📄 বাগদানে পুনঃ প্রবেশ ও মিসর
১৯৮ হিজরীতে ইমাম শাফেয়ী পুনরায় বাগদাদে আগমন করিলেন, কিন্তু তখন হারুনুর রশীদের মৃত্যু ঘটিয়াছিল। তদীয় পুত্র মামুন ভ্রাতা আমীনের রক্তে স্বীয় হস্ত রঞ্জিত করিয়া খিলাফতের সিংহাসনে অধিরোহন করিয়াছিলেন। আমীনের পৃষ্ঠপোষকতায় আরবীয় শক্তি দণ্ডায়মান হইয়াছিল। আর মামুনের প্রতিষ্ঠা কল্পে তাঁর চতুস্পার্শে তদানীন্তন পারসিক শক্তির সমাবেশ ঘটিয়াছিল। ফলে আমীনের পরাজয় দ্বারা প্রকৃত প্রস্তাবে ইসলামী খিলাফতে আরবীয়-প্রভাবেরই অবসান সূচিত হইয়াছিল。
এই নবোদ্ভূত পরিবেশ ইমাম শাফেয়ীর প্রকৃতির অনুকূল হয় নাই। এতদ্ব্যতীত খলীফা হারুনুর রশীদের যুগে তদানীন্তন ইসলাম জগতের অন্যান্য নগর নগরীর ন্যায় বাগদাদেও আহলে সুন্নাতগণেরই সর্বাধিক প্রভাব ও প্রাধান্য পরিলক্ষিত হইত। কিন্তু মামুনুর রশীদের গায়ের-ইসলামী দার্শনিক রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গী বাগদাদে জ্ঞান সাধনার ক্ষেত্রেও অভূতপূর্ব বিপ্লব সৃষ্টি করিয়া ফেলিয়াছিল। আহলে সুন্নাত বিদ্বানগণের পরিবর্তে বাগদাদে তখন মু'তাযিলাদের প্রতিপত্তি বাড়িয়া যাইতেছিল। মু'তাযিলারাই রাজদরবারের ভিতরে ও বাহিরে সর্বেসর্বা হইয়া পড়িয়াছিলেন, বিদ্যা-বুদ্ধি এমন কি ফিকহ শাস্ত্রেও খলীফা মামুন তাঁহাদিগকেই অগ্রগণ্য বিবেচনা করিতেন। এই দিকে ইমাম শাফেয়ী-ইমাম মালিক ও ইমাম আবু হানিফার ন্যায় মু'তাযিলাদিগকে মোটেই বরদাশ্ত করিতে পারিতেন না, তাঁদের প্রতিপাদন ভঙ্গী ও সমস্যার সমাধান রীতি তাঁর মনঃপুত হইত না। ইতিমধ্যে মু'তাযিলাদের প্ররোচনায় মামুন কুরআন সৃষ্ট পদার্থ কিনা সে সম্পর্কে এক অভিমত অত্যন্ত কঠোরতার সহিত প্রচার করিতে প্রবৃত্ত হইয়া তৎকালীন আহলে সুন্নত বিদ্বানগণকে নিপীড়ন করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। এই সময়ে স্বয়ং মামুনুর রশীদ ইমাম শাফেয়ীকে বাগদাদের প্রধান বিচারপতির পদ গ্রহণ করার জন্য আহ্বান করেন। কিন্তু সমুদয় অবস্থা বিবেচনা করিয়া ইমাম সাহেব খলীফার প্রস্তাব স্বসম্মানে প্রত্যাখান করিলেন এবং নিম্নলিখিত কবিতা পাঠ করিতে করিতে চিরদিনের মত এশিয়া মহাদেশ পরিত্যাগ করিয়া মিসরের যাত্রী হইলেন :
لقد أصبحت نفسي تتوق الى مصر !
ومن دونها أرض المهامة والقفر !
