📘 ফিরকাবন্দি বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি 📄 গ্রন্থ পরিচয়

📄 গ্রন্থ পরিচয়


মুল্লা আলী কারী হানাফী মিরকাত নামক মিশকাতের ভাষ্য গ্রন্থে লিখিয়াছেন যে, ইমাম শাফেয়ী বিভিন্ন শাস্ত্রে একশত তের খানা গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন। ইবনে যুলাক বলেন যে, ইমাম শাফেয়ী ইসলামের মূলনীতি (অসূলে দ্বীন) সম্পর্কে চৌদ্দ খণ্ড আর ব্যবহারিক ফিকহে শতাধিক খণ্ড পুস্তক রচনা করিয়াছিলেন। ইমাম শাফেয়ীর ভুবন বিখ্যাত কিতাবুল উম নামক পুস্তকসহ যে সকল গ্রন্থ মিসরের বুলাকে মুদ্রিত হইয়াছে এবং যে গুলির নাম হাফিয ইবনে হজর আসকালানী ইমাম শাফেয়ীর জীবনীতে উল্লেখ করিয়াছেন তন্মধ্যে নিম্নলিখিত গ্রন্থগুলি সমধিক উল্লেখযোগ্য:

আহকামুল কুরআন, মুসনদে ইমাম শাফেয়ী, ইখতিলাফুল হাদীস, জুম্মাউল ইলম, ইবতালুল ইসতিহসান, কিতাব সিয়ারুল আওযায়ী, কিতাব আরাদ্দো আ'লা মুহাম্মদ বিনিল হাসান, কিতাব ইখতিলাফ আবু হানীফা ওয়া ইবনো আবি লাইলা, কিতাব ইখতিলাফ মালিক ওয়াশ শাফেয়ী, কিতাব ইখতিলাফ আলী ওয়া ইবনে মসউদ, কিতাব সিয়ারুল ওয়াকেদী, কিতাবুল উম, কিতাবুল কুরআ, কিতাবুর রিসালা, রিসালা কাদীমা, রিসালা জাদীদা, কিতাবুসসুনন ও কিতাবুল মাবসূত।

কিতাবুল-উম্
সমুদয় গ্রন্থের মধ্যে ইমাম শাফেয়ীর শাহকার (Masterpiece) হইতেছে তাঁর কিতাবুল উম্। এই গ্রন্থখানা রচনা করার জন্য তিনি চারি বৎসর কাল পরিশ্রম করিয়াছিলেন। ইমাম সাহেবের অপ্রতিদ্বন্দী বিদ্যাবত্তা ও কুশাগ্র প্রজ্ঞার বহুল পরিচয় এই গ্রন্থের পৃষ্ঠায় বিদ্যমান রহিয়াছে। বহু বিদ্বান ব্যক্তি এই অমূল্য গ্রন্থকে আশ্রয় করিয়া ইজতিহাদের আসনে সমারূঢ় হইয়াছেন। তিন হাজারেরও অধিক পৃষ্ঠায় এই গ্রন্থখানা সম্পূর্ণ হইয়াছে।

সিয়ারুল আওযায়ী
ইমাম আবদুর রহমান বিনে আম্ম আল্ আওযায়ী ৮৮ হিযরীতে জন্ম গ্রহণ করিয়া ইমাম আবু হানীফার (রহ) সাত বৎসর পর পরলোকপ্রাপ্ত হন। সিরিয়া ও স্পেনে তাঁরই ফিকহ প্রচলিত ছিল। তিনি সত্তর হাজার জিজ্ঞাসার উত্তর একক ভাবে প্রণয়ন করিয়াছিলেন এবং স্বয়ং একটি স্বতন্ত্র মযহবের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তিনি ইমাম আযম আবু হানীফার অনেকগুলি সিদ্ধান্তের খণ্ডন লিপিবদ্ধ করিয়াছিলেন। ইমামে আযমের প্রিয় ছাত্র ইমাম মুহাম্মদ বিনুল হাসান ইমাম আওযারীর খণ্ডনগুলির প্রতিবাদ লিখিয়াছিলেন। ইমাম শাফেয়ী যে গ্রন্থে ইমাম মুহাম্মদের উপরিউক্ত প্রতিবাদের সমুচিত জওয়াব লিখিয়াছিলেন এবং ইমাম আওযায়ীর সমর্থন করিয়াছিলেন তাহার নাম সিয়ারুল আওযায়ী।

ইখতিলাফে মালিক
ইমাম শাফেয়ী শুধু ইমাম আবু হানীফার (রহ) মত খন্ডন করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই। তিনি স্বীয় উসতায ইমাম মালিক বিনে আনাসের সঙ্গেও মতভেদ করিয়াছেন এবং প্রমাণিত করিয়াছেন যে, ইমাম মালিক আপন যুগের অদ্বিতীয় মহা মনীষী হইলেও অভ্রান্ত নহেন। ইমাম শাফেয়ী এই গ্রন্থের সূচনায় এই সূত্রটি নির্দেশিত করেন যে, একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি অপর বিশ্বস্তের নিকট হইতে সংলগ্ন রেওয়ায়তের সাহায্যে যদি রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস রেওয়ায়ত করেন তাহা হইলে উহাকে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস বলিয়া অবশ্যই গ্রাহ্য করিতে হইবে এবং রসূলুল্লাহর (সা) কোন প্রমাণিত হাদীস- উহার বিরুদ্ধে অপর কোন হাদীস না পাওয়া পর্যন্ত কিছুতেই পরিত্যাগ করা যাইতে পারিবে না। বিরোধের অবস্থায় একটি হাদীস যদি অপরটির সংশোধক বলিয়া বুঝিতে পারা যায় তাহা হইলে সংশোধক হাদীসটির অনুসরণ এবং অন্যটিকে বর্জন করা হইবে। আর যদি একটিকে অপরটির সংশোধক বলিয়া না বুঝা যায় তাহা হইলে যে হাদীসের রেওয়ায়ত প্রামাণিকতার দিক দিয়া অধিকতর বিশুদ্ধ হইবে সেইটির অনুসরণ করিতে হইবে। আর উভয়-হাদীসই যদি তুল্যভাবে প্রমাণিত হইয়া থাকে, তাহা হইলে যে হাদীসটির সমর্থন কুরআনে অথবা অন্য কোন সহীহ হাদীসে পাওয়া যাইবে তাহাই অনুসরণযোগ্য বিবেচিত হইবে। আর যদি সাহাবা বা তাবেয়ীগণের কোন সিদ্ধান্ত রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসের প্রতিকূল দেখিতে পাওয়া যায় তাহা হইলে সকল অবস্থায় রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসকেই অগ্রগণ্য এবং বিরুদ্ধ সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ ভাবে উপেক্ষা করিতে হইবে। [কিতাবুল উম (৭) ১৭৭ পৃষ্ঠা]।।

এই সূত্র স্থিরীকৃত করার পর ইমাম শাফেয়ী লিখিয়াছেন যে, ইমাম মালিক কতিপয় মসআলায় উপরিউক্ত নিয়মের অনুসরণ করিয়াছেন এবং কতকগুলি ব্যাপারে এই নিয়ম লঙ্ঘন করিয়াছেন। যে সকল মসআলায় ইমাম মালিক শুধু একজন সাহাবা বা তাবেয়ী অথবা শুধু নিজের ব্যক্তিগত কিয়াসের অনুসরণ করিয়া বিশুদ্ধ হাদীস বর্জন করিয়াছেন এবং স্বীয় অভিমতের পোষকতায় অলীক ইজমার দাবী করিয়াছেন, অতঃপর ইমাম শাফেয়ী এই গ্রন্থে ইমাম মালিকের সেই সকল মসআলার অবতারণা করিয়াছেন। ইমাম শাফেয়ী স্বীয় উসতায ইমাম মালিকের প্রতিবাদে লেখনী ধারণ করিলেন কেন, তাহার কথঞ্চিৎ আলোচনা আমরা ইতিপূর্বে করিয়াছি। এ সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ী স্বয়ং যাহা বলিয়াছেন এবং হাফিয ইবনে হজর যাহা উধৃত করিয়াছেন তাহাই যথেষ্ট বলিয়া আমরা বিবেচনা করিতে পারি। ইমাম সাহেব বলিয়াছেন,
إِن مالكا بشر يُخطئ ولا أخالف إلا من خالف سنة رسول - الله صلى الله عليه وسلم -
"ইমাম মালিক শেষ পর্যন্ত মানুষই ছিলেন। কাজেই তাঁরও ভুল ভ্রান্তি ঘটিত এবং যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাতের বিরোধ করিয়াছে আমি শুধু তাহারই বিরোধ করিয়া থাকি। [তওয়ালি উত্তাসীস]।"

ইখতিলাফ মুহাম্মদ বিনুল হাসান
এই গ্রন্থে ইমাম শাফেয়ী স্বীয় উসতায-ভ্রাতা এবং উসতায ইমাম মুহাম্মদ বিনুল হাসানের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের খন্ডন করিয়াছেন। ইমাম মুহাম্মদ স্বীয় উসতায আবু হানীফার সমর্থনে সর্বদা মদীনার ইমাম মালিক বিনে আনসের প্রতিবাদে ব্যাপৃত থাকিতেন। ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী মনাকীব গ্রন্থে লিখিয়াছেন যে, ইমাম শাফেয়ী স্বয়ং বলিয়াছেন, আমি ৬০ সুবর্ণ মুদ্রা ব্যয় করিয়া ইমাম মুহাম্মদের গ্রন্থগুলি ক্রয় করিয়াছিলাম এবং বিশেষ মনোযোগ সহকারে সেগুলি পাঠ করার পর তাঁর ভ্রান্তিসমূহ প্রতিপন্ন করিয়াছিলাম।

ইখতিলাফুল হাদীস
এই গ্রন্থে বিভিন্ন হাদীসমূহের মধ্যে সমন্বয় সাধনের নিয়ম লিপিবদ্ধ রহিয়াছে।

ইবতালুল ইসতিহসান
কুরআন, সুন্নাত ও ইজমা বিরোধী অভিমতের খণ্ডন।

কিতাবুরিসালা
স্বনামধন্য আহলে হাদীস ইমাম আব্দুর রহমান বিনে মাহদী ইমাম শাফেয়ী অপেক্ষা পনের বৎসরের বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু তাহা স্বত্বেও তিনি ইমাম শাফেয়ীকে কুরআন ও হাদীস এবং ইজমা ও কিয়াসের সাহায্যে কিভাবে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করিতে হয়, তাহার নিয়ম এবং নাসিখ ও মসুখ এবং অমুম ও খসূসের পরিচয় লিপিবদ্ধ করার জন্য অনুরোধ করিয়াছিলেন। তাঁরই অনুরোধক্রমে ইমাম সাহেব এই সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ রচনা করেন। আল্লামা আবুল কাসিম আনন্মাতী বলেন যে, "ইমাম শাফেয়ীর এই অমূল্য গ্রন্থখানা আমি পঞ্চাশ বৎসর ধরিয়া বারংবার পাঠ করিয়াছি এবং যতবার অভিনিবেশ সহকারে পাঠ করিয়াছি তত বারই উহার মধ্যে নূতন তথ্য আবিষ্কার করিতে সমর্থ হইয়াছি।"

