📄 মনগড়া হাদিস রচনাকারীদের শ্রেণিভাগ
নবীজি ﷺ-এর নামে মনগড়া এবং বানোয়াট কথার রচয়িতাদেরকে আলেমগণ কয়েক শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। যথা:
১. জিন্দিক
যখন কোনো ব্যক্তি দ্বীন থেকে বেরিয়ে যায় এবং সজ্ঞানে দ্বীনকে আঘাত করে, তখন সে জিন্দিক হয়ে যায়। যেমন, বর্তমান সময়ের সালমান রুশদি। সে দ্বীন থেকে বেরিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি; বরং তার রচনাবলির মাধ্যমে ইসলামের ওপর আঘাত শুরু করেছে। এসব জিন্দিক মূলত দ্বীনের বিকৃতি সাধন এবং ইসলামের আকিদা-বিশ্বাস, কুরআন ও সুন্নাহর ওপর কালিমা লেপনের লক্ষ্যে প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের ভান করেছে। তাই তারা হাদিসের নামে মনগড়া কথা বানিয়ে হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল আখ্যা দেয়।
এর আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে মুহাম্মাদ ইবনে সাইদ আল-মাসলুব নামক এক ব্যক্তি। আব্বাসীয় খলিফা আবু জাফর মানসুর তার হাদিস জালিয়াতির ব্যাপারে জানতে পেরে তাকে হত্যা করেছিলেন। তার বানানো একটি হাদিস হলো, আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল ﷺ বলেছেন, আমিই শেষ নবী। আমার পর আর কোনো নবী আসবে না। তবে আল্লাহ যদি চান (তবে আসতে পারে)।¹⁵
এমন আরেক ব্যক্তির নাম হচ্ছে আবদুল কারিম ইবনে আবিল আওজা। তার হাদিস জালিয়াতি সম্পর্কে জানার পর আব্বাসি খলিফা তাকে হত্যা করেছেন। এই ইবনে আবিল আওজা ছিল চরম ইসলাম বিদ্বেষী। তাকে হত্যার জন্য আনা হলে, সে সদম্ভে বলেছিল, তোমরা আমাকে একটি বা দুটি হাদিসের জন্য হত্যা করছ। আল্লাহর শপথ! আমি রাসুল ﷺ-কে নিয়ে ৪ হাজার জাল হাদিস রচনা করেছি। এসব হাদিসে আমি হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল হিসাবে উপস্থাপন করেছি।
সে একাই বিপুল পরিমাণ জাল হাদিস রচনা করেছে। কথিত আছে, জিন্দিকদের রচিত জাল হাদিসের সংখ্যা প্রায় ১৪ হাজার। এর অনেকগুলো প্রসিদ্ধিও পেয়েছে।
২. শাসকশ্রেণির তোষামোদকারী
এই শ্রেণির লোকেরা তোষামোদ এবং চাটুকারিতার মাধ্যমে শাসকশ্রেণির নৈকট্যলাভ করতে চায়। এজন্য তারা রাসুল ﷺ-এর নামে মনগড়া হাদিস রচনা করে। এর মাধ্যমে বনু উমাইয়ার ওপর অপবাদ আরোপের ধারা শুরু করে। কারণ, তখন আব্বাসীয়দের শাসন চলছিল। তাই তাদেরকে খুশি করার অব্যর্থ অস্ত্র ছিল বনু উমাইয়া গোত্রের নিন্দা করা। এর প্রেক্ষিতেই মহান সাহাবি মুআবিয়া রা. এবং তার পুত্র ইয়াজিদের নিন্দামূলক বর্ণনাগুলো প্রকাশ পায়। অথচ ইয়াজিদ ছিলেন একজন খোদাভীরু ব্যক্তি। তারা ইয়াজিদের ব্যাপারে রটিয়ে দেয় যে, তিনিও মদ্যপান এবং নারীলিপ্সার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। ওয়ালিদ ইবনে উকবা রা.-এর মতো মহান মুজাহিদের ব্যাপারে তারা এ কথা ছড়িয়ে দেয় যে, তিনি মদ্যপানের প্রতি আসক্ত ছিলেন। এমনইভাবে আমের ইবনে আবদুল্লাহ এবং বনু উমাইয়া গোত্রের প্রত্যেক শাসকের চরিত্রে তারা কালিমা লেপন করে। তাদের মধ্যে মহান সাহাবি উসমান ইবনে আফফান রা.-ও ছিলেন। কারণ, তিনি ছিলেন বনু উমাইয়া বংশোদ্ভূত। তিনিও তাদের অপবাদ থেকে মুক্তি পাননি।
৩. জনগণের মনোতুষ্টিতে আগ্রহী
সেই যুগে একদল মানুষ ছিল, যাদের বলা হতো কাসসাস (বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে এর অনুবাদ করা যায় বক্তা)। তারা লোকদের কাছে বিভিন্ন হৃদয়স্পর্শী গল্প-কাহিনি বর্ণনা করত। মুসলিম সমাজ স্বাভাবিকভাবেই রাসুল এবং সাহাবিগণকে ভালোবাসে, তাই তারা রাসুল এবং সাহাবিগণকে এসব গল্প-কাহিনির বর্ণনাকারী বানাত। তারা দুর্লভ, বিস্ময়কর এবং বানোয়াট বিভিন্ন কাহিনি বর্ণনা করত, যেগুলোর কোনো ভিত্তি ছিল না। দুঃখজনক কথা হচ্ছে, তারা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে এসব মনগড়া কাহিনি সাহাবিগণের বর্ণনা বলে চালিয়ে দিত।
এমন একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা তুলে ধরছি-
একবার ইমাম আহমাদ রহ. এবং ইয়াহইয়া ইবনে মাইন রহ. বাগদাদের মসজিদে রুসাফায় নামাজ আদায় করছিলেন। ইতিমধ্যে এক বক্তা তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে থাকে, আহমাদ ইবনে হাম্বল এবং ইয়াহইয়া ইবনে মাইন আমাকে শুনিয়েছেন, তারা শুনেছেন আবদুর রাজ্জাকের কাছ থেকে। তিনি শুনেছেন মামারের কাছ থেকে। তিনি কাতাদা থেকে, আর কাতাদা আনাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, রাসুল ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করবে, আল্লাহ প্রতিটি অক্ষর থেকে একটি পাখি সৃষ্টি করবেন। যার ঠোঁট হবে স্বর্ণের আর পালক হবে অমূল্য মারজান পাথরের।
এভাবে সে ২০ পৃষ্ঠাব্যাপী লম্বা এক ঘটনা বর্ণনা করে। আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এবং ইয়াহইয়া ইবনে মাইন রহ. আশ্চর্যান্বিত হয়ে একে অপরের দিকে তাকাতে থাকেন। ইয়াহইয়া ইবনে মাইন রহ. ইমাম আহমাদ রহ.-কে জিজ্ঞাসা করেন, আপনি কি তার কাছে এই হাদিস বর্ণনা করেছেন? তিনি জবাব দেন, আল্লাহর শপথ! এমন হাদিস আমি মাত্রই শুনলাম।
লোকটির মজলিস শেষ হলে শুরু হয় হাদিয়া গ্রহণের পালা। সে লোকদের হাদিয়া গ্রহণের জন্য বসে পড়ে। ইয়াহইয়া ইবনে মাইন রহ. ইশারায় তাকে কাছে ডাকেন। সে হাদিয়া পাওয়ার আশা নিয়ে তাদের কাছে আসে। ইয়াহইয়া ইবনে মাইন রহ. তাকে জিজ্ঞাসা করেন, আপনাকে এই হাদিস কে শুনিয়েছে?