فو الله ما أدرى الفوز والغنى ؟
أساق إليها أم أساق إلى قبرى ؟
অর্থাৎ আমার মন মিসরের দিকে এখন বড়ই আগ্রাহান্বিত হইয়াছে, কিন্তু এ পথ দুঃখপূর্ণ ও তৃর্ণলতাদি শূন্য! আল্লাহর শপথ! আমি জানি না, আমি সাফল্য ও সম্পদের সহিত মিলিত হইবার জন্য তথায় গমন করিতেছি, না কবরের মুখে প্রবেশ করার জন্য।
📄 মিসরে পদার্পণ
বড়ই আশ্চর্যের বিষয়, ইমাম শাফেয়ী তদীয় কবিতায় দুইটি বিষয়ের মধ্যে যে কোন একটির প্রত্যাশা করিলেও মিসরে তিনি উভয় বস্তুরই অধিকারী হইয়াছিলেন। ১৯৮ হিজরীতে ইমাম শাফেয়ী মিসরে উপস্থিত হইবার সংগে সংগেই উক্ত প্রদেশের শাসনকর্তা রাজকোষ হইতে অভাবগ্রস্ত জ্ঞাতির অংশ ইমাম শাফেয়ীর জন্য বরাদ্দ করিয়া দিলেন। ফলে তিনি জীবিকার চিন্তা হইতে নিশ্চিন্ত হইয়া নবোদ্যমে স্বীয় ফিক্হী স্কুলের প্রতিষ্ঠা কল্পে সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করিলেন। আব্দুল্লাহ বিনে আবদুল হাকাম (মৃঃ ২১৪ হি) মুহাম্মদ বিনে আবদুল্লাহ বিনে আবদুল হাকাম (মৃঃ ২৭৮ হিঃ) রুবাইয়অ বিনে সুলায়মান, (মৃঃ ২৭০ হিঃ) ইসমাঈল বিনে ইয়াহয়া মুযানী (মৃঃ ২৬৪ হিঃ), ইউসুফ বিনে ইয়াহয়া বুওয়ায়তী (মৃঃ ২৩১ হিঃ) প্রভৃতি প্রথিতযশা বিদ্বানগণ কেহ মালিকী ও কেহ হানাফী স্কুল পরিত্যাগ করিয়া ইমাম সাহেব কর্তৃক স্থাপিত নূতন শাফেয়ী দলে দীক্ষিত হইলেন। মিসরেই ইমাম সাহেব তাঁর মযহব অনুসারে বিশ্ববরেণ্য গ্রন্থরাজি যথা কিতাবুল উম, ইমলায়ে কুরা, ইমলায়ে সগীর, মুখতসর বওয়ায়তী, মুখতসর মুযানী, মুখতসর রুবাইয়অ ও কিতাবুসসুনন প্রভৃতি রচনা করিয়াছিলেন।
ইমাম শাফেয়ী বাগদাদে অবস্থানকালীন আপন গ্রন্থ সমূহে যে সকল সিদ্ধান্ত সন্নিবেশিত করিয়াছিলেন, সেগুলি "মহযবে কদীম" আর মিসরে লিখিত গ্রন্থরাজিতে বর্ণিত অভিমত "মযহবে জদীদ" বলিয়া শাফেয়ী ফিক্হে উল্লিখিত হইয়াছে।
📄 ইমাম শাফেয়ীর পরিগৃহীত ব্যবহারিক মযহব
১৯৫ হিজরী অর্থাৎ বাগদাদে প্রবেশ করার অব্যবহিত কাল পূর্ব পর্যন্ত ইমাম শাফেয়ী ইমাম মালিকের সর্বাপেক্ষা বড় সমর্থক ছিলেন, কিন্তু যখন তিনি বুঝিতে পারিলেন, যে, ইমাম মালিকের অন্ধ ভক্তের দল তাঁর উক্তি ও সিদ্ধান্ত সমূহকে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসেরও উর্ধেস্থান দিতে আরম্ভ করিয়াছেন এবং তাঁহাকে প্রমাদহীন সাব্যস্ত করিতে দৃঢ়সংকল্প হইয়াছেন তখন ইমাম শাফেয়ী বাধ্য হইয়া রাসূলুল্লাহ (সা) হাদীস সমূহের রক্ষী এবং প্রহরীরূপে ইমাম মালিকের মযহবের সমালোচনায় প্রবৃত্ত হইলেন।
📄 মযহবী ফিরকাবন্দীর প্রতিবাদঃ ইমাম শাফেয়ীর বৈশিষ্ট্য
