📄 মিসরে পদার্পণ
বড়ই আশ্চর্যের বিষয়, ইমাম শাফেয়ী তদীয় কবিতায় দুইটি বিষয়ের মধ্যে যে কোন একটির প্রত্যাশা করিলেও মিসরে তিনি উভয় বস্তুরই অধিকারী হইয়াছিলেন। ১৯৮ হিজরীতে ইমাম শাফেয়ী মিসরে উপস্থিত হইবার সংগে সংগেই উক্ত প্রদেশের শাসনকর্তা রাজকোষ হইতে অভাবগ্রস্ত জ্ঞাতির অংশ ইমাম শাফেয়ীর জন্য বরাদ্দ করিয়া দিলেন। ফলে তিনি জীবিকার চিন্তা হইতে নিশ্চিন্ত হইয়া নবোদ্যমে স্বীয় ফিক্হী স্কুলের প্রতিষ্ঠা কল্পে সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করিলেন। আব্দুল্লাহ বিনে আবদুল হাকাম (মৃঃ ২১৪ হি) মুহাম্মদ বিনে আবদুল্লাহ বিনে আবদুল হাকাম (মৃঃ ২৭৮ হিঃ) রুবাইয়অ বিনে সুলায়মান, (মৃঃ ২৭০ হিঃ) ইসমাঈল বিনে ইয়াহয়া মুযানী (মৃঃ ২৬৪ হিঃ), ইউসুফ বিনে ইয়াহয়া বুওয়ায়তী (মৃঃ ২৩১ হিঃ) প্রভৃতি প্রথিতযশা বিদ্বানগণ কেহ মালিকী ও কেহ হানাফী স্কুল পরিত্যাগ করিয়া ইমাম সাহেব কর্তৃক স্থাপিত নূতন শাফেয়ী দলে দীক্ষিত হইলেন। মিসরেই ইমাম সাহেব তাঁর মযহব অনুসারে বিশ্ববরেণ্য গ্রন্থরাজি যথা কিতাবুল উম, ইমলায়ে কুরা, ইমলায়ে সগীর, মুখতসর বওয়ায়তী, মুখতসর মুযানী, মুখতসর রুবাইয়অ ও কিতাবুসসুনন প্রভৃতি রচনা করিয়াছিলেন।
ইমাম শাফেয়ী বাগদাদে অবস্থানকালীন আপন গ্রন্থ সমূহে যে সকল সিদ্ধান্ত সন্নিবেশিত করিয়াছিলেন, সেগুলি "মহযবে কদীম" আর মিসরে লিখিত গ্রন্থরাজিতে বর্ণিত অভিমত "মযহবে জদীদ" বলিয়া শাফেয়ী ফিক্হে উল্লিখিত হইয়াছে।
📄 ইমাম শাফেয়ীর পরিগৃহীত ব্যবহারিক মযহব
১৯৫ হিজরী অর্থাৎ বাগদাদে প্রবেশ করার অব্যবহিত কাল পূর্ব পর্যন্ত ইমাম শাফেয়ী ইমাম মালিকের সর্বাপেক্ষা বড় সমর্থক ছিলেন, কিন্তু যখন তিনি বুঝিতে পারিলেন, যে, ইমাম মালিকের অন্ধ ভক্তের দল তাঁর উক্তি ও সিদ্ধান্ত সমূহকে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসেরও উর্ধেস্থান দিতে আরম্ভ করিয়াছেন এবং তাঁহাকে প্রমাদহীন সাব্যস্ত করিতে দৃঢ়সংকল্প হইয়াছেন তখন ইমাম শাফেয়ী বাধ্য হইয়া রাসূলুল্লাহ (সা) হাদীস সমূহের রক্ষী এবং প্রহরীরূপে ইমাম মালিকের মযহবের সমালোচনায় প্রবৃত্ত হইলেন।
📄 মযহবী ফিরকাবন্দীর প্রতিবাদঃ ইমাম শাফেয়ীর বৈশিষ্ট্য
মযহবী ফিরকাবন্দীর প্রতিবাদ
ইমাম শাফেয়ী একাধারে ইমাম মালিক, ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম আওযায়ীর সিদ্ধান্ত সমূহের কঠোর প্রতিবাদে প্রবৃত্ত হন। স্বীয় উসতায ইমাম মালিকের বিরোধ করিতে গিয়া তিনি এক বৎসর কাল ধরিয়া ইতস্ততঃ করিয়াছিলেন। এ সম্পর্কে তাঁর গ্রন্থ "খিলাফু মালিক" ভূবন বিখ্যাত। ইমাম ফকরুদ্দীন রাযী লিখিয়াছেন, ইমাম শাফেয়ী অবগত হইলেন যে, স্পেনে ইমাম মালিকের একটি টুপী আছে, মালেকীরা সেই টুপির দোহাই দিয়া বৃষ্টির প্রার্থনা করিয়া থাকে। এবং সকল অন্ধভক্তদের যখন বলা হইত যে, রাসূলুল্লাহ (সা) এইরূপ বলিয়াছেন, তাহারা সে কথার জওয়াবে তৎক্ষণাৎ বলিত, ইমাম মালিক এইরূপ বলিয়াছেন। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি অবলোকন করিয়া ইমাম শাফেয়ী ইহা প্রতিপন্ন করিতে দৃঢ় সংকল্প হইলেন যে, ইমাম মালিক যত বড়ই বিদ্বান হউন না কেন তিনি নবী বা রাসূল ছিলেন না এবং তাঁহাকে অভ্রান্ত ও প্রমাদবিহীন মনে করা মুর্খতার নিদর্শন মাত্র। তাই যে সকল সিদ্ধান্তে ইমাম মালেকের ভ্রান্তি ঘটিয়াছিল, ইমাম শাফেয়ী অকাট্য প্রমাণ সহকারে সেগুলির স্বরূপ স্বীয় গ্রন্থে উদঘাটিত করিলেন। এই ভাবে তিনি ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম আওযায়ীর মযহবের ভ্রান্তিগুলিও ধরাইয়া দিয়াছিলেন।