লোকটি জবাব দেয়, আহমাদ ইবনে হাম্বল এবং ইয়াহইয়া ইবনে মাইন।
ইয়াহইয়া ইবনে মাইন রহ. বলেন, আমি ইয়াহইয়া ইবনে মাইন এবং ইনি হলেন আহমাদ ইবনে হাম্বল। আমরা তো রাসুল ﷺ-এর এমন কোনো হাদিসই শুনিনি।
লোকটি জবাব দেয়, আমি বরাবরই শুনে এসেছি, ইয়াহইয়া ইবনে মাইন একজন বোকা লোক। এখন সে ব্যাপারে নিশ্চিত হলাম। মনে হয় যেন পৃথিবীতে তোমরা ছাড়া আর কোনো ইয়াহইয়া ইবনে মাইন আর আহমাদ ইবনে হাম্বল নেই! আমি তো ১৭জন আহমাদ ইবনে হাম্বল এবং ইয়াহইয়া ইবনে মাইন থেকে লিখেছি।
তখন আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. তার জামার আস্তিন দিয়ে মুখ চেপে বলেন, এই লোককে যেতে দিন। লোকটি তখন বিদ্রূপাত্মক এক হাসি দিয়ে তাদের সামনে থেকে চলে যায়।¹⁶, ¹⁷
এই ছিল ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. (১৬৪-২৪১ হিজরি)-এর যুগের চিত্র। যা রাসুল ﷺ-এর যুগ থেকে খুবই নিকটবর্তী ছিল। তাহলে পরবর্তী সময়ে বিষয়টি কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে একটু ভেবেই দেখুন।
৪. নিজের মতবাদ বা অঞ্চলের প্রতি অন্যায় পক্ষপাতদুষ্ট
যারা মনগড়া হাদিস রচনা করে তাদের মধ্যে এই গোষ্ঠীকেই সবচেয়ে বিপজ্জনক গণ্য করা হয়। নিজেদের মতবাদের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস ও সাম্প্রদায়িক মনোভাবের কারণেই শিয়ারা রাসুল ﷺ-কে নিয়ে বানোয়াট হাদিস রচনা এবং সাহাবিগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে মিথ্যা বর্ণনা শুরু করেছিল। বিশেষ করে ফিতনাসংক্রান্ত ব্যাপারে তাদের মনোযোগ ছিল সবচেয়ে বেশি। তৎকালীন পরিস্থিতিতে শিয়াদের প্রভাবের কারণে এই ঘৃণ্য পদ্ধতিটি ব্যাপক প্রচলন লাভ করে। এমনইভাবে তারা পারস্যের প্রতিও খুব অন্যায় পক্ষপাতিত্বের আশ্রয় নেয় এবং ইসলামের সঙ্গে অনেক বিষয়ের সংমিশ্রণ ঘটায়। এর চেয়েও স্পর্ধার কথা হচ্ছে, তারা ইসলাম ধর্মে অগ্নিপূজারিদের অনেক আকিদার অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে। শিয়াদের আকিদা বর্ণনা করার সময় এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ।
এদের রচিত কিছু জাল হাদিস হচ্ছে-
• বনু হাশেম ব্যতীত অন্য লোকেরা একে অপরের সম্মানে দাঁড়াবে। কারণ, বনু হাশেম কারও সম্মানে দাঁড়ায় না।¹⁸
• রাসুল ﷺ মদিনায় আগমন করার পর যখন সাহাবিগণের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন গড়লেন, তখন আলি রা. অশ্রুসজল চোখে তাঁর কাছে এসে বললেন, আপনি সকল সাহাবিগণদের মাঝে একে অপরের সঙ্গে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন গড়ে দিলেন। কিন্তু আমার সঙ্গে কারও ভ্রাতৃত্ব গড়ে দিলেন না। তখন রাসুল বললেন, হে আলি, তুমি দুনিয়া এবং আখেরাতে আমার ভাই।¹⁹ এটি একটি জাল হাদিস। অনেকেই এটিকে সহিহ মনে করে থাকে।
এমনইভাবে আরও অনেক জাল হাদিস রয়েছে। যেমন:
• কুরআনের দিকে তাকানো ইবাদত।²⁰
• পিতামাতার দিকে সন্তানের তাকানো ইবাদত।²¹
• আলি রা.-এর দিকে তাকানো ইবাদত।²²
• আমি সর্বশেষ নবী। আর হে আলি, তুমি সর্বশেষ অলি ইত্যাদি।²³
এমনকি তারা উম্মুল মুমিনিন আয়েশা সিদ্দিকা রা.-এর মর্যাদাকে তুচ্ছ প্রতিপন্ন করতে চায়। এজন্য তারা বলে থাকে, রাসুল ﷺ বলেছেন, হে আয়েশা, তুমি কি জানো, আল্লাহ তাআলা জান্নাতে আমার সঙ্গে মারয়াম বিনতে ইমরান, মুসার বোন কুলসুম এবং ফেরাউনের স্ত্রীকে বিয়ে দিয়েছেন!²⁴
তারা এখানে আম্মাজান আয়েশা রা.-এর কথা উল্লেখ করেনি। অথচ এটি স্বতঃসিদ্ধ বিষয় যে, মুমিনের দুনিয়ার স্ত্রী আখেরাতেও তার স্ত্রী থাকবেন। তারা আয়েশা রা.-এর ব্যাপারে আরও জঘন্য অপবাদ আরোপ করার প্রয়াস চালিয়েছে। তার কুৎসা বর্ণনা করতে এমন আরও অনেক হাদিস তারা রচনা করেছে। তাদের মধ্যে মাইসারা ইবনে আবদে রাব্বি নামে কুখ্যাত এক লোক ছিল। সে স্বীকার করেছে যে, সে একাই আলি রা.-এর মর্যাদাসংক্রান্ত ৭০টি হাদিস বানিয়েছে।
আমরা জানি যে, আলি রা.-এর মর্যাদা প্রমাণের জন্য এসব বানোয়াট হাদিসের কোনো প্রয়োজন নেই। ইসলামে আলি রা.-এর মর্যাদা সর্বজন স্বীকৃত। আল্লাহ তাআলার কাছে তার জন্য বিরাট মর্যাদা রয়েছে। কিন্তু আলি রা.-এর মর্যাদা প্রমাণ এবং অন্যান্য সাহাবিগণের কুৎসা রটনায় নবীজির নামে হাদিস রচনার কোনো সুযোগ নেই। অন্য সাহাবিগণকে উপেক্ষা করে শুধু আলি রা.-কে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করা অবশ্যই ঘৃণ্য অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে।
৫. ইসলামের প্রতি অতি ভক্তি পোষণকারী
আশ্চর্যের কথা হচ্ছে, এ ধরনের লোকেরাও জাল হাদিস রচনা করেছেন। কিন্তু আমরা যখন এ সমস্ত জাল হাদিস রচনার পেছনে তাদের উদ্দেশ্য জানতে পারব, তখন আমাদের বিস্ময় কেটে যাবে। তারা দেখতে পেয়েছিল যে, মানুষ দিনদিন ইসলাম ধর্ম থেকে সরে যাচ্ছে। কুরআন তেলাওয়াত কমিয়ে দিচ্ছে। সুন্নাহর অনুসরণ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাই মানুষকে কুরআন তেলাওয়াত এবং সুন্নাহর অনুসরণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে তারা এ ধরনের মনগড়া হাদিস রচনার আশ্রয় নেয়।
এদের মধ্যে আবু ইসমাহ ইবনে মারয়াম নামক এক ব্যক্তি ছিলেন। যিনি তৎকালীন পারস্যের অন্তর্গত মার্ভ শহরের কাজি তথা বিচারক ছিলেন। তিনি কুরআনের প্রতিটি সুরার ফজিলত বর্ণনা করার জন্য একটি করে হাদিস রচনা করেছিলেন যে, যে অমুক অমুক সুরা পাঠ করবে সে এমন এমন সওয়াব পাবে ইত্যাদি। এমন একটি মুনকার (অগ্রহণযোগ্য ও বর্ণনার অযোগ্য) হাদিস হচ্ছে, প্রতিটি বস্তুরই সৌন্দর্যবর্ধক আছে। আর কুরআনের সৌন্দর্যবর্ধক হচ্ছে সুরা আর-রাহমান।²⁵ এমন অগ্রহণযোগ্য আরও বহু হাদিস তিনি রচনা করেছিলেন।
৬. জাগতিক স্বার্থ উদ্ধারকারী