মযহবী ফিরকাবন্দীর প্রতিবাদ
ইমাম শাফেয়ী একাধারে ইমাম মালিক, ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম আওযায়ীর সিদ্ধান্ত সমূহের কঠোর প্রতিবাদে প্রবৃত্ত হন। স্বীয় উসতায ইমাম মালিকের বিরোধ করিতে গিয়া তিনি এক বৎসর কাল ধরিয়া ইতস্ততঃ করিয়াছিলেন। এ সম্পর্কে তাঁর গ্রন্থ "খিলাফু মালিক" ভূবন বিখ্যাত। ইমাম ফকরুদ্দীন রাযী লিখিয়াছেন, ইমাম শাফেয়ী অবগত হইলেন যে, স্পেনে ইমাম মালিকের একটি টুপী আছে, মালেকীরা সেই টুপির দোহাই দিয়া বৃষ্টির প্রার্থনা করিয়া থাকে। এবং সকল অন্ধভক্তদের যখন বলা হইত যে, রাসূলুল্লাহ (সা) এইরূপ বলিয়াছেন, তাহারা সে কথার জওয়াবে তৎক্ষণাৎ বলিত, ইমাম মালিক এইরূপ বলিয়াছেন। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি অবলোকন করিয়া ইমাম শাফেয়ী ইহা প্রতিপন্ন করিতে দৃঢ় সংকল্প হইলেন যে, ইমাম মালিক যত বড়ই বিদ্বান হউন না কেন তিনি নবী বা রাসূল ছিলেন না এবং তাঁহাকে অভ্রান্ত ও প্রমাদবিহীন মনে করা মুর্খতার নিদর্শন মাত্র। তাই যে সকল সিদ্ধান্তে ইমাম মালেকের ভ্রান্তি ঘটিয়াছিল, ইমাম শাফেয়ী অকাট্য প্রমাণ সহকারে সেগুলির স্বরূপ স্বীয় গ্রন্থে উদঘাটিত করিলেন। এই ভাবে তিনি ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম আওযায়ীর মযহবের ভ্রান্তিগুলিও ধরাইয়া দিয়াছিলেন।
ইমাম শাফেয়ীর বৈশিষ্ট্য
ইমাম মালিক (র) এবং ইমাম আবু হানীফার (র) মযহবদ্বয়ের মূলনীতি এবং বিস্তৃত ব্যাখ্যা যখন পুস্তকাকারে সংকলিত হইতে আরম্ভ করে, সেই সময় ইমাম শাফেয়ী (র) আবির্ভূত হন। তিনি পূর্ববর্তী বিদ্বানগণের কার্যকলাপ অভিনিবেশ সহকারে পর্যবেক্ষণ করেন এবং সেগুলির মধ্যে এমন অনেক বিষয় লক্ষ্য করেন যে, অবশেষে তিনি ইমাম মালিক (র) ও ইমাম আবু হানীফার (র) স্থাপিত স্কুল দুইটিকেই পরিহার করিতে বাধ্য হন। ইমাম সাহেব এই সকল কথার আলোচনা তাঁর স্বনামধন্য "উম্" নামক গ্রন্থের সূচনায় করিয়াছেন।
১। তিনি দেখিতে পান যে, তাঁর পূর্ববর্তী ইমামদ্বয় 'মুরসল' ও 'মুনকাতা' উভয়বিধ হাদীস গ্রহণ করিতে অভ্যস্ত ছিলেন এবং এই কারণে তাঁদের উক্তির ভিতর ত্রুটি ও বৈষম্য ঘটিয়াছিল কারণ হাদীসের সনদ এবং মতনের সবগুলি পদ্ধতি একত্রিত করিয়া তিনি দেখিতে পান যে, অনেকগুলি মুরসল হাদীস ভিত্তিহীন। অধিকন্তু অনেকগুলি মুরসাল হাদীস মুসনদ হাদীসের পরিপন্থী। ফলে ইমাম শাফেয়ী মুরসল হাদীস গ্রহণ করার জন্য কতকগুলি নিয়ম প্রণয়ন করেন। এই নিয়মগুলি উসুলে ফিক্হে গ্রন্থে সবিস্তারে বর্ণিত রহিয়াছে।
