📘 ফিরকাবন্দি বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি 📄 ইমাম শাফেয়ীর সমাধান পদ্ধতি

📄 ইমাম শাফেয়ীর সমাধান পদ্ধতি


সমস্যার সমাধানকল্পে ইমাম শাফেয়ী যে পদ্ধতির অনুসরণ করিতেন তাহা সম্যকরূপে হৃদয়ঙ্গম করিতে হইলে ইমাম সাহেবের প্রাককালীন ফিকহ শাস্ত্রের (Islamic Jurisprudence) অবস্থা অবগত হওয়া আবশ্যক। তৎকালীন ফিক্‌হ শাস্ত্রের মোটামুটি অবস্থা ছিল এই যে, তখন পর্যন্ত ফিক্হে বাঁধাধরা নিয়ম ও মূলনীতি (Principles) সমূহ আবিষ্কৃত হয় নাই। ভুল ও সঠিক মসআলা সমূহের মধ্যে পার্থক্য করার কোন মানদণ্ডও স্থিরীকৃত ছিল না। বিভিন্নরূপী হাদীস সমূহের মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করার এবং তাহাদের পারস্পরিক বিরোধ দূরীভূত করার কোন নিয়মও ছিল না। তৎকালীন ফকীহগণ সাধারণতঃ মূর্সল ও মুনকাতা হাদীস সমূহের সাহায্যে মসআলাসমূহ আবিষ্কার করিতেন এবং বিরোধ ক্ষেত্রে স্বীয় ধীশক্তি ও মানসিক প্রবণতার (Mental tendency) উপর নির্ভর করিয়াই একটি হাদীসকে অগ্রাহ্য এবং অপরটিকে অগ্রগণ্য করিয়া তাহার অনুসরণ করিতেন। বহু ক্ষেত্রে সহীহ হাদীস সমূহ পরিত্যাগ করিয়া যঈফ হাদীস সমূহের আশ্রয় লইতেন এবং সাহাবা ও তাবেয়ীগণের অভিমত নিজেদের সিদ্ধান্তের পোষকতায় উপস্থাপিত করিতেন। শরীঅত বিরোধী কাল্পনিক অভিমতকে শরীঅতের অনুকূল বিশুদ্ধ কিয়াসের সহিত মিশাইয়া ফেলিতেন এবং এই কার্যকে ইসতিহসান নামে অভিহিত করিতেন। সংশোধন (নাসিখ) ও সংশোধিত (মনসুখ), ব্যাপক (মুতলক) ও নির্ধারিত (মুকাইয়দ), সাধারণ (আম) ও বিশেষ (খাস), শর্ত ও পরিচয় (ওয়াসফ) প্রভৃতি বিষয়ের আলোচনা করা হইত না, ফলে তৎকালীন বিদ্বানগণের ইজতিহাদ ও আবিষ্কারে নানারূপ বিভ্রান্তি ও বৈপরীত্য সংঘটিত হইত এবং তাঁহাদের সিদ্ধান্তগুলি পরস্পর অসংলগ্ন হইয়া পড়িত। ইমাম শাফেয়ী হানাফী ও মালেকী মযহবের অসূল ও ফরূ' (Principles & details) সমূহ পর্যবেক্ষণ করিয়া উক্ত দুই মযহবে যে সকল বিষয়ের অভাব ঘটিয়াছিল সেগুলি পূর্ণ করেন এবং নূতন পদ্ধতিতে ফিক্‌হ শাস্ত্রের মূলনীতি ও বিধানগুলি সুসম্পাদিত করেন সর্ব প্রথম তিনিই অসুলে ফিক্হে এক খানা গ্রন্থ প্রণয়ন করেন এবং উহাতে বিভিন্ন রূপ হাদীস সমূহের মধ্যে সমন্বয় সংঘটিত করার নিয়ম লিপিবদ্ধ করেন। মূর্সল ও মুনকাতা হাদীস সমূহ গ্রহণ করার জন্য তিনিই যথোপযুক্ত শর্ত আবিষ্কার করেন। যে সকল মূলনীতিতে ইমাম শাফেয়ী হানাফী ও মালেকী মযহবের সহিত বিরোধ করিয়াছেন আমরা সেগুলির মোটামুটি বিবরণ নিম্নে প্রদান করিতেছি।

১। মূর্সল ও মুনকাতা হাদীসের উপর নির্ভর না করা
হানাফী ও মালেকী মযহবের মূর্সল ও মুনকাতা হাদীসে নির্ভর করা হয় দেখিয়া ইমাম শাফেয়ী এই নিয়ম স্থিরীকৃত করিলেন যে, যথোপযুক্ত শর্তের উপস্থিতি ব্যতিরেকে উল্লিখিত হাদীসসমূহ পরিগৃহীত হইবে না। কারণ হাদীসের তরিকাগুলি একত্রিত করার ফলে ইহা স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে যে, কতিপয় মূল হাদীস সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং উহা কতকগুলি মুসনদ হাদীসেরও বিপরীত।

২। বিভিন্ন হাদীস সমূহের মধ্যে সমন্বয় ঘটাইবার নিয়ম প্রণয়ন করা
ইমাম শাফেয়ীর সময়ে হাদীসের যেরূপ প্রাচুর্য ঘটিয়াছিল তাঁর পূর্বে হাদীসের অবস্থা সেরূপ ছিল না। তাঁর পূর্বে প্রত্যেক নগরের অধিবাসীবৃন্দ শুধু স্ব স্ব নগরের বিদ্বান ও ইমামগণের নিকট হইতে হাদীস গ্রহণ করিয়াই ক্ষান্ত থাকিতেন। ইমাম শাফেয়ীর যুগে হাদীস সংকলনের কার্য আরম্ভ হইলে এক নগরের বিদ্বানগণ অপর নগরে গমন করিয়া হাদীস সংগ্রহ করিতে লাগিয়া যান। এই ভাবে বিভিন্ন নগর ও জনপদের ইমাম ও বিদ্বানগণের নিকট যে সকল হাদীস মওজুদ ছিল সেগুলির মধ্যে পার্থক্য ও বৈষম্যও পরিদৃষ্ট হয়। এই পার্থক্য ও বৈষম্য বিদূরিত করার উপায় অপরিহার্য হওয়ায় ইমাম সাহেব শুধু এই উদ্দেশ্যেই একখানা গ্রন্থ প্রণয়ন করেন, উহাতে বিভিন্ন হাদীস সমূহের বৈষম্য বিদূরিত করার উপায় লিপিবদ্ধ করা হয়।

৩। সহীহ হাদীস প্রত্যাখ্যান করার রীতি রহিত করা
পূর্বে যে সকল বিদ্বান ফিকহ শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি লাভ করিয়াছিলেন এবং যাঁহাদের সিদ্ধান্তকে ভিত্তি করিয়া তাঁহারা স্ব স্ব মযহব স্থাপন করিয়াছিলেন অনেকগুলি সহীহ হাদীস তখন পর্যন্ত তাঁহারা হস্তগত করিতে পারেন নাই। সুতরাং যে সকল হাদীসে স্পষ্ট ভাবে মআলা বিদ্যমান ছিল সেগুলি অবগত না থাকার ফলে তাঁহারা কিয়াস ও রায় এবং ইজতিহাদ ও আবিষ্কারের আশ্রয় লইতে বাধ্য হইয়াছিলেন। ইমাম শাফেয়ী দেখিতে পাইলেন যে, একান্ত বাধ্য হইয়াই পূর্ববর্তী বিদ্বানগণ অনেক সহীহ হাদীসের অনুসরণ করিতে পারেন নাই। ইমাম শাফেয়ী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় প্রচার করিলেন যে, সহীহ হাদীস প্রাপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিয়াস বর্জন করিয়া সহীহ হাদীসের অনুসরণ করিতে হইবে। তিনি ইহাও প্রমাণিত করিলেন যে, সাহাবা ও তাবেয়ীগণও এই নিয়মের অনুসরণ করিয়া চলিতেন। তাঁহারা সর্বদাই রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস অনুসন্ধান করার কার্যে ব্যাপৃত থাকিতেন এবং শুধু হাদীস না পাওয়ার ক্ষেত্রেই তাঁহারা বাধ্য হইয়া কিয়াস, ইসতিদলাল এবং প্রতিপাদনের আশ্রয় লইতেন এবং পরেও যদি তাঁহারা হাদীস প্রাপ্ত হইতেন তাহা হইলে অবলীলাক্রমে স্বীয় কিয়াস পরিহার করিয়া উক্ত হাদীস গ্রহণ করিয়া লইতেন।