ইমাম শাফেয়ীর বৈশিষ্ট্য
ইমাম মালিক (র) এবং ইমাম আবু হানীফার (র) মযহবদ্বয়ের মূলনীতি এবং বিস্তৃত ব্যাখ্যা যখন পুস্তকাকারে সংকলিত হইতে আরম্ভ করে, সেই সময় ইমাম শাফেয়ী (র) আবির্ভূত হন। তিনি পূর্ববর্তী বিদ্বানগণের কার্যকলাপ অভিনিবেশ সহকারে পর্যবেক্ষণ করেন এবং সেগুলির মধ্যে এমন অনেক বিষয় লক্ষ্য করেন যে, অবশেষে তিনি ইমাম মালিক (র) ও ইমাম আবু হানীফার (র) স্থাপিত স্কুল দুইটিকেই পরিহার করিতে বাধ্য হন। ইমাম সাহেব এই সকল কথার আলোচনা তাঁর স্বনামধন্য "উম্" নামক গ্রন্থের সূচনায় করিয়াছেন।
১। তিনি দেখিতে পান যে, তাঁর পূর্ববর্তী ইমামদ্বয় 'মুরসল' ও 'মুনকাতা' উভয়বিধ হাদীস গ্রহণ করিতে অভ্যস্ত ছিলেন এবং এই কারণে তাঁদের উক্তির ভিতর ত্রুটি ও বৈষম্য ঘটিয়াছিল কারণ হাদীসের সনদ এবং মতনের সবগুলি পদ্ধতি একত্রিত করিয়া তিনি দেখিতে পান যে, অনেকগুলি মুরসল হাদীস ভিত্তিহীন। অধিকন্তু অনেকগুলি মুরসাল হাদীস মুসনদ হাদীসের পরিপন্থী। ফলে ইমাম শাফেয়ী মুরসল হাদীস গ্রহণ করার জন্য কতকগুলি নিয়ম প্রণয়ন করেন। এই নিয়মগুলি উসুলে ফিক্হে গ্রন্থে সবিস্তারে বর্ণিত রহিয়াছে।
২। তিনি দেখিতে পান যে, বিভিন্নরূপী 'নস্' সমূহের মধ্যে সমন্বয় ঘটাইবার কোন নিয়ম হানাফী ও মালেকীদের কাছে নাই। এই জন্য তাঁদের ইমামদ্বয়ের ইজতিহাদী মসআলা সমূহে গোলযোগ ঘটিয়াছে। ইমাম শাফেয়ী কুরআনের বিভিন্ন আয়াত, হাদীসের বিভিন্ন উক্তি এবং কুরআন ও হাদীসের নির্দেশ সমূহের মধ্যে পার-স্পরিক সমন্বয় ও সামঞ্জস্য প্রতিপাদন কল্পে একখানা মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন। পৃথিবীতে উসুলে ফিক্হে ইহাই সর্বপ্রথম গ্রন্থ।
(ক) ইমাম শাফেয়ীর উসুল বুঝিতে হইলে নিম্নলিখিত ঘটনাটি অনুধাবন করা কর্তব্য। ইমাম শাফেয়ী যখন বাগদাদে ইমাম মুহাম্মদের নিকট আগমন করেন, তখন তিনি শুনিতে পান যে, ইমাম মুহাম্মদ মদীনার বিদ্বানগণকে এই বলিয়া বিদ্রূপ করিতেছেন যে, তাঁহারা একজনের সাক্ষ্য আর একটি শপথের সাহায্যে বিচার মীমাংসা করার অনুমতি দিয়া থাকেন। তিনি বলিতেছিলেন, মদীনার বিদ্বানগণের এই আচরণ কুরআনের অতিরিক্ত (যায়েদ আলাল কিতাব)। হানাফীগণ "খবরে ওয়াহিদ" অর্থাৎ একজন রাবীর বর্ণিত হাদীস দ্বারা কুরআনের নির্দেশের অতিরিক্ত কোন মীমাংসা গ্রাহ্য করেন না। কুরআনে বর্ণিত সাক্ষ্য আইনের বিধান এই যে, দুইজন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ আর দুইজন নারীর সাক্ষ্য ও একটি শপথ দ্বারাও বিচার মীমাংসা করার অনুমতি বিদ্যমান রহিয়াছে। হানাফীগণ এই হাদীস দ্বিবিধ কারণে অগ্রাহ্য করিয়াছেন। প্রথমতঃ উহা কুরআনের নির্দেশিত বিধানের অতিরিক্ত। দ্বিতীয়তঃ এই হাদীসের মূল রাবী একজন মাত্র। ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মুহাম্মদের বিদ্রূপের জওয়াবে বলিলেন যে, সত্যই কি আপনাদের কাছে "খবরে ওয়াহিদ" দ্বারা কুরআনের অতিরিক্ত কোন কিছুই গ্রহণীয় নয়? ইমাম মুহাম্মদ বলিলেন, ইহাই আমাদের মযহব। ইমাম শাফেয়ী প্রশ্ন করিলেন যে, তাহা হইলে ওয়ারিসের জন্য ওসীয়ৎ নাই’ রাসূলুল্লাহ (সা) এর হাদীস সূত্রে আপনারা ওয়ারিসের জন্য ওসীয়ৎকে অবৈধ বলিয়া থাকেন কেন,? অথচ কুরআনে উক্ত হইয়াছে যে, তোমাদের কাহারও সম্মুখে মৃত্যু ঘনাইয়া আসিলে সে যদি বিত্তশীল হয়, তাহা হইলে তাহাকে পিতামাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের জন্য ন্যায়সংগত ভাবে ওসীয়ৎ করিয়া যাইতে হইবে (আলবাকারা, ১৮০ আয়াত)।