২। তিনি দেখিতে পান যে, বিভিন্নরূপী 'নস্' সমূহের মধ্যে সমন্বয় ঘটাইবার কোন নিয়ম হানাফী ও মালেকীদের কাছে নাই। এই জন্য তাঁদের ইমামদ্বয়ের ইজতিহাদী মসআলা সমূহে গোলযোগ ঘটিয়াছে। ইমাম শাফেয়ী কুরআনের বিভিন্ন আয়াত, হাদীসের বিভিন্ন উক্তি এবং কুরআন ও হাদীসের নির্দেশ সমূহের মধ্যে পার-স্পরিক সমন্বয় ও সামঞ্জস্য প্রতিপাদন কল্পে একখানা মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন। পৃথিবীতে উসুলে ফিক্হে ইহাই সর্বপ্রথম গ্রন্থ।
(ক) ইমাম শাফেয়ীর উসুল বুঝিতে হইলে নিম্নলিখিত ঘটনাটি অনুধাবন করা কর্তব্য। ইমাম শাফেয়ী যখন বাগদাদে ইমাম মুহাম্মদের নিকট আগমন করেন, তখন তিনি শুনিতে পান যে, ইমাম মুহাম্মদ মদীনার বিদ্বানগণকে এই বলিয়া বিদ্রূপ করিতেছেন যে, তাঁহারা একজনের সাক্ষ্য আর একটি শপথের সাহায্যে বিচার মীমাংসা করার অনুমতি দিয়া থাকেন। তিনি বলিতেছিলেন, মদীনার বিদ্বানগণের এই আচরণ কুরআনের অতিরিক্ত (যায়েদ আলাল কিতাব)। হানাফীগণ "খবরে ওয়াহিদ" অর্থাৎ একজন রাবীর বর্ণিত হাদীস দ্বারা কুরআনের নির্দেশের অতিরিক্ত কোন মীমাংসা গ্রাহ্য করেন না। কুরআনে বর্ণিত সাক্ষ্য আইনের বিধান এই যে, দুইজন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ আর দুইজন নারীর সাক্ষ্য ও একটি শপথ দ্বারাও বিচার মীমাংসা করার অনুমতি বিদ্যমান রহিয়াছে। হানাফীগণ এই হাদীস দ্বিবিধ কারণে অগ্রাহ্য করিয়াছেন। প্রথমতঃ উহা কুরআনের নির্দেশিত বিধানের অতিরিক্ত। দ্বিতীয়তঃ এই হাদীসের মূল রাবী একজন মাত্র। ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মুহাম্মদের বিদ্রূপের জওয়াবে বলিলেন যে, সত্যই কি আপনাদের কাছে "খবরে ওয়াহিদ" দ্বারা কুরআনের অতিরিক্ত কোন কিছুই গ্রহণীয় নয়? ইমাম মুহাম্মদ বলিলেন, ইহাই আমাদের মযহব। ইমাম শাফেয়ী প্রশ্ন করিলেন যে, তাহা হইলে ওয়ারিসের জন্য ওসীয়ৎ নাই’ রাসূলুল্লাহ (সা) এর হাদীস সূত্রে আপনারা ওয়ারিসের জন্য ওসীয়ৎকে অবৈধ বলিয়া থাকেন কেন,? অথচ কুরআনে উক্ত হইয়াছে যে, তোমাদের কাহারও সম্মুখে মৃত্যু ঘনাইয়া আসিলে সে যদি বিত্তশীল হয়, তাহা হইলে তাহাকে পিতামাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের জন্য ন্যায়সংগত ভাবে ওসীয়ৎ করিয়া যাইতে হইবে (আলবাকারা, ১৮০ আয়াত)।
এইভাবে ইমাম শাফেয়ী আরও কয়েকটি দৃষ্টান্ত উত্থাপিত করেন এবং ইহার ফলে শেষ পর্যন্ত ইমাম মুহাম্মদ চুপ করিয়া যাইতে বাধ্য হন।
