📘 ফিতনার ইতিহাস 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য। আমরা তাঁর প্রশংসা করি, তাঁর কাছেই সাহায্য কামনা করি। ক্ষমাপ্রার্থনা করি তাঁর কাছে এবং তাঁর কাছে চাই সঠিক পথের দিশা। আমরা আল্লাহ তাআলার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি আমাদের প্রবৃত্তির অনিষ্ট থেকে এবং মন্দ আমল থেকে। আল্লাহ তাআলা যাকে সরল পথে পরিচালিত করেন, কেউ তাকে পথভ্রষ্ট করতে পারে না। যাকে পথভ্রষ্ট করেন, কেউ তাকে সুপথ দেখাতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কেউ ইবাদতের উপযুক্ত নয়। তিনি একক সত্তা, তাঁর কোনো শরিক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, নিশ্চয় মুহাম্মাদ আল্লাহ তাআলার বান্দা এবং রাসুল।

পরকথা, আমরা আজ ইসলামি ইতিহাসের বেদনাসিক্ত একটি অধ্যায় উন্মোচন করতে যাচ্ছি। সময়ের যে প্রান্তে এসে সম্মানিত সাহাবিগণের হাতেই শহিদ হয়েছিলেন অনেক সাহাবি। আমরা কথা বলব ইসলামি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ফিতনা উসমান ইবনে আফফান রা.-এর হত্যাকাণ্ড নিয়ে। আলোচনা করব আলি রা. এবং মুআবিয়া রা.-এর মতো সম্মানিত সাহাবিদ্বয়ের মধ্যকার লড়াই নিয়ে। কথা বলব এক অনভিপ্রেত ঘটনায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সাহাবিগণের শাহাদাত নিয়ে। যা সেসময় ইসলামের প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রে রেখেছিল বিরাট নেতিবাচক প্রভাব।

সত্যি বলতে, এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা ধারণার চেয়েও কঠিন। কারণ, বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে কোনো ভুল মন্তব্য করা মানে জান্নাতি একজন ব্যক্তির ব্যাপারে ভুল মন্তব্য করা। সকল সাহাবিকে আমরা জান্নাতি মনে করি। রাসুল ﷺ তাদের ওপর সন্তুষ্ট থাকা অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন। তাদের মর্যাদার ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে কুরআনের অনেক আয়াত। তাই তাদের কোনো একজনের ব্যাপারে ভুল মন্তব্য করা অবশ্যই মারাত্মক এবং ভয়াবহ ব্যাপার।

তবে অচিরেই আমরা এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করব, যেগুলোর আলোকে আমরা এই ফিতনা সম্পর্কে আলোচনা করতে পারব। আর যেকোনো উৎস থেকে এ ফিতনা নিয়ে অধ্যয়ন করা ঠিক হবে না। কারণ, অনির্ভরযোগ্য উৎস থেকে এ বিষয়টি অধ্যয়ন করা খুবই বিপজ্জনক। এর কারণ আমরা শীঘ্রই উল্লেখ করব।

আমরা সামনে সেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উল্লেখ করব, যেগুলো আপনাকে পবিত্র ও সম্মানিত সাহাবিগণের ক্ষেত্রে ভুল মন্তব্য করা থেকে রক্ষা করবে।

-ড. রাগিব সারজানি
কায়রো, মিশর

📘 ফিতনার ইতিহাস 📄 গ্রন্থটি যেসব উদ্দেশ্যে লেখা

📄 গ্রন্থটি যেসব উদ্দেশ্যে লেখা


প্রথম উদ্দেশ্য: সাহাবিগণের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অপবাদ ও আপত্তির জবাব দেওয়া
শুরুতেই আমাদের নিকট এ বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া উচিত যে, কী কারণে ও কী উদ্দেশ্যে আমরা এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রথম উদ্দেশ্য হবে, আমাদের প্রিয়নবী ﷺ-এর প্রিয় সাহাবিগণের মর্যাদা রক্ষা করা। সাহাবিগণের মর্যাদা রক্ষা করা সত্তাগতভাবেই অত্যন্ত মর্যাদার বিষয়। কারণ, বর্তমানে সাহাবিগণের ওপর অনেক অপবাদ আরোপ করা হচ্ছে। ইসলাম বিকৃতকারী কুচক্রী মহল তাদের কাউকেই লক্ষ্যবস্তু বানাতে কুণ্ঠাবোধ করছে না; চাই অজ্ঞতাবশত হোক কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল ﷺ বলেছেন, যখন এ উম্মতের শেষাংশ প্রথমাংশের (সাহাবিগণের) ওপর (তাদের মর্যাদা সম্পর্কে অজ্ঞতাবশত) অভিসম্পাত করবে, তখন যারা এ বিষয়ে (তাদের মর্যাদার বিষয়ে) জানে তারা যেন তাদের জ্ঞান প্রকাশ করে। নয়তো এই জ্ঞান গোপন করার কারণে মুহাম্মাদ ﷺ-এর ওপর অবতীর্ণ জ্ঞানকে গোপন করার সমতুল্য অপরাধ হবে।¹

আমরা চিন্তা করলে বুঝতে পারব যে, এ বাক্যটির গভীর মর্ম রয়েছে। সাহাবিগণের বিরুদ্ধে উত্থাপিত আপত্তির জবাব না দিলে মানুষ মুহাম্মাদ ﷺ-এর ওপর অবতীর্ণ জ্ঞানকে গোপনকারী সাব্যস্ত হবে-এ কথার কী অর্থ? আমাদের নিকট এই দ্বীন সাহাবিগণের মাধ্যমেই এসেছে। পবিত্র কুরআন রাসুল ﷺ-এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি সাহাবিগণের নিকট তা বর্ণনা করেছেন। তারা কুরআন লিপিবদ্ধ করেছেন, যথাযথভাবে সংরক্ষণ করেছেন এবং আমাদের পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন। রাসুল ﷺ নিজ হাতে পবিত্র সুন্নাহ তথা হাদিস লিপিবদ্ধ করেননি। বরং তাঁর থেকে সাহাবিগণ তা বর্ণনা করেছেন। তাই কোনো সাহাবির ওপর অপবাদ আরোপ করা সুন্নাহকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সমতুল্য। বরং এতে কুরআনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। কারণ, এই কুরআন রাসুল ﷺ থেকে সাহাবিগণের মাধ্যমেই প্রচার হয়েছে।

আমরা সকলেই জানি, শিয়ারা সাহাবিগণের ওপর কতশত অপবাদ আরোপ করেছে! হয়তো কখনো কেউ বিষয়টি সম্পর্কে উদার নীতি গ্রহণ করে বলতে পারে, যতক্ষণ তারা আল্লাহ তাআলার তাওহিদ এবং রাসুল ﷺ-এর রিসালাতের সাক্ষ্য দেবে, ততক্ষণ সাহাবিগণের ওপর অপবাদ আরোপ করার কারণে তাদের ঈমানে কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি খুবই ভয়াবহ এবং বিপজ্জনক।

আসুন দেখে নিই, সাহাবিগণের ওপর অপবাদ আরোপ করার পরিণাম কী দাঁড়ায়। তারা সাহাবিগণের বিভিন্ন দোষত্রুটি তুলে ধরেছে। একজন একজন করে সবাইকে সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। এমনকি তারা পাঁচজন সাহাবি ছাড়া অন্য সকল সাহাবিকে কাফের হিসাবে আখ্যায়িত করেছে। এ মতবাদের প্রবক্তারা আজও আমাদের মধ্যে বিদ্যমান। যারা আমাদের কাছে শিয়া ইসনা আশারিয়া অথবা জাফরিয়া নামে পরিচিত। যে পাঁচজন সাহাবিকে তারা কাফের বলেনি তারা হলেন, আলি ইবনে আবু তালেব রা., মিকদাদ ইবনে আমর রা., আম্মার ইবনে ইয়াসির রা., আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. ও সালমান ফারসি রা.।

তাদের কেউ কেউ এ ক্ষেত্রে শিথিলতা করে ১১জন সাহাবি ছাড়া বাকি সকল সাহাবিকে কাফের সাব্যস্ত করেছে। আবু বকর সিদ্দিক রা. এবং উমর রা.- এর মতো সাহাবিকে তারা জিবত (শয়তান) ও তাগুত (বাতিল আরাধ্য) বলে আখ্যা দিয়েছে। উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা.-সহ অন্য সকল সাহাবির ওপর অসংখ্য অপবাদ আরোপ করেছে।

সাহাবিগণের ঘৃণ্য সমালোচনা এবং তাদের কাফের সাব্যস্ত করার ফলে তারা সাহাবিগণের মুখনিঃসৃত সব কথা বর্জন করেছে। ওই সকল সাহাবিগণ যত হাদিস বর্ণনা করেছেন সবগুলোকেই তারা পরিত্যাগ করেছে। বিশুদ্ধ গণনা অনুযায়ী প্রায় ১ লক্ষ ১৪ হাজার সাহাবি যত হাদিস বর্ণনা করেছেন সবগুলোকেই তারা বাতিল আখ্যা দিয়েছে। এমনকি তাদেরকে আমানতের খেয়ানতকারী আখ্যা দিয়ে স্পর্ধার চূড়ান্তসীমা লঙ্ঘন করেছে। ফলে বিষয়টি জটিল আকার ধারণ করেছে। তাদের মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে ওই সকল সাহাবিগণ থেকে বর্ণিত হাদিসকে তারা বাতিল আখ্যা দিয়ে থাকে।

ইমাম বুখারি রহ. যেহেতু সে সকল সাহাবি থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন; তাই শিয়াদের কথা অনুযায়ী এগুলো সবই বাতিল হিসাবে গণ্য হবে। আলি রা., সালমান ফারসি রা. প্রমুখগণ; যাদেরকে তারা কাফের সাব্যস্ত করেনি, সহিহ বুখারিতে তাদের বর্ণনা থেকে আনীত হাদিসগুলোও বাতিল বলে গণ্য হবে। এমনইভাবে সহিহ মুসলিম, সুনানুত তিরমিজি, আস-সুনানুল কুবরা লিন নাসায়ি, সুনানু আবি দাউদ-সহ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআ সংকলিত সকল সহিহ হাদিসগ্রন্থ তাদের দৃষ্টিতে বাতিল ও পরিত্যাজ্য।

