয়ে দেওয়ার কথা বলা থেকে বেঁচে থাকো। আল্লাহর শপথ! তিনি সাহাবিগণের উপস্থিতিতেই এমনটি করেছেন। আমাদের তিনি একত্র করে বলেছিলেন, মানুষ কুরআনের কেরাত নিয়ে মতানৈক্য করছে। একজনের সঙ্গে আরেকজনের দেখা হলে বলছে, আমার কেরাত তার কেরাতের চেয়ে উত্তম। এভাবে একে অপরকে কুফরের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, এ ব্যাপারে আপনারা কী বলেন? আমরা বললাম, আপনার কী মত? তিনি বললেন, আমি চাই সকল মানুষ একই কেরাতে কুরআন তেলাওয়াত করুক। যদি আপনারাই এখন মতানৈক্যে লিপ্ত হন; তবে আপনাদের পরবর্তী সময়ে যারা আসবে, তারা আরও অধিক মতানৈক্যে লিপ্ত হবে। আমরা সকলেই বললাম, আপনার ভাবনা অত্যন্ত সুন্দর।’¹⁰¹
শিয়াদের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থেই আলি রা.-এর এ কথা উল্লেখ করা হয়েছে। উপরিউক্ত গ্রন্থ-সহ শাহরাস্তানি রচিত আরও কিছু গ্রন্থে এই বর্ণনা রয়েছে। অপরদিকে তাদের কিছু গ্রন্থে বলা হয়েছে, কুরআন সংকলন করে এবং কুরআন পুড়িয়ে দিয়ে উসমান রা. বিদআতে লিপ্ত হয়েছেন। তাদের এই পারস্পরিক বৈপরীত্যই সত্যকে স্পষ্ট করে দেয়।
সাহাবিগণের ঐকমত্যসত্ত্বেও শিয়ারা মনে করে যে, উসমান রা. ব্যক্তিগত আগ্রহে কুরআন সংকলন করেছেন, আরও কিছু সাহাবি কুরআন সংকলনে তার সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছেন। শিয়ারা তাদের নাম উল্লেখ করে দাবি করে, তারা যেভাবে কুরআন সংকলন করেছেন কুরআন সেভাবে অবতীর্ণ হয়নি। শিয়াদের দাবি অনুযায়ী প্রকৃত কুরআন তাদের কাছেই রয়েছে। যা বর্তমান কুরআনের তিনগুণ। সে কুরআন তাদের নিকটে একটি পাতালকুঠুরিতে সংরক্ষিত আছে। তাদের দ্বাদশ ইমাম তা নিয়ে আসবেন। তাতে আমাদের কাছে থাকা কুরআনের একটি অক্ষরও নেই। তবে কোনো কোনো শিয়া কুরআনের কিছু আয়াতের কথা স্বীকার করে এবং অন্য আয়াতগুলোকে রহিত বলে।
শিয়াগোষ্ঠীকর্তৃক আবু বকর রা.-এর কুরআন সংকলনের বিষয়টি অস্বীকার করা এবং আমাদের কাছে থাকা কুরআন উসমান রা.-এর যুগে সংকলিত হয়েছে বলে তাদের যে দাবি, এটি খ্রিষ্টান সম্প্রদায় কর্তৃক কুরআনের ওপর আঘাতের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখে। খ্রিষ্টানরা অনেক আগে থেকেই কুরআনের ওপর আঘাত করার চেষ্টা করে আসছে। ইবনে হাজম আন্দালুসি রহ.-এর সময়ে খ্রিষ্টানরা এ প্রসঙ্গে অধিক হারে মুসলিমদের সমালোচনা করেছিল এবং তারাও দাবি করেছিল যে, কুরআন উসমান এবং সামসময়িক সাহাবিগণের যুগে সংকলন হয়েছে। এ ক্ষেত্রে খ্রিষ্টানদের দলিল হচ্ছে শিয়াদের গ্রন্থাবলি। যেখানে শিয়ারা দাবি করেছে, প্রকৃত কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে রাসুল -এর ইন্তেকালের ছয় মাস পর ফাতেমা রা.-এর ওপর। এরপর আলি ইবনে আবু তালেব রা. এবং পরবর্তী ইমামগণ তা সংরক্ষণ করেছেন। ইবনে হাজম আন্দালুসি রহ. তার গ্রন্থ আল-ফাসল-এর মধ্যে বলেন, শিয়া রাফেজিরা কিছুতেই মুসলিম নয়। কুফরের দিক দিয়ে এরা ইহুদি এবং খ্রিষ্টানদের মতোই।¹⁰²
হাদিসে বর্ণিত সাত হরফের পর্যালোচনা
‘নিশ্চয় এই কুরআন সাত হরফে অবতীর্ণ হয়েছে। তাই তোমরা তা থেকে যা সহজ মনে হয় তাই পাঠ করো।’¹⁰৩ এই হাদিসটি সহিহ। ২০জনের অধিক সাহাবি হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। এই হাদিসের একাধিক ব্যাখ্যাও রয়েছে। ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতি রহ. আল-ইতকান ফি উলুমিল কুরআন-এ এই হাদিসের ৪০টি ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি রহ. এবং ইবনে হিব্বান রহ. এই হাদিসের ব্যাখ্যায় ৩৫টি অভিমত উল্লেখ করেছেন।
হাদিসে বর্ণিত সাত হরফ সম্পর্কে বিভিন্ন মত রয়েছে। কেউ বলেন, এই সাত হরফ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে সাত কেরাত।¹⁰⁴ কেউ কেউ বলেন সাত হরফ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে সাত ধরনের উচ্চারণ। কেউ বলেন, এই সাত ধরনের উচ্চারণ হচ্ছে মুজার গোত্রের। কেউ বলেন, এই সাত ধরনের উচ্চারণ হচ্ছে কুরাইশ গোত্রের। কেউ বলেন, সাত হরফের দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে কুরআন কারিমের মুশকিল তথা কঠিন আয়াতগুলো সর্বোচ্চ সাত ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে। কেউ বলেন, সাত হরফের দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে শব্দ অথবা আকৃতির ভিন্নতা। কেউ বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, (কুরআনের আয়াতের কোনো শব্দ) কমবেশি করা অথবা ইরাব তথা বাক্যের শেষ অবস্থার পরিবর্তন অথবা কোনো আয়াত আগপিছ করা। ইমাম তহাবি রহ.-এর মতে এই হাদিসের মাধ্যমে মুসলিমদের জন্য কুরআন তেলাওয়াতের বিষয়টি সহজ করা হয়েছে। কারণ, বিভিন্ন গোত্রের জন্য একই উচ্চারণে কুরআন তেলাওয়াত করা ছিল কঠিন। তবে সাহাবিগণ যখন দেখতে পেলেন, এসব গোত্রে কুরআন ছড়িয়ে পড়েছে এবং তা যথাযথ মুখস্থ ও আয়ত্ব করা হচ্ছে; তখন তারা এক কেরাতকেই বহাল রাখলেন। এটাই সে কেরাত, যে কেরাতে উসমান রা. কুরআন সংকলন করেছেন।
এ প্রসঙ্গে ইমাম ইবনে জারির তবারি রহ. বলেন, কুরআন সংকলন কোনো হারাম কাজ ছিল না। এর দ্বারা কোনো ওয়াজিবও ছেড়ে দেওয়া হয়নি। রাসুল ﷺ-এর ইন্তেকালের কয়েক মাস পূর্বে দশম হিজরির রমজান মাসে যেভাবে তিনি ও জিবরাইল আ. একে অপরকে কুরআন শুনিয়েছিলেন, সেভাবেই তা সংকলন করেছেন। আর সাহাবিগণ এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন। অতএব, আমাদের সামনে যে কুরআন রয়েছে তা উসমান রা.-এর সময়ে সংকলিত। এটি রাসুল ﷺ-এর মৃত্যুর কয়েক মাস পূর্বে দশম হিজরির রমজান মাসে যেভাবে তিনি ও জিবরাইল আ. একে অপরকে কুরআন শুনিয়েছিলেন এবং নবীজির ওপর যেভাবে অবতীর্ণ হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই সংকলিত হয়েছে।
চতুর্থ অপবাদের জবাব : শিয়ারা উসমান রা.-এর ওপর অপবাদ আরোপ করে যে, তিনি কিছু উটের জন্য চারণভূমি নির্ধারণ করেছিলেন। সেখানে শুধু তার উটই চরানো হতো। অন্যদের উট চরানোর কোনো অনুমতি ছিল না। তাদের দাবি অনুযায়ী এমনটি করে তিনি বিদআত তথা নব্য প্রথা চালু করেছেন। তারা আরও বলে, তিনি নিজের উট এবং ঘোড়ার জন্য এই চারণভূমি নির্ধারণ করেছিলেন।
তাদের এ দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, রাসুল ﷺ-এর আগমনের পূর্বে জাহেলি যুগেও চারণক্ষেত্র নির্ধারণের প্রথা ছিল। মালিক যে ভূমিকে উটের চারণভূমি বানাতে চাইত, সেখানে তিনি কুকুর নিয়ে প্রবেশ করত। এরপর যে পর্যন্ত কুকুরের ঘেউ ঘেউ ডাক পৌঁছত ততটুকুতে সীমানা দেওয়া হতো। সেই সীমানার মধ্যে তার উট ব্যতীত অন্য কারও উট চরানো যেত না। এই ছিল সে সময়কার চারণভূমি নির্ধারণের পদ্ধতি। রাসুল ﷺ এসে এ প্রথা রহিত করেন। তবে তিনি সদকার উটের জন্য নির্দিষ্ট চারণভূমির প্রথা চালু রাখেন। রবাযা অঞ্চলে রাসুল ﷺ-এর একটি চারণভূমি ছিল। রবাযা ছিল হিজাযের শেষ প্রান্তে, নাজদের নিকটবর্তী একটি মরু অঞ্চল। যার দৈর্ঘ্য ছিল সাত মাইল এবং প্রস্থ ছিল এক মাইল। এখানে সদকা, জিহাদ এবং জনগণের সুবিধার জন্য পালিত উট চরানো হতো। সাব ইবনে জাসসামা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল ﷺ বলেছেন, একমাত্র আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল ব্যতীত অন্য কারও জন্য নির্দিষ্ট চারণভূমি নেই।¹⁰⁵
আবু বকর রা. এ ব্যাপারে রাসুল-এর পদ্ধতিই অনুসরণ করেছেন। উমর রা. এসে চারণভূমির আয়তন আরও বৃদ্ধি করেন এবং এর সঙ্গে আরও বেশ কিছু জায়গা সংযুক্ত করেন। কারণ, উমর রা.-এর যুগে মুসলিমদের বিজয় অভিযান ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ফলে জিহাদের ঘোড়াও বেড়ে গিয়েছিল। তাই জিহাদের উট এবং ঘোড়া চরানোর জন্য প্রয়োজন ছিল বিশাল এক অঞ্চল। উসমান রা.-এর যুগে এসে ইসলামি সাম্রাজ্যের পরিধি আরও বেড়ে যায়। মুসলিমরা হয়ে ওঠে পূর্বের তুলনায় অধিক সচ্ছল। অনেক সম্পদের পাশাপাশি অনেক উটেরও মালিক হন তারা। ফলে চারণভূমিকে আরও বেশি প্রশস্ত করা হয়। অতএব চারণভূমি মূলত রাসুল-এরই সুন্নাহ। এর আয়তন বৃদ্ধি করা ছিল উমর রা.-এর সুন্নাহ। প্রয়োজন অনুযায়ীই এই বৃদ্ধি ঘটানো হয়েছিল। এর সঙ্গে নবীজির পূর্বোক্ত হাদিস-আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ব্যতীত অন্য কারও জন্য নির্দিষ্ট চারণভূমি নেই-এর কোনো বিরোধ নেই।
উসমান রা.-এর ব্যক্তিগত উটের পালকে এই চারণভূমিতে চরানো হতো না। এ ভূমিতে কেবলই সদকার উটগুলো চরানো হতো। উসমান রা.-এর উটগুলো চরানো হতো দূরে অন্য স্থানে। এ ব্যাপারে উসমান রা. ছিলেন খুবই কঠোর এবং সতর্ক। তিনি সদকার উটের জন্য নির্ধারিত চারণভূমিতে অন্য যেকোনো ধনী ব্যক্তির উট প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিলেন। তবে অসচ্ছলদের তিনি এই চারণভূমিতে উট চরানোর সুযোগ দিয়েছিলেন। কারণ, অসচ্ছলতার কারণে মালিক খাবার দিতে অক্ষম হলে কখনো কখনো উট মারা যেত। খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বেই উসমান রা. আরবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উটের মালিক ছিলেন। শাহাদাতবরণের সময় তার কাছে কেবল দুটি উট ছিল। যা তিনি হজের সফরের জন্য রেখে দিয়েছিলেন। বাকি উটগুলো তিনি খলিফা থাকাকালীন মুসলিমদের কল্যাণে ব্যয় করে দিয়েছিলেন। ইসলাম গ্রহণের পর থেকে শাহাদাত পর্যন্ত এ ব্যাপারে তিনি সকল মুসলিমের চেয়ে অগ্রগামী ছিলেন।
পঞ্চম অপবাদের জবাব: উসমান রা.-এর ওপর আরোপিত পঞ্চম অপবাদ হচ্ছে, তিনি আবু যর রা.-কে শাম থেকে রবাযায় নির্বাসিত করেছিলেন। পূর্বে উল্লেখ করেছি যে, আবদুল্লাহ ইবনে সাবা শামে তার মতাদর্শ প্রচারের কোনো সুযোগ না পেয়ে আবু যর গিফারি রা.-এর কাছে যায়। আবু যর গিফারি রা. ছিলেন একেবারেই দুনিয়াবিমুখ। দুনিয়ার প্রতি কোনো মোহ তার ছিল না। এদিকে ইবনে সাবা চেয়েছিল শামের ভূখণ্ডে ফিতনার আগুন প্রজ্বলিত করতে। তাই সে আবু যর গিফারি রা.-কে গিয়ে বলে, মুআবিয়া রা. বলেছেন, এই সম্পদ কেবল আল্লাহ তাআলার। এ কথা বলে তিনি মুসলিমদের বঞ্চিত করতে চাইছেন। মুআবিয়া রা. বাস্তবেই এ কথা বলেছিলেন। কিন্তু ইহুদি ইবনে সাবা আবু যর রা.-এর কাছে গিয়ে এর ভিন্ন ব্যাখ্যা করে, যা মুআবিয়া রা.-এর উদ্দেশ্য ছিল না। তখন আবু যর রা. মুআবিয়া রা.-এর কাছে গিয়ে বলেন, আপনি কি বলেছেন সম্পদ আল্লাহ তাআলার? মুআবিয়া রা. বললেন, হ্যাঁ। আবু যর রা. বললেন, সম্পদ মুসলিমদের।
মুআবিয়া রা. অত্যন্ত সহনশীল বলে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তাই সহনশীলতার সঙ্গে জবাব দিলেন, হে আবু যর, আল্লাহ আপনাকে দয়া করুন। আমরা সবাই কি আল্লাহ তাআলার বান্দা নই? সমস্ত সম্পদ তো তাঁরই। সমস্ত সৃষ্টি কি আল্লাহর নয়? সবকিছু কি আল্লাহর নির্দেশে হয় না? আবু যর রা. বললেন, আপনি সে কথা আর বলবেন না। মুআবিয়া রা. তখন অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে জবাব দিলেন, সম্পদ আল্লাহ তাআলার নয় এ কথা আমি বলব না। তবে আমি বলব যে, সম্পদ মুসলিমদের।¹⁰⁶
আবু যর রা. একবার শামের ধনী এবং শামের বিভিন্ন প্রান্তে নিযুক্ত মুআবিয়া রা.-এর দায়িত্বশীলদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি তাদের শুনিয়ে এ আয়াত পড়তে থাকেন- ‘আর যারা স্বর্ণ-রৌপ্য সঞ্চয় করে এবং তা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে না, তাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তির সুসংবাদ প্রদান করো।’ [সুরা তাওবা: ৩৪] তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, যে ব্যক্তি একদিনের খাবারের চেয়ে বেশি সম্পদের মালিক হবে, সে সম্পদ সঞ্চয়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং এই আয়াতের আওতাভুক্ত হবে।
আবু যর রা. মনে করতেন, যদি কেউ একদিনের খাবারের চেয়ে বেশি সম্পদের মালিক হয়, তাহলে আল্লাহ তাআলার রাস্তায় দান করে দেওয়া ফরজ। এর ব্যতিক্রম করার সুযোগ নেই। যারা এমনটি করবে না, তারাই আয়াতে ঘোষিত শাস্তির আওতাভুক্ত হবে। মুআবিয়া রা.-কেও তিনি একই কথা বলেছিলেন। মুআবিয়া রা. তাকে বলেছিলেন, সুবহানাল্লাহ! কী বলছেন আপনি! মানুষ তো এমনটি পারবে না। আপনি যা বলছেন তা তো ওয়াজিবও নয়। এরপর মুআবিয়া রা. ব্যাপারটি উসমান রা.-কে জানিয়ে দেন।¹⁰⁷
আবু যর রা.-এর এই অবস্থান নিয়ে আমাদের একটু ভাবা উচিত। কারণ, আবু যর রা. ছিলেন অত্যন্ত খোদাভীরু ব্যক্তি, দুনিয়াবিমুখ ও আখেরাতের প্রতি আগ্রহী। অপরদিকে আমরা দেখি যে, (মদিনার একজন ফকিহ সাহাবি) আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলছেন, যে সম্পদের জাকাত দেওয়া হয় তা সঞ্চিত সম্পদ নয়। তা ছাড়া শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী একজন মুসলিম কতটুকু ধনী হবেন, তা নিয়ে কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। একজন মুসলিম যা ইচ্ছা তাই নিজের মালিকানায় রাখতে পারে। তবে শর্ত হচ্ছে, এই সম্পদ হালাল পন্থায় উপার্জন করতে হবে। ব্যয় করতে হবে হালাল খাতে। অপচয় করা যাবে না এবং সেই সম্পদের জাকাতও আদায় করতে হবে।
তবে এ ক্ষেত্রে আবু যর রা.-এর এই অবস্থান ছিল অধিক সতর্কতামূলক এবং জান্নাতের জন্য নিকটতম। একজন মানুষ যত বেশি দুনিয়াবিমুখ হবে তার জন্য তা ততই কল্যাণজনক হবে। রাসুল আমাদেরকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের দুনিয়াবিমুখতায় উৎসাহিত করেছেন। এমনকি তিনি খালি চাটাইয়ে ঘুমিয়েছেন। তার পিঠে সেই চাটাইয়ের দাগ বসে যেত। ক্ষুধার কারণে তিনি পেটে একটি অথবা দুটি পাথর বেঁধে রাখতেন। লাগাতার দুই মাস তার চুলায় আগুন জ্বলেনি। আবু বকর রা.-ও ছিলেন এমনই। উমর রা.-ও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। এমনইভাবে অনেক সাহাবি ছিলেন এ পর্যায়ের দুনিয়াবিমুখ এবং খোদাভীরু। রাসুল যদি চাইতেন, আল্লাহ তাকে উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ দিয়ে দিতেন। বিশুদ্ধ হাদিস থেকে এমনটি জানা যায়। রাসুল প্রায়ই বলতেন, দুনিয়ার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক?