এই দীন লেখকের অশেষ সৌভাগ্য যে, সে উল্লিখিত গ্রন্থসমূহের সন্দর্শন এবং পঠনের সুযোগ লাভ করিয়াছে এবং এই গ্রন্থগুলি তাহার পুস্তকাগারে সংরক্ষিত রহিয়াছে। ইমাম সাহেবের অন্যান্য গ্রন্থগুলি মুদ্রিত হইয়াছে কিনা, আমি তাহা অবগত নই-এমন কি তন্মধ্যে যেগুলি পৃথিবীর পৃষ্ঠ হইতে নিশ্চিহ্ন হইয়া গিয়াছে সেগুলির সংবাদ সরবরাহ করাও আমার পক্ষে সম্ভবপর হয় নাই।

📘 ফিরকাবন্দি বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি 📄 ইমাম শাফেয়ীর মযহব ও উক্তি

📄 ইমাম শাফেয়ীর মযহব ও উক্তি


(ক) ইমাম সাহেবের অন্যতম বিশিষ্ট ছাত্র বুওয়ায়তী তাঁর উসতাযের এই উক্তি বর্ণনা করিয়াছেন। ইমাম সাহেব বলিয়াছেন,
عليكم بأصحاب الحديث، فإنهم أكثر صوابا من غيرهم، وقال : إذا رأيت رجلا من أصحاب الحديث، فكأنما رأيت رجلا من أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم ! جزاهم الله خيرا، هم حفظوا لنا الأصل، فلهم علينا الفضل -
তোমরা আহলে হাদীসগণের দলভুক্ত থাকিও, কারণ তাঁহারা অন্যান্য দল অপেক্ষা অধিকতর সঠিক পথের পথিক। ইমাম সাহেব আরও বলিয়াছেন যে, কোন আহলে হাদীস বিদ্বানের সন্দর্শন লাভ রাসূলুল্লাহর (সা) সহচরবৃন্দের সন্দর্শন লাভের তুল্য। আল্লাহ তাহাদিগকে উত্তম পুরস্কার দান করুন! তাঁরাই আমাদের জন্য ধর্মের মূল বস্তু রক্ষা করিয়াছেন এবং এই জন্যই তাঁহারা আমাদের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর- [তিওয়ালি-উত্তাসীস, ৬৪ পৃঃ (বুলাক)]

(খ) ইমাম শা'রানী ও ভারত গুরু শাহ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী স্ব স্ব গ্রন্থে উধৃত করিয়াছেন যে, একদা ইমাম শাফেয়ী তদীয় ছাত্র ইমাম মুযানীকে বলিলেন,
يا ابراهيم ، لا تقلدني في كل ما أقول وانظر في ذلك لنفسك فانه دين -
দেখ ইবরাহীম, আমার প্রত্যেকটি কথার তুমি অন্ধভাবে অনুসরণ (তক্লীদ) করিও না। তুমি নিজেও বিবেচনা করিয়া দেখিবে, কারণ ইহা দীনের ব্যাপার।

(গ) তাঁহারা ইমাম শাফেয়ীর একথাও উধৃত করিয়াছেন যে,
لا حجة في قول أحد دون رسول الله صلى الله عليه وسلم وان كثروا، لا في قياس ولا في شئى -
রাসূলুল্লাহ (সা) ব্যতীত কাহারও কথাই দলীল নয়। তাঁদের সংখ্যা অধিক হইলেও নয়। কিয়াস অথবা অন্য কোন বিষয়েও নয়- [হিয়াওয়াকীৎ ওয়াল জওয়াহির (২) ২৪৩ পৃঃ, হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা: ১৬৩ পৃ, ইকদুল জীদ, ৮১ পৃঃ]।।

(ঘ) ইমাম সাহেব আরও বলিয়াছেন,
انظروا في أمر دينكم ، فإن التقليد المحض مذموم وفيه عمى للبصيرة، وكان يقول أيضا : قبيح على من أعطى شمعة ليستضنى بها أن يطفئها ويمشى في الظلام -
তোমরা তোমাদের দীনের ব্যাপার স্বয়ং বিবেচনা করিয়া দেখিও, কারণ শুধু তকলীদ অর্থাৎ, অন্ধ অনুসরণ দুষণীয় ব্যাপার, ইহা জ্ঞানের অন্ধত্ব। যাহাকে আলোর জন্য বাতি দেওয়া হইয়াছে, তাহার পক্ষে উক্ত বাতি নির্বাপিত করিয়া অন্ধকারে চলা অত্যন্ত নিন্দনীয়- [মিনহাজুল মুবীন (আমল বিল হাদীস, মহদী আলী ৮৩ পৃ.)]।।

(ঙ) ইমাম বয়হকী শাফেয়ীর প্রমুখাত তাঁর এই উক্তি বর্ণনা করিয়াছেন যে,
مَّثَلُ الَّذِى يَطْلُبُ الْعِلْمَ بِلَا حُجَّةٍ كَمَثَلِ حَاطِبِ لَّيْلٍ ، يَحْمِلُ حُزْمَةَ حَطَبٍ وَفِيْهِ افْعًى تَلْدَغُهٗ وَهُوَ لَا يَدْرِى -
প্রমাণবিহীন অভিজ্ঞতা যে অর্জন করিতে চায় তাহার অবস্থা অন্ধকারে জ্বালানী কাষ্ঠ সংগ্রহকারীর ন্যায়। খড়ির বোঝা সে বহন করিয়া চলিয়াছে, আর তাহার মধ্য হইতে একটি সাপ তাহাকে দংশন করিয়াছে, অথচ সে সাপের কথা কিছুই জানে না- [ই'লামুল মুয়াক্কেয়ীন (২) ৩০১ ও ৩০৯ পৃ]।।

(চ) শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়াহ ইমাম সাহেবের উক্তি উধৃত করিয়াছেন যে,
اِذَا رَايْتَ الْحُجَّةَ مَوْضُوْعَةً عَلَى الطَّرِيْقِ، فَهُوَ قَوْلِى !
প্রমাণ যদি পথে কুড়াইয়া পাও, উহাকেই আমার সিদ্ধান্ত বলিয়া জানিবে- [ফতাওয়া (২) ৩৮৪ পৃঃ]।।

(ছ) ইমাম মুযানী তদীয় মুগ্ধসর নামক ফিকহ গ্রন্থের সূচনায় লিখিয়াছেন যে,
اخْتَصَرْتُ هٰذَا الْكِتَابَ مِنْ عِلْمِ مُحَمَّدِ بْنِ اِدْرِيْسَ الشَّافِعِيّ (رح) وَمِنْ مَّعْنَى قَوْلِه لَا قُرْبَةَ عَلَى مَنْ أَرَادَهٗ مَعَ أَعْلَامِيَّةِ نَهْيِه عَنْ تَقْلِيْدِه وَتَقْلِيْدِ غَيْرِهٖ يَنْظُرُ فِيْهِ لِدِيْنِهٖ وَ يَحْتَاطُ فِيْهِ لِنَفْسِهٖ !
আমি মুহাম্মদ বিনে ইদরীস শাফেয়ী রাহেমাহুল্লাহর মযহবের সার সংকলন এই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করিলাম, যাহাতে এই বিদ্যা যাহারা আয়ত্ব করিতে চাহেন তাঁহাদের পক্ষে ইহা সহজসাধ্য হয়।
ইমাম সাহেবের এই ঘোষণাও আমি প্রচার করিতেছি যে, তিনি তাঁর নিজের এবং অপর বিদ্বানের তকলীদ করিতে নিষেধ করিয়া গিয়াছেন এবং নিজের দীনের ব্যাপারে স্বয়ং বিবেচনা করিয়া দেখিতে এবং সতর্ক হইয়া চলিতে উপদেশ দিয়াছেন- [মুগ্ধসর মুযানী (১) ১ম পৃঃ (কিতাবুল উম্ সহ-বুলাক প্রেসে মুদ্রিত)]।।

(জ) ইমাম সাহেবের অন্যতম ছাত্র হরমলা তুজীবী বলেন,
كل ماقلت وكان قول رسول الله صلى الله عليه وسلم خلاف قولى مما يصح، فحديث النبى صلى الله عليه وسلم أولى ولا تقلدوني -
শাফেয়ী বলিয়াছেন, আমার কোন উক্তি যদি রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশের প্রতিকূল দেখিতে পাও, তাহা হইলে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস অনুসরণীয় হইবে। তোমরা আমার উক্তির তকলীদ করিবে না- [আবু শামামুমেল-৩৮ পৃ]।।

(ঝ) হুসাইন করাবিছীকে একদা ইমাম শাফেয়ী বলিলেন যে,
ان أصبتم الحجة في الطريق مطروحة، فاحكم بها عنى فاني القائل بها -
যাহা প্রকৃত দলীল, তাহাকে যদি তোমরা পথের মাঝখানে পরিত্যক্ত অবস্থায় দেখিতে পাও, তাহা হইলে আমার নামে তোমরা তদনুসারেই ব্যবস্থা দিও। আমি উহার কথক। [ঐ]

(ঞ) ইমাম শাফেয়ী স্বীয় কিতাবুল উম্ নামক গ্রন্থে বলিয়াছেন,
إنه ليس لأحد دون رسول الله صلى الله عليه وسلم أن يقول إلا بالإستدلال -
রাসূলুল্লাহ (সা) ব্যতীত অন্য কোন বিদ্বানের পক্ষে প্রমাণ প্রয়োগ ছাড়া কোন কথা বলা বৈধ নয়- [রশীদ রিযা, মুহাবিরাৎ, ১০৭ পৃঃ]।।

(ট) একদা তিনি স্বীয় ছাত্র রুবাইয়অকে বলিলেন,
يا أبا اسحق ، لا تقلدني في كل ما أقول، وانظر في ذلك لنفسك فإنه دين -
ওগো ইসহাকের পিতা, আমার প্রত্যেকটি কথার তকলীদ করিও না, তুমি নিজেও বিবেচনা করিয়া দেখ। কারণ ইহা দীনের ব্যাপার- [মীযানুল কুরা (১) ৬৩ পৃ]।।

(ঠ) ইমাম সাহেব স্বীয় গ্রন্থ- রিসালায় লিখিয়াছেন,
ولم يجعل الله لأحد بعد رسول الله صلى الله عليه وسلم أن يقول إلا من جهة علم مضى قبله ومن جهة العلم بعد الكتاب فالسنة فالاجماع والآثار ثم ما وصفت من القياس عليها وهو غير الإستحسان -
রাসূলুল্লাহ (সা) ব্যতীত পূর্ববর্তী বিদ্যার আশ্রয় না লইয়া অথবা কুরআনের পর সুন্নাত এবং অতঃপর ইজমা ও আসারের সাহায্য বর্জন করিয়া কোন ব্যক্তিকে কথা বলার অধিকার আল্লাহ প্রদান করেন নাই। এইগুলির পর হইতেছে আমি যে কিয়াসের কথা বলিয়াছি উহার স্থান এবং উহা ইস্তিহসান নয়- [কিতাবুর রিসালা, ১৩৫ পৃঃ]।।