এই শ্রেণির লোকেরা জাগতিক স্বার্থ উদ্ধারের জন্য জাল হাদিস রচনা করে থাকে। রাসুল-এর সঙ্গে এসব মনগড়া কথাকে সম্বন্ধ করতে তারা একটুও কুণ্ঠাবোধ করে না। এ ধরনের জাল হাদিসের একটি উদাহরণ হলো, এক ব্যক্তি রাসুল-এর দিকে সম্বন্ধ করে বলেছে যে, আল্লাহ তাআলা বিনহা অঞ্চলের মধুর মধ্যে বরকত দান করেন।²⁶
বোঝা যায় যে, সেই ব্যক্তি ছিল মধু বিক্রেতা। নিজের ব্যবসার প্রসারের উদ্দেশ্যে সে রাসুল-এর নামে এমন মনগড়া কথা বলে দিয়েছে। উল্লেখ্য, বিনহা হচ্ছে মিশরের একটি গ্রাম।
এমন আরও কিছু জাল হাদিস রয়েছে। যথা:
যে ব্যক্তি মাসের ১৭ তারিখ মঙ্গলবার দিন শিঙ্গা লাগাবে, তার সারা বছরের চিকিৎসা সম্পন্ন হয়ে যাবে।²⁷
কোনো পরিবারের কর্তা কখনো সফল হয়নি।²⁸
এসবই হচ্ছে ঈমানের দুর্বলতা এবং অন্তর থেকে দ্বীনদারি বিদূরিত হয়ে যাওয়ার কুফল।
আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, একাধিক কারণে বিপুল পরিমাণে জাল হাদিস ছড়িয়েছে। জিন্দিকরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই ইসলামের বিকৃতি সাধন করেছে। নিজেদের মতবাদের প্রতি অন্যায় পক্ষপাতদুষ্টরা তাদের মতবাদকে সমুন্নত করার জন্য ইসলামের সঠিক মতবাদকে কলুষিত করেছে। কিছু লোক শ্রোতাদেরকে মুগ্ধ করার জন্য নিজ থেকে মনগড়া গল্প রচনা করেছে। কিছু লোক আব্বাসি মন্ত্রী এবং আমলাদের নৈকট্যলাভের জন্য বনু উমাইয়া গোত্রের শাসকদের অপবাদ দিয়ে ভ্রান্তি ছড়িয়েছে। এসব মনগড়া হাদিসের প্রতিক্রিয়া ফিতনাসংক্রান্ত ঘটনাসমূহের ওপরেও প্রকাশ পেতে থাকে।
যেসব গ্রন্থে এই ফিতনা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে, সেগুলোর দিকে আমরা যদি চোখ বুলাই তাহলে দেখব যে, এসব গ্রন্থের প্রায় সব হাদিসই যথাক্রমে : আবু মিখনাফ লুত ইবনে ইয়াহইয়া, ওয়াকিদি, মুহাম্মাদ ইবনে সায়িব কালবি এবং তার পুত্র হিশাম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে সায়িব কালবির সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। ফিতনাসংক্রান্ত যত সন্দেহযুক্ত হাদিস রয়েছে, এগুলো এই চারজনের সঙ্গেই সম্বন্ধযুক্ত করা হয়েছে।
এখন দেখি এই চারজনের ব্যাপারে আলেমগণের কী মন্তব্য:
১. প্রথম বর্ণনাকারী লুত ইবনে ইয়াহইয়া আবু মিখনাফের ব্যাপারে ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেছেন, লুত ইবনে ইয়াহইয়া আবু মিখনাফ হলো একেবারেই অনির্ভরযোগ্য একজন ঐতিহাসিক। তার ওপর নির্ভর করা যায় না।
• দারাকুতনি রহ. বলেছেন, সে দুর্বল।
• ইয়াহইয়া ইবনে মাইন রহ. বলেছেন, সে কোনো নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী নয়। আরেকবার বলেছেন, তার কথা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়।
• ইবনে আদি রহ.-এর মতানুযায়ী সে ছিল একজন বিদ্বেষী শিয়া।
২. দ্বিতীয় বর্ণনাকারী ওয়াকিদির ব্যাপারে যাহাবি রহ.-এর মন্তব্য হচ্ছে, তার হাদিস বর্জনের ব্যাপারে সকলে একমত।
• আলি ইবনে মাদিনি রহ.-এর মতে, ওয়াকিদি জাল হাদিস রচনা করেন।
• ইমাম বুখারি রহ.-এর মতে ওয়াকিদির হাদিস বর্জনীয়।
• মুআবিয়া ইবনে সালিহ রহ. বলেন, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. ওয়াকিদিকে মিথ্যাবাদী বলেছেন। আরেকবার তিনি ওয়াকিদিকে অনির্ভরযোগ্য বলেছেন।
• ইমাম শাফেয়ি রহ.-এর মতে ওয়াকিদির লেখা সব গ্রন্থই বানোয়াট।
• আলি ইবনে মাদিনি রহ. বলেছেন, আমার কাছে ওয়াকিদির বর্ণিত ২০ হাজার হাদিস আছে, যেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। ইবরাহিম ইবনে ইয়াহইয়া একজন মিথ্যাবাদী বর্ণনাকারী হলেও সে আমার কাছে ওয়াকিদি থেকে উত্তম।
৩. তৃতীয় এবং চতুর্থ বর্ণনাকারী মুহাম্মাদ ইবনে সায়িব এবং হিশাম ইবনে মুহাম্মাদ সম্পর্কে অনেক সমালোচনা বর্ণিত হয়েছে। মুহাম্মাদ ইবনে সায়িব বর্ণিত একটি হাদিস হচ্ছে, সে অমুক থেকে অমুকের সূত্রে শুনে বর্ণনা করেছে, রাসুল ﷺ বসে থাকতেন এবং এমতাবস্থায় তাঁর ওপর ওহি অবতীর্ণ হতো। একদিন তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন সম্পন্ন করতে যান। আলি রা. তাঁর স্থানে বসে ছিলেন। তখন জিবরাইল আ. আলি রা.-এর ওপরেই ওহি অবতীর্ণ করেন।
এ চারজন শিয়াদের নিকট অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ইমাম। শিয়াদের রচিত গ্রন্থাবলিতে তাদের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে। ফিতনা নিয়ে অধ্যয়নের সময় আমরা যে উৎস থেকে অধ্যয়ন করব, সে উৎসগুলো সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নেওয়া আবশ্যক। আমরা যা বর্ণনা করছি সেগুলোর উৎস কি এসব মিথ্যুক ও জাল বর্ণনা রচয়িতাদের বর্ণনা নাকি ইলমুল জারহ ওয়াত তাদিল শাস্ত্রের আলেমগণ যাদেরকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন তাদের বর্ণনা। এ বিষয়টি সঠিকভাবে জানার জন্য প্রয়োজন ব্যাপক চেষ্টা-সাধনা এবং নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম।
টিকাঃ
১৫. আল-মাওজুআত লি ইবনিল জাওযি, ১/২৭৯, তানযিহুশ শারিয়া, ১/২২১, আল-লাআলিল মাসনুয়া, ১/২৪৩
১৬. ঘটনাটির বিশুদ্ধতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ইমাম যাহাবি রহ. এই. ঘটনার বর্ণনাকারীকে অপরিচিত আখ্যা দিয়ে ঘটনাটি বানোয়াট হওয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন।- অনুবাদক
১৭. তাহযিবুল কামাল, ৩১/৫৫৮; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১১/৮৬
১৮. মাজমাউয যাওয়ায়িদ, ৮/৪০
১৯. তাখরিজু আহাদিসিল ইহয়া, ১/৬৪৮; তাজকিয়াতুল মাওজুআত, পৃ. ৯৭
২০. আল-ইলালুল মুতানাহিয়া, ২/৩৪৪; আল-লাআলিল মাসনুআ, ১/৩১৭
২১. আল-লাআলিল মাসনুআ, ১/৩১৭
২২. আল-লাআলিল মাসনুআ, ১/৩১৭
২৩. আল-মাওজুআত লি ইবনিল জাওযি, ১/৩৯৮; তানযিহুশ শারিয়া, ১/৩৬৬