হযরত ইমামে আযম অথবা হযরত ইমাম মালিক যে কতকগুলি বিশুদ্ধ হাদীস শ্রবণ করার সুযোগ প্রাপ্ত হন নাই এবং খুব দায়ে ঠেকিয়াই যে তাঁহারা অনেকগুলি হাদীসের অনুসরণ করিতে পারেন নাই, কোন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি সে কথা অস্বীকার করিবেন না। কারণ হযরত ইমাম শাফেয়ী হাদীসের যে বিরাট সম্ভার অধিকার করার সুযোগ পাইয়াছিলেন উল্লিখিত মহামতি ইমামন্বয় তাঁহাদের জীবদ্দশায় সে সুযোগ প্রাপ্ত হন নাই। হানাফী মযহবের বিখ্যাত ফকীহ ও সাধক ইমাম আবদুল ওয়াহহাব শা'রানী এ সম্পর্কে লিখিয়াছেন:
إنه لو عاش حتى دولت أحاديث الشريعة ويعد رحيل الحفاظ فى جمعها من البلاد والثفور وظفر بها لأخذبها وترك كل قياس كان قياسه وكان القياس قل فى مذهبه كما قل فى مذهب غيره بالنسبة إليه لكن لما كان أدلة الشريعة مفرقة في عصره مع التابعين وتابع التابعين في المدائن والقرى والشغور كثر القياس في مذهبه بالنسبة إلى غيره من الائمة ضرورة لعدم وجود النص في تلك المسائل التي قاس فيها -
যে সময় শরীঅতের হাদীস সমূহ সংকলিত হইয়াছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সা) হাদীস চয়ন করার উদ্দেশ্যে হাদীস তত্ববিশারদগণ পৃথিবীর বিভিন্ন নগর নগরী ও সীমান্তে বিস্তৃত হইয়া পড়িয়াছিলেন, ইমাম আবু হানীফা যদি সে যুগে বাঁচিয়া থাকিতেন এবং ঐ সকল হাদীস তিনি শ্রবণ করার সুযোগ পাইতেন তাহা হইলে নিশ্চয় সেগুলি তিনি গ্রহণ করিতেন এবং সমুদয় কিয়াস পরিত্যাগ করিতেন এবং তাঁর মযহবের তুলনায় অন্যান্য মযহবে যেরূপ কিয়াসের পরিমাণ কম ঘটিয়াছে তাঁর মযহবেও সেইরূপ কিয়াসের স্বল্পতা পরিদৃষ্ট হইত। কিন্তু যেহেতু তাঁর যুগে শরীঅতের দলীলগুলি তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীগণের নিকট বিভিন্ন জনপদ ও ইলাকায় সুদূর প্রসারিত হইয়া পড়িয়াছিল এবং ইহারই ফলে তাঁর মযহবে অন্যান্য ইমামগণের তুলনায় কিয়াসের আধিক্য ঘটিয়াছিল। যে সকল মসআলায় স্পষ্ট নস বিদ্যমান ছিলনা সেই সকল মসআলার মীমাংসার জন্যই তাঁর পক্ষে কিয়াসের আশ্রয় গ্রহণ করা অপরিহার্য হইয়াছিল।

৪। সাহাবীগণের যে সকল উক্তি রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসের প্রতিকূল, সেগুলিকে দলীলরূপে গ্রহণ না করা
ইমাম শাফেয়ীর সময়ে সাহাবীগণের ফাতাওয়া ও উক্তিসমূহও সংকলিত হইয়াছিল। এই উক্তিগুলি অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরের বিরোধী পরিদৃষ্ট হইত। কতকগুলি উক্তি সহীহ হাদীসেরও প্রতিকূল দেখিতে পাওয়া যাইত। ইমাম শাফেয়ী সহীহ হাদীসের মুকাবেলায় তাঁহাদের প্রতিকূল উক্তিসমূহ দলীলরূপে গ্রাহ্য করার রীতি পরিত্যাগ করিয়াছিলেন। তিনি সুস্পষ্টভাবেই বলিয়া দিয়াছিলেন:
هم رجال ونحن رجال
'সাহাবীগণও মানুষ ছিলেন আর আমরাও মানুষ।' সুতরাং আমাদের মত তাঁহাদের পক্ষেও ভুলভ্রান্তি সংঘটিত হওয়া সম্ভবপর। অতএব সহীহ হাদীস প্রাপ্ত হইবার পর সাহাবীগণের ইজতিহাদের অনুসরণ করা আবশ্যক নয়। অধিকন্তু উহা বর্জন করা এবং হাদীস অবলম্বন করিয়া চলাই কর্তব্য।

৫। শরীঅত-বিরোধী অভিমত (রায়) আর শরীঅত অনুমোদিত কিয়াসের মধ্যে পার্থক্য করা
ইমাম শাফেয়ীর যুগে কতক বিদ্বান স্বকীয় ইজতিহাদের ভিতর অবলীলাক্রমে স্বীয় রায় প্রয়োগ করিয়া চলিতেন এবং এই রায়কে শরীঅতের অন্যতম দলীল-কিয়াস মনে করিতেন। এবম্বিধ রায় তাঁহাদের পরিভাষায় ইসতিহসান নামে কথিত হইত। অথচ সাহাবা ও তাবেয়ীগণের মধ্যে যে শরীঅতসঙ্গত কিয়াস প্রচলিত ছিল তাহার তাৎপর্য ছিল কুরআন ও হাদীসের কোন প্রত্যক্ষ আদেশ নিষেধের কারণ আবিষ্কার করা এবং যে সকল বস্তু বা কার্য সম্বন্ধে প্রত্যক্ষ নির্দেশ নাই সেগুলির মধ্যে উক্ত কারণ পরিদৃষ্ট হইলে সেই সকল কার্য বা বিষয় সম্বন্ধে উপরিউক্ত আদেশ বলবৎ করা। যেমন কুরআনে মদ্য হারাম হওয়া স্পষ্টভাবে উল্লিখিত হইয়াছে কিন্তু অন্যান্য মাদক দ্রব্যের কোন উল্লেখ নাই। এক্ষণে মদ্য হারাম হওয়ার আদেশ স্পষ্ট দলীলের ভিতর বিদ্যমান রহিয়াছে এবং উহা হারাম হওয়ার কারণ হইতেছে মাদকতা। অতএব এই মাদকতার কারণ যে সকল বস্তুর মধ্যে পাওয়া যাইবে সেগুলিকে হারাম বলিয়া নির্দেশিত করার কার্য শরীঅতসঙ্গত কিয়াস বলিয়া অভিহিত হইবে। এইরূপ কিয়াসই সাহাবা ও তাবেয়ীগণের মধ্যে প্রচলিত ছিল। আর নিজের কপোল-কল্পিত কথাকে হালাল বা হারাম হইবার কারণ রূপে গ্রহণ করার কার্য রায় নামে কথিত হইয়া থাকে। যথা: ব্যাপক সুবিধা বা অসুবিধাকে কোন আদেশের কারণ রূপে গ্রহণ করা। ইমাম শাফেয়ী এই ধরণের কিয়াসকে যাহা আদৌ শরীঅতসঙ্গত কিয়াস নয় এবং যাহা বুদ্ধিজীবীদের কল্পনাবিলাস মাত্র, সম্পূর্ণ রূপে বর্জন করিয়াছিলেন। আর তিনি খোলাখুলিভাবে বলিয়া দিয়াছিলেন যে,
مَنِ اسْتَحْسَنَ فَقَدْ أَرَادَ أَنْ يَكُوْنَ شَارِعًا
'যে ব্যক্তি ইসতিহসানের আশ্রয় গ্রহণ করিল সে পয়গম্বর সাজিবার ইচ্ছা করিল।'

ফল কথা, এই পাঁচটি বিষয়ে ইমাম শাফেয়ী পূর্ববর্তীগণের পথ পরিত্যাগ করিয়াছিলেন। তিনিই মধ্যবর্তী অবলম্বনগুলিকে ছাড়িয়া দিয়া সরাসরিভাবে মূল উৎস হইতে ফিকহ শাস্ত্র নূতন ভাবে প্রণয়ন করেন এবং নির্দিষ্ট কোন দলের ফকীহ বা মুজতাহিদ অথবা নির্দিষ্ট কোন নগর নগরীর বিদ্বানগণের উক্তি এবং নীতির উপর ইজতিহাদের ভিত্তি স্থাপন না করিয়া সরাসরিভাবে কুরআন ও সুন্নাতের উপর স্বীয় মযহব প্রতিষ্ঠিত করেন। সমস্ত ঐতিহাসিক এবং পূর্ব ও পরবর্তী সমুদয় মুসলিম বিদ্বানের এ বিষয়ে দ্বিমত নাই যে, ইমাম শাফেয়ী সর্ব প্রথম ফিকহ শাস্ত্রের মূলনীতিগুলি আবিষ্কার করিয়াছিলেন। তিনিই উহাকে বিভিন্ন অধ্যায় ও পরিচ্ছেদে সুবিন্যস্ত করিয়াছিলেন। তিনিই সেগুলির ভিন্ন ভিন্ন প্রকরণ এবং শ্রেণীভেদ বর্ণনা করিয়াছিলেন, তিনিই কুরআন, হাদীস, ইজমা ও কিয়াসের সাহায্যে দলীল গ্রহণ করার নিয়ম ও শর্ত আবিষ্কার করিয়াছিলেন, তিনিই নাসিখ, মনসুখ, মুতলক, মুকাইয়াদ আম ও খাস প্রভৃতির আলোচনা সুনিয়ন্ত্রিত করিয়াছিলেন, তিনিই দুর্বলতা ও বলিষ্ঠতার দিক দিয়া কিয়াস ও ইসতিদলালকে বিভিন্ন ভাবে বিভক্ত করিয়াছিলেন।