৩। ইমাম শাফেয়ী দেখিতে পান, যে সকল তাবেয়ী ফতওয়া প্রদান করার অধিকার পাইয়াছিলেন, অনেকগুলি বিশুদ্ধ হাদীস তাঁদের অপরিজ্ঞাত ছিল। আর এই জন্য তাঁহারা ইজতিহাদের আশ্রয় গ্রহণ এবং সাধারণ নিয়মের অনুসরণ অথবা পরবর্তী সাহাবাগণের অনুসরণ করিয়া তদনুসারে ফতওয়া দিয়াছিলেন। অতঃপর তৃতীয় স্তরের বিদ্বানগণ সেই সকল হাদীস অবগত হইবার সুযোগ লাভ করা সত্ত্বেও তাঁহারা সেগুলি প্রত্যাখান করেন। তাঁহারা মনে করিয়াছিলেন, এই হাদীসগুলি আমাদের নগরের বিদ্বানগণের পরিগৃহীত আচরণ এবং রীতির পরিপন্থী। ফলে নাগরিক বিদ্বানগণের রীতি এবং আচরণের দরুণ রাসূলুল্লাহর (স) বহু হাদীস দুষণীয় বিবেচিত হইতে থাকে। তৃতীয় স্তরের বিদ্বানগণ অতিক্রান্ত হওয়ার পর আহলে হাদীস বিদ্বানগণ হাদীস সমূহের বিভিন্ন সনদ ও মতগুলি পরীক্ষা করিয়া দেখিলেন এবং দেশ দেশান্তর পর্যটন করিয়া বিদ্বাজ্জনমণ্ডলীর সাক্ষাৎকার অর্জন করিলেন তখন আরও বহু হাদীস এরূপ প্রকাশ লাভ করিল যেগুলি সাহাবীগণের মধ্যে মাত্র দুই একজন এবং তাঁদের শিষ্যগণের মধ্যে মাত্র দুই একজন এবং তদীয় শিষ্যগণের মধ্যেও দুই একজন রেওয়ায়ত করিয়াছিলেন, এই সকল হাদীস ফিকাহ শাস্ত্রের বিদ্বানগণের নিকট অপ্রকাশিত ছিল, কিন্তু হাদীস শাস্ত্রবিশারদ ইমামগণের যুগে প্রকাশ লাভ করে। আবার এমনও অনেকগুলি হাদীস দেখিতে পাওয়া যায়, যেগুলি শুধু বসরা শহরের বিদ্বানরাই রেওয়ায়ত করিয়াছিলেন এবং অন্যান্য নগরের বিদ্বানগণ সেগুলির দিকে দৃকপাত করা আবশ্যক বিবেচনা করেন নাই। ইমাম শাফেয়ী বলেন যে, সাহাবা এবং তাবেয়ী বিদ্বানগণের চিরাচরিত আচরণ ছিল এই যে, কোন মাসআলার সমাধান হাদীসে প্রাপ্ত না হইলে তাহারা অন্যবিধ প্রামাণিকতার আশ্রয় গ্রহণ করিতেন কিন্তু উত্তরকালে সেই সকল সমস্যার সমাধান যদি কোন হাদীসের মধ্যে তাঁহারা দেখিতে পাইতেন, তাহা হইলে তৎক্ষণাৎ স্বীয় ইজতিহাদ পরিহার করিয়া তাঁহারা আল্লাহর রাসূলের (সা) হাদীসের দিকে প্রত্যাবর্তন করিতেন। তাঁদের উল্লিখিত আচরণ দ্বারা সংশয়াতীত ভাবে ইহা প্রমাণিত হইল যে, কোন সাহাবা যদি কোন হাদীস অনুসরণ না করিয়া থাকেন, তাহাতে উক্ত হাদীসের কোন ত্রুটি বা দোষ সাব্যস্ত হইবে না। অবশ্য ত্রুটি বা দোষের কারণ যদি তাঁহারা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করিয়া গিয়া থাকেন তবেই সেই হাদীস বর্জনীয় হইবে। ইহার দৃষ্টান্ত স্বরূপ "কুল্লাতায়নের" হাদীস পেশ করা যাইতে পারে। ইমাম সাহেব বলেন, এই হাদীস অভ্রান্ত এবং বিভিন্ন সনদে বর্ণিত। কিন্তু ইহার সমুদয় সনদের গোড়া এই যে, এই হাদীসটি ওলীদ বিনে কসীর মুহাম্মদ বিনে জা'ফর বিনে যুবায়র অথবা মুহাম্মদ বিনে ইবাদ বিনে জা'ফরের প্রমুখাত