📄 ইমাম শাফেয়ীর ইজতিহাদ
যে সেকল মসআলায় হানাফী মযহবের সহিত ইমাম শাফেয়ী বিরোধ করিয়াছেন, শিক্ষিত সমাজের অবগতির জন্য আমরা সেগুলির কতকাংশ নিয়ে সংকলিত করিয়া দিতেছি।
১। ইমাম শাফেয়ীর নিকট ওযুর জন্য সংকল্প (নিয়ৎ) করা ওযুর বিশুদ্ধতার অন্যতম শর্ত, ইমাম আবু হানীফার নিকট নয়।
২। ইমাম শাফেয়ীর নিকট পর্যায়ক্রমে অর্থাৎ তরতীব রক্ষা করিয়া ওযু করা ফরয। হানাফী মযহবে ফরয নয়।
৩। ইমাম শাফেয়ীর নিকট মাথা মসহ করার নির্ধারিত কোন পরিমান নাই। ইমাম আবু হানীফার নিকট এক চতুর্থ মস্তক মসহ করা ফরয।
৪। ইমাম শাফেয়ীর নিকট সমুদয় নামায প্রথম ওয়াক্তে পড়া উত্তম। ইমাম আবু হানীফার নিকট মাগরিব ব্যতীত সমুদয় নামায বিলম্ব করিয়া পড়াই উত্তম।
৫। যে সকল নামাযে কিরআত উচ্চৈঃস্বরে পাঠ করিতে হয় ইমাম শাফেয়ীর নিকট সেই সকল নামাযে 'বিসমিল্লাহ'ও উচ্চৈঃস্বরে পাঠ করা আবশ্যক, কিন্তু ইমাম আবু হানীফার নিকট মকরূহ।
৬। ইমাম শাফেয়ীর নিকট উচ্চ ও নিম্নস্বরের সকল নামাযে সূরা আল- ফাতিহা পাঠ করা আবশ্যক, ইমাম আবু হানীফার নিকট নয়।
৭। ইমাম শাফেয়ীর নিকট রুকু ও কওমার সময় রফউল ইয়াদায়েন করা সুন্নত, ইমাম আবু হানীফার নিকট নয়।
৮। নামাযের প্রাক্কালে ইকামতের বাক্যগুলি 'কাদকামাতিস সালাত' ছাড়া আর সমস্তই ইমাম শাফেয়ীর নিকট একবার করিয়া উচ্চারণ করিতে হয়, কিন্তু ইমাম আবু হানীফা বলেন যে, ইকামত আযানেরই মত।
৯। ইমাম শাফেয়ীর নিকট গৃহপালিত পশুর যাকাতের বিনিময়ে উহার মূল্য প্রদান করা জায়েয নয়, কিন্তু ইমাম আবু হানীফা উহা জায়েয বলিয়াছেন।
১০। ইমাম শাফেয়ীর নিকট যে স্ত্রীকে পুরুষ তাহার মৃত্যুশয্যায় তালাক প্রদান করিয়াছে সে স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকারিনী হইবে না, কিন্তু ইমাম আবু হানীফার নিকট অবশ্যই হইবে।
১১। ইমাম শাফেয়ীর নিকট ওযু বা গোসলের ব্যবহৃত পানি না-পাক নয়, কিন্তু ইমাম আবু হানীফার নিকট না-পাক।
১২। ইমাম শাফেয়ীর নিকট ব্যভিচারের ফলে মুসাহরতের হুরমত সাব্যস্ত হয়না- অর্থাৎ যে নারীর সহিত পুরুষ ব্যভিচার করিয়াছে তাহার গর্ভ হইতে ভূমিষ্ঠ সন্তানের সহিত উক্ত পুরুষের ঔরস-জাত বৈধ সন্তানের বিবাহ সিদ্ধ হইবে; কিন্তু ইমাম আবু হানীফা ইহাকে হারাম বলিয়াছেন, এমন কি সকাম অবস্থায় কোন নারীর দেহ স্পর্শ করিলে অথবা তাহার প্রতি সকাম দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেও উক্ত নারীর জননী ও কন্যাগণ উক্ত পুরুষের পক্ষে চিরদিনের জন্য হারাম হইয়া যইবে এবং উক্ত পুরুষের জননী ও ভগ্নিরাও উল্লিখিত নারীর স্বামী এবং পুত্রগণের পক্ষে অনন্তকালের জন্য হারাম হইয়া যাইবে।
১৩। ইমাম শাফেয়ীর নিকট ওলী ব্যতীত নারীর বিবাহ সিদ্ধ নয়, কিন্তু ইমাম আবু হানীফা প্রাপ্তবয়স্ক নারীর পক্ষে ওলীর অনুমতি গ্রহণ করাও আবশ্যক বিবেচনা করেন নাই।
