📄 বাগদাদে প্রবেশ
সর্বজনমান্য বিশ্ব-বিশ্রুত মহাবিদ্বান রূপে সর্ব প্রথম ১৯৫ হিজরীতে ইমাম শাফেয়ী ইসলাম জগতের তৎকালীন কেন্দ্র-ভূমি বাগদাদে প্রবেশ করেন। তখন তিনি ইসলামী ফিক্হে একটি নিজস্ব স্কুল প্রতিষ্ঠা করার যোগ্যতা অর্জন করিয়াছিলেন। বাগদাদে উপনীত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দারুল খিলাফতের ফকীহ্ ও মুহাদ্দিসগণ কর্তৃক তিনি পরিবেষ্টিত হইলেন। খলীফার গোষ্ঠির বহু গণ্যমান্য ব্যক্তিও শাফেয়ীর বিদ্যাবত্তার প্রভাবে নতশীর হইলেন। তিনি এ যাত্রায় দুই বৎসর বাগদাদে অবস্থান করিয়াছিলেন। এই সময় ইমাম আবু সওর বাগদাদী, ইমাম আহমদ বিনে হাম্বল, হাসান বিনে মুহাম্মদ সবাহ যাআফরানী ও আবু আবদুর রহমান প্রভৃতি তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। বাগদাদের তৎকালীন শ্রেষ্ঠতম হাদীসতত্ববিশারদ আবদুর রহমান বিনে মহদী ইমাম শাফেয়ী অপেক্ষা পনের বৎসর বয়োজ্যেষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও তাঁহাকে কুরআন, হাদীস, ইজমা ও কিয়াসের সাহায্যে মসআলা প্রতিপাদন করার রীতি এবং নাসেখ-মনসুখ ও অমূম নসুসের পরিচয় লিপিবদ্ধ করার জন্য অনুরোধ করেন। ইবনে মহদীর অনুরোধ ক্রমেই ইমাম শাফেয়ী 'কিতাবুর রিসালা' নামক তাঁর যুগান্তকারী পুস্তিকা প্রণয়ন করেন। শাফেয়ীর "কিতাবুল হুজ্জাত"ও এই সময়ের লিখিত গ্রন্থ। দুই বৎসর পর্যন্ত বাগদাদে অবস্থান করার পর ইমাম শাফেয়ী মক্কায় প্রত্যাবর্তিত হন।
📄 বাগদানে পুনঃ প্রবেশ ও মিসর
১৯৮ হিজরীতে ইমাম শাফেয়ী পুনরায় বাগদাদে আগমন করিলেন, কিন্তু তখন হারুনুর রশীদের মৃত্যু ঘটিয়াছিল। তদীয় পুত্র মামুন ভ্রাতা আমীনের রক্তে স্বীয় হস্ত রঞ্জিত করিয়া খিলাফতের সিংহাসনে অধিরোহন করিয়াছিলেন। আমীনের পৃষ্ঠপোষকতায় আরবীয় শক্তি দণ্ডায়মান হইয়াছিল। আর মামুনের প্রতিষ্ঠা কল্পে তাঁর চতুস্পার্শে তদানীন্তন পারসিক শক্তির সমাবেশ ঘটিয়াছিল। ফলে আমীনের পরাজয় দ্বারা প্রকৃত প্রস্তাবে ইসলামী খিলাফতে আরবীয়-প্রভাবেরই অবসান সূচিত হইয়াছিল。
এই নবোদ্ভূত পরিবেশ ইমাম শাফেয়ীর প্রকৃতির অনুকূল হয় নাই। এতদ্ব্যতীত খলীফা হারুনুর রশীদের যুগে তদানীন্তন ইসলাম জগতের অন্যান্য নগর নগরীর ন্যায় বাগদাদেও আহলে সুন্নাতগণেরই সর্বাধিক প্রভাব ও প্রাধান্য পরিলক্ষিত হইত। কিন্তু মামুনুর রশীদের গায়ের-ইসলামী দার্শনিক রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গী বাগদাদে জ্ঞান সাধনার ক্ষেত্রেও অভূতপূর্ব বিপ্লব সৃষ্টি করিয়া ফেলিয়াছিল। আহলে সুন্নাত বিদ্বানগণের পরিবর্তে বাগদাদে তখন মু'তাযিলাদের প্রতিপত্তি বাড়িয়া যাইতেছিল। মু'তাযিলারাই রাজদরবারের ভিতরে ও বাহিরে সর্বেসর্বা হইয়া পড়িয়াছিলেন, বিদ্যা-বুদ্ধি এমন কি ফিকহ শাস্ত্রেও খলীফা মামুন তাঁহাদিগকেই অগ্রগণ্য বিবেচনা করিতেন। এই দিকে ইমাম শাফেয়ী-ইমাম মালিক ও ইমাম আবু হানিফার ন্যায় মু'তাযিলাদিগকে মোটেই বরদাশ্ত করিতে পারিতেন না, তাঁদের প্রতিপাদন ভঙ্গী ও সমস্যার সমাধান রীতি তাঁর মনঃপুত হইত না। ইতিমধ্যে মু'তাযিলাদের প্ররোচনায় মামুন কুরআন সৃষ্ট পদার্থ কিনা সে সম্পর্কে এক অভিমত অত্যন্ত কঠোরতার সহিত প্রচার করিতে প্রবৃত্ত হইয়া তৎকালীন আহলে সুন্নত বিদ্বানগণকে নিপীড়ন করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। এই সময়ে স্বয়ং মামুনুর রশীদ ইমাম শাফেয়ীকে বাগদাদের প্রধান বিচারপতির পদ গ্রহণ করার জন্য আহ্বান করেন। কিন্তু সমুদয় অবস্থা বিবেচনা করিয়া ইমাম সাহেব খলীফার প্রস্তাব স্বসম্মানে প্রত্যাখান করিলেন এবং নিম্নলিখিত কবিতা পাঠ করিতে করিতে চিরদিনের মত এশিয়া মহাদেশ পরিত্যাগ করিয়া মিসরের যাত্রী হইলেন :
لقد أصبحت نفسي تتوق الى مصر !