২৪. মাজমাউয যাওয়ায়িদ, ৯/২১৮
২৫. জয়িফুল জামিয়িস-সগির ওয়া যিয়াদাতিহি, ৪৭২৯
২৬. তারিখু ইবনি মাইন, ৪/৪৮৭; সিলসিলাতুল আহাদিসিজ জয়িফা ওয়াল-মাওজুআ, ১২৫৮
২৭. তাখরিজু আহাদিসিল ইহয়া, ১/১৬৪৫
২৮. আত-তাযকিরাহ ফিল আহাদিসিল মুশতাহিরা, পৃ. ১৯০; আল-মাওযুয়াত লি ইবনিল জাওযি, ২/২৮১
📄 আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর নিকট ফিতনাবিষয়ক বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থ
ফিতনাবিষয়ক সবচেয়ে বিশুদ্ধ গ্রন্থ হচ্ছে সিহাহ সিত্তাহ তথা প্রসিদ্ধ ছয়টি সহিহ হাদিস গ্রন্থ।²⁹ আর এ সবগুলোর মাঝে সবচেয়ে বিশুদ্ধ গ্রন্থ হলো সহিহ বুখারি। এটি খুবই প্রসিদ্ধ কথা। বরং পবিত্র কুরআনের পর এটিকেই সবচেয়ে বিশুদ্ধ গ্রন্থ হিসাবে আখ্যা দেওয়া হয়। জারহ এবং তাদিল শাস্ত্রবিদগণ এমনটিই বলেছেন। তারা সকলে বলেছেন, নিশ্চয় বুখারির প্রমাণ বিরোধী পক্ষের প্রমাণের চেয়ে শক্তিশালী।
ইমাম বুখারি রহ. তার গ্রন্থে দ্বিরুক্তি-সহ ৭৩৯৭টি এবং দ্বিরুক্তি ব্যতীত ২৬০২টি হাদিস চয়ন করেছেন।³⁰ এই হাদিসসমূহ তিনি নির্বাচিত করেছেন ৬০ লাখ হাদিসের মধ্য থেকে। প্রতিটি হাদিস চয়ন করার আগে দুই রাকাত ইস্তেখারার নামাজ আদায় করে আল্লাহ তাআলার কাছে সমাধান চেয়েছেন যে, তিনি এই হাদিসটি লিখবেন নাকি লিখবেন না। তিনি একটি হাদিস শোনার জন্য মাইলের পর মাইল সফর করতেন। ১৯৪ হিজরিতে তৎকালীন খোরাসানের বুখারা নামক গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আরব বংশোদ্ভূত ছিলেন না। ৬২ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।
সহিহ বুখারির পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সহিহ মুসলিম। রাসুল ﷺ-এর হাদিস নিয়ে রচিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ এটি। বরং কোনো কোনো আলেম এই গ্রন্থকে বুখারির পর্যায়ে উন্নীত মনে করেন। কোনো কোনো আলেম সহিহ মুসলিম নিয়ে আরও উচ্চ মন্তব্য করেছেন। তারা বলেন, সনদ বা বর্ণনাসূত্র সংকলন এবং গঠন বিন্যাসের দিক দিয়ে সহিহ মুসলিম, সহিহ বুখারির চেয়েও উত্তম। কিন্তু বিশুদ্ধতার দিক দিয়ে সহিহ বুখারি এগিয়ে। এরপরই সহিহ মুসলিম-এর অবস্থান। কিছু হাদিসের ক্ষেত্রে ইমাম মুসলিম রহ.-এর ওপর আপত্তি করা হয়েছে। যদিও তা খুবই অল্প। যারা আপত্তি করেছেন তাদের আপত্তি যথাযথ। সহিহ মুসলিম-এ দ্বিরুক্তিহীন বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা ৪ হাজার। যেখানে সহিহ বুখারিতে দ্বিরুক্তিহীন হাদিসের সংখ্যা ২৬০২টি। ইমাম মুসলিম রহ. জন্মগ্রহণ করেন পারস্যের নিশাপুরে। তিনিও আরব বংশোদ্ভূত নন। তার ইন্তেকাল হয়েছিল ৫৭ বছর বয়সে।
সহিহ মুসলিম-এর পরের অবস্থানে আছে আস-সুনানুল কুবরা লিন নাসায়ি। ইমাম নাসায়ি রহ. খোরাসানের অন্তর্গত নাসা নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনিও আরব বংশোদ্ভূত ছিলেন না। তিনি ২১৫ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৮৮ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। ইলমুর রিজালশাস্ত্রে তিনি খুবই সূক্ষ্ম জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন।
এরপরের অবস্থানে আছে সুনানু আবি দাউদ। এই গ্রন্থে ৪৮০০টি হাদিস রয়েছে। ইমাম আবু দাউদ রহ. আরব বংশোদ্ভূত ছিলেন। ২০২ হিজরিতে তিনি বসরায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ৭৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
এরপরের অবস্থান সুনানুত তিরমিজির। এই গ্রন্থে কিছু দুর্বল হাদিসও রয়েছে। তবে এগুলোর মাননির্ণয়কৃত; ইমাম তিরমিজি রহ. তার গ্রন্থে হাদিসের বিশুদ্ধতা এবং দুর্বলতার দিক ইঙ্গিত করেছেন। তবে কিছু হাদিসের দুর্বলতার ক্ষেত্রে তিনি কোনো ইঙ্গিত প্রদান করেননি। ইলমুল জারহ ওয়াত তাদিল সম্পর্কে অভিজ্ঞ আলেমগণ এই গ্রন্থকে বিশুদ্ধ বলেছেন। ২০৯ হিজরিতে আফগানিস্তানের আমুদরিয়া নদীর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে অবস্থিত তিরমিজ নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ইমাম তিরমিজি রহ.। তিনি আরব বংশীয় ছিলেন না। ইন্তেকালের সময় তার বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। ইমাম বুখারি রহ. ছিলেন ইমাম তিরমিজি রহ.-এর শিক্ষক। তা সত্ত্বেও তিনি ইমাম তিরমিজি রহ.-এর ওপর খুবই আস্থা রাখতেন এবং তার কাছ থেকে হাদিস গ্রহণ করতেন।
অতঃপর ষষ্ঠ অবস্থানে আছে সুনানু ইবনি মাজাহ। এ গ্রন্থের ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, ইমাম ইবনে মাজাহ রহ. অন্য ইমামদের থেকে পৃথক যেসব হাদিস এনেছেন সেগুলোর অধিকাংশই দুর্বল। তবে যেসব হাদিস ইবনে মাজাহ-এর সঙ্গে অন্যান্য ইমামগণও বর্ণনা করেছেন সেগুলো ব্যতীত। ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেন, ঢালাওভাবে এ কথা বলা যাবে না। অর্থাৎ, ইমাম ইবনে মাজাহ এমন কিছু পৃথক হাদিসও এনেছেন যেগুলো দুর্বল নয়।³¹
ইবনে মাজাহ রহ. ২০৯ হিজরিতে কাজবিন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনিও আরব বংশোদ্ভূত নন। লক্ষণীয় যে, ছয় বিশুদ্ধ গ্রন্থের পাঁচজনই ছিলেন অনারব। সুবহানাল্লাহ! এসব অনারব অঞ্চল বিজিত করে আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের ওপর কতই-না অনুগ্রহ করেছেন। এ বিজয়ের ফলে ওই সকল মনীষীগণের মধ্যে ইসলামের আলো প্রবেশ করেছে, যারা আমাদের জন্য প্রিয় নবীজির সুন্নাহ তথা হাদিসগুলো সংরক্ষণ করেছেন।
সিহাহ সিত্তাহ তথা ছয় বিশুদ্ধ গ্রন্থের পরের অবস্থানে আছে আল-মুসনাদ লিল ইমাম আহমাদ। এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মুসনাদ গ্রন্থ। এখানে প্রশ্ন আসে যে, আলেমগণ আল-মুসনাদ লিল ইমাম আহমাদকে পূর্বের ছয় গ্রন্থের সঙ্গে কেন রাখেননি?