(ড) খতীব বাদগাদী ইমাম শাফেয়ীর নিম্নলিখিত উক্তি উধৃত করিয়াছেন:
لا يحل لأحد أن يفتى فى دين الله إلا رجلا عارفا بكتاب الله بناسخه و منسوخه ومحكمه ومتشابهه وتأويله وتنزيله ومكيه ومدنيه وما أريدبه ويكون بعد ذلك بصيرا بحديث رسول الله صلى الله عليه وسلم وبالناسخ والمنسوخ ويعرف من الحديث مثل ما عرف من القرآن ويكون بصيرا باللغة بصيرا بالشعر وما يحتاج إليه للسنة والقرآن ويستعمل هذا مع الأنصاف ويكون بعد هذا مشرفا على اختلاف أهل الأمصار وتكون له قريحة بعد هذا، فإذا كان هكذا فله أن يتكلم ويفتى فى الحلال والحرام .
যে ব্যক্তি আল্লাহর গ্রন্থের বিদ্যায় উহার সংশোধক ও সংশোধিত, সুস্পষ্ট ও অস্পষ্ট অংশের, উহার ব্যাখ্যা এবং অবতরণ, উহার মক্কী এবং মদনী আয়ত সমূহের এবং উহার তাৎপর্যের পাণ্ডিত্য অর্জন করে নাই এবং রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস সম্পর্কেও উহার নাসিখ্ ও মনসুখ এবং কুরআনের মত হাদীস সম্পর্কিত অন্যান্য বিদ্যাসমূহে অভিজ্ঞতা অর্জন করে নাই এবং অভিধান ও কাব্যে কুরআন ও হাদীস হৃদয়ঙ্গম করার উপযোগী এবং ন্যায়পরায়ণতার সহিত উহা প্রয়োগ করার মত বুৎপত্তি লাভ করে নাই এবং এই সমস্তের পর বিভিন্ন নগর সমূহের বিদ্বানগণের মতভেদ অবগত হয় নাই এবং গবেষণা কার্য্যের প্রকৃতিগত যোগ্যতা যাহার ভিতর নাই, এরূপ- ব্যক্তির পক্ষে আল্লাহর দীন সম্পর্কিত ব্যাপারে নিষ্পত্তি করা বৈধ হইবে না। এই সকল বিদ্যায় যে ব্যক্তি পারদর্শী, কেবল তাঁরই পক্ষে হালাল ও হারাম সম্বন্ধে ফতওয়া দান করা বিধেয় হইবে- [ই'লামুল মুওয়াক্কেয়ীন, (১) ৫২ পৃঃ]।।

(ঢ) বয়হকী ইমাম আহমদ বিনে হাম্বলের মধ্যস্থতায় ইমাম শাফেয়ীর উক্তি উধৃত করিয়াছেন যে,
القياس عند الضرورة ومع ذلك فليس العامل برأيه على ثقة من أنه وقع على المراد من الحكم فى نفس الأمر وإنما عليه بذل الوسع في الاجتهاد يوجر ولو أخطأ .
শুধু বিশেষ প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রেই কিয়াসের আশ্রয় লইতে হয় কিন্তু ইহা সত্বেও কিয়াসকারীর পক্ষে ইহা বলা সম্ভবপর নয় যে, সে যে সিদ্ধান্তে উপস্থিত হইয়াছে তাহা প্রকৃতপক্ষে বাস্তব ও অভ্রান্ত। তাঁর পক্ষে শুধু গবেষণার জন্য সকল শক্তি প্রয়োগ ছাড়া অন্য পন্থা নাই এবং এই গবেষণাকার্যে তাহার ভ্রান্তি ঘটিলেও সে পুরস্কৃত হইবে- [ফতহুল বারী (১৩)-২৪৫ পৃ।]।।

(ণ) রুবাইয়া বিনে সুলায়মান বলিতেছেন,-একদা জনৈক ব্যক্তি ইমাম শাফেয়ীকে একটি মসআলা জিজ্ঞাসা করিল, আমিও তথায় উপস্থিত থাকিয়া শ্রবণ করিতেছিলাম। জিজ্ঞাসাকারীর জওয়াবে ইমাম শাফেয়ী বলিলেন, এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সা) এই নির্দেশ বর্ণিত হইয়াছে। জিজ্ঞাসাকারী পুনরায় বলিল, আপনার ফতওয়াও কি ইহাই?
فار تعد الشافعي واصفر وحال لونه ، وقال : ويحك وأى أرض ثقلني وأى سماء تظلنى إذا رويت لرسول الله صلى الله عليه وسلم شيئا ولم اقل به ؟ نعم على الرأس والعين !
"জিজ্ঞাসাকারীর এই কথা শ্রবণ করিয়া ইমাম শাফেয়ী চমকিয়া উঠিলেন এবং বিবর্ণ হইলেন। মনে হইল যেন তাঁর দেহের রক্ত শুকাইয়া গিয়াছে। ইমাম সাহেব বলিয়া উঠিলেন, ওরে হতভাগা আমি রাসূলুল্লাহর (সা) কোন হাদীস বর্ণনা করার পর যদি তদনুসারে ফতওয়া না দেই, তাহা হইলে কোন্ মাটি আমার ভার বহন এবং কোন্ আকাশ আমাকে আচ্ছাদিত করিবে? হাঁ! হাঁ! রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস আমার মস্তক ও চক্ষুর উপর, উহাই আমার মযহব।" [ইকাযুল হিমম, ১০০ পৃঃ]।।

(ত) ইমাম সাহেবের উল্লিখিত ছাত্র ইমাম রুবাইয়া বিনে সুলায়মান বলেন যে, আমি একদা ইমাম শাফেয়ীকে এই কথা বলিতে শুনিলাম যে,
إذا وجدتم في كتابى خلاف سنة رسول الله صلى الله عليه وسلم فقولوا بسنة رسول الله صلى الله عليه وسلم ودعوا ماقلت !
তোমরা আমার গ্রন্থে যদি কোন কথা রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাতের প্রতিকূল দেখিতে পাও, তাহা হইলে রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাত অনুসারে ব্যবস্থা প্রদান করিও এবং আমার ফতওয়া প্রত্যাখ্যান করিও-- [ঐ, ঐ]

(থ) ইমাম হুমায়দী বলেন যে, জনৈক ব্যক্তি ইমাম শাফেয়ীকে একটি মস্আলা জিজ্ঞাসা করিল, তদুত্তরে ইমাম সাহেব রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস পাঠ করিলেন। লোকটি বলিল,
أتقول بهذا يا أبا عبد الله ؟ فقال الشافعي : أرأيت في وسطى زنارا؟ أتر اني خرجت من الكناسة؟ أقول : قال النبي صلى الله عليه وسلم وتقول لي : أتقول بهذا ؟ أروى عن النبي صلى الله عليه وسلم ولا أقول به ؟
এ বিষয়ে আপনার অভিমত কি? ইমাম শাফেয়ী বলিলেন, তুমি কি আমার কোমরে পৈতা দেখিয়াছ? তুমি কি আমাকে কোন গির্জা হইতে বাহিরে আসিতে দেখিয়াছ? আমি বলিতেছি: রাসূলুল্লাহ (সা) এরূপ বলিয়াছেন, আর তুমি জিজ্ঞাসা করিতেছ এ বিষয়ে আমার অভিমত কি? তুমি কি মনে কর আমি রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস রেওয়ায়ত করিব অথচ আমার অভিমত উহার প্রতিকূল হইবে? [ঐ ১০৪ পৃঃ]

(দ) রুবাইয়া ইমাম শাফেয়ীকে বলিতে শুনিলেন যে,
كل مسألة صح فيها الخبر عن رسول الله صلى الله عليه وسلم عند أهل النقل بخلاف ما قلت فأنا راجع عنها في حياتي وبعد موتى -
যে কোন মআলায় রাসূলুল্লাহর (সা) সহীহ হাদীস প্রমাণিত হইবে সেই সকল হাদীসের পরিপন্থী আমার সমুদয় উক্তিকে আমি আমার জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর প্রত্যাহার করিয়া লইতেছি- [ঐ ১০৪ পৃঃ]

(ধ) ইমামুল আয়েম্মা শাফেয়ী স্বীয় গ্রন্থে লিখিয়াছেন,
وقد سن رسول الله صلى الله عليه وسلم مع كتاب الله ، وسن فيما ليس فيه بعينه نص كتاب، وكل ماسن فقد الزمنا الله اتباعه وجعل في اتباعه طاعته وفى العنود عن اتباعه معصية التي لم يعذبها خلفاء ولم يجعل له من اتباع سنن رسول الله صلى الله عيه وسلم مخرجا لما وصفت -
রাসূলুল্লাহ (সা) কুরআনের সংগে সংগে অনেকগুলি বিষয় প্রবর্তিত করিয়াছেন। তাঁর প্রবর্তিত নির্দেশ সমূহের মধ্যে এমন কতকগুলি বিষয় রহিয়াছে, যেগুলি স্পষ্টভাবে কুরআনে উল্লিখিত হয় নাই এবং যাহাই রাসূলুল্লাহ (সা) প্রবর্তিত করিয়াছেন- আল্লাহ আমাদের জন্য সেগুলি অবশ্য প্রতিপালনীয় বলিয়া স্থিরীকৃত করিয়াছেন এবং রাসূলুল্লাহর (সা) আদেশের অনুসরণ কার্যকে আল্লাহ তাঁর আনুগত্য এবং রাসূলুল্লাহ (সা) অনুসরণের অবাধ্যতাকে আল্লাহ স্বীয় বিদ্রোহ ও পাপ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন এবং এই অবাধ্যতার জন্য মানুষের কোন আপত্তিই তিনি গ্রাহ্য করেন নাই এবং রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাতের অনুসরণ হইতে মুক্ত হওয়ার কোন উপায়ই আল্লাহ রাখেন নাই- [কিতাবুর রিসালা, ২৭ পৃঃ]।।

হাফিয ইবনে হযর তাওয়ালি-উত্তাসীস গ্রন্থে, হাফিয ইবনুল কাইয়েম ই'লামুল মুয়াক্কেয়ীন গ্রন্থে, শাহ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দিস হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা গ্রন্থে এবং আল্লামা ফুল্লানী ঈকাযুল হিমম পুস্তকে ইমাম শাফেয়ী রাহেমাহুল্লাহর এই বহু বিখ্যাত ও সুপ্রসিদ্ধ উক্তি উধৃত করিয়াছেন যে, ইমাম সাহেব প্রায়শঃ বলিতেন,
إذا صح الحديث فهو مذهبى وإذا رايتم كلامي يخالف الحديث فاعملوا بالحديث واضربوا بكلامي الحائط -
হাদীস বিশুদ্ধ প্রতিপন্ন হইলেই উহা আমার মযহব এবং তোমরা যদি আমার কোন উক্তি হাদীসের খেলাপ দেখিতে পাও, তাহা হইলে হাদীসের অনুসরণ করিও এবং আমার উক্তি প্রাচীরের বাহিরে ফেলিয়া দিও- [হুজ্জাতুল্লাহ (১) ১৬৩ পৃঃ; ঈকায-১০৭ পৃঃ]।

📘 ফিরকাবন্দি বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি 📄 ইমাম শাফেয়ীর মযহব ও অভিমত