এরিষ্ট্রোটল যেরূপ ন্যায় শাস্ত্রের আবিষ্কর্তা রূপে আর খলীল বিনে আহমদ যেরূপ কাব্য আবিষ্কার রূপে অমর হইয়া রহিয়াছেন, ইমাম শাফেয়ীও তদরূপ অসূলে ফিকহের আবিষ্কারকরূপে ইতিহাসের পৃষ্ঠায় মৃত্যুঞ্জয়ী হইয়াছেন, তাঁর পূর্বে ফিকহ শাস্ত্রের কোন বাঁধাধরা নিয়ম ছিলনা। আভিধানিক অর্থ ছাড়া ফিকহের কোন বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য ছিলনা। যে বিদ্যাকে আজ আমরা ফিকহ নামে অভিহিত করিয়া থাকি এবং একান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিশিষ্ট বিজ্ঞানের পথপ্রদর্শক ও আবিষ্কার হইতেছেন ইমাম শাফেয়ী।

ইজতিহাদের যে সকল নীতি তিনি নির্ধারিত করিয়াছিলেন আমরা অতঃপর সেগুলিরও উল্লেখ করিব।

ইমাম শাফেয়ীর আলোচনায় এরূপ বিস্তৃত ভাবে মনঃসংযোগ করার দুইটি প্রধান কারণ। প্রথম, ইমাম শাফেয়ীই আহলে হাদীসগণের অন্যতম প্রধান ইমাম। দ্বিতীয়, ইমাম শাফেয়ী এবং তাঁর মযহব সম্পর্কে আমাদের শিক্ষিত দলের অজ্ঞতা মারাত্মক ভাবে সীমাবদ্ধ। এই প্রবন্ধের ভিতর দিয়া যদি আমি ইমাম শাফেয়ীকে আমাদের দেশের শিক্ষিত জনগণের মধ্যে কিঞ্চিৎ পরিচিত করিয়া তুলিতে পারি তাহা হইলে আমার শ্রম সার্থক হইবে।

(ক) ইমাম শাফেয়ীর ইজতিহাদের প্রথম বুনয়াদী নীতি (Basic principle) এই যে, দীনের মূল হইতেছে কুরআন ও হাদীস আর উহাদের অবিদ্যমানতায় কুরআন ও হাদীসের অনুকূল কিয়াস।

(খ) যে হাদীসের সনদ রাসূলুল্লাহ (সা) পর্যন্ত সংলগ্নভাবে প্রমাণিত এবং যাহার সনদের ভিতর কোনরূপ ত্রুটি নাই তাহা সুন্নাত।

(গ) এককভাবে বর্ণিত হাদীস অপেক্ষা ইজমার আসন উর্ধতর।

(ঘ) সকল সময় হাদীসের প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করিতে হইবে। বিভিন্ন অর্থবোধক হাদীস সমূহের মধ্যে উহার যে অর্থ প্রকাশ্য হাদীসের অনুরূপ সেই হাদীসকেই অগ্রগণ্য করিতে হইবে।

(ঙ) সমান শ্রেণীর বিভিন্ন হাদীসের মধ্যে অসামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হইলে যে হাদীসের সনদ সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট তাহাই অগ্রগণ্য বলিয়া বিবেচিত হইবে।

(চ) বিখ্যাত তাবেঈ সঈদ বিনুল মুসাইয়ের ছাড়া অন্য কোন বর্ণনাদাতার মূর্সল হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়।

(ছ) একটি মৌলিক আদেশকে অপর কোন মৌলিক আদেশের সঙ্গে কিয়াস করা চলিবে না। শরীঅতের মূলনীতির ভিতর একথা বলা চলিবেনা যে, এই আদেশের কারণ কি এবং কি ভাবে এই আদেশ প্রদত্ত হইয়াছে। একথা বিস্তৃত আদেশ নিষেধের (ফরূআৎ) বেলাতেই বলা চলিতে পারিবে। ফরূআতের কিয়াস যদি মৌলিক আদেশের সহিত সুসমঞ্জস হয় তবেই সে ইজতিহাদ সঠিক এবং উহা দলীলরূপে গ্রহণযোগ্য হইবে।

(জ) যে নির্দিষ্ট কারণে আদেশ অবতীর্ণ, হইয়াছে সে কারণটি কোন ক্রমেই আদেশের আওতার বহির্ভূত বিবেচিত হইবে না। আদেশের শব্দের ব্যাপক অর্থ অনুসারে অবতীর্ণ কারণ সমূহের উপর উক্ত আদেশ প্রযোজ্য হইলেও মূলতঃ যে কারণে আদেশ অবতীর্ণ হইয়াছে তাহাকে কোন অবস্থাতেই উল্লিখিত নির্দেশের বহির্ভূত গণ্য করা চলিবে না।
শেষোক্ত নিয়মটি অনুসরণ না করার ফলে বিদ্বানগণের মধ্যে বহু গোলযোগ ঘটিয়া গিয়াছে। আমরা এস্থলে মাত্র দুইটি দৃষ্টান্ত প্রদান করিয়া ক্ষান্ত হইব।

সূরা আল-বাকারার বিখ্যাত আয়াত:
وَلِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ
"এবং তোমরা আল্লাহর তকবীর ধ্বনি কর, যে ভাবে তিনি তোমাদিগকে আদেশ করিয়াছেন"- রামাযানের সিয়াম প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হইয়াছে। সুতরাং ইমাম শাফেয়ী এই আয়াত অনুসারে ঈদুল ফিতরের তকবীর সমূহেকে ওয়াজিব বলিয়া থাকেন। তাঁর বক্তব্য এই যে, ঈদুল ফিতর সম্পর্কে এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার দরুণ ঈদুল ফিতরের তকবীর এই আদেশের বহির্ভূত বলিয়া গণ্য হইবে না এবং আদেশের শব্দের ব্যাপক অর্থ অনুসারে ঈদুল আযহার তকবীর উহার অন্তর্ভুক্ত রূপে বিবেচিত হইবে। পক্ষান্তরে তকবীরের আদেশ শুধু ইদুল ফিতর উপলক্ষ্যে অবতীর্ণ হইলেও ইমামে আযম আবু হানীফা ঈদুল ফিতরের তকবীরগুলিকে মকরূহ বলিয়াছেন।

আর একটি দৃষ্টান্ত এই যে, রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে জনৈক ব্যক্তি উপস্থিত হইয়া নিবেদন করিল যে, "হে আল্লাহর রাসূল (সা) যদি কোন ব্যক্তি স্বীয় স্ত্রীর শয্যায় অপর কোন পুরুষকে দেখিতে পায় তাহা হইলে সে কি তাহাকে হত্যা করিবে এবং আপনি অতঃপর খুনের দায়ে তাহাকেও হত্যা করিবেন? না, সে কি করিবে?' এ সম্পর্কে কুরআনে 'লি'আনের' আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সা) উক্ত ব্যক্তিকে বলেন যে, তোমার এবং তোমার স্ত্রী সম্পর্কে আল্লাহ বিচার করিয়া দিয়াছেন। হাদীসের রাবী সহল বিনে সঅদ বলিতেছেন যে, অতঃপর স্বামী স্ত্রী উভয়েই 'লিআন' করিল এবং আমি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট থাকিয়া উহা প্রত্যক্ষ করিয়াছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সা) 'লি'আনের' পর স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ করিয়া দেন এবং এই ভাবে 'লিআনে'র পর বিচ্ছেদের রীতি সুন্নত হইয়া দাঁড়ায়। স্ত্রীলোকটি গর্ভবতী ছিল, কিন্তু তাহার স্বামী উক্ত সন্তানকে অস্বীকার করিয়াছিল এবং উক্ত সন্তান তাহার জননীর নামে পরিচিত হইয়াছিল। অতঃপর এইরীতি প্রবর্তিত হয় যে, এরূপ সন্তান মাতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হইবে এবং জননীও আল্লাহর নির্দেশিত ব্যবস্থামত সন্তানের পরিত্যক্ত সম্পত্তির অংশ প্রাপ্ত হইবে।

এই হাদীস সূত্রে ইমাম শাফেয়ী তাঁর অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন যে, যদিও বিনাগর্ভে স্ত্রীর সহিত 'লি'আন চলিতে পারে কিন্তু যেহেতু 'লি'আনের' অনুমতির আয়াতটি গর্ভবতী নারী সম্পর্কেই অবতীর্ণ হইয়াছিল, অতএব গর্ভবর্তী নারীর সঙ্গেও 'লি'আন করা বৈধ হইবে। পক্ষান্তরে শানে নযুলকে আদেশের অন্ত-র্ভুক্ত গণ্য না করায় ইমাম আবু হানীফা গর্ভবর্তী নারীর সহিত 'লি'আন' করাকে অবৈধ বলিয়াছেন।

