📘 ফিরকাবন্দি বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি 📄 জীবন সন্ধ্যা

📄 জীবন সন্ধ্যা


ইমাম শাফেয়ী তাঁর জীবনের শেষ পাঁচ বৎসর মিসরে অতিবাহিত করিয়াছিলেন তাঁর বিদ্যাবত্তা ও জ্ঞান গরীমার যশঃসৌরভে তাঁর জীবদ্দশাতেই ইসলাম জগতের সকল প্রান্তে আমোদিত হইয়া উঠিয়াছিল। হানাফী ও মালিকী বিদ্বানগণের ইমামগণ দলে দলে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করিয়া ধন্য হইতেছিলেন। ১৯৫ হিজরী পর্যন্ত ইমাম শাফেয়ী ইমাম মালিকের মযহব অনুসরণ করিয়া চলিতেন এবং মালিকী বিবেচিত হইতেন। কিন্তু যখন তিনি জানিতে পারিলেন যে, ইসলাম জগতের কতিপয় অঞ্চলে ইমাম মালিকের পূজা আরম্ভ হইয়া গিয়াছে এবং এই পূজা এরূপ উৎকট আকার ধারণ করিয়াছে যে, কতক স্থানে ইমাম মালিকের উক্তি রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস অপেক্ষাও অগ্রগণ্য বিবেচিত হইতেছে, তখন ইমাম শাফেয়ী রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি তাঁর অন্তরে যে অনাবিল শ্রদ্ধা পোষণ করিতেন, তাহার বশবর্তী হইয়া রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসের সমর্থন ও সাহায্য কল্পে দণ্ডায়মান হইলেন- এবং ইহারই ফলে তিনি অতঃপর স্বাধীন ও স্বতন্ত্র শাফেয়ী মযহবের প্রাণ-প্রতিষ্ঠাতা হইয়াছিলেন।

📘 ফিরকাবন্দি বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি 📄 ইমাম সাহেবের ছাত্রমণ্ডলী

📄 ইমাম সাহেবের ছাত্রমণ্ডলী


যে সকল বিদ্যারথী ইমাম সাহেবের জ্ঞান পারাবার হইতে তৃষ্ণা নিবারণ করিয়াছিলেন তাঁহাদের সংখ্যা নিরূপণ করা দুরূহ। মওলানা আবদুল হাই লক্ষ্ণৌভী হানাফী হিদায়ার ভূমিকায় ইমাম সাহেবের অন্যতম বিশিষ্ট ছাত্র রুবাইঅ বিনে সুলায়মানের উক্তি উধৃত করিয়াছেন, যে, আমি একদা ইমাম সাহেবের গৃহ দ্বারে তাঁর ছাত্র মণ্ডলীর সাত শতটি সওয়ারী দেখিতে পাইলাম। এরূপ ক্ষেত্রে ইমাম সাহেবের সমুদয় ছাত্রের সংখ্যা যে কত হইবে তাহা সহজেই অনুমেয়। যে সকল জ্যোতিষ্ক বিদ্যা ও গৌরবের আকাশে ইমাম শাফেয়ীর নাম লইয়া অনন্তকাল যাবৎ আলোক বিকীর্ণ করিতে থাকিবেন যদি শুধু তাঁহাদেরই নাম গণনা করা যায় তাহা হইলে আল্লামা ইবনে হজরের উক্তি মত তাঁহাদের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬৪। তাঁহাদের মধ্যে ১৪৯ জন এরূপ ছাত্র যাঁহারা এককালে স্বয়ং ইমাম শাফেয়ীর উসতায ছিলেন, অবশিষ্ট ১৫ জন তাঁর সহযোগী। এই দলের মধ্য হইতে আমি মাত্র কয়েকটি বিশ্ব বিশ্রুত নাম নিম্নে উধৃত করিতেছি:

১। ইমাম আবু বকর আবদুল্লাহ বিনে যুবায়দ আলহুমায়দী
হাদীস-শাস্ত্রের অন্যতম ইমাম, ইমাম বুখারীর উস্তায। ইমাম ইবনে উআয়নার দলের নেতা, মক্কার মুফতী, ২১৯ হিজরীতে পরলোকগমন করেন।

২। ইমাম সুলায়মান বিনে দাউদ বিনে দাউদ আবুর-রুবাইঅ
হাদীস সমূহের অন্যতম রাবী, ২৩৪ হিজরীতে পরলোকগমন করেন।

৩। ইমাম আহমদ বিনে হাম্বাল
মহামতি ইমাম- চতুষ্টয়ের অন্যতম। বিস্তৃত জীবনী পরে আলোচিত হইবে।

৪। ইমাম আবু সওর ইবরাহীম বিনে খালিদ কলবী
স্বতন্ত্র মযহবের প্রতিষ্ঠাতা। আযরবাইজান ও আরমেনিয়ার অধিবাসী বৃন্দ তাঁরই মযহব অনুসরণ করিয়া চলিতেন। সাধককুল চুড়ামণি হযরত জুনায়দ বাগদাদী তাঁরই মযহবের অনুসারী ছিলেন। ২৪৬ হিজরীতে পরলোকগমন করেন।

৫। ইমাম হরমালা বিনে ইয়াহয়া আবু আবদুল্লাহ মিসরী
হাফিযুল হাদীস, শাফেয়ী ফিক্সের মবসূত ও মুখতসর প্রভৃতি গ্রন্থের রচয়িতা। ১৬৬ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করিয়া ২৪৩ হিজরীতে মিসরে পরলোকপ্রাপ্ত হন।

৬। ইমাম আবু মুহাম্মদ হাসান বিনে মুহাম্মদ, বিন আব্বাস যাআফরানী-বাগদাদী।
হাদীস শাস্ত্রের ইমাম শাফেয়ীর বিশিষ্ট ছাত্র, বিখ্যাত ফকীহ, অভিধান শাস্ত্রে এবং বাগ্মীতায় আপন যুগে অতুলনীয়। ২৫৯ হিজরীতে পরলোকগমন করেন।

৭। আবু ইব্রাহীম ইসমাঈল বিনে ইয়াহয়া আলমুযনী
ইমাম শাফেয়ীর বিশিষ্ট ছাত্র, মিসরের অধিবাসী। শাফেয়ী মযহবের অধিকাংশ গ্রন্থ- যথা: জামে কবীর, জামে সগীর, মুখতসর, মনসূর, তরগীব প্রভৃতি গ্রন্থের রচয়িতা। ১৭৫ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করিয়া ২৬৪ হিজরীতে পরলোকগমন করেন।

৮। ইমাম ইয়ূনুস বিনে আবদুল আ'লা আবু মুসা ইবনে ময়সরা সদফী
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ফকীহগণের অন্যতম, হাদীসশাস্ত্র-বিশারদ ও তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন। জন্ম ১৭০ হিজরী, মিসরে ২৬৪ হিজরীতে পরলোকগমন করেন।

৯। ইমাম মুহাম্মদ বিনে আবদুল হাকাম আবু আবদুল্লাহ মিসরী
আপন যুগে মিসরে বিদ্যার মুকুটহীন নরপতি ছিলেন। পূর্বে ইমাম মালিকের মযহবের একনিষ্ঠ প্রচারকরূপে ইমাম শাফেয়ীর প্রতিবাদে "আররদেদ্দা আলাশাফেয়ী" নামক একখানা গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন। ১৮২ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করিয়া ২৬৮ হিজরীতে পরলোকগমন করেন।

১০। ইমাম আবু মুহাম্মদ রুবাইঅ বিনে সুলায়মান বিনে আবদুল জব্বার-আল মুরাদী
জন্ম ও মৃত্যু মিসরে ইমাম শাফেয়ীর গ্রন্থ সমূহের বর্ণনাদাতা। মিসরের ইবনে তুলুন বিশ্ব বিদ্যালয়ে সর্বপ্রথম হাদীস রেওয়ায়তকারী। ১৭৪ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করিয়া ২৭০ হিজরীতে পরলোকগমন করেন।

১১। ইমাম আবু ইয়াকুব ইউসুফ বিনে ইয়াহয়া-আল-কুরায়শী বুওয়ায়তী।
ইমাম শাফেয়ী ইহার সম্বন্ধে বলিয়াছিলেন, আমার ছাত্রগণের মধ্যে বুওয়ায়তী অপেক্ষা অধিকতর বিদ্বান আর কেহ নাই। ইমাম সাহেবের মৃত্যুর পর পাঠন ও ফতওয়া ব্যাপারে তিনি তাঁর স্থলাভিষিক্ত হইয়াছিলেন। খলীফা ওয়াসেক বিল্লাহর সময় যুক্তিবাদী (মু'তাযিলা)-দের ষড়যন্ত্রে কারারুদ্ধ হন এবং আহলে সুন্নাতগণের সমর্থনের অপরাধে ২৩১ হিজরীতে কারাগারেই পরলোকগমন করেন।

ইমাম সাহেবের এই সকল ছাত্র কর্তৃক বর্ণিত হাদীস সমূহ সিহাহ সিত্তার গ্রন্থরাজি বিভূষিত রহিয়াছে। শুধু ইহারাই নহেন, ইমাম সাহেবের প্রায় সমুদয় ছাত্রই সিহাহ সিত্তার রাবী। এইরূপ ২৪ জনের নিকট হইতে বুখারী, সতের জনের নিকট হইতে মুসলিম, আঠার জনের নিকট হইতে আবু দাউদ, সাত জনের নিকট হইতে তিরমিযী, নয় জনের নিকট হইতে নাসায়ী, ছয় জনের নিকট হইতে ইবনে মাযা এবং ৮৩ জনের নিকট হইতে অন্যান্য ইমামগণ হাদীস রেওয়ায়ত করিয়া স্ব স্ব গ্রন্থে সন্নিবেশিত করিয়াছেন।

📘 ফিরকাবন্দি বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি 📄 সূর্যাস্ত

📄 সূর্যাস্ত


কেহ কেহ লিখিয়াছেন যে, মিসরে ফিতয়ান নামক মালিকী মযহবের অন্ধ মুকাল্লিদ একজন তর্কবাগীশ বাস করিতেন। তিনি আপন মজলিসে ইমাম শাফেয়ীর বিরুদ্ধে প্রায় অভদ্রোচিত ভাষায় আক্রমণ চালাইতেন। কোন এক তর্কযুদ্ধে তিনি ইমাম শাফেয়ীকে আঁটিয়া উঠিতে না পারায় কুৎসিত ভাষায় গালিগালাজ করেন। ইমাম সাহেব তাঁর গালাগালিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করিয়া মূল বক্তব্য বিষয়ে বক্তৃতা করিতে থাকেন। মিসরের শাসন কর্তৃপক্ষ সমুদয় বৃত্তান্ত অবগত হইয়া তর্কবাগীশটিকে ধৃত করেন এবং তাঁর পৃষ্ঠে কশাঘাত করিয়া উষ্ট্রপৃষ্টে নগর প্রদক্ষিণ করাইবার শাস্তি দেন। এই ঘটনায় ফিতয়ানের মূর্খ ভক্তের দল কুপিত হইয়া উঠে। আর কতিপয় গুণ্ডা ইমাম সাহেবের দর্সের হলকায় যোগদান করে, পঠন ও পাঠন সমাপ্তির পর যখন অন্যান্য ছাত্রমণ্ডলী বিদায় গ্রহণ করেন তখন আকস্মিক ভাবে গুণ্ডারদল ইমাম সাহেবকে আক্রমণ করিয়া এরূপ ভয়ঙ্কর ভাবে আঘাত করে যে, অবশেষে তাঁহাকে তাঁর বাসগৃহ পর্যন্ত বহন করিয়া আনিতে হয়। এই আঘাত সহ্য করিতে না পারিয়া অবশেষে ইমাম সাহেব মানবলীলা সংবরণ করেন।

কিন্তু রিজাল ও জীবনী সমূহের বিশ্বস্ত লেখকগণ এই ঘটনার উল্লেখ করেন নাই। তাঁহারা লিখিয়াছেন যে, ইমাম সাহেব স্মৃতিশক্তি বর্ধনের জন্য ছাত্র জীবনে অধিক মাত্রায় লোবান ব্যবহার করায় অবশেষে তিনি অর্শরোগে আক্রান্ত হইয়াছিলেন এবং এই দুরারোগ্য ব্যাধির প্রকোপে অধিক মাত্রায় রক্তক্ষয় ঘটিয়া তাঁর জীবন প্রদীপ নির্বাপিত হইয়াছিল। কেহ কেহ এরূপ কথাও লিখিয়াছেন যে, হাদীস বিদ্বেষীগণ তাঁহাকে বিষপান করাইয়াছিল।

ফলকথা, কুরআন, হাদীস, ফিক্হ, উসূল, ইতিহাস, আরবী সাহিত্য প্রভৃতি বিদ্যার একচ্ছত্র অধিপতি, জ্ঞান ও প্রতিভার এই উজ্জ্বল ভাস্কর ২০৪ হিজরীতে রজব মাসের শেষ রাত্রিতে চিরতরে অস্তমিত হইয়া যায়... ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজিউন। রাহেমাহুল্লাহু ওয়া রাযিয়া আনহু।

ফন্ট সাইজ
15px
17px