আবু যর রা. এ ক্ষেত্রে রাসুল -কে পূর্ণ অনুসরণ করার চেষ্টা করেছেন। অন্যদেরও উদ্বুদ্ধ করেছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে এ পর্যায়ে উন্নীত হওয়া সম্ভব নয়। এ ছাড়া বিষয়টি ফরজও ছিল না। ফরজ হচ্ছে, মানুষ যে সম্পদের মালিক হবে তা যেন হালাল পন্থায় উপার্জন করে, হালাল খাতে ব্যয় করে এবং সেই সম্পদের জাকাত আদায় করে। একজন মুসলিম যদি হালাল সম্পদ জমা করে তা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে, তাহলে এটি যে মুসলিমদের জন্য উপকারী এবং কল্যাণজনক হবে তা আমরা অস্বীকার করতে পারি না। এতে সে যে কল্যাণ অর্জন করবে, তা কোনো দরিদ্র ব্যক্তি অর্জন করতে পারবে না।
উসমান রা., আবু বকর রা. এবং আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. প্রমুখ সাহাবিগণের ধনাঢ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ইসলাম প্রচারের কল্যাণে তাদের সম্পদ ব্যয় হয়েছে। তাই একজন মুসলিম হিসাবে হালাল সম্পদ অর্জন এবং তা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ বিষয়। ইসলাম তাতে উৎসাহিত করে। তবে শর্ত হচ্ছে, দুনিয়ার লোভে, অথবা সঞ্চয় করার উদ্দেশ্যে কিংবা নিছক সম্পদ বাড়ানোর লক্ষ্যে এসব সম্পদ অর্জন করা যাবে না।
একজন মুসলিম যদি নিজেকে আদর্শবান এবং অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তাহলে তার উচিত, আল্লাহ তাআলার ইবাদত যেমন, নামাজ আদায়, অন্যকে দ্বীন শেখানো, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা ও জীবিকা উপার্জন ইত্যাদির জন্য সময় বণ্টন করে নেওয়া। একজন মুসলিমের জন্য তার সময়কে অপরের প্রয়োজন, নিজের প্রয়োজন এবং আল্লাহ তাআলার ইবাদতের জন্য বণ্টন করে নেওয়া উচিত। সম্পদ উপার্জনের ক্ষেত্রে এই নিয়ত থাকবে যে, এই সম্পদের মাধ্যমে নিজেকে এবং পরিবারকে অন্যের মুখাপেক্ষী হওয়া থেকে রক্ষা করবে, হালাল উপার্জন থেকে তাদের প্রয়োজন নির্বাহ করবে এবং তা ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর জন্য খরচ করবে। ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর জন্য খরচ করাটা তার অনুগ্রহ নয়; বরং কাউকে খোঁটা ও কষ্ট না দিয়ে এটি করা তার কর্তব্য। কারণ, এ সম্পদ তো আল্লাহ তাআলারই। তিনি তাকে এর প্রতিনিধি বানিয়েছেন, সে কীভাবে তা ব্যয় করে তা দেখার জন্য।
ধনসম্পদ বন্টনের কথা বলায় সোশ্যালিস্ট তথা সমাজতান্ত্রিকরা আবু যর রা.-কে তাদের ইসলামিক গুরু মনে করে। আল্লাহ তাআলা তাকে তাদের একজন সদস্য হওয়া থেকে পবিত্র রেখেছেন; তিনি তাদের গুরু হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। তার ইচ্ছা ছিল, তিনি দুনিয়াবিমুখ থাকবেন এবং দুনিয়ার প্রতি আগ্রহী হবেন না। তার ইচ্ছা ছিল প্রত্যেকেই যেন আল্লাহ তাআলার রাস্তায় তাদের ধনসম্পদ ব্যয় করে। তার ইচ্ছা এটা ছিল না যে, সকল সম্পদ লোকদের মধ্যে সমানভাবে বন্টন করে দেওয়া হোক; যে কাজ করে আর যে কাজ করে না তাদের সবাকেই সম্পদ দেওয়া হোক।
উসমান রা. মুআবিয়া রা.-এর কাছ থেকে এ কথা শোনার পর আবু যর রা.-কে ডেকে পাঠান। তিনি উসমান রা.-এর কাছে আসেন এবং তার সঙ্গে এ ব্যাপারে তর্কে লিপ্ত হন। আবু যর রা. শুরুতে বলেন, রাসুল আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, সাল নামক স্থানে যখন বাড়িঘর হবে, তখন আমি যেন সেখান থেকে বেরিয়ে যাই, সাল মদিনার প্রান্তে অবস্থিত একটি এলাকার নাম। রাসুল -এর যুগে সেখানে তেমন জনবসতি ছিল না। রাসুল ছিলেন লোকদের অবস্থা সম্পর্কে সম্যক অবগত। তিনি ভালোভাবেই জানতেন যে, যখন মদিনায় নাগরিক সভ্যতা গড়ে উঠবে এবং মানুষের জীবনযাপন উন্নত হতে শুরু করবে, তখন আবু যর রা. সেখানে বসবাস করতে পারবে না। আর এটা তিনি যে খোদাভীরুতা এবং দুনিয়াবিমুখতা আঁকড়ে ধরেছেন সেটার কারণেই সম্ভব হবে না। যদি তিনি লোকেদর মধ্যে অবস্থান করেন, তাহলে নিজেকেও কষ্টে ফেলবেন এবং লোকদেরও কষ্টে ফেলবেন। এজন্যই রাসুল তাকে চলে যাওয়ার উপদেশ দিয়েছেন।
সাল থেকে চলে যাওয়ার কথা বললে উসমান রা. আবু যর রা.-কে বললেন, তাহলে এখন আপনার সিদ্ধান্ত কী? আবু যর রা. বললেন, আমি রবাযায় চলে যেতে চাই। দেখা গেল যে, আবু যর রা. নিজেই রবাযায় চলে যেতে চেয়েছেন। তখন উসমান রা. তাকে বলেছেন, তবে তা-ই করুন।¹⁰⁸ অর্থাৎ, এখানে উসমান রা. আবু যর রা.-এর ইচ্ছার সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন।
আবু যর রা. স্বেচ্ছায় এবং সজ্ঞানে রবাযার উদ্দেশে বেরিয়েছিলেন। এখানে কোনো নির্বাসন অথবা বিতাড়িত করার ঘটনা ঘটেনি। যেমনটি উসমান রা.-এর সময়ের ফিতনাবাজরা দাবি করেছে। পরবর্তী সময়ে শিয়ারাও এ দাবি করে এবং তা আজও পর্যন্ত তাদের গ্রন্থসমূহে লিপিবদ্ধ আছে। অনেক অজ্ঞ এবং অসচেতন মুসলিমও এ ফাঁদে পা দিয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে সামিত রহ.-এর বর্ণনা আমাদের উক্ত বক্তব্যকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। তিনি বলেন, উম্মে যর রা. বলেছেন, আল্লাহর শপথ! উসমান রা. আবু যর রা.-কে সফরের নির্দেশ দেননি। বরং রাসুল -ই তাকে বলেছিলেন, যখন সাল নামক স্থানে জনবসতি গড়ে উঠবে, তখন তুমি সেখান থেকে বেরিয়ে যাবে।¹⁰⁹
হাকিম রহ. বলেন, ইমাম বুখারি রহ. ও মুসলিম রহ.-এর শর্ত অনুযায়ী হাদিসটি সহিহ। যদিও তারা বর্ণনা করেননি। ইমাম যাহাবি রহ.-ও এ কথার সঙ্গে একমত হয়েছেন। উসমান রা. আবু যর রা.-এর ইচ্ছা ও আগ্রহের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তাকে সফরের জন্য উট প্রদান করেছেন। তার সেবায় দুজন গোলাম নিয়োজিত করেছেন এবং ভাতা চালু করেছেন। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে, আবু যর রা. প্রায়ই মদিনা মুনাওয়ারা ভ্রমণে আসতেন। যদি তিনি নির্বাসিত হতেন, তবে তিনি কখনোই মদিনায় প্রবেশ করতে পারতেন না। এ ছাড়া রবাযা অঞ্চলটি মরুভূমির বিচ্ছিন্ন কোনো অঞ্চল ছিল না। ইয়াকুত হামাকি রহ. এ অঞ্চল সম্পর্কে বলেন, মক্কা এবং মদিনার মধ্যকার গমনপথে রবাযা ছিল একটি উত্তম বিশ্রামস্থল। মদিনা থেকে তিন মাইল দূরে অবস্থিত। সেখানে ছিল মানুষের বসবাস। নির্মিত করা হয়েছিল মসজিদ।¹¹⁰ মসজিদ নির্মাণের মাধ্যমেই বোঝা যায় আবু যর রা. এখানে একা বসবাস করতেন না। অতএব বোঝা গেল, তাদের দাবি সম্পূর্ণ অবাস্তব। নির্বাসন, বিতাড়ন এবং বরখাস্তকরণ-এ সবই ছিল মিথ্যা অপবাদ। আবু যর রা. স্বেচ্ছায় সেখানে গিয়েছিলেন।
ষষ্ঠ অপবাদের জবাব: তাদের দাবি হচ্ছে উসমান রা. আরেক সম্মানিত সাহাবি আবু দারদা রা.-কে শাম থেকে বিতাড়িত করেছিলেন। তিনি শামের কাজি তথা বিচারক ছিলেন। তাকে বরখাস্ত করে জোরপূর্বক নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন। ফিতনার সময়ে তারা এ কথা বলেছিল। তবে পরবর্তী শিয়াদের গ্রন্থাবলিতে এ ঘটনার তেমন চর্চা হয়নি। কারণ, আবু দারদা রা.-এর প্রতি শিয়ারা সন্তুষ্ট ছিল না। আসল কথা হচ্ছে, আবু দারদা রা. ছিলেন শামের বিচারক। সত্যের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন খুবই কঠোর। এমনকি এজন্য কেউ কেউ তাকে উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর সঙ্গেও তুলনা করেছেন। আল্লাহ তাআলার হকের ক্ষেত্রে তিনি কাউকেই বিন্দুমাত্র ছাড় দিতেন না। তিনি শামের অধিবাসীদের কিছুটা কঠোরতার সঙ্গে সম্বোধন করতেন। লোকেরা এটা অপছন্দ করে। সে সময় শামের গভর্নর ছিলেন মুআবিয়া রা.। তিনি ছিলেন কোমল এবং সহনশীল প্রকৃতির। তাই একজন সম্মানিত সাহাবি হিসাবে আবু দারদা রা.-কে তিনি নিষেধ করেননি। এদিকে উসমান রা.-এর কাছে আসতে থাকে একের পর এক অভিযোগ। অবশেষে উসমান রা. আবু দারদা রা.-এর সঙ্গে আলোচনা করে তাকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। আবু দারদা রা. নিজের ইচ্ছাতেই শাম ত্যাগ করে উসমান রা.-এর প্রতিবেশী হয়ে মদিনা মুনাওয়ারায় জীবনযাপনের সিদ্ধান্ত নেন।
ইতিহাসের গ্রন্থাবলিতে এ অভিযোগকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এসব অবান্তর অভিযোগ উত্থাপন করে তারা সাধারণ লোকদের উসমান রা.-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করে তুলতে চাইত। এ ক্ষেত্রে ফিতনাবাজগোষ্ঠীর নেতৃস্থানীয়দের নীতি ছিল, তারা প্রথমে উসমান রা. কর্তৃক নিযুক্ত গভর্নরদের ওপর অপবাদ আরোপ করত। তাদের নিন্দায় লিপ্ত হতো এবং বিভিন্ন দোষারোপ করত। যদি কোনো বিশিষ্ট সাহাবি গভর্নর হতেন, তাহলে তারা চেষ্টা করত উসমান রা. এবং তাদের মধ্যে বিরোধ ঘটাতে। এসব সাহাবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা., আম্মার ইবনে ইয়াসির রা., আবু দারদা রা. এবং আবু যর গিফারি রা. প্রমুখ বিশিষ্ট সাহাবিগণ।