এবং তাঁহারা দুইজন উবায়দুল্লাহ বিনে আবদুল্লাহর এবং তিনি ইবনে উমরের বাচনিক বর্ণনা করিয়াছেন। পরবর্তী যুগে এই হাদীস বিভিন্ন শাখা প্রশাখায় রেওয়ায়ত করা হইলেও মূল রাবী দুইজন অর্থাৎ মুহাম্মদ বিনে জা'ফর এবং মুহাম্মদ বিনে ইবাদ যেহেতু ফাতওয়া দানের অধিকার তাঁদের জীবদ্দশায় লাভ করেন নাই, তাই তাঁহারা দুইজন বিশ্বস্ত বিদ্বান হওয়া স্বত্বেও তাঁদের এই হাদীস সইদ বিনুল মুসাইয়েব এবং যুহরীর সময়ে প্রকাশ লাভ করে নাই আর এই জন্য মালিকী ও হানাফীগণ এই হাদীস অনুসরণ করেন নাই। কিন্তু ইমাম শাফেয়ী ইহা গ্রহণ করিয়াছেন।
"কুল্লাতায়ন," কুল্লার দ্বিবচন। কুল্লাহ এমন বৃহৎ মটকাকে বলে যাহাতে পাক্কি ওজনের সোয়া ছয় মণ পানি সঙ্কুলিত হয়। কেহ কেহ বলেন, এক কুল্লা আড়াই মশক পানির সমান। হাদীসে উল্লিখিত হইয়াছে যে, পানির পরিমাণ দুই কুল্লা হইলে তাহাকে অপবিত্রতা স্পর্শ করিবে না।
এরূপ ধরনের আর একটি দৃষ্টান্ত হইতেছে 'খিয়ারে-মজলিসের' হাদীস। এই হাদীসের তাৎপর্য এই যে, রাসূলুল্লাহ (সা) আদেশ করিয়াছেন, ক্রেতা ও বিক্রেতা যতক্ষণ পর্যন্ত পরস্পর হইতে বিচ্ছিন্ন না হইবে ততক্ষণ পর্যন্ত ক্রয় বিক্রয়ের চুক্তি উভয়েরই বাতিল করার অধিকার রহিবে। পরস্পর হইতে বিচ্ছিন্ন হইবার তাৎপর্য হানাফী বিদ্বানগণ "উক্তির বিচ্ছিন্নতা" রূপে গ্রহণ করিয়াছেন। কিন্তু শাফেয়ীগণ ইহার অর্থ 'দৈহিক বিচ্ছিন্নতা' ধরিয়াছেন।
হাদীসটি প্রকৃতপক্ষে বিশুদ্ধ এবং বহুবিধ সনদ সহকারে বর্ণিত। সাহাবীগণের মধ্যে ইবনে উমর ও আবু হুরায়রা ইহার অনুসরণও করিয়াছিলেন কিন্তু তাবেয়ীগণের ফকীহ সপ্তক এবং তাঁদের সমসাময়িক বিদ্বানগণ এই হাদীসের সন্ধান লাভ করিতে পারেন নাই। আর এই কারণেই ইমাম মালিক ও ইমাম আবু হানীফা তাবেয়ীদের যুগে এই হাদীস প্রকাশ লাভ না করাকে হাদীসের ত্রুটির কারণ বলিয়া নির্ণয় করিয়াছিলেন এবং ইহা বর্জন করিয়াছিলেন কিন্তু ইমাম শাফেয়ী এই হাদীস গ্রহণ করেন।
৪। সাহাবীগণের যে সকল উক্তি এযাবৎ বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ছড়ান ছিল, ইমাম শাফেয়ীর যুগে সেগুলি প্রচুর পরিমাণে সংকলিত হয়। তিনি দেখিতে পান যে, অনেক ক্ষেত্রে সহীহ হাদীস না পাওয়ার দরুণ সাহাবীগণের উক্তি হাদীসের প্রতিকূল হইয়াছে। ইমাম শাফেয়ী অনুসন্ধান করিয়া জানিতে পারেন যে, এরূপ ধরণের ব্যাপারে সুবর্ণ যুগের বিদ্বানগণ সর্বদা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত পরিহার করিয়া তাহার পরিবর্তে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস বরণ করিয়া লইতে অভ্যস্ত ছিলেন। ইমাম শাফেয়ীও এই কারণে সাহাবীগণের মিলিত সিদ্ধান্ত ব্যতীত তাঁদের ব্যক্তিগত উক্তিকে দলীলরূপে গ্রহণ করার রীতি পরিত্যাগ করেন এবং বলেন যে, সাহাবীগণও মানুষ ছিলেন আর আমরাও মানুষ! একথার তাৎপর্য এই যে, সাহাবীগণ যেরূপ কুরআন ও হাদীস হইতে সরাসরিভাবে মসআলা সমূহ প্রতিপাদন করার অধিকারী ছিলেন, আমাদেরও সেইরূপ অধিকার রহিয়াছে।
৫। ইমাম শাফেয়ী এরূপ একদল ফকীহ দেখিতে পান যে, তাঁহারা ব্যক্তিগত মতকে— যাহা শরীঅত কর্তৃক অনুমোদিত নয়, শরীয়তের অনুমোদিত কিয়াসের সহিত সেগুলি মিশাইয়া ফেলিয়াছেন এবং এরূপ 'রায়' ও 'কিয়াসের' মধ্যে তাঁহারা পার্থক্য অনুধাবন করিতে পারিতেছেন না। তাহারা তাঁদের এরূপ ধরনের "রায়কে" ইসতিহসান নামে অভিহিত করিতেছেন। কোন ক্ষতি বা লাভকে আদেশের কারণ নির্ণয় করার তাৎপর্য হইতেছে 'রায়'। কিন্তু কিয়াসের আদেশের কারণ কুরআন ও হাদীস হইতেই নির্ণয় করা হইয়া থাকে এবং সেই কারণকে ভিত্তি করিয়াই আদেশ প্রদান করা হয়। দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা যাইতে পারে যে, ইয়াতীম (পিতৃহীন) বুদ্ধিমান হইলেই তাহার সম্পত্তি তাহার হাতে ছাড়িয়া দেওয়াই শরীয়তের ব্যবস্থা। এক্ষণে ইসতিহসান অনুসারে পঁচিশ বৎসর বয়স হইলেই ইয়াতীমকে বুদ্ধিমান গণ্য করিতে হয়। আর কিয়াস এই যে, যখনই ইয়াতীমের ভিতর বিবেচনা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যাইবে তখনই তাহাকে তাহার সম্পত্তি ছাড়িয়া দিতে হইবে। বয়সের তারতম্য শরয়ী কিয়াসের ভিতর স্থান লাভ করিতে পারে নাই।
ফলকথা, ইমাম শাফেয়ী এই ইসতিহসানের কঠোর প্রতিবাদ করেন এবং বলেন যে, যাহারা ইসতিহসান করিতে চায় তাহারা পয়গম্বরের আসন অধিকার করার বাসনা পোষণ করিয়া থাকে। ইমাম শাফেয়ীর এই উক্তি কাযী উযদ তাঁর 'মুখতসর' নামক উসূল গ্রন্থে উল্লেখ করিয়াছেন। মোটের উপর পূর্ববর্তী বিদ্বানগণের উপরিউক্ত রীতি এবং কার্যকলাপ দর্শন করিয়া ইমাম শাফেয়ী নূতন ভাবে ফিক্হ শাস্ত্র প্রণয়নের কার্যে ব্রতী হন এবং উহার উসূল রচনা করেন আর সেই উসূলকে ভিত্তি করিয়া ব্যবহারিক সমস্যা সমূহের বিস্তৃত সমাধান কল্পে বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করেন। (হুজ্জাতুল্লাহেল বালেগা, ১৫১ ও ১৫২ পৃঃ)।
টিকাঃ
* যে হাদীস কোন তাবেয়ী সাহাবার নাম উল্লেখ না করিয়াই রাসূলুল্লাহর (সা) প্রমুখাত রেওয়ায়াত করেন সেই হাদীসকে 'মুরসাল' বলা হয় আর যে হাদীসের ছনদের মধ্যে কোন রাবীর নাম বাদ পড়িয়া যায় তাহা মুনকাতা নামে অভিহিত হয়।