এইভাবে ইমাম শাফেয়ী আরও কয়েকটি দৃষ্টান্ত উত্থাপিত করেন এবং ইহার ফলে শেষ পর্যন্ত ইমাম মুহাম্মদ চুপ করিয়া যাইতে বাধ্য হন।
৩। ইমাম শাফেয়ী দেখিতে পান, যে সকল তাবেয়ী ফতওয়া প্রদান করার অধিকার পাইয়াছিলেন, অনেকগুলি বিশুদ্ধ হাদীস তাঁদের অপরিজ্ঞাত ছিল। আর এই জন্য তাঁহারা ইজতিহাদের আশ্রয় গ্রহণ এবং সাধারণ নিয়মের অনুসরণ অথবা পরবর্তী সাহাবাগণের অনুসরণ করিয়া তদনুসারে ফতওয়া দিয়াছিলেন। অতঃপর তৃতীয় স্তরের বিদ্বানগণ সেই সকল হাদীস অবগত হইবার সুযোগ লাভ করা সত্ত্বেও তাঁহারা সেগুলি প্রত্যাখান করেন। তাঁহারা মনে করিয়াছিলেন, এই হাদীসগুলি আমাদের নগরের বিদ্বানগণের পরিগৃহীত আচরণ এবং রীতির পরিপন্থী। ফলে নাগরিক বিদ্বানগণের রীতি এবং আচরণের দরুণ রাসূলুল্লাহর (স) বহু হাদীস দুষণীয় বিবেচিত হইতে থাকে। তৃতীয় স্তরের বিদ্বানগণ অতিক্রান্ত হওয়ার পর আহলে হাদীস বিদ্বানগণ হাদীস সমূহের বিভিন্ন সনদ ও মতগুলি পরীক্ষা করিয়া দেখিলেন এবং দেশ দেশান্তর পর্যটন করিয়া বিদ্বাজ্জনমণ্ডলীর সাক্ষাৎকার অর্জন করিলেন তখন আরও বহু হাদীস এরূপ প্রকাশ লাভ করিল যেগুলি সাহাবীগণের মধ্যে মাত্র দুই একজন এবং তাঁদের শিষ্যগণের মধ্যে মাত্র দুই একজন এবং তদীয় শিষ্যগণের মধ্যেও দুই একজন রেওয়ায়ত করিয়াছিলেন, এই সকল হাদীস ফিকাহ শাস্ত্রের বিদ্বানগণের নিকট অপ্রকাশিত ছিল, কিন্তু হাদীস শাস্ত্রবিশারদ ইমামগণের যুগে প্রকাশ লাভ করে। আবার এমনও অনেকগুলি হাদীস দেখিতে পাওয়া যায়, যেগুলি শুধু বসরা শহরের বিদ্বানরাই রেওয়ায়ত করিয়াছিলেন এবং অন্যান্য নগরের বিদ্বানগণ সেগুলির দিকে দৃকপাত করা আবশ্যক বিবেচনা করেন নাই। ইমাম শাফেয়ী বলেন যে, সাহাবা এবং তাবেয়ী বিদ্বানগণের চিরাচরিত আচরণ ছিল এই যে, কোন মাসআলার সমাধান হাদীসে প্রাপ্ত না হইলে তাহারা অন্যবিধ প্রামাণিকতার আশ্রয় গ্রহণ করিতেন কিন্তু উত্তরকালে সেই সকল সমস্যার সমাধান যদি কোন হাদীসের মধ্যে তাঁহারা দেখিতে পাইতেন, তাহা হইলে তৎক্ষণাৎ স্বীয় ইজতিহাদ পরিহার করিয়া তাঁহারা আল্লাহর রাসূলের (সা) হাদীসের দিকে প্রত্যাবর্তন করিতেন। তাঁদের উল্লিখিত আচরণ দ্বারা সংশয়াতীত ভাবে ইহা প্রমাণিত হইল যে, কোন সাহাবা যদি কোন হাদীস অনুসরণ না করিয়া থাকেন, তাহাতে উক্ত হাদীসের কোন ত্রুটি বা দোষ সাব্যস্ত হইবে না। অবশ্য ত্রুটি বা দোষের কারণ যদি তাঁহারা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করিয়া গিয়া থাকেন তবেই সেই হাদীস বর্জনীয় হইবে। ইহার দৃষ্টান্ত স্বরূপ "কুল্লাতায়নের" হাদীস পেশ করা যাইতে পারে। ইমাম সাহেব বলেন, এই হাদীস অভ্রান্ত এবং বিভিন্ন সনদে বর্ণিত। কিন্তু ইহার সমুদয় সনদের গোড়া এই যে, এই হাদীসটি ওলীদ বিনে কসীর মুহাম্মদ বিনে জা'ফর বিনে যুবায়র অথবা মুহাম্মদ বিনে ইবাদ বিনে জা'ফরের প্রমুখাত এবং তাঁহারা দুইজন উবায়দুল্লাহ বিনে আবদুল্লাহর এবং তিনি ইবনে উমরের বাচনিক বর্ণনা করিয়াছেন। পরবর্তী যুগে এই হাদীস বিভিন্ন শাখা প্রশাখায় রেওয়ায়ত করা হইলেও মূল রাবী দুইজন অর্থাৎ মুহাম্মদ বিনে জা'ফর এবং মুহাম্মদ বিনে ইবাদ যেহেতু ফাতওয়া দানের অধিকার তাঁদের জীবদ্দশায় লাভ করেন নাই, তাই তাঁহারা দুইজন বিশ্বস্ত বিদ্বান হওয়া স্বত্বেও তাঁদের এই হাদীস সইদ বিনুল মুসাইয়েব এবং যুহরীর সময়ে প্রকাশ লাভ করে নাই আর এই জন্য মালিকী ও হানাফীগণ এই হাদীস অনুসরণ করেন নাই। কিন্তু ইমাম শাফেয়ী ইহা গ্রহণ করিয়াছেন।