📄 ইমাম শাফেয়ীর মযহব ও অভিমত


(ন) রুবাইয়া বলেন যে, একদা ইমাম শাফেয়ী বলিলেন, এমন কোন ব্যক্তি যাহার বিদ্যার সহিত সম্পর্ক রহিয়াছে অথবা জনগণ যাহাকে বিদ্বজ্জনমণ্ডলীর পর্যায়ভুক্ত করিয়াছে অথবা যিনি স্বয়ং নিজেকে বিদ্বানগণের অন্তর্ভুক্ত করিয়াছেন, তিনি কখনও এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন নাই যে, আল্লাহ তদীয় রাসূলের (সা) আদেশ অনুসরণ করা এবং তাঁর শাসন মান্য করা ফরয করিয়াছেন, কারণ- রাসূলুল্লাহর (সা) পর এমন কোন ব্যক্তি পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন নাই যিনি রাসূলুল্লাহর (সা) অনুসরণ করিতে আদিষ্ট হন নাই এবং আল্লাহর গ্রন্থ এবং রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নত ছাড়া কোন ব্যক্তির উক্তিই অবশ্য প্রতিপালনীয় বলিয়া নির্দেশিত হয় নাই। সমস্ত কথাকেই কুরআন ও সুন্নাতের অধীনস্ত বিবেচনা করিতে হইবে। আল্লাহ আমাদের প্রতি এবং আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তীগণের প্রতি রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস গ্রহণ করা ফরয করিয়াছেন। মাত্র একটি দল এই ব্যবস্থার অন্যথাচরণ করিয়া থাকে। রাসূলুল্লাহর (সা) যে হাদীস দুই একজন মাত্র রাবীর প্রমুখাৎ বর্ণিত হইয়াছে তাহার প্রামাণিকতা সম্পর্কে আহলে কালামের দল বিভিন্ন মতে বিভক্ত হইয়া পড়িয়াছেন। এই ভাবে জনগণ যাহাদের ফকীহ বলিয়া মানিয়া লইয়াছেন তাঁহাদের মধ্যেও মতভেদ সৃষ্টি হইয়াছে। ইহাদেরই কেহ কেহ সত্যানুসন্ধিৎসার পথ পরিহার করিয়া গতানুগতিকতা (তকলীদ) বিভ্রান্তি প্রাধান্যস্পৃহার পথ গ্রহণ করিয়াছেন।

(প) ইমাম আহমদ বিনে হাম্বল বলেন যে, একদা ইমাম শাফেয়ী আমাকে বলিলেন যে, দেখ! যদি কোন হাদীস তোমাদের কাছে বিশুদ্ধ প্রমাণিত হয় তাহা হইলে তৎক্ষণাৎ আমাকে সেই হাদীসের কথা জ্ঞাপন করিবে, যাহাতে আমি উহার অনুসরণ করিতে পারি। ইমাম আহমদ আরও বলিয়াছেন যে, ইমাম শাফেয়ীর যে আচরণ আমার চক্ষে সর্বাপেক্ষা সুন্দর বিবেচিত হইত তাহা এই যে, তাঁর অজ্ঞাত কোন হাদীস যদি তিনি শ্রবণ করিতেন তাহা হইলে তিনি তৎক্ষণাৎ তাহার অনুসরণ করিতেন এবং স্বীয় ব্যক্তিগত অভিমত প্রত্যাহার করিয়া লইতেন।

(ফ) রুবাইয়া বলিলেন যে, ইমাম শাফেয়ী একদা আমাকে আদেশ করিলেন যে, রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস কোনক্রমেই পরিহার করিও না, উহার ভিতর কিয়াসের স্থান নাই এবং কোন অবস্থাতেই কিয়াস সুন্নাতের সম-আসন অধিকার করার যোগ্য নয়।

(ব) রুবাইয়া বলেন, আমি একদা ইমাম শাফেয়ীকে নামাযে হস্তোত্তোলন (রফউল ইয়াদায়েন) করা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করায় তিনি বলিলেন,
يرفع المصلى يديه إذا افتتح الصلوة حذو منكبيه و إذا أراد أن يركع و إذا رفع رأسه من الركوع رفعهما كذلك، ولا يفعل ذلك في السجود -
নামাযী যখন নামায আরম্ভ করিবে তখন সে তাহার উভয় হস্ত স্কন্ধ পর্যন্ত উত্তোলন করিবে এবং যখন রুকু করিতে উদ্যত হইবে এবং রুকু হইতে মস্তক উত্তোলন করিবে তখনও অনুরূপ ভাবে রফউল ইয়াদায়েন করিবে। কিন্তু সিজদায় এরূপ করিবে না।

রুবাইয়া বলিলেন, একথার প্রমাণ কি? ইমাম শাফেয়ী বলিলেন,
أنبأنا ابن عيينة عن الزهرى عن سالم بن عبد الله بن عمر عن النبي صلى الله عليه وسلم مثل قولنا -
সুফ্যান ইবনে উআয়না আমার নিকট হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন যে, যুহরী আব্দুল্লাহ বিনে উমরের পুত্র সালিমের প্রমুখাৎ এবং তিনি স্বীয় পিতার বাচনিক অবগত হইয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের এই উক্তির অনুরূপই আদেশ করিয়াছেন।

রুবাইয়া বলিলেন, আমরা কিন্তু বলিয়া থাকি যে, নামাযী কেবল নামাযের সূচনাতেই হস্তোত্তোলন করিবে, পুনশ্চ আর করিবে না। ইমাম শাফেয়ী বলিলেন,
أخبرنا مالك عن نافع أن ابن عمر كان إذا افتتح الصلوة رفع يديه حذو منكبيه وإذا رفع رأسه من الركوع رفعهما -
ইমাম মালিক আমার নিকট নাফেয়ের প্রমুখাৎ রেওয়ায়ত করিয়াছেন যে, আব্দুল্লাহ বিনে উমর যখন নামায আরম্ভ করিতেন, তখন স্কন্ধ পর্যন্ত হস্ত উত্তোলন করিতেন এবং যখন রুকু হইতে মাথা তুলিতেন তখনও।

শাফেয়ী বলিলেন, তুমি দেখিতেছ, ইমাম মালিক স্বয়ং রাসূলুল্লাহর (সা) প্রমুখাৎ রেওয়ায়ত করিতেছেন যে, হযরত (সা) নামাযের প্রারম্ভে স্কন্ধ পর্যন্ত হস্ত উত্তোলন করিতেন এবং রুকু হইতে মস্তক উঠাইবার সময়েও হস্ত উত্তোলন করিতেন। কিন্তু তোমরা এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) এবং ইবনে উমরের বিরুদ্ধাচরণ করিতেছ আর বলিতেছ যে, নামাযের সূচনা ব্যতীত অন্য সময়ে হস্তোত্তোলন করা হইবে না। অথচ তোমরাই রেওয়ায়ত করিতেছ যে, রাসূলুল্লাহ (সা) এবং ইবনে উমর নামাযের সূচনায় এবং রুকু হইতে মাথা উঠাইবার সময় হস্তোত্তোলন করিতেন। কোন বিদ্বানের পক্ষে নিজের ব্যক্তিগত মতের অনুসরণ করিয়া রাসূলুল্লাহ (সা) এবং ইবনে উমরের আচরণের অনুসরণ বর্জন করা কি জায়েয হইতে পারে? তারপর তৃতীয় ক্ষেত্রে ইবনে উমরের কথা সূত্রে তিনি স্বয়ং রাসূলুল্লাহর (সা) প্রমুখাৎ যাহা রেওয়ায়ত করিয়াছেন তাহা কেমন করিয়া ছাড়া হইল? তাঁর বর্ণিত হাদীসের কতকাংশ গৃহীত আর কতকাংশ পরিত্যক্ত হইল কেন? রাসূলুল্লাহর (সা) প্রমুখাৎ দুইবার অথবা তিনবার হস্তোত্তোলন করার হাদীস রেওয়ায়ত করা যদি ইমাম মালিকের পক্ষে বৈধ হইয়া থাকে এবং ইবনে উমরের প্রমুখাৎ যদি দুইবার হস্তোত্তোলন করা তিনি রেওয়ায়ত করিয়া থাকেন এবং তন্মধ্যে এক বার হস্তোত্তোলন করার হাদীস যদি তিনি গ্রহণ করিয়া থাকেন তাহা হইলে যাহা তিনি পরিত্যাগ করিয়াছেন কাহারও পক্ষে তাহা গ্রহণ করা বা যাহা তিনি গ্রহণ করিয়াছেন তাহা বর্জন করা সঙ্গত হইবে কি? সর্বোপরি রাসূলুল্লাহর (সা) প্রমুখাৎ যাহা বর্ণিত হইয়াছে অন্য কাহারও পক্ষে তাহা পরিহার করা বৈধ হইবে কি?

রুবাইয়া বলিলেন, আমাদের ইমাম মালিক বলিয়াছেন,- হস্তোত্তোলন করার তাৎপর্য কি? শাফেয়ী বলিলেন, হস্তোত্তোলন করার তাৎপর্য হইতেছে, আল্লাহর প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং আল্লাহর রাসূলের (সা) সুন্নাতের অনুসরণ। নামাযের সূচনায় হস্তোত্তোলন করার যে অর্থ, রুকুতে যাইবার প্রাক্কালে এবং রুকু হইতে মাথা উঠাইবার সময়েও [অর্থাৎ যে দুই ক্ষেত্রে হস্তোত্তোলন করা সম্পর্কে তোমরা আল্লাহর রাসূলের (সা) বিরোধ করিয়াছি] তাহার অর্থ উহাই। অধিকন্তু তোমরা রাসূলুল্লাহ (সা) এবং ইবনে উমর-উভয়ের প্রমুখাৎ তোমাদেরই রেওয়ায়তের তোমরা একই সঙ্গে বিরোধ করিতেছ অথচ রফউল ইয়াদায়েনের হাদীস রাসূলুল্লাহর (সা) বহু গণ্যমান্য সাহাবী ইহার অনুসরণ করিতেন। সুতরাং যে ব্যক্তি রফউল ইয়াদায়েন পরিত্যাগ করিবে সে সুন্নাতের পরিত্যাগকারী হইবে।

ইমাম আহমদ ইমাম শাফেয়ীর প্রমুখাৎ এই রেওয়ায়তই করিয়াছেন যে, ইমাম শাফেয়ী বলিয়াছেন, রূকুতে যাওয়ার প্রাক্কালে এবং রুকু হইতে উঠার সময়ে যে ব্যক্তি রফউল ঈয়াদায়েন বর্জনকারী, সে আল্লাহর রাসূলের (সা) সুন্নাতের বর্জনকারী।

(ম) হজ্জের সময়ে ইহরামের পূর্বে যদি সুগন্ধি ব্যবহার করা হয় এবং উহার গন্ধ যদি ইহরামের পর অথবা জমরাতে প্রস্তরাঘাতের পর অথবা মস্তক মুণ্ডনের পর অথবা তওয়াফে ইফাযার পূর্ব পর্যন্ত অবশিষ্ট রহিয়া যায় তাহার ব্যবস্থা সম্পর্কে রুবাইয়া ইমাম শাফেয়ীকে জিজ্ঞাসা করায় তিনি বলিলেন, ইহরামের পূর্বে সুগন্ধি ব্যবহার করা জায়েয। আমি ইহা পছন্দ করি এবং আমি ইহাকে দূষণীয় মনে করি না। কারণ রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাতে ইহা প্রমাণিত রহিয়াছে এবং একাধিক বিশিষ্ট সাহাবা এরূপ করিয়াছেন।