এর চেয়েও ঘৃণ্য এবং বিপজ্জনক কথা হচ্ছে, তারা পবিত্র কুরআনুল কারিমকে বিকৃত সাব্যস্ত করার ঘৃণ্য অপকর্মে লিপ্ত হয়েছে। শিয়াদের নিকট সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য গ্রন্থ কিতাবুল কাফি। আমাদের নিকট সহিহ বুখারির যে মর্যাদা, তাদের নিকট এ গ্রন্থটির সেই মর্যাদা। এই গ্রন্থে জাফর আল-জুফির সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, সে বলেছে, আমি আবু জাফর² আ.-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি এই দাবি করে যে, সে সম্পূর্ণ কুরআন যেভাবে অবতীর্ণ হয়েছে সেভাবেই সংকলন করেছে; সে মিথ্যাবাদী।³

তাদের দাবি অনুযায়ী কুরআন যেভাবে অবতীর্ণ হয়েছে সেভাবে সংকলিত হয়নি। একমাত্র আলি রা. এবং তার পরবর্তী ইমামগণই কুরআন যেভাবে অবতীর্ণ হয়েছে সেভাবে সংকলন ও সংরক্ষণ করেছেন।⁴ তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, কুরআনের ১৭ হাজার আয়াত রয়েছে।⁵ অথচ আমরা জানি কুরআনের মোট আয়াত ৬২৩৬টি। আরও বলে, আমাদের কাছে যে কুরআন আছে, মূল কুরআন এর চেয়ে তিনগুণ বড়।⁶ আরও বলে, তাদের অদৃশ্য ইমাম, যিনি কোনো একদিন এসে আত্মপ্রকাশ করবেন; কুরআন তার সঙ্গে গোপন রয়েছে। আমাদের মাঝে যে কুরআন রয়েছে, তাতে অনেক বিকৃতি এবং ভ্রষ্টতা রয়েছে (নাউজুবিল্লাহ)। তবে বর্তমানে তাদের তাকিয়্যা নামক বিশ্বাস অনুযায়ী তারা এ কুরআনকে স্বীকার করে থাকে।

তাকিয়্যার শাব্দিক অর্থ আত্মরক্ষা। পারিভাষিক সংজ্ঞা হচ্ছে, নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য আপনি মনেপ্রাণে যা বিশ্বাস করেন তার বিপরীত প্রকাশ করা এবং আপনার অন্তরে নেই এমন কথা বলা।

শিয়াদের নিকট তাকিয়্যার আকিদা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি তারা বলে থাকে, 'যে তাকিয়্যায় বিশ্বাস করে না, তার দ্বীন নেই।' তাদের কথা অনুযায়ী তাকিয়্যা হচ্ছে দ্বীনের ১০ ভাগের নয়ভাগ। তাই দেখা যায়, তারা আমাদের মাঝে যে কুরআন রয়েছে, বাহ্যত তার প্রতি ঈমানের কথা স্বীকার করে ঠিকই, কিন্তু নিজেদের বইপত্রে তাদের বক্তব্য হচ্ছে— প্রকৃত কুরআন সেটিই, যাতে ১৭ হাজার আয়াত রয়েছে। যা রাসুল ﷺ-এর ইন্তেকালের পর ফাতেমা রা.-এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল। তিনি এ কুরআন মুখস্থ করেছিলেন। এরপর আলি রা.-ও পরবর্তী ইমামগণ তার কাছ থেকে আয়ত্ব করেছেন।' তাদের বক্তব্য অনুযায়ী কুরআনের অধিকাংশ আয়াত রহিত হয়ে গেছে।⁷ যেমন, সুরা ইনশিরাহের প্রথম আয়াত, 'আমি কি আপনার বক্ষকে উন্মোচিত করিনি?' তাদের বক্তব্য অনুযায়ী এ আয়াত রহিত হয়ে গেছে। এর পরিবর্তে সেখানে হবে, 'আমি আলিকে বানিয়েছি আপনার মেয়ের জামাই।'

এ আলোচনা তাদের গ্রন্থ কিতাবুল কাফি-তে রয়েছে। বর্তমান ইরানি কুরআনের সুরা বেলায়া-এর মধ্যে এটি রয়েছে! আমাদের কুরআনে এ আলোচনা নেই এবং না থাকাটাই স্বাভাবিক। তাদের গ্রন্থে এই সুরাটি এভাবে আছে, 'হে ঈমানদাররা, তোমরা ঈমান আনো নবী এবং অলির প্রতি। যাদের আমি প্রেরণ করেছি, তোমাদের সরলপথ দেখানোর জন্য। আমার নবী এবং অলি একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত। আমিই সর্বজ্ঞ এবং সর্বাধিক অবগত। নিশ্চয় যারা আল্লাহ তাআলার সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার পূরণ করে, তাদের জন্য রয়েছে নেয়ামতে পরিপূর্ণ জান্নাত। আর যাদের সামনে আমার আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করা হলে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে, তাদের জন্য জাহান্নামের ভয়াবহ স্থান নির্ধারিত। কেয়ামতের দিন তাদের এই বলে ডাকা হবে যে, ওই সকল মিথ্যাবাদী জালেমরা কোথায়, যারা আমার প্রেরিত দূতদ্বয়কে অস্বীকার করেছে? তাদের পরবর্তী সময়ে সত্য নিয়ে আর কোনো দূত প্রেরিত হবে না। আল্লাহ নিকটবর্তী সময় পর্যন্ত তাদের প্রকাশ ঘটাবেন না। আর তোমাদের প্রভুর তাসবিহ পাঠ করো এবং জেনে রাখো, আলি সাক্ষীগণের অন্তর্ভুক্ত।'

এসব আলোচনা থেকে বোঝা গেল যে, সাহাবিগণের মর্যাদা রক্ষা করা সম্পূর্ণ দ্বীন রক্ষার নামান্তর। যদি ওই সকল ভ্রান্ত দাবিদারকে সুযোগ করে দেওয়া হয়, তবে অচিরেই সুন্নাহের বিলুপ্তি ঘটবে। আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য যে দ্বীনকে মনোনীত করেছেন, সেই দ্বীন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এমনটি বাস্তবেই ঘটেছিল, যখন ওই সকল বিকৃতকারী কোনো কোনো অঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছিল। যেমন, মিশরে শিয়া ফাতেমিদের শাসনকালে তারা সুন্নাহকে সম্পূর্ণভাবে রহিত করে দিয়েছিল। তারা এমন সব বিষয় প্রতিষ্ঠা করেছিল, যা কুফর থেকে মুক্ত নয়। ফাতেমিদের ইতিহাস অধ্যয়নকারীগণ এমন অসংখ্য উদাহরণ খুঁজে পাবেন।

দ্বিতীয় উদ্দেশ্য : ইতিহাস নিয়ে চিন্তাভাবনা করা
পৃথিবীতে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। এটি আল্লাহ তাআলার অবহারিত রীতি। তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলার স্থিরীকৃত নিয়মে কোনো পরিবর্তন পাবে না। এবং আল্লাহর স্থিরীকৃত নিয়মকে কখনো টলতেও দেখবে না।' [সুরা ফাতির : ৪৩]

সাহাবিগণের মধ্যে সংঘটিত ঘটনাবলি, তার কারণ, প্রকৃতি এবং ফলাফল এমন বিষয়, যুগে যুগে যার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। আমাদের যুগে আসবে এবং কেয়ামত পর্যন্ত বারবার পুনরাবৃত্তি হবে। তাই প্রথমে আমাদের জানতে হবে, তাদের মধ্যকার বিরোধের প্রধান কারণ কী ছিল? কীভাবে সেগুলোর উৎপত্তি হয়েছিল? এর ফলাফল কী হয়েছিল? এবং কীভাবে এর ইতি ঘটেছিল? যেন আমরা আল্লাহ তাআলার এই আদেশ থেকে উপকৃত হতে পারি। তিনি বলেন, 'আপনি ঘটনা বর্ণনা করুন, যেন তারা চিন্তাভাবনা করতে পারে।' [সুরা আরাফ: ১৭৬]

তিনি আরও বলেন, 'নিশ্চয় তাদের ঘটনাতে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য শিক্ষার উপাদান রয়েছে। এটি কোনো মনগড়া কথা নয় বরং তা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সমর্থক, সবকিছুর বিশদ বিবরণ এবং ঈমান আনয়নকারীদের জন্য হেদায়েত ও রহমতের উপকরণ।' [সুরা ইউসুফ: ১১১]

তৃতীয় উদ্দেশ্য: বিকৃত আকিদাসমূহের সংশোধন
এসব ঘটনা সম্পর্কে যখন আমরা জানব, ভ্রান্ত দলগুলোর আত্মপ্রকাশের ইতিহাস সম্পর্কে অবগতি লাভ করব এবং তারা যে বিকৃত আকিদাগুলোর অনুসরণ করে, কীভাবে সেগুলো তাদের মধ্যে প্রবেশ করেছে; এ নিয়ে অধ্যয়ন করব, তখন আমাদের সামনে তাদের আকিদা আরও স্পষ্ট হবে এবং এসব আকিদার ব্যাপারে সুন্নাহর দৃষ্টিভঙ্গিও উদ্ভাসিত হবে।