"কুল্লাতায়ন," কুল্লার দ্বিবচন। কুল্লাহ এমন বৃহৎ মটকাকে বলে যাহাতে পাক্কি ওজনের সোয়া ছয় মণ পানি সঙ্কুলিত হয়। কেহ কেহ বলেন, এক কুল্লা আড়াই মশক পানির সমান। হাদীসে উল্লিখিত হইয়াছে যে, পানির পরিমাণ দুই কুল্লা হইলে তাহাকে অপবিত্রতা স্পর্শ করিবে না।
এরূপ ধরনের আর একটি দৃষ্টান্ত হইতেছে 'খিয়ারে-মজলিসের' হাদীস। এই হাদীসের তাৎপর্য এই যে, রাসূলুল্লাহ (সা) আদেশ করিয়াছেন, ক্রেতা ও বিক্রেতা যতক্ষণ পর্যন্ত পরস্পর হইতে বিচ্ছিন্ন না হইবে ততক্ষণ পর্যন্ত ক্রয় বিক্রয়ের চুক্তি উভয়েরই বাতিল করার অধিকার রহিবে। পরস্পর হইতে বিচ্ছিন্ন হইবার তাৎপর্য হানাফী বিদ্বানগণ "উক্তির বিচ্ছিন্নতা" রূপে গ্রহণ করিয়াছেন। কিন্তু শাফেয়ীগণ ইহার অর্থ 'দৈহিক বিচ্ছিন্নতা' ধরিয়াছেন।
হাদীসটি প্রকৃতপক্ষে বিশুদ্ধ এবং বহুবিধ সনদ সহকারে বর্ণিত। সাহাবীগণের মধ্যে ইবনে উমর ও আবু হুরায়রা ইহার অনুসরণও করিয়াছিলেন কিন্তু তাবেয়ীগণের ফকীহ সপ্তক এবং তাঁদের সমসাময়িক বিদ্বানগণ এই হাদীসের সন্ধান লাভ করিতে পারেন নাই। আর এই কারণেই ইমাম মালিক ও ইমাম আবু হানীফা তাবেয়ীদের যুগে এই হাদীস প্রকাশ লাভ না করাকে হাদীসের ত্রুটির কারণ বলিয়া নির্ণয় করিয়াছিলেন এবং ইহা বর্জন করিয়াছিলেন কিন্তু ইমাম শাফেয়ী এই হাদীস গ্রহণ করেন।
৪। সাহাবীগণের যে সকল উক্তি এযাবৎ বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ছড়ান ছিল, ইমাম শাফেয়ীর যুগে সেগুলি প্রচুর পরিমাণে সংকলিত হয়। তিনি দেখিতে পান যে, অনেক ক্ষেত্রে সহীহ হাদীস না পাওয়ার দরুণ সাহাবীগণের উক্তি হাদীসের প্রতিকূল হইয়াছে। ইমাম শাফেয়ী অনুসন্ধান করিয়া জানিতে পারেন যে, এরূপ ধরণের ব্যাপারে সুবর্ণ যুগের বিদ্বানগণ সর্বদা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত পরিহার করিয়া তাহার পরিবর্তে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস বরণ করিয়া লইতে অভ্যস্ত ছিলেন। ইমাম শাফেয়ীও এই কারণে সাহাবীগণের মিলিত সিদ্ধান্ত ব্যতীত তাঁদের ব্যক্তিগত উক্তিকে দলীলরূপে গ্রহণ করার রীতি পরিত্যাগ করেন এবং বলেন যে, সাহাবীগণও মানুষ ছিলেন আর আমরাও মানুষ! একথার তাৎপর্য এই যে, সাহাবীগণ যেরূপ কুরআন ও হাদীস হইতে সরাসরিভাবে মসআলা সমূহ প্রতিপাদন করার অধিকারী ছিলেন, আমাদেরও সেইরূপ অধিকার রহিয়াছে।
৫। ইমাম শাফেয়ী এরূপ একদল ফকীহ দেখিতে পান যে, তাঁহারা ব্যক্তিগত মতকে— যাহা শরীঅত কর্তৃক অনুমোদিত নয়, শরীয়তের অনুমোদিত কিয়াসের সহিত সেগুলি মিশাইয়া ফেলিয়াছেন এবং এরূপ 'রায়' ও 'কিয়াসের' মধ্যে তাঁহারা পার্থক্য অনুধাবন করিতে পারিতেছেন না। তাহারা তাঁদের এরূপ ধরনের "রায়কে" ইসতিহসান নামে অভিহিত করিতেছেন। কোন ক্ষতি বা লাভকে আদেশের কারণ নির্ণয় করার তাৎপর্য হইতেছে 'রায়'। কিন্তু কিয়াসের আদেশের কারণ কুরআন ও হাদীস হইতেই নির্ণয় করা হইয়া থাকে এবং সেই কারণকে ভিত্তি করিয়াই আদেশ প্রদান করা হয়। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যাইতে পারে যে, ইয়াতীম (পিতৃহীন) বুদ্ধিমান হইলেই তাহার সম্পত্তি তাহার হাতে ছাড়িয়া দেওয়াই শরীয়তের ব্যবস্থা। এক্ষণে ইসতিহসান অনুসারে পঁচিশ বৎসর বয়স হইলেই ইয়াতীমকে বুদ্ধিমান গণ্য করিতে হয়। আর কিয়াস এই যে, যখনই ইয়াতীমের ভিতর বিবেচনা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যাইবে তখনই তাহাকে তাহার সম্পত্তি ছাড়িয়া দিতে হইবে। বয়সের তারতম্য শরয়ী কিয়াসের ভিতর স্থান লাভ করিতে পারে নাই।
ফলকথা, ইমাম শাফেয়ী এই ইসতিহসানের কঠোর প্রতিবাদ করেন এবং বলেন যে, যাহারা ইসতিহসান করিতে চায় তাহারা পয়গম্বরের আসন অধিকার করার বাসনা পোষণ করিয়া থাকে। ইমাম শাফেয়ীর এই উক্তি কাযী উযদ তাঁর 'মুখতসর' নামক উসূল গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন। মোটের উপর পূর্ববর্তী বিদ্বানগণের উপরিউক্ত রীতি এবং কার্যকলাপ দর্শন করিয়া ইমাম শাফেয়ী নূতন ভাবে ফিক্হ শাস্ত্র প্রণয়নের কার্যে ব্রতী হন এবং উহার উসূল রচনা করেন আর সেই উসূলকে ভিত্তি করিয়া ব্যবহারিক সমস্যা সমূহের বিস্তৃত সমাধান কল্পে বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করেন। (হুজ্জাতুল্লাহেল বালেগা, ১৫১ ও ১৫২ পৃঃ)।
টিকাঃ
* যে হাদীস কোন তাবেয়ী সাহাবার নাম উল্লেখ না করিয়াই রাসূলুল্লাহর (সা) প্রমুখাত রেওয়ায়াত করেন সেই হাদীসকে 'মুরসাল' বলা হয় আর যে হাদীসের ছনদের মধ্যে কোন রাবীর নাম বাদ পড়িয়া যায় তাহা মুনকাতা নামে অভিহিত হয়।
📄 ইমাম শাফেয়ীর বিতর্ক ও বিচার
আজকালকার পরিভাষায় যাহাকে ডিবেট বলা হয়, পূর্ববর্তী যুগের বিদ্বানগণ তাহাকেই 'মুনাযরা' বলিয়া আখ্যাত করিতেন। জ্ঞানের সম্প্রসারণ এবং ভ্রান্তি ও অভ্রান্তির নিরুপণকল্পে এই মুনাযরা বা ডিবেটের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। ইমাম শাফেয়ী বিদ্বানগণের সহিত এইরূপ বিতর্ক ও বিচারে সর্বদাই প্রবৃত্ত থাকিতেন এবং স্বীয় অগাধ বিদ্যাবত্তা, প্রখর ধীশক্তি এবং সাহিত্যিক প্রতিভার বলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিপক্ষকে পরাস্ত অথবা নিরস্ত হইতে বাধ্য করিতেন।
আমরা নিম্নে ইমাম সাহেবের এইরূপ কয়েকটি মুনাযারার বিবরণ সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করিব।
(ক) একদা ইমাম শাফেয়ী তদীয় উস্তাদ ইমাম মুহাম্মাদ বিনুল হাসানের সহিত কূপের পানির মসলা লইয়া বিতর্কে প্রবৃত্ত হন। ফকরুদ্দীন রাযী তাঁর মনাকিবশ শাফেয়ী গ্রন্থে এই বিতর্কের বিস্তৃত বিবরণ প্রদান করিয়াছেন। ইমাম রাযীর প্রদত্ত বিবরণের সারাংশ এই যে, ইমাম শাফেয়ী ইমাম মুহাম্মাদকে বলিয়াছিলেন যে, কোন কূপ হইতে কুড়ি বালতি পানি তুলিয়া ফেলিলে আপনা আপনি বলিয়া থাকেন যে, কূপ হইতে কুড়ি বালতি পানি তুলিয়া ফেলিলে উক্ত কূপ পবিত্র হইবে। কোন বস্তুর সঙ্গতটাই যদি অপবিত্র হয় তাহা হইলে উহার কতকাংশ ফেলিয়া দিলেই যে অবশিষ্টাংশ বিশুদ্ধ হইয়া যাইবে, তাহা হইলে আমি বলিব যে, আপনার এই উক্তি আরও আশ্চর্যজনক। কারণ যে হাদীসটিকে হাদীস তত্ত্ববিশারদগণ সমভাবে যাচাই করিয়া সঠিক বলিয়া সাক্ষ্য প্রদান করিয়াছেন, আপনারা উহাকে অবলম্বন করিয়া নিশ্চিত কিয়াসকে বর্জন করিলেন, অথচ গুহপালিত পশুর জন্য সম্পর্কিত মসআলায় আপনারা সর্বসম্মত বিশুদ্ধ হাদীস অগ্রাহ্য করিয়া একটি দুর্বল কিয়াসের আশ্রয় লইয়াছেন। ইহা অপেক্ষা আরও চমৎকার ব্যাপার এই যে, কোন ব্যক্তি ওযুর উদ্দেশ্যে কূপের ভিতর হস্তকে প্রবিষ্ট করাইবে এবং আপনারা বলিয়া থাকেন যে, উক্ত কূপের সমস্ত পানি অপবিত্র হইয়া গিয়াছে এবং প্রত্যেক বিন্দু পানি নিকাশিত না হওয়া পর্যন্ত উক্ত কূপ কিছুতেই পবিত্র হইবে না। পক্ষান্তরে উহাতে মরা অথবা নাপাক বস্তু পতিত হইলে বিশ, ত্রিশ বালতি পানি টানিয়া ফেলিয়া দিলে উক্ত কূপ আপনাদের কাছে পবিত্র হইয়া যায়। আর মরা অন্য প্রত্যক্ষ অপবিত্র বস্তু অপেক্ষা মানুষের হাত কেমন করিয়া অধিকতর নাপাক হইতে পারে। আমরা একথা বুঝিতে অক্ষম।
(খ) ইমাম মুহাম্মাদ বিনুল হাসান বলিতেন যে, কুরআনে বিস্তৃত বা সংক্ষিপ্তভাবে সর্ব প্রকার ব্যাখ্যা বিদ্যমান রহিয়াছে। ইমাম শাফেয়ী সেইগুলি আলোচনা না করিয়া কোনও নামাযের ভিতর পাঠ করা জায়েয নয়। ইমাম শাফেয়ী এদ্বারা তাঁর প্রত্যুত্তরে বলিলেন যে, আপনার এরূপ উক্তির তাৎপর্য কি? আমরা দেখিতে পাই যে, ইহলৌকিক ও পারলৌকিক সববিধ কল্যাণ কামনা এবং জাগতিক ও পারত্রিক কল্যাণ হইতে রক্ষা-প্রাপ্তির দ্বারা কুরআনে উল্লেখিত হইয়াছে। হযরত ইবরাহীম (আ) তদীয় বংশধরগণের জন্য প্রার্থনা করিয়াছিলেন যে আল্লাহ্,
وَارْزُقْهُمْ مِنَ الثَّمَرَاتِ
"আমার বংশধরদিগকে সর্ব প্রকার খাদ্য ও মেওয়া দান করিও।" হযরত মূসা (আ) ফিরআউন ও তাহার দল বলের জন্য বদদোয়া করিয়াছিলেন এইভাবেঃ
رَبَّنَا اطْمِسْ عَلَى أَمْوَالِهِمْ وَاشْدُدْ عَلَى قُلُوبِهِمْ
"হযরত যাকারিয়া (আ) এইভাবে পুত্র কামনা করিয়াছিলেন।
هَبْ لِي مِنْ لَدُنْكَ وَلِيًّا
হযরত সুলায়মান (আ) বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী হইতে চাহিয়াছিলেন এই প্রার্থনা জ্ঞাপন করিয়াঃ
هَبْ لِي مُلْكًا
হযরত নূহ (আ) ধন-সম্পদ-পুত্র এবং প্রার্থনাস্থলী প্রভৃতির প্রতি স্বীয় জাতিকে প্রদান করিয়াছিলেন এইভাবেঃ
وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ أَنْهَارًا
অতএব যদি কোন ব্যক্তি নামাযের ভিতর এই বলিয়া প্রার্থনা করে যে, 'হে আল্লাহ্! তুমি আমাকে সওগাদীর জন্য অন্ন, খাদ্যের জন্য মেওয়া, সাহচর্যের জন্য বিশুদ্ধ নারী দান কর, তাহা হইলে এ সমুদয় বস্তুর কথাই কুরআনে উল্লেখিত রহিয়াছে। এরূপ ক্ষেত্রে কুরআনে উল্লিখিত দু'আ ব্যতীত অন্য কোন বিষয়ের জন্য নামাযের ভিতর প্রার্থনা করা অবৈধ, আপনার এরূপ উক্তির কোন অর্থই থাকিতে পারে না।
ফকরুদ্দীন রাযী লিখিয়াছেন যে, ইমাম শাফেয়ী বলিয়াছেন, বিশুদ্ধ হাদীসে প্রমাণিত রহিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) নামাযের ভিতর বিভিন্ন গোত্রের প্রতি বদদোয়া করিয়াছিলেন, এমন কি তাহাদের নাম ও গোত্রের উল্লেখও বদ দু'আর ভিতর বিদ্যমান ছিল। সুতরাং ইমাম শাফেয়ীর মতের অনুসারে নামাযের ভিতর আল্লাহর নিকট কোন কিছু প্রার্থনা করা অবৈধ হইবে না। শুধু পরস্পরের মধ্যে কথা বার্তা এবং পরস্পরের নিকট যাওয়া ও প্রার্থনাই নিষিদ্ধ রহিয়াছে। আমি বলিতে চাই যে, খাছ- রাসূলুল্লাহ (সা) আদেশ করিয়াছেন, তোমরা সিজদার মধ্যে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করিতে সচেষ্ট হইও, কারণ সিজদাকালীন দু'আ গ্রাহ্য হইয়া থাকে। রাসূলুল্লাহ (সা) নিজেও রুকুর পর এবং দুই সিজদার মধ্যবর্তী সময়ে দু'আ করিয়াছেন এবং কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের পর সাহাবীগণকে নামাযের ভিতর দু'আ করার নির্দেশ প্রদান করিয়াছেন।
(গ) একদা ইমাম মুহাম্মদ বিনুল হাসানের সহিত ইমাম শাফেয়ীর নিম্নরূপ কথোপকথন হইল:
মুহাম্মদ বিনুল হাসান: আমি জানিতে পারিয়াছি আপনি নাকি যবর দখলের (গছব) মসআলায় আমাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধাচরণ করিয়া থাকেন?