তাদের দাবি অনুযায়ী উসমান রা.-কর্তৃক নিযুক্ত অন্যান্য গভর্নরগণ হয়তো তার নিকটাত্মীয় ছিলেন, নয়তো ফাসেক অথবা অত্যাচারী ছিলেন। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল, সব দিক থেকে উসমান রা.-কে প্রশ্নবিদ্ধ করা। এ ক্ষেত্রে তারা এ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল যে, যখন তারা কিছুসংখ্যক লোক-সহ উসমান রা.-কে বরখাস্ত করার দাবি নিয়ে যায়, তখন মুসলিম উম্মাহ একপর্যায়ে তাদের এ জঘন্যতম দাবির পক্ষে সম্মতিও দিয়েছিল, যা ইতিপূর্বে কখনো ঘটেনি।
সপ্তম অপবাদের জবাব : শিয়াদের দাবি হচ্ছে, রাসুল ﷺ নির্বাসিত করার পরও উসমান রা. হাকাম ইবনে আবুল আস রা.-কে ফিরিয়ে এনেছে। শিয়াদের গ্রন্থাবলির বর্ণনা অনুযায়ী রাসুল ﷺ হাকাম ইবনে আবুল আস রা. এবং তার পুত্র মারওয়ানকে মদিনা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আবু বকর রা. এবং উমর রা.-এর আমলেও তারা বিতাড়িতই ছিলেন। কিন্তু উসমান রা. তাদের দুজনকে মদিনায় ফিরিয়ে এনে আশ্রয় দিয়েছেন। এর উত্তর হচ্ছে—
এক. রাসুল ﷺ-কর্তৃক হাকাম ইবনে আবুল আস রা. এবং তার পুত্রকে বিতাড়িত করার বিবরণ সিহাহ সিত্তাহ তথা হাদিসের ছয় বিশুদ্ধ কিতাবের কোনোটিতেই আসেনি। হাদিসের অন্যান্য গ্রন্থগুলোতে যে বিবরণ এসেছে, তা এসেছে মুরসাল সূত্রে। কোনো তাবেয়ি যদি সাহাবিগণের নাম উল্লেখ করা ব্যতীত সরাসরি রাসুল ﷺ-এর দিকে সম্বন্ধ করে হাদিস বর্ণনা করে, তাহলে সেটিকে মুরসাল হাদিস বলা হয়। কোনো কোনো হাদিসবেত্তার মতে মুরসাল হাদিস দুর্বল। এর মাধ্যমে দলিল দেওয়া যায় না। ইমাম নববি রহ. আত-তাকরিব ওয়াত তাইসির গ্রন্থে এটাকে অধিকাংশ মুহাদ্দিস এবং উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ফকিহ ও উসুলবিদের¹¹¹ মত আখ্যা দিয়েছেন।
দুই. এই বর্ণনার মধ্যে এমন বর্ণনাকারী রয়েছেন, যাদের ব্যাপারে সন্দেহ রয়েছে। কারও কারও ব্যাপারে মিথ্যা বলার অভিযোগও আছে।
আসুন, হাকাম ইবনে আবুল আস রা.-এর বিষয়টি আমরা গভীরভাবে পর্যালোচনা করি- হাকাম ইবনে আবুল আস রা. ছিলেন মক্কা বিজয়ের সময় ইসলাম গ্রহণকারীদের একজন। অষ্টম হিজরিতে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। মক্কা বিজয়ের সময় ইসলাম গ্রহণকারীদের ইতিহাসে তুলাকা (‘ক্ষমাপ্রাপ্ত’) নামে অভিহিত করা হয়। সংখ্যায় তারা ছিলেন ২ হাজার। হাকাম ইবনে আবুল আস রা. মক্কায় বসবাস করতেন, মদিনায় নয়। তাহলে রাসুল কীভাবে তাকে মদিনা থেকে বিতাড়িত করবেন? কেউ কেউ বলেন, তিনি মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেছিলেন। তাদের উদ্দেশে বলব, সহিহ বুখারি-তে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসুল বলেছেন, মক্কা বিজয়ের পর আর কোনো হিজরত নেই। এখন শুধু জিহাদ এবং নিয়তের সময়। অতএব যখন তোমাদের আহ্বান করা হবে তখন তোমরা বেরিয়ে পড়বে।
এই হাদিসের মাধ্যমে মক্কা বিজয়ের পর মদিনায় হিজরতকে সম্পূর্ণরূপে নিষেধ করা হয়েছে। মক্কা বিজয়কালে ইসলাম গ্রহণকারী সফওয়ান ইবনে উমাইয়া রা. যখন মদিনায় হিজরত করেন, তখন রাসুল তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। কিন্তু যখন তাকে সংবাদ দেওয়া হলো যে, সফওয়ান রা. মক্কা থেকে হিজরত করেছেন, তখন তাকে মক্কার দিকে ফিরিয়ে দেন এবং বলেন, মক্কা বিজয়ের পর আর কোনো হিজরত নেই। এখন শুধু জিহাদ এবং নিয়তের সময়। মক্কা বিজয়ের পর আব্বাস রা. রাসুল -এর কাছে এক লোককে নিয়ে যান এবং শপথ করেন যে, নবীজি ওই ব্যক্তি থেকে হিজরতের বাইআত নেবেন। এ ঘটনা ছিল মক্কা বিজয়ের পর। তখন রাসুল ওই ব্যক্তির হাত ধরে বললেন, আমি আমার চাচাকে শপথ থেকে মুক্ত করলাম। তবে মক্কা বিজয়ের পর আর কোনো হিজরত নেই।¹¹²
সুতরাং বোঝা গেল যে, হাকাম ইবনে আবুল আস রা. ছিলেন মূলত মক্কার অধিবাসী। মদিনার অধিবাসী ছিলেন না। তাই রাসুল ﷺ তাকে মদিনা থেকে বিতাড়িত করার প্রশ্নই ওঠে না। কিছু আলেম বলেন, হাকাম রা. স্বেচ্ছায় তায়েফ গমন করেছিলেন, নির্বাসিত হয়ে নয়। এই মতটি বিশুদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। কারণ, হাকাম রা. রাসুল ﷺ-এর জীবনের শেষদিকে কিছুকাল তায়েফে অবস্থান করেছিলেন।
শিয়াদের পূর্বোক্ত বর্ণনা অনুযায়ী হাকাম ইবনে আবুল আস রা. এবং তার পুত্র মারওয়ানকে মদিনা থেকে তায়েফে নির্বাসিত করা হয়েছিল। কিন্তু আমরা দেখতে পাই, অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের সময় মারওয়ানের বয়স ছিল সাত বছর। যদি রাসুল ﷺ তাঁর জীবনের শেষ দিনে এসেও তাদেরকে নির্বাসিত করেন, তখন মারওয়ানের বয়স সর্বোচ্চ ১০ বছর হওয়ার কথা। সে হিসাবে তার ওপর শরিয়তের কোনো আদেশ প্রয়োগ করা যায় না। এমন কাউকে রাসুল ﷺ নির্বাসিত করবেন তা একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার।
তর্কের খাতিরে না হয় ধরে নিলাম শিয়াদের গ্রন্থাবলিতে পাওয়া এই বর্ণনা সঠিক। রাসুল ﷺ হাকাম ইবনে আবুল আস রা.-কে তায়েফে নির্বাসিত করেছিলেন। কিন্তু শরিয়তে এমন কোনো অপরাধ নেই, যার কারণে স্থায়ীভাবে নির্বাসিত করা হয়। নির্বাসনের থাকে নির্দিষ্ট মেয়াদ, যা শেষ হওয়ার পর নির্বাসিত ব্যক্তি পুনরায় ফিরে আসে কিংবা নির্বাসিত ব্যক্তি যদি তওবা করে এবং বিচারক তার তওবাকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন, তাহলে তাকে নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই ফিরিয়ে আনা হয়। তাই হাকাম রা. যদি নির্বাসিত হয়ে থাকেন এবং উসমান রা. তাকে ফিরিয়ে আনেন, তবে এতে সমস্যার কিছু নেই।
প্রশ্ন উঠতে পারে, আবু বকর রা. এবং উমর রা. কেন ফিরিয়ে আনলেন না? অথচ এক বর্ণনা অনুযায়ী জানা যায়, উসমান রা. তাদের দুজনের কাছে এজন্য সুপারিশও করেছিলেন। তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, আবু বকর রা. এবং উমর রা.-এর সময়েও হাকাম ইবনে আবুল আস রা. নির্বাসিত ছিলেন এবং তারা দুজন তাকে ফিরিয়ে আনেননি। এর কারণ হতে পারে তিনি তখনও তওবা করেননি, পরবর্তী সময় তওবা করেছেন। কিংবা এটাও হতে পারে যে, তার নির্বাসনের মেয়াদ তখনও যথেষ্ট হয়নি। কিন্তু উসমান রা.-এর সময়ে এসে তা যথেষ্ট হয়েছে। আবার এটাও হতে পারে যে, হাকাম ইবনে আবুল আস রা. প্রথম দুই খলিফার কাছে আবেদন করেননি। কিন্তু উসমান রা.-এর কাছে আবেদন করেছিলেন।
যদি কেউ বলে যে, হাকাম ইবনে আবুল আস রা.-কে স্থায়ীভাবে নির্বাসন করা হয়েছিল, তাহলে উসমান রা. তাকে ফিরিয়ে এনেছেন এমন ধারণা করাও অসম্ভব। কারণ, রাসুল -এর নির্দেশের ব্যাপারে উসমান রা. ছিলেন খুবই সতর্ক। যদি এমনটি তিনি করতেনই তাহলে সকল সাহাবিই এ নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন। এ কাজে উসমান রা.-এর বিরোধিতা করতেন যে, রাসুল তাকে যে স্থায়ী নির্বাসনের নির্দেশ দিয়েছেন, আপনি তা লঙ্ঘন করেছেন। অথচ অন্যান্য সাহাবিগণের সঙ্গে আলি রা. নিজেও এ কাজে সহমত পোষণ করেছিলেন।
যদি প্রশ্ন করা হয়, তাহলে একজন অপরাধীর ক্ষেত্রে উসমান রা. কেন সুপারিশ করলেন?
উত্তরে বলব, এটি একপ্রকারের আত্মীয়তা রক্ষা। হাকাম রা. ছিলেন উসমান রা.-এর চাচা। সহিহ বুখারি-তে উরওয়া রহ.-এর সূত্রে আসমা রা. থেকে বর্ণিত আছে, কুরাইশরা যখন রাসুল -এর সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করেছিল, (হুদাইবিয়ার সন্ধি), সে সময় আমার মা তার পুত্রকে নিয়ে আমাকে দেখতে এলেন। তখন তিনি মুশরিক ছিলেন। আমি রাসুল-কে বললাম, আমার মা এসেছেন। তিনি আমাকে দেখতে আগ্রহী। আমি কি তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখব? তিনি বললেন, হ্যাঁ তোমার মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখো।¹¹³
উম্মুল মুমিনিন সফিয়্যা বিনতে হুয়াই রা. তার মৃত্যুর পূর্বে কিছু ইহুদি নিকটাত্মীয়ের জন্য অসিয়ত করে গিয়েছিলেন। এ ঘটনার দ্বারা ফকিহগণ দলিল দিয়েছেন যে, একজন মুসলিম তার বিধর্মী জিম্মি¹¹⁴ আত্মীয়দের জন্য অসিয়ত করতে পারবে। অতএব, যদি একজন বিধর্মীর সঙ্গে আত্মীয়তা রক্ষা বৈধ হয়ে থাকে, তাহলে মুসলিমের সঙ্গে আত্মীয়তা রক্ষা কেন বৈধ হবে না?
তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম এই সুপারিশ করে উসমান রা. ভুল করেছেন। তিনি হাকাম রা.-কে মদিনায় ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে ইজতেহাদ করেছেন। উত্তম ছিল তাকে ফিরিয়ে না আনা। কিন্তু এই কারণে কি উসমান রা.-কে আদৌ দোষারোপ করা যায়?
