📘 ফিরকাবন্দি বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি 📄 আরও কয়েকটি বিতর্ক ও বিচার

📄 আরও কয়েকটি বিতর্ক ও বিচার


(ঙ) ইমাম শাফেয়ী একদা ইমাম আহমদ বিনে হাম্বলকে বলিলেন, কোন রাক্তি যদি একটি নামাযও পরিত্যাগ করে, আপনারা নাকি তাহাকে কাফের বলিয়া থাকেন।
ইমাম আহমদ: জী হাঁ।
শাফেয়ী: আচ্ছা সেই কাফের যদি পুনরায়-মুসলমান হইতে চায় তাহা হইলে তাহাকে কি করিতে হইবে?
আহমদ: তাহাকে নামায পড়িতে হইবে।
শাফেয়ী: তাহা হইলে আপনাদের কাছে কাফেরের নামাযও গ্রাহ্য? নামায সঠিক হওয়ার জন্য আপনারা কি ইসলামের শর্ত স্বীকার করেন না?
ইমাম শাফেয়ীর এই কথা শ্রবণ করিয়া তাঁর যশস্বী ও বরেণ্য ছাত্র ইমাম আহমদ বিনে হাম্বল মৌনালম্বন করিয়া রহিলেন।

(চ) হানাফী মযহবের কতিপয় বিদ্বান ব্যক্তি সমবেত হইয়া একদা ইমাম শাফেয়ীর সহিত পিতৃহীনের ধনে যাকাত ওয়াজিব হওয়া সম্পর্কে বিতর্কে প্রবৃত্ত হন। ইমাম শাফেয়ীর সিদ্ধান্ত এই যে, অপরিণত বয়স্ক পিতৃহীন বালক বালিকার ধনেও- যাকাতের আদেশ বর্তাইবে। উভয় পক্ষের মধ্যে যে সকল কথার আলোচনা হইয়াছিল, তাহার সারাংশ নিম্নে সংকলিত হইল।
হানাফী বিদ্বানগণ : আল্লাহ বলিয়াছেন,
أقيموا الصلوة وأتُوا الزكوة
"নামায প্রতিষ্ঠা কর এবং যাকাত দাও।" এই আয়াতে নামায এবং যাকাত তুল্য পর্যায়ে উল্লিখিত হইয়াছে। সুতরাং অপরিণত বয়স্ক পিতৃহীন বালক বালিকার জন্য যেরূপ নামায ফরয নয়, সেইরূপ তাহাদের ধনে যাকাতও ফরয হইতে পারে না। অধিকন্তু মদ্য পান ও ব্যভিচারের অপরাধের জন্যও ইসলামী দণ্ডবিধির বিধান তাহাদের উপর প্রযোজ্য নয়। এমন কি কুফরের মধ্যে লিপ্ত হইলেও মূর্তাদের দণ্ড তাহার উপর প্রযুক্ত হয় না। আরও রাসূলুল্লাহ (সা) আদেশ করিয়াছেন যে, তিন প্রকার মানুষ (শরীঅতের নির্দেশের) আওতার বাহিরে, যথা : শিশু, পাগল ও ঘুমন্ত ব্যক্তি।

শাফেয়ী : আপনারা যে অভিযোগ আমার উপর আরোপ করিতেছেন আপনারা স্বয়ং সেই অভিযোগে অভিযুক্ত। কারণ আপনারা অপরিণত বয়স্ক পিতৃহীনের জমির উৎপন্ন ফসলের দশমাংশ গ্রহণ করিয়া থাকেন। তাহাদের ধনে সাদাকাতুল ফিতর ওয়াজিব বলিয়া থাকেন সুতরাং কেমন করিয়া আপনারা শরীঅতের কতক নির্দেশ ইয়াতীমের উপর বলবৎ রাখিয়া আবার কতক নির্দেশ হইতে তাহাদিগকে মুক্ত রাখিতে পারেন? অধিকন্তু আল্লাহ তা'লা মৃত স্বামীর পরিত্যক্ত স্ত্রীর জন্য চারি মাস দশ দিনের ইদ্দত নির্ধারিত করিয়াছেন, আর আপনারা বালিকা এমন কি দুগ্ধ পোষ্য শিশুকেও এই আদেশের অনুসরণ ব্যাপারে বয়ঃপ্রাপ্তা নারীর মত ধরিয়া লইয়াছেন। এতদ্ব্যতীত দৈহিক এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণের ব্যাপারেও আপনাদের কাছে বালকরা বয়ঃপ্রাপ্ত পুরুষেরই পর্যায়ভুক্ত বিবেচিত হইয়া থাকে। এইভাবে আপনারা অপরিণত বয়স্ক শিশুদিগকে শরীঅতের কতক অনুশাসনের বাধা এবং কতক শাসন হইতে মুক্ত বিবেচনা করেন কেমন করিয়া? নামায ও যাকাতকে একই পর্যায়ভুক্ত বলিয়া ধরিয়া লইয়া আপনারা শিশুর প্রতি নামাযের মত যাকাতের আদেশও প্রযোজ্য হইবে না বলিয়া যে সিদ্ধান্ত করিয়াছেন, আপনাদের সেই সিদ্ধান্ত বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক নয়। যে ব্যক্তি নিঃস্ব তাহার উপর যাকাতের আদেশ প্রযোজ্য হয় না বলিয়া নামাযের আদেশও কি প্রয়োজ্য হইবে না? একজন ধনী ব্যক্তি প্রবাসে তাহার নামায সংক্ষেপ (কসর) করার অধিকারী হয় বলিয়া তাহার যাকাতের পরিমাণও কি কমিয়া যাইবে? বৎসরকাল ধরিয়া কোন ব্যক্তি উম্মাদ বা বেহুঁশ হইয়া থাকিলে তাহার জন্য নামাযের আদেশ বলবৎ থাকে না বলিয়া যাকাতের আদেশও কি রহিত হইয়া যাইবে? মকাতিব দাসদাসী অর্থাৎ যাহারা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদান করার বিনিময়ে মুক্তির প্রতিশ্রুতি লাভ করিয়াছে, তাহাদের ধনে যাকাত ওয়াজিব নাই বলিয়া তাহাদের জন্য নামাযের হুকুমও কি রহিত হইয়াছে?

প্রতিপক্ষ দল : আপনার বিচার পদ্ধতির চমৎকারিত্বে সন্দেহ নাই। কিন্তু সঈদ বিনে জুবায়র এবং ইব্রাহীম নখয়ী প্রমুখ প্রথিতযশা তাবেয়ী বিদ্বানগণও পিতৃহীন শিশুর ধনে যাকাত ওয়াজিব নাই বলিয়াই ব্যবস্থা দিয়াছেন।

শাফেয়ী : তাবেয়ী বিদ্বানগণ সম্বন্ধে হযরত ইমাম আবু হানীফা কি একথা বলিয়া যান নাই যে, তাঁহারাও মানুষ ছিলেন আর আমরাও মানুষ? আমরা শুধু আমাদের বিচার বুদ্ধি লইয়াই তাঁদের মতের অন্যথাচরণ করিতে পারি। অথচ রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসের অনুসরণে কতিপয় তাবেয়ী বিদ্বানের অভিমত মান্য করার জন্য আপনারা আমার দোষ ধরিতেছেন কেমন করিয়া?