শাফেয়ী: এ কথা সত্য।
মুহাম্মদ: এ বিষয়ে আমি আপনার সহিত বিতর্ক ও বিচারে প্রবৃত্ত হইতে চাই।
শাফেয়ী: আমার কোন আপত্তি নাই।
মুহাম্মদ: আচ্ছা বলুন দেখি, কোন ব্যক্তি কাহারও কড়িকাঠ যবরদস্তী দখল করিয়া নিজের ঘরের ছাদে সংযুক্ত করিল এবং এই নির্মাণ কার্যে তাহার সহস্র মুদ্রা ব্যয় হইল। ইতিমধ্যে কড়িকাঠের অধিকারী আসিয়া সাক্ষ্য দ্বারা নিজের অধিকার প্রমাণিত করিল। এরূপ অবস্থায় আপনার অভিমত কি?
শাফেয়ী: কড়িকাঠের মালিক যদি মূল্য লইয়া নিরস্ত হয় তাহা হইলে ভাল, অন্যথায় তাহার কড়িকাঠ যবর দখলকারীর ছাদ হইতে উপড়াইয়া লইয়া মালিককে সমর্পণ করা হইবে।
মুহাম্মদ: আচ্ছা আর একটি কথা। জনৈক ব্যক্তি একখন্ড কাষ্ট ফলক যবর দখল করিয়া স্বীয় নৌকায় সংযোজিত করিল, নৌকাখানা নদীর মধ্যভাগে পৌঁছিলে তক্তার মালিক আসিয়া পড়িল আর সাক্ষ্য প্রমাণদ্বারা নিজের অধিকার প্রমাণিত করিল। তখন কি আপনি সেই মাঝ দরিয়ায় তক্তাখানা উৎপাটিত করিয়া মালিককে সমর্পণ করিবার ব্যবস্থা দিবেন?
শাফেয়ী: না।
শাফেয়ীর এই জওয়াবে ইমাম মুহাম্মদ এবং তাঁর সহচরবৃন্দ উল্লসিত হইয়া উঠিলেন এবং আনন্দের আতিশয্যে তকবীর ধ্বনি করিতে লাগিলেন এবং বলিলেন, শাফেয়ীর পরাজয় হইয়াছে। তিনি তাঁর পূর্ব সিদ্ধান্ত স্থির থাকিতে পারেন নাই।
পুনশ্চ ইমাম মুহাম্মদ বলিলেন, আচ্ছা আর এক কথা, জনৈক ব্যক্তি রেশমের কিছুটা সূতা যবরদস্তী দখল করিয়া লইল। ইতিমধ্যে তাহার পেট ফাটিয়া যাওয়ায় উক্ত সূতার সাহায্যে তাহার পেট সিলাই করিয়া দেওয়া হইল। এ সম্পর্কে আপনার ব্যবস্থা কি?
শাফেয়ী: কিছুতেই উহার পেট বিদীর্ণ করা চলিবে না।
শাফেয়ীর উত্তর শুনিয়া মুহাম্মদ বিনুল হাসান এবং তাঁর দলভুক্ত ব্যক্তিগণ পুনশ্চ আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া তকবীর ধ্বনি করিলেন এবং বলিলেন, আপনার প্রথম উক্তির ভ্রান্তি আপনারই মুখে প্রতিপন্ন হইল।
শাফেয়ী : থামুন, থামুন অত ব্যস্ত হইবেন না। আমারও কিছু আপনার নিকট জিজ্ঞাসা রহিয়াছে। আপনি অনুগ্রহ করিয়া আমাকে বলিবেন কি যে, উক্ত ব্যক্তি যে, সূতায় নিজের পেট সিলাই করিয়াছিল যদি সেই সূতা তাহার নিজস্ব হইত তাহা হইলে তাহার পেট বিদীর্ণ করিয়া সেই সূতা পৃথক করা হালাল হইত না হারাম?
মুহাম্মদ: হারাম!