রুবাইয়া একথার প্রমাণ চাহিলে ইমাম শাফেয়ী হাদীস এবং 'আসার' আবৃত্তি করিয়া শোনান এবং বলেন, ইবনে উআয়না আমার নিকট আমর বিনে দীনারের প্রমুখাৎ এবং তিনি সালিমের বাচনিক হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন যে, হযরত উমর বলিয়াছেন, জমরায় প্রস্তর নিক্ষেপ করার পর স্ত্রী সহবাস ও সুগন্ধি ব্যবহার ব্যতীত সমুদয় নিষিদ্ধ কার্যকলাপ হালাল হইয়া যায় এবং মা আয়েশা বলিতেছেন, তওয়াফে ইফাযার পূর্বেই (জমরায় প্রস্তর নিক্ষেপের পর মীনা হইতে আসিয়া বয়তুল্লাহ শরীফ প্রদক্ষিণ করার কার্যকে তওয়াফে ইফাযা বলা হয়) আমি স্বয়ং রাসূলুল্লাহর (সা) কে সুগন্ধি মাখাইয়াছিলাম। আবদুল্লাহ বিনে উমরের পুত্র সালিম বলিতেছেন যে, রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাতই অনুসরণের অধিকতর যোগ্য। অর্থাৎ সালিম স্বীয় পিতামহ দ্বিতীয় খলীফা উমর ফারুকের ফতওয়া রাসূলুল্লাহ (সা) হাদীসের সমক্ষতায় বর্জন করিতে কিছুমাত্র দ্বিধা করিলেন না। ইমাম শাফেয়ী সালিমের উক্তি প্রসঙ্গে বলিতেছেন, সাধু সজ্জন এবং বিদ্বানগণের আচরণ এইরূপ হওয়াই বাঞ্ছনীয় আর যাহারা ব্যক্তিগত অভিমতের অনুসরণ করিয়া সুন্নাতের নির্দেশ বর্জন করিয়া থাকে, সেইরূপ বিদ্বানগণের উক্তি স্ব স্ব বিদ্যা ও বিবেচনা অনুসারে গ্রহণীয় ও বর্জনীয় হইবে।

(য) ইমাম শাফেয়ী ঋণগ্রস্তের সম্পত্তি বিক্রয় সম্পর্কে যে ফতওয়া প্রদান করিয়াছিলেন, তদুত্তরে জনৈক ব্যক্তি তাঁহাকে বলেন যে, আপনি আপনার কোন কোন উসতাযের বিরোধ করিলেন। ইমাম শাফেয়ী স্বীয় পুরাতন গ্রন্থে (যা আফরানীর মধ্যস্থতায় যে গ্রন্থগুলি প্রকাশিত হইয়াছে) এই কথার জওয়াব লিখিয়াছেন যে, যিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাতের অনুগমন করিয়াছেন আমি তাঁর সহযোগী হইয়াছি এবং যিনি ভুল করিয়া উহা পরিত্যাগ করিয়াছেন আমি তাঁর বিরোধ করিয়াছি। যে সহচরকে আমি কখনও বর্জন করিব না তাহা রাসূলুল্লাহর (সা) সুদৃঢ় এবং সুপ্রমাণিত সাহচর্য এবং যিনি রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস অনুসারে ব্যবস্থা প্রদান করেন না তিনি আমার নিকটতম ব্যক্তি হইলেও আমি তাঁহাকে পরিহার করিব- [ই'লামুল মুআক্কেয়ীন, ঈকাযুল হিমম, ১০৪-১০৭ পৃঃ]।

📘 ফিরকাবন্দি বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি 📄 ইমাম শাফেয়ীর সমাধান পদ্ধতি

📄 ইমাম শাফেয়ীর সমাধান পদ্ধতি


সমস্যার সমাধানকল্পে ইমাম শাফেয়ী যে পদ্ধতির অনুসরণ করিতেন তাহা সম্যকরূপে হৃদয়ঙ্গম করিতে হইলে ইমাম সাহেবের প্রাককালীন ফিকহ শাস্ত্রের (Islamic Jurisprudence) অবস্থা অবগত হওয়া আবশ্যক। তৎকালীন ফিক্‌হ শাস্ত্রের মোটামুটি অবস্থা ছিল এই যে, তখন পর্যন্ত ফিক্হে বাঁধাধরা নিয়ম ও মূলনীতি (Principles) সমূহ আবিষ্কৃত হয় নাই। ভুল ও সঠিক মসআলা সমূহের মধ্যে পার্থক্য করার কোন মানদণ্ডও স্থিরীকৃত ছিল না। বিভিন্নরূপী হাদীস সমূহের মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি করার এবং তাহাদের পারস্পরিক বিরোধ দূরীভূত করার কোন নিয়মও ছিল না। তৎকালীন ফকীহগণ সাধারণতঃ মূর্সল ও মুনকাতা হাদীস সমূহের সাহায্যে মসআলাসমূহ আবিষ্কার করিতেন এবং বিরোধ ক্ষেত্রে স্বীয় ধীশক্তি ও মানসিক প্রবণতার (Mental tendency) উপর নির্ভর করিয়াই একটি হাদীসকে অগ্রাহ্য এবং অপরটিকে অগ্রগণ্য করিয়া তাহার অনুসরণ করিতেন। বহু ক্ষেত্রে সহীহ হাদীস সমূহ পরিত্যাগ করিয়া যঈফ হাদীস সমূহের আশ্রয় লইতেন এবং সাহাবা ও তাবেয়ীগণের অভিমত নিজেদের সিদ্ধান্তের পোষকতায় উপস্থাপিত করিতেন। শরীঅত বিরোধী কাল্পনিক অভিমতকে শরীঅতের অনুকূল বিশুদ্ধ কিয়াসের সহিত মিশাইয়া ফেলিতেন এবং এই কার্যকে ইসতিহসান নামে অভিহিত করিতেন। সংশোধন (নাসিখ) ও সংশোধিত (মনসুখ), ব্যাপক (মুতলক) ও নির্ধারিত (মুকাইয়দ), সাধারণ (আম) ও বিশেষ (খাস), শর্ত ও পরিচয় (ওয়াসফ) প্রভৃতি বিষয়ের আলোচনা করা হইত না, ফলে তৎকালীন বিদ্বানগণের ইজতিহাদ ও আবিষ্কারে নানারূপ বিভ্রান্তি ও বৈপরীত্য সংঘটিত হইত এবং তাঁহাদের সিদ্ধান্তগুলি পরস্পর অসংলগ্ন হইয়া পড়িত। ইমাম শাফেয়ী হানাফী ও মালেকী মযহবের অসূল ও ফরূ' (Principles & details) সমূহ পর্যবেক্ষণ করিয়া উক্ত দুই মযহবে যে সকল বিষয়ের অভাব ঘটিয়াছিল সেগুলি পূর্ণ করেন এবং নূতন পদ্ধতিতে ফিক্‌হ শাস্ত্রের মূলনীতি ও বিধানগুলি সুসম্পাদিত করেন সর্ব প্রথম তিনিই অসুলে ফিক্হে এক খানা গ্রন্থ প্রণয়ন করেন এবং উহাতে বিভিন্ন রূপ হাদীস সমূহের মধ্যে সমন্বয় সংঘটিত করার নিয়ম লিপিবদ্ধ করেন। মূর্সল ও মুনকাতা হাদীস সমূহ গ্রহণ করার জন্য তিনিই যথোপযুক্ত শর্ত আবিষ্কার করেন। যে সকল মূলনীতিতে ইমাম শাফেয়ী হানাফী ও মালেকী মযহবের সহিত বিরোধ করিয়াছেন আমরা সেগুলির মোটামুটি বিবরণ নিম্নে প্রদান করিতেছি।

১। মূর্সল ও মুনকাতা হাদীসের উপর নির্ভর না করা
হানাফী ও মালেকী মযহবের মূর্সল ও মুনকাতা হাদীসে নির্ভর করা হয় দেখিয়া ইমাম শাফেয়ী এই নিয়ম স্থিরীকৃত করিলেন যে, যথোপযুক্ত শর্তের উপস্থিতি ব্যতিরেকে উল্লিখিত হাদীসসমূহ পরিগৃহীত হইবে না। কারণ হাদীসের তরিকাগুলি একত্রিত করার ফলে ইহা স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে যে, কতিপয় মূল হাদীস সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং উহা কতকগুলি মুসনদ হাদীসেরও বিপরীত।

২। বিভিন্ন হাদীস সমূহের মধ্যে সমন্বয় ঘটাইবার নিয়ম প্রণয়ন করা
ইমাম শাফেয়ীর সময়ে হাদীসের যেরূপ প্রাচুর্য ঘটিয়াছিল তাঁর পূর্বে হাদীসের অবস্থা সেরূপ ছিল না। তাঁর পূর্বে প্রত্যেক নগরের অধিবাসীবৃন্দ শুধু স্ব স্ব নগরের বিদ্বান ও ইমামগণের নিকট হইতে হাদীস গ্রহণ করিয়াই ক্ষান্ত থাকিতেন। ইমাম শাফেয়ীর যুগে হাদীস সংকলনের কার্য আরম্ভ হইলে এক নগরের বিদ্বানগণ অপর নগরে গমন করিয়া হাদীস সংগ্রহ করিতে লাগিয়া যান। এই ভাবে বিভিন্ন নগর ও জনপদের ইমাম ও বিদ্বানগণের নিকট যে সকল হাদীস মওজুদ ছিল সেগুলির মধ্যে পার্থক্য ও বৈষম্যও পরিদৃষ্ট হয়। এই পার্থক্য ও বৈষম্য বিদূরিত করার উপায় অপরিহার্য হওয়ায় ইমাম সাহেব শুধু এই উদ্দেশ্যেই একখানা গ্রন্থ প্রণয়ন করেন, উহাতে বিভিন্ন হাদীস সমূহের বৈষম্য বিদূরিত করার উপায় লিপিবদ্ধ করা হয়।