এর উত্তরে বলা যায় যে, সহিহ, সুনান ও মুসনাদ গ্রন্থের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সহিহ এবং সুনান গ্রন্থগুলোতে হাদিস লিখিত হয় অধ্যায় এবং বিষয়ভিত্তিক আকারে। আর মুসনাদ গ্রন্থে হাদিস লেখা হয় সাহাবিগণের নাম অনুসারে। যেমন, বলা হয়ে থাকে, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত হাদিসসমূহ, আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হাদিসসমূহ ইত্যাদি।
আল-মুসনাদ লিল ইমাম আহমাদ-এ দ্বিরুক্তিহীন ৩০ হাজার হাদিস রয়েছে এবং দ্বিরুক্তি-সহ হাদিসের সংখ্যা ৪০ হাজার। বর্ণিত আছে, ইমাম আহমাদ রহ. ৭ অথবা ১০ লক্ষ হাদিস থেকে বাছাই করে এই হাদিসগুলো সংকলন করেছেন। আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর মৃত্যুর পর তার ছেলে আবদুল্লাহ মুসনাদে আহমাদ-এ কিছু হাদিস বৃদ্ধি করেন। বর্ণিত আছে, মুসনাদে আহমাদ-এ কোনো মওজু তথা জাল হাদিস নেই। যদি কয়েকটি থেকেও থাকে, তবে সেগুলো ইমাম আহমাদের ছেলের মাধ্যমে এসেছে।
এগুলো হলো আমাদের নিকট এবং ইলমুল জারহ ওয়াত তাদিল সম্পর্কে অভিজ্ঞ আলেমগণের কাছে পরিচিত এবং প্রসিদ্ধ নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ। তাই ফিতনা সম্পর্কে অধ্যয়নের সময় এগুলোই আমাদের নির্ভরতার উৎস হওয়া উচিত। অন্য যেসব অনির্ভরযোগ্য এবং মিথ্যা ও জাল হাদিস বর্ণনার উৎস রয়েছে, সেগুলো বর্জন করা উচিত।
কেউ কেউ মনে করেন যে, আব্বাসি শাসনামলে আব্বাসি খলিফাদের নৈকট্যলাভের উদ্দেশ্যে উমাইয়াদের কুৎসা রটনায় এসব মিথ্যার সয়লাব ঘটেছিল। কিন্তু এখন কেন এসব মিথ্যার মাধ্যমে ইসলামের ওপর আঘাত করা হবে? এসব কারা করবে?
বর্তমানে যারা ইসলামের ওপর আঘাত করছে তারা হচ্ছে কিছু বিকৃত মতাদর্শের অনুসারী। তাদের প্রত্যেকেই নিজস্ব দলের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ইসলামের ওপর আঘাত করছে। তাদের ভ্রান্ত এবং বিকৃত মতের সমর্থনে দুর্বল এবং জাল হাদিস বর্ণনা করছে। ওরিয়েন্টালিস্ট তথা প্রাচ্যবিদরা যখন সব ইসলামি ঐতিহাসিক গ্রন্থের সমালোচনা শুরু করে, তখন এসব বানোয়াট ও জাল হাদিসের বিশাল ভান্ডার তাদের হস্তগত হয়। তারা বিভিন্ন ভাষায় এসব বানোয়াট হাদিস বর্ণনা করে ছড়িয়ে দেয়। তারা প্রচার করে যে, ইসলাম যুদ্ধের মাধ্যমে বিস্তৃতি লাভ করেছে। তাই কোনো মুসলিম যখন ক্ষমতার অধিকারী হয়, তখন তারা অন্যের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ফিতনাসংক্রান্ত ঘটনাকে তারা এসব মিথ্যা বর্ণনা এবং দাবির সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছে।
এ ছাড়াও পশ্চিমাদের মদদপুষ্ট অক্সিডেন্টালিস্ট তথা পাশ্চাত্যবিদরা নিজ নিজ দেশে ইসলামের ওপর আঘাত হানতে শুরু করে। এরা মুসলিম নাম ধারণ করে মুসলিম সমাজে বসবাস করলেও এবং কখনো নামাজ-রোজা পালন করলেও ইসলামের ওপর কঠিন আঘাত হানতে এরা কোনোরূপ কুণ্ঠাবোধ করে না।
এদের একজন হচ্ছে তহা হুসাইন। একদিক দিয়ে তিনি খুবই প্রসিদ্ধ। তাকে বলা হয়ে থাকে আরবি সাহিত্যের খুঁটি। তিনি আরবি সাহিত্যিক হলেও ইসলামের একজন ঘোরতর শত্রু। তার রচিত সব গ্রন্থেই ইসলামের ওপর আঘাতমূলক বক্তব্য রয়েছে। তিনি তার ছাত্রদের কুরআনের সমালোচনা শেখাত। এভাবে বলত যে, এসব আয়াতের ভিত্তি মজবুত এবং ওই সব আয়াতের ভিত্তি দুর্বল (নাউজুবিল্লাহ)।
সে কুরআনের অপব্যাখ্যা করে বলে যে, কুরআনে ইবরাহিম আ. এবং ইসমাইল আ.-এর ঘটনা বর্ণিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে, এ ঘটনা বাস্তব। কখনো কখনো কুরআনে গল্পের মতো বর্ণনাও এসেছে। এগুলো বাস্তব হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দলিল-প্রমাণ বিদ্যমান থাকা জরুরি।
এমনইভাবে তহা হুসাইন তার গ্রন্থাবলিতে অনেক সাহাবিগণের সমালোচনা করেছে। এতটাই সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে যে, অবশেষে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে কাফের এবং মুরতাদ ফতোয়া দেওয়া হয়। তখন সে আল-আজহারের লিটারেচার তথা সাহিত্য অনুষদের অধ্যাপক ছিল। এরপর সবাই মনে করেছিল, সে তওবা করে আল্লাহর পথে ফিরে এসেছে। আল-আজহারের আলেমগণের নৈকট্যলাভের জন্য সে নতুন একটি গ্রন্থ রচনা করে। এই গ্রন্থটিকে বাহ্যিকভাবে ইসলামের পক্ষে মনে হলেও, অন্তর্নিহিতভাবে এতেও ইসলামের ওপর আঘাত করা হয়েছে এবং বানোয়াট বর্ণনার সমাবেশ ঘটানো হয়েছে। তহা হুসাইনের সামসময়িক অনেক ব্যক্তি যারা ফ্রান্স, ইংল্যান্ড প্রভৃতি ইউরোপীয় দেশে পড়ালেখা করেছে, তারাও একই কাজ করেছে।
এই বিষয়ে আবদুর রহমান শারকাবি রচিত গ্রন্থাবলিও বিপজ্জনক। এসব গ্রন্থাবলি থেকে যারা ফিতনা সম্পর্কে অধ্যয়ন করবেন তারা দেখতে পাবেন যে, কোনো যাচাই-বাছাই না করেই এসব গ্রন্থে সকল সাহাবিগণকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। এমনইভাবে খালিদ মুহাম্মাদ খালিদ রচিত রিজালুন হাওলার রাসুল এবং খোলাফাউর রাসুল গ্রন্থদুটিতেও আলি রা.-এর বিরুদ্ধে মুআবিয়া রা.-এর পক্ষাবলম্বনকারী সাহাবিগণের সমালোচনা করা হয়েছে। ভ্রান্ত ও মিথ্যা ঘটনার সূত্র তুলে ধরে সে প্রখ্যাত সাহাবি আবু মুসা আশআরি রা.-এর সমালোচনাও করেছে।