শাফেয়ী: আর তক্তাখানা যাহা সে নৌকায় সংযুক্ত করিয়াছিল, সেটা যদি তাহার নিজের হইত, তাহা হইলে মাঝ ধরিয়ায় উহা উৎপাটিত করা হালাল হইত, না হারাম?
মুহাম্মদ: হারাম!
শাফেয়ী: এখন বলুন দেখি, বাড়ীর মালিক যদি নিজের বাড়ী ভাঙ্গিয়া ফেলিতে চায় তাহা হইলে তাহার এই কার্য দুরস্ত হবে, না হারাম?
মুহাম্মদ: অবশ্যই দুরস্ত হইবে।
শাফেয়ী: আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন! আপনি দুরস্ত কার্যকে হারাম কার্যের সহিত তুলনা করিতেছেন কেমন করিয়া?
মুহাম্মদ : আচ্ছা বুঝিলাম। কিন্তু নৌকা সম্বন্ধে আপনি কি করিতে বলেন?
শাফেয়ী: প্রথমতঃ নৌকাটিকে মাঝ দরিয়া হইতে উপকূলে আনিতে হইবে। অতঃপর যবর দখলের- তক্তাখানি নৌকা হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া উহার মালিকের হস্তে ফিরাইয়া দিতে হইবে।
মুহাম্মদ: কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা) বলিয়াছেন কাহাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করা চলিবে না।
لاضرر ولا ضرار
শাফেয়ী: ক্ষতিগ্রস্ত তাহাকে কেহই করে নাই, সে নিজের ক্ষতি নিজেই করিয়াছে।
শাফেয়ী: এইবারে আমিও আপনাকে একটি কথা জিজ্ঞাসা করিব। আচ্ছা বলুন দেখি, বহু গুণসম্পন্ন জনৈক ব্যক্তি যদি কোন দুষ্ট নিগ্রোর দাসীকে যবর দখল করিয়া লইয়া যায় এবং তাহার সহিত গৃহবাস করার ফলে উক্ত দাসীর গর্ভে দশজন চারুদর্শন এবং গুণবান সন্তান জন্ম গ্রহণ করে আর বহু যুগ পর উক্ত নিগ্রো নিজেকে উক্ত দাসীর অধিকারী বলিয়া সাব্যস্ত করিতে পারে, তাহা হইলে তাহার গর্ভস্থ সন্তানগুলি সম্বন্ধে আপনি কি মীমাংসা করিবেন?
মুহাম্মদঃ ঐ দুষ্ট নিগ্রোটাই ছেলেগুলির মালিক হইবে।
শাফেয়ী: আমি আপনাকে আল্লাহর শপথ দিয়া জিজ্ঞাসা করিতেছি যে, উক্ত সম্ভ্রান্ত, সুদর্শন এবং গুণবান ছেলেগুলিকে দাসে পরিণত করাই বেশী ক্ষতির কারণ হইবে, না নৌকার তক্তাখানা উপড়াইয়া ফেলায় অধিকতর ক্ষতি সাধিত হইবে?
ইমাম শাফেয়ীর কথায় ইমাম মুহাম্মদ বিনুল হাসান মৌনাবলম্বন করিলেন। আর একদিন মুহাম্মদ বিনুল হাসান ও শাফেয়ীর মধ্যে নিম্নরূপ কথোপকথন হইল।
(ঘ) মুহাম্মদ: আচ্ছা বলুন দেখি আমাদের- উস্তায (ইমাম আবু হানীফা) অধিকতর বিদ্যান ছিলেন, না আপনার উস্তায (ইমাম মালিক)?
শাফেয়ী: আপনি এ বিষয়ে ন্যায়পরায়ণতার সহিত-বিচারে প্রবৃত্ত হইবেন কি?
মুহাম্মদ: হ্যাঁ, অবশ্যই।
শাফেয়ী: তাহা হইলে আমি আপনাকে আল্লাহর শপথ দিয়া জিজ্ঞাসা করিতেছি যে, আমার উসতায কুরআনের বিদ্যায় অধিকতর পারদর্শী ছিলেন, না আপনার উসতায?
মুহাম্মদ: আল্লাহর কসম। কুরআনের বিদ্যায় আপনার উসতাযই অধিকতর জ্ঞানসম্পন্ন ছিলেন।
শাফেয়ী: ভালকথা। আর আল্লাহর রাসূলের (সা) হাদীস শাস্ত্রে আমার উসতায অধিকতর সুদক্ষ ছিলেন, না আপনার উসতায?
মুহাম্মদ: আল্লাহর শপথ! আপনার উসতাযই রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসে অধিকতর দক্ষতা রাখিতেন।
শাফেয়ী: আর সাহাবীদের সিদ্ধান্তসমূহে কে অধিকতর বিদিত ছিলেন?
মুহাম্মদ: আল্লাহর শপথ! সাহাবীদের উক্তি সম্পর্কেও আপনার উসতায অধিকতর বিদিত ছিলেন।
শাফেয়ী: তাহা হইলে কিয়াস ছাড়া আর কি অবশিষ্ট রহিল? আর কিয়াসের ভিত্তিও তো কুরআন, হাদীস এবং সাহাবীদের সিদ্ধান্তের উপরেই প্রতিষ্ঠিত।
মুহাম্মদ বিনুল হাসান শাফেয়ীর কথা শুনিয়া চুপ করিয়া গেলেন। [ইবনে খল্লকান, (১) ৪০৯ পৃষ্ঠা]