ومن دونها أرض المهامة والقفر !
فو الله ما أدرى الفوز والغنى ؟
أساق إليها أم أساق إلى قبرى ؟
অর্থাৎ আমার মন মিসরের দিকে এখন বড়ই আগ্রাহান্বিত হইয়াছে, কিন্তু এ পথ দুঃখপূর্ণ ও তৃর্ণলতাদি শূন্য! আল্লাহর শপথ! আমি জানি না, আমি সাফল্য ও সম্পদের সহিত মিলিত হইবার জন্য তথায় গমন করিতেছি, না কবরের মুখে প্রবেশ করার জন্য।
📄 মিসরে পদার্পণ
বড়ই আশ্চর্যের বিষয়, ইমাম শাফেয়ী তদীয় কবিতায় দুইটি বিষয়ের মধ্যে যে কোন একটির প্রত্যাশা করিলেও মিসরে তিনি উভয় বস্তুরই অধিকারী হইয়াছিলেন। ১৯৮ হিজরীতে ইমাম শাফেয়ী মিসরে উপস্থিত হইবার সংগে সংগেই উক্ত প্রদেশের শাসনকর্তা রাজকোষ হইতে অভাবগ্রস্ত জ্ঞাতির অংশ ইমাম শাফেয়ীর জন্য বরাদ্দ করিয়া দিলেন। ফলে তিনি জীবিকার চিন্তা হইতে নিশ্চিন্ত হইয়া নবোদ্যমে স্বীয় ফিক্হী স্কুলের প্রতিষ্ঠা কল্পে সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করিলেন। আব্দুল্লাহ বিনে আবদুল হাকাম (মৃঃ ২১৪ হি) মুহাম্মদ বিনে আবদুল্লাহ বিনে আবদুল হাকাম (মৃঃ ২৭৮ হিঃ) রুবাইয়অ বিনে সুলায়মান, (মৃঃ ২৭০ হিঃ) ইসমাঈল বিনে ইয়াহয়া মুযানী (মৃঃ ২৬৪ হিঃ), ইউসুফ বিনে ইয়াহয়া বুওয়ায়তী (মৃঃ ২৩১ হিঃ) প্রভৃতি প্রথিতযশা বিদ্বানগণ কেহ মালিকী ও কেহ হানাফী স্কুল পরিত্যাগ করিয়া ইমাম সাহেব কর্তৃক স্থাপিত নূতন শাফেয়ী দলে দীক্ষিত হইলেন। মিসরেই ইমাম সাহেব তাঁর মযহব অনুসারে বিশ্ববরেণ্য গ্রন্থরাজি যথা কিতাবুল উম, ইমলায়ে কুরা, ইমলায়ে সগীর, মুখতসর বওয়ায়তী, মুখতসর মুযানী, মুখতসর রুবাইয়অ ও কিতাবুসসুনন প্রভৃতি রচনা করিয়াছিলেন।
ইমাম শাফেয়ী বাগদাদে অবস্থানকালীন আপন গ্রন্থ সমূহে যে সকল সিদ্ধান্ত সন্নিবেশিত করিয়াছিলেন, সেগুলি "মহযবে কদীম" আর মিসরে লিখিত গ্রন্থরাজিতে বর্ণিত অভিমত "মযহবে জদীদ" বলিয়া শাফেয়ী ফিক্হে উল্লিখিত হইয়াছে।
📄 ইমাম শাফেয়ীর পরিগৃহীত ব্যবহারিক মযহব
১৯৫ হিজরী অর্থাৎ বাগদাদে প্রবেশ করার অব্যবহিত কাল পূর্ব পর্যন্ত ইমাম শাফেয়ী ইমাম মালিকের সর্বাপেক্ষা বড় সমর্থক ছিলেন, কিন্তু যখন তিনি বুঝিতে পারিলেন, যে, ইমাম মালিকের অন্ধ ভক্তের দল তাঁর উক্তি ও সিদ্ধান্ত সমূহকে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসেরও উর্ধেস্থান দিতে আরম্ভ করিয়াছেন এবং তাঁহাকে প্রমাদহীন সাব্যস্ত করিতে দৃঢ়সংকল্প হইয়াছেন তখন ইমাম শাফেয়ী বাধ্য হইয়া রাসূলুল্লাহ (সা) হাদীস সমূহের রক্ষী এবং প্রহরীরূপে ইমাম মালিকের মযহবের সমালোচনায় প্রবৃত্ত হইলেন।