সাহাবিগণের সমালোচনাকারীদের মধ্যে অন্যতম হলো লেবানন ইউনিভার্সিটির সাহিত্য ও মানব বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক ডিন ড. জাহিয়া কাদুরা। সে তার আয়েশা : উম্মুল মুমিনিন গ্রন্থে এ ধরনের ঘৃণ্য পন্থার আশ্রয় নিয়েছে। তার এই গ্রন্থে যে ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে, তা পড়ে আমার বমি আসার উপক্রম হয়েছিল। সে তার গ্রন্থে লিখেছে, আলি রা. এবং আয়েশা রা.-এর মধ্যকার বিরোধের মূল কারণ হলো রাসুল কর্তৃক আয়েশা রা.-কে বিয়ে করা। আয়েশা রা. ছিলেন রাসুল-এর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। তাই ফাতেমা রা. তার প্রতি হিংসাপরায়ণ হয়ে তাকে অপছন্দ করতেন। তিনি আলি রা.-কে এ বিষয়টি বললে তিনিও আয়েশা রা.-কে অপছন্দ করতে থাকেন। এ ব্যাপারটিই আলি রা.-কে আয়েশা রা.-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করেছে। এদিকে রাসুল ফাতেমা রা.-কেও ভালোবাসতেন। এ দেখে আয়েশা রা.-ও তার প্রতি হিংসাপরায়ণ হয়েছিলেন।
সে আরও বলে যে, আয়েশা রা.-এর ওপর অপবাদ আরোপের সময় তার ওপর যেসব সাহাবি অপবাদ আরোপ করেছিলেন, তাদের মধ্যে আলি রা.-ও ছিলেন। তাই আয়েশা রা. তাকে অপছন্দ করতেন এবং এটিই তাকে আলি রা.-এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এই লেখিকা আরও বলেছে যে, আয়েশা রা.-এর ওপর অপবাদ আরোপের সময় আলি রা. ও ফাতেমা রা. আয়েশা রা.-কে নিয়ে উল্লাস প্রকাশ করেছিলেন। এর পর নিষ্পাপ প্রমাণিত হওয়ার পর আয়েশা রা. এ নিয়ে তাদের সঙ্গে বিতণ্ডায় লিপ্ত হয়েছিলেন।
এমনইভাবে তার আরেকটি জঘন্য মন্তব্য হলো যে, উসমান রা.-এর শাহাদাতের পর আলি রা. খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার কারণে আয়েশা রা. আলি রা.-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। আয়েশা রা. চেয়েছিলেন সগোত্রীয় তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা. খলিফা হোক।
এই লেখিকার দৃষ্টিতে তৎকালীন মুসলিম সমাজ বর্তমান সময়ের মুসলিম সমাজের তুলনায় অধিক অধঃপতনের শিকার ছিল। এই লেখিকার সব আলোচনার রেফারেন্স এবং উৎস শিয়াদের রচিত। জানি না সে এসব জেনেই লিখেছে নাকি না জেনে লিখেছে! যদি না জেনে লিখে থাকে তবে এটিও বিপজ্জনক। আর যদি জেনে লিখে থাকে তবে এটি আরও বেশি বিপজ্জনক।
এই লেখিকা আরও লিখেছে যে, আয়েশা রা. এবং আলি রা.-এর মধ্যকার এই বিদ্বেষ এবং পারস্পরিক অপছন্দের ফলেই তাদের মধ্যে জঙ্গে জামাল সংঘটিত হয়েছে। লেখিকার বক্তব্য অনুযায়ী তাদের এই পারস্পরিক অপছন্দের কারণেই এসব সাহাবিগণের পবিত্র রক্ত বিনষ্ট হয়েছে।
এই ভ্রান্ত লেখিকার বক্তব্য অনুযায়ী আয়েশা রা. উসমান রা.-এর ওপরও প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন। ফলে লোকেরা তার আহ্বানে সাড়া দেয়। তখন আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. উসমান রা.-এর পক্ষে প্রতিরোধ গড়ার জন্য মদিনায় থেকে যান। অথচ তিনি ছিলেন সে বছরের হজের আমির। তখন আয়েশা রা. তাকে বলেছিলেন, হে আবদুল্লাহ, এই শহরে থেকো না। এই পথভ্রষ্ট লোকের পক্ষে লোকদের নিবৃত্ত রেখো না।
এসব অক্সিডেন্টালিস্ট তথা পাশ্চাত্যবিদরা এভাবেই তাদের মিথ্যা এবং বাতিল চিন্তাধারা ছড়িয়েছে। এভাবেই তারা মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠ সন্তান সাহাবিগণের ওপর অপবাদ আরোপ করার চেষ্টা চালিয়েছে।
টিকাঃ
২৯. সিহাহ সিত্তা : হাদিসের বিশুদ্ধ ছয়টি গ্রন্থ। এর দ্বারা সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, আস-সুনানুল কুবরা লিন নাসায়ি, সুনানু আবি দাউদ, সুনানুত তিরমিজি এবং সুনানু ইবনি মাজাহকে বুঝানো হয়েছে। এ ছয় কিতাবের মধ্যে সহিহ বুখারি এবং সহিহ মুসলিম-এর সব হাদিস সহিহ বা নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রমাণিত। অবশিষ্ট চারটি গ্রন্থ সার্বিক বিবেচনায় নির্ভরযোগ্য হলেও তাতে বর্ণিত সব হাদিস নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রমাণিত নয়। এ কারণে মুহাদ্দিসগণ এ ছয় গ্রন্থকে সিহাহ সিত্তার পরিবর্তে 'আল-কুতুবুস সিত্তাহ' বলাকে অধিক সমীচীন মনে করেন। উল্লেখ্য, হাদিসের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ উপরিউক্ত ছয়টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং হাদিসের আরও বহু গ্রন্থ রয়েছে। যা সার্বিক বিবেচনায় নির্ভরযোগ্য। যেমন, সহিহ ইবনি খুযাইমা, সহিহ ইবনি হিব্বান, আল-মুনতাকা লি ইবনিল জারুদ, আল-হাদিসুল মুখতারা লিজ জিয়া মাকদিসি ইত্যাদি।-সম্পাদক
৩০. এ নিয়ে আলেমগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। উল্লেখিত মতটি ইবনে হাজার আসকালানি রহ.-এর।-অনুবাদক
৩১. তাহযিবুত তাহযিব, ৯/৪৬৮
📄 সাহাবিগণের পরিচয়
এখানে সাহাবিগণের পরিচয় তুলে ধরাও প্রয়োজন মনে করছি। যেন আমরা যাদের নিয়ে কথা বলছি, তাদের মর্যাদা সম্পর্কে সম্যক অবগত থাকতে পারি। সাহাবি হলেন প্রত্যেক এমন ব্যক্তি, যিনি রাসুল ﷺ-এর ওপর ঈমান এনেছেন। তাঁকে স্বচক্ষে দেখেছেন, জীবনে একবার হলেও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং ঈমানের ওপর মৃত্যুবরণ করেছেন। আশআস ইবনে কায়স রা.-এর মতো যারা ইসলাম গ্রহণ করার পর মুরতাদ হয়ে পুনরায় ইসলামে ফিরে এসেছেন, তারাও এ সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হবেন। বিশুদ্ধতম মতানুযায়ী সাহাবিগণের সংখ্যা হলো ১ লক্ষ ১৪ হাজার।³²
