📄 মদীনায় আগমন
মক্কার গুণী ও সুধীবৃন্দের নিকট হইতে শিক্ষা সমাপ্ত করিয়া ইমাম সাহেব ১৬৩ হিজরীতে মদীনার ইমাম মালিক বিনে আনসের নিকট উপস্থিত হন। শাফেয়ী স্বয়ং বলিয়াছেন, আমি ইমাম মালিক কর্তৃক ক্লাসে শরীক হইবার অনুমতি প্রাপ্ত হইয়া পরবর্তী দিবসের দরসের হলকায় যোগদান করিলাম মোয়াত্তা আমার হাতেই ছিল, আমি উচ্চকণ্ঠে উহা আবৃত্তি করিতে আরম্ভ করিয়া দিলাম কিন্তু আমি ইমাম মালিকের প্রতাপে স্তব্ধ হইয়া গেলাম এবং আবৃত্তি শেষ করিতে উদ্যত হইলাম। ইমাম মালিক আমার আবৃত্তির সৌন্দর্যে সন্তুষ্ট হইয়া বলিয়া উঠিলেন, হে জওয়ান, পড়িতে থাক। আবৃত্তি বন্ধ করিও না। ইমাম শাফেয়ী বলেন, আমি এই ভাবে কয়েক দিবস পর্যন্ত মুওয়াত্তা আবৃত্তি করিতে থাকিলাম। ১৯৭ হিজরীতে ইমাম মালিকের ওফাত হয়, ইমাম শাফেয়ী উসতাযের মৃত্যুকাল পর্যন্ত তাঁর সাহচর্য সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করেন নাই, মাঝে মাঝে মাতৃ দর্শনের উদ্দেশ্যে তিনি মক্কায় এবং দেশ পর্যটনের জন্য বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করিতেন।
📄 চাকুরী জীবন
দারিদ্রের কবলে নিষ্পেষিত হইতে থাকায় অতঃপর ইমাম সাহেবকে অর্থোপার্জনের কার্যে মনোনিবেশ করিতে হইল। ইয়ামানের শাসনকর্তা তাঁর বিদ্যাবত্তা ও জ্ঞান গরিমার ভূয়সী প্রশংসা শুনিয়া তাঁহাকে ইয়ামানে একটি সরকারী চাকুরী দিতে সম্মত হন। ইমাম সাহেব তখন এরূপ সম্বলহীন হইয়া পড়িয়াছিলেন যে, পাথেয় সংগ্রহের জন্য তাঁহাকে তদীয় মাতার বাস গৃহ বন্ধক রাখিতে হইয়াছিল। মোটের উপর তিনি ইয়ামানে প্রথমতঃ একটি সরকারী কার্যে নিয়োজিত এবং কিছুকাল পরেই ইয়ামানের অন্তর্গত নজরানের শাসনকর্তা নিযুক্ত হইলেন। চাকুরী এবং শাসন কর্তৃত্বের কার্য উপলক্ষে বহু ফকীহ, মুহাদ্দিস ও বিদ্বান ব্যক্তির সহিত তাঁর যোগাযোগ স্থাপনের পথ সুগম হইল, তাঁর গভীর জ্ঞান ও বিদ্যাবত্তার কথা দূরদূরান্তর ছড়াইয়া পড়িল। কিন্তু একদল বিদ্বান তাঁহাকে চাকুরী পরিত্যাগ করার পরামর্শ দিতে ছিলেন, তাঁহারা তাঁহাকে বুঝাইতে ছিলেন যে, চাকুরীর জন্য বিদ্যাকে সৃষ্টি করা হয় নাই।
📄 বিদ্রোহের অভিযোগ
ইতিমধ্যে এমন কতকগুলি ব্যাপার সংগঠিত হইল যাহার ফলে ইমাম শাফেয়ী খলীফা হারূণের কোপ দৃষ্টিতে পতিত হইলেন। ইমাম সাহেব স্বয়ং লিখিয়াছেন, "আমি যখন নজদ্রানের শাসকর্তা নিযুক্ত হই, তখন উক্ত অঞ্চলে বনু হারিস ও বনু সকিফের মুক্তিপ্রাপ্ত ক্রীতদাসেরা বসবাস করিত। কোন নূতন ব্যক্তি শাসনকর্তