📄 ইমাম শাফেয়ীর বৈশিষ্ট্য
ইমাম মালিক (র) যেরূপ মদনী ও কুফী বিদ্যার উদ্ভব কেন্দ্র ছিলেন, সেইরূপ ইমাম শাফেয়ীর মধ্যে মদনী ও কুফী অর্থাৎ হাদীস ও রায় উভয় বিদ্যা সংগম লাভ করিয়াছিল। হাফেয ইবনে হজর আসকালানীর ভাষায় বলা যাইতে পারে যে, "মদনী ফিক্সের সার্বভৌমত্ব ইমাম মালিকের ভিতর নিঃশোষিত হইয়াছিল, ইমাম শাফেয়ী তাঁর নিকট উপস্থিত হইয়া, তাঁর শিষ্যত্ব বরণ করিয়া ইমাম মালিকের সমুদয় বিদ্যার ধারক হইয়াছিলেন। আবার ইরাকী ফিরে একচ্ছত্র অধিনায়কত্ব ইমাম আবু হানিফার মধ্যে সমাপ্তি লাভ করিয়াছিল। ইমাম শাফেয়ী তাঁর সন্দর্শন লাভ করেন নাই। কিন্তু তাঁর বিশিষ্ট ছাত্র যিনি ইমাম মালিকেরও অন্যতম ছাত্র ছিলেন সেই ইমাম মুহাম্মদ বিনুল হাসানের নিকট হইতে ইরাকী ফিক্সের সমস্তই শ্রবণ করিয়াছিলেন। ফলে ইমাম শাফেয়ীর মধ্যে আহলে হাদীস ও আহলে রায় উভয় দলের বিদ্যার সমাবেশ হইয়াছিল এবং এ বিষয়ে তাঁর পক্ষ ও প্রতিপক্ষ সকলেই তাঁর আনুগত্য স্বীকার করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন।"
ইমাম শাফেয়ী স্বয়ং বলিয়াছিলেন:
‘আমি মুহাম্মদ বিনুল হাসানের নিকট হইতে উষ্ট্রের বোঝা পরিমাণ বিদ্যা সংকলিত করিয়াছিলাম এবং যদি তিনি না হইতেন তাহা হইলে আমার বিদ্যা যেরূপ বিস্তৃতি লাভ করিয়াছে, সেরূপ করিত না।’ [শযরাতুযযহব (১) ৩২৩ পৃঃ]।।
ইমাম মুহাম্মদ ইমাম শাফেয়ীকে যেরূপ ইরাকের বিদ্যায় সমৃদ্ধ করিয়া তুলিয়াছিলেন, সেইরূপ তাঁর অভাব অভিযোগেও সকল সময়ে প্রচুর অর্থ সাহায্য করিতেন। ইমাম মুহাম্মদ স্বীয় উসতায ভাই ও গৌরবান্বিত ছাত্রকে অত্যন্ত সম্মান করিতেন। একদা খলীফার দরবারে গমন করার জন্য কাযী মুহাম্মদ বিনুল হাসান অশ্বারোহণ করিয়াছিলেন এমন সময়ে ইমাম শাফেয়ী আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তাঁহাকে দর্শন করা মাত্র ইমাম মুহাম্মদ অশ্বপৃষ্ঠ হইতে অবতরণ করিলেন এবং স্বীয় খাদিমকে বলিলেন, যাও, খলীফার কাছে গিয়া বল, আমার পক্ষে এখন উপস্থিত হওয়া সম্ভবপর হইল না; শাফেয়ী স্বীয় উসতাযকে বলিলেন, আমি অন্য সময় উপস্থিত হইলেই চলিবে। ইমাম মুহাম্মদ বলিলেন, তাহা হইতে পারে না। এই কথা বলিয়া তিনি শাফেয়ীর হস্ত ধারণ পূর্বক স্বীয় বাসভবনে প্রবেশ করিলেন।
📄 মক্কায় প্রত্যাবর্তন
কুরআন, হাদীস, ফিক্হে মদীনা, ফিক্হে ইরাক, আরবী সাহিত্য, কবিতা, ইতিহাস, রিজাল প্রভৃতি বিদ্যায় আপন যুগের বিদ্বানগণের মধ্যে শীর্ষস্থান অধিকার করিয়া ইমাম শাফেয়ী মক্কায় প্রত্যাবর্তিত হন। মক্কায় হজ্জের মওসুমে ইসলাম জগতের সকল প্রান্ত হইতে সমস্ত দলের বিদ্বান, ফকীহ ও মুহাদ্দিসগণ সমবেত হইতেন। মুসলিম জগতের এই নাভিস্থল হইতে ইমাম শাফেয়ীর যশো-সৌরভ মৃগণাভির ন্যায় পৃথিবীর প্রতি প্রান্তে ছড়াইয়া পড়িল, এই স্থানেই ইমাম আহমদ বিনে হাম্বল ও ইসহাক বিনে রাহওয়ে প্রভৃতির ন্যায় বিদ্বানগণ তাঁর সহিত মিলিত হইয়াছিলেন।