৩। সহীহ হাদীস প্রত্যাখ্যান করার রীতি রহিত করা
পূর্বে যে সকল বিদ্বান ফিকহ শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি লাভ করিয়াছিলেন এবং যাঁহাদের সিদ্ধান্তকে ভিত্তি করিয়া তাঁহারা স্ব স্ব মযহব স্থাপন করিয়াছিলেন অনেকগুলি সহীহ হাদীস তখন পর্যন্ত তাঁহারা হস্তগত করিতে পারেন নাই। সুতরাং যে সকল হাদীসে স্পষ্ট ভাবে মআলা বিদ্যমান ছিল সেগুলি অবগত না থাকার ফলে তাঁহারা কিয়াস ও রায় এবং ইজতিহাদ ও আবিষ্কারের আশ্রয় লইতে বাধ্য হইয়াছিলেন। ইমাম শাফেয়ী দেখিতে পাইলেন যে, একান্ত বাধ্য হইয়াই পূর্ববর্তী বিদ্বানগণ অনেক সহীহ হাদীসের অনুসরণ করিতে পারেন নাই। ইমাম শাফেয়ী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় প্রচার করিলেন যে, সহীহ হাদীস প্রাপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিয়াস বর্জন করিয়া সহীহ হাদীসের অনুসরণ করিতে হইবে। তিনি ইহাও প্রমাণিত করিলেন যে, সাহাবা ও তাবেয়ীগণও এই নিয়মের অনুসরণ করিয়া চলিতেন। তাঁহারা সর্বদাই রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস অনুসন্ধান করার কার্যে ব্যাপৃত থাকিতেন এবং শুধু হাদীস না পাওয়ার ক্ষেত্রেই তাঁহারা বাধ্য হইয়া কিয়াস, ইসতিদলাল এবং প্রতিপাদনের আশ্রয় লইতেন এবং পরেও যদি তাঁহারা হাদীস প্রাপ্ত হইতেন তাহা হইলে অবলীলাক্রমে স্বীয় কিয়াস পরিহার করিয়া উক্ত হাদীস গ্রহণ করিয়া লইতেন।

হযরত ইমামে আযম অথবা হযরত ইমাম মালিক যে কতকগুলি বিশুদ্ধ হাদীস শ্রবণ করার সুযোগ প্রাপ্ত হন নাই এবং খুব দায়ে ঠেকিয়াই যে তাঁহারা অনেকগুলি হাদীসের অনুসরণ করিতে পারেন নাই, কোন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি সে কথা অস্বীকার করিবেন না। কারণ হযরত ইমাম শাফেয়ী হাদীসের যে বিরাট সম্ভার অধিকার করার সুযোগ পাইয়াছিলেন উল্লিখিত মহামতি ইমামন্বয় তাঁহাদের জীবদ্দশায় সে সুযোগ প্রাপ্ত হন নাই। হানাফী মযহবের বিখ্যাত ফকীহ ও সাধক ইমাম আবদুল ওয়াহহাব শা'রানী এ সম্পর্কে লিখিয়াছেন:
إنه لو عاش حتى دولت أحاديث الشريعة ويعد رحيل الحفاظ فى جمعها من البلاد والثفور وظفر بها لأخذبها وترك كل قياس كان قياسه وكان القياس قل فى مذهبه كما قل فى مذهب غيره بالنسبة إليه لكن لما كان أدلة الشريعة مفرقة في عصره مع التابعين وتابع التابعين في المدائن والقرى والشغور كثر القياس في مذهبه بالنسبة إلى غيره من الائمة ضرورة لعدم وجود النص في تلك المسائل التي قاس فيها -
যে সময় শরীঅতের হাদীস সমূহ সংকলিত হইয়াছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সা) হাদীস চয়ন করার উদ্দেশ্যে হাদীস তত্ববিশারদগণ পৃথিবীর বিভিন্ন নগর নগরী ও সীমান্তে বিস্তৃত হইয়া পড়িয়াছিলেন, ইমাম আবু হানীফা যদি সে যুগে বাঁচিয়া থাকিতেন এবং ঐ সকল হাদীস তিনি শ্রবণ করার সুযোগ পাইতেন তাহা হইলে নিশ্চয় সেগুলি তিনি গ্রহণ করিতেন এবং সমুদয় কিয়াস পরিত্যাগ করিতেন এবং তাঁর মযহবের তুলনায় অন্যান্য মযহবে যেরূপ কিয়াসের পরিমাণ কম ঘটিয়াছে তাঁর মযহবেও সেইরূপ কিয়াসের স্বল্পতা পরিদৃষ্ট হইত। কিন্তু যেহেতু তাঁর যুগে শরীঅতের দলীলগুলি তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীগণের নিকট বিভিন্ন জনপদ ও ইলাকায় সুদূর প্রসারিত হইয়া পড়িয়াছিল এবং ইহারই ফলে তাঁর মযহবে অন্যান্য ইমামগণের তুলনায় কিয়াসের আধিক্য ঘটিয়াছিল। যে সকল মসআলায় স্পষ্ট নস বিদ্যমান ছিলনা সেই সকল মসআলার মীমাংসার জন্যই তাঁর পক্ষে কিয়াসের আশ্রয় গ্রহণ করা অপরিহার্য হইয়াছিল।

৪। সাহাবীগণের যে সকল উক্তি রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসের প্রতিকূল, সেগুলিকে দলীলরূপে গ্রহণ না করা
ইমাম শাফেয়ীর সময়ে সাহাবীগণের ফাতাওয়া ও উক্তিসমূহও সংকলিত হইয়াছিল। এই উক্তিগুলি অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরের বিরোধী পরিদৃষ্ট হইত। কতকগুলি উক্তি সহীহ হাদীসেরও প্রতিকূল দেখিতে পাওয়া যাইত। ইমাম শাফেয়ী সহীহ হাদীসের মুকাবেলায় তাঁহাদের প্রতিকূল উক্তিসমূহ দলীলরূপে গ্রাহ্য করার রীতি পরিত্যাগ করিয়াছিলেন। তিনি সুস্পষ্টভাবেই বলিয়া দিয়াছিলেন:
هم رجال ونحن رجال
'সাহাবীগণও মানুষ ছিলেন আর আমরাও মানুষ।' সুতরাং আমাদের মত তাঁহাদের পক্ষেও ভুলভ্রান্তি সংঘটিত হওয়া সম্ভবপর। অতএব সহীহ হাদীস প্রাপ্ত হইবার পর সাহাবীগণের ইজতিহাদের অনুসরণ করা আবশ্যক নয়। অধিকন্তু উহা বর্জন করা এবং হাদীস অবলম্বন করিয়া চলাই কর্তব্য।

৫। শরীঅত-বিরোধী অভিমত (রায়) আর শরীঅত অনুমোদিত কিয়াসের মধ্যে পার্থক্য করা
ইমাম শাফেয়ীর যুগে কতক বিদ্বান স্বকীয় ইজতিহাদের ভিতর অবলীলাক্রমে স্বীয় রায় প্রয়োগ করিয়া চলিতেন এবং এই রায়কে শরীঅতের অন্যতম দলীল-কিয়াস মনে করিতেন। এবম্বিধ রায় তাঁহাদের পরিভাষায় ইসতিহসান নামে কথিত হইত। অথচ সাহাবা ও তাবেয়ীগণের মধ্যে যে শরীঅতসঙ্গত কিয়াস প্রচলিত ছিল তাহার তাৎপর্য ছিল কুরআন ও হাদীসের কোন প্রত্যক্ষ আদেশ নিষেধের কারণ আবিষ্কার করা এবং যে সকল বস্তু বা কার্য সম্বন্ধে প্রত্যক্ষ নির্দেশ নাই সেগুলির মধ্যে উক্ত কারণ পরিদৃষ্ট হইলে সেই সকল কার্য বা বিষয় সম্বন্ধে উপরিউক্ত আদেশ বলবৎ করা। যেমন কুরআনে মদ্য হারাম হওয়া স্পষ্টভাবে উল্লিখিত হইয়াছে কিন্তু অন্যান্য মাদক দ্রব্যের কোন উল্লেখ নাই। এক্ষণে মদ্য হারাম হওয়ার আদেশ স্পষ্ট দলীলের ভিতর বিদ্যমান রহিয়াছে এবং উহা হারাম হওয়ার কারণ হইতেছে মাদকতা। অতএব এই মাদকতার কারণ যে সকল বস্তুর মধ্যে পাওয়া যাইবে সেগুলিকে হারাম বলিয়া নির্দেশিত করার কার্য শরীঅতসঙ্গত কিয়াস বলিয়া অভিহিত হইবে। এইরূপ কিয়াসই সাহাবা ও তাবেয়ীগণের মধ্যে প্রচলিত ছিল। আর নিজের কপোল-কল্পিত কথাকে হালাল বা হারাম হইবার কারণ রূপে গ্রহণ করার কার্য রায় নামে কথিত হইয়া থাকে। যথা: ব্যাপক সুবিধা বা অসুবিধাকে কোন আদেশের কারণ রূপে গ্রহণ করা। ইমাম শাফেয়ী এই ধরণের কিয়াসকে যাহা আদৌ শরীঅতসঙ্গত কিয়াস নয় এবং যাহা বুদ্ধিজীবীদের কল্পনাবিলাস মাত্র, সম্পূর্ণ রূপে বর্জন করিয়াছিলেন। আর তিনি খোলাখুলিভাবে বলিয়া দিয়াছিলেন যে,
مَنِ اسْتَحْسَنَ فَقَدْ أَرَادَ أَنْ يَكُوْنَ شَارِعًا
'যে ব্যক্তি ইসতিহসানের আশ্রয় গ্রহণ করিল সে পয়গম্বর সাজিবার ইচ্ছা করিল।'

ফল কথা, এই পাঁচটি বিষয়ে ইমাম শাফেয়ী পূর্ববর্তীগণের পথ পরিত্যাগ করিয়াছিলেন। তিনিই মধ্যবর্তী অবলম্বনগুলিকে ছাড়িয়া দিয়া সরাসরিভাবে মূল উৎস হইতে ফিকহ শাস্ত্র নূতন ভাবে প্রণয়ন করেন এবং নির্দিষ্ট কোন দলের ফকীহ বা মুজতাহিদ অথবা নির্দিষ্ট কোন নগর নগরীর বিদ্বানগণের উক্তি এবং নীতির উপর ইজতিহাদের ভিত্তি স্থাপন না করিয়া সরাসরিভাবে কুরআন ও সুন্নাতের উপর স্বীয় মযহব প্রতিষ্ঠিত করেন। সমস্ত ঐতিহাসিক এবং পূর্ব ও পরবর্তী সমুদয় মুসলিম বিদ্বানের এ বিষয়ে দ্বিমত নাই যে, ইমাম শাফেয়ী সর্ব প্রথম ফিকহ শাস্ত্রের মূলনীতিগুলি আবিষ্কার করিয়াছিলেন। তিনিই উহাকে বিভিন্ন অধ্যায় ও পরিচ্ছেদে সুবিন্যস্ত করিয়াছিলেন। তিনিই সেগুলির ভিন্ন ভিন্ন প্রকরণ এবং শ্রেণীভেদ বর্ণনা করিয়াছিলেন, তিনিই কুরআন, হাদীস, ইজমা ও কিয়াসের সাহায্যে দলীল গ্রহণ করার নিয়ম ও শর্ত আবিষ্কার করিয়াছিলেন, তিনিই নাসিখ, মনসুখ, মুতলক, মুকাইয়াদ আম ও খাস প্রভৃতির আলোচনা সুনিয়ন্ত্রিত করিয়াছিলেন, তিনিই দুর্বলতা ও বলিষ্ঠতার দিক দিয়া কিয়াস ও ইসতিদলালকে বিভিন্ন ভাবে বিভক্ত করিয়াছিলেন।