প্রতিপক্ষ দল : হযরত আবদুল্লাহ বিনে মসউদের মত মহাবিদ্বান সাহাবীও তো এইরূপ কথাই বলিয়াছেন।

শাফেয়ী : ইবনে মসউদের অনুসরণ অপেক্ষা রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসের অনুসরণ করাই উত্তম। এতদ্ব্যতীত ইবনে মসউদের প্রমুখাৎ শুধু এইটুকুই বর্ণিত হইয়াছে যে, পিতৃহীন শিশুর অভিভাবক তাহার ধন হইতে যাকাত প্রদান করিবে না। একথার তাৎপর্য এই যে, শিশু স্বয়ং বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়া তাহার ধনের যাকাত পরিশোধ করিবে। পক্ষান্তরে ইবনে মসউদের রেওয়ায়ত প্রমাণিত নয়। ইহার জনৈক বর্ণনাদাতা অবিশ্বস্ত ব্যক্তি। সর্বশেষ কথা এই যে, আপনাদের মযহব অনুসারে কোন সাহাবীর উক্তি কেবল সেই ক্ষেত্রেই প্রামাণ্য বলিয়া গ্রাহ্য হইয়া থাকে যে স্থলে অন্য কোন সাহাবীর বিরোধ বিদ্যমান রহিবে না, আর বিভিন্ন সাহাবার ভিতর মতানৈক্য পরিলক্ষিত হইলে অনির্দিষ্ট ভাবে যে কোন সাহাবীর মীমাংসা গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হইবে। অপরিণত বয়স্ক শিশুর ধনে যাকাত ওয়াজিব হইবার পক্ষে হযরত আলী, হযরত উমর, আবদুল্লাহ বিনে উমর, জননী আয়েশা প্রভৃতির সিদ্ধান্ত এমন কি স্বয়ং রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসও মওজুদ রহিয়াছে。

বিতর্ক ও বিচারের জন্য বিদ্যাবত্তা ব্যতীত যে গভীর ধীশক্তি ও প্রখর বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন ইমাম শাফেয়ী শৈশবকাল হইতেই অধিকারী ছিলেন। ইমাম ইবনে জরীর তাবারী লিখিয়াছেন, একদা ইমাম শাফেয়ী ইমাম মালিকের দর্সের ক্লাশে উপস্থিত ছিলেন। তখনও ইমামের বয়স চতুর্দশ বৎসর অতিক্রম করে নাই। ইতিমধ্যে জনৈক ব্যক্তি ইমাম মালিকের নিকট আসিয়া নিবেদন করিল, ওগো আবদুল্লাহর পিতা, আমি বড়ই বিপন্ন হইয়াছি। আমি তোতা পাখী ক্রয় বিক্রয়ের ব্যবসা করি। আজ আমি জনৈক ব্যক্তির নিকট তোতা বিক্রয় করিয়াছিলাম। কিছুক্ষণ পর ক্রেতা আমার নিকট ফিরিয়া আসিয়া বলিল, তোমার তোতা কথা বলে না। এই বিষয়ে তাহার সহিত আমার বচশা হইল। আমি জোর গলায় তাহাকে বলিলাম, আমার তোতা কখনও নির্বাক থাকে না। যদি নির্বাক হয় তাহা হইলে আমার স্ত্রীর উপর তালাক। এখন জনাব, আপনি বলুন আমার কি উপায় হইবে? ইমাম মালিক সমুদয় বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া উত্তর দিলেন যে, তোমার স্ত্রীর উপর তালাক সংঘটিত হইয়াছে।

লোকটি অত্যন্ত বিমর্ষ হইয়া দুঃখিত চিত্তে বিলাপ করিতে করিতে বাড়ীর দিকে ফিরিয়া গেল, আর বালক শাফেয়ীও চুপি চুপি ক্লাস হইতে বাহির হইয়া উহার অনুসরণ করিলেন। কিছুদুরে গিয়া বালক শাফেয়ী তোতা ব্যবসায়ীকে জিজ্ঞাসা করিলেন যে, তোমার তোতাটি অধিকাংশ সময় সবাক থাকে, না নির্বাক? সে বলিল, বেশীর ভাগ সময় আমার তোতা কথা বলিয়া থাকে কিন্তু কখনও কখনও চুপও হইয়া যায়। বালক শাফেয়ী বলিলেন, যাও তোমার স্ত্রীর উপর তালাক সংঘটিত হয় নাই! এই কথা বলিয়া শাফেয়ী ক্লাসে ফিরিয়া আসিয়া স্বস্থানে উপবেশন করিলেন। ওদিকে জিজ্ঞাসাকারীও সঙ্গে সঙ্গে ইমাম মালিকের নিকট উপস্থিত হইয়া বলিতে লাগিল, হযরত! আমার বিষয়টা আরেকবার দয়া করিয়া বিশেষরূপে ভাবিয়া দেখুন। ইমাম সাহেব পুনশ্চ কিছুক্ষণ ধরিয়া চিন্তা করার পর বলিলেন যে, আমি যাহা পূর্বে তোমাকে বলিয়াছি তোমার জিজ্ঞাসার তাহাই সঠিক জওয়াব। লোকটি বলিল, আপনারই ছাত্রমন্ডলীর একজন আমাকে ফতওয়া দিয়াছেন যে, তালাক সংঘটিত হয় নাই।
ইমাম মালিক: সে ছাত্রটি কে?
জিজ্ঞাসাকারী শাফেয়ীর দিকে ইংগিত করিয়া বলিল, ঐ বালক ছাত্রটি এইরূপ ফতওয়া দিয়াছেন।
ইমাম মালিক অত্যন্ত রুষ্ট হইয়া শাফেয়ীকে বলিলেন, তুমি এই অবৈধ ফতওয়া কেমন করিয়া প্রদান করিলে?
শাফেয়ী: আমি উহাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম, তোমার তোতাটি বেশীর ভাগ সময় চুপ থাকে, না কথা বলে? সে বলিয়াছিল, তাহার তোতাটি অধিকাংশ সময় সবাক থাকে। এই জন্যই আমি উক্ত ফতওয়া প্রদান করিয়াছি।
শাফেয়ীর কথা শুনিয়া ইমাম মালিক অধিকতর ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিলেন এবং সরোষে শাফেয়ীকে ধমক দিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, সবাক বা নির্বাক থাকার সময়ের স্বল্পতা এবং আধিক্যের সহিত এই তালাকের কি সম্পর্ক?
শাফেয়ী: আপনি স্বয়ং উবায়দুল্লাহ বিনে যিয়াদের প্রমুখাতঃ রাসূলুল্লাহ (সা) এই হাদীস আমাকে শুনাইয়াছেন যে, ফাতিমা বিনতে কয়েস রাসূলুল্লাহর (সা) সমীপে উপস্থিত হইয়া নিবেদন করিলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা)! আবু জাহাম এবং মুআবিয়া উভয়েই আমাকে বিবাহের পয়গাম দিয়াছেন। আমি তাঁহাদের দুই জনার মধ্যে কাহার সহিত বিবাহিত হইব? হুযুর (সা) বলিলেন, "মুআবিয়া দরিদ্র ব্যক্তি আর আবু জাহাম কোন সময়ই তাঁহার কাঁধ হইতে লাঠি নামায় না।" শাফেয়ী বলিলেন, অথচ রাসূলুল্লাহ (সা) নিশ্চয়ই ইহা অবগত ছিলেন যে, আবু জাহাম পানাহার করিয়া থাকেন এবং নিদ্রাও যান। এই হাদীসটির সাহায্যে আমি বুঝিলাম যে, "আবু জাহাম কোন সময় তাঁহার কাঁধ হইতে লাঠি নামান না"। এই কথার দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সা) ইহাই বুঝাইতে চাহিয়াছিলেন যে, তাঁহার অধিকাংশ সময়ের আচরণকে রাসূলুল্লাহ (সা) সর্বকালীন আচরণরূপে অভিহিত করিয়াছেন। এই হাদীস অনুসারে তোতা বিক্রেতার এই উক্তি যে, আমার পাখী কখনও চুপ থাকে না, আমি এই তাৎপর্য গ্রহণ করিয়াছি যে, কখনও চুপ না থাকার অর্থ অধিকাংশ সময় চুপ না থাকা।

ইমাম মালিক তদীয় ছাত্র শাফেয়ীর বক্তব্য শ্রবণ করিয়া অত্যন্ত চমৎকৃত হইলেন এবং ছাত্রের প্রদত্ত ফতওয়াকেই বলবৎ রাখিলেন।

📘 ফিরকাবন্দি বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি 📄 গ্রন্থ পরিচয়

📄 গ্রন্থ পরিচয়


মুল্লা আলী কারী হানাফী মিরকাত নামক মিশকাতের ভাষ্য গ্রন্থে লিখিয়াছেন যে, ইমাম শাফেয়ী বিভিন্ন শাস্ত্রে একশত তের খানা গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন। ইবনে যুলাক বলেন যে, ইমাম শাফেয়ী ইসলামের মূলনীতি (অসূলে দ্বীন) সম্পর্কে চৌদ্দ খণ্ড আর ব্যবহারিক ফিকহে শতাধিক খণ্ড পুস্তক রচনা করিয়াছিলেন। ইমাম শাফেয়ীর ভুবন বিখ্যাত কিতাবুল উম নামক পুস্তকসহ যে সকল গ্রন্থ মিসরের বুলাকে মুদ্রিত হইয়াছে এবং যে গুলির নাম হাফিয ইবনে হজর আসকালানী ইমাম শাফেয়ীর জীবনীতে উল্লেখ করিয়াছেন তন্মধ্যে নিম্নলিখিত গ্রন্থগুলি সমধিক উল্লেখযোগ্য:

আহকামুল কুরআন, মুসনদে ইমাম শাফেয়ী, ইখতিলাফুল হাদীস, জুম্মাউল ইলম, ইবতালুল ইসতিহসান, কিতাব সিয়ারুল আওযায়ী, কিতাব আরাদ্দো আ'লা মুহাম্মদ বিনিল হাসান, কিতাব ইখতিলাফ আবু হানীফা ওয়া ইবনো আবি লাইলা, কিতাব ইখতিলাফ মালিক ওয়াশ শাফেয়ী, কিতাব ইখতিলাফ আলী ওয়া ইবনে মসউদ, কিতাব সিয়ারুল ওয়াকেদী, কিতাবুল উম, কিতাবুল কুরআ, কিতাবুর রিসালা, রিসালা কাদীমা, রিসালা জাদীদা, কিতাবুসসুনন ও কিতাবুল মাবসূত।

কিতাবুল-উম্
সমুদয় গ্রন্থের মধ্যে ইমাম শাফেয়ীর শাহকার (Masterpiece) হইতেছে তাঁর কিতাবুল উম্। এই গ্রন্থখানা রচনা করার জন্য তিনি চারি বৎসর কাল পরিশ্রম করিয়াছিলেন। ইমাম সাহেবের অপ্রতিদ্বন্দী বিদ্যাবত্তা ও কুশাগ্র প্রজ্ঞার বহুল পরিচয় এই গ্রন্থের পৃষ্ঠায় বিদ্যমান রহিয়াছে। বহু বিদ্বান ব্যক্তি এই অমূল্য গ্রন্থকে আশ্রয় করিয়া ইজতিহাদের আসনে সমারূঢ় হইয়াছেন। তিন হাজারেরও অধিক পৃষ্ঠায় এই গ্রন্থখানা সম্পূর্ণ হইয়াছে।

সিয়ারুল আওযায়ী
ইমাম আবদুর রহমান বিনে আম্ম আল্ আওযায়ী ৮৮ হিযরীতে জন্ম গ্রহণ করিয়া ইমাম আবু হানীফার (রহ) সাত বৎসর পর পরলোকপ্রাপ্ত হন। সিরিয়া ও স্পেনে তাঁরই ফিকহ প্রচলিত ছিল। তিনি সত্তর হাজার জিজ্ঞাসার উত্তর একক ভাবে প্রণয়ন করিয়াছিলেন এবং স্বয়ং একটি স্বতন্ত্র মযহবের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তিনি ইমাম আযম আবু হানীফার অনেকগুলি সিদ্ধান্তের খণ্ডন লিপিবদ্ধ করিয়াছিলেন। ইমামে আযমের প্রিয় ছাত্র ইমাম মুহাম্মদ বিনুল হাসান ইমাম আওযারীর খণ্ডনগুলির প্রতিবাদ লিখিয়াছিলেন। ইমাম শাফেয়ী যে গ্রন্থে ইমাম মুহাম্মদের উপরিউক্ত প্রতিবাদের সমুচিত জওয়াব লিখিয়াছিলেন এবং ইমাম আওযায়ীর সমর্থন করিয়াছিলেন তাহার নাম সিয়ারুল আওযায়ী।

ইখতিলাফে মালিক
ইমাম শাফেয়ী শুধু ইমাম আবু হানীফার (রহ) মত খন্ডন করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই। তিনি স্বীয় উসতায ইমাম মালিক বিনে আনাসের সঙ্গেও মতভেদ করিয়াছেন এবং প্রমাণিত করিয়াছেন যে, ইমাম মালিক আপন যুগের অদ্বিতীয় মহা মনীষী হইলেও অভ্রান্ত নহেন। ইমাম শাফেয়ী এই গ্রন্থের সূচনায় এই সূত্রটি নির্দেশিত করেন যে, একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি অপর বিশ্বস্তের নিকট হইতে সংলগ্ন রেওয়ায়তের সাহায্যে যদি রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস রেওয়ায়ত করেন তাহা হইলে উহাকে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস বলিয়া অবশ্যই গ্রাহ্য করিতে হইবে এবং রসূলুল্লাহর (সা) কোন প্রমাণিত হাদীস- উহার বিরুদ্ধে অপর কোন হাদীস না পাওয়া পর্যন্ত কিছুতেই পরিত্যাগ করা যাইতে পারিবে না। বিরোধের অবস্থায় একটি হাদীস যদি অপরটির সংশোধক বলিয়া বুঝিতে পারা যায় তাহা হইলে সংশোধক হাদীসটির অনুসরণ এবং অন্যটিকে বর্জন করা হইবে। আর যদি একটিকে অপরটির সংশোধক বলিয়া না বুঝা যায় তাহা হইলে যে হাদীসের রেওয়ায়ত প্রামাণিকতার দিক দিয়া অধিকতর বিশুদ্ধ হইবে সেইটির অনুসরণ করিতে হইবে। আর উভয়-হাদীসই যদি তুল্যভাবে প্রমাণিত হইয়া থাকে, তাহা হইলে যে হাদীসটির সমর্থন কুরআনে অথবা অন্য কোন সহীহ হাদীসে পাওয়া যাইবে তাহাই অনুসরণযোগ্য বিবেচিত হইবে। আর যদি সাহাবা বা তাবেয়ীগণের কোন সিদ্ধান্ত রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসের প্রতিকূল দেখিতে পাওয়া যায় তাহা হইলে সকল অবস্থায় রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসকেই অগ্রগণ্য এবং বিরুদ্ধ সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ ভাবে উপেক্ষা করিতে হইবে। [কিতাবুল উম (৭) ১৭৭ পৃষ্ঠা]।।

এই সূত্র স্থিরীকৃত করার পর ইমাম শাফেয়ী লিখিয়াছেন যে, ইমাম মালিক কতিপয় মসআলায় উপরিউক্ত নিয়মের অনুসরণ করিয়াছেন এবং কতকগুলি ব্যাপারে এই নিয়ম লঙ্ঘন করিয়াছেন। যে সকল মসআলায় ইমাম মালিক শুধু একজন সাহাবা বা তাবেয়ী অথবা শুধু নিজের ব্যক্তিগত কিয়াসের অনুসরণ করিয়া বিশুদ্ধ হাদীস বর্জন করিয়াছেন এবং স্বীয় অভিমতের পোষকতায় অলীক ইজমার দাবী করিয়াছেন, অতঃপর ইমাম শাফেয়ী এই গ্রন্থে ইমাম মালিকের সেই সকল মসআলার অবতারণা করিয়াছেন। ইমাম শাফেয়ী স্বীয় উসতায ইমাম মালিকের প্রতিবাদে লেখনী ধারণ করিলেন কেন, তাহার কথঞ্চিৎ আলোচনা আমরা ইতিপূর্বে করিয়াছি। এ সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ী স্বয়ং যাহা বলিয়াছেন এবং হাফিয ইবনে হজর যাহা উধৃত করিয়াছেন তাহাই যথেষ্ট বলিয়া আমরা বিবেচনা করিতে পারি। ইমাম সাহেব বলিয়াছেন,
إِن مالكا بشر يُخطئ ولا أخالف إلا من خالف سنة رسول - الله صلى الله عليه وسلم -
"ইমাম মালিক শেষ পর্যন্ত মানুষই ছিলেন। কাজেই তাঁরও ভুল ভ্রান্তি ঘটিত এবং যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাতের বিরোধ করিয়াছে আমি শুধু তাহারই বিরোধ করিয়া থাকি। [তওয়ালি উত্তাসীস]।"