আর তাবেয়ি হলেন, যারা রাসুল ﷺ-এর ওপর ঈমান এনেছেন, সাহাবিগণের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং তাদের কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। তাবেয়িগণের কয়েকটি স্তর রয়েছে। সর্বোচ্চ স্তরে আছেন সাইদ ইবনে মুসাইয়িব রহ. প্রমুখ। কারণ, তাদের অধিকাংশ বর্ণনা সরাসরি সাহাবিগণের থেকে। মধ্যম স্তরে আছেন ইকরিমা রহ., কাতাদা রহ., উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ. এবং হাসান বসরি রহ. প্রমুখ। এরপর হলেন সর্বনিম্ন স্তরের তাবেয়িগণ। তারা সাহাবিগণ থেকে খুব কমই হাদিস বর্ণনা করেছেন।
মুখাদরাম নামেও একশ্রেণির তাবেয়ি রয়েছেন, যারা রাসুল ﷺ-এর জীবদ্দশায় তাঁর ওপর ঈমান এনেছেন, কিন্তু তাঁকে স্বচক্ষে দেখতে পারেননি। যেমন, নাজ্জাশি প্রমুখ।
জারহ ওয়াত তাদিলশাস্ত্রবিদ আলেমগণের ঐকমত্য অনুযায়ী সকল সাহাববিগণ ন্যায়পরায়ণ এবং তারা যা বলেন তা-ই সত্য। কখনো কখনো এতে ভুল হয়ে গেলেও তা মিথ্যা, খেয়ানত এবং সত্য গোপন হিসাবে গণ্য হবে না।³³
আলেমগণ বলেছেন, সাহাবিগণের নাম, পরিচয় অজ্ঞাত থাকা ক্ষতিকর নয়।³⁴ অর্থাৎ, আপনি যখন জানতে পারবেন যে, অমুক ব্যক্তি সাহাবি ছিলেন; এ ছাড়া তার সম্পর্কে আর কিছুই জানেন না। শুধু জানেন, তিনি রাসুলের সান্নিধ্য পেয়েছেন। তবেই তিনি যা বলবেন তাই বিশুদ্ধ গণ্য হবে। এতে কোনো মিথ্যার আশঙ্কা নেই। সাহাবিগণের ব্যাপারে এটিই আমাদের নীতি।
তাই কোনো সাহাবির সমালোচনা করা জায়েজ নেই। যখন কোনো সাহাবি এমন কোনো কাজ করেন, যে কাজে দুই ধরনের উদ্দেশ্য থাকার সম্ভাবনা থাকে, তখন কাজটিকে উত্তম উদ্দেশ্যেই বিবেচনা করা হবে। প্রতিটি মুসলিমের ক্ষেত্রেই সুধারণা রাখা প্রয়োজন। তাই সাহাবিগণের ওপর সর্বাগ্রে সুধারণা রাখতে হবে।
কোনো সাহাবির ভুল প্রকাশিত হলে আমরা বলব যে, তিনি এখানে ইজতেহাদ³⁵ করেছেন ও ইজতেহাদে ভুল করেছেন। তাই এতেও তিনি সওয়াব পাবেন। কয়েকজন সাহাবির খুব বেশি সমালোচনা করা হয়েছে। মুআবিয়া রা. হলেন তাদের একজন। অথচ রাসুল ﷺ তার সম্পর্কে বলেছেন, 'হে আল্লাহ, আপনি তাকে সুপথপ্রাপ্ত এবং সুপথ প্রদর্শনকারী হিসাবে কবুল করুন।'³⁶
যারা মুআবিয়া রা.-এর সমালোচনা করে, তারা সারা জীবন নেক আমল করলেও তাদের আমল মুআবিয়া রা.-এর এক বছর কিংবা আরও কম সময়ের নেক আমলের সমানও হবে না। আল্লাহ তাআলা তার হাতে অনেক জাতিকে সুপথ দেখিয়েছেন।
তবে শিয়াদের আকিদা এবং তাদের জাল হাদিস রচনার প্রতি ঘৃণাপোষণ যেন আমাদেরকে আলি রা., হাসান রা., হুসাইন রা., ফাতেমা রা. এবং সম্মানিত আহলে বাইতের³⁷ কারও মর্যাদাহানিতে প্ররোচিত না করে। নিশ্চয় ইসলামে তাদের বিরাট মর্যাদা রয়েছে। কিন্তু এতে কোনো বাড়াবাড়ি অথবা ছাড়াছাড়ির সুযোগ নেই।
টিকাঃ
৩২. আল-জামি লিল খতিব, ২/২৯৩
৩৩. আল-ইসতিয়াব, ১/৩; আল-ইসাবা, ১/১০; আত-তাকরিব ওয়াত তাইসির, পৃ. ৯২
৩৪. আল-বাদরুল মুনির লি ইবনিল মুলাক্কিন, ২/২৪০
৩৫. ইজতেহাদ: কুরআন ও সুন্নাহয় যে সমাধান সুস্পষ্টভাবে দেওয়া হয়নি বা যে সমাধান উল্লেখ করা হয়নি, এমন ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহর অগাধ জ্ঞানের অধিকারী ব্যক্তি কুরআন ও সুন্নাহ গবেষণা করে সমাধান দেওয়াকে ইজতেহাদ বলা হয়।-সম্পাদক
৩৬. সুনানুত তিরমিজি, ৩৮৪২; আল-মুসনাদ লিল ইমাম আহমাদ, ১৭৮৯৫
৩৭. আহলে বাইত : রাসুল ﷺ-এর পরিবার, বংশধর ও তাদের মুক্ত দাসগণকে আহলে বাইত বলা হয়।-সম্পাদক
📄 ফিতনাবিষয়ক নির্ভরযোগ্য আরও কিছু গ্রন্থ
ফিতনা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে এমন কিছু নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ নিম্নে উল্লেখ করা হলো—
১. কাজি আবু বকর ইবনুল আরাবি রহ. রচিত আল-আওয়াসিম মিনাল কাওয়াসিম। সাহাবিগণের সমালোচকদের জবাবে লিখিত উৎকৃষ্ট গ্রন্থাবলির মধ্যে এটি অন্যতম। তবে এটিকে যেন আল-আওয়াসিম ওয়াল কাওয়াসিম গ্রন্থ মনে না করা হয়। সেটি ভিন্ন গ্রন্থ। কাজি আবু বকর ইবনুল আরাবি পঞ্চম হিজরি শতাব্দীর শেষভাগে আন্দালুসের ইশবেলিয়া তথা বর্তমান স্পেনের সেভিলায় জন্মগ্রহণ করেন। পাঁচ বছর বয়সেই তিনি কুরআন হিফজ সমাপ্ত করেন। ১৬ বছর বয়সে কুরআনের ১০ কেরাত আয়ত্ব করেন। এরপর ইলম অন্বেষণের উদ্দেশ্যে একের পর এক অঞ্চল ভ্রমণ করতে থাকেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি আলজেরিয়া, মিশর, হিজায, শাম এবং ফিলিস্তিন প্রভৃতি অঞ্চলে সফর করেন। এই সময়ে তিনি অনেক প্রসিদ্ধ আলেমগণের সান্নিধ্য লাভ করেন এবং তাদের কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করেন। এরপর রচনা এবং লেখালেখিতে মনোযোগী হওয়ার জন্য ফিরে আসেন জন্মভূমিতে। ৩৫টিরও বেশি গ্রন্থ তার হাতে রচিত হয়েছে। তন্মধ্যে একটি তাফসিরুল কুরআন বিষয়ে লিখিত আনওয়ারুল ফজর ফি তাফসিরিল কুরআন। এটি ছিল ১ লক্ষ ৬০ হাজার পৃষ্ঠায় লিখিত। এই গ্রন্থটি বহন করা হতো উটের পিঠে করে। পঞ্চম হিজরি শতাব্দীর একেবারে শেষদিকে তিনি এই গ্রন্থ রচনা করেন। একাধিক স্থানে এই গ্রন্থকে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। অবশেষে অষ্টম হিজরিতে এই অমূল্য গ্রন্থটি বাদশাহর হস্তগত হয়। এরপর গ্রন্থটির আর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। কাজি আবু বকর ইবনুল আরাবি দীর্ঘ ২০ বছর সময় নিয়ে এই গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন। তার লিখিত সবচেয়ে চমৎকার গ্রন্থগুলোর একটি হচ্ছে আল-আওয়াসিম মিনাল কাওয়াসিম গ্রন্থটি। সামসময়িক প্রসিদ্ধ আলেম মুহিব্বুদ্দিন আল-খতিব রহ. এই গ্রন্থে টীকা সংযোজন করেছেন। আলোচ্য গ্রন্থের সঙ্গে তিনি আরও অনেক মূল্যবান আলোচনা সংযোজন করেছেন। যা পাঠকদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে তুলবে।