১৪। অট্টহাস্য করিলে ইমাম শাফেয়ীর নিকট ওযু নষ্ট হয়না, কিন্তু ইমাম আবু হানীফার নিকট নামাযে অট্টহাস্য করিলে ওযু নষ্ট হইয়া যাইবে।
১৫। দেহ হইতে রক্ত নিঃসৃত হইলে অথবা বমন করিলে ইমাম শাফেয়ীর নিকট ওযু নষ্ট হয়না, কিন্তু ইমাম আ'যমের নিকট নষ্ট হইয়া যায়।
১৬। খেজুরের রসে ইমাম শাফেয়ীর নিকট ওযু জায়েয নয়, তাঁর মযহবে পানির অভাবে তায়াম্মুম করিতে হইবে, কিন্তু ইমাম আবু হানীফার নিকট খেজুরের রস মওজুদ রহিলে তায়াম্মুম জায়েয হইবে না, খেজুরের রস দিয়াই ওষু করিতে হইবে।
১৭। ওযুর মধ্যে কুল্লির সময়ে হঠাৎ ভুল করিয়া যদি পানি গলার নিচে চলিয়া যায় তাহা হইলে ইমাম শাফেয়ীর নিকট রোযা নষ্ট হইবেনা, কিন্তু ইমামে আ'যমের নিকট রোযা নষ্ট হইবে।
১৮। মুসলমান প্রভুর পক্ষে কাফের গোলামের ফিতরা ইমাম শাফেয়ীর নিকট ওয়াজিব নয়, কিন্তু ইমাম আবু হানীফা উহা ওয়াজিব বলিয়াছেন।
১৯। নফল রোযার কাযা ইমাম শাফেয়ীর নিকট ওয়াজিব নয়, কিন্তু ইমাম আবু হানীফা রোযা কাযা করিতে বলিয়াছেন।
২০। ইমাম শাফেয়ীর নিকট কুড়ি মণের কম উৎপন্ন হইলেও উশর ওয়াজিব হইবে।
২১। ইমাম শাফেয়ীর নিকট ব্যবহৃত অলঙ্কারের যাকাত নাই, কিন্তু ইমাম আবু হানীফার নিকট ব্যবহৃত অলঙ্কারেও যাকাত ওয়াজিব।
২২। ইমাম শাফেয়ীর নিকট সকল স্থানেই জুমুআর নামায দুরস্ত হইবে, কিন্তু ইমাম আবু হানীফার নিকট শহর ছাড়া ও শাসনকর্তার উপস্থিতি ব্যতিরেকে জুমুআ' দুরস্ত হইবেনা।
২৩। ঈদের দিনে রোযার নযর মান্য করা ইমাম শাফেয়ীর নিকট জায়েয নয়, কিন্তু ইমামে আ'যমের নিকট উহা জায়েয।
২৪। বলপূর্বক কেহ যদি কাহারও নিকট হইতে তাহার স্ত্রীর তালাক আদায় করিয়া লয় আর সে প্রাণের ভয়ে যদি তালাক দিয়া বসে তাহা হইলে সে তালাক ইমাম শাফেয়ীর নিকট সংঘটিত হইবেনা, কিন্তু ইমামে আ'যমের নিকট প্রাণের ভয়ে তালাক দিলেও উহা সংঘটিত হইবে।
২৫। নিয়ত ছাড়াই শুধু মৌখিক তালাক শব্দ উচ্চারণ করিলে ইমাম শাফেয়ীর নিকট তালাক ঘটিবেনা, কিন্তু ইমাম আবু হানীফার নিকট নিয়ত না থাকিলেও তালাক ঘটিয়া যাইবে।
২৬। ইমাম শাফেয়ীর নিকট মুসলমান গোলাম কাফেরের প্রতিভূ হইতে পারিবে, কিন্তু মুসলমান গোলামের এ অধিকার ইমামে আযম স্বীকার করেন নাই, বরং প্রভুকে চুক্তি ভঙ্গ করিবার অনুমতি দিয়াছেন।
২৭। কোন ব্যক্তি জনৈকা নারীকে বিবাহ করিল এবং নারীর অঙ্গ স্পর্শ করার পূর্বেই বিবাহ মজলিসের ভিতর কাযী এবং সাক্ষীদের সম্মুখে উক্ত স্ত্রীলোককে তালাক প্রদান করিল কিন্তু এই ঘটনার ছয় মাস পর উক্ত নারী একটি পুত্র সন্তান প্রসব করিল। ইমাম শাফেয়ী বলেন, উক্ত সন্তানকে উল্লিখিত পুরুষের বংশধর বলিয়া গ্রাহ্য করা হইবেনা। কিন্তু ইমামে আযম বলেন যে, উক্ত সন্তানকে উল্লিখিত পুরুষের পুত্ররূপে গ্রাহ্য করিতে হইবে।
প্রকাশ থাকে যে, ইমাম আবু হানীফা অথবা ইমাম শাফেয়ীর সমুদয় দলআলাই যে সঠিক অথবা ভ্রান্তিপূর্ণ ইহা প্রমাণিত করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। উভয় ইমামের ইজতিহাদের স্বরূপ বিচার করিয়া দেখার জন্যই আমরা বিদ্বান ও বুদ্ধিমানগণের সম্মুখে বহি পুস্তক ঘাটিয়া উল্লিখিত বৈষম্যগুলি উপস্থাপিত করিলাম। উত্তরকালে শাফেয়ী মযহবের যে সকল মসআলা হানাফীগণের মধ্যেও চালু হইয়া গিয়াছে তাহার যৎকিঞ্চিৎ নমুনা অতঃপর পেশ করিতেছি।
(১) নিয়ত ও তরতীব ছাড়া ওযু সিদ্ধ না হওয়ার অভিমত হানাফী শাফেয়ী সকলেই মানিয়া লইয়াছেন।
(২) খেজুরের রসে ওযু সিদ্ধ না হওয়ার সিদ্ধান্তও সকলে স্বীকার করিয়া লইয়াছেন।
(৩) যবহ করা বা না-করা কুকুরের চামড়া সকল অবস্থায় অপবিত্র হওয়ার অভিমতও সকলেই মানিয়া লইয়াছেন।
(৪) সূর আল-ফাতিহা ব্যতীত নামায অসিদ্ধ হওয়ার উক্তিও সকলেই স্বীকার করিয়া লইয়াছেন।
(৫) সমস্ত রাতেই কিছু না কিছু কুরআন পাঠ করার উক্তিও সকলেই গ্রহণ করিয়াছেন।
(৬) প্রথম দুই রাকাআতের পর তাশাহুদ পাঠ করার অপরিহার্যতাও সকলেই স্বীকার করিয়া লইয়াছেন।
(৭) প্রবাসী ও রোগীর জন্য যোহর ও আসর অথবা মাগরিব ও এশার নামায জমা করিয়া পড়ার অনুমতি সকলেই দিয়াছেন। তাঁহাদের জন্য রোযা কাযা করার অনুমতিও সর্বস্বীকৃত হইয়াছে।
(৮) দরূদ শরীফ পাঠ না করিলে যে নামায সিদ্ধ হয়না ইমাম শাফেয়ীর এই অভিমত হানাফী ও শাফেয়ী সকলেই মানিয়া লইয়াছেন।
(৯) বস্ত্রে টাকার পরিমান স্থানে মলমূত্র প্রভৃতি না-পাকি লাগিয়া থাকিলে যে নামায সিদ্ধ হইবে না, ইমাম শাফেয়ীর এই অভিমত হানাফীগণও স্বীকার করিয়া লইয়াছেন।
(১০) রুকু ও সিজদায় কিছুটা বিলম্ব করা যে অত্যাবশ্যক একথাও উভয় পক্ষই মানিয়া লইয়াছেন।
(১১) ফারসী অথবা উরদু, বাংলা কিংবা অন্য কোন ভাষায় কুরআনের তরজমা পাঠ করিলে নামায যে সিদ্ধ হইবেনা পরন্ত নামাযের বিশুদ্ধতার জন্য মূল আরাবী কুরআনই পাঠ করিতে হইবে, ইমাম শাফেয়ীর এই অভিমতও হানাফী বিদ্বানগণ গ্রহণ করিয়াছেন।
(১২) 'হিবা' বা দান শব্দ দ্বারা বিবাহ সংঘটিত হইবেনা, বিবাহের জন্য সুস্পষ্টভাবে 'বিবাহ' শব্দ প্রয়োগ করিতে হইবে- একথাও উভয় পক্ষ স্বীকার করিয়া লইয়াছে।
📄 ইমাম শাফেয়ী সম্বন্ধে বিদ্বানগণের সাক্ষ্য
জগতবরেণ্য ইমাম মালিক বিনে আনস (রহ) বলেন যে, শাফেয়ী অপেক্ষা অধিকতর তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন কোন কুরায়শী আমার নিকট কোন দিন আগমন করেন নাই।
ইমাম আবু হানীফার শ্রেষ্ঠ ছাত্র হানাফী মযহবের সংকলয়িতা ইমাম মুহাম্মদ বিনুল হাসান (১৩১-১৭৯) বলেন যে,
إن تكلم أصحاب الحديث يوما، فبلسان الشافعي -
আহলে হাদীসগণ যদি কোন দিন কথা বলেন, তাহা হইলে শাফেয়ীর ভাষাতেই বলিবেন।৯
আহলে সুন্নাতগণের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ইমাম আহমদ বিনে হাম্বল (১৬৪-২৪০) বলেন যে,
ما أحد من أهل الحديث مس محبرة ولا قلما، إلا وللشافعي في رقبته منه -
পৃথিবীতে এমন কোন বিদ্বান নাই, যিনি দোয়াত-কলম স্পর্শ করিয়াছেন, অথচ তাঁর স্কন্ধে শাফেয়ীর অনুগ্রহ নাই।১০
ইমাম হাসান বিনে মুহাম্মদ বিনে সাব্বাহ যাফরাণী (-২৬৯) বলেন,
كان أصحاب الحديث رقودا حتى أيقظهم الشافعي -
আহলে হাদীসগণ সকলেই ঘুমন্ত ছিলেন, শাফেয়ী আসিয়া তাঁহাদিগকে জাগরিত করিলেন।১১
ইমাম ইউনুস বিনে আবদুল আ'লা ইবনে ময়সরা সদফী (১৭০-২৬৪) বলেন যে, পৃথিবীর সমুদয় অধিবাসীর অর্ধেক বুদ্ধি যদি ইমাম শাফেয়ীর বুদ্ধির সহিত ওজন করা হয়, তাহা হইলে শাফেয়ীর বুদ্ধি ওজন বাড়িয়া যাইবে।১২
ইমাম আবু সত্তর ইবরাহীম বিনে খালীদ বাগদাদী (২৪০ হিঃ) বলেন যে, শাফেয়ী সুফ্যান সওরী ও ইবরাহীম নখয়ী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর ফকীহ ছিলেন।১৩
ইমাম আহমদ বিনে হাম্বল ইহাও বলিয়াছেন যে,
ما عرفت ناسخ الحديث من منسوخه حتى جالست الشافعي .
শাফেয়ীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করার পূর্বে আমি নাসিখ ও মনসুখ হাদীস চিনিতাম না।১৪ তিনি আরও বলিয়াছেন যে,
الشافعي كالشمس للدنيا وكالعافية للبدن .
দুনিয়ার পক্ষে সূর্য আর দেহের পক্ষে সুস্থ্যতা যেরূপ, বিদ্বানগণের জন্য শাফেয়ীও তদ্রূপ।
ইমাম হিলাল বিনুল উলা বিনে হিলাল আল-বাহেলী (-২৮০) বলেন যে,
أصحاب الحديث عيال على الشافعي فتح لهم الاقفال -
আহলে হাদীসরা সকলেই- ইমাম শাফেয়ীর পরিবারভুক্ত। তিনি তাঁহাদের জন্য অবরুদ্ধ তালা খুলিয়াছেন।১৫
ইমাম আবদুর রহমান আবু শামা (৫৯৬-৬৬৫) স্বীয় মু'মল গ্রন্থে লিখিয়াছেন, যে সকল মুজতাহিদ ইজতিহাদের বিদ্যা পৃথিবীর সকল প্রান্তে সম্প্রসারিত করিয়াছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে কেহ বা কুরআনের বিদ্যায় অধিকতর পারদর্শী ছিলেন, কাহারও জ্ঞান সুন্নাতের বিদ্যায় প্রখরতর ছিল, কেহ বা আরবী সাহিত্যে অধিকতর দক্ষতা রাখিতেন আর কেহ মআলা আবিষ্কারের কার্যে কুশাগ্র বুদ্ধিসম্পন্ন ছিলেন, কিন্তু উল্লিখিত বিদ্যাগুলিতে তুল্যভাবে কোন ইমামেরই অধিকার ছিল না একমাত্র ইমাম শাফেয়ী ব্যতীত, এই সকল বিদ্যায় তিনিই সর্বাপেক্ষা সুপণ্ডিত এবং গভীরতম জ্ঞানসম্পন্ন ছিলেন।১৬
ইমামুল আয়েম্মা আবু সুলায়মান দাউদ বিনে আলী আয্যাহেরী (২০১-২৭০) বলিয়াছেন, ইনি সেই শাফেয়ী মুত্তালবী-- যিনি সূচাগ্র প্রতিভা দ্বারা মানব সমাজকে গৌরবান্বিত এবং স্বীয় বলিষ্ঠ প্রমাণ প্রয়োগ দ্বারা বিদ্বজ্জনমন্ডলীকে পরাভূত এবং স্বীয় শৌর্য দ্বারা পরাস্ত আর ধর্মপরায়ণতা এবং সাধুতা ও বংশমর্যাদা দ্বারা তাঁহাদের উপর জয়যুক্ত হইয়াছেন। স্বীয় প্রভুর গ্রন্থের ধারক এবং রাসূলের (সা) সুন্নাতের অনুসারী, বিদআতীগণের নেতৃবৃন্দের নিশ্চিহ্নকারী, তাহাদের আচরণে কালিমাসিক্তকারী এবং কুরআনে কথিত-
فأصبح هشيما تذروه الرياح .
'বাত্যাবিক্ষুব্ধ উদ্ভিদ পত্রের ন্যায় তাহাদের চূর্ণ বিচূর্ণকারী।১৭
ইমাম শাফেয়ী লিখিয়াছেন যে, ইমাম শাফেয়ীর সহিত তর্কযুদ্ধে ইমাম মুহাম্মদ বিনুল হাসানের পরাজয়ের কথা খলীফা হারুনুর রশীদ শুনিতে পাইয়া বলিয়াছিলেন যে, মুহাম্মদ বিনুল হাসান যতই বিদ্বান হউন না কেন (এই) কুরায়শী পুরুষের সহিত বিতর্কে প্রবৃত্ত হইলে তিনি মুহাম্মদ বিনুল হাসানকে অবশ্যই পরাভূত করিবেন। পুনশ্চ যখন খলীফা শুনিতে পাইলেন যে, তিনি ইমাম শাফেয়ীকে যে সহস্র সুবর্ণ মুদ্রা পুরস্কার স্বরূপ প্রদান করিয়াছিলেন শাফেয়ী তাঁর সমস্তই দীন দরিদ্রের মধ্যে বিতরণ করিয়াছেন, খলীফা তখন বলিলেন, মুত্তালিবের বংশধরগণ আভিজাত্য ও দানশীলতায় রাসূলুল্লাহর (সা) পরিবারবর্গ অপেক্ষা কোন অংশেই ভিন্ন নয়।১৮
বিখ্যাত সাধক ইমাম আবুল হাসান শাযলী মালেকীকে শায়খ শাহাবুদ্দীন ইবনুল মালীক শাফেয়ী বলিলেন যে, আমি আপনার সাহচর্য করিতে চাই কিন্তু আমার শর্ত এই যে, আমি শাফেয়ী মযহব পরিত্যাগ করিতে পারিব না। শাযলী বলিলেন, বহুত আচ্ছা! আপনি উক্ত মযহবে আরো দৃঢ় হউন, কারণ ইমাম শাফেয়ী কুতুব না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুমুখে পতিত হন নাই।১৯
স্বনামধন্য অর্থনীতিবিশারদ ইমাম আবু উবায়দ কাসিম বিনে সালাম বাগদাদী (১৫৭-২২৪) বলেন যে আমি শাফেয়ী অপেক্ষা কামিল পুরুষ আর কাহাকেও দর্শন করি নাই। পুনশ্চ বলেন যে, আমি কখনও কোন ব্যক্তিকে শাফেয়ীর ন্যায় তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন পরহেযগার, প্রাঞ্জলভাষী এবং সাহসী পুরুষ দর্শন করি নাই।২০
রিজাল ও হাদীস শাস্ত্রের জগদ্বরেণ্য ইমাম ইয়াহয়া বিনে মঈন (১৫৮-২৩৩) একদা দেখিতে পাইলেন যে, ইমাম আহমদ বিনে হাম্বল ইমাম শাফেয়ীর খচ্চরের পিছনে পিছনে পদব্রজে ইমামকে অনুসরণ করিয়া চলিতেছেন। ইবনে মঈন ইমাম আহমদকে বলিলেন, আপনার একি অবস্থা? ইমাম আহমদ বলিলেন, চুপ করিয়া থাক। যদি তুমি এই খচ্চরের অনুসরণ করিয়া চলিতে পার তাহা হইলে অনেক উপকৃত হইবে।২১
হাদীস শাস্ত্র বিশারদগণের ইমাম, ইমাম শাফেয়ীর অন্যতম উসতায আবদুর রহমান বিনে মহদী (১৩৫-১৯৮) ইমাম শাফেয়ী সম্বন্ধে বলিয়াছেন, পৃথিবীতে এই ব্যক্তির তুলনা নাই- [তহযীবুত তাহযীব, (৬) ২৭৯ পৃঃ]
ইমাম শাফেয়ী কর্তৃক বিরচিত কিতাবুর রিসালা পাঠ করিয়া ইমাম আহমদ বিনে হাম্বল বলিয়াছেন যে, আল্লাহ শাফেয়ীর মত কোন ব্যক্তিকে সৃষ্টি করিয়াছেন- আমার এরূপ ধারণা নাই।২২
ইমাম আহমদ বিনে হাম্বল আরো বলিয়াছেন যে, শাফেয়ী চারিটি বিষয়ে ডক্টর (فيلسوف) হইয়াছেন: ১। অভিধান শাস্ত্রে, ২। বিদ্বানগণের মতভেদে, ৩। অলঙ্কার বিদ্যায় এবং ৪। ফিক্হ্ন শাস্ত্রে।২৩ তিনি আরও বলিয়াছেন,
إن الله يبعث على رأس كل ماية سنة من يجدد لهذه الامة دينها -
রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস- "আল্লাহ প্রত্যেক শতাব্দীর গোঁড়ায় এমন ব্যক্তি প্রেরণ করিবেন যিনি এই উম্মতের জন্য তাহাদের ধর্মের বিপর্যস্ত অংশের সংস্কার সাধন করিবেন।" এই হাদীস সূত্রে প্রথম শতকের মুজাদ্দিদ হইতেছেন তাবেয়ী কুলাগ্রগণ্য আমীরুল মুমেনীন উমর বিনে আব্দুল আযীয (৬১-১০১) আর দ্বিতীয় শতকের মুজাদ্দিদ হইতেছেন ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস শাফেয়ী।২০
ভূবন বিখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে খল্লকান (৬০৮-৬৮১) তাঁর ইতিহাসে লিখিয়াছেন, শাফেয়ী বহু গুণসম্পন্ন, বহু গৌরবের অধিকারী, আপন যুগের অদ্বিতীয় ও অতুলনীয় মহান বিদ্বান ছিলেন। কুরআনের পাণ্ডিত্য, রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নতের প্রজ্ঞা, সাহাবাগণের সিদ্ধান্তের অভিজ্ঞতা, বিদ্বানগণের- মতভেদ সম্বন্ধে দক্ষতা, আরবদের ভাষা, অভিধান, সাহিত্য ও কবিতায় গভীর জ্ঞান তাঁর বিদ্যার সাগরে সঙ্গম লাভ করিয়াছিল।২৪
হুবহু এই ভাষাতেই ইমাম আবু মুহাম্মদ ইয়াফেয়ী (-৭৬২) তাঁর ইতিহাসেও শাফেয়ীর গুণ গাহিয়াছেন।২৫
ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস আবু হাতিম রাযী (১৯৫-২৭৭) বলিয়াছেন যে, যদি শাফেয়ী না হইতেন তাহা হইলে আহলে হাদীসদিগকে অন্ধ হইয়া থাকিতে হইত।২৬
রাসূলুল্লাহর (সা) পরিবারবর্গের প্রতি অকৃত্রিম ও গভীর শ্রদ্ধার অপরাধে একদেশদর্শীর দল ইমাম শাফেয়ীকে রাফেযী, শিয়া প্রভৃতি আখ্যায় ভূষিত করিয়াছিলেন। এই অপরাধে অভিযুক্ত হইয়া খলীফার আদেশে যখন তিনি ধৃত হন, তখন ইমাম শাফেয়ী তাঁর স্বরচিত যে কবিতাটি পাঠ করিয়াছিলেন তাহা আমি নিম্নে উধৃত করিয়া দিতেছি।
يارا كب البيت قف بالمحصب من منى ، واهتف لساكن خيفها والناهض !
قف ثم ناد بانني لمحمد ووصيه وابنيه لست بباغض
ان كان رفضا حب آل محمد فليشهد الثقلان اني رافضي !
"হে মক্কার যাত্রী উষ্ট্র-পৃষ্ঠের সওয়ার! একবার মিনা প্রান্তরে কঙ্কর নিক্ষেপের স্থানে কিছুক্ষণের জন্য থামিও আর খীফ ও তদঞ্চলের অধিবাসীদের ডাকিয়া বলিয়ো! একটু দাঁড়াইও আর উচ্চকণ্ঠে বলিও-
আমি মুহাম্মাদের (সা) পক্ষে এবং তাঁর ওসী এবং তদীয় দুই পুত্রের পক্ষে আমি বিদ্রোহী নই, যদি মুহাম্মদের (সা) পরিবার বর্গের প্রেম রাফেযী হইবার নিদর্শন হয় তাহা হইলে মানব দানব সকলেই সাক্ষী থাকুক যে, আমি রাফেযী?
টিকাঃ
৯. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, [২] ১৪ পৃঃ।
১০. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, ১৫ পৃঃ।
১১. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, [২] ১৬ পৃঃ।
১২. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, (২) ১৭ পৃঃ。
১৩. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, [২] ১৭ পৃঃ।
১৪. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, (২) ১৭ পৃঃ।
১৫. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, [২] ১৭ পৃঃ।
১৬. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, (২) ১৭ পৃঃ।
১৭. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, [২] ১৪ পৃঃ।
১৮. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, ১৫ পৃঃ।
১৯. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, [২] ১৬ পৃঃ।
২০. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, (২) ১৭ পৃঃ。
২১. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, [২] ১৭ পৃঃ।
২২. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, [২] ১৭ পৃঃ।
২৩. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, [২] ১৭ পৃঃ।
২৪. ইবনে খল্লকান, (২) ৪৪৭ পৃঃ।
২৫. মিরআতুল জেনান, [২] ১৬ পৃঃ।
২৬. মিরআতুল জেনান, [২] ১৯ পৃঃ।
📄 জীবন সন্ধ্যা
ইমাম শাফেয়ী তাঁর জীবনের শেষ পাঁচ বৎসর মিসরে অতিবাহিত করিয়াছিলেন তাঁর বিদ্যাবত্তা ও জ্ঞান গরীমার যশঃসৌরভে তাঁর জীবদ্দশাতেই ইসলাম জগতের সকল প্রান্তে আমোদিত হইয়া উঠিয়াছিল। হানাফী ও মালিকী বিদ্বানগণের ইমামগণ দলে দলে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করিয়া ধন্য হইতেছিলেন। ১৯৫ হিজরী পর্যন্ত ইমাম শাফেয়ী ইমাম মালিকের মযহব অনুসরণ করিয়া চলিতেন এবং মালিকী বিবেচিত হইতেন। কিন্তু যখন তিনি জানিতে পারিলেন যে, ইসলাম জগতের কতিপয় অঞ্চলে ইমাম মালিকের পূজা আরম্ভ হইয়া গিয়াছে এবং এই পূজা এরূপ উৎকট আকার ধারণ করিয়াছে যে, কতক স্থানে ইমাম মালিকের উক্তি রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস অপেক্ষাও অগ্রগণ্য বিবেচিত হইতেছে, তখন ইমাম শাফেয়ী রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি তাঁর অন্তরে যে অনাবিল শ্রদ্ধা পোষণ করিতেন, তাহার বশবর্তী হইয়া রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসের সমর্থন ও সাহায্য কল্পে দণ্ডায়মান হইলেন- এবং ইহারই ফলে তিনি অতঃপর স্বাধীন ও স্বতন্ত্র শাফেয়ী মযহবের প্রাণ-প্রতিষ্ঠাতা হইয়াছিলেন।
📄 ইমাম সাহেবের ছাত্রমণ্ডলী
যে সকল বিদ্যারথী ইমাম সাহেবের জ্ঞান পারাবার হইতে তৃষ্ণা নিবারণ করিয়াছিলেন তাঁহাদের সংখ্যা নিরূপণ করা দুরূহ। মওলানা আবদুল হাই লক্ষ্ণৌভী হানাফী হিদায়ার ভূমিকায় ইমাম সাহেবের অন্যতম বিশিষ্ট ছাত্র রুবাইঅ বিনে সুলায়মানের উক্তি উধৃত করিয়াছেন, যে, আমি একদা ইমাম সাহেবের গৃহ দ্বারে তাঁর ছাত্র মণ্ডলীর সাত শতটি সওয়ারী দেখিতে পাইলাম। এরূপ ক্ষেত্রে ইমাম সাহেবের সমুদয় ছাত্রের সংখ্যা যে কত হইবে তাহা সহজেই অনুমেয়। যে সকল জ্যোতিষ্ক বিদ্যা ও গৌরবের আকাশে ইমাম শাফেয়ীর নাম লইয়া অনন্তকাল যাবৎ আলোক বিকীর্ণ করিতে থাকিবেন যদি শুধু তাঁহাদেরই নাম গণনা করা যায় তাহা হইলে আল্লামা ইবনে হজরের উক্তি মত তাঁহাদের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬৪। তাঁহাদের মধ্যে ১৪৯ জন এরূপ ছাত্র যাঁহারা এককালে স্বয়ং ইমাম শাফেয়ীর উসতায ছিলেন, অবশিষ্ট ১৫ জন তাঁর সহযোগী। এই দলের মধ্য হইতে আমি মাত্র কয়েকটি বিশ্ব বিশ্রুত নাম নিম্নে উধৃত করিতেছি:
১। ইমাম আবু বকর আবদুল্লাহ বিনে যুবায়দ আলহুমায়দী
হাদীস-শাস্ত্রের অন্যতম ইমাম, ইমাম বুখারীর উস্তায। ইমাম ইবনে উআয়নার দলের নেতা, মক্কার মুফতী, ২১৯ হিজরীতে পরলোকগমন করেন।
২। ইমাম সুলায়মান বিনে দাউদ বিনে দাউদ আবুর-রুবাইঅ
হাদীস সমূহের অন্যতম রাবী, ২৩৪ হিজরীতে পরলোকগমন করেন।
৩। ইমাম আহমদ বিনে হাম্বাল
মহামতি ইমাম- চতুষ্টয়ের অন্যতম। বিস্তৃত জীবনী পরে আলোচিত হইবে।
৪। ইমাম আবু সওর ইবরাহীম বিনে খালিদ কলবী
স্বতন্ত্র মযহবের প্রতিষ্ঠাতা। আযরবাইজান ও আরমেনিয়ার অধিবাসী বৃন্দ তাঁরই মযহব অনুসরণ করিয়া চলিতেন। সাধককুল চুড়ামণি হযরত জুনায়দ বাগদাদী তাঁরই মযহবের অনুসারী ছিলেন। ২৪৬ হিজরীতে পরলোকগমন করেন।
৫। ইমাম হরমালা বিনে ইয়াহয়া আবু আবদুল্লাহ মিসরী
হাফিযুল হাদীস, শাফেয়ী ফিক্সের মবসূত ও মুখতসর প্রভৃতি গ্রন্থের রচয়িতা। ১৬৬ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করিয়া ২৪৩ হিজরীতে মিসরে পরলোকপ্রাপ্ত হন।
৬। ইমাম আবু মুহাম্মদ হাসান বিনে মুহাম্মদ, বিন আব্বাস যাআফরানী-বাগদাদী।
হাদীস শাস্ত্রের ইমাম শাফেয়ীর বিশিষ্ট ছাত্র, বিখ্যাত ফকীহ, অভিধান শাস্ত্রে এবং বাগ্মীতায় আপন যুগে অতুলনীয়। ২৫৯ হিজরীতে পরলোকগমন করেন।
৭। আবু ইব্রাহীম ইসমাঈল বিনে ইয়াহয়া আলমুযনী
ইমাম শাফেয়ীর বিশিষ্ট ছাত্র, মিসরের অধিবাসী। শাফেয়ী মযহবের অধিকাংশ গ্রন্থ- যথা: জামে কবীর, জামে সগীর, মুখতসর, মনসূর, তরগীব প্রভৃতি গ্রন্থের রচয়িতা। ১৭৫ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করিয়া ২৬৪ হিজরীতে পরলোকগমন করেন।
৮। ইমাম ইয়ূনুস বিনে আবদুল আ'লা আবু মুসা ইবনে ময়সরা সদফী
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ফকীহগণের অন্যতম, হাদীসশাস্ত্র-বিশারদ ও তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন। জন্ম ১৭০ হিজরী, মিসরে ২৬৪ হিজরীতে পরলোকগমন করেন।
৯। ইমাম মুহাম্মদ বিনে আবদুল হাকাম আবু আবদুল্লাহ মিসরী
আপন যুগে মিসরে বিদ্যার মুকুটহীন নরপতি ছিলেন। পূর্বে ইমাম মালিকের মযহবের একনিষ্ঠ প্রচারকরূপে ইমাম শাফেয়ীর প্রতিবাদে "আররদেদ্দা আলাশাফেয়ী" নামক একখানা গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন। ১৮২ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করিয়া ২৬৮ হিজরীতে পরলোকগমন করেন।
১০। ইমাম আবু মুহাম্মদ রুবাইঅ বিনে সুলায়মান বিনে আবদুল জব্বার-আল মুরাদী
জন্ম ও মৃত্যু মিসরে ইমাম শাফেয়ীর গ্রন্থ সমূহের বর্ণনাদাতা। মিসরের ইবনে তুলুন বিশ্ব বিদ্যালয়ে সর্বপ্রথম হাদীস রেওয়ায়তকারী। ১৭৪ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করিয়া ২৭০ হিজরীতে পরলোকগমন করেন।
১১। ইমাম আবু ইয়াকুব ইউসুফ বিনে ইয়াহয়া-আল-কুরায়শী বুওয়ায়তী।
ইমাম শাফেয়ী ইহার সম্বন্ধে বলিয়াছিলেন, আমার ছাত্রগণের মধ্যে বুওয়ায়তী অপেক্ষা অধিকতর বিদ্বান আর কেহ নাই। ইমাম সাহেবের মৃত্যুর পর পাঠন ও ফতওয়া ব্যাপারে তিনি তাঁর স্থলাভিষিক্ত হইয়াছিলেন। খলীফা ওয়াসেক বিল্লাহর সময় যুক্তিবাদী (মু'তাযিলা)-দের ষড়যন্ত্রে কারারুদ্ধ হন এবং আহলে সুন্নাতগণের সমর্থনের অপরাধে ২৩১ হিজরীতে কারাগারেই পরলোকগমন করেন।
ইমাম সাহেবের এই সকল ছাত্র কর্তৃক বর্ণিত হাদীস সমূহ সিহাহ সিত্তার গ্রন্থরাজি বিভূষিত রহিয়াছে। শুধু ইহারাই নহেন, ইমাম সাহেবের প্রায় সমুদয় ছাত্রই সিহাহ সিত্তার রাবী। এইরূপ ২৪ জনের নিকট হইতে বুখারী, সতের জনের নিকট হইতে মুসলিম, আঠার জনের নিকট হইতে আবু দাউদ, সাত জনের নিকট হইতে তিরমিযী, নয় জনের নিকট হইতে নাসায়ী, ছয় জনের নিকট হইতে ইবনে মাযা এবং ৮৩ জনের নিকট হইতে অন্যান্য ইমামগণ হাদীস রেওয়ায়ত করিয়া স্ব স্ব গ্রন্থে সন্নিবেশিত করিয়াছেন।