এরিষ্ট্রোটল যেরূপ ন্যায় শাস্ত্রের আবিষ্কর্তা রূপে আর খলীল বিনে আহমদ যেরূপ কাব্য আবিষ্কার রূপে অমর হইয়া রহিয়াছেন, ইমাম শাফেয়ীও তদরূপ অসূলে ফিকহের আবিষ্কারকরূপে ইতিহাসের পৃষ্ঠায় মৃত্যুঞ্জয়ী হইয়াছেন, তাঁর পূর্বে ফিকহ শাস্ত্রের কোন বাঁধাধরা নিয়ম ছিলনা। আভিধানিক অর্থ ছাড়া ফিকহের কোন বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য ছিলনা। যে বিদ্যাকে আজ আমরা ফিকহ নামে অভিহিত করিয়া থাকি এবং একান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিশিষ্ট বিজ্ঞানের পথপ্রদর্শক ও আবিষ্কার হইতেছেন ইমাম শাফেয়ী।

ইজতিহাদের যে সকল নীতি তিনি নির্ধারিত করিয়াছিলেন আমরা অতঃপর সেগুলিরও উল্লেখ করিব।

ইমাম শাফেয়ীর আলোচনায় এরূপ বিস্তৃত ভাবে মনঃসংযোগ করার দুইটি প্রধান কারণ। প্রথম, ইমাম শাফেয়ীই আহলে হাদীসগণের অন্যতম প্রধান ইমাম। দ্বিতীয়, ইমাম শাফেয়ী এবং তাঁর মযহব সম্পর্কে আমাদের শিক্ষিত দলের অজ্ঞতা মারাত্মক ভাবে সীমাবদ্ধ। এই প্রবন্ধের ভিতর দিয়া যদি আমি ইমাম শাফেয়ীকে আমাদের দেশের শিক্ষিত জনগণের মধ্যে কিঞ্চিৎ পরিচিত করিয়া তুলিতে পারি তাহা হইলে আমার শ্রম সার্থক হইবে।

(ক) ইমাম শাফেয়ীর ইজতিহাদের প্রথম বুনয়াদী নীতি (Basic principle) এই যে, দীনের মূল হইতেছে কুরআন ও হাদীস আর উহাদের অবিদ্যমানতায় কুরআন ও হাদীসের অনুকূল কিয়াস।

(খ) যে হাদীসের সনদ রাসূলুল্লাহ (সা) পর্যন্ত সংলগ্নভাবে প্রমাণিত এবং যাহার সনদের ভিতর কোনরূপ ত্রুটি নাই তাহা সুন্নাত।

(গ) এককভাবে বর্ণিত হাদীস অপেক্ষা ইজমার আসন উর্ধতর।

(ঘ) সকল সময় হাদীসের প্রকাশ্য অর্থ গ্রহণ করিতে হইবে। বিভিন্ন অর্থবোধক হাদীস সমূহের মধ্যে উহার যে অর্থ প্রকাশ্য হাদীসের অনুরূপ সেই হাদীসকেই অগ্রগণ্য করিতে হইবে।

(ঙ) সমান শ্রেণীর বিভিন্ন হাদীসের মধ্যে অসামঞ্জস্য পরিলক্ষিত হইলে যে হাদীসের সনদ সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট তাহাই অগ্রগণ্য বলিয়া বিবেচিত হইবে।

(চ) বিখ্যাত তাবেঈ সঈদ বিনুল মুসাইয়ের ছাড়া অন্য কোন বর্ণনাদাতার মূর্সল হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়।

(ছ) একটি মৌলিক আদেশকে অপর কোন মৌলিক আদেশের সঙ্গে কিয়াস করা চলিবে না। শরীঅতের মূলনীতির ভিতর একথা বলা চলিবেনা যে, এই আদেশের কারণ কি এবং কি ভাবে এই আদেশ প্রদত্ত হইয়াছে। একথা বিস্তৃত আদেশ নিষেধের (ফরূআৎ) বেলাতেই বলা চলিতে পারিবে। ফরূআতের কিয়াস যদি মৌলিক আদেশের সহিত সুসমঞ্জস হয় তবেই সে ইজতিহাদ সঠিক এবং উহা দলীলরূপে গ্রহণযোগ্য হইবে।

(জ) যে নির্দিষ্ট কারণে আদেশ অবতীর্ণ, হইয়াছে সে কারণটি কোন ক্রমেই আদেশের আওতার বহির্ভূত বিবেচিত হইবে না। আদেশের শব্দের ব্যাপক অর্থ অনুসারে অবতীর্ণ কারণ সমূহের উপর উক্ত আদেশ প্রযোজ্য হইলেও মূলতঃ যে কারণে আদেশ অবতীর্ণ হইয়াছে তাহাকে কোন অবস্থাতেই উল্লিখিত নির্দেশের বহির্ভূত গণ্য করা চলিবে না।
শেষোক্ত নিয়মটি অনুসরণ না করার ফলে বিদ্বানগণের মধ্যে বহু গোলযোগ ঘটিয়া গিয়াছে। আমরা এস্থলে মাত্র দুইটি দৃষ্টান্ত প্রদান করিয়া ক্ষান্ত হইব।

সূরা আল-বাকারার বিখ্যাত আয়াত:
وَلِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ
"এবং তোমরা আল্লাহর তকবীর ধ্বনি কর, যে ভাবে তিনি তোমাদিগকে আদেশ করিয়াছেন"- রামাযানের সিয়াম প্রসঙ্গে অবতীর্ণ হইয়াছে। সুতরাং ইমাম শাফেয়ী এই আয়াত অনুসারে ঈদুল ফিতরের তকবীর সমূহেকে ওয়াজিব বলিয়া থাকেন। তাঁর বক্তব্য এই যে, ঈদুল ফিতর সম্পর্কে এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার দরুণ ঈদুল ফিতরের তকবীর এই আদেশের বহির্ভূত বলিয়া গণ্য হইবে না এবং আদেশের শব্দের ব্যাপক অর্থ অনুসারে ঈদুল আযহার তকবীর উহার অন্তর্ভুক্ত রূপে বিবেচিত হইবে। পক্ষান্তরে তকবীরের আদেশ শুধু ইদুল ফিতর উপলক্ষ্যে অবতীর্ণ হইলেও ইমামে আযম আবু হানীফা ঈদুল ফিতরের তকবীরগুলিকে মকরূহ বলিয়াছেন।

আর একটি দৃষ্টান্ত এই যে, রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে জনৈক ব্যক্তি উপস্থিত হইয়া নিবেদন করিল যে, "হে আল্লাহর রাসূল (সা) যদি কোন ব্যক্তি স্বীয় স্ত্রীর শয্যায় অপর কোন পুরুষকে দেখিতে পায় তাহা হইলে সে কি তাহাকে হত্যা করিবে এবং আপনি অতঃপর খুনের দায়ে তাহাকেও হত্যা করিবেন? না, সে কি করিবে?' এ সম্পর্কে কুরআনে 'লি'আনের' আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সা) উক্ত ব্যক্তিকে বলেন যে, তোমার এবং তোমার স্ত্রী সম্পর্কে আল্লাহ বিচার করিয়া দিয়াছেন। হাদীসের রাবী সহল বিনে সঅদ বলিতেছেন যে, অতঃপর স্বামী স্ত্রী উভয়েই 'লিআন' করিল এবং আমি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট থাকিয়া উহা প্রত্যক্ষ করিয়াছিলাম। রাসূলুল্লাহ (সা) 'লি'আনের' পর স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ করিয়া দেন এবং এই ভাবে 'লিআনে'র পর বিচ্ছেদের রীতি সুন্নত হইয়া দাঁড়ায়। স্ত্রীলোকটি গর্ভবতী ছিল, কিন্তু তাহার স্বামী উক্ত সন্তানকে অস্বীকার করিয়াছিল এবং উক্ত সন্তান তাহার জননীর নামে পরিচিত হইয়াছিল। অতঃপর এইরীতি প্রবর্তিত হয় যে, এরূপ সন্তান মাতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হইবে এবং জননীও আল্লাহর নির্দেশিত ব্যবস্থামত সন্তানের পরিত্যক্ত সম্পত্তির অংশ প্রাপ্ত হইবে।

এই হাদীস সূত্রে ইমাম শাফেয়ী তাঁর অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন যে, যদিও বিনাগর্ভে স্ত্রীর সহিত 'লি'আন চলিতে পারে কিন্তু যেহেতু 'লি'আনের' অনুমতির আয়াতটি গর্ভবতী নারী সম্পর্কেই অবতীর্ণ হইয়াছিল, অতএব গর্ভবর্তী নারীর সঙ্গেও 'লি'আন করা বৈধ হইবে। পক্ষান্তরে শানে নযুলকে আদেশের অন্ত-র্ভুক্ত গণ্য না করায় ইমাম আবু হানীফা গর্ভবর্তী নারীর সহিত 'লি'আন' করাকে অবৈধ বলিয়াছেন।

ইমাম শাফেয়ী এই মৌলিক নীতিও স্থিরীকৃত করেন যে, কুরআনে যে সকল পাঠ-পদ্ধতি বিরল এবং সুপ্রসিদ্ধ ও সার্বজনীন পাঠ-পদ্ধতির বিরোধী, তাহা অনুসরণীয় হইবে না। এই নীতির অনুসরণ করিয়া কাফফারার কসম সম্বন্ধে তিনি উপর্যুপরি তিনটি রোযা রাখা প্রয়োজন মনে করেন নাই। তিনি বলিয়াছেন যে, প্রসিদ্ধ কিরআতে উপর্যুপরি সিয়ামের উল্লেখ করা হয় নাই। শুধু তিনটি রোযার আদেশ দেওয়া হইয়াছে মাত্র। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা বলেন যে, আবদুল্লাহ বিনে মাসউদের বিরল কিরআতে 'উপর্যুপরি' শব্দ বিদ্যমান রহিয়াছে:
فصيام ثلاثة أيام متتابعات
অতএব শপথের কাফফারায় তিনটি রোযাই উপর্যুপরি ভাবে পালন করিতে হইবে।

(ঝ) ইমাম শাফেয়ী বলেন, কোন আদেশ নির্দিষ্ট অবস্থার শর্তাধীনে প্রদত্ত হইয়া থাকিলে সেই শর্ত বা অবস্থার অবিদ্যমানতায় উক্ত আদেশ, প্রযোজ্য রহিবেনা আর ইমাম আবু হানীফা বলেন যে, শর্ত বা অবস্থার অবলুপ্তির দ্বারা মূল আদেশ রহিত হইবে না! দৃষ্টান্ত স্বরূপ কুরআনে কথিত হইয়াছে যে,
ومن لم يستطع منكم طولا أن ينكح المحصنات المؤمنات فمن ما ملكت أيمانكم من فتياتكم المؤمنات .
'তোমাদের মধ্যে যাহাদের স্বাধীন মুসলিম নারীকে বিবাহ করার ক্ষমতা নাই তাহারা মুসলিম দাসীকে বিবাহ করিবে।" এই আয়াত সূত্রে ইমাম শাফেয়ী বলিয়াছেন, যে ব্যক্তির স্বাধীন নারীকে বিবাহ করার ক্ষমতা রহিয়াছে তাহার পক্ষে দাসীকে বিবাহ করা বিধেয় হইবে না। কারণ দাসীকে বিবাহ করার অনুমতি এই শর্তে আবদ্ধ রহিয়াছে যে, সে ব্যক্তির স্বাধীন নারী গ্রহণ করার ক্ষমতা নাই। পুনশ্চ এই আয়াত দ্বারা ইমাম শাফেয়ী অমুসলিম দাসীকে বিবাহ করাও অসিদ্ধ বলিয়াছেন। কারণ দাসীকে আয়াতের ভিতর বিবাহ করার অনুমতি ঈমানের শর্তাধীন রাখা হইয়াছে। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা স্বাধীন মুসলিম নারীকে বিবাহ করার ক্ষমতা থাকা সত্বেও দাসী বিবাহ করার অনুমতি দিয়াছেন এবং দাসীর জন্য মুসলমান হওয়ার শর্ত অবশ্য প্রতিপালনীয় বলেন নাই।