যখন আমাদের অন্তরে এ সব উদ্দেশ্যের সম্মিলন ঘটবে ও আমাদের অধ্যয়ন হবে এসব মহান উদ্দেশ্যে, শুধু ঘটনা এবং কেচ্ছা শোনার উদ্দেশ্য নয়, তখনই আমরা বিপদ থেকে নিরাপদ হতে পারব। এ বিষয়ে মনগড়া ঘটনা অনেক রয়েছে। তবে কিছু মানুষ এগুলো অধ্যয়ন বা শ্রবণ করে পুলক বোধ করে। অথচ এটি খুবই মারাত্মক একটি ব্যাপার। হাসান বসরি রহ.-কে সাহাবিগণের মধ্যে সংঘটিত ফিতনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছিলেন, আল্লাহ তাআলা আমাদের তরবারিগুলো তাদের রক্ত থেকে নিরাপদ রেখেছেন। তাই আমরাও আমাদের কলমকে তাদের সম্মানে আঘাত করা থেকে নিরাপদ রাখতে চাই।

এই অধ্যায় (উসমান ইবনে আফফান রা.-এর হত্যাকাণ্ডের আলোচনা) শুরু করার আগে বলে রাখা আবশ্যক যে, মানুষ এই ফিতনা সম্পর্কে ব্যাপকভাবে যেসব তথ্য জানে তার বেশিরভাগই বিকৃত। স্কুল, মাদরাসা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আমরা যে ইতিহাস পড়েছি, সেগুলোও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিকৃত করা হয়েছে। অচিরেই এ বিষয়ে আলোচনা করব। ইনশাআল্লাহ।

এ বিষয়ে জ্ঞানতাত্ত্বিক অধ্যয়নের মাধ্যমে আমরা ফিতনা নিয়ে গবেষণা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি সম্পর্কে জানতে পারব। এই মূলনীতিটি আমাদের সামনে এমন একটি শাস্ত্রের পরিচয় তুলে ধরবে, যে শাস্ত্রের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহর প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ করেছেন। এই শাস্ত্র হচ্ছে ইলমুর রিজাল বা ইলমুল জারহ ওয়াত তাদিল।

শুরুতে আমাদের বলে রাখা উচিত, রাসুল ﷺ থেকে যেসব হাদিস বর্ণিত হয়েছে সেগুলোর দুটি অংশ রয়েছে। প্রথম অংশ হচ্ছে মতন তথা হাদিসের মূল বক্তব্য। দ্বিতীয় অংশ হচ্ছে সনদ তথা বর্ণনাসূত্র। ইলমুর রিজালে বা ইলমুল জারহ ওয়াত তাদিলে সনদের বিশুদ্ধতা ও দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা করা হয়। আলেমগণের নিকট জারহ-এর সংজ্ঞা হচ্ছে, কোনো বিজ্ঞ হাফিজুল হাদিস⁸ কোনো বর্ণনায় কিংবা বর্ণনাকারীর মধ্যে ফিসক⁹, তাদলিস¹⁰, মিথ্যা, শুযুয¹¹ অথবা এ ধরনের অন্য কোনো ত্রুটি থাকায় বর্ণনাটি গ্রহণ না করা। যেমন, কোনো বর্ণনাকারীর ব্যাপারে তিনি বললেন, এই বর্ণনাকারীর মধ্যে সমস্যা রয়েছে। সে মিথ্যাবাদী বা হাদিস জালকারী, অথবা সে নির্ভরযোগ্য নয় কিংবা সে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুলে যায়। আর এ কারণে ওই বর্ণনাকারীর বর্ণিত বর্ণনাকে তিনি গ্রহণ করলেন না।

তাদিলের সংজ্ঞা হচ্ছে, একজন বর্ণনাকারীর বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য তার মধ্যে যেসব গুণ থাকা উচিত তাকে সেসব গুণে গুণান্বিত সাব্যস্ত করা। সনদের বা বর্ণনাসূত্রের মান বিচারের মধ্য দিয়েই আমরা হাদিস সহিহ¹², জয়িফ¹³ বা জাল¹⁴ কি না তা জানতে পারব।

ইলমুর রিজাল বা ইলমুল জারহ ওয়াত তাদিল একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ শাস্ত্রের মর্যাদা রাখে। ইয়াহইয়া ইবনে মাইন রহ.; যিনি ছিলেন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর সামসময়িক ব্যক্তিত্ব-তার মতো অনেক বিজ্ঞ আলেম এ শাস্ত্রে বিশেষ দক্ষ ছিলেন। তবে চিন্তার বিষয় হচ্ছে, ফিতনা সম্পর্কিত যত হাদিস এবং বর্ণনা রয়েছে, এর মধ্যে ৭৫ শতাংশের বেশি অত্যন্ত দুর্বল এবং রাসুল ও সাহাবিগণের নামে জালকৃত।

এ কথা বলাও গুরুত্বের দাবি রাখে যে, রাসুল ﷺ-এর হাদিসসমূহের সংকলন শুরু হয়েছিল উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ.-এর খেলাফতকালে। অর্থাৎ রাসুল ﷺ-এর হিজরতের প্রায় ১০০ বছর পর। যখন উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ. দেখতে পেলেন যে, মানুষ রাসুল ﷺ-এর সুন্নাহ ভুলে যাচ্ছে এবং উম্মাহর এই অমূল্য সম্পদ বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তখন তিনি সেই সময়কার বিজ্ঞ আলেম ইমাম যুহরি রহ.-কে হাদিস সংকলনের আদেশ দেন। তিনি এসব হাদিস লিপিবদ্ধকরণ এবং সংকলনের দিকে মনোযোগী হন। সে সময় সাহাবিগণের মধ্যে কেবল হাতে গোনা কজন সাহাবি জীবিত ছিলেন। আর আমরা জানি যে, সর্বশেষ সাহাবির ইন্তেকাল হয়েছিল ১১০ হিজরিতে। তাই ইমাম যুহরি রহ. সম্পূর্ণরূপে ইলমুর রিজালের ওপর নির্ভর করেছিলেন। তিনি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে গবেষণা করে হাদিস সংকলন করতে থাকেন। তার পরবর্তী সময়ে আসেন ইমাম বুখারি রহ. এবং ইমাম মুসলিম রহ. প্রমুখ মনীষীগণ। তারা এসে 'অমুক থেকে অমুক বর্ণনা করেছেন' এই সূত্র ধরে হাদিস লিপিবদ্ধ করা শুরু করেন। তখন ইলমুর রিজাল এবং ইলমুল জারহ ওয়াত তাদিলের গুরুত্ব প্রকাশ পেতে থাকে।

৬০০ হিজরিতে এসে একজন লোক যখন কোনো একটি হাদিস পাঠ করে, তখন এই মন্তব্য করতে পারে যে, এই হাদিসটি দুর্বল। কারণ, এই হাদিসে অমুক বর্ণনাকারী রয়েছে, যাকে মিথ্যাবাদী আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আর হাদিস সম্পর্কে এ ধরনের মন্তব্য করা অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি বিষয়। এই পদ্ধতিতে নিশ্চিতভাবে হাদিসের মান নির্ধারণ করার লক্ষ্যে আলেমগণ একজন বর্ণনাকারীর সম্পূর্ণ জীবনী অধ্যয়ন করতেন। তিনি কখন জন্মগ্রহণ করেছেন, কখন তার মৃত্যু হয়েছে, কোথায় বাস করেছেন, কোন কোন শহরে কত সময় থেকেছেন, তার সম্পর্কে মানুষের কী মন্তব্য ছিল, তিনি কি সত্যবাদী ছিলেন নাকি মিথ্যাবাদী, আমানতদার ছিলেন নাকি খেয়ানতকারী-এসব নিয়ে তারা বিস্তারিত পড়াশোনা করেছেন।

এই শাস্ত্রই আমাদের জন্য সুন্নাহকে সংরক্ষণ করেছে। সংরক্ষণ করেছে সাহাবিগণের কার্যাবলি। এমনইভাবে আমাদের জন্য সংরক্ষিত রেখেছে ফিতনাসংক্রান্ত হাদিসসমূহ। বিশেষভাবে আমাদেরকে জানিয়েছে যে, এ বিষয়ে রয়েছে অনেক মনগড়া হাদিস।

আমরা যদি শিয়াদের বর্তমান গ্রন্থাদির দিকে তাকাই, তবে দেখতে পাব তাদের কাছে ইলমুল জারহ ওয়াত তাদিল নামক অতি প্রয়োজনীয় এই শাস্ত্রের কোনো চিহ্নও নেই। একমাত্র আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর কাছেই এ শাস্ত্রের মূল্যায়ন রয়েছে। তাই আমরা দেখি, শিয়ারা অমুক থেকে অমুক, এভাবে বর্ণনা করতে গিয়ে একপর্যায়ে নির্দিষ্ট কারও নাম উল্লেখ না করে এভাবে বলতে থাকে যে, সে বর্ণনা করেছে তার চাচার সূত্রে, সে তার পিতার সূত্রে, সে একদল মানুষ থেকে। এখন এই অস্পষ্ট কথাগুলো দ্বারা কাদের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে তাদের বিবরণে তা আর খুঁজে পাওয়া যায় না। কোনো হাদিস বিশারদ এ বর্ণনাকারীদেরকে চেনে না, ফলে এদের কারও সম্পর্কে ইতিবাচক বা নেতিবাচক মন্তব্য করতে পারছে না। এভাবেই নানা অস্পষ্টতা রয়ে যায়। এ ছাড়া তাদের অনেক বর্ণনাকারীর ব্যাপারেই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআ একমত যে, হাদিসশাস্ত্রে তাদের বর্ণনা অগ্রহণযোগ্য। এর বিস্তারিত বিবরণ সামনে আসছে ইনশাআল্লাহ।

রাসুল ﷺ এবং সাহাবিগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে মনগড়া হাদিস রচনার প্রসার ঘটেছিল আব্বাসি খেলাফতকালে। কারণ, সে সময় ওই সকল পথভ্রষ্টরা ছিল খুবই শক্তিশালী। আব্বাসি খলিফাগণ তাদের প্রতিরোধে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। এই ঘৃণ্য অপকর্ম থেকে বিরত থাকার জন্য তাদেরকে অনেক সতর্কবার্তাও দিয়েছেন। তবুও তারা এই অপকর্ম অব্যাহত রেখেছে।

টিকাঃ
১. আল-মুজামুল আওসাত লিত তবারানি, ৪৩০
২. আবু জাফর সাদিক রহ. শিয়াদের থেকে মুক্ত। শিয়ারা তার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে যত কথা বলেছে তা থেকে তিনি পবিত্র। তিনি ছিলেন আলি রা.-এর বংশধর। শিয়ারা তাকে তাদের ষষ্ঠ ইমাম হিসাবে আখ্যা দিয়ে থাকে।
৩. কিতাবুল কাফি, ১/১৩৫
৪. কিতাবুল কাফি, ১/১৩৬
৫. কিতাবুল কাফি, ২/৩৫০
৬. কিতাবুল কাফি, ১/১৪১, আশ-শিয়া ওয়াল কুরআন, ৪২
৭. কিতাবুল কাফি, ১/১৪২
৮. হাফিজুল হাদিস: হাফিজুল হাদিস বলতে বিপুলসংখ্যক হাদিস আত্মস্থকারী ও হাদিসশাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিকে বুঝানো হয়। আদ-দুরারুস সামিনা ফি মুস্তলাহিস সুন্নাহ লিশ শায়খ আবদিল মাতিন।-সম্পাদক
৯. ফিসক: কবিরা গুনাহ পর্যায়ের পাপাচারে লিপ্ত হওয়া।-সম্পাদক
১০. তাদলিস: হাদিসশাস্ত্রের একটি পরিভাষা। এর উদ্দেশ্য হলো বর্ণনার ত্রুটি ঢেকে রাখা বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে বর্ণনায় ধোঁকার আশ্রয় নেওয়া। হাদিসশাস্ত্রে এর বিভিন্ন প্রকার রয়েছে।-সম্পাদক
১১. শুযুয: হাদিসশাস্ত্রের একটি পরিভাষা। এর দ্বারা নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী তার সমপর্যায়ের বর্ণনাকারীদের অথবা উচ্চপর্যায়ের বর্ণনাকারীদের বিপরীত বা স্বতন্ত্রভাবে বর্ণনা করাকে বুঝানো হয়। অনুরূপভাবে অনির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী কোনো নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীর বিপরীত বা স্বতন্ত্রভাবে বর্ণনা করাকেও বুঝানো হয়। শারহু লুগাতিল মুহাদ্দিস, পৃ. ৪১৫-৪২৫। -সম্পাদক
১২. সহিহ: বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হাদিস।-সম্পাদক
১৩. জয়িফ: অনির্ভরযোগ্য হাদিসের একটি প্রকার, এ প্রকারের হাদিস দ্বারা শরিয়তের কোনো বিধান সাব্যস্ত হয় না। আল-আজবিবাতুল ফাযিলা।-সম্পাদক
১৪. জাল: এমন হাদিসকে বলা হয় যা নবীজি ﷺ-এর নামে চালানো হয়, কিন্তু বাস্তবে নবীজি তা বলেছেন বা করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন, লামাহাত মিন তারিখিস সুন্নাহ ওয়া উলুমিল হাদিস।-সম্পাদক

📘 ফিতনার ইতিহাস 📄 মনগড়া হাদিস রচনাকারীদের শ্রেণিভাগ

📄 মনগড়া হাদিস রচনাকারীদের শ্রেণিভাগ


নবীজি ﷺ-এর নামে মনগড়া এবং বানোয়াট কথার রচয়িতাদেরকে আলেমগণ কয়েক শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। যথা:

১. জিন্দিক
যখন কোনো ব্যক্তি দ্বীন থেকে বেরিয়ে যায় এবং সজ্ঞানে দ্বীনকে আঘাত করে, তখন সে জিন্দিক হয়ে যায়। যেমন, বর্তমান সময়ের সালমান রুশদি। সে দ্বীন থেকে বেরিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি; বরং তার রচনাবলির মাধ্যমে ইসলামের ওপর আঘাত শুরু করেছে। এসব জিন্দিক মূলত দ্বীনের বিকৃতি সাধন এবং ইসলামের আকিদা-বিশ্বাস, কুরআন ও সুন্নাহর ওপর কালিমা লেপনের লক্ষ্যে প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের ভান করেছে। তাই তারা হাদিসের নামে মনগড়া কথা বানিয়ে হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল আখ্যা দেয়।

এর আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে মুহাম্মাদ ইবনে সাইদ আল-মাসলুব নামক এক ব্যক্তি। আব্বাসীয় খলিফা আবু জাফর মানসুর তার হাদিস জালিয়াতির ব্যাপারে জানতে পেরে তাকে হত্যা করেছিলেন। তার বানানো একটি হাদিস হলো, আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল ﷺ বলেছেন, আমিই শেষ নবী। আমার পর আর কোনো নবী আসবে না। তবে আল্লাহ যদি চান (তবে আসতে পারে)।¹⁵

এমন আরেক ব্যক্তির নাম হচ্ছে আবদুল কারিম ইবনে আবিল আওজা। তার হাদিস জালিয়াতি সম্পর্কে জানার পর আব্বাসি খলিফা তাকে হত্যা করেছেন। এই ইবনে আবিল আওজা ছিল চরম ইসলাম বিদ্বেষী। তাকে হত্যার জন্য আনা হলে, সে সদম্ভে বলেছিল, তোমরা আমাকে একটি বা দুটি হাদিসের জন্য হত্যা করছ। আল্লাহর শপথ! আমি রাসুল ﷺ-কে নিয়ে ৪ হাজার জাল হাদিস রচনা করেছি। এসব হাদিসে আমি হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল হিসাবে উপস্থাপন করেছি।

সে একাই বিপুল পরিমাণ জাল হাদিস রচনা করেছে। কথিত আছে, জিন্দিকদের রচিত জাল হাদিসের সংখ্যা প্রায় ১৪ হাজার। এর অনেকগুলো প্রসিদ্ধিও পেয়েছে।

২. শাসকশ্রেণির তোষামোদকারী
এই শ্রেণির লোকেরা তোষামোদ এবং চাটুকারিতার মাধ্যমে শাসকশ্রেণির নৈকট্যলাভ করতে চায়। এজন্য তারা রাসুল ﷺ-এর নামে মনগড়া হাদিস রচনা করে। এর মাধ্যমে বনু উমাইয়ার ওপর অপবাদ আরোপের ধারা শুরু করে। কারণ, তখন আব্বাসীয়দের শাসন চলছিল। তাই তাদেরকে খুশি করার অব্যর্থ অস্ত্র ছিল বনু উমাইয়া গোত্রের নিন্দা করা। এর প্রেক্ষিতেই মহান সাহাবি মুআবিয়া রা. এবং তার পুত্র ইয়াজিদের নিন্দামূলক বর্ণনাগুলো প্রকাশ পায়। অথচ ইয়াজিদ ছিলেন একজন খোদাভীরু ব্যক্তি। তারা ইয়াজিদের ব্যাপারে রটিয়ে দেয় যে, তিনিও মদ্যপান এবং নারীলিপ্সার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। ওয়ালিদ ইবনে উকবা রা.-এর মতো মহান মুজাহিদের ব্যাপারে তারা এ কথা ছড়িয়ে দেয় যে, তিনি মদ্যপানের প্রতি আসক্ত ছিলেন। এমনইভাবে আমের ইবনে আবদুল্লাহ এবং বনু উমাইয়া গোত্রের প্রত্যেক শাসকের চরিত্রে তারা কালিমা লেপন করে। তাদের মধ্যে মহান সাহাবি উসমান ইবনে আফফান রা.-ও ছিলেন। কারণ, তিনি ছিলেন বনু উমাইয়া বংশোদ্ভূত। তিনিও তাদের অপবাদ থেকে মুক্তি পাননি।

৩. জনগণের মনোতুষ্টিতে আগ্রহী
সেই যুগে একদল মানুষ ছিল, যাদের বলা হতো কাসসাস (বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে এর অনুবাদ করা যায় বক্তা)। তারা লোকদের কাছে বিভিন্ন হৃদয়স্পর্শী গল্প-কাহিনি বর্ণনা করত। মুসলিম সমাজ স্বাভাবিকভাবেই রাসুল এবং সাহাবিগণকে ভালোবাসে, তাই তারা রাসুল এবং সাহাবিগণকে এসব গল্প-কাহিনির বর্ণনাকারী বানাত। তারা দুর্লভ, বিস্ময়কর এবং বানোয়াট বিভিন্ন কাহিনি বর্ণনা করত, যেগুলোর কোনো ভিত্তি ছিল না। দুঃখজনক কথা হচ্ছে, তারা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে এসব মনগড়া কাহিনি সাহাবিগণের বর্ণনা বলে চালিয়ে দিত।

এমন একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা তুলে ধরছি-
একবার ইমাম আহমাদ রহ. এবং ইয়াহইয়া ইবনে মাইন রহ. বাগদাদের মসজিদে রুসাফায় নামাজ আদায় করছিলেন। ইতিমধ্যে এক বক্তা তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে থাকে, আহমাদ ইবনে হাম্বল এবং ইয়াহইয়া ইবনে মাইন আমাকে শুনিয়েছেন, তারা শুনেছেন আবদুর রাজ্জাকের কাছ থেকে। তিনি শুনেছেন মামারের কাছ থেকে। তিনি কাতাদা থেকে, আর কাতাদা আনাস রা. থেকে বর্ণনা করেন, রাসুল ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করবে, আল্লাহ প্রতিটি অক্ষর থেকে একটি পাখি সৃষ্টি করবেন। যার ঠোঁট হবে স্বর্ণের আর পালক হবে অমূল্য মারজান পাথরের।

এভাবে সে ২০ পৃষ্ঠাব্যাপী লম্বা এক ঘটনা বর্ণনা করে। আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. এবং ইয়াহইয়া ইবনে মাইন রহ. আশ্চর্যান্বিত হয়ে একে অপরের দিকে তাকাতে থাকেন। ইয়াহইয়া ইবনে মাইন রহ. ইমাম আহমাদ রহ.-কে জিজ্ঞাসা করেন, আপনি কি তার কাছে এই হাদিস বর্ণনা করেছেন? তিনি জবাব দেন, আল্লাহর শপথ! এমন হাদিস আমি মাত্রই শুনলাম।

লোকটির মজলিস শেষ হলে শুরু হয় হাদিয়া গ্রহণের পালা। সে লোকদের হাদিয়া গ্রহণের জন্য বসে পড়ে। ইয়াহইয়া ইবনে মাইন রহ. ইশারায় তাকে কাছে ডাকেন। সে হাদিয়া পাওয়ার আশা নিয়ে তাদের কাছে আসে। ইয়াহইয়া ইবনে মাইন রহ. তাকে জিজ্ঞাসা করেন, আপনাকে এই হাদিস কে শুনিয়েছে?
লোকটি জবাব দেয়, আহমাদ ইবনে হাম্বল এবং ইয়াহইয়া ইবনে মাইন।

ইয়াহইয়া ইবনে মাইন রহ. বলেন, আমি ইয়াহইয়া ইবনে মাইন এবং ইনি হলেন আহমাদ ইবনে হাম্বল। আমরা তো রাসুল ﷺ-এর এমন কোনো হাদিসই শুনিনি।
লোকটি জবাব দেয়, আমি বরাবরই শুনে এসেছি, ইয়াহইয়া ইবনে মাইন একজন বোকা লোক। এখন সে ব্যাপারে নিশ্চিত হলাম। মনে হয় যেন পৃথিবীতে তোমরা ছাড়া আর কোনো ইয়াহইয়া ইবনে মাইন আর আহমাদ ইবনে হাম্বল নেই! আমি তো ১৭জন আহমাদ ইবনে হাম্বল এবং ইয়াহইয়া ইবনে মাইন থেকে লিখেছি।

তখন আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. তার জামার আস্তিন দিয়ে মুখ চেপে বলেন, এই লোককে যেতে দিন। লোকটি তখন বিদ্রূপাত্মক এক হাসি দিয়ে তাদের সামনে থেকে চলে যায়।¹⁶, ¹⁷

এই ছিল ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. (১৬৪-২৪১ হিজরি)-এর যুগের চিত্র। যা রাসুল ﷺ-এর যুগ থেকে খুবই নিকটবর্তী ছিল। তাহলে পরবর্তী সময়ে বিষয়টি কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে একটু ভেবেই দেখুন।

৪. নিজের মতবাদ বা অঞ্চলের প্রতি অন্যায় পক্ষপাতদুষ্ট
যারা মনগড়া হাদিস রচনা করে তাদের মধ্যে এই গোষ্ঠীকেই সবচেয়ে বিপজ্জনক গণ্য করা হয়। নিজেদের মতবাদের প্রতি অন্ধ বিশ্বাস ও সাম্প্রদায়িক মনোভাবের কারণেই শিয়ারা রাসুল ﷺ-কে নিয়ে বানোয়াট হাদিস রচনা এবং সাহাবিগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে মিথ্যা বর্ণনা শুরু করেছিল। বিশেষ করে ফিতনাসংক্রান্ত ব্যাপারে তাদের মনোযোগ ছিল সবচেয়ে বেশি। তৎকালীন পরিস্থিতিতে শিয়াদের প্রভাবের কারণে এই ঘৃণ্য পদ্ধতিটি ব্যাপক প্রচলন লাভ করে। এমনইভাবে তারা পারস্যের প্রতিও খুব অন্যায় পক্ষপাতিত্বের আশ্রয় নেয় এবং ইসলামের সঙ্গে অনেক বিষয়ের সংমিশ্রণ ঘটায়। এর চেয়েও স্পর্ধার কথা হচ্ছে, তারা ইসলাম ধর্মে অগ্নিপূজারিদের অনেক আকিদার অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে। শিয়াদের আকিদা বর্ণনা করার সময় এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করব, ইনশাআল্লাহ।

এদের রচিত কিছু জাল হাদিস হচ্ছে-
• বনু হাশেম ব্যতীত অন্য লোকেরা একে অপরের সম্মানে দাঁড়াবে। কারণ, বনু হাশেম কারও সম্মানে দাঁড়ায় না।¹⁸
• রাসুল ﷺ মদিনায় আগমন করার পর যখন সাহাবিগণের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন গড়লেন, তখন আলি রা. অশ্রুসজল চোখে তাঁর কাছে এসে বললেন, আপনি সকল সাহাবিগণদের মাঝে একে অপরের সঙ্গে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন গড়ে দিলেন। কিন্তু আমার সঙ্গে কারও ভ্রাতৃত্ব গড়ে দিলেন না। তখন রাসুল বললেন, হে আলি, তুমি দুনিয়া এবং আখেরাতে আমার ভাই।¹⁹ এটি একটি জাল হাদিস। অনেকেই এটিকে সহিহ মনে করে থাকে।

এমনইভাবে আরও অনেক জাল হাদিস রয়েছে। যেমন:
• কুরআনের দিকে তাকানো ইবাদত।²⁰
• পিতামাতার দিকে সন্তানের তাকানো ইবাদত।²¹
• আলি রা.-এর দিকে তাকানো ইবাদত।²²
• আমি সর্বশেষ নবী। আর হে আলি, তুমি সর্বশেষ অলি ইত্যাদি।²³

এমনকি তারা উম্মুল মুমিনিন আয়েশা সিদ্দিকা রা.-এর মর্যাদাকে তুচ্ছ প্রতিপন্ন করতে চায়। এজন্য তারা বলে থাকে, রাসুল ﷺ বলেছেন, হে আয়েশা, তুমি কি জানো, আল্লাহ তাআলা জান্নাতে আমার সঙ্গে মারয়াম বিনতে ইমরান, মুসার বোন কুলসুম এবং ফেরাউনের স্ত্রীকে বিয়ে দিয়েছেন!²⁴

তারা এখানে আম্মাজান আয়েশা রা.-এর কথা উল্লেখ করেনি। অথচ এটি স্বতঃসিদ্ধ বিষয় যে, মুমিনের দুনিয়ার স্ত্রী আখেরাতেও তার স্ত্রী থাকবেন। তারা আয়েশা রা.-এর ব্যাপারে আরও জঘন্য অপবাদ আরোপ করার প্রয়াস চালিয়েছে। তার কুৎসা বর্ণনা করতে এমন আরও অনেক হাদিস তারা রচনা করেছে। তাদের মধ্যে মাইসারা ইবনে আবদে রাব্বি নামে কুখ্যাত এক লোক ছিল। সে স্বীকার করেছে যে, সে একাই আলি রা.-এর মর্যাদাসংক্রান্ত ৭০টি হাদিস বানিয়েছে।

আমরা জানি যে, আলি রা.-এর মর্যাদা প্রমাণের জন্য এসব বানোয়াট হাদিসের কোনো প্রয়োজন নেই। ইসলামে আলি রা.-এর মর্যাদা সর্বজন স্বীকৃত। আল্লাহ তাআলার কাছে তার জন্য বিরাট মর্যাদা রয়েছে। কিন্তু আলি রা.-এর মর্যাদা প্রমাণ এবং অন্যান্য সাহাবিগণের কুৎসা রটনায় নবীজির নামে হাদিস রচনার কোনো সুযোগ নেই। অন্য সাহাবিগণকে উপেক্ষা করে শুধু আলি রা.-কে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করা অবশ্যই ঘৃণ্য অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে।

৫. ইসলামের প্রতি অতি ভক্তি পোষণকারী
আশ্চর্যের কথা হচ্ছে, এ ধরনের লোকেরাও জাল হাদিস রচনা করেছেন। কিন্তু আমরা যখন এ সমস্ত জাল হাদিস রচনার পেছনে তাদের উদ্দেশ্য জানতে পারব, তখন আমাদের বিস্ময় কেটে যাবে। তারা দেখতে পেয়েছিল যে, মানুষ দিনদিন ইসলাম ধর্ম থেকে সরে যাচ্ছে। কুরআন তেলাওয়াত কমিয়ে দিচ্ছে। সুন্নাহর অনুসরণ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাই মানুষকে কুরআন তেলাওয়াত এবং সুন্নাহর অনুসরণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে তারা এ ধরনের মনগড়া হাদিস রচনার আশ্রয় নেয়।

এদের মধ্যে আবু ইসমাহ ইবনে মারয়াম নামক এক ব্যক্তি ছিলেন। যিনি তৎকালীন পারস্যের অন্তর্গত মার্ভ শহরের কাজি তথা বিচারক ছিলেন। তিনি কুরআনের প্রতিটি সুরার ফজিলত বর্ণনা করার জন্য একটি করে হাদিস রচনা করেছিলেন যে, যে অমুক অমুক সুরা পাঠ করবে সে এমন এমন সওয়াব পাবে ইত্যাদি। এমন একটি মুনকার (অগ্রহণযোগ্য ও বর্ণনার অযোগ্য) হাদিস হচ্ছে, প্রতিটি বস্তুরই সৌন্দর্যবর্ধক আছে। আর কুরআনের সৌন্দর্যবর্ধক হচ্ছে সুরা আর-রাহমান।²⁵ এমন অগ্রহণযোগ্য আরও বহু হাদিস তিনি রচনা করেছিলেন।

৬. জাগতিক স্বার্থ উদ্ধারকারী
এই শ্রেণির লোকেরা জাগতিক স্বার্থ উদ্ধারের জন্য জাল হাদিস রচনা করে থাকে। রাসুল-এর সঙ্গে এসব মনগড়া কথাকে সম্বন্ধ করতে তারা একটুও কুণ্ঠাবোধ করে না। এ ধরনের জাল হাদিসের একটি উদাহরণ হলো, এক ব্যক্তি রাসুল-এর দিকে সম্বন্ধ করে বলেছে যে, আল্লাহ তাআলা বিনহা অঞ্চলের মধুর মধ্যে বরকত দান করেন।²⁶
বোঝা যায় যে, সেই ব্যক্তি ছিল মধু বিক্রেতা। নিজের ব্যবসার প্রসারের উদ্দেশ্যে সে রাসুল-এর নামে এমন মনগড়া কথা বলে দিয়েছে। উল্লেখ্য, বিনহা হচ্ছে মিশরের একটি গ্রাম।

এমন আরও কিছু জাল হাদিস রয়েছে। যথা:
যে ব্যক্তি মাসের ১৭ তারিখ মঙ্গলবার দিন শিঙ্গা লাগাবে, তার সারা বছরের চিকিৎসা সম্পন্ন হয়ে যাবে।²⁷
কোনো পরিবারের কর্তা কখনো সফল হয়নি।²⁸
এসবই হচ্ছে ঈমানের দুর্বলতা এবং অন্তর থেকে দ্বীনদারি বিদূরিত হয়ে যাওয়ার কুফল।

আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, একাধিক কারণে বিপুল পরিমাণে জাল হাদিস ছড়িয়েছে। জিন্দিকরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই ইসলামের বিকৃতি সাধন করেছে। নিজেদের মতবাদের প্রতি অন্যায় পক্ষপাতদুষ্টরা তাদের মতবাদকে সমুন্নত করার জন্য ইসলামের সঠিক মতবাদকে কলুষিত করেছে। কিছু লোক শ্রোতাদেরকে মুগ্ধ করার জন্য নিজ থেকে মনগড়া গল্প রচনা করেছে। কিছু লোক আব্বাসি মন্ত্রী এবং আমলাদের নৈকট্যলাভের জন্য বনু উমাইয়া গোত্রের শাসকদের অপবাদ দিয়ে ভ্রান্তি ছড়িয়েছে। এসব মনগড়া হাদিসের প্রতিক্রিয়া ফিতনাসংক্রান্ত ঘটনাসমূহের ওপরেও প্রকাশ পেতে থাকে।

যেসব গ্রন্থে এই ফিতনা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে, সেগুলোর দিকে আমরা যদি চোখ বুলাই তাহলে দেখব যে, এসব গ্রন্থের প্রায় সব হাদিসই যথাক্রমে : আবু মিখনাফ লুত ইবনে ইয়াহইয়া, ওয়াকিদি, মুহাম্মাদ ইবনে সায়িব কালবি এবং তার পুত্র হিশাম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে সায়িব কালবির সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। ফিতনাসংক্রান্ত যত সন্দেহযুক্ত হাদিস রয়েছে, এগুলো এই চারজনের সঙ্গেই সম্বন্ধযুক্ত করা হয়েছে।

এখন দেখি এই চারজনের ব্যাপারে আলেমগণের কী মন্তব্য:
১. প্রথম বর্ণনাকারী লুত ইবনে ইয়াহইয়া আবু মিখনাফের ব্যাপারে ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেছেন, লুত ইবনে ইয়াহইয়া আবু মিখনাফ হলো একেবারেই অনির্ভরযোগ্য একজন ঐতিহাসিক। তার ওপর নির্ভর করা যায় না।
• দারাকুতনি রহ. বলেছেন, সে দুর্বল।
• ইয়াহইয়া ইবনে মাইন রহ. বলেছেন, সে কোনো নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী নয়। আরেকবার বলেছেন, তার কথা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়।
• ইবনে আদি রহ.-এর মতানুযায়ী সে ছিল একজন বিদ্বেষী শিয়া।

২. দ্বিতীয় বর্ণনাকারী ওয়াকিদির ব্যাপারে যাহাবি রহ.-এর মন্তব্য হচ্ছে, তার হাদিস বর্জনের ব্যাপারে সকলে একমত।
• আলি ইবনে মাদিনি রহ.-এর মতে, ওয়াকিদি জাল হাদিস রচনা করেন।
• ইমাম বুখারি রহ.-এর মতে ওয়াকিদির হাদিস বর্জনীয়।
• মুআবিয়া ইবনে সালিহ রহ. বলেন, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. ওয়াকিদিকে মিথ্যাবাদী বলেছেন। আরেকবার তিনি ওয়াকিদিকে অনির্ভরযোগ্য বলেছেন।
• ইমাম শাফেয়ি রহ.-এর মতে ওয়াকিদির লেখা সব গ্রন্থই বানোয়াট।
• আলি ইবনে মাদিনি রহ. বলেছেন, আমার কাছে ওয়াকিদির বর্ণিত ২০ হাজার হাদিস আছে, যেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। ইবরাহিম ইবনে ইয়াহইয়া একজন মিথ্যাবাদী বর্ণনাকারী হলেও সে আমার কাছে ওয়াকিদি থেকে উত্তম।

৩. তৃতীয় এবং চতুর্থ বর্ণনাকারী মুহাম্মাদ ইবনে সায়িব এবং হিশাম ইবনে মুহাম্মাদ সম্পর্কে অনেক সমালোচনা বর্ণিত হয়েছে। মুহাম্মাদ ইবনে সায়িব বর্ণিত একটি হাদিস হচ্ছে, সে অমুক থেকে অমুকের সূত্রে শুনে বর্ণনা করেছে, রাসুল ﷺ বসে থাকতেন এবং এমতাবস্থায় তাঁর ওপর ওহি অবতীর্ণ হতো। একদিন তিনি প্রাকৃতিক প্রয়োজন সম্পন্ন করতে যান। আলি রা. তাঁর স্থানে বসে ছিলেন। তখন জিবরাইল আ. আলি রা.-এর ওপরেই ওহি অবতীর্ণ করেন।

এ চারজন শিয়াদের নিকট অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ইমাম। শিয়াদের রচিত গ্রন্থাবলিতে তাদের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে। ফিতনা নিয়ে অধ্যয়নের সময় আমরা যে উৎস থেকে অধ্যয়ন করব, সে উৎসগুলো সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নেওয়া আবশ্যক। আমরা যা বর্ণনা করছি সেগুলোর উৎস কি এসব মিথ্যুক ও জাল বর্ণনা রচয়িতাদের বর্ণনা নাকি ইলমুল জারহ ওয়াত তাদিল শাস্ত্রের আলেমগণ যাদেরকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন তাদের বর্ণনা। এ বিষয়টি সঠিকভাবে জানার জন্য প্রয়োজন ব্যাপক চেষ্টা-সাধনা এবং নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম।

টিকাঃ
১৫. আল-মাওজুআত লি ইবনিল জাওযি, ১/২৭৯, তানযিহুশ শারিয়া, ১/২২১, আল-লাআলিল মাসনুয়া, ১/২৪৩
১৬. ঘটনাটির বিশুদ্ধতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। ইমাম যাহাবি রহ. এই. ঘটনার বর্ণনাকারীকে অপরিচিত আখ্যা দিয়ে ঘটনাটি বানোয়াট হওয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন।- অনুবাদক
১৭. তাহযিবুল কামাল, ৩১/৫৫৮; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১১/৮৬
১৮. মাজমাউয যাওয়ায়িদ, ৮/৪০
১৯. তাখরিজু আহাদিসিল ইহয়া, ১/৬৪৮; তাজকিয়াতুল মাওজুআত, পৃ. ৯৭
২০. আল-ইলালুল মুতানাহিয়া, ২/৩৪৪; আল-লাআলিল মাসনুআ, ১/৩১৭
২১. আল-লাআলিল মাসনুআ, ১/৩১৭
২২. আল-লাআলিল মাসনুআ, ১/৩১৭
২৩. আল-মাওজুআত লি ইবনিল জাওযি, ১/৩৯৮; তানযিহুশ শারিয়া, ১/৩৬৬
২৪. মাজমাউয যাওয়ায়িদ, ৯/২১৮
২৫. জয়িফুল জামিয়িস-সগির ওয়া যিয়াদাতিহি, ৪৭২৯
২৬. তারিখু ইবনি মাইন, ৪/৪৮৭; সিলসিলাতুল আহাদিসিজ জয়িফা ওয়াল-মাওজুআ, ১২৫৮
২৭. তাখরিজু আহাদিসিল ইহয়া, ১/১৬৪৫
২৮. আত-তাযকিরাহ ফিল আহাদিসিল মুশতাহিরা, পৃ. ১৯০; আল-মাওযুয়াত লি ইবনিল জাওযি, ২/২৮১

📘 ফিতনার ইতিহাস 📄 আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর নিকট ফিতনাবিষয়ক বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থ

📄 আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর নিকট ফিতনাবিষয়ক বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থ


ফিতনাবিষয়ক সবচেয়ে বিশুদ্ধ গ্রন্থ হচ্ছে সিহাহ সিত্তাহ তথা প্রসিদ্ধ ছয়টি সহিহ হাদিস গ্রন্থ।²⁹ আর এ সবগুলোর মাঝে সবচেয়ে বিশুদ্ধ গ্রন্থ হলো সহিহ বুখারি। এটি খুবই প্রসিদ্ধ কথা। বরং পবিত্র কুরআনের পর এটিকেই সবচেয়ে বিশুদ্ধ গ্রন্থ হিসাবে আখ্যা দেওয়া হয়। জারহ এবং তাদিল শাস্ত্রবিদগণ এমনটিই বলেছেন। তারা সকলে বলেছেন, নিশ্চয় বুখারির প্রমাণ বিরোধী পক্ষের প্রমাণের চেয়ে শক্তিশালী।

ইমাম বুখারি রহ. তার গ্রন্থে দ্বিরুক্তি-সহ ৭৩৯৭টি এবং দ্বিরুক্তি ব্যতীত ২৬০২টি হাদিস চয়ন করেছেন।³⁰ এই হাদিসসমূহ তিনি নির্বাচিত করেছেন ৬০ লাখ হাদিসের মধ্য থেকে। প্রতিটি হাদিস চয়ন করার আগে দুই রাকাত ইস্তেখারার নামাজ আদায় করে আল্লাহ তাআলার কাছে সমাধান চেয়েছেন যে, তিনি এই হাদিসটি লিখবেন নাকি লিখবেন না। তিনি একটি হাদিস শোনার জন্য মাইলের পর মাইল সফর করতেন। ১৯৪ হিজরিতে তৎকালীন খোরাসানের বুখারা নামক গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আরব বংশোদ্ভূত ছিলেন না। ৬২ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।

সহিহ বুখারির পর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সহিহ মুসলিম। রাসুল ﷺ-এর হাদিস নিয়ে রচিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ এটি। বরং কোনো কোনো আলেম এই গ্রন্থকে বুখারির পর্যায়ে উন্নীত মনে করেন। কোনো কোনো আলেম সহিহ মুসলিম নিয়ে আরও উচ্চ মন্তব্য করেছেন। তারা বলেন, সনদ বা বর্ণনাসূত্র সংকলন এবং গঠন বিন্যাসের দিক দিয়ে সহিহ মুসলিম, সহিহ বুখারির চেয়েও উত্তম। কিন্তু বিশুদ্ধতার দিক দিয়ে সহিহ বুখারি এগিয়ে। এরপরই সহিহ মুসলিম-এর অবস্থান। কিছু হাদিসের ক্ষেত্রে ইমাম মুসলিম রহ.-এর ওপর আপত্তি করা হয়েছে। যদিও তা খুবই অল্প। যারা আপত্তি করেছেন তাদের আপত্তি যথাযথ। সহিহ মুসলিম-এ দ্বিরুক্তিহীন বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা ৪ হাজার। যেখানে সহিহ বুখারিতে দ্বিরুক্তিহীন হাদিসের সংখ্যা ২৬০২টি। ইমাম মুসলিম রহ. জন্মগ্রহণ করেন পারস্যের নিশাপুরে। তিনিও আরব বংশোদ্ভূত নন। তার ইন্তেকাল হয়েছিল ৫৭ বছর বয়সে।

সহিহ মুসলিম-এর পরের অবস্থানে আছে আস-সুনানুল কুবরা লিন নাসায়ি। ইমাম নাসায়ি রহ. খোরাসানের অন্তর্গত নাসা নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনিও আরব বংশোদ্ভূত ছিলেন না। তিনি ২১৫ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৮৮ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। ইলমুর রিজালশাস্ত্রে তিনি খুবই সূক্ষ্ম জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন।

এরপরের অবস্থানে আছে সুনানু আবি দাউদ। এই গ্রন্থে ৪৮০০টি হাদিস রয়েছে। ইমাম আবু দাউদ রহ. আরব বংশোদ্ভূত ছিলেন। ২০২ হিজরিতে তিনি বসরায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ৭৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

এরপরের অবস্থান সুনানুত তিরমিজির। এই গ্রন্থে কিছু দুর্বল হাদিসও রয়েছে। তবে এগুলোর মাননির্ণয়কৃত; ইমাম তিরমিজি রহ. তার গ্রন্থে হাদিসের বিশুদ্ধতা এবং দুর্বলতার দিক ইঙ্গিত করেছেন। তবে কিছু হাদিসের দুর্বলতার ক্ষেত্রে তিনি কোনো ইঙ্গিত প্রদান করেননি। ইলমুল জারহ ওয়াত তাদিল সম্পর্কে অভিজ্ঞ আলেমগণ এই গ্রন্থকে বিশুদ্ধ বলেছেন। ২০৯ হিজরিতে আফগানিস্তানের আমুদরিয়া নদীর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে অবস্থিত তিরমিজ নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ইমাম তিরমিজি রহ.। তিনি আরব বংশীয় ছিলেন না। ইন্তেকালের সময় তার বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। ইমাম বুখারি রহ. ছিলেন ইমাম তিরমিজি রহ.-এর শিক্ষক। তা সত্ত্বেও তিনি ইমাম তিরমিজি রহ.-এর ওপর খুবই আস্থা রাখতেন এবং তার কাছ থেকে হাদিস গ্রহণ করতেন।

অতঃপর ষষ্ঠ অবস্থানে আছে সুনানু ইবনি মাজাহ। এ গ্রন্থের ব্যাপারে বলা হয়েছে যে, ইমাম ইবনে মাজাহ রহ. অন্য ইমামদের থেকে পৃথক যেসব হাদিস এনেছেন সেগুলোর অধিকাংশই দুর্বল। তবে যেসব হাদিস ইবনে মাজাহ-এর সঙ্গে অন্যান্য ইমামগণও বর্ণনা করেছেন সেগুলো ব্যতীত। ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেন, ঢালাওভাবে এ কথা বলা যাবে না। অর্থাৎ, ইমাম ইবনে মাজাহ এমন কিছু পৃথক হাদিসও এনেছেন যেগুলো দুর্বল নয়।³¹

ইবনে মাজাহ রহ. ২০৯ হিজরিতে কাজবিন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনিও আরব বংশোদ্ভূত নন। লক্ষণীয় যে, ছয় বিশুদ্ধ গ্রন্থের পাঁচজনই ছিলেন অনারব। সুবহানাল্লাহ! এসব অনারব অঞ্চল বিজিত করে আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের ওপর কতই-না অনুগ্রহ করেছেন। এ বিজয়ের ফলে ওই সকল মনীষীগণের মধ্যে ইসলামের আলো প্রবেশ করেছে, যারা আমাদের জন্য প্রিয় নবীজির সুন্নাহ তথা হাদিসগুলো সংরক্ষণ করেছেন।

সিহাহ সিত্তাহ তথা ছয় বিশুদ্ধ গ্রন্থের পরের অবস্থানে আছে আল-মুসনাদ লিল ইমাম আহমাদ। এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মুসনাদ গ্রন্থ। এখানে প্রশ্ন আসে যে, আলেমগণ আল-মুসনাদ লিল ইমাম আহমাদকে পূর্বের ছয় গ্রন্থের সঙ্গে কেন রাখেননি?

এর উত্তরে বলা যায় যে, সহিহ, সুনান ও মুসনাদ গ্রন্থের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সহিহ এবং সুনান গ্রন্থগুলোতে হাদিস লিখিত হয় অধ্যায় এবং বিষয়ভিত্তিক আকারে। আর মুসনাদ গ্রন্থে হাদিস লেখা হয় সাহাবিগণের নাম অনুসারে। যেমন, বলা হয়ে থাকে, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত হাদিসসমূহ, আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত হাদিসসমূহ ইত্যাদি।

আল-মুসনাদ লিল ইমাম আহমাদ-এ দ্বিরুক্তিহীন ৩০ হাজার হাদিস রয়েছে এবং দ্বিরুক্তি-সহ হাদিসের সংখ্যা ৪০ হাজার। বর্ণিত আছে, ইমাম আহমাদ রহ. ৭ অথবা ১০ লক্ষ হাদিস থেকে বাছাই করে এই হাদিসগুলো সংকলন করেছেন। আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর মৃত্যুর পর তার ছেলে আবদুল্লাহ মুসনাদে আহমাদ-এ কিছু হাদিস বৃদ্ধি করেন। বর্ণিত আছে, মুসনাদে আহমাদ-এ কোনো মওজু তথা জাল হাদিস নেই। যদি কয়েকটি থেকেও থাকে, তবে সেগুলো ইমাম আহমাদের ছেলের মাধ্যমে এসেছে।

এগুলো হলো আমাদের নিকট এবং ইলমুল জারহ ওয়াত তাদিল সম্পর্কে অভিজ্ঞ আলেমগণের কাছে পরিচিত এবং প্রসিদ্ধ নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ। তাই ফিতনা সম্পর্কে অধ্যয়নের সময় এগুলোই আমাদের নির্ভরতার উৎস হওয়া উচিত। অন্য যেসব অনির্ভরযোগ্য এবং মিথ্যা ও জাল হাদিস বর্ণনার উৎস রয়েছে, সেগুলো বর্জন করা উচিত।

কেউ কেউ মনে করেন যে, আব্বাসি শাসনামলে আব্বাসি খলিফাদের নৈকট্যলাভের উদ্দেশ্যে উমাইয়াদের কুৎসা রটনায় এসব মিথ্যার সয়লাব ঘটেছিল। কিন্তু এখন কেন এসব মিথ্যার মাধ্যমে ইসলামের ওপর আঘাত করা হবে? এসব কারা করবে?

বর্তমানে যারা ইসলামের ওপর আঘাত করছে তারা হচ্ছে কিছু বিকৃত মতাদর্শের অনুসারী। তাদের প্রত্যেকেই নিজস্ব দলের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ইসলামের ওপর আঘাত করছে। তাদের ভ্রান্ত এবং বিকৃত মতের সমর্থনে দুর্বল এবং জাল হাদিস বর্ণনা করছে। ওরিয়েন্টালিস্ট তথা প্রাচ্যবিদরা যখন সব ইসলামি ঐতিহাসিক গ্রন্থের সমালোচনা শুরু করে, তখন এসব বানোয়াট ও জাল হাদিসের বিশাল ভান্ডার তাদের হস্তগত হয়। তারা বিভিন্ন ভাষায় এসব বানোয়াট হাদিস বর্ণনা করে ছড়িয়ে দেয়। তারা প্রচার করে যে, ইসলাম যুদ্ধের মাধ্যমে বিস্তৃতি লাভ করেছে। তাই কোনো মুসলিম যখন ক্ষমতার অধিকারী হয়, তখন তারা অন্যের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ফিতনাসংক্রান্ত ঘটনাকে তারা এসব মিথ্যা বর্ণনা এবং দাবির সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছে।

এ ছাড়াও পশ্চিমাদের মদদপুষ্ট অক্সিডেন্টালিস্ট তথা পাশ্চাত্যবিদরা নিজ নিজ দেশে ইসলামের ওপর আঘাত হানতে শুরু করে। এরা মুসলিম নাম ধারণ করে মুসলিম সমাজে বসবাস করলেও এবং কখনো নামাজ-রোজা পালন করলেও ইসলামের ওপর কঠিন আঘাত হানতে এরা কোনোরূপ কুণ্ঠাবোধ করে না।