রাসুল ﷺ এবং হাতিব ইবনে আবি বালতাআ রা.-এর ঘটনার দিকে আমরা একটু লক্ষ্য করি- হাতিব ইবনে আবি বালতাআ রা. মক্কা বিজয়ের লক্ষ্যে রাসুল-এর প্রস্তুতির কথা মক্কার কাফেরদের কাছে ফাঁস করে দিয়েছিলেন। মক্কায় তার পরিবার-পরিজন এবং সম্পদ ছিল। তিনি এসবের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। তাই চেয়েছিলেন, মক্কার অধিবাসীরা যেন এসবের কোনো ক্ষতি না করে। তাই তিনি তাদেরকে রাসুল-এর প্রস্তুতির সংবাদ জানিয়ে দিয়েছিলেন। সহিহ বুখারি-তে আলি রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল আমাকে এবং আবু মারসাদ গানাবি ও যুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা.-কে পাঠালেন। তিনজনই ছিলাম অশ্বারোহী। তিনি বললেন, তোমরা যেতে থাকবে। যখন তোমরা রওজায়ে খাখ¹¹⁵ নামক স্থানে পৌঁছবে, সেখানে এক মুশরিক মহিলাকে দেখতে পাবে। তার সঙ্গে হাতিবের পক্ষ থেকে মুশরিকদের কাছে প্রেরিত একটি চিঠি রয়েছে। আলি রা. বলেন, রাসুল যে স্থানের কথা বলেছেন সেখানেই আমরা সেই মহিলাকে দেখতে পেলাম; সে একটি খচ্চরের পিঠে চড়ে যাচ্ছিল। আমরা তাকে বললাম, চিঠি কোথায়? সে বলল, আমার সঙ্গে কোনো চিঠি নেই। আমরা তাকে থামিয়ে খোঁজাখুঁজি করে কোনো চিঠি পেলাম না। অতঃপর বললাম, রাসুল কখনো মিথ্যা বলেন না। হয়তো তুমি চিঠি বের করবে, নইলে আমরা তোমাকে বিবস্ত্র করে হলেও চিঠি বের করব। আমাদের এ কথা শুনে সে কোমরের কাপড়ের নিচ থেকে চিঠিটি বের করে দিলো। আমরা সেই চিঠি নিয়ে রাসুল-এর কাছে চলে গেলাম। তখন উমর রা. বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, নিশ্চয় সে আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও সকল মুমিনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আমাকে অনুমতি দিন, আমি তার গর্দান ছিন্ন করে দেবো। রাসুল হাতিব রা.-কে জিজ্ঞাসা করলেন, কেন তুমি এমন কাজ করলে? হাতিব রা. বললেন, আল্লাহর শপথ! আমি আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের প্রতি কিছুতেই অবিশ্বাসী নই। আমি চেয়েছিলাম, কোনো মক্কার অধিবাসীর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আমার পরিবার এবং সম্পদের নিরাপত্তা দিক। আপনার সাহাবিগণের প্রত্যেকেরই সেখানে কেউ না কেউ আছে, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাদের পরিবার এবং সম্পদের নিরাপত্তা দেবেন। রাসুল বললেন, সে সত্য বলেছে। তাই কেউ তাকে মন্দ বলবে না। উমর রা. আবারও বললেন, নিশ্চয় সে আল্লাহ, তাঁর রাসুল এবং সমস্ত মুমিনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আমাকে অনুমতি দিন, আমি তার গর্দান ছিন্ন করে দেবো। রাসুল তখন বললেন, সে কি বদরে অংশগ্রহণ করেনি? তিনি আরও বললেন, নিশ্চয়! আল্লাহ বদরে অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে বলেছেন, তোমরা যা ইচ্ছা তাই করো, তোমাদের জন্য জান্নাত আবশ্যক হয়ে গিয়েছে। অথবা বলেছেন, তোমাদেরকে আমি ক্ষমা করে দিয়েছি। এ কথা শুনে উমর রা.-এর চক্ষুদ্বয় অশ্রুসজল হয়ে যায়। তিনি বলেন, আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলই ভালো জানেন।¹¹⁶
উসমান রা. হাকাম ইবনে আবুল আস রা.-এর ব্যাপারে যা করেছেন, এর তুলনায় হাতিব ইবনে আবি বালতাআ রা.-এর কাজ অনেক বেশি গুরুতর ছিল। তবুও রাসুল তাঁকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। হাকাম ইবনে আবুল আস রা.-কে ফিরিয়ে আনাকে ভুল তখনই বলা যাবে, যদি আমরা ধরে নিই যে, তাকে আসলেই নির্বাসিত করা হয়েছিল। হাতিব ইবনে আবি বালতাআ রা.-এর তুলনায় উসমান রা.-এর মর্যাদা অনেক বেশি। রাসুল ﷺ-এর সাক্ষ্যমতে, তিনি, আবু বকর রা. ও উমর রা.-এর পরে উসমান রা.-এর ঈমানের শক্তি পুরো মুসলিম উম্মাহর ঈমানের শক্তির সমপর্যায়ের। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, রাসুল থাকা অবস্থায় আমরা আবু বকর রা., উমর রা. ও উসমান রা.-এর সঙ্গে কারও তুলনা করতাম না। তাদের পরে অন্য সাহাবিগণের মধ্যে কোনো পার্থক্য করতাম না।¹¹⁷
রাসুল হাতিব ইবনে আবি বালতাআ রা.-এর এই মারাত্মক অপরাধ, যাকে আমরা বর্তমানে ভয়ানক বিশ্বাসঘাতকতা আখ্যা দিয়ে থাকি, তা ক্ষমা করেছেন। এমনকি তিনি হাতিব রা.-কে বিশ্বাসঘাতক বলাও সহ্য করেননি। তাহলে আমরা উসমান রা.-এর একটি ইজতেহাদকে কেন গ্রহণ করতে পারছি না? অথচ তার এই ইজতেহাদে ভুল হাতিব রা.-এর অপরাধের চেয়ে খুবই সামান্য। মজবুত ঈমান এবং সুস্থ আকিদাসম্পন্ন একজন মুসলিমের কাছে এ বিষয়টি স্পষ্ট। পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, সাহাবিগণ সম্পর্কে আমাদের বিশ্বাস হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ। অপরদিকে মুসলিম উম্মাহর প্রতি সাধারণ কোনো সাহাবির বিরূপ ধারণা ছিল না। উসমান রা.-এর এমন ধারণা থাকার তো কোনো প্রশ্নই আসে না।
শিয়ারা উসমান রা.-কে শুধু বিশ্বাসঘাতকতা অথবা নেফাকের (কপটতার) অভিযোগে অভিযুক্ত করে না; বরং দ্ব্যর্থহীনভাবে সরাসরি তাকে কাফের হিসাবে সাব্যস্ত করে। আবু বকর রা. এবং উমর-রা.-কেও একইভাবে কাফের আখ্যা দেয় তারা। তাদের এই মিথ্যা অপবাদ কতই-না নিকৃষ্ট।
অষ্টম অপবাদের জবাব: শিয়াদের দাবি হচ্ছে উসমান রা. সফরে নামাজ কসর করার সুন্নাহকে রহিত করেছেন। এই অভিযোগের ভিত্তি হচ্ছে, ২৯ হিজরিতে হজের মৌসুমে উসমান রা. মিনায় পূর্ণ নামাজ আদায় করেছেন। কিন্তু রাসুল-এর সুন্নাহ ছিল মিনায় এবং প্রতি সফরে নামাজ কসর তথা সংক্ষিপ্ত করা। রাসুল কোনো সফরে পূর্ণ নামাজ আদায় করেছেন বলে প্রমাণিত হয়নি। তাই উসমান রা.-এর এই বিষয়টি ছিল সাধারণ নীতির বিপরীত। তখন আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. এ ব্যাপারে উসমান রা.- এর সঙ্গে তর্ক করেন। আলি ইবনে আবু তালেব রা. এবং আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. প্রমুখ সাহাবিগণও আপত্তি পেশ করেন।
তখন উসমান রা. পূর্ণ নামাজ আদায়ের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, মক্কায় আমার পরিবার আছে। এখানে আমি বিয়ে করেছি, এ হিসাবে তো আমি মক্কার অধিবাসী। তখন আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. বলেন, আপনার তো মদিনাতেও পরিবার রয়েছে। আপনি মদিনাতেই আপনার পরিবারের সঙ্গে অবস্থান করে থাকেন। তখন উসমান রা. বলেন, তায়েফে আমার সম্পদ রয়েছে। আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. বলেন, আপনার এবং তায়েফের মধ্যে তিন দিনের দূরত্ব। তাই তায়েফকে আপনার শহর হিসাবে গণ্য করতে পারেন না। উসমান রা. বললেন, ইয়ামেনিদের একটি দল বলে থাকে, নিজ শহরেও নামাজ দুই রাকাত পড়া হবে। অর্থাৎ, ইলম এবং ফিকহ সম্পর্কে অজ্ঞ কিছু গ্রাম্য বেদুইন মনে করে থাকে যে, সফর এবং নিজ এলাকায় অবস্থান; উভয় অবস্থায় নামাজে কসর করা হবে। তাই তারা নিজ এলাকায়ও নামাজ কসর করে। উসমান রা. বলেন, তাই যদি তারা আমাকে নামাজ কসর করতে দেখে, তাহলে আমার মাধ্যমে দলিল পেশ করবে। আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. বললেন, যখন রাসুল -এর ওপর ওহি অবতীর্ণ হতো এবং যখন মুসলিমদের সংখ্যা কম ছিল, তখন তিনি এখানে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেছেন। আবু বকর রা. এখানে দুই রাকাত আদায় করেছেন। একইভাবে উমর রা.-ও দুই রাকাত আদায় করেছেন। এমনকি আপনিও আপনার শাসনামলের শুরুতে এখানে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেছেন। উসমান রা. কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলেন, এটি আমার মত, আমি চিন্তাভাবনা করেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি।¹¹⁸
কথা শেষে আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. উসমান রা.-এর কাছ থেকে চলে যান। এরপর তিনি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তার কাছে উসমান রা. এবং তার মধ্যকার আলোচনার কথা ব্যক্ত করেন। তখন আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, আমি আমার সঙ্গীদের নিয়ে দুই রাকাত নামাজ পড়েছিলাম। এরপর জানতে পারি যে, তিনি তার সাথিদের নিয়ে চার রাকাত পড়েছেন। তখন আমিও চার রাকাত পড়েছি। কারণ, বিরোধিতা একটি মন্দ কাজ। আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. বলেন, তিনি যে চার রাকাত পড়েছেন তা আমি জানতে পেরেছিলাম। তবুও আমি দুই রাকাত আদায় করেছি। এখন আপনি যেমনটি বললেন তাই হবে। অর্থাৎ, আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা.-ও চার রাকাত নামাজ পড়বেন, যেন তাদের মধ্যে কোনো বিরোধ না ঘটে।¹¹⁹ প্রকৃতপক্ষে এ ঘটনায় সাহাবিগণের গভীর জ্ঞানের প্রমাণ পাওয়া যায়। আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা. এবং আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. উভয়েই কসর সম্পর্কে নিজেদের মত সঠিক হওয়া সত্ত্বেও বলেছিলেন, বিরোধিতা একটি মন্দ কাজ।¹²⁰
অথচ কিছু মানুষ বলে বেড়ায় যে, আমার উম্মতের মতানৈক্য রহমতস্বরূপ। তারা মনে করে এটি একটি হাদিস। অথচ এই কথাটির কোনো ভিত্তি নেই;¹²¹ বরং কথাটি অনর্থক। কারণ, বিরোধিতা হচ্ছে মন্দ কাজ। এতে কোনো রহমত নেই।
এই কসরের ব্যাপারে ফকিহগণের মন্তব্য জেনে নেওয়া যাক। শাফেয়ি এবং হাম্বলি মাজহাব অনুযায়ী নামাজ কসর করা এবং পূর্ণ করা উভয়টিই জায়েজ। যদিও কসর করাই উত্তম। মালেকি মাজহাব অনুযায়ী কসর হচ্ছে সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। তাদের মতানুযায়ী সফর অবস্থায় নামাজে কসর করা জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করার সুন্নাহ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এর ওপর ভিত্তি করেই তারা বলেন যে, যদি আপনি মুসাফির হন এবং লোকদেরকে জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায় করতে দেখেন, তখনও মুকিমদের সঙ্গে জামাতে শরিক হওয়ার চেয়ে একাকী নামাজ কসর করাই আপনার জন্য উত্তম হবে। তবে যদি আপনার মতোই কোনো মুসাফিরকে দেখতে পান তবে তার ইকতেদা করুন। দুজনই দুরাকাত করে নামাজ আদায় করুন। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী সফর অবস্থায় নামাজে কসর করা ওয়াজিব। যদি আপনি চার রাকাত পড়ে ফেলেন, তাহলে নামাজ হয়ে যাবে, কিন্তু এমনটি করার মাধ্যমে আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে সুন্নাহর বিরোধিতা করলেন। তাই কেয়ামতের দিন নবীজি -এর সুপারিশ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। এমনকি তাদের মত হচ্ছে, যদি আপনি নামাজের প্রথম বৈঠক না করেন, তবে আপনার নামাজ বাতিল হয়ে যাবে।¹²²
দেখা গেল যে, এখানে ব্যাপারটি ইজতেহাদের। উসমান রা. এ বিষয়ে ইজতেহাদ তথা নিজ থেকে চিন্তা-গবেষণা করেছিলেন। যদিও সফরে কসর করা উত্তম এবং রাসুল থেকে এটা প্রমাণিত যে, তিনি কখনো সফরে নামাজ পূর্ণ করেননি। তবে এ বিষয়টি নিয়ে ইজতেহাদের সুযোগ ছিল। এজন্যই অন্যান্য সাহাবিগণ তার বিপরীত জবাব দিয়েও এই ইজতেহাদকে সমর্থন করেছেন। যদি এটি হারাম হতো তাহলে তারা কখনোই এমনটি করতেন না। উসমান রা. যদি ইজতেহাদে ভুলও করে থাকেন তবুও তিনি একটি সওয়াব পাবেন। কিন্তু সঠিক হয়ে থাকলে পাবেন দুটি সওয়াব। এখানে উসমান রা. নিজের মতের বেশ কিছু ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন। যেমন, মক্কায় তার বৈবাহিক সম্পর্ক থাকা, তায়েফে তার সম্পদ থাকা এবং কসর নিয়ে মানুষের বিভ্রান্তি। অতএব এ ইজতেহাদের কারণে কোনোভাবেই উসমান রা.-কে হত্যা করা বৈধ হয়ে যায় না।
নবম অপবাদের জবাব: উসমান রা. স্বজনপ্রীতি করে মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রা.-কে গভর্নর হিসাবে নিয়োগ দিয়েছেন। কারণ, তিনি ছিলেন উসমান রা.-এর নিকটাত্মীয়। এটি স্পষ্ট অপবাদ। মুআবিয়া রা. সম্পর্কে আমরা সিফফিনের যুদ্ধ এবং মুআবিয়া রা.-এর খেলাফতের আলোচনায় এ নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোকপাত করব। তবুও এখানে আমরা মুআবিয়া রা.-এর জীবনের সামান্য একটু আলোচনা উপস্থাপন করছি।
রাসুল ﷺ-এর যুগে মুআবিয়া রা. ছিলেন তার ওপর অবতীর্ণ ওহির অন্যতম লেখক। রাসুল এই মহাগুরুত্বপূর্ণ কাজে তার ওপর আস্থা রেখেছিলেন। আবু বকর রা. নিজের খেলাফতকালে তাকে শামে রোমকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানে বের হওয়া সেনাবাহিনীতে তার ভাই ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান রা.-এর স্থলাভিষিক্ত হিসাবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। উমর রা. আমর ইবনে সাদ রা.-কে বরখাস্ত করে তাকে হোমসের গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন। আমর ইবনে সাদ রা. ছিলেন একজন দুনিয়াবিমুখ এবং প্রথমসারির আনসার সাহাবি। তখন লোকেরা বলাবলি করেছিল, সাদকে বরখাস্ত করে মুআবিয়াকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে!