ইমাম শাফেয়ী এই মৌলিক নীতিও স্থিরীকৃত করেন যে, কুরআনে যে সকল পাঠ-পদ্ধতি বিরল এবং সুপ্রসিদ্ধ ও সার্বজনীন পাঠ-পদ্ধতির বিরোধী, তাহা অনুসরণীয় হইবে না। এই নীতির অনুসরণ করিয়া কাফফারার কসম সম্বন্ধে তিনি উপর্যুপরি তিনটি রোযা রাখা প্রয়োজন মনে করেন নাই। তিনি বলিয়াছেন যে, প্রসিদ্ধ কিরআতে উপর্যুপরি সিয়ামের উল্লেখ করা হয় নাই। শুধু তিনটি রোযার আদেশ দেওয়া হইয়াছে মাত্র। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা বলেন যে, আবদুল্লাহ বিনে মাসউদের বিরল কিরআতে 'উপর্যুপরি' শব্দ বিদ্যমান রহিয়াছে:
فصيام ثلاثة أيام متتابعات
অতএব শপথের কাফফারায় তিনটি রোযাই উপর্যুপরি ভাবে পালন করিতে হইবে।

(ঝ) ইমাম শাফেয়ী বলেন, কোন আদেশ নির্দিষ্ট অবস্থার শর্তাধীনে প্রদত্ত হইয়া থাকিলে সেই শর্ত বা অবস্থার অবিদ্যমানতায় উক্ত আদেশ, প্রযোজ্য রহিবেনা আর ইমাম আবু হানীফা বলেন যে, শর্ত বা অবস্থার অবলুপ্তির দ্বারা মূল আদেশ রহিত হইবে না! দৃষ্টান্ত স্বরূপ কুরআনে কথিত হইয়াছে যে,
ومن لم يستطع منكم طولا أن ينكح المحصنات المؤمنات فمن ما ملكت أيمانكم من فتياتكم المؤمنات .
'তোমাদের মধ্যে যাহাদের স্বাধীন মুসলিম নারীকে বিবাহ করার ক্ষমতা নাই তাহারা মুসলিম দাসীকে বিবাহ করিবে।" এই আয়াত সূত্রে ইমাম শাফেয়ী বলিয়াছেন, যে ব্যক্তির স্বাধীন নারীকে বিবাহ করার ক্ষমতা রহিয়াছে তাহার পক্ষে দাসীকে বিবাহ করা বিধেয় হইবে না। কারণ দাসীকে বিবাহ করার অনুমতি এই শর্তে আবদ্ধ রহিয়াছে যে, সে ব্যক্তির স্বাধীন নারী গ্রহণ করার ক্ষমতা নাই। পুনশ্চ এই আয়াত দ্বারা ইমাম শাফেয়ী অমুসলিম দাসীকে বিবাহ করাও অসিদ্ধ বলিয়াছেন। কারণ দাসীকে আয়াতের ভিতর বিবাহ করার অনুমতি ঈমানের শর্তাধীন রাখা হইয়াছে। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা স্বাধীন মুসলিম নারীকে বিবাহ করার ক্ষমতা থাকা সত্বেও দাসী বিবাহ করার অনুমতি দিয়াছেন এবং দাসীর জন্য মুসলমান হওয়ার শর্ত অবশ্য প্রতিপালনীয় বলেন নাই।

(ঞ) ইমাম শাফেয়ী মৌন ইজমার (اجماع سكوتى) প্রামাণিকতা স্বীকার করেন নাই। কারণ একজন সাহাবীর কোন কার্যকে অপর সাহাবী ভয়ের বশবর্তী হইয়া অবৈধ জানা সত্বেও উহার প্রতিবাদে বিরত থাকিতে পারেন। সুতরাং সাহাবীগণের মৌনভাব এবং কোন কার্যের প্রতিবাদে তাঁহাদের বিরত থাকা তাঁহাদের সম্মতির প্রমাণ হইতে পারেনা। হাদীসের পাঠকবর্গের ইহা অবিদিত নাই যে, কতিপয় সাহাবা বিভিন্ন কারণে অনেকগুলি ব্যাপারে উচ্চবাচ্য করেন নাই।

(ট) মুতলক আদেশকে সীমাবদ্ধ আদেশরূপে ধরিয়া লওয়া। যথা, সাদাকাতুল ফিতর সম্বন্ধে দুই প্রকার নস বিদ্যমান রহিয়াছে। একটিতে বলা হইয়াছে,
أدوا عن كل حر وعبد
প্রত্যেক স্বাধীন ও দাসের পক্ষ হইতে ফিতরা আদা' করা। এই আদেশটি সাধারণ। কিন্তু দ্বিতীয় আদেশে বলা হইয়াছে,
أدوا عن كل حرو عبد من المسلمين
প্রত্যেক স্বাধীন ও দাস মুসলিমের তরফ হইতে ফিতরা আদা' করা, এই আদেশটি সীমাবদ্ধ। কারণ ইহা দ্বারা শুধু মুসলমানগণই ফিতরা দেওয়ার জন্য আদিষ্ট হইয়াছেন। ইমাম শাফেয়ী বলেন যে, প্রথম সাধারণ আদেশটিকে দ্বিতীয় আদেশ সূত্রে সীমাবদ্ধ রূপেই গ্রহণ করিতে হইবে এবং প্রথম হাদীসে কথিত স্বাধীন ও দাসের অর্থ স্বাধীন ও দাস মুসলিম বলিয়া গ্রহণ করিতে হইবে। অতএব কাফের দাসের জন্য ফিতরা ওয়াজিব নয়। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা বলেন যে, ফিতরার জন্য ইসলামের কোন শর্ত নাই। সুতরাং বিধর্মী দাসের জন্যও ফিতরা পরিশোধ করা ওয়াজিব।

(ঠ) ইমাম শাফেয়ী বলেন, সাধারণ আদেশ সকল অবস্থায় এবং সকল ক্ষেত্রে অকাট্য ভাবে সাধারণত্বের পর্যায়ভুক্ত থাকিতে পারে না। এমন কোন সাধারণত্বই নাই যাহার মধ্যে কোন ব্যতিক্রমই নাই। এই মূলনীতির ফলে ইমাম শাফেয়ীর কাছে শাকপাতা প্রভৃতি তরকারীর উশর ওয়াজিব নয়। যদিও হাদীসে উল্লিখিত হইয়াছে যে,
ما اخرجت الأرض فقيه عشر
"মৃত্তিকা হইতে উৎপন্ন সকল বস্তুর জন্যই উশর আছে।" কিন্তু অন্যতম হাদীস
ليس في الخضروات صدقة
শাক সব্জীর উপর উশর নাই', প্রথমোক্ত হাদীসের ব্যাপকতা সীমাবদ্ধ করিয়া দিয়াছে। পক্ষান্তরে ইমাম আবু হানীফা এক সের পরিমাণ তরিতরকারীতেও উশর ওয়াজিব করিয়াছেন।

এই সকল মৌলিক নীতি ছাড়াও ফিকহ শাস্ত্রে ইমাম শাফেয়ী একটি বিশেষ কথা আবিষ্কার করিয়াছেন। তিনি কিয়াসকে তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করিয়াছেন।

(ক) যদি উপপাদ্য বিষয়টি মূল আদেশ অপেক্ষা যোগ্যতর হয় তাহা হইলে আদেশের কারণ অনুসন্ধান করা আবশ্যক হইবে না। পরন্তু মূল আদেশটি উপপাদ্য সমাধানের জন্য অবলীলাক্রমে ব্যবহৃত হইবে। যথা, দাসীদের সম্বন্ধে মূল আদেশ এই যে,
فإِنْ أَتَيْنَ بفَاحِشَةٍ فَعَلَيْهِنَّ نِصْفُ مَا عَلى المُحْصَنَاتِ مِنَ العَذاب
তাহারা ব্যভিচারে লিপ্ত হইলে স্বাধীন নারীর অর্ধেক দন্ড ভোগ করিবে। আয়াতে শুধু দাসীদের দণ্ডবিধি উল্লিখিত হইয়াছে। কিন্তু কুরআনের কুত্রাপিও এসম্পর্কে দাসদের দন্ডের কথা উল্লিখিত হয় নাই। ইমাম শাফেয়ী বলেন যে, সাধারণ জ্ঞান অনুসারে দাসীগণ অপেক্ষা দাসদের উপর দণ্ড তাহাদের সামর্থের আধিক্য অনুসারে- প্রযুক্ত হওয়া উচিত। সুতরাং দাসগণও উল্লিখিত আদেশের অন্তর্ভুক্ত।