ইসহাক বিনে রাহওয়ে বলিতেছেন, একদা আমরা সুফ্যান বিনে উআয়নার দর্সে আম্র বিনে দীনারের হাদীসগুলি লিপিবদ্ধ করিতেছিলাম, এমন সময় আহমদ বিনে হাম্বল আসিয়া আমাকে বলিলেন, تعال حتى أذهب بك إلى من لم ترعيناك مثله "চল আবু ইয়াকুব, আমি তোমাকে লইয়া এমন একজন লোকের নিকট যাইব যাঁহার তুল্য কোন ব্যক্তিকে তোমার চক্ষু কোনদিন দর্শন করে নাই।" আমি তাঁর কথা শুনিয়া গাত্রোত্থান করিলাম, তিনি আমাকে ইমাম শাফেয়ীর দর্সের হলকায় লইয়া গেলেন। আমি তাঁর বিদ্যার গভীরতা এবং স্মৃতিশক্তির প্রখরতা দেখিয়া চমৎকৃত হইলাম। ইমাম আহমদ বলিলেন, হে আবু ইয়াকুব, ইহার নিকট হইতে যাহা পার শিখিয়া লও, কারণ ইহার তুল্য কোন ব্যক্তি আমি দর্শন করি নাই। ইমাম শাফেয়ী মক্কায় ৯ বৎসর পর্যন্ত অবস্থান করেন, ইতিমধ্যে তাঁর যশোভাতি মধ্যাহ্ন ভাস্করের ন্যায় দিগদিগন্তে ছড়াইয়া পড়ে।
📄 বাগদাদে প্রবেশ
সর্বজনমান্য বিশ্ব-বিশ্রুত মহাবিদ্বান রূপে সর্ব প্রথম ১৯৫ হিজরীতে ইমাম শাফেয়ী ইসলাম জগতের তৎকালীন কেন্দ্র-ভূমি বাগদাদে প্রবেশ করেন। তখন তিনি ইসলামী ফিক্হে একটি নিজস্ব স্কুল প্রতিষ্ঠা করার যোগ্যতা অর্জন করিয়াছিলেন। বাগদাদে উপনীত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দারুল খিলাফতের ফকীহ্ ও মুহাদ্দিসগণ কর্তৃক তিনি পরিবেষ্টিত হইলেন। খলীফার গোষ্ঠির বহু গণ্যমান্য ব্যক্তিও শাফেয়ীর বিদ্যাবত্তার প্রভাবে নতশীর হইলেন। তিনি এ যাত্রায় দুই বৎসর বাগদাদে অবস্থান করিয়াছিলেন। এই সময় ইমাম আবু সওর বাগদাদী, ইমাম আহমদ বিনে হাম্বল, হাসান বিনে মুহাম্মদ সবাহ যাআফরানী ও আবু আবদুর রহমান প্রভৃতি তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। বাগদাদের তৎকালীন শ্রেষ্ঠতম হাদীসতত্ববিশারদ আবদুর রহমান বিনে মহদী ইমাম শাফেয়ী অপেক্ষা পনের বৎসর বয়োজ্যেষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও তাঁহাকে কুরআন, হাদীস, ইজমা ও কিয়াসের সাহায্যে মসআলা প্রতিপাদন করার রীতি এবং নাসেখ-মনসুখ ও অমূম নসুসের পরিচয় লিপিবদ্ধ করার জন্য অনুরোধ করেন। ইবনে মহদীর অনুরোধ ক্রমেই ইমাম শাফেয়ী 'কিতাবুর রিসালা' নামক তাঁর যুগান্তকারী পুস্তিকা প্রণয়ন করেন। শাফেয়ীর "কিতাবুল হুজ্জাত"ও এই সময়ের লিখিত গ্রন্থ। দুই বৎসর পর্যন্ত বাগদাদে অবস্থান করার পর ইমাম শাফেয়ী মক্কায় প্রত্যাবর্তিত হন।