এদের একজন হচ্ছে তহা হুসাইন। একদিক দিয়ে তিনি খুবই প্রসিদ্ধ। তাকে বলা হয়ে থাকে আরবি সাহিত্যের খুঁটি। তিনি আরবি সাহিত্যিক হলেও ইসলামের একজন ঘোরতর শত্রু। তার রচিত সব গ্রন্থেই ইসলামের ওপর আঘাতমূলক বক্তব্য রয়েছে। তিনি তার ছাত্রদের কুরআনের সমালোচনা শেখাত। এভাবে বলত যে, এসব আয়াতের ভিত্তি মজবুত এবং ওই সব আয়াতের ভিত্তি দুর্বল (নাউজুবিল্লাহ)।

সে কুরআনের অপব্যাখ্যা করে বলে যে, কুরআনে ইবরাহিম আ. এবং ইসমাইল আ.-এর ঘটনা বর্ণিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে, এ ঘটনা বাস্তব। কখনো কখনো কুরআনে গল্পের মতো বর্ণনাও এসেছে। এগুলো বাস্তব হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দলিল-প্রমাণ বিদ্যমান থাকা জরুরি।

এমনইভাবে তহা হুসাইন তার গ্রন্থাবলিতে অনেক সাহাবিগণের সমালোচনা করেছে। এতটাই সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে যে, অবশেষে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে কাফের এবং মুরতাদ ফতোয়া দেওয়া হয়। তখন সে আল-আজহারের লিটারেচার তথা সাহিত্য অনুষদের অধ্যাপক ছিল। এরপর সবাই মনে করেছিল, সে তওবা করে আল্লাহর পথে ফিরে এসেছে। আল-আজহারের আলেমগণের নৈকট্যলাভের জন্য সে নতুন একটি গ্রন্থ রচনা করে। এই গ্রন্থটিকে বাহ্যিকভাবে ইসলামের পক্ষে মনে হলেও, অন্তর্নিহিতভাবে এতেও ইসলামের ওপর আঘাত করা হয়েছে এবং বানোয়াট বর্ণনার সমাবেশ ঘটানো হয়েছে। তহা হুসাইনের সামসময়িক অনেক ব্যক্তি যারা ফ্রান্স, ইংল্যান্ড প্রভৃতি ইউরোপীয় দেশে পড়ালেখা করেছে, তারাও একই কাজ করেছে।

এই বিষয়ে আবদুর রহমান শারকাবি রচিত গ্রন্থাবলিও বিপজ্জনক। এসব গ্রন্থাবলি থেকে যারা ফিতনা সম্পর্কে অধ্যয়ন করবেন তারা দেখতে পাবেন যে, কোনো যাচাই-বাছাই না করেই এসব গ্রন্থে সকল সাহাবিগণকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। এমনইভাবে খালিদ মুহাম্মাদ খালিদ রচিত রিজালুন হাওলার রাসুল এবং খোলাফাউর রাসুল গ্রন্থদুটিতেও আলি রা.-এর বিরুদ্ধে মুআবিয়া রা.-এর পক্ষাবলম্বনকারী সাহাবিগণের সমালোচনা করা হয়েছে। ভ্রান্ত ও মিথ্যা ঘটনার সূত্র তুলে ধরে সে প্রখ্যাত সাহাবি আবু মুসা আশআরি রা.-এর সমালোচনাও করেছে।

সাহাবিগণের সমালোচনাকারীদের মধ্যে অন্যতম হলো লেবানন ইউনিভার্সিটির সাহিত্য ও মানব বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক ডিন ড. জাহিয়া কাদুরা। সে তার আয়েশা : উম্মুল মুমিনিন গ্রন্থে এ ধরনের ঘৃণ্য পন্থার আশ্রয় নিয়েছে। তার এই গ্রন্থে যে ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে, তা পড়ে আমার বমি আসার উপক্রম হয়েছিল। সে তার গ্রন্থে লিখেছে, আলি রা. এবং আয়েশা রা.-এর মধ্যকার বিরোধের মূল কারণ হলো রাসুল কর্তৃক আয়েশা রা.-কে বিয়ে করা। আয়েশা রা. ছিলেন রাসুল-এর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়। তাই ফাতেমা রা. তার প্রতি হিংসাপরায়ণ হয়ে তাকে অপছন্দ করতেন। তিনি আলি রা.-কে এ বিষয়টি বললে তিনিও আয়েশা রা.-কে অপছন্দ করতে থাকেন। এ ব্যাপারটিই আলি রা.-কে আয়েশা রা.-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করেছে। এদিকে রাসুল ফাতেমা রা.-কেও ভালোবাসতেন। এ দেখে আয়েশা রা.-ও তার প্রতি হিংসাপরায়ণ হয়েছিলেন।

সে আরও বলে যে, আয়েশা রা.-এর ওপর অপবাদ আরোপের সময় তার ওপর যেসব সাহাবি অপবাদ আরোপ করেছিলেন, তাদের মধ্যে আলি রা.-ও ছিলেন। তাই আয়েশা রা. তাকে অপছন্দ করতেন এবং এটিই তাকে আলি রা.-এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এই লেখিকা আরও বলেছে যে, আয়েশা রা.-এর ওপর অপবাদ আরোপের সময় আলি রা. ও ফাতেমা রা. আয়েশা রা.-কে নিয়ে উল্লাস প্রকাশ করেছিলেন। এর পর নিষ্পাপ প্রমাণিত হওয়ার পর আয়েশা রা. এ নিয়ে তাদের সঙ্গে বিতণ্ডায় লিপ্ত হয়েছিলেন।

এমনইভাবে তার আরেকটি জঘন্য মন্তব্য হলো যে, উসমান রা.-এর শাহাদাতের পর আলি রা. খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার কারণে আয়েশা রা. আলি রা.-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। আয়েশা রা. চেয়েছিলেন সগোত্রীয় তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা. খলিফা হোক।

এই লেখিকার দৃষ্টিতে তৎকালীন মুসলিম সমাজ বর্তমান সময়ের মুসলিম সমাজের তুলনায় অধিক অধঃপতনের শিকার ছিল। এই লেখিকার সব আলোচনার রেফারেন্স এবং উৎস শিয়াদের রচিত। জানি না সে এসব জেনেই লিখেছে নাকি না জেনে লিখেছে! যদি না জেনে লিখে থাকে তবে এটিও বিপজ্জনক। আর যদি জেনে লিখে থাকে তবে এটি আরও বেশি বিপজ্জনক।

এই লেখিকা আরও লিখেছে যে, আয়েশা রা. এবং আলি রা.-এর মধ্যকার এই বিদ্বেষ এবং পারস্পরিক অপছন্দের ফলেই তাদের মধ্যে জঙ্গে জামাল সংঘটিত হয়েছে। লেখিকার বক্তব্য অনুযায়ী তাদের এই পারস্পরিক অপছন্দের কারণেই এসব সাহাবিগণের পবিত্র রক্ত বিনষ্ট হয়েছে।

এই ভ্রান্ত লেখিকার বক্তব্য অনুযায়ী আয়েশা রা. উসমান রা.-এর ওপরও প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন। ফলে লোকেরা তার আহ্বানে সাড়া দেয়। তখন আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. উসমান রা.-এর পক্ষে প্রতিরোধ গড়ার জন্য মদিনায় থেকে যান। অথচ তিনি ছিলেন সে বছরের হজের আমির। তখন আয়েশা রা. তাকে বলেছিলেন, হে আবদুল্লাহ, এই শহরে থেকো না। এই পথভ্রষ্ট লোকের পক্ষে লোকদের নিবৃত্ত রেখো না।

এসব অক্সিডেন্টালিস্ট তথা পাশ্চাত্যবিদরা এভাবেই তাদের মিথ্যা এবং বাতিল চিন্তাধারা ছড়িয়েছে। এভাবেই তারা মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠ সন্তান সাহাবিগণের ওপর অপবাদ আরোপ করার চেষ্টা চালিয়েছে।

টিকাঃ
২৯. সিহাহ সিত্তা : হাদিসের বিশুদ্ধ ছয়টি গ্রন্থ। এর দ্বারা সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, আস-সুনানুল কুবরা লিন নাসায়ি, সুনানু আবি দাউদ, সুনানুত তিরমিজি এবং সুনানু ইবনি মাজাহকে বুঝানো হয়েছে। এ ছয় কিতাবের মধ্যে সহিহ বুখারি এবং সহিহ মুসলিম-এর সব হাদিস সহিহ বা নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রমাণিত। অবশিষ্ট চারটি গ্রন্থ সার্বিক বিবেচনায় নির্ভরযোগ্য হলেও তাতে বর্ণিত সব হাদিস নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রমাণিত নয়। এ কারণে মুহাদ্দিসগণ এ ছয় গ্রন্থকে সিহাহ সিত্তার পরিবর্তে 'আল-কুতুবুস সিত্তাহ' বলাকে অধিক সমীচীন মনে করেন। উল্লেখ্য, হাদিসের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ উপরিউক্ত ছয়টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং হাদিসের আরও বহু গ্রন্থ রয়েছে। যা সার্বিক বিবেচনায় নির্ভরযোগ্য। যেমন, সহিহ ইবনি খুযাইমা, সহিহ ইবনি হিব্বান, আল-মুনতাকা লি ইবনিল জারুদ, আল-হাদিসুল মুখতারা লিজ জিয়া মাকদিসি ইত্যাদি।-সম্পাদক
৩০. এ নিয়ে আলেমগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। উল্লেখিত মতটি ইবনে হাজার আসকালানি রহ.-এর।-অনুবাদক
৩১. তাহযিবুত তাহযিব, ৯/৪৬৮

ফন্ট সাইজ
15px
17px