মুআবিয়া রা. ষষ্ঠ বা অষ্টম হিজরিতে ইসলাম গ্রহণ করেন, যার আলোচনা যথাস্থানে আসবে। উমাইর ইবনে সাদ রা. বলেন, তোমরা মুআবিয়ার ব্যাপারে কেবল উত্তম কথাই আলোচনা করো। আমি রাসুল ﷺ-কে তার ব্যাপারে বলতে শুনেছি, ‘হে আল্লাহ, তাকে হেদায়েতের মাধ্যম বানিয়ে দাও।’ ইমাম তিরমিজি রহ. হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।¹²³ একই হাদিস উমর রা. থেকেও বর্ণিত হয়েছে।
হোমসের গভর্নর হিসাবে নিয়োগের পর উমর রা. তাকে সমগ্র শাম অঞ্চলের গভর্নরের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ভয়াবহ আমওয়াস মহামারিতে একের পর এক গভর্নরের ইন্তেকালের পর তাকে এ দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়া হয়। আমরা জানি যে, গভর্নর নির্বাচনের ক্ষেত্রে উমর রা. ছিলেন খুবই বিচক্ষণ। তিনি কাউকে বরখাস্ত করার ক্ষেত্রে কোনো দ্বিধাবোধ করতেন না, চাই তিনি যত বড় সাহাবিই হন না কেন। সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা.-এর মতো বড় সাহাবিকেও তিনি বরখাস্ত করেছিলেন। ২৩ হিজরিতে শাহাদাতবরণের পূর্ব পর্যন্ত উমর রা. মুআবিয়া রা.-কে গভর্নর পদে বহাল রেখেছিলেন।
উসমান রা.-এর মৃত্যুর পর এবং মুআবিয়া রা.-এর খেলাফতের সময় সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা. বলেছিলেন, উসমান রা.-এর পর আমি এই ঘরের মালিকের চেয়ে অধিক যথাযথ ফয়সালাকারী কাউকে দেখিনি। এ কথা বলে তিনি মুআবিয়া রা.-এর ঘরের দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন।¹²⁴ মুসলিম উম্মাহর অন্যতম বিচক্ষণ ব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, আমি মুআবিয়া রা.-এর চেয়ে রাজ্য পরিচালনার অধিক যোগ্য আর কাউকে দেখিনি।¹২৫
মুআবিয়া রা. ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ, প্রাজ্ঞ এবং সহনশীল ব্যক্তি। নিজ রাজত্বের প্রতিরক্ষায় তিনি ছিলেন উত্তম ব্যবস্থাপক। মুসলিমদের সীমানার বাইরে গিয়ে ইসলাম প্রচারে তার ছিল উল্লেখযোগ্য অবদান। এ ক্ষেত্রে তিনি সর্বদা আল্লাহ তাআলার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেছেন। তিনি ছিলেন একজন প্রথম শ্রেণির মুজাহিদ। তার হাত ধরে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে প্রবেশ করেছেন অনেক অনেক লোক; বরং অনেক জাতি। প্রজাদের সঙ্গেও তার আচরণ ছিল উত্তম। প্রজারাও তাকে অনেক ভালোবাসত। ইমাম মুসলিম রহ.-সহ অনেক মুহাদ্দিস, আউফ ইবনে মালেক আশজায়ি রা.-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, আমি রাসুল -কে বলতে শুনেছি, তোমাদের মধ্যে উত্তম নেতা হচ্ছে যাদের তোমরা ভালোবাসো এবং তারাও তোমাদের ভালোবাসে। যাদের জন্য তোমরা দোয়া করো এবং তারাও তোমাদের জন্য দোয়া করে। আর নিকৃষ্ট নেতা হচ্ছে যাদের তোমরা ঘৃণা করো এবং তারাও তোমাদের ঘৃণা করে। যাদের তোমরা অভিসম্পাত করো এবং তারাও তোমাদের অভিসম্পাত করে।¹²⁶
যখন প্রজা শাসককে ভালোবাসবে এবং শাসকও প্রজাদের ভালোবাসবে, সেই শাসক হবে উত্তম শাসক। কিন্তু যদি কোনো শাসককে প্রজারা ঘৃণা করে সে হবে নিকৃষ্ট। রাসুল এই মানদণ্ড প্রণয়ন করে গিয়েছেন। এখানে মুআবিয়া রা. সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা সম্ভব নয়। তা যথাস্থানে আলোচনা করা হবে। তবে এখানে যে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি উল্লেখ করতে চাই তা হচ্ছে, উসমান রা.-ই প্রথম ব্যক্তি নন, যিনি মুআবিয়া রা.-কে গভর্নর হিসাবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। ইতিপূর্বে উসমান রা.-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিও তাকে গভর্নর হিসাবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।
দশম অপবাদের জবাব : উসমান রা. তার নিকটাত্মীয় আবদুল্লাহ ইবনে আমের ইবনে কুরাইজ রা.-কে স্বজনপ্রীতি করে বসরার গভর্নর হিসাবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এটিও তার ওপর একটি অপবাদ। আবদুল্লাহ ইবনে আমের রা. ছিলেন পিতার দিক দিয়ে বনু উমাইয়া এবং মায়ের দিক দিয়ে বনু হাশেম বংশোদ্ভূত। তার দাদির মা ছিলেন রাসুল -এর ফুফু। তিনি যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন তাকে রাসুল-এর কাছে নিয়ে আসা হয়। তাকে দেখে নবীজি রাসুল বলেছিলেন, এ তো দেখছি তোমাদের চেয়ে আমাদের সঙ্গে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ। এরপর নবীজি তার মুখে লালা দিলে আবদুল্লাহ ইবনে আমের রা. সেই লালা গিলতে শুরু করেন। রাসুল তখন বলেন, আমি আশা করি সে হবে মানুষের পানি লাভের মাধ্যম।¹²⁷ তিনি যেখানেই পা ফেলতেন সেখানেই পানির ক্ষেত্র দেখা যেত। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি রহ. আল-ইসাবা গ্রন্থে এ কথা উল্লেখ করেছেন।
আবদুল্লাহ ইবনে আমের রা.-কে ইসলামের প্রসিদ্ধ বিজেতাদের একজন গণ্য করা হয়। তার হাতেই পুরো খোরাসান অঞ্চল, পারস্য ও সিজিস্তানের একাংশ জয় হয়েছিল। কিরমান¹²⁸ অঞ্চল চুক্তি ভঙ্গ করার পর তিনি পুনরায় সে অঞ্চল জয় করেন। পারসিক অগ্নিপূজারিরা তাদের রাজত্ব পুনরুদ্ধারের যে স্বপ্ন দেখছিল, তার এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে সেই স্বপ্নের প্রদীপ একেবারেই নিভে যায়। এ কারণেই তার প্রতি পারসিকদের হৃদয়ে ছিল প্রবল বিদ্বেষ। শিয়ারা যখন সেই অঞ্চলে গমন করে তখন তারা আবদুল্লাহ ইবনে আমের রা.-সহ যেসব সাহাবি পারসিকদের রাজত্ব ধসিয়ে দিয়েছিলেন, তাদের নামে নিন্দাচার শুরু করে। যখন তিনি গভর্নর হিসাবে নিয়োগ পান, তখন তার বয়স ২৫-ও পেরোয়নি। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া গ্রন্থে ইমাম ইবনে কাসির রহ. তার সম্পর্কে বলেন, তিনিই প্রথম আরাফায় বায়তুল্লাহর হাজিগণের জন্য হাউজের ব্যবস্থা করেছিলেন এবং হাউজগুলোতে পানি প্রবাহের ব্যবস্থা করেছিলেন। মিনহাজুস সুন্নাহ গ্রন্থে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. তার সম্পর্কে বলেন, তার অনেক প্রশংসনীয় অবদান রয়েছে, লোকদের অন্তরে তার জন্য যে ভালোবাসা ছিল তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।¹²⁹
একাদশ অপবাদের জবাব: তিনি স্বজনপ্রীতি করে তার নিকটাত্মীয় মারওয়ান ইবনে হাকামকে গভর্নর হিসাবে নিয়োগ দিয়েছেন। বাস্তবতা হচ্ছে, মারওয়ান ইবনে হাকামকে গভর্নর হিসাবে কখনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি। উসমান রা. অনেক বিষয়ে তার কাছে পরামর্শ চাইতেন এবং তাকে কাছে রাখতেন। সাম্রাজ্যের কোনো অঞ্চলের গভর্নরের দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়নি। কাজি ইবনে আরাবি রহ. আল-আওয়াসিম মিনাল কাওয়াসিম গ্রন্থে বলেন, মারওয়ান ইবনে হাকাম ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি। সাহাবি, তাবেয়ি ও ফকিহগণের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র।
সাহাবিগণের মধ্যে অনেকেই তার কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। যেমন সাহল ইবনে সাদ আনসারি রা. তার থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন, যা সহিহ বুখারি-তে উল্লেখ করা হয়েছে। যাইনুল আবিদিন আলি ইবনে হুসাইন ইবনে আলি ইবনে আবু তালেব রহ.-ও তার থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। যেহেতু যাইনুল আবিদিন মারওয়ান ইবনে হাকামের হাদিসকে নির্ভরযোগ্য বিবেচনা করেছেন, সেহেতু এটিই হতে পারে শিয়াদের বিপক্ষে অন্যতম শক্তিশালী দলিল। কারণ, যাইনুল আবিদিন রহ. শিয়াদের চতুর্থ ইমাম হিসাবে গণ্য। তাদের কাছে তিনি নিষ্পাপ। তাবেয়িগণের ইমাম সাইদ ইবনে মুসাইয়িব রহ., বড়মাপের তাবেয়ি ইমাম উরওয়া ইবনে যুবায়ের রহ. ও ইরাক ইবনে মালেক রহ. প্রমুখ বিশিষ্ট তাবেয়িগণ-সহ আরও অনেকেই মারওয়ান ইবনে হাকামের কাছ থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। কেউ যদি এ ব্যাপারে আরও বিস্তারিত জানতে চান, তাহলে ইহসান ইলাহি জহির রচিত আশ-শিয়াতু ওয়াত তাশাইয়ু গ্রন্থ অধ্যয়ন করতে পারেন।
জঙ্গে জামালের ঘটনায় মারওয়ান ইবনে হাকাম বন্দি হলে আলি রা. ও তার অনুসারীরা তাকে কোনো কষ্ট দেননি। মুসলিম সমাজে তার অবস্থান বিবেচনা করেই তিনি এমনটি করেছিলেন। হাসান রা. এবং হুসাইন রা. উভয়েই তাদের পিতার কাছে সুপারিশ করেছিলেন মারওয়ানকে মুক্ত করে দেওয়ার জন্য। হ্যাঁ, এমনটিই ঘটেছিল। শিয়াদের দৃষ্টিতে হাসান রা. ও হুসাইন রা. নিষ্পাপ, তাহলে তো তাদের পিতার অবস্থান নিয়ে কোনো প্রশ্নই আসে না। সত্য তো সেটাই যে ব্যাপারে শত্রুও সাক্ষ্য দেয়।
এখন এ বিষয়ে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়—
এক. বনু উমাইয়া গোত্রের কাউকে গভর্নর নিয়োগে ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো সমস্যা আছে কি?
দুই. উসমান রা.-কর্তৃক নিযুক্ত গভর্নরদের অধিকাংশই কি তার নিকটাত্মীয় ছিলেন?
তিন. নিকটাত্মীয়দের দায়িত্ব প্রদান করা ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে হালাল না হারাম?
১ম প্রশ্নের উত্তর: বনু উমাইয়া ছিল সে সময়কার আরব গোত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ একটি গোত্র। তাদের মধ্যে ছিল অনেক বিজ্ঞ এবং নেতৃস্থানীয় লোকের উপস্থিতি। তাদের ছিল সম্মান ও আভিজাত্য। রাসুল নিজেও বহু কাজে তাদের দায়িত্ব দিয়েছেন। আমরা দেখতে পাই যে, রাসুল ﷺ-এর জীবদ্দশায় মক্কা বিজয়ের পর বনু উমাইয়া গোত্রের আত্তাব ইবনে আসিদ রা.-কে সেখানকার গভর্নর নিয়োগ করা হয়েছিল। তখন তার বয়স ২০-ও পেরোয়নি। কিন্তু রাসুল তাকেই নিয়োগ দিয়েছিলেন পৃথিবীর সর্বোত্তম শহর মক্কার গভর্নর হিসাবে। একইভাবে রাসুল নাজরানে নিয়োগ দিয়েছিলেন বনু উমাইয়া গোত্রের আবু সুফিয়ান ইবনে হারব রা.-কে। সানআ, ইয়ামেন এবং বনু মাজহিজ গোত্রের সদকা সংগ্রহের দায়িত্ব দিয়েছিলেন খালিদ ইবনে সাইদ ইবনুল আস উমাবি রা.-কে। তাইমা, খাইবর এবং উরাইনা জনপদে নিয়োগ দিয়েছিলেন উসমান ইবনে সাইদ ইবনুল আস উমাবি রা.-কে। বাহরাইনে নিয়োগ দিয়েছিলেন আবান ইবনে সাইদ ইবনুল আস রা.-কে। এর আগে এ দায়িত্ব দিয়েছিলেন আলা ইবনে হাদরামি রা.-কে। আলা ইবনে হাদরামি রা.-ও ছিলেন বনু উমাইয়ার মিত্র। রাসুল ﷺ-এর পর আবু বকর সিদ্দিক রা. এবং উমর রা. উভয়েই উপরিউক্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে কাজ নিয়েছেন। উমর রা. তাদের সঙ্গে ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান রা. এবং মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রা.-কে যোগ করেছেন। একইভাবে আবু বকর রা.-ও শামের দিকে প্রেরিত মুসলিম বাহিনীর এক-চতুর্থাংশের নেতৃত্বের জন্য ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান রা.-এর ওপর আস্থা রেখেছেন। তাই ইতিহাসের পাতায় বনু উমাইয়ার শ্রেষ্ঠত্ব এবং অবদান অনস্বীকার্য। তারা ইসলামি সাম্রাজ্যের ভিত মজবুত করেছে এবং বহু অঞ্চলে ইসলামের বাণী প্রচার করেছে। যথাস্থানে এই আলোচনা আসবে।
২য় প্রশ্নের উত্তর: উসমান রা.-এর খেলাফতকালে, নির্দিষ্ট করে যখন ফিতনার মূলহোতারা উসমান রা.-কে অপসারণ করতে চেয়েছিল, তখন ইসলামি সাম্রাজ্যের উচ্চপদে যারা আসীন ছিলেন তাদের তালিকা নিম্নরূপ— বিচারকের দায়িত্বে ছিলেন যায়দ ইবনে সাবেত আনসারি রা. বায়তুল মাল তথা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের দায়িত্বে ছিলেন উকবা ইবনে আমের জুহানি রা., হজের আমির ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস হাশেমি রা., খারাজের¹⁰⁰ দায়িত্বে ছিলেন জাবের ইবনে ফুলান মুজানি রা. ও সিমাক আনসারি (আবু দুজানা) রা., সামরিক বিষয়াদির দায়িত্বে ছিলেন কাকা ইবনে আমর তামিমি রা. এবং পুলিশ বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন বনু তাইম গোত্রের আবদুল্লাহ ইবনে কুনফুজ।
খেলাফতের উল্লেখিত এই ছয় উচ্চপদে বনু উমাইয়ার কেউ ছিলেন না। এ ছাড়া বিভিন্ন অঞ্চলে উসমান রা. কর্তৃক নিযুক্ত গভর্নরগণ হলেন, ইয়ামেন: ইয়ালা ইবনে উমাইয়া তামিমি রা.; মক্কা: আবদুল্লাহ ইবনে আমর হাদরামি রা.; হামাদান: জারির ইবনে আবদিল্লাহ বাজালি রা.; তায়েফ: কাসিম ইবনে রবিআ সাকাফি; কুফা: আবু মুসা আশআরি রা.; বসরা: আবদুল্লাহ ইবনে আমের ইবনে কুরাইজ রা.; মিশর: আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারহ রা.; শাম: মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রা.; হোমস: আবদুর রহমান ইবনে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ মাখযুমি রা.; কিননাসরিন:¹³⁰ হাবিব ইবনে মাসলামা কুরাশি হাশেমি রা.; জর্ডান: আবুল আওয়ার সুলামি রা.; ফিলিস্তিন: আলাকামা ইবনে হাকাম কিনানি; ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল: আবদুল্লাহ ইবনে কায়স ফাজারি; আজারবাইজান: আশআস ইবনে কায়স কিন্দি; পারস্যের হুলওয়ান: উতাইবা ইবনুন-নাহহাস ইজলি রা.; পারস্যের মধ্যভাগে অবস্থিত ইস্পাহান: সায়িব ইবনে আকরা সাকাফি রা.। এসব গভর্নরদের মধ্যে উসমান রা.-এর নিকটাত্মীয় কেবল দুজনকেই দেখতে পাই। তারা হলেন আবদুল্লাহ ইবনে আমের ইবনে কুরাইজ রা. এবং মুআবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রা.।
পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, মারওয়ান ইবনে হাকাম রা.-কে গভর্নর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এদিকে ওয়ালিদ ইবনে উকবা রা., যিনি মায়ের দিক দিয়ে উসমান রা.-এর আত্মীয় ছিলেন, তবে বনু উমাইয়া গোত্রের ছিলেন না। তাকে এই ফিতনার সময়ে বরখাস্ত করা হয়েছিল। তার ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা যথাস্থানে আসবে। বনু উমাইয়ার আভিজাত্য, মর্যাদা এবং প্রশাসনিক পদের যোগ্যতাসত্ত্বেও আমরা তাদের মধ্য থেকে কেবল দুজনকেই প্রশাসনিক পদে দেখতে পেয়েছি। যা শিয়াদের আরোপিত এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত করে।
৩য় প্রশ্নের উত্তর : নিকটাত্মীয় যদি যোগ্য হয় তাহলে তাদের নিয়োগ দেওয়া নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে শরিয়তের কোনো দলিল-প্রমাণ নেই। যে শিয়ারা এ নিয়ে উসমান রা.-কে অভিযুক্ত করে তাদের উদ্দেশে আমরা বলব, যদি আমরা আলি রা.-এর খেলাফতকালীন গভর্নরদের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই যে, প্রথমে ইয়ামেনে এবং পরবর্তী সময় বসরায় গভর্নর হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-কে। যিনি ছিলেন আলি রা.-এর চাচাতো ভাই। মক্কার গভর্নর ছিলেন কুসাম ইবনে আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা., তিনিও ছিলেন আলি রা.-এর চাচাতো ভাই। মিশরের গভর্নর ছিলেন মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা. (তিনি ছিলেন আলি রা.-এর ঘরে প্রতিপালিত এবং তার স্ত্রীর পুত্র। যে স্ত্রী প্রথমে আবু বকর রা.-এর বিবাহ বন্ধনে ছিলেন। আবু বকর রা.-এর মৃত্যুর পর আলি রা.-এর সঙ্গে তার বিয়ে হয়)।
খোরাসানের গভর্নর ছিলেন জাদ ইবনে হুবাইরা রা.। তিনি ছিলেন আলি রা.-এর জামাতা এবং ভাগ্নে। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে মদিনা মুনাওয়ারার গভর্নর হিসাবে ছিলেন তামাম ইবনে আব্বাস রা. এবং সাহল ইবনে হুনাইফ রা., সামরিক বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন আলি রা.-এর পুত্র মুহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়্যা রহ.। তাকে ইবনে হানাফিয়্যা বলার কারণ হলো, তার মা ছিলেন ইয়ামামার যুদ্ধে বন্দি হওয়া বনু হানাফিয়্যা গোত্রের। তার সময়ে ৩৬ হিজরিতে হজের দায়িত্বে ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা., ৩৭ হিজরিতে কুসাম ইবনে আব্বাস রা. এবং ৩৮ হিজরিতে উবাইদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.।
এসব ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়ার কারণে আলি রা.-এর ওপর অভিযোগ উত্থাপন করা হয় না। কারণ, তারা সকলেই ছিলেন দায়িত্বের উপযুক্ত। পাশাপাশি তারা ছিলেন মর্যাদা, শ্রেষ্ঠত্ব এবং দায়িত্ব গ্রহণের যোগ্য। কিন্তু আলি রা. মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের প্রতি লক্ষ্য করে যে কাজ করে গিয়েছেন, সেই একই কাজকে কেন্দ্র করে শিয়াারা উসমান রা.-এর ওপর অপবাদ আরোপ করার ঘৃণ্য অপচেষ্টা চালায়। অথচ শিয়ারা এই ধারণাও পোষণ করে যে, আলি রা. তার মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে হাসান রা.-এর জন্য, তারপর হুসাইন রা., এরপর হুসাইন রা.-এর ছেলের জন্য, এভাবে আরও অনেকের জন্য খেলাফতের অসিয়ত করে গিয়েছেন। তাদের কথিত এই মিথ্যা অসিয়ত স্বজনপ্রীতি থেকেও গুরুতর।
সুতরাং বোঝা গেল, একজন আমিরুল মুমিনিন মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের প্রতি লক্ষ রেখে চিন্তাভাবনা করে প্রশাসনিক দায়িত্ব প্রদান করে থাকেন। চাই দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিকটাত্মীয় হোক বা না হোক। বরং মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের লক্ষ্যে অথবা বিশৃঙ্খলা দমনে অপেক্ষাকৃত মর্যাদাবান লোককে বরখাস্ত করে তার তুলনায় কম মর্যাদার লোককে নিয়োগ দেওয়ার অধিকারও আমিরুল মুমিনিনের রয়েছে। যেমন, উমর রা. বরখাস্ত করেছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০জন সাহাবির একজন এবং রাসুল ﷺ-এর সম্মানিত মামা সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা.-কে। তিনি একমাত্র সাহাবি যার ওপর নবীজি তাঁর মাতাপিতাকে উৎসর্গ করেছিলেন। তাকে বরখাস্ত করে উমর রা. নিয়োগ দিয়েছিলেন তার তুলনায় কম মর্যাদার আবদুল্লাহ ইবনে উতবান রা.-কে, এরপর যিয়াদ ইবনে হানজালা রা.-কে, এরপর আম্মার ইবনে ইয়াসির রা.-কে। উমর রা.-এর এই সিদ্ধান্তে কেউই অসন্তুষ্ট হননি। আলি রা. নিজেও যিয়াদ ইবনে আবু সুফিয়ান রহ., আশতার নাখায়ি এবং মুহাম্মাদ ইবনে আবু বকর রা. প্রমুখকে গভর্নর হিসাবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। নিঃসন্দেহে তাদের তুলনায় মুআবিয়া রা. ছিলেন অধিক মর্যাদাবান। তা সত্ত্বেও নিজের চিন্তা এবং মত অনুযায়ী আলি রা. তাদের নিয়োগ দিয়েছিলেন।
দ্বাদশ অপবাদের জবাব: শিয়াদের দাবি হলো, উসমান রা. ওয়ালিদ ইবনে উকবা রা.-কে ফাসেক হওয়া সত্ত্বেও কুফার গভর্নর নিয়োগ দিয়েছিলেন। এর জবাবে কাজি ইবনুল আরাবি আল-আওয়াসিম মিনাল কাওয়াসিম গ্রন্থে বলেন, যারা ওয়ালিদ ইবনে উকবা রা.-কে ফাসেক বলবে তারা নিজেরাই ফাসেক।¹³² আবু বকর রা. তার খেলাফতকালে তাকে মিজারের যুদ্ধ চলাকালীন খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রা.-এর সঙ্গে পত্র আদান-প্রদানের জন্য বিশ্বস্ত দূত বানিয়েছিলেন। পারসিক বাহিনী এবং মুসলিম বাহিনীর মধ্যকার এ যুদ্ধের ব্যাপারে সেসব চিঠিতে ছিল অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং নির্দেশনা, যা পারসিকদের হস্তগত হলে মুসলিমদের জন্য খুব বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াত। আবু বকর রা.-এর খেলাফতকালেই দুমাতুল জান্দাল যুদ্ধে তাকে সাহায্যকারী বাহিনীর আমির বানিয়ে ইয়াজ ইবনে গানম রা.-এর সাহায্যে প্রেরণ করা হয়েছিল। ১৩ হিজরিতে আবু বকর রা. তাকে সদকা সংগ্রহের দায়িত্বে নিয়োগ দেন। তিনিই আবু বকর রা.-কে সদকা সংগ্রহ করে দিতেন। দায়িত্বশীল নিয়োগের ক্ষেত্রে আবু বকর রা. ছিলেন খুব সতর্ক ও বিচক্ষণ।
উমর ইবনুল খাত্তাব রা. ওয়ালিদ ইবনে উকবা রা.-কে বনু তাগলিব, বনু তানুখ, বনু রবিয়া এবং আরব উপদ্বীপের গোত্রসমূহের প্রতিরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত করেন। তিনি অত্যন্ত উত্তমরূপে এ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ওই অঞ্চলে বিদ্যমান খ্রিষ্টান গোত্রগুলোর মধ্যে ইসলাম প্রচার করতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু ওই সকল খ্রিষ্টান গোত্র এসে উমর রা.-এর কাছে অভিযোগ করে যে, ওয়ালিদ ইবনে উকবা রা. তাদের গোত্রের যুবক এবং শিশুদের ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করছেন। এ ছিল স্পষ্ট অপবাদ। তিনি ছিলেন একজন উত্তম চরিত্রের তরুণ মুজাহিদ এবং আল্লাহর রাস্তায় একজন নিবেদিত দাঈ। উসমান রা.-এর খেলাফতকালে তাকে কুফার গভর্নর হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পুরো পাঁচ বছর তিনি গভর্নর পদে বহাল ছিলেন। কুফার জনগণ তাকে ভালোবাসত। তিনিও তাদের ভালোবাসতেন। আতিথেয়তায় তিনি ছিলেন অনন্য। যারাই তার বাড়িতে আসত তিনি তাদের জন্য উত্তম আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতেন। তার সময়ে কুফার মানুষ বেশ সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে ছিল। পারস্য অঞ্চলে বেশ কিছু বিজয় অভিযানে তিনি ছিলেন কাণ্ডারির ভূমিকায়। আল্লাহ তাআলার পথে কারও তিরস্কারের তিনি পরোয়া করতেন না।
তাহলে শিয়ারা কেন তাকে অপবাদ দিলো এবং ফাসেক হিসাবে আখ্যায়িত করল? তারা প্রথমত এই আয়াতের মাধ্যমে দলিল দিয়ে থাকে- ‘হে মুমিনগণ, যদি কোনো পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা যাচাই করে দেখবে। যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বসো। ফলে নিজেদের কৃতকর্মের কারণে তোমাদেরকে অনুতপ্ত হতে হয়।’ [সুরা হুজুরাত : ০৬] শিয়াদের দাবি অনুযায়ী রাসুল ওয়ালিদ ইবনে উকবা রা.-কে বনু মুসতালিকের সদকা সংগ্রহের জন্য পাঠিয়েছিলেন। বনু মুসতালিকের কাছে যখন তার আগমন সংবাদ পৌঁছল তখন তারা আনন্দিত হয় এবং রাসুল-এর দূতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য বেরিয়ে আসে। এ দেখে ওয়ালিদ ইবনে উকবা রা. এই ধারণা করেন যে, বনু মুসতালিক তাকে হত্যা করার জন্য আসছে। তাই তিনি সদকা না নিয়েই ফিরে আসেন। এসে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, বনু মুসতালিক সদকা প্রদানে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এ কথা শুনে রাসুল অত্যন্ত রাগান্বিত হন। তিনি যখন নিজের ব্যাপারে বলছিলেন, তখনই বনু মুসতালিকের প্রতিনিধি দল এসে পৌঁছে। তারা এসে বলে, আমরা জানতে পেরেছি যে, আপনার দূত মাঝপথ থেকেই ফিরে এসেছে। আমরা আশঙ্কা করছি যে, আপনার পক্ষ থেকে প্রেরিত দূত ফিরে আসায় আপনি খুবই রাগান্বিত হবেন। নিশ্চয় আমরা আল্লাহ তাআলার কাছে তাঁর এবং তাঁর রাসুলের ক্রোধ থেকে আশ্রয় চাই। তখনই আল্লাহ তাআলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন।
এই আয়াত ওয়ালিদ ইবনে উকবা রা. সম্পর্কে অবতীর্ণ হওয়ার স্বপক্ষে রাসুল থেকে সরাসরি কোনো সহিহ হাদিস পাওয়া যায় না। নেই কোনো মুত্তাসিল হাদিসও¹³³। ওয়ালিদ ইবনে উকবা রা. ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন মক্কা বিজয়ের বছর অষ্টম হিজরিতে। তখন তিনি ছিলেন ছোট্ট বালক। তাহলে তার মতো কাউকে রাসুল এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য কীভাবে প্রেরণ করতে পারেন? সুতরাং, এটা স্পষ্ট যে, তিনি তখন ছোট ছিলেন। এর মাধ্যমে এটিও প্রমাণ হয়ে গেল যে, আবু বকর রা. এবং উমর রা.-এর সময়ে গভর্নর থাকাকালীন তার বয়স ছিল ২০ বছরেরও কম। তারা দুজনই ওয়ালিদ ইবনে উকবা রা.-এর প্রতি খুবই আস্থাশীল ছিলেন। কুরআন যদি তাকে ফাসেক বলে থাকে, তাহলে এ দুজন ব্যক্তি কখনোই তার ওপর আস্থা রাখতেন না। এটি অসম্ভব ব্যাপার।
তা ছাড়া শিয়ারা তার ব্যাপারে মদ পান করার অপবাদও আরোপ করেছে। তাকে এই অপবাদের লক্ষ্য বানানোর কারণ ছিল, তিনি আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে কাউকে পরোয়া করতেন না। কুফার অধিবাসীদের মধ্যে যারা হদের উপযুক্ত অপরাধ করেছিল, তাদের ওপর হদ প্রয়োগে তিনি কোনো চিন্তাভাবনা করেননি। একইভাবে তিনি এক ব্যক্তিকে হত্যার অপরাধে তিনজনকে হত্যার দণ্ড প্রয়োগ করেছিলেন। এ হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে একজন সাহাবি এবং ওয়ালিদ ইবনে উকবা রা.-এর পুত্র সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। এতে হত্যার সাজাপ্রাপ্ত ওই তিন খুনির পিতারা রাগে ফুঁসে ওঠে। তারা ছিল কুফার প্রসিদ্ধ দুষ্ট লোক। এদের একজনের ওপর উসমান রা. একবার খুব রেগে গিয়েছিলেন এবং তাকে মদিনা থেকে বিতাড়িত করে দিয়েছিলেন। এরপর সে কুফায় এসে বাস করতে থাকে। তাকে বিতাড়িত করার কারণ ছিল, সে এক মহিলার ইদ্দতের¹³⁴ সময় শেষ হওয়ার পূর্বেই তাকে বিয়ে করেছিল। সেই তিন পাপিষ্ঠ ব্যক্তি উসমান রা.-এর কাছে গিয়ে ওয়ালিদ ইবনে উকবা রা.-এর বিরুদ্ধে অত্যাচারের অভিযোগ করে। তার ব্যাপারে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে বলে যে, তারা তাকে মদ পান করতে দেখেছে। উসমান রা. তাকে ডেকে পাঠান। তিনি এসে উপস্থিত হলে উসমান রা. বলেন, তারা সাক্ষ্য দিচ্ছে, তোমাকে তারা মদ পান করে মাতাল হয়ে বমি করতে দেখেছে। তখন ওয়ালিদ রা. শপথ করে বলেন, তিনি এমনটি করেননি। তখন উসমান রা. বলেন, আমি হদ প্রয়োগ করব। যদি তারা মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে থাকে তাদের প্রত্যাবর্তনস্থল হবে জাহান্নাম।
তিনি মায়ের দিক দিয়ে উসমান রা.-এর নিকটাত্মীয় হওয়া সত্ত্বেও তার ওপর হদ প্রয়োগ করেন। বর্ণিত আছে, আলি রা. তাকে বেত্রাঘাত করেন। এরপর উসমান রা. তাকে বরখাস্ত করেন। যদি ধরেও নেওয়া হয়, তার কাছ থেকে এই গুনাহ সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু কোনো গুনাহ একজন ব্যক্তির ন্যায়পরায়ণতা এবং গ্রহণযোগ্যতাকে তখনই রহিত করে, যখন সেই ব্যক্তি গুনাহ থেকে তওবা না করে। উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বিশিষ্ট সাহাবি কুদামা ইবনে মাজউন রা.-কে হদ প্রয়োগ করেছিলেন। তিনি ছিলেন ওই সব সাহাবিগণের একজন, যারা দুই হিজরত করেছিলেন। অংশগ্রহণ করেছিলেন বদর যুদ্ধেও। তিনি যখন মদ পান করেন তখন উমর রা. তার ওপর হদ প্রয়োগ করেন। এতে তার মর্যাদা কমে যায়নি। কারণ, তিনি এই গুনাহ থেকে তওবা করে নিয়েছিলেন।
এই হলো ওয়ালিদ ইবনে উকবা রা.-এর বিরুদ্ধে আরোপিত অভিযোগের স্বরূপ। যিনি ছিলেন মহান মুজাহিদ এবং ইসলামের বিজয়ে যার রয়েছে অসামান্য অবদান।