(খ) কিন্তু প্রতিপাদ্য বিষয়টি যদি মূল আদেশ অপেক্ষা স্পষ্টতর না হয়, তাহা হইলে দ্বিবিধ উপায়ের মধ্যে একটি দ্বারা উহার সমাধান করিতে হইবে। প্রথমত: মূল আদেশের কারণ আবিষ্কার করিতে হইবে এবং প্রতিপাদ্যের ভিতর উক্ত কারণ বিদ্যমান থাকিলে তাহার জন্যও মূল আদেশ বলবৎ করা হইবে। যথা, কুরআনে মদ্য হারাম হওয়া উল্লিখিত রহিয়াছে। কিন্তু অপরাপর মাদক দ্রব্যের কথা কথিত হয় নাই। অথচ মদের নিষিদ্ধতার কারণ হইতেছে উহার মাদকতা। সুতরাং মদের মাদকতা যেকোন বস্তুর ভিতর পাওয়া যাইবে তাহাও হারাম বলিয়া অবধারিত হইবে। ইমাম শাফেয়ী এইরূপ কিয়াসকে কিয়াসুল মানি (قياس المعنى) নামে আখ্যায়িত করিয়াছেন।

(গ) দুই প্রকার উল্লিখিত আদেশের মাঝখানে যদি এমন একটি তৃতীয় প্রকারের অবস্থা সৃষ্টি হয় যাহার আদেশ স্পষ্টতঃ জানা নাই- এরূপ ক্ষেত্রে তৃতীয় অবস্থাটিকে উল্লিখিত উভয়বিধ অবস্থার সহিত তুলনা করিয়া দেখিতে হইবে এবং অনন্মধ্যে যে অবস্থার সহিত উহার সৌসাদৃশ্য অধিকতর এবং প্রকটতর দেখা যাইবে উপপাদ্য বিষয়টি সম্বন্ধে সেই আদেশই প্রয়োজ্য হইবে। যথা, তায়াম্মুমের জন্য নিয়ত বা সংকল্প অন্যতম শর্ত কিন্তু বস্ত্রের পবিত্রতার এই দুই লকার আদেশের মধ্যভাগে ওযুর স্থান। কিন্তু বস্ত্রের পবিত্রতা অপেক্ষা তায়াম্মুমের সঙ্গেই ওযুর সৌসাদৃশ্য অধিকতর এবং প্রকটতর। কারণ ওযূ এবং তায়াম্মুম একই উদ্দেশ্য অর্থাৎ নামাযের শুদ্ধতার জন্য ব্যবস্থা হইয়াছে। কিন্তু বস্ত্রের বিশুদ্ধতার ব্যাপার এরূপ নয়। অধিকন্তু যে সকল কারণে ওযু নষ্ট হইয়া যায় তায়াম্মুম ভঙ্গকারী কারণগুলিও তাহাই, সুতরাং বস্ত্রের পবিত্রতা অপেক্ষা ওযুকে তায়াম্মুমের পর্যায়ভুক্ত করা অধিকতর বিধেয়। ইমাম শাফেয়ী এইরূপ কিয়াসকে 'কিয়াসে শুবাহ (قياس الشبه)' নাম দিয়াছেন।

ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী দুঃখ করিয়া লিখিয়াছেন যে, ইমাম আবু হানীফা তাঁর সমস্ত জীবন কিয়াসের প্রামাণিকতায় অতিবাহিত করিয়া গিয়াছেন। তাঁর প্রতিপক্ষের দল সকল সময় তাঁর বিরুদ্ধে হাদীসের অন্যথাচরণ এবং কিয়াস অনুসরণের অভিযোগ আরোপ করিতেন। ইমাম জাফর সাদিক তাঁর কাছে কিয়াস বাতিল হওয়ার অনেকগুলি দলীল উপস্থাপিত করিয়াছিলেন। কিন্তু বড়ই আশ্বর্যের বিষয়, ইমাম আবু হানীফা এই সকল অভিযোগের কখনও উত্তর প্রদান করেন নাই এবং কিয়াসের প্রামাণিকতা সম্বন্ধে কোন দলীল দেওয়াও আবশ্যক মনে করেন নাই। এই বিদ্যার একটি পৃষ্ঠাও তিনি লিপিবদ্ধ করিয়া যান নাই। পক্ষান্তরে ইমাম শাফেয়ীই সর্বপ্রথম কিয়াসের প্রামাণিকতা প্রকাশ করেন এবং এই শাস্ত্রে গ্রন্থাদি রচনা করিয়া বিদ্বানদিগকে উপকৃত করেন। অথচ তাঁর স্বভাবে হাদীসের অনুসরণ-রীতিই অধিকতর প্রবল ছিল। যে গভীর গবেষণা ও অধ্যবসায়-শক্তি প্রয়োগ করিয়া ইমামুল আয়েম্মাহ শাফেয়ী স্বকীয় মযহবের নীতি ও নিয়মগুলি আবিষ্কার করিয়াছিলেন এই একটি ঘটনা দ্বারাই তাহা অনুমান করা যাইতে পারে। তিনি স্বয়ং লিখিয়াছেন, ইজমার প্রামাণিকতার দলীল অনুসন্ধান করিতে গিয়া আমি প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত তিন শতবার কুরআন পাঠ করিয়াছিলাম এবং সর্বশেষে একটি আয়াত দ্বারাই আমি সকল সন্দেহের অবসান ঘটাইতে সমর্থ হইয়াছিলাম।

📘 ফিরকাবন্দি বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি 📄 ইমাম শাফেয়ীর ইজতিহাদ

📄 ইমাম শাফেয়ীর ইজতিহাদ


যে সেকল মসআলায় হানাফী মযহবের সহিত ইমাম শাফেয়ী বিরোধ করিয়াছেন, শিক্ষিত সমাজের অবগতির জন্য আমরা সেগুলির কতকাংশ নিয়ে সংকলিত করিয়া দিতেছি।

১। ইমাম শাফেয়ীর নিকট ওযুর জন্য সংকল্প (নিয়ৎ) করা ওযুর বিশুদ্ধতার অন্যতম শর্ত, ইমাম আবু হানীফার নিকট নয়।

২। ইমাম শাফেয়ীর নিকট পর্যায়ক্রমে অর্থাৎ তরতীব রক্ষা করিয়া ওযু করা ফরয। হানাফী মযহবে ফরয নয়।

৩। ইমাম শাফেয়ীর নিকট মাথা মসহ করার নির্ধারিত কোন পরিমান নাই। ইমাম আবু হানীফার নিকট এক চতুর্থ মস্তক মসহ করা ফরয।

৪। ইমাম শাফেয়ীর নিকট সমুদয় নামায প্রথম ওয়াক্তে পড়া উত্তম। ইমাম আবু হানীফার নিকট মাগরিব ব্যতীত সমুদয় নামায বিলম্ব করিয়া পড়াই উত্তম।

৫। যে সকল নামাযে কিরআত উচ্চৈঃস্বরে পাঠ করিতে হয় ইমাম শাফেয়ীর নিকট সেই সকল নামাযে 'বিসমিল্লাহ'ও উচ্চৈঃস্বরে পাঠ করা আবশ্যক, কিন্তু ইমাম আবু হানীফার নিকট মকরূহ।

৬। ইমাম শাফেয়ীর নিকট উচ্চ ও নিম্নস্বরের সকল নামাযে সূরা আল- ফাতিহা পাঠ করা আবশ্যক, ইমাম আবু হানীফার নিকট নয়।

৭। ইমাম শাফেয়ীর নিকট রুকু ও কওমার সময় রফউল ইয়াদায়েন করা সুন্নত, ইমাম আবু হানীফার নিকট নয়।

৮। নামাযের প্রাক্কালে ইকামতের বাক্যগুলি 'কাদকামাতিস সালাত' ছাড়া আর সমস্তই ইমাম শাফেয়ীর নিকট একবার করিয়া উচ্চারণ করিতে হয়, কিন্তু ইমাম আবু হানীফা বলেন যে, ইকামত আযানেরই মত।

৯। ইমাম শাফেয়ীর নিকট গৃহপালিত পশুর যাকাতের বিনিময়ে উহার মূল্য প্রদান করা জায়েয নয়, কিন্তু ইমাম আবু হানীফা উহা জায়েয বলিয়াছেন।

১০। ইমাম শাফেয়ীর নিকট যে স্ত্রীকে পুরুষ তাহার মৃত্যুশয্যায় তালাক প্রদান করিয়াছে সে স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকারিনী হইবে না, কিন্তু ইমাম আবু হানীফার নিকট অবশ্যই হইবে।

১১। ইমাম শাফেয়ীর নিকট ওযু বা গোসলের ব্যবহৃত পানি না-পাক নয়, কিন্তু ইমাম আবু হানীফার নিকট না-পাক।

১২। ইমাম শাফেয়ীর নিকট ব্যভিচারের ফলে মুসাহরতের হুরমত সাব্যস্ত হয়না- অর্থাৎ যে নারীর সহিত পুরুষ ব্যভিচার করিয়াছে তাহার গর্ভ হইতে ভূমিষ্ঠ সন্তানের সহিত উক্ত পুরুষের ঔরস-জাত বৈধ সন্তানের বিবাহ সিদ্ধ হইবে; কিন্তু ইমাম আবু হানীফা ইহাকে হারাম বলিয়াছেন, এমন কি সকাম অবস্থায় কোন নারীর দেহ স্পর্শ করিলে অথবা তাহার প্রতি সকাম দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেও উক্ত নারীর জননী ও কন্যাগণ উক্ত পুরুষের পক্ষে চিরদিনের জন্য হারাম হইয়া যইবে এবং উক্ত পুরুষের জননী ও ভগ্নিরাও উল্লিখিত নারীর স্বামী এবং পুত্রগণের পক্ষে অনন্তকালের জন্য হারাম হইয়া যাইবে।

১৩। ইমাম শাফেয়ীর নিকট ওলী ব্যতীত নারীর বিবাহ সিদ্ধ নয়, কিন্তু ইমাম আবু হানীফা প্রাপ্তবয়স্ক নারীর পক্ষে ওলীর অনুমতি গ্রহণ করাও আবশ্যক বিবেচনা করেন নাই।

১৪। অট্টহাস্য করিলে ইমাম শাফেয়ীর নিকট ওযু নষ্ট হয়না, কিন্তু ইমাম আবু হানীফার নিকট নামাযে অট্টহাস্য করিলে ওযু নষ্ট হইয়া যাইবে।

১৫। দেহ হইতে রক্ত নিঃসৃত হইলে অথবা বমন করিলে ইমাম শাফেয়ীর নিকট ওযু নষ্ট হয়না, কিন্তু ইমাম আ'যমের নিকট নষ্ট হইয়া যায়।

১৬। খেজুরের রসে ইমাম শাফেয়ীর নিকট ওযু জায়েয নয়, তাঁর মযহবে পানির অভাবে তায়াম্মুম করিতে হইবে, কিন্তু ইমাম আবু হানীফার নিকট খেজুরের রস মওজুদ রহিলে তায়াম্মুম জায়েয হইবে না, খেজুরের রস দিয়াই ওষু করিতে হইবে।

১৭। ওযুর মধ্যে কুল্লির সময়ে হঠাৎ ভুল করিয়া যদি পানি গলার নিচে চলিয়া যায় তাহা হইলে ইমাম শাফেয়ীর নিকট রোযা নষ্ট হইবেনা, কিন্তু ইমামে আ'যমের নিকট রোযা নষ্ট হইবে।

১৮। মুসলমান প্রভুর পক্ষে কাফের গোলামের ফিতরা ইমাম শাফেয়ীর নিকট ওয়াজিব নয়, কিন্তু ইমাম আবু হানীফা উহা ওয়াজিব বলিয়াছেন।

১৯। নফল রোযার কাযা ইমাম শাফেয়ীর নিকট ওয়াজিব নয়, কিন্তু ইমাম আবু হানীফা রোযা কাযা করিতে বলিয়াছেন।

২০। ইমাম শাফেয়ীর নিকট কুড়ি মণের কম উৎপন্ন হইলেও উশর ওয়াজিব হইবে।

২১। ইমাম শাফেয়ীর নিকট ব্যবহৃত অলঙ্কারের যাকাত নাই, কিন্তু ইমাম আবু হানীফার নিকট ব্যবহৃত অলঙ্কারেও যাকাত ওয়াজিব।

২২। ইমাম শাফেয়ীর নিকট সকল স্থানেই জুমুআর নামায দুরস্ত হইবে, কিন্তু ইমাম আবু হানীফার নিকট শহর ছাড়া ও শাসনকর্তার উপস্থিতি ব্যতিরেকে জুমুআ' দুরস্ত হইবেনা।

২৩। ঈদের দিনে রোযার নযর মান্য করা ইমাম শাফেয়ীর নিকট জায়েয নয়, কিন্তু ইমামে আ'যমের নিকট উহা জায়েয।

২৪। বলপূর্বক কেহ যদি কাহারও নিকট হইতে তাহার স্ত্রীর তালাক আদায় করিয়া লয় আর সে প্রাণের ভয়ে যদি তালাক দিয়া বসে তাহা হইলে সে তালাক ইমাম শাফেয়ীর নিকট সংঘটিত হইবেনা, কিন্তু ইমামে আ'যমের নিকট প্রাণের ভয়ে তালাক দিলেও উহা সংঘটিত হইবে।

২৫। নিয়ত ছাড়াই শুধু মৌখিক তালাক শব্দ উচ্চারণ করিলে ইমাম শাফেয়ীর নিকট তালাক ঘটিবেনা, কিন্তু ইমাম আবু হানীফার নিকট নিয়ত না থাকিলেও তালাক ঘটিয়া যাইবে।

২৬। ইমাম শাফেয়ীর নিকট মুসলমান গোলাম কাফেরের প্রতিভূ হইতে পারিবে, কিন্তু মুসলমান গোলামের এ অধিকার ইমামে আযম স্বীকার করেন নাই, বরং প্রভুকে চুক্তি ভঙ্গ করিবার অনুমতি দিয়াছেন।

২৭। কোন ব্যক্তি জনৈকা নারীকে বিবাহ করিল এবং নারীর অঙ্গ স্পর্শ করার পূর্বেই বিবাহ মজলিসের ভিতর কাযী এবং সাক্ষীদের সম্মুখে উক্ত স্ত্রীলোককে তালাক প্রদান করিল কিন্তু এই ঘটনার ছয় মাস পর উক্ত নারী একটি পুত্র সন্তান প্রসব করিল। ইমাম শাফেয়ী বলেন, উক্ত সন্তানকে উল্লিখিত পুরুষের বংশধর বলিয়া গ্রাহ্য করা হইবেনা। কিন্তু ইমামে আযম বলেন যে, উক্ত সন্তানকে উল্লিখিত পুরুষের পুত্ররূপে গ্রাহ্য করিতে হইবে।

প্রকাশ থাকে যে, ইমাম আবু হানীফা অথবা ইমাম শাফেয়ীর সমুদয় দলআলাই যে সঠিক অথবা ভ্রান্তিপূর্ণ ইহা প্রমাণিত করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। উভয় ইমামের ইজতিহাদের স্বরূপ বিচার করিয়া দেখার জন্যই আমরা বিদ্বান ও বুদ্ধিমানগণের সম্মুখে বহি পুস্তক ঘাটিয়া উল্লিখিত বৈষম্যগুলি উপস্থাপিত করিলাম। উত্তরকালে শাফেয়ী মযহবের যে সকল মসআলা হানাফীগণের মধ্যেও চালু হইয়া গিয়াছে তাহার যৎকিঞ্চিৎ নমুনা অতঃপর পেশ করিতেছি।

(১) নিয়ত ও তরতীব ছাড়া ওযু সিদ্ধ না হওয়ার অভিমত হানাফী শাফেয়ী সকলেই মানিয়া লইয়াছেন।

(২) খেজুরের রসে ওযু সিদ্ধ না হওয়ার সিদ্ধান্তও সকলে স্বীকার করিয়া লইয়াছেন।

(৩) যবহ করা বা না-করা কুকুরের চামড়া সকল অবস্থায় অপবিত্র হওয়ার অভিমতও সকলেই মানিয়া লইয়াছেন।

(৪) সূর আল-ফাতিহা ব্যতীত নামায অসিদ্ধ হওয়ার উক্তিও সকলেই স্বীকার করিয়া লইয়াছেন।

(৫) সমস্ত রাতেই কিছু না কিছু কুরআন পাঠ করার উক্তিও সকলেই গ্রহণ করিয়াছেন।

(৬) প্রথম দুই রাকাআতের পর তাশাহুদ পাঠ করার অপরিহার্যতাও সকলেই স্বীকার করিয়া লইয়াছেন।

(৭) প্রবাসী ও রোগীর জন্য যোহর ও আসর অথবা মাগরিব ও এশার নামায জমা করিয়া পড়ার অনুমতি সকলেই দিয়াছেন। তাঁহাদের জন্য রোযা কাযা করার অনুমতিও সর্বস্বীকৃত হইয়াছে।

(৮) দরূদ শরীফ পাঠ না করিলে যে নামায সিদ্ধ হয়না ইমাম শাফেয়ীর এই অভিমত হানাফী ও শাফেয়ী সকলেই মানিয়া লইয়াছেন।

(৯) বস্ত্রে টাকার পরিমান স্থানে মলমূত্র প্রভৃতি না-পাকি লাগিয়া থাকিলে যে নামায সিদ্ধ হইবে না, ইমাম শাফেয়ীর এই অভিমত হানাফীগণও স্বীকার করিয়া লইয়াছেন।

(১০) রুকু ও সিজদায় কিছুটা বিলম্ব করা যে অত্যাবশ্যক একথাও উভয় পক্ষই মানিয়া লইয়াছেন।