📄 বাগদানে পুনঃ প্রবেশ ও মিসর
১৯৮ হিজরীতে ইমাম শাফেয়ী পুনরায় বাগদাদে আগমন করিলেন, কিন্তু তখন হারুনুর রশীদের মৃত্যু ঘটিয়াছিল। তদীয় পুত্র মামুন ভ্রাতা আমীনের রক্তে স্বীয় হস্ত রঞ্জিত করিয়া খিলাফতের সিংহাসনে অধিরোহন করিয়াছিলেন। আমীনের পৃষ্ঠপোষকতায় আরবীয় শক্তি দণ্ডায়মান হইয়াছিল। আর মামুনের প্রতিষ্ঠা কল্পে তাঁর চতুস্পার্শে তদানীন্তন পারসিক শক্তির সমাবেশ ঘটিয়াছিল। ফলে আমীনের পরাজয় দ্বারা প্রকৃত প্রস্তাবে ইসলামী খিলাফতে আরবীয়-প্রভাবেরই অবসান সূচিত হইয়াছিল。
এই নবোদ্ভূত পরিবেশ ইমাম শাফেয়ীর প্রকৃতির অনুকূল হয় নাই। এতদ্ব্যতীত খলীফা হারুনুর রশীদের যুগে তদানীন্তন ইসলাম জগতের অন্যান্য নগর নগরীর ন্যায় বাগদাদেও আহলে সুন্নাতগণেরই সর্বাধিক প্রভাব ও প্রাধান্য পরিলক্ষিত হইত। কিন্তু মামুনুর রশীদের গায়ের-ইসলামী দার্শনিক রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গী বাগদাদে জ্ঞান সাধনার ক্ষেত্রেও অভূতপূর্ব বিপ্লব সৃষ্টি করিয়া ফেলিয়াছিল। আহলে সুন্নাত বিদ্বানগণের পরিবর্তে বাগদাদে তখন মু'তাযিলাদের প্রতিপত্তি বাড়িয়া যাইতেছিল। মু'তাযিলারাই রাজদরবারের ভিতরে ও বাহিরে সর্বেসর্বা হইয়া পড়িয়াছিলেন, বিদ্যা-বুদ্ধি এমন কি ফিকহ শাস্ত্রেও খলীফা মামুন তাঁহাদিগকেই অগ্রগণ্য বিবেচনা করিতেন। এই দিকে ইমাম শাফেয়ী-ইমাম মালিক ও ইমাম আবু হানিফার ন্যায় মু'তাযিলাদিগকে মোটেই বরদাশ্ত করিতে পারিতেন না, তাঁদের প্রতিপাদন ভঙ্গী ও সমস্যার সমাধান রীতি তাঁর মনঃপুত হইত না। ইতিমধ্যে মু'তাযিলাদের প্ররোচনায় মামুন কুরআন সৃষ্ট পদার্থ কিনা সে সম্পর্কে এক অভিমত অত্যন্ত কঠোরতার সহিত প্রচার করিতে প্রবৃত্ত হইয়া তৎকালীন আহলে সুন্নত বিদ্বানগণকে নিপীড়ন করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। এই সময়ে স্বয়ং মামুনুর রশীদ ইমাম শাফেয়ীকে বাগদাদের প্রধান বিচারপতির পদ গ্রহণ করার জন্য আহ্বান করেন। কিন্তু সমুদয় অবস্থা বিবেচনা করিয়া ইমাম সাহেব খলীফার প্রস্তাব স্বসম্মানে প্রত্যাখান করিলেন এবং নিম্নলিখিত কবিতা পাঠ করিতে করিতে চিরদিনের মত এশিয়া মহাদেশ পরিত্যাগ করিয়া মিসরের যাত্রী হইলেন :
لقد أصبحت نفسي تتوق الى مصر !
ومن دونها أرض المهامة والقفر !
فو الله ما أدرى الفوز والغنى ؟
أساق إليها أم أساق إلى قبرى ؟
অর্থাৎ আমার মন মিসরের দিকে এখন বড়ই আগ্রাহান্বিত হইয়াছে, কিন্তু এ পথ দুঃখপূর্ণ ও তৃর্ণলতাদি শূন্য! আল্লাহর শপথ! আমি জানি না, আমি সাফল্য ও সম্পদের সহিত মিলিত হইবার জন্য তথায় গমন করিতেছি, না কবরের মুখে প্রবেশ করার জন্য।