(ঞ) ইমাম শাফেয়ী মৌন ইজমার (اجماع سكوتى) প্রামাণিকতা স্বীকার করেন নাই। কারণ একজন সাহাবীর কোন কার্যকে অপর সাহাবী ভয়ের বশবর্তী হইয়া অবৈধ জানা সত্বেও উহার প্রতিবাদে বিরত থাকিতে পারেন। সুতরাং সাহাবীগণের মৌনভাব এবং কোন কার্যের প্রতিবাদে তাঁহাদের বিরত থাকা তাঁহাদের সম্মতির প্রমাণ হইতে পারেনা। হাদীসের পাঠকবর্গের ইহা অবিদিত নাই যে, কতিপয় সাহাবা বিভিন্ন কারণে অনেকগুলি ব্যাপারে উচ্চবাচ্য করেন নাই।

(ট) মুতলক আদেশকে সীমাবদ্ধ আদেশরূপে ধরিয়া লওয়া। যথা, সাদাকাতুল ফিতর সম্বন্ধে দুই প্রকার নস বিদ্যমান রহিয়াছে। একটিতে বলা হইয়াছে,
أدوا عن كل حر وعبد
প্রত্যেক স্বাধীন ও দাসের পক্ষ হইতে ফিতরা আদা' করা। এই আদেশটি সাধারণ। কিন্তু দ্বিতীয় আদেশে বলা হইয়াছে,
أدوا عن كل حرو عبد من المسلمين
প্রত্যেক স্বাধীন ও দাস মুসলিমের তরফ হইতে ফিতরা আদা' করা, এই আদেশটি সীমাবদ্ধ। কারণ ইহা দ্বারা শুধু মুসলমানগণই ফিতরা দেওয়ার জন্য আদিষ্ট হইয়াছেন। ইমাম শাফেয়ী বলেন যে, প্রথম সাধারণ আদেশটিকে দ্বিতীয় আদেশ সূত্রে সীমাবদ্ধ রূপেই গ্রহণ করিতে হইবে এবং প্রথম হাদীসে কথিত স্বাধীন ও দাসের অর্থ স্বাধীন ও দাস মুসলিম বলিয়া গ্রহণ করিতে হইবে। অতএব কাফের দাসের জন্য ফিতরা ওয়াজিব নয়। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা বলেন যে, ফিতরার জন্য ইসলামের কোন শর্ত নাই। সুতরাং বিধর্মী দাসের জন্যও ফিতরা পরিশোধ করা ওয়াজিব।

(ঠ) ইমাম শাফেয়ী বলেন, সাধারণ আদেশ সকল অবস্থায় এবং সকল ক্ষেত্রে অকাট্য ভাবে সাধারণত্বের পর্যায়ভুক্ত থাকিতে পারে না। এমন কোন সাধারণত্বই নাই যাহার মধ্যে কোন ব্যতিক্রমই নাই। এই মূলনীতির ফলে ইমাম শাফেয়ীর কাছে শাকপাতা প্রভৃতি তরকারীর উশর ওয়াজিব নয়। যদিও হাদীসে উল্লিখিত হইয়াছে যে,
ما اخرجت الأرض فقيه عشر
"মৃত্তিকা হইতে উৎপন্ন সকল বস্তুর জন্যই উশর আছে।" কিন্তু অন্যতম হাদীস
ليس في الخضروات صدقة
শাক সব্জীর উপর উশর নাই', প্রথমোক্ত হাদীসের ব্যাপকতা সীমাবদ্ধ করিয়া দিয়াছে। পক্ষান্তরে ইমাম আবু হানীফা এক সের পরিমাণ তরিতরকারীতেও উশর ওয়াজিব করিয়াছেন।

এই সকল মৌলিক নীতি ছাড়াও ফিকহ শাস্ত্রে ইমাম শাফেয়ী একটি বিশেষ কথা আবিষ্কার করিয়াছেন। তিনি কিয়াসকে তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করিয়াছেন।

(ক) যদি উপপাদ্য বিষয়টি মূল আদেশ অপেক্ষা যোগ্যতর হয় তাহা হইলে আদেশের কারণ অনুসন্ধান করা আবশ্যক হইবে না। পরন্তু মূল আদেশটি উপপাদ্য সমাধানের জন্য অবলীলাক্রমে ব্যবহৃত হইবে। যথা, দাসীদের সম্বন্ধে মূল আদেশ এই যে,
فإِنْ أَتَيْنَ بفَاحِشَةٍ فَعَلَيْهِنَّ نِصْفُ مَا عَلى المُحْصَنَاتِ مِنَ العَذاب
তাহারা ব্যভিচারে লিপ্ত হইলে স্বাধীন নারীর অর্ধেক দন্ড ভোগ করিবে। আয়াতে শুধু দাসীদের দণ্ডবিধি উল্লিখিত হইয়াছে। কিন্তু কুরআনের কুত্রাপিও এসম্পর্কে দাসদের দন্ডের কথা উল্লিখিত হয় নাই। ইমাম শাফেয়ী বলেন যে, সাধারণ জ্ঞান অনুসারে দাসীগণ অপেক্ষা দাসদের উপর দণ্ড তাহাদের সামর্থের আধিক্য অনুসারে- প্রযুক্ত হওয়া উচিত। সুতরাং দাসগণও উল্লিখিত আদেশের অন্তর্ভুক্ত।

(খ) কিন্তু প্রতিপাদ্য বিষয়টি যদি মূল আদেশ অপেক্ষা স্পষ্টতর না হয়, তাহা হইলে দ্বিবিধ উপায়ের মধ্যে একটি দ্বারা উহার সমাধান করিতে হইবে। প্রথমত: মূল আদেশের কারণ আবিষ্কার করিতে হইবে এবং প্রতিপাদ্যের ভিতর উক্ত কারণ বিদ্যমান থাকিলে তাহার জন্যও মূল আদেশ বলবৎ করা হইবে। যথা, কুরআনে মদ্য হারাম হওয়া উল্লিখিত রহিয়াছে। কিন্তু অপরাপর মাদক দ্রব্যের কথা কথিত হয় নাই। অথচ মদের নিষিদ্ধতার কারণ হইতেছে উহার মাদকতা। সুতরাং মদের মাদকতা যেকোন বস্তুর ভিতর পাওয়া যাইবে তাহাও হারাম বলিয়া অবধারিত হইবে। ইমাম শাফেয়ী এইরূপ কিয়াসকে কিয়াসুল মানি (قياس المعنى) নামে আখ্যায়িত করিয়াছেন।

(গ) দুই প্রকার উল্লিখিত আদেশের মাঝখানে যদি এমন একটি তৃতীয় প্রকারের অবস্থা সৃষ্টি হয় যাহার আদেশ স্পষ্টতঃ জানা নাই- এরূপ ক্ষেত্রে তৃতীয় অবস্থাটিকে উল্লিখিত উভয়বিধ অবস্থার সহিত তুলনা করিয়া দেখিতে হইবে এবং অনন্মধ্যে যে অবস্থার সহিত উহার সৌসাদৃশ্য অধিকতর এবং প্রকটতর দেখা যাইবে উপপাদ্য বিষয়টি সম্বন্ধে সেই আদেশই প্রয়োজ্য হইবে। যথা, তায়াম্মুমের জন্য নিয়ত বা সংকল্প অন্যতম শর্ত কিন্তু বস্ত্রের পবিত্রতার এই দুই লকার আদেশের মধ্যভাগে ওযুর স্থান। কিন্তু বস্ত্রের পবিত্রতা অপেক্ষা তায়াম্মুমের সঙ্গেই ওযুর সৌসাদৃশ্য অধিকতর এবং প্রকটতর। কারণ ওযূ এবং তায়াম্মুম একই উদ্দেশ্য অর্থাৎ নামাযের শুদ্ধতার জন্য ব্যবস্থা হইয়াছে। কিন্তু বস্ত্রের বিশুদ্ধতার ব্যাপার এরূপ নয়। অধিকন্তু যে সকল কারণে ওযু নষ্ট হইয়া যায় তায়াম্মুম ভঙ্গকারী কারণগুলিও তাহাই, সুতরাং বস্ত্রের পবিত্রতা অপেক্ষা ওযুকে তায়াম্মুমের পর্যায়ভুক্ত করা অধিকতর বিধেয়। ইমাম শাফেয়ী এইরূপ কিয়াসকে 'কিয়াসে শুবাহ (قياس الشبه)' নাম দিয়াছেন।

ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী দুঃখ করিয়া লিখিয়াছেন যে, ইমাম আবু হানীফা তাঁর সমস্ত জীবন কিয়াসের প্রামাণিকতায় অতিবাহিত করিয়া গিয়াছেন। তাঁর প্রতিপক্ষের দল সকল সময় তাঁর বিরুদ্ধে হাদীসের অন্যথাচরণ এবং কিয়াস অনুসরণের অভিযোগ আরোপ করিতেন। ইমাম জাফর সাদিক তাঁর কাছে কিয়াস বাতিল হওয়ার অনেকগুলি দলীল উপস্থাপিত করিয়াছিলেন। কিন্তু বড়ই আশ্বর্যের বিষয়, ইমাম আবু হানীফা এই সকল অভিযোগের কখনও উত্তর প্রদান করেন নাই এবং কিয়াসের প্রামাণিকতা সম্বন্ধে কোন দলীল দেওয়াও আবশ্যক মনে করেন নাই। এই বিদ্যার একটি পৃষ্ঠাও তিনি লিপিবদ্ধ করিয়া যান নাই। পক্ষান্তরে ইমাম শাফেয়ীই সর্বপ্রথম কিয়াসের প্রামাণিকতা প্রকাশ করেন এবং এই শাস্ত্রে গ্রন্থাদি রচনা করিয়া বিদ্বানদিগকে উপকৃত করেন। অথচ তাঁর স্বভাবে হাদীসের অনুসরণ-রীতিই অধিকতর প্রবল ছিল। যে গভীর গবেষণা ও অধ্যবসায়-শক্তি প্রয়োগ করিয়া ইমামুল আয়েম্মাহ শাফেয়ী স্বকীয় মযহবের নীতি ও নিয়মগুলি আবিষ্কার করিয়াছিলেন এই একটি ঘটনা দ্বারাই তাহা অনুমান করা যাইতে পারে। তিনি স্বয়ং লিখিয়াছেন, ইজমার প্রামাণিকতার দলীল অনুসন্ধান করিতে গিয়া আমি প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত তিন শতবার কুরআন পাঠ করিয়াছিলাম এবং সর্বশেষে একটি আয়াত দ্বারাই আমি সকল সন্দেহের অবসান ঘটাইতে সমর্থ হইয়াছিলাম।

ফন্ট সাইজ
15px
17px