২. ইবনে তাইমিয়া রহ. রচিত মিনহাজুস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যা। প্রকৃতপক্ষেই তিনি শাইখুল ইসলাম উপাধির উপযুক্ত। তিনি ছিলেন বিদআতিদের বিরুদ্ধে সুন্নাহর উন্মুক্ত তরবারি। শিয়া ও কদরিয়্যা³⁸ আকিদা এবং ফিতনার ঘটনাবলি নিয়ে যারা জানতে চায়, তাদের জন্য এই গ্রন্থের বিকল্প নেই। গ্রন্থটি চার খণ্ডে লিখিত। সাহাবিগণের ওপর আরোপিত প্রশ্ন এবং অপবাদের জবাবে তিনি গ্রন্থটিতে মানতেক তথা তর্কশাস্ত্র এবং যুক্তির ব্যবহারও করেছেন।
৩. আল্লামা ইবনে কাসির রহ. রচিত আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া। এটিকে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য এবং উত্তম গ্রন্থসমূহের একটি বিবেচনা করা হয়। প্রত্যেক মুসলিমের জন্যই আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া সংগ্রহে রাখা উচিত। তবে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, ইবনে কাসির রহ. কিছু কিছু স্থানে ওয়াকিদি থেকে বর্ণনা করেছেন। এসব বর্ণনা নির্ভরযোগ্য নয়। তবে ইবনে কাসির রহ. বর্ণিত অনেক গ্রহণযোগ্য বর্ণনাও রয়েছে। তিনি ইমাম তবারি রহ. প্রণীত তারিখুল উমামি ওয়াল মুলুক থেকেও অনেক বর্ণনা এনেছেন।
৪. ইহসান ইলাহি জহির রচিত আশ-শিয়াতু ওয়াত তাশাইয়ু। এটি শিয়া এবং তাদের পরিকল্পনা সম্পর্কে আলোকপাতকারী সবচেয়ে সুন্দর গ্রন্থের একটি। সাম্প্রতিক সময়ে রহস্যজনকভাবে লেখককে হত্যা করা হয়েছে। তার রচিত এই গ্রন্থটি শিয়া এবং শিয়া মতাদর্শ সম্পর্কে রচিত সর্বোত্তম গ্রন্থগুলোর একটি।
৫. আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ুতি রহ. রচিত তারিখুল খুলাফা। এ গ্রন্থে প্রত্যেক খলিফার ইতিহাস বিবৃত হয়েছে। যদিও ফিতনাসংক্রান্ত ঘটনার বর্ণনায় তিনি খুব বেশি সতর্কতা অবলম্বন করেননি। ইমাম সুয়ুতি ৯১১ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন।
৬. মোস্তফা নাজিব রচিত হুমাতুল ইসলাম। এটি সংক্ষিপ্ত হলেও খুবই মূল্যবান একটি গ্রন্থ। এ গ্রন্থের অধিকাংশই নির্ভরযোগ্য। গ্রন্থটির বিভিন্ন স্থানে লেখকের পক্ষ থেকে যে টীকা যুক্ত করা হয়েছে তাও খুব চমৎকার।
৭. আল্লামা ইবনে কাসির রহ. রচিত ইসতিশহাদুল হুসাইন।
৮. শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. রচিত রাঅসুল হুসাইন।
৯. নাসিরুদ্দিন শাহ রচিত আল-আকাইদুশ শিইয়্যা।
১০. সাইদ ইসমাইল রচিত হাকিকতুল খিলাফ বাইনা উলামায়িশ শিয়া ওয়া জুমহুরি উলামায়িল মুসলিমিন।
১১. আল্লামা মুহিব্বুদ্দিন আল-খতিব রহ. রচিত আল-উসুসুল্লাতি কামা আলাইহা দ্বীনুশ শিয়াতিল ইমামিয়্যাতিল ইসনা আশারিয়্যা।
আল্লামা মুহিব্বুদ্দিন আল-খতিব রহ. তার জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় করেছেন শিয়া এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর মধ্যে সামঞ্জস্যতার দাবিদারদের অপনোদন এবং তাদের নিয়ে গবেষণা করে। তিনি বলেন, আহলুস সুন্নাহ এবং শিয়াদের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নেই। শিয়া মতবাদ ইসলাম ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। শিয়াদের গ্রন্থসমূহে তাদের আকিদাগুলো অধ্যয়ন করলে এ বিষয়টি পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে যাবে।
এই আকিদাগুলো আমাদের ভালোভাবে বোঝা এবং আয়ত্ব করা উচিত। ফিতনাসংক্রান্ত এই স্পর্শকাতর বিষয়ে অধ্যয়ন করার সময় আমরা যেসব গ্রন্থ অধ্যয়ন করব, কিছুতেই কোনো লেখককে ত্রুটিমুক্ত মনে করব না। কারণ, শিয়ারা লোকদের বুঝাতে চায় যে, কেবল আবু বকর রা. এবং উমর রা.-এর সময়েই ইসলামি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়েছিল। এরপর ইসলামি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি। তাদের দাবি অনুযায়ী এরপর থেকে ইসলাম রক্তারক্তি এবং হানাহানির মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে। তাই ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার কোনো প্রয়োজন নেই। নয়তো আমাদের পরিণতি, তাদের পরিণতির মতোই হবে। তাদের দাবি অনুযায়ী, রাসুল ﷺ থেকে সরাসরি দীক্ষা গ্রহণকারী সাহাবিগণই যদি এমন সব অন্যায়কর্ম করে থাকেন, তাহলে অন্যরা কী করবে তা বলার অপেক্ষা রাখা না। এই কথাটি প্রতিষ্ঠিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য। এ উদ্দেশ্যেই তারা এসব বানোয়াট এবং মিথ্যা বর্ণনা ছড়িয়ে থাকে।
অতএব, ফিতনাসংক্রান্ত ঘটনা পাঠ করার সময় আপনার জন্য উচিত হবে এ ঘটনা উল্লেখকারী উৎস এবং রেফারেন্সগুলো খতিয়ে দেখা এবং সেগুলোর বিশুদ্ধতা ও দুর্বলতা যাচাই করে নেওয়া।
টিকাঃ
৩৮. কদরিয়্যা: তাকদিরকে অস্বীকারকারী একটি কাফের দল। তাদের দাবি হলো, যেকোনো ঘটনা ঘটার পূর্বে আল্লাহ তাআলা সে সম্পর্কে জানেন না। নাউজুবিল্লাহ। এ দলটির উৎপত্তি হয় হিজরি প্রথম শতাব্দীতে। তুহফাতুল আহওয়াযি, ৬/৩০৩ (শামেলা)-সম্পাদক