(১১) ফারসী অথবা উরদু, বাংলা কিংবা অন্য কোন ভাষায় কুরআনের তরজমা পাঠ করিলে নামায যে সিদ্ধ হইবেনা পরন্ত নামাযের বিশুদ্ধতার জন্য মূল আরাবী কুরআনই পাঠ করিতে হইবে, ইমাম শাফেয়ীর এই অভিমতও হানাফী বিদ্বানগণ গ্রহণ করিয়াছেন।

(১২) 'হিবা' বা দান শব্দ দ্বারা বিবাহ সংঘটিত হইবেনা, বিবাহের জন্য সুস্পষ্টভাবে 'বিবাহ' শব্দ প্রয়োগ করিতে হইবে- একথাও উভয় পক্ষ স্বীকার করিয়া লইয়াছে।

📘 ফিরকাবন্দি বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি 📄 ইমাম শাফেয়ী সম্বন্ধে বিদ্বানগণের সাক্ষ্য

📄 ইমাম শাফেয়ী সম্বন্ধে বিদ্বানগণের সাক্ষ্য


জগতবরেণ্য ইমাম মালিক বিনে আনস (রহ) বলেন যে, শাফেয়ী অপেক্ষা অধিকতর তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন কোন কুরায়শী আমার নিকট কোন দিন আগমন করেন নাই।

ইমাম আবু হানীফার শ্রেষ্ঠ ছাত্র হানাফী মযহবের সংকলয়িতা ইমাম মুহাম্মদ বিনুল হাসান (১৩১-১৭৯) বলেন যে,
إن تكلم أصحاب الحديث يوما، فبلسان الشافعي -
আহলে হাদীসগণ যদি কোন দিন কথা বলেন, তাহা হইলে শাফেয়ীর ভাষাতেই বলিবেন।৯

আহলে সুন্নাতগণের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ইমাম আহমদ বিনে হাম্বল (১৬৪-২৪০) বলেন যে,
ما أحد من أهل الحديث مس محبرة ولا قلما، إلا وللشافعي في رقبته منه -
পৃথিবীতে এমন কোন বিদ্বান নাই, যিনি দোয়াত-কলম স্পর্শ করিয়াছেন, অথচ তাঁর স্কন্ধে শাফেয়ীর অনুগ্রহ নাই।১০

ইমাম হাসান বিনে মুহাম্মদ বিনে সাব্বাহ যাফরাণী (-২৬৯) বলেন,
كان أصحاب الحديث رقودا حتى أيقظهم الشافعي -
আহলে হাদীসগণ সকলেই ঘুমন্ত ছিলেন, শাফেয়ী আসিয়া তাঁহাদিগকে জাগরিত করিলেন।১১

ইমাম ইউনুস বিনে আবদুল আ'লা ইবনে ময়সরা সদফী (১৭০-২৬৪) বলেন যে, পৃথিবীর সমুদয় অধিবাসীর অর্ধেক বুদ্ধি যদি ইমাম শাফেয়ীর বুদ্ধির সহিত ওজন করা হয়, তাহা হইলে শাফেয়ীর বুদ্ধি ওজন বাড়িয়া যাইবে।১২

ইমাম আবু সত্তর ইবরাহীম বিনে খালীদ বাগদাদী (২৪০ হিঃ) বলেন যে, শাফেয়ী সুফ্যান সওরী ও ইবরাহীম নখয়ী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর ফকীহ ছিলেন।১৩

ইমাম আহমদ বিনে হাম্বল ইহাও বলিয়াছেন যে,
ما عرفت ناسخ الحديث من منسوخه حتى جالست الشافعي .
শাফেয়ীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করার পূর্বে আমি নাসিখ ও মনসুখ হাদীস চিনিতাম না।১৪ তিনি আরও বলিয়াছেন যে,
الشافعي كالشمس للدنيا وكالعافية للبدن .
দুনিয়ার পক্ষে সূর্য আর দেহের পক্ষে সুস্থ্যতা যেরূপ, বিদ্বানগণের জন্য শাফেয়ীও তদ্রূপ।

ইমাম হিলাল বিনুল উলা বিনে হিলাল আল-বাহেলী (-২৮০) বলেন যে,
أصحاب الحديث عيال على الشافعي فتح لهم الاقفال -
আহলে হাদীসরা সকলেই- ইমাম শাফেয়ীর পরিবারভুক্ত। তিনি তাঁহাদের জন্য অবরুদ্ধ তালা খুলিয়াছেন।১৫

ইমাম আবদুর রহমান আবু শামা (৫৯৬-৬৬৫) স্বীয় মু'মল গ্রন্থে লিখিয়াছেন, যে সকল মুজতাহিদ ইজতিহাদের বিদ্যা পৃথিবীর সকল প্রান্তে সম্প্রসারিত করিয়াছিলেন, তাঁহাদের মধ্যে কেহ বা কুরআনের বিদ্যায় অধিকতর পারদর্শী ছিলেন, কাহারও জ্ঞান সুন্নাতের বিদ্যায় প্রখরতর ছিল, কেহ বা আরবী সাহিত্যে অধিকতর দক্ষতা রাখিতেন আর কেহ মআলা আবিষ্কারের কার্যে কুশাগ্র বুদ্ধিসম্পন্ন ছিলেন, কিন্তু উল্লিখিত বিদ্যাগুলিতে তুল্যভাবে কোন ইমামেরই অধিকার ছিল না একমাত্র ইমাম শাফেয়ী ব্যতীত, এই সকল বিদ্যায় তিনিই সর্বাপেক্ষা সুপণ্ডিত এবং গভীরতম জ্ঞানসম্পন্ন ছিলেন।১৬

ইমামুল আয়েম্মা আবু সুলায়মান দাউদ বিনে আলী আয্যাহেরী (২০১-২৭০) বলিয়াছেন, ইনি সেই শাফেয়ী মুত্তালবী-- যিনি সূচাগ্র প্রতিভা দ্বারা মানব সমাজকে গৌরবান্বিত এবং স্বীয় বলিষ্ঠ প্রমাণ প্রয়োগ দ্বারা বিদ্বজ্জনমন্ডলীকে পরাভূত এবং স্বীয় শৌর্য দ্বারা পরাস্ত আর ধর্মপরায়ণতা এবং সাধুতা ও বংশমর্যাদা দ্বারা তাঁহাদের উপর জয়যুক্ত হইয়াছেন। স্বীয় প্রভুর গ্রন্থের ধারক এবং রাসূলের (সা) সুন্নাতের অনুসারী, বিদআতীগণের নেতৃবৃন্দের নিশ্চিহ্নকারী, তাহাদের আচরণে কালিমাসিক্তকারী এবং কুরআনে কথিত-
فأصبح هشيما تذروه الرياح .
'বাত্যাবিক্ষুব্ধ উদ্ভিদ পত্রের ন্যায় তাহাদের চূর্ণ বিচূর্ণকারী।১৭

ইমাম শাফেয়ী লিখিয়াছেন যে, ইমাম শাফেয়ীর সহিত তর্কযুদ্ধে ইমাম মুহাম্মদ বিনুল হাসানের পরাজয়ের কথা খলীফা হারুনুর রশীদ শুনিতে পাইয়া বলিয়াছিলেন যে, মুহাম্মদ বিনুল হাসান যতই বিদ্বান হউন না কেন (এই) কুরায়শী পুরুষের সহিত বিতর্কে প্রবৃত্ত হইলে তিনি মুহাম্মদ বিনুল হাসানকে অবশ্যই পরাভূত করিবেন। পুনশ্চ যখন খলীফা শুনিতে পাইলেন যে, তিনি ইমাম শাফেয়ীকে যে সহস্র সুবর্ণ মুদ্রা পুরস্কার স্বরূপ প্রদান করিয়াছিলেন শাফেয়ী তাঁর সমস্তই দীন দরিদ্রের মধ্যে বিতরণ করিয়াছেন, খলীফা তখন বলিলেন, মুত্তালিবের বংশধরগণ আভিজাত্য ও দানশীলতায় রাসূলুল্লাহর (সা) পরিবারবর্গ অপেক্ষা কোন অংশেই ভিন্ন নয়।১৮

বিখ্যাত সাধক ইমাম আবুল হাসান শাযলী মালেকীকে শায়খ শাহাবুদ্দীন ইবনুল মালীক শাফেয়ী বলিলেন যে, আমি আপনার সাহচর্য করিতে চাই কিন্তু আমার শর্ত এই যে, আমি শাফেয়ী মযহব পরিত্যাগ করিতে পারিব না। শাযলী বলিলেন, বহুত আচ্ছা! আপনি উক্ত মযহবে আরো দৃঢ় হউন, কারণ ইমাম শাফেয়ী কুতুব না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুমুখে পতিত হন নাই।১৯

স্বনামধন্য অর্থনীতিবিশারদ ইমাম আবু উবায়দ কাসিম বিনে সালাম বাগদাদী (১৫৭-২২৪) বলেন যে আমি শাফেয়ী অপেক্ষা কামিল পুরুষ আর কাহাকেও দর্শন করি নাই। পুনশ্চ বলেন যে, আমি কখনও কোন ব্যক্তিকে শাফেয়ীর ন্যায় তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন পরহেযগার, প্রাঞ্জলভাষী এবং সাহসী পুরুষ দর্শন করি নাই।২০