ইখতিলাফ মুহাম্মদ বিনুল হাসান
এই গ্রন্থে ইমাম শাফেয়ী স্বীয় উসতায-ভ্রাতা এবং উসতায ইমাম মুহাম্মদ বিনুল হাসানের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের খন্ডন করিয়াছেন। ইমাম মুহাম্মদ স্বীয় উসতায আবু হানীফার সমর্থনে সর্বদা মদীনার ইমাম মালিক বিনে আনসের প্রতিবাদে ব্যাপৃত থাকিতেন। ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী মনাকীব গ্রন্থে লিখিয়াছেন যে, ইমাম শাফেয়ী স্বয়ং বলিয়াছেন, আমি ৬০ সুবর্ণ মুদ্রা ব্যয় করিয়া ইমাম মুহাম্মদের গ্রন্থগুলি ক্রয় করিয়াছিলাম এবং বিশেষ মনোযোগ সহকারে সেগুলি পাঠ করার পর তাঁর ভ্রান্তিসমূহ প্রতিপন্ন করিয়াছিলাম।

ইখতিলাফুল হাদীস
এই গ্রন্থে বিভিন্ন হাদীসমূহের মধ্যে সমন্বয় সাধনের নিয়ম লিপিবদ্ধ রহিয়াছে।

ইবতালুল ইসতিহসান
কুরআন, সুন্নাত ও ইজমা বিরোধী অভিমতের খণ্ডন।

কিতাবুরিসালা
স্বনামধন্য আহলে হাদীস ইমাম আব্দুর রহমান বিনে মাহদী ইমাম শাফেয়ী অপেক্ষা পনের বৎসরের বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু তাহা স্বত্বেও তিনি ইমাম শাফেয়ীকে কুরআন ও হাদীস এবং ইজমা ও কিয়াসের সাহায্যে কিভাবে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করিতে হয়, তাহার নিয়ম এবং নাসিখ ও মসুখ এবং অমুম ও খসূসের পরিচয় লিপিবদ্ধ করার জন্য অনুরোধ করিয়াছিলেন। তাঁরই অনুরোধক্রমে ইমাম সাহেব এই সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ রচনা করেন। আল্লামা আবুল কাসিম আনন্মাতী বলেন যে, "ইমাম শাফেয়ীর এই অমূল্য গ্রন্থখানা আমি পঞ্চাশ বৎসর ধরিয়া বারংবার পাঠ করিয়াছি এবং যতবার অভিনিবেশ সহকারে পাঠ করিয়াছি তত বারই উহার মধ্যে নূতন তথ্য আবিষ্কার করিতে সমর্থ হইয়াছি।"

এই দীন লেখকের অশেষ সৌভাগ্য যে, সে উল্লিখিত গ্রন্থসমূহের সন্দর্শন এবং পঠনের সুযোগ লাভ করিয়াছে এবং এই গ্রন্থগুলি তাহার পুস্তকাগারে সংরক্ষিত রহিয়াছে। ইমাম সাহেবের অন্যান্য গ্রন্থগুলি মুদ্রিত হইয়াছে কিনা, আমি তাহা অবগত নই-এমন কি তন্মধ্যে যেগুলি পৃথিবীর পৃষ্ঠ হইতে নিশ্চিহ্ন হইয়া গিয়াছে সেগুলির সংবাদ সরবরাহ করাও আমার পক্ষে সম্ভবপর হয় নাই।

📘 ফিরকাবন্দি বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি 📄 ইমাম শাফেয়ীর মযহব ও উক্তি

📄 ইমাম শাফেয়ীর মযহব ও উক্তি


(ক) ইমাম সাহেবের অন্যতম বিশিষ্ট ছাত্র বুওয়ায়তী তাঁর উসতাযের এই উক্তি বর্ণনা করিয়াছেন। ইমাম সাহেব বলিয়াছেন,
عليكم بأصحاب الحديث، فإنهم أكثر صوابا من غيرهم، وقال : إذا رأيت رجلا من أصحاب الحديث، فكأنما رأيت رجلا من أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم ! جزاهم الله خيرا، هم حفظوا لنا الأصل، فلهم علينا الفضل -
তোমরা আহলে হাদীসগণের দলভুক্ত থাকিও, কারণ তাঁহারা অন্যান্য দল অপেক্ষা অধিকতর সঠিক পথের পথিক। ইমাম সাহেব আরও বলিয়াছেন যে, কোন আহলে হাদীস বিদ্বানের সন্দর্শন লাভ রাসূলুল্লাহর (সা) সহচরবৃন্দের সন্দর্শন লাভের তুল্য। আল্লাহ তাহাদিগকে উত্তম পুরস্কার দান করুন! তাঁরাই আমাদের জন্য ধর্মের মূল বস্তু রক্ষা করিয়াছেন এবং এই জন্যই তাঁহারা আমাদের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর- [তিওয়ালি-উত্তাসীস, ৬৪ পৃঃ (বুলাক)]

(খ) ইমাম শা'রানী ও ভারত গুরু শাহ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী স্ব স্ব গ্রন্থে উধৃত করিয়াছেন যে, একদা ইমাম শাফেয়ী তদীয় ছাত্র ইমাম মুযানীকে বলিলেন,
يا ابراهيم ، لا تقلدني في كل ما أقول وانظر في ذلك لنفسك فانه دين -
দেখ ইবরাহীম, আমার প্রত্যেকটি কথার তুমি অন্ধভাবে অনুসরণ (তক্লীদ) করিও না। তুমি নিজেও বিবেচনা করিয়া দেখিবে, কারণ ইহা দীনের ব্যাপার।

(গ) তাঁহারা ইমাম শাফেয়ীর একথাও উধৃত করিয়াছেন যে,
لا حجة في قول أحد دون رسول الله صلى الله عليه وسلم وان كثروا، لا في قياس ولا في شئى -
রাসূলুল্লাহ (সা) ব্যতীত কাহারও কথাই দলীল নয়। তাঁদের সংখ্যা অধিক হইলেও নয়। কিয়াস অথবা অন্য কোন বিষয়েও নয়- [হিয়াওয়াকীৎ ওয়াল জওয়াহির (২) ২৪৩ পৃঃ, হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা: ১৬৩ পৃ, ইকদুল জীদ, ৮১ পৃঃ]।।

(ঘ) ইমাম সাহেব আরও বলিয়াছেন,
انظروا في أمر دينكم ، فإن التقليد المحض مذموم وفيه عمى للبصيرة، وكان يقول أيضا : قبيح على من أعطى شمعة ليستضنى بها أن يطفئها ويمشى في الظلام -
তোমরা তোমাদের দীনের ব্যাপার স্বয়ং বিবেচনা করিয়া দেখিও, কারণ শুধু তকলীদ অর্থাৎ, অন্ধ অনুসরণ দুষণীয় ব্যাপার, ইহা জ্ঞানের অন্ধত্ব। যাহাকে আলোর জন্য বাতি দেওয়া হইয়াছে, তাহার পক্ষে উক্ত বাতি নির্বাপিত করিয়া অন্ধকারে চলা অত্যন্ত নিন্দনীয়- [মিনহাজুল মুবীন (আমল বিল হাদীস, মহদী আলী ৮৩ পৃ.)]।।

(ঙ) ইমাম বয়হকী শাফেয়ীর প্রমুখাত তাঁর এই উক্তি বর্ণনা করিয়াছেন যে,
مَّثَلُ الَّذِى يَطْلُبُ الْعِلْمَ بِلَا حُجَّةٍ كَمَثَلِ حَاطِبِ لَّيْلٍ ، يَحْمِلُ حُزْمَةَ حَطَبٍ وَفِيْهِ افْعًى تَلْدَغُهٗ وَهُوَ لَا يَدْرِى -
প্রমাণবিহীন অভিজ্ঞতা যে অর্জন করিতে চায় তাহার অবস্থা অন্ধকারে জ্বালানী কাষ্ঠ সংগ্রহকারীর ন্যায়। খড়ির বোঝা সে বহন করিয়া চলিয়াছে, আর তাহার মধ্য হইতে একটি সাপ তাহাকে দংশন করিয়াছে, অথচ সে সাপের কথা কিছুই জানে না- [ই'লামুল মুয়াক্কেয়ীন (২) ৩০১ ও ৩০৯ পৃ]।।

(চ) শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়াহ ইমাম সাহেবের উক্তি উধৃত করিয়াছেন যে,
اِذَا رَايْتَ الْحُجَّةَ مَوْضُوْعَةً عَلَى الطَّرِيْقِ، فَهُوَ قَوْلِى !
প্রমাণ যদি পথে কুড়াইয়া পাও, উহাকেই আমার সিদ্ধান্ত বলিয়া জানিবে- [ফতাওয়া (২) ৩৮৪ পৃঃ]।।

(ছ) ইমাম মুযানী তদীয় মুগ্ধসর নামক ফিকহ গ্রন্থের সূচনায় লিখিয়াছেন যে,
اخْتَصَرْتُ هٰذَا الْكِتَابَ مِنْ عِلْمِ مُحَمَّدِ بْنِ اِدْرِيْسَ الشَّافِعِيّ (رح) وَمِنْ مَّعْنَى قَوْلِه لَا قُرْبَةَ عَلَى مَنْ أَرَادَهٗ مَعَ أَعْلَامِيَّةِ نَهْيِه عَنْ تَقْلِيْدِه وَتَقْلِيْدِ غَيْرِهٖ يَنْظُرُ فِيْهِ لِدِيْنِهٖ وَ يَحْتَاطُ فِيْهِ لِنَفْسِهٖ !
আমি মুহাম্মদ বিনে ইদরীস শাফেয়ী রাহেমাহুল্লাহর মযহবের সার সংকলন এই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করিলাম, যাহাতে এই বিদ্যা যাহারা আয়ত্ব করিতে চাহেন তাঁহাদের পক্ষে ইহা সহজসাধ্য হয়।
ইমাম সাহেবের এই ঘোষণাও আমি প্রচার করিতেছি যে, তিনি তাঁর নিজের এবং অপর বিদ্বানের তকলীদ করিতে নিষেধ করিয়া গিয়াছেন এবং নিজের দীনের ব্যাপারে স্বয়ং বিবেচনা করিয়া দেখিতে এবং সতর্ক হইয়া চলিতে উপদেশ দিয়াছেন- [মুগ্ধসর মুযানী (১) ১ম পৃঃ (কিতাবুল উম্ সহ-বুলাক প্রেসে মুদ্রিত)]।।

(জ) ইমাম সাহেবের অন্যতম ছাত্র হরমলা তুজীবী বলেন,
كل ماقلت وكان قول رسول الله صلى الله عليه وسلم خلاف قولى مما يصح، فحديث النبى صلى الله عليه وسلم أولى ولا تقلدوني -
শাফেয়ী বলিয়াছেন, আমার কোন উক্তি যদি রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশের প্রতিকূল দেখিতে পাও, তাহা হইলে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস অনুসরণীয় হইবে। তোমরা আমার উক্তির তকলীদ করিবে না- [আবু শামামুমেল-৩৮ পৃ]।।

(ঝ) হুসাইন করাবিছীকে একদা ইমাম শাফেয়ী বলিলেন যে,
ان أصبتم الحجة في الطريق مطروحة، فاحكم بها عنى فاني القائل بها -
যাহা প্রকৃত দলীল, তাহাকে যদি তোমরা পথের মাঝখানে পরিত্যক্ত অবস্থায় দেখিতে পাও, তাহা হইলে আমার নামে তোমরা তদনুসারেই ব্যবস্থা দিও। আমি উহার কথক। [ঐ]

(ঞ) ইমাম শাফেয়ী স্বীয় কিতাবুল উম্ নামক গ্রন্থে বলিয়াছেন,
إنه ليس لأحد دون رسول الله صلى الله عليه وسلم أن يقول إلا بالإستدلال -
রাসূলুল্লাহ (সা) ব্যতীত অন্য কোন বিদ্বানের পক্ষে প্রমাণ প্রয়োগ ছাড়া কোন কথা বলা বৈধ নয়- [রশীদ রিযা, মুহাবিরাৎ, ১০৭ পৃঃ]।।

(ট) একদা তিনি স্বীয় ছাত্র রুবাইয়অকে বলিলেন,
يا أبا اسحق ، لا تقلدني في كل ما أقول، وانظر في ذلك لنفسك فإنه دين -
ওগো ইসহাকের পিতা, আমার প্রত্যেকটি কথার তকলীদ করিও না, তুমি নিজেও বিবেচনা করিয়া দেখ। কারণ ইহা দীনের ব্যাপার- [মীযানুল কুরা (১) ৬৩ পৃ]।।

(ঠ) ইমাম সাহেব স্বীয় গ্রন্থ- রিসালায় লিখিয়াছেন,
ولم يجعل الله لأحد بعد رسول الله صلى الله عليه وسلم أن يقول إلا من جهة علم مضى قبله ومن جهة العلم بعد الكتاب فالسنة فالاجماع والآثار ثم ما وصفت من القياس عليها وهو غير الإستحسان -
রাসূলুল্লাহ (সা) ব্যতীত পূর্ববর্তী বিদ্যার আশ্রয় না লইয়া অথবা কুরআনের পর সুন্নাত এবং অতঃপর ইজমা ও আসারের সাহায্য বর্জন করিয়া কোন ব্যক্তিকে কথা বলার অধিকার আল্লাহ প্রদান করেন নাই। এইগুলির পর হইতেছে আমি যে কিয়াসের কথা বলিয়াছি উহার স্থান এবং উহা ইস্তিহসান নয়- [কিতাবুর রিসালা, ১৩৫ পৃঃ]।।

(ড) খতীব বাদগাদী ইমাম শাফেয়ীর নিম্নলিখিত উক্তি উধৃত করিয়াছেন:
لا يحل لأحد أن يفتى فى دين الله إلا رجلا عارفا بكتاب الله بناسخه و منسوخه ومحكمه ومتشابهه وتأويله وتنزيله ومكيه ومدنيه وما أريدبه ويكون بعد ذلك بصيرا بحديث رسول الله صلى الله عليه وسلم وبالناسخ والمنسوخ ويعرف من الحديث مثل ما عرف من القرآن ويكون بصيرا باللغة بصيرا بالشعر وما يحتاج إليه للسنة والقرآن ويستعمل هذا مع الأنصاف ويكون بعد هذا مشرفا على اختلاف أهل الأمصار وتكون له قريحة بعد هذا، فإذا كان هكذا فله أن يتكلم ويفتى فى الحلال والحرام .
যে ব্যক্তি আল্লাহর গ্রন্থের বিদ্যায় উহার সংশোধক ও সংশোধিত, সুস্পষ্ট ও অস্পষ্ট অংশের, উহার ব্যাখ্যা এবং অবতরণ, উহার মক্কী এবং মদনী আয়ত সমূহের এবং উহার তাৎপর্যের পাণ্ডিত্য অর্জন করে নাই এবং রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস সম্পর্কেও উহার নাসিখ্ ও মনসুখ এবং কুরআনের মত হাদীস সম্পর্কিত অন্যান্য বিদ্যাসমূহে অভিজ্ঞতা অর্জন করে নাই এবং অভিধান ও কাব্যে কুরআন ও হাদীস হৃদয়ঙ্গম করার উপযোগী এবং ন্যায়পরায়ণতার সহিত উহা প্রয়োগ করার মত বুৎপত্তি লাভ করে নাই এবং এই সমস্তের পর বিভিন্ন নগর সমূহের বিদ্বানগণের মতভেদ অবগত হয় নাই এবং গবেষণা কার্য্যের প্রকৃতিগত যোগ্যতা যাহার ভিতর নাই, এরূপ- ব্যক্তির পক্ষে আল্লাহর দীন সম্পর্কিত ব্যাপারে নিষ্পত্তি করা বৈধ হইবে না। এই সকল বিদ্যায় যে ব্যক্তি পারদর্শী, কেবল তাঁরই পক্ষে হালাল ও হারাম সম্বন্ধে ফতওয়া দান করা বিধেয় হইবে- [ই'লামুল মুওয়াক্কেয়ীন, (১) ৫২ পৃঃ]।।

(ঢ) বয়হকী ইমাম আহমদ বিনে হাম্বলের মধ্যস্থতায় ইমাম শাফেয়ীর উক্তি উধৃত করিয়াছেন যে,
القياس عند الضرورة ومع ذلك فليس العامل برأيه على ثقة من أنه وقع على المراد من الحكم فى نفس الأمر وإنما عليه بذل الوسع في الاجتهاد يوجر ولو أخطأ .
শুধু বিশেষ প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রেই কিয়াসের আশ্রয় লইতে হয় কিন্তু ইহা সত্বেও কিয়াসকারীর পক্ষে ইহা বলা সম্ভবপর নয় যে, সে যে সিদ্ধান্তে উপস্থিত হইয়াছে তাহা প্রকৃতপক্ষে বাস্তব ও অভ্রান্ত। তাঁর পক্ষে শুধু গবেষণার জন্য সকল শক্তি প্রয়োগ ছাড়া অন্য পন্থা নাই এবং এই গবেষণাকার্যে তাহার ভ্রান্তি ঘটিলেও সে পুরস্কৃত হইবে- [ফতহুল বারী (১৩)-২৪৫ পৃ।]।।

(ণ) রুবাইয়া বিনে সুলায়মান বলিতেছেন,-একদা জনৈক ব্যক্তি ইমাম শাফেয়ীকে একটি মসআলা জিজ্ঞাসা করিল, আমিও তথায় উপস্থিত থাকিয়া শ্রবণ করিতেছিলাম। জিজ্ঞাসাকারীর জওয়াবে ইমাম শাফেয়ী বলিলেন, এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সা) এই নির্দেশ বর্ণিত হইয়াছে। জিজ্ঞাসাকারী পুনরায় বলিল, আপনার ফতওয়াও কি ইহাই?
فار تعد الشافعي واصفر وحال لونه ، وقال : ويحك وأى أرض ثقلني وأى سماء تظلنى إذا رويت لرسول الله صلى الله عليه وسلم شيئا ولم اقل به ؟ نعم على الرأس والعين !
"জিজ্ঞাসাকারীর এই কথা শ্রবণ করিয়া ইমাম শাফেয়ী চমকিয়া উঠিলেন এবং বিবর্ণ হইলেন। মনে হইল যেন তাঁর দেহের রক্ত শুকাইয়া গিয়াছে। ইমাম সাহেব বলিয়া উঠিলেন, ওরে হতভাগা আমি রাসূলুল্লাহর (সা) কোন হাদীস বর্ণনা করার পর যদি তদনুসারে ফতওয়া না দেই, তাহা হইলে কোন্ মাটি আমার ভার বহন এবং কোন্ আকাশ আমাকে আচ্ছাদিত করিবে? হাঁ! হাঁ! রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস আমার মস্তক ও চক্ষুর উপর, উহাই আমার মযহব।" [ইকাযুল হিমম, ১০০ পৃঃ]।।

(ত) ইমাম সাহেবের উল্লিখিত ছাত্র ইমাম রুবাইয়া বিনে সুলায়মান বলেন যে, আমি একদা ইমাম শাফেয়ীকে এই কথা বলিতে শুনিলাম যে,
إذا وجدتم في كتابى خلاف سنة رسول الله صلى الله عليه وسلم فقولوا بسنة رسول الله صلى الله عليه وسلم ودعوا ماقلت !
তোমরা আমার গ্রন্থে যদি কোন কথা রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাতের প্রতিকূল দেখিতে পাও, তাহা হইলে রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাত অনুসারে ব্যবস্থা প্রদান করিও এবং আমার ফতওয়া প্রত্যাখ্যান করিও-- [ঐ, ঐ]

(থ) ইমাম হুমায়দী বলেন যে, জনৈক ব্যক্তি ইমাম শাফেয়ীকে একটি মস্আলা জিজ্ঞাসা করিল, তদুত্তরে ইমাম সাহেব রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস পাঠ করিলেন। লোকটি বলিল,
أتقول بهذا يا أبا عبد الله ؟ فقال الشافعي : أرأيت في وسطى زنارا؟ أتر اني خرجت من الكناسة؟ أقول : قال النبي صلى الله عليه وسلم وتقول لي : أتقول بهذا ؟ أروى عن النبي صلى الله عليه وسلم ولا أقول به ؟
এ বিষয়ে আপনার অভিমত কি? ইমাম শাফেয়ী বলিলেন, তুমি কি আমার কোমরে পৈতা দেখিয়াছ? তুমি কি আমাকে কোন গির্জা হইতে বাহিরে আসিতে দেখিয়াছ? আমি বলিতেছি: রাসূলুল্লাহ (সা) এরূপ বলিয়াছেন, আর তুমি জিজ্ঞাসা করিতেছ এ বিষয়ে আমার অভিমত কি? তুমি কি মনে কর আমি রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস রেওয়ায়ত করিব অথচ আমার অভিমত উহার প্রতিকূল হইবে? [ঐ ১০৪ পৃঃ]

(দ) রুবাইয়া ইমাম শাফেয়ীকে বলিতে শুনিলেন যে,
كل مسألة صح فيها الخبر عن رسول الله صلى الله عليه وسلم عند أهل النقل بخلاف ما قلت فأنا راجع عنها في حياتي وبعد موتى -
যে কোন মআলায় রাসূলুল্লাহর (সা) সহীহ হাদীস প্রমাণিত হইবে সেই সকল হাদীসের পরিপন্থী আমার সমুদয় উক্তিকে আমি আমার জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর প্রত্যাহার করিয়া লইতেছি- [ঐ ১০৪ পৃঃ]

(ধ) ইমামুল আয়েম্মা শাফেয়ী স্বীয় গ্রন্থে লিখিয়াছেন,
وقد سن رسول الله صلى الله عليه وسلم مع كتاب الله ، وسن فيما ليس فيه بعينه نص كتاب، وكل ماسن فقد الزمنا الله اتباعه وجعل في اتباعه طاعته وفى العنود عن اتباعه معصية التي لم يعذبها خلفاء ولم يجعل له من اتباع سنن رسول الله صلى الله عيه وسلم مخرجا لما وصفت -
রাসূলুল্লাহ (সা) কুরআনের সংগে সংগে অনেকগুলি বিষয় প্রবর্তিত করিয়াছেন। তাঁর প্রবর্তিত নির্দেশ সমূহের মধ্যে এমন কতকগুলি বিষয় রহিয়াছে, যেগুলি স্পষ্টভাবে কুরআনে উল্লিখিত হয় নাই এবং যাহাই রাসূলুল্লাহ (সা) প্রবর্তিত করিয়াছেন- আল্লাহ আমাদের জন্য সেগুলি অবশ্য প্রতিপালনীয় বলিয়া স্থিরীকৃত করিয়াছেন এবং রাসূলুল্লাহর (সা) আদেশের অনুসরণ কার্যকে আল্লাহ তাঁর আনুগত্য এবং রাসূলুল্লাহ (সা) অনুসরণের অবাধ্যতাকে আল্লাহ স্বীয় বিদ্রোহ ও পাপ বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন এবং এই অবাধ্যতার জন্য মানুষের কোন আপত্তিই তিনি গ্রাহ্য করেন নাই এবং রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাতের অনুসরণ হইতে মুক্ত হওয়ার কোন উপায়ই আল্লাহ রাখেন নাই- [কিতাবুর রিসালা, ২৭ পৃঃ]।।

হাফিয ইবনে হযর তাওয়ালি-উত্তাসীস গ্রন্থে, হাফিয ইবনুল কাইয়েম ই'লামুল মুয়াক্কেয়ীন গ্রন্থে, শাহ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দিস হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগা গ্রন্থে এবং আল্লামা ফুল্লানী ঈকাযুল হিমম পুস্তকে ইমাম শাফেয়ী রাহেমাহুল্লাহর এই বহু বিখ্যাত ও সুপ্রসিদ্ধ উক্তি উধৃত করিয়াছেন যে, ইমাম সাহেব প্রায়শঃ বলিতেন,
إذا صح الحديث فهو مذهبى وإذا رايتم كلامي يخالف الحديث فاعملوا بالحديث واضربوا بكلامي الحائط -
হাদীস বিশুদ্ধ প্রতিপন্ন হইলেই উহা আমার মযহব এবং তোমরা যদি আমার কোন উক্তি হাদীসের খেলাপ দেখিতে পাও, তাহা হইলে হাদীসের অনুসরণ করিও এবং আমার উক্তি প্রাচীরের বাহিরে ফেলিয়া দিও- [হুজ্জাতুল্লাহ (১) ১৬৩ পৃঃ; ঈকায-১০৭ পৃঃ]।

📘 ফিরকাবন্দি বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি 📄 ইমাম শাফেয়ীর মযহব ও অভিমত

📄 ইমাম শাফেয়ীর মযহব ও অভিমত


(ন) রুবাইয়া বলেন যে, একদা ইমাম শাফেয়ী বলিলেন, এমন কোন ব্যক্তি যাহার বিদ্যার সহিত সম্পর্ক রহিয়াছে অথবা জনগণ যাহাকে বিদ্বজ্জনমণ্ডলীর পর্যায়ভুক্ত করিয়াছে অথবা যিনি স্বয়ং নিজেকে বিদ্বানগণের অন্তর্ভুক্ত করিয়াছেন, তিনি কখনও এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন নাই যে, আল্লাহ তদীয় রাসূলের (সা) আদেশ অনুসরণ করা এবং তাঁর শাসন মান্য করা ফরয করিয়াছেন, কারণ- রাসূলুল্লাহর (সা) পর এমন কোন ব্যক্তি পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন নাই যিনি রাসূলুল্লাহর (সা) অনুসরণ করিতে আদিষ্ট হন নাই এবং আল্লাহর গ্রন্থ এবং রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নত ছাড়া কোন ব্যক্তির উক্তিই অবশ্য প্রতিপালনীয় বলিয়া নির্দেশিত হয় নাই। সমস্ত কথাকেই কুরআন ও সুন্নাতের অধীনস্ত বিবেচনা করিতে হইবে। আল্লাহ আমাদের প্রতি এবং আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তীগণের প্রতি রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস গ্রহণ করা ফরয করিয়াছেন। মাত্র একটি দল এই ব্যবস্থার অন্যথাচরণ করিয়া থাকে। রাসূলুল্লাহর (সা) যে হাদীস দুই একজন মাত্র রাবীর প্রমুখাৎ বর্ণিত হইয়াছে তাহার প্রামাণিকতা সম্পর্কে আহলে কালামের দল বিভিন্ন মতে বিভক্ত হইয়া পড়িয়াছেন। এই ভাবে জনগণ যাহাদের ফকীহ বলিয়া মানিয়া লইয়াছেন তাঁহাদের মধ্যেও মতভেদ সৃষ্টি হইয়াছে। ইহাদেরই কেহ কেহ সত্যানুসন্ধিৎসার পথ পরিহার করিয়া গতানুগতিকতা (তকলীদ) বিভ্রান্তি প্রাধান্যস্পৃহার পথ গ্রহণ করিয়াছেন।

(প) ইমাম আহমদ বিনে হাম্বল বলেন যে, একদা ইমাম শাফেয়ী আমাকে বলিলেন যে, দেখ! যদি কোন হাদীস তোমাদের কাছে বিশুদ্ধ প্রমাণিত হয় তাহা হইলে তৎক্ষণাৎ আমাকে সেই হাদীসের কথা জ্ঞাপন করিবে, যাহাতে আমি উহার অনুসরণ করিতে পারি। ইমাম আহমদ আরও বলিয়াছেন যে, ইমাম শাফেয়ীর যে আচরণ আমার চক্ষে সর্বাপেক্ষা সুন্দর বিবেচিত হইত তাহা এই যে, তাঁর অজ্ঞাত কোন হাদীস যদি তিনি শ্রবণ করিতেন তাহা হইলে তিনি তৎক্ষণাৎ তাহার অনুসরণ করিতেন এবং স্বীয় ব্যক্তিগত অভিমত প্রত্যাহার করিয়া লইতেন।

(ফ) রুবাইয়া বলিলেন যে, ইমাম শাফেয়ী একদা আমাকে আদেশ করিলেন যে, রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস কোনক্রমেই পরিহার করিও না, উহার ভিতর কিয়াসের স্থান নাই এবং কোন অবস্থাতেই কিয়াস সুন্নাতের সম-আসন অধিকার করার যোগ্য নয়।

(ব) রুবাইয়া বলেন, আমি একদা ইমাম শাফেয়ীকে নামাযে হস্তোত্তোলন (রফউল ইয়াদায়েন) করা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করায় তিনি বলিলেন,
يرفع المصلى يديه إذا افتتح الصلوة حذو منكبيه و إذا أراد أن يركع و إذا رفع رأسه من الركوع رفعهما كذلك، ولا يفعل ذلك في السجود -
নামাযী যখন নামায আরম্ভ করিবে তখন সে তাহার উভয় হস্ত স্কন্ধ পর্যন্ত উত্তোলন করিবে এবং যখন রুকু করিতে উদ্যত হইবে এবং রুকু হইতে মস্তক উত্তোলন করিবে তখনও অনুরূপ ভাবে রফউল ইয়াদায়েন করিবে। কিন্তু সিজদায় এরূপ করিবে না।

রুবাইয়া বলিলেন, একথার প্রমাণ কি? ইমাম শাফেয়ী বলিলেন,
أنبأنا ابن عيينة عن الزهرى عن سالم بن عبد الله بن عمر عن النبي صلى الله عليه وسلم مثل قولنا -
সুফ্যান ইবনে উআয়না আমার নিকট হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন যে, যুহরী আব্দুল্লাহ বিনে উমরের পুত্র সালিমের প্রমুখাৎ এবং তিনি স্বীয় পিতার বাচনিক অবগত হইয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের এই উক্তির অনুরূপই আদেশ করিয়াছেন।

রুবাইয়া বলিলেন, আমরা কিন্তু বলিয়া থাকি যে, নামাযী কেবল নামাযের সূচনাতেই হস্তোত্তোলন করিবে, পুনশ্চ আর করিবে না। ইমাম শাফেয়ী বলিলেন,
أخبرنا مالك عن نافع أن ابن عمر كان إذا افتتح الصلوة رفع يديه حذو منكبيه وإذا رفع رأسه من الركوع رفعهما -
ইমাম মালিক আমার নিকট নাফেয়ের প্রমুখাৎ রেওয়ায়ত করিয়াছেন যে, আব্দুল্লাহ বিনে উমর যখন নামায আরম্ভ করিতেন, তখন স্কন্ধ পর্যন্ত হস্ত উত্তোলন করিতেন এবং যখন রুকু হইতে মাথা তুলিতেন তখনও।

শাফেয়ী বলিলেন, তুমি দেখিতেছ, ইমাম মালিক স্বয়ং রাসূলুল্লাহর (সা) প্রমুখাৎ রেওয়ায়ত করিতেছেন যে, হযরত (সা) নামাযের প্রারম্ভে স্কন্ধ পর্যন্ত হস্ত উত্তোলন করিতেন এবং রুকু হইতে মস্তক উঠাইবার সময়েও হস্ত উত্তোলন করিতেন। কিন্তু তোমরা এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) এবং ইবনে উমরের বিরুদ্ধাচরণ করিতেছ আর বলিতেছ যে, নামাযের সূচনা ব্যতীত অন্য সময়ে হস্তোত্তোলন করা হইবে না। অথচ তোমরাই রেওয়ায়ত করিতেছ যে, রাসূলুল্লাহ (সা) এবং ইবনে উমর নামাযের সূচনায় এবং রুকু হইতে মাথা উঠাইবার সময় হস্তোত্তোলন করিতেন। কোন বিদ্বানের পক্ষে নিজের ব্যক্তিগত মতের অনুসরণ করিয়া রাসূলুল্লাহ (সা) এবং ইবনে উমরের আচরণের অনুসরণ বর্জন করা কি জায়েয হইতে পারে? তারপর তৃতীয় ক্ষেত্রে ইবনে উমরের কথা সূত্রে তিনি স্বয়ং রাসূলুল্লাহর (সা) প্রমুখাৎ যাহা রেওয়ায়ত করিয়াছেন তাহা কেমন করিয়া ছাড়া হইল? তাঁর বর্ণিত হাদীসের কতকাংশ গৃহীত আর কতকাংশ পরিত্যক্ত হইল কেন? রাসূলুল্লাহর (সা) প্রমুখাৎ দুইবার অথবা তিনবার হস্তোত্তোলন করার হাদীস রেওয়ায়ত করা যদি ইমাম মালিকের পক্ষে বৈধ হইয়া থাকে এবং ইবনে উমরের প্রমুখাৎ যদি দুইবার হস্তোত্তোলন করা তিনি রেওয়ায়ত করিয়া থাকেন এবং তন্মধ্যে এক বার হস্তোত্তোলন করার হাদীস যদি তিনি গ্রহণ করিয়া থাকেন তাহা হইলে যাহা তিনি পরিত্যাগ করিয়াছেন কাহারও পক্ষে তাহা গ্রহণ করা বা যাহা তিনি গ্রহণ করিয়াছেন তাহা বর্জন করা সঙ্গত হইবে কি? সর্বোপরি রাসূলুল্লাহর (সা) প্রমুখাৎ যাহা বর্ণিত হইয়াছে অন্য কাহারও পক্ষে তাহা পরিহার করা বৈধ হইবে কি?

রুবাইয়া বলিলেন, আমাদের ইমাম মালিক বলিয়াছেন,- হস্তোত্তোলন করার তাৎপর্য কি? শাফেয়ী বলিলেন, হস্তোত্তোলন করার তাৎপর্য হইতেছে, আল্লাহর প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং আল্লাহর রাসূলের (সা) সুন্নাতের অনুসরণ। নামাযের সূচনায় হস্তোত্তোলন করার যে অর্থ, রুকুতে যাইবার প্রাক্কালে এবং রুকু হইতে মাথা উঠাইবার সময়েও [অর্থাৎ যে দুই ক্ষেত্রে হস্তোত্তোলন করা সম্পর্কে তোমরা আল্লাহর রাসূলের (সা) বিরোধ করিয়াছি] তাহার অর্থ উহাই। অধিকন্তু তোমরা রাসূলুল্লাহ (সা) এবং ইবনে উমর-উভয়ের প্রমুখাৎ তোমাদেরই রেওয়ায়তের তোমরা একই সঙ্গে বিরোধ করিতেছ অথচ রফউল ইয়াদায়েনের হাদীস রাসূলুল্লাহর (সা) বহু গণ্যমান্য সাহাবী ইহার অনুসরণ করিতেন। সুতরাং যে ব্যক্তি রফউল ইয়াদায়েন পরিত্যাগ করিবে সে সুন্নাতের পরিত্যাগকারী হইবে।

ইমাম আহমদ ইমাম শাফেয়ীর প্রমুখাৎ এই রেওয়ায়তই করিয়াছেন যে, ইমাম শাফেয়ী বলিয়াছেন, রূকুতে যাওয়ার প্রাক্কালে এবং রুকু হইতে উঠার সময়ে যে ব্যক্তি রফউল ঈয়াদায়েন বর্জনকারী, সে আল্লাহর রাসূলের (সা) সুন্নাতের বর্জনকারী।

(ম) হজ্জের সময়ে ইহরামের পূর্বে যদি সুগন্ধি ব্যবহার করা হয় এবং উহার গন্ধ যদি ইহরামের পর অথবা জমরাতে প্রস্তরাঘাতের পর অথবা মস্তক মুণ্ডনের পর অথবা তওয়াফে ইফাযার পূর্ব পর্যন্ত অবশিষ্ট রহিয়া যায় তাহার ব্যবস্থা সম্পর্কে রুবাইয়া ইমাম শাফেয়ীকে জিজ্ঞাসা করায় তিনি বলিলেন, ইহরামের পূর্বে সুগন্ধি ব্যবহার করা জায়েয। আমি ইহা পছন্দ করি এবং আমি ইহাকে দূষণীয় মনে করি না। কারণ রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাতে ইহা প্রমাণিত রহিয়াছে এবং একাধিক বিশিষ্ট সাহাবা এরূপ করিয়াছেন।

রুবাইয়া একথার প্রমাণ চাহিলে ইমাম শাফেয়ী হাদীস এবং 'আসার' আবৃত্তি করিয়া শোনান এবং বলেন, ইবনে উআয়না আমার নিকট আমর বিনে দীনারের প্রমুখাৎ এবং তিনি সালিমের বাচনিক হাদীস বর্ণনা করিয়াছেন যে, হযরত উমর বলিয়াছেন, জমরায় প্রস্তর নিক্ষেপ করার পর স্ত্রী সহবাস ও সুগন্ধি ব্যবহার ব্যতীত সমুদয় নিষিদ্ধ কার্যকলাপ হালাল হইয়া যায় এবং মা আয়েশা বলিতেছেন, তওয়াফে ইফাযার পূর্বেই (জমরায় প্রস্তর নিক্ষেপের পর মীনা হইতে আসিয়া বয়তুল্লাহ শরীফ প্রদক্ষিণ করার কার্যকে তওয়াফে ইফাযা বলা হয়) আমি স্বয়ং রাসূলুল্লাহর (সা) কে সুগন্ধি মাখাইয়াছিলাম। আবদুল্লাহ বিনে উমরের পুত্র সালিম বলিতেছেন যে, রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাতই অনুসরণের অধিকতর যোগ্য। অর্থাৎ সালিম স্বীয় পিতামহ দ্বিতীয় খলীফা উমর ফারুকের ফতওয়া রাসূলুল্লাহ (সা) হাদীসের সমক্ষতায় বর্জন করিতে কিছুমাত্র দ্বিধা করিলেন না। ইমাম শাফেয়ী সালিমের উক্তি প্রসঙ্গে বলিতেছেন, সাধু সজ্জন এবং বিদ্বানগণের আচরণ এইরূপ হওয়াই বাঞ্ছনীয় আর যাহারা ব্যক্তিগত অভিমতের অনুসরণ করিয়া সুন্নাতের নির্দেশ বর্জন করিয়া থাকে, সেইরূপ বিদ্বানগণের উক্তি স্ব স্ব বিদ্যা ও বিবেচনা অনুসারে গ্রহণীয় ও বর্জনীয় হইবে।

(য) ইমাম শাফেয়ী ঋণগ্রস্তের সম্পত্তি বিক্রয় সম্পর্কে যে ফতওয়া প্রদান করিয়াছিলেন, তদুত্তরে জনৈক ব্যক্তি তাঁহাকে বলেন যে, আপনি আপনার কোন কোন উসতাযের বিরোধ করিলেন। ইমাম শাফেয়ী স্বীয় পুরাতন গ্রন্থে (যা আফরানীর মধ্যস্থতায় যে গ্রন্থগুলি প্রকাশিত হইয়াছে) এই কথার জওয়াব লিখিয়াছেন যে, যিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাতের অনুগমন করিয়াছেন আমি তাঁর সহযোগী হইয়াছি এবং যিনি ভুল করিয়া উহা পরিত্যাগ করিয়াছেন আমি তাঁর বিরোধ করিয়াছি। যে সহচরকে আমি কখনও বর্জন করিব না তাহা রাসূলুল্লাহর (সা) সুদৃঢ় এবং সুপ্রমাণিত সাহচর্য এবং যিনি রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস অনুসারে ব্যবস্থা প্রদান করেন না তিনি আমার নিকটতম ব্যক্তি হইলেও আমি তাঁহাকে পরিহার করিব- [ই'লামুল মুআক্কেয়ীন, ঈকাযুল হিমম, ১০৪-১০৭ পৃঃ]।

ফন্ট সাইজ
15px
17px