ত্রয়োদশ অপবাদের জবাব: উসমান রা.-এর ওপর আরেকটি অপবাদ হলো, তিনি মারওয়ান ইবনে হাকামকে আফ্রিকা থেকে অর্জিত গনিমতের (যুদ্ধলব্ধ সম্পদের) পাঁচ ভাগের এক ভাগ প্রদান করেছিলেন। প্রথমত, এই বর্ণনার কোনো সূত্র নেই। এই বর্ণনার সমর্থনে কোনো সহিহ বর্ণনা পাওয়া যায় না। যদি আমরা ওপরের এই তথ্য প্রদানকারী বর্ণনাগুলো অধ্যয়ন করি, তবে দেখতে পাব যে, এগুলোর মূলে ঘুরেফিরে পূর্বোল্লেখিত সেই চারজনের কোনো একজনকে পাওয়া যাবে। হয়তো ওয়াকিদি, নতুবা মুহাম্মাদ ইবনে হিশাম কালবি, নয়তো আবু মিখনাফ লুত ইবনে ইয়াহইয়া। এদের কেউ না কেউ সূত্রে থাকবেই। আমরা জানি যে, এদের সবাই ছিল শিয়া। রাসুল -এর নামে হাদিস জাল করা এবং সাহাবিগণের নামে মিথ্যারোপ করার ব্যাপারে এরা ছিল সিদ্ধহস্ত।
সঠিক কথা হচ্ছে, উসমান রা. এক-পঞ্চমাংশের এক-পঞ্চমাংশ দিয়েছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারহ রা.-কে। উসমান রা. তাকে বলেছিলেন, তিনি যদি আফ্রিকা জয়ে সাহাসিকতাপূর্ণ অবদান রাখেন, তবে তাকে গনিমতের এক-পঞ্চমাংশের এক-পঞ্চমাংশ দান করবেন। এ কথা বলে তিনি আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারহ রা.-কে উৎসাহ প্রদান করেছিলেন। এরপর আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারহ রা. সত্যিই আফ্রিকা জয় করেন এবং উসমান রা. পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাকে গনিমতের এক-পঞ্চমাংশের এক-পঞ্চমাংশ দান করেন। এরপর আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারহ রা.-এর অধীনে থাকা কিছু সৈন্য উসমান রা.- এর কাছে অভিযোগ করে যে, আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারহ রা. গনিমতের এক-পঞ্চমাংশ দখল করেছেন। তখন উসমান রা. বলেন, আমিই তাকে এমনটি করার নির্দেশ দিয়েছি। আগত লোকেরা বললেন, এতে আমরা খুবই ক্রুদ্ধ হয়েছি। উসমান রা. বলেন, যদি তিনি রাজি হন তবে আমি তাকে ফিরিয়ে দিতে বলব। উসমান রা. আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু সারহ রা.-কে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বললে তিনি সেই এক-পঞ্চমাংশের এক-পঞ্চমাংশ ফিরিয়ে দেন।¹³⁵ যদিও শরিয়ত অনুযায়ী তার জন্য এটা গ্রহণ করা বৈধ ছিল এবং উসমান রা.-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি অর্থাৎ রাসুল ﷺ, আবু বকর রা. এবং উমর রা.-ও এমনটি করেছিলেন। তারা কারও কারও জন্য জায়গির নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। কাউকে দিয়েছিলেন বিশাল কোনো পুরস্কার। এভাবে তারা লোকদের উৎসাহ প্রদান করতেন। ইসলামের প্রতি তাদের হৃদয়কে আকৃষ্ট করতেন। উত্তম কাজের পুরস্কার প্রদান করতেন। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. তার আল-খারাজ গ্রন্থে এমন অনেক উদাহরণ উল্লেখ করেছেন।
চতুর্দশ অপবাদের জবাব : উসমান রা.-এর ব্যাপারে অপবাদ আরোপ করা হয় যে, উমর রা. ছোট লাঠি দিয়ে প্রহার করতেন, কিন্তু উসমান রা. প্রহার করেন বড় লাঠি দিয়ে। এই অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। নেই কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র। এ ব্যাপারে কোনো গ্রহণযোগ্য হাদিসও নেই।
পঞ্চদশ অপবাদের জবাব : পঞ্চদশ অপবাদ ছিল, তিনি মিম্বরে রাসুল ﷺ- এর সিঁড়িতে বসেন, অথচ আবু বকর রা. এবং উমর রা. বসেছিলেন নিচের সিঁড়িতে। কাজি ইবনুল আরাবি রহ. আল-আওয়াসিম মিনাল কাওয়াসিম গ্রন্থে বলেছেন, এই বর্ণনার কোনো সহিহ সূত্র নেই। যদি সহিহ সূত্র থেকেও থাকে, তাহলে সাহাবিগণের মধ্যে কেউই উসমান রা.-এর এই কাজে আপত্তি করেননি। আর যদি সাহাবিগণ আপত্তি করতেন, তাহলে আমরা বলতাম, এই আপত্তির কারণে কিছুতেই উসমান রা.-এর রক্ত হালাল হয়ে যায় না। তাকে হত্যা করা বৈধ হয়ে যায় না।
মুহিব্বুদ্দিন খতিব রহ. আল-আওয়াসিম মিনাল কাওয়াসিম নামক গ্রন্থের টীকায় বলেন, যদি উসমান রা. সম্পর্কে এই বর্ণনা সহিহ হয়ে থাকে, তবে এর পক্ষে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে। উসমান রা.-এর সময়ে এসে মসজিদে নববির আয়তন অনেক বৃদ্ধি করা হয়েছিল। উসমান রা. এই সংস্কার কাজে তার নিজস্ব সম্পদ ব্যয় করেছিলেন। এ সময় মসজিদে নববির আয়তন দাঁড়ায় ১২০x১০০ গজ। তখন যদি উসমান রা. মিম্বরের নিচের সিঁড়িতে বসতেন তাহলে মসজিদে আগত সকল মুসল্লি তাকে দেখতে পেত না। ফলে তিনি মিম্বরের ওপরের সিঁড়িতে বসেছেন, যেন সবাই সমানভাবে দেখতে পায়। এই ব্যাখ্যা তখনই প্রযোজ্য হবে, যখন 'উসমান রা. রাসুল ﷺ-এর সিঁড়িতে বসেছেন' এই বর্ণনা প্রমাণিত হবে।
ষোড়শ অপবাদ: উসমান রা. বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি।
সপ্তদশ অপবাদ: তিনি উহুদের যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পলায়ন করেছিলেন।
অষ্টাদশ অপবাদ: বাইআতে রিদওয়ানে তিনি ছিলেন অনুপস্থিত।
ইতিপূর্বে উসমান রা.-এর জীবনী নিয়ে আলোচনা করার সময় আমরা উপরিউক্ত এই তিনটি অপবাদের জবাব দিয়েছি। এ ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. যে কথা বলেছেন তা উল্লেখ করাই আমাদের জন্য যথেষ্ট। সহিহ বুখারি-তে উসমান ইবনে মাওহাব রহ.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, মিশরের এক ব্যক্তি হজের উদ্দেশ্যে বায়তুল্লাহ শরিফে আসেন। তিনি এসে কিছু লোককে একসঙ্গে বসা দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ওই লোকেরা কারা? উপস্থিত লোকেরা জবাব দিলেন, তারা কুরাইশ গোত্রের লোক। লোকটি বললেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি কে? লোকেরা জবাব দিলো, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.। এরপর লোকটি আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এর কাছে গিয়ে বললেন, ইবনে উমর, আমি আপনাকে একটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতে চাই। আশা করি আপনি আমাকে উত্তর দেবেন। উহুদ যুদ্ধে উসমান রা.-এর পলায়নের ব্যাপারে কি আপনি জানেন? আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, হ্যাঁ, জানি। লোকটি বললেন, আপনি কি জানেন, তিনি যে বদর যুদ্ধেও ছিলেন না? আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, হ্যাঁ, জানি। লোকটি বললেন, আপনি কি জানেন, তিনি বাইআতে রিদওয়ানেও ছিলেন না। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, হ্যাঁ, জানি। লোকটি বললেন, আল্লাহু আকবার।
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. লোকটিকে বললেন, আসুন, আপনাকে শোনাই সে কথা। উহুদ যুদ্ধে তিনি যে পালিয়েছিলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। যদি বদর যুদ্ধে তার অনুপস্থিতির কথা বলি, রাসুল ﷺ-এর কন্যা ছিলেন উসমান রা.-এর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ। বদর যুদ্ধের সময় নবীজির কন্যা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। উসমান রা.-কে থাকতে হয়েছিল অসুস্থ স্ত্রীর দেখাশোনায়। তখন রাসুল তাকে বলেছিলেন, যারা বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে তুমিও তাদের মতোই সওয়াব পাবে এবং গনিমতের অংশ পাবে। বাইআতে রিদওয়ানে তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। কারণ, মক্কার লোকদের কাছে তিনি ছিলেন মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠ। এজন্য রাসুল তাকে পাঠিয়েছিলেন মক্কার লোকদের সঙ্গে সমঝোতা করার জন্য। তিনি মক্কায় যাওয়ার পর বাইআতে রিদওয়ান সংঘটিত হয়েছিল। তখন রাসুল তার ডান হাত রেখে বলেছিলেন, এটি আমার হাত, অপরটি উসমানের হাত। এই বলে তিনি আমার পক্ষ থেকে বাইআত গ্রহণ করেছিলেন। এরপর আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. লোকটিকে বললেন, এখন আপনি এই কথাগুলো গভীরভাবে ভেবে দেখুন।¹³⁶
উনবিংশতম অপবাদের জবাব: উসমান রা. হুরমুযান হত্যার বদলায় উবাইদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-কে হত্যা করেননি। এখানে খুবই জটিল একটি বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে। উমর ইবনুল খাত্তাব রা. ২৩ হিজরিতে অগ্নিপূজারি আবু লুলুর হাতে শহিদ হন। সেদিন আবু লুলু আরও সাতজন সাহাবিকে হত্যা করে এবং আরও কিছু সাহাবিকে আহত করে। একই সঙ্গে সে নিজেও আত্মহত্যা করে।
উমর রা.-কে আঘাত করা হয় ২৩ হিজরির ২৭ জিলহজ। সেদিনই তিনি ইন্তেকাল করেননি। জিলহজের শেষ রাতে ইন্তেকাল হয়েছিল তাঁর। এই সময়ের মধ্যে আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর রা. উমর রা.-এর কাছে আসেন। তিনি এসে বলেন, আমি একবার হুরমুযানকে আবু লুলুর সঙ্গে কানাঘুষা করতে দেখলাম। তখন তাদের ব্যাপারে আমার সন্দেহ সৃষ্টি হলে আমি তাদের কাছাকাছি যাই এবং অতর্কিতভাবে তাদের ওপর হামলা করে বসি। তখন তাদের কাছ থেকে দুই মাথাবিশিষ্ট একটি খঞ্জর পড়ে যায়। এ ঘটনা শোনার পর উপস্থিত লোকেরা গিয়ে উমর রা.-কে যে খঞ্জর দিয়ে আঘাত করা হয়েছে তা অনুসন্ধান করে দেখতে পায় যে, আবদুর রহমান রা.-এর বর্ণনার সঙ্গে খঞ্জরটির বৈশিষ্ট্য হুবহু মিলে যাচ্ছে। তখন সবাই নিশ্চিত হয়ে যায় যে, আবু লুলুর সঙ্গে হুরমুযানও এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল। হুরমুযান ছিল এক প্রবীণ পারসিক সেনাপতি। সে প্রথমে রাসুল ﷺ-এর সঙ্গে ওয়াদা ভঙ্গ করে। এরপর উমর রা.-এর সঙ্গে তিন বার ওয়াদা ভঙ্গ করে। এরপর ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিয়ে মদিনাতেই স্থায়ী হয়ে যায়। হত্যাকাণ্ডে হুরমুযানের জড়িত থাকার কথা উমর রা.-এর পুত্র উবাইদুল্লাহ রা.-এর কানে পৌঁছে যায়। তখনই তিনি কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। কিন্তু উমর রা.-এর ইন্তেকালের পর তিনি তাঁর তরবারি নিয়ে বেরিয়ে যান এবং হুরুমুযানকে হত্যা করেন। মূলত এটি খুবই জটিল একটি বিষয়।
এখন আমরা লক্ষ্য করি, ইসলামি সাম্রাজ্যের ন্যায়পরায়ণতার পরিধির প্রতি। এ ঘটনার পর উসমান রা. বিশিষ্ট মুহাজির এবং আনসার সাহাবিগণকে নিয়ে একত্র হন। তাদের আলোচনার বিষয় ছিল, উবাইদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এর পিতা এবং খলিফার হত্যাকাণ্ডে যে ব্যক্তির জড়িত থাকার ব্যাপারে সকলেই নিশ্চিত, এমন ব্যক্তিকে হত্যা করার কারণে উবাইদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এর ওপর শরয়ি হদ তথা শাস্তি প্রয়োগ করা হবে কি না? সাহাবিগণের মধ্যে এ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কথা চলতে থাকে। তখন উসমান রা. উপস্থিত লোকদের উদ্দেশে বলেন, ‘এই ব্যক্তির (উবাইদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এর) ব্যাপারে আপনারা আমাকে পরামর্শ দিন। সে ইসলামের যা ক্ষতি করার, তা তো করেছেই। উমর রা.-এর মৃত্যুর তিন দিন পর এই বৈঠক বসে। এ সময় উবাইদুল্লাহ ইবনে উমর রা. সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস রা.-এর ঘরে বন্দি ছিলেন।’ তখন আলি ইবনে আবু তালেব রা. বলেন, আমার মত হচ্ছে, তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া। তখন অন্যান্য মুহাজির এবং আনসারি সাহাবিগণ বললেন, গতকালই উমর ইবনুল খাত্তাব শহিদ হলেন, আজ তার ছেলেকেও হত্যা করা হবে! তখন আমর ইবনুল আস রা. বললেন, আমিরুল মুমিনিন, আল্লাহ তাআলা আপনাকে এ থেকে পরিত্রাণ দিয়েছেন। এ ঘটনা যখন সংঘটিত হয়; তখন আপনার হাতে ক্ষমতা ছিল না। তাই আপনার পক্ষ থেকে এটি ছেড়ে দিতে পারেন। তখন উসমান রা. খানিক নীরবতা অবলম্বন করে বললেন, আমি নিহত ব্যক্তির অভিভাবক। আমি এই হত্যার জন্য দিয়তের (রক্তপণ) ফয়সালা করলাম এবং তা আমার নিজস্ব সম্পদ থেকে পরিশোধ করব।¹³⁷
ইবনে তাইমিয়া রহ. মিনহাজুস সুন্নাহ গ্রন্থে এ ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, যদি হত্যাকারী ইজতেহাদ করেন এবং বাহ্যিক নিদর্শনের ভিত্তিতে হত্যা করা বৈধ মনে করে থাকেন, তাহলে এই ইজতেহাদকে এমন সংশয় আখ্যা দেওয়া যেতে পারে, যার ফলে হত্যার বিধান রহিত হয়ে যায়।¹³⁸
এ ঘটনার ব্যাখ্যা খুবই শক্তিশালী। আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর রা.-এর সাক্ষ্য থেকে স্পষ্ট যে, হুরমুযান আবু লুলুর সঙ্গে উমর রা.-কে হত্যার ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিল। তিনি আবু লুলুর হাতে যে খঞ্জর দেখতে পেয়েছিলেন, হুবহু সেই খঞ্জর দিয়েই উমর রা.-কে আঘাত করা হয়েছে। এ থেকে সন্দেহ নিশ্চয়তায় রূপ নেয়। উমর রা.-এর মৃত্যুর পর তখনও উসমান রা.-কে খলিফা হিসাবে নির্বাচিত করা হয়নি। তাই উবাইদুল্লাহ রা.-ই ছিলেন পিতার অভিভাবক। তাই তিনি নিজের ইজতেহাদ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সাহাবিগণের মধ্যে কেউই উবাইদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এর এই ইজতেহাদ এবং ব্যাখ্যার সঙ্গে সহমত পোষণ করেননি। তথাপি যেহেতু ইজতেহাদের ভিত্তিতেই হত্যা করা হয়েছে, তাই উসমান রা. নিজস্ব সম্পদ থেকে উবাইদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-এর পক্ষে দিয়ত তথা রক্তপণ আদায় করেছেন।
এর আগে হাবরুল উম্মাহ তথা মুসলিম উম্মাহর জ্ঞানী ব্যক্তি হিসাবে খ্যাত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.-এর সঙ্গে উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর একটি কথোপকথন হয়েছিল। আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার পর উমর রা. ইবনে আব্বাস রা.- কে ডেকে বলেছিলেন, তুমি এবং তোমার পিতা আশা করতে, মদিনায় পারসিকদের বসবাস বৃদ্ধি পাক। অর্থাৎ, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এবং তার পিতা আব্বাস রা. উভয়েই চাইতেন যে, মদিনা মুনাওয়ারায় পারসিকদের আগমন বৃদ্ধি পাক। ইসলাম গ্রহণ করে এখানেই স্থায়ী হয়ে তারা ইসলামি অনুশাসনের কাছাকাছি অবস্থান করুক। উমর ইবনুল খাত্তাব রা. এমনটি অপছন্দ করতেন এবং আগে থেকেই পারসিকদের বিশ্বাসঘাতকতার আশঙ্কা করতেন। উমর রা.-এর কথার জবাবে ইবনে আব্বাস রা. বলেছিলেন, আপনি যদি চান তাদের সবাইকে আমরা হত্যা করি, তবে তাই করব। শুধু হুরমুযানকেই নয়; বরং মদিনায় অবস্থানরত সকল পারসিকদের কথা বলেছেন তিনি। কারণ, তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কারণে তাদের ওপর হদ প্রয়োগে শরয়ি কোনো বাধা নেই। শাসক চাইলে তাদের হত্যাও করতে পারেন। তখন উমর রা. বললেন, তুমি ভুল বললে। তারা তোমাদের ভাষায় কথা বলার পর এবং তোমাদের কেবলামুখী হয়ে নামাজ আদায় করার পর তোমরা কি এমনটি করতে পারবে?¹³⁹
এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, উমর রা.-এর হত্যাকাণ্ডের সময় মুসলিমদের মধ্যে এমন লোকও ছিলেন, যিনি একজনের কারণে মদিনায় অবস্থানরত সকল পারসিকদের হত্যা করা বৈধ মনে করতেন। কারণ, তারা পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে এবং খলিফাতুল মুসলিমিন উমর রা.-কে হত্যার চক্রান্ত করেছে। যে ব্যক্তি এমনটি মনে করতেন, তিনি সাধারণ কোনো লোক ছিলেন না। তিনি ছিলেন মুসলিম উম্মাহর জ্ঞানী হিসাবে খ্যাত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.। নিঃসন্দেহে এবং নিশ্চিতভাবেই তিনি ছিলেন উবাইদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে অধিক প্রজ্ঞাবান। তাই উসমান রা. নিজস্ব সম্পদ থেকে রক্তপণ আদায় করে দেন এবং হুরমুযানকে হত্যার কারণে উবাইদুল্লাহ ইবনে উমর রা.-কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।
বিংশতম অপবাদের জবাব: উসমান রা. কেবল তার নিকটাত্মীয়দেরই দান করতেন। অন্যান্য সাধারণ মুসলিমদের দান করতেন না। এটিও তার ওপর একটি অপবাদ। উসমান রা. বলেন, আমি আমার পরিবার-পরিজনকে ভালোবাসি ও তাদের দান করি। তবে তাদের প্রতি এই ভালোবাসা আমাকে কোনো অন্যায়ের প্রতি ধাবিত করেনি। বরং আমি তাদের প্রাপ্য অধিকার যথাযথ আদায় করি। তাদের আমি দান করি আমার নিজস্ব সম্পদ থেকে। মুসলিমদের সম্মিলিত সম্পদ থেকে কিঞ্চিৎ পরিমাণও আমি নিজের জন্য অথবা অন্য কোনো মুসলিমের জন্য বৈধ মনে করি না। আমি রাসুল ﷺ, আবু বকর রা. ও উমর রা.-এর সময়েও আমার সম্পদ থেকে অনেক দান করেছি। অথচ তখন আমি ছিলাম সম্পদের প্রতি আগ্রহী। এখন আমি বার্ধক্যে উপনীত হয়েছি। আমার পরিবারের দায়ভার আমার কাঁধে এসেছে। আমি আমার সম্পদ পরিবারের জন্য ব্যয় করেছি, এ সময়ে এসে বেদ্বীন ব্যক্তিরা এমন আপত্তিকর কথা বলছে।¹⁴⁰
এ কথা প্রসিদ্ধ যে, উসমান রা. প্রতি শুক্রবারে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একজন করে দাস মুক্ত করতেন। তিনি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা., আম্মার ইবনে ইয়াসির রা., খাব্বার ইবনে আরাত রা. এবং যুবায়ের ইবনুল আওয়াম রা. প্রমুখ সাহাবিকে জায়গির প্রদান করেছিলেন, যারা তার আত্মীয় ছিলেন না। অপরদিকে তিনি তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা.-এর কাছে প্রাপ্য ৫০ হাজার দিরহাম মাফ করে দিয়েছিলেন। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. মিনহাজুস সুন্নাহ গ্রন্থে এর সঙ্গে যোগ করে আরও বলেন, মারওয়ান ইবনে হাকাম রা.-কে আফ্রিকার গনিমতের এক-পঞ্চমাংশ প্রদানের যে অভিযোগ করা হয়েছে, তা যদি সত্যও হয়ে থাকে, তবে এতে উসমান রা.-এর কোনো অন্যায় নেই। কারণ, উসমান রা. এখানে মুসলিমদের সদকার সম্পদ থেকে বন্টন করেছেন। তিনি ধনী হলেও এই সম্পদে তারও অধিকার রয়েছে। তিনি সুরা আনফালের নিম্নোক্ত আয়াতে উল্লেখিত আত্মীয়দের অংশের কথা উল্লেখ করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘জেনে রাখো, যা-কিছু তোমরা গনিমত হিসাবে পাবে তার এক- পঞ্চমাংশ আল্লাহ তাআলা, তাঁর রাসুল, নিকটাত্মীয়, এতিম-অসহায় এবং মুসাফিরদের জন্য বরাদ্দ।’ [সুরা আনফাল : ৪১] হাসান বসরি রহ. ও আবু সাওর রহ. প্রমুখের মতে উক্ত আয়াতে যে আত্মীয়ের কথা বলা হয়েছে, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, যিনি নেতা অথবা শাসক হবেন তার আত্মীয়। রাসুল -ও তাঁর আত্মীয়দের এ থেকে দান করতেন। কারণ, তিনি তখন মুসলিমদের নেতা ছিলেন। রাসুল ﷺ-এর পরবর্তী প্রত্যেক শাসকের জন্যই এই অধিকার রয়েছে। তিনি চাইলে এই এক-পঞ্চমাংশ থেকে তার আত্মীয়স্বজনকে দান করতে পারেন।¹⁴¹ এই জবাব তখনই দেওয়া যেতে পারে, যখন শিয়াদের আরোপিত এই অপবাদকে সত্য বলে ধরা হবে। যদিও শুরু থেকেই তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
বিদ্রোহীরা উসমান রা.-এর বিরুদ্ধে এ ২০টি অভিযোগ একত্র করে বসরা, কুফা এবং মিশর থেকে সংঘবদ্ধ হয়ে মদিনায় উসমান রা.-এর উদ্দেশে রওনা হয়। ৩৫ হিজরির জিলকদ মাসের চাঁদ উদিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা মদিনায় এসে পৌঁছে এবং এসব অভিযোগ নিয়ে উসমান রা.-এর মুখোমুখি হয়।
টিকাঃ
৮৭. তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৪/২৯; তারিখুত তবারি, ৪/৩৪০
৮৮. সিলসিলাতুল আহাদিসিয যয়িফা ওয়াল মাওযুয়া, ২/১৩৬
৮৯. তারিখুত তবারি, ৪/৩৪১; তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৪/২৯; আল-কামিল ফিত তারিখ, ২/৫২৬
৯০. আল-কামিল ফিত তারিখ, ২/৪৮৪; তারিখুত তবারি, ৪/২৮৩
৯১. তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৩৯/৪৮৭; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২১৮
৯২. খারেজি: উসমান রা.-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারী ও তার হত্যাকারীদের খারেজি বলা হয়।-সম্পাদক
৯৩. কসর: চার রাকাত ফরজ নামাজকে দুই রাকাত পড়া।-সম্পাদক
৯৪. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১/৪৭৫; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২৮৮
৯৫. তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৬/২৯
৯৯. অর্থাৎ ১০ দিরহাম (দুই তোলা সাড়ে সাত মাশা বা ৩০.৬১৮ গ্রাম রুপা) মূল্যমানের কোনো বস্তু চুরি করা।-সম্পাদক
১০০. সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হলেও পিতা তাকে প্রহার করতে পারবে। আবু বকর রা. তার মেয়ে আয়েশা রা.-কে শাসনের জন্য তার কোমরে আঘাত করেছিলেন। ইবনে উমর রা. তার ছেলে বিলাল রহ.-কে শাসনের জন্য চড় মেরেছিলেন। তবে তাকে এমনভাবে প্রহার করা যাবে না, যার ফলে হাড় ভেঙে যায় বা শরীরে দাগ পড়ে যায়। সহিহ বুখারি, ৩৪৬৯ (শামেলা); মুসনাদুত তয়ালিসি, ২০০৬ (শামেলা); আল-জামিউ লি আহকামিল কুরআন, ৫/১৭২ (শামেলা); ইমদাদুল আহকাম, ৪/১৩৪-১৩৫; -সম্পাদক
১০১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/২৪৪; আল-আওয়াসিম মিনাল কাওয়াসিম, ১/৬৯
১০২. আল-ফাসল ফিল-মিলালি ওয়াল আহওয়া ওয়ান নিহাল, ২/৬৫
১০৩. সহিহ বুখারি, ২৪১৯; সহিহ মুসলিম, ৮১৮; সুনানু আবি দাউদ, ১৪৭৫; সুনানুত তিরমিজি, ২৯৪৩
১০৪. সাত হরফ : প্রণিধানযোগ্য মতানুসারে সাত হরফ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো কেরাতের সাত ধরনের ভিন্নতা। এ মতটিই গ্রহণ করেছেন ইমাম মালেক রহ., ইবনে কুতাইবা রহ., আবু বকর বাকিল্লানি রহ., ইবনে জাযারি রহ. ও আবুল ফজল রাজি রহ.। আর সাত ধরনের ভিন্নতা হলো-১. একবচন, দ্বিবচন, বহুবচন, পুঃলিঙ্গ ও স্ত্রীলিঙ্গ শব্দ নিয়ে ভিন্নতা। ২. অতীতকালবাচক, ভবিষ্যৎকালবাচক, বর্তমানকালবাচক ও আদেশবাচক ক্রিয়া নিয়ে ভিন্নতা। ৩. হরকত নিয়ে ভিন্নতা। ৪. শব্দ কমবেশি করা নিয়ে ভিন্নতা। ৫. শব্দ আগে-পরে হওয়া নিয়ে ভিন্নতা। ৬. শব্দ নির্ধারণ নিয়ে ভিন্নতা। ৭. উচ্চারণপদ্ধতি নিয়ে ভিন্নতা। মানাহিলুল ইরফান, ১/১৫৫-১৫৭; উলুমুল কুরআন (মুফতি তাকি উসমানি), পৃ. ১০৬-১০৯।-সম্পাদক
১০৫. সহিহ বুখারি, ২৩৭০; সুনানু আবি দাউদ, ৩০৮৩
১০৬. আল-কামিল ফিত তারিখ, ২/৪৮৪; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১৭৫
১০৭. তারিখুত তবারি, ৪/২৮৩; আল-কামিল ফিত তারিখ, ২/৪৮৪; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১৭৫
১০৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১৭৫; তারিখু ইবনি খালদুন, ২/৫৮৮; তারিখুত তবারি, ৪/২৮৪
১০৯. আল-মুসতাদরাক লিল হাকিম, ৫৪৬৮
১১০. তারিখুল বুলদান, ৩/২৪
১১১. উসুলবিদ: ইসলামি ফিকহের উৎসসমূহ নিয়ে গবেষণায় পারদর্শী ব্যক্তিকে উসুলবিদ বলা হয়।-সম্পাদক
১১২. আল-মুসনাদ লিল ইমাম আহমাদ, ১৫৫৫০
১১৩. সহিহ বুখারি, ৫৯৭৯; সহিহ মুসলিম, ১০০৩
১১৪. জিম্মি: ইসলামি রাষ্ট্রে রাষ্ট্রপ্রধান কর্তৃক অনুমতিপ্রাপ্ত বসবাসকারী অমুসলিম।-সম্পাদক
১১৫. রওজায়ে খাখ : মদিনা মুনাওয়ারা থেকে পায়ে হেঁটে একদিনের দূরত্বে অবস্থিত একটি স্থান, যে স্থানটিকে রাসুল-সহ পরবর্তী খলিফাগণ চারণভূমি বানিয়েছিলেন। (উইকিপিডিয়া)-সম্পাদক
১১৬. সহিহ বুখারি, ৩৯৮৩; সহিহ মুসলিম, ২৪৯৪
১১৭. সহিহ বুখারি, ২৬৯৭; সুনানু আবি দাউদ, ৪৬২৭
১১৮. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১৭৩; তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৩৯/২৫৬
১১৯. আল-কামিল ফিত তারিখ, ২/৪৭৬; তারিখুত তবারি, ৪/২৬৮
১২০. বিরোধিতা একটি মন্দ কাজ : এখানে ইবনে মাসউদ রা. বোঝাতে চেয়েছেন, তার মত ও উসমান রা.-এর মত উভয়টি ইজতেহাদসম্মত ও বৈধ। তবুও নিজের ইজতেহাদসম্মত মত ছেড়ে দিয়ে উসমান রা.-এর মত গ্রহণ করেছেন। কারণ, ইজতেহাদের আওতাভুক্ত ক্ষেত্রে খলিফার মত গ্রহণ করা আবশ্যক। এ ক্ষেত্রে বিপরীত আমল মন্দ ও নিন্দনীয়।-সম্পাদক
১২১. আমার উম্মতের মতানৈক্য রহমতস্বরূপ : এ কথাটির উদ্দেশ্য হচ্ছে আমার উম্মতের মুজতাহিদ আলেমগণের মতানৈক্য রহমতস্বরূপ। সূত্র: আস-সিরাজুল মুনির শারহুল জামিয়িস সগির, ১/৬৮। এ কথাটি কিছু গ্রন্থে রাসুল ﷺ-এর হাদিস হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু এর কোনো সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই এটিকে হাদিস বলা যাচ্ছে না। তবে এটি হাদিস না হলেও মনীষীদের বক্তব্য থেকে এর সমর্থন পাওয়া যায়। যেমন ইমাম মালেক রহ. বলেছেন- ‘নিশ্চয় আলেমগণের মতানৈক্য আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এ উম্মতের জন্য রহমত।’ কাশফুল খফা, ১/৬৬ (শামেলা)। খুব সম্ভব গ্রন্থকার এখানে বুঝাতে চেয়েছেন যে, সাধারণ ব্যক্তিদের মতানৈক্য একটি গর্হিত কাজ আর মুজতাহিদ আলেমগণের মতানৈক্য রহমত। এজন্য তিনিও একটু পরেই কসর নামাজ বিষয়ে মুজতাহিদ ফকিহগণের মতামত উল্লেখ করেছেন।-সম্পাদক
১২২. আর যদি প্রথম বৈঠক করেন তাহলে সাহু সেজদা দিয়ে নিলেই নামাজ আদায় হয়ে যাবে। হাশিয়াতু ইবনি আবিদিন, ২/১২৮; (শামেলা)-সম্পাদক
১২৩. সুনানুত তিরমিজি, ৩৮৪৩
১২৪ তারিখ মাদিনাতি দিমাশক, ৫৯/১৬১; তারিখুল ইসলাম, ৪/১৬২; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৩/১৫০; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮/১৪২
১২৫. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮/১৪৩
১২৬. সহিহ মুসলিম, ১৮৫৫; সুনানুদ দারিমি, ২৮৩৯
১২৭. আল-মুসতাদরাক লিল হাকিম, ৩/৭৪১; আল-ইসতিয়াব, ৩/৯৩২; আল-ইসাবা, ৫/১৪
১২৮. কিরমান: বর্তমান ইরানের একটি শহর।-সম্পাদক
১২৯. মিনহাজুস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যা, ৬/২৪৮
১৩০. কিননাসরিন : বর্তমান সিরিয়ার আলেপ্পোতে অবস্থিত একটি বিলুপ্ত ঐতিহাসিক অঞ্চল।-অনুবাদক
১৩২. আল-আওয়াসিম মিনাল কাওয়াসিম, ৮৯
১৩৩. মুত্তাসিল হাদিস: অবিচ্ছিন্ন সূত্র পরম্পরায় বর্ণিত হাদিস।-সম্পাদক
১৩৪. ইদ্দত: কোনো মহিলা তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার পর বা স্বামী মারা যাওয়ার পর নির্ধারিত কিছু নিয়ম মেনে নির্দিষ্ট সময় পার করাকে বুঝায়, যা ক্ষেত্রভেদে তিন মাসিক, তিন মাস, সন্তান প্রসব ও চার মাস ১০ দিন পর্যন্ত দীর্ঘ হয়ে থাকে।-সম্পাদক
১৩৫. আল-কামিল ফিত তারিখ, ২/৪৬২; আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১৭০; তারিখুল ইসলাম, ৩/১০৭
১৩৬ সহিহ বুখারি, ৩৬৯৮; সুনানুত তিরমিজি, ৩৭০৬; আল-মুসনাদ লিল ইমাম আহমাদ, ৫৭৭২
১৩৭. আল-ইসাবা, ৫/৪২-৪৩; আল-কামিল ফিত তারিখ, ২/৪৪৭; তারিখু ইবনি খালদুন, ২/৫৭১
১৩৮. মিনহাজুস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যা, ৬/২৮০
১৩৯. তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৪৪/৪১৬; উসদুল গাবা, ৪/১৫৩
১৪০. তারিখু মাদিনাতি দিমাশক, ৩৯/৩১৪; তারিখুত তবারি, ৪/৩৪৭; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১/১৯১
১৪১. মিনহাজুস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যা, ৬/৩৫৫