রিজাল ও হাদীস শাস্ত্রের জগদ্বরেণ্য ইমাম ইয়াহয়া বিনে মঈন (১৫৮-২৩৩) একদা দেখিতে পাইলেন যে, ইমাম আহমদ বিনে হাম্বল ইমাম শাফেয়ীর খচ্চরের পিছনে পিছনে পদব্রজে ইমামকে অনুসরণ করিয়া চলিতেছেন। ইবনে মঈন ইমাম আহমদকে বলিলেন, আপনার একি অবস্থা? ইমাম আহমদ বলিলেন, চুপ করিয়া থাক। যদি তুমি এই খচ্চরের অনুসরণ করিয়া চলিতে পার তাহা হইলে অনেক উপকৃত হইবে।২১

হাদীস শাস্ত্র বিশারদগণের ইমাম, ইমাম শাফেয়ীর অন্যতম উসতায আবদুর রহমান বিনে মহদী (১৩৫-১৯৮) ইমাম শাফেয়ী সম্বন্ধে বলিয়াছেন, পৃথিবীতে এই ব্যক্তির তুলনা নাই- [তহযীবুত তাহযীব, (৬) ২৭৯ পৃঃ]

ইমাম শাফেয়ী কর্তৃক বিরচিত কিতাবুর রিসালা পাঠ করিয়া ইমাম আহমদ বিনে হাম্বল বলিয়াছেন যে, আল্লাহ শাফেয়ীর মত কোন ব্যক্তিকে সৃষ্টি করিয়াছেন- আমার এরূপ ধারণা নাই।২২

ইমাম আহমদ বিনে হাম্বল আরো বলিয়াছেন যে, শাফেয়ী চারিটি বিষয়ে ডক্টর (فيلسوف) হইয়াছেন: ১। অভিধান শাস্ত্রে, ২। বিদ্বানগণের মতভেদে, ৩। অলঙ্কার বিদ্যায় এবং ৪। ফিক্হ্ন শাস্ত্রে।২৩ তিনি আরও বলিয়াছেন,
إن الله يبعث على رأس كل ماية سنة من يجدد لهذه الامة دينها -
রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস- "আল্লাহ প্রত্যেক শতাব্দীর গোঁড়ায় এমন ব্যক্তি প্রেরণ করিবেন যিনি এই উম্মতের জন্য তাহাদের ধর্মের বিপর্যস্ত অংশের সংস্কার সাধন করিবেন।" এই হাদীস সূত্রে প্রথম শতকের মুজাদ্দিদ হইতেছেন তাবেয়ী কুলাগ্রগণ্য আমীরুল মুমেনীন উমর বিনে আব্দুল আযীয (৬১-১০১) আর দ্বিতীয় শতকের মুজাদ্দিদ হইতেছেন ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস শাফেয়ী।২০

ভূবন বিখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে খল্লকান (৬০৮-৬৮১) তাঁর ইতিহাসে লিখিয়াছেন, শাফেয়ী বহু গুণসম্পন্ন, বহু গৌরবের অধিকারী, আপন যুগের অদ্বিতীয় ও অতুলনীয় মহান বিদ্বান ছিলেন। কুরআনের পাণ্ডিত্য, রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নতের প্রজ্ঞা, সাহাবাগণের সিদ্ধান্তের অভিজ্ঞতা, বিদ্বানগণের- মতভেদ সম্বন্ধে দক্ষতা, আরবদের ভাষা, অভিধান, সাহিত্য ও কবিতায় গভীর জ্ঞান তাঁর বিদ্যার সাগরে সঙ্গম লাভ করিয়াছিল।২৪

হুবহু এই ভাষাতেই ইমাম আবু মুহাম্মদ ইয়াফেয়ী (-৭৬২) তাঁর ইতিহাসেও শাফেয়ীর গুণ গাহিয়াছেন।২৫

ইমাম মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস আবু হাতিম রাযী (১৯৫-২৭৭) বলিয়াছেন যে, যদি শাফেয়ী না হইতেন তাহা হইলে আহলে হাদীসদিগকে অন্ধ হইয়া থাকিতে হইত।২৬

রাসূলুল্লাহর (সা) পরিবারবর্গের প্রতি অকৃত্রিম ও গভীর শ্রদ্ধার অপরাধে একদেশদর্শীর দল ইমাম শাফেয়ীকে রাফেযী, শিয়া প্রভৃতি আখ্যায় ভূষিত করিয়াছিলেন। এই অপরাধে অভিযুক্ত হইয়া খলীফার আদেশে যখন তিনি ধৃত হন, তখন ইমাম শাফেয়ী তাঁর স্বরচিত যে কবিতাটি পাঠ করিয়াছিলেন তাহা আমি নিম্নে উধৃত করিয়া দিতেছি।
يارا كب البيت قف بالمحصب من منى ، واهتف لساكن خيفها والناهض !
قف ثم ناد بانني لمحمد ووصيه وابنيه لست بباغض
ان كان رفضا حب آل محمد فليشهد الثقلان اني رافضي !

"হে মক্কার যাত্রী উষ্ট্র-পৃষ্ঠের সওয়ার! একবার মিনা প্রান্তরে কঙ্কর নিক্ষেপের স্থানে কিছুক্ষণের জন্য থামিও আর খীফ ও তদঞ্চলের অধিবাসীদের ডাকিয়া বলিয়ো! একটু দাঁড়াইও আর উচ্চকণ্ঠে বলিও-
আমি মুহাম্মাদের (সা) পক্ষে এবং তাঁর ওসী এবং তদীয় দুই পুত্রের পক্ষে আমি বিদ্রোহী নই, যদি মুহাম্মদের (সা) পরিবার বর্গের প্রেম রাফেযী হইবার নিদর্শন হয় তাহা হইলে মানব দানব সকলেই সাক্ষী থাকুক যে, আমি রাফেযী?

টিকাঃ
৯. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, [২] ১৪ পৃঃ।
১০. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, ১৫ পৃঃ।
১১. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, [২] ১৬ পৃঃ।
১২. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, (২) ১৭ পৃঃ。
১৩. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, [২] ১৭ পৃঃ।
১৪. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, (২) ১৭ পৃঃ।
১৫. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, [২] ১৭ পৃঃ।
১৬. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, (২) ১৭ পৃঃ।
১৭. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, [২] ১৪ পৃঃ।
১৮. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, ১৫ পৃঃ।
১৯. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, [২] ১৬ পৃঃ।
২০. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, (২) ১৭ পৃঃ。
২১. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, [২] ১৭ পৃঃ।
২২. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, [২] ১৭ পৃঃ।
২৩. ইয়াফেয়ী: মিরআতুল জেনান, [২] ১৭ পৃঃ।
২৪. ইবনে খল্লকান, (২) ৪৪৭ পৃঃ।
২৫. মিরআতুল জেনান, [২] ১৬ পৃঃ।
২৬. মিরআতুল জেনান, [২] ১৯ পৃঃ।

📘 ফিরকাবন্দি বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি 📄 জীবন সন্ধ্যা

📄 জীবন সন্ধ্যা


ইমাম শাফেয়ী তাঁর জীবনের শেষ পাঁচ বৎসর মিসরে অতিবাহিত করিয়াছিলেন তাঁর বিদ্যাবত্তা ও জ্ঞান গরীমার যশঃসৌরভে তাঁর জীবদ্দশাতেই ইসলাম জগতের সকল প্রান্তে আমোদিত হইয়া উঠিয়াছিল। হানাফী ও মালিকী বিদ্বানগণের ইমামগণ দলে দলে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করিয়া ধন্য হইতেছিলেন। ১৯৫ হিজরী পর্যন্ত ইমাম শাফেয়ী ইমাম মালিকের মযহব অনুসরণ করিয়া চলিতেন এবং মালিকী বিবেচিত হইতেন। কিন্তু যখন তিনি জানিতে পারিলেন যে, ইসলাম জগতের কতিপয় অঞ্চলে ইমাম মালিকের পূজা আরম্ভ হইয়া গিয়াছে এবং এই পূজা এরূপ উৎকট আকার ধারণ করিয়াছে যে, কতক স্থানে ইমাম মালিকের উক্তি রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস অপেক্ষাও অগ্রগণ্য বিবেচিত হইতেছে, তখন ইমাম শাফেয়ী রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি তাঁর অন্তরে যে অনাবিল শ্রদ্ধা পোষণ করিতেন, তাহার বশবর্তী হইয়া রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসের সমর্থন ও সাহায্য কল্পে দণ্ডায়মান হইলেন- এবং ইহারই ফলে তিনি অতঃপর স্বাধীন ও স্বতন্ত্র শাফেয়ী মযহবের প্রাণ-প্রতিষ্ঠাতা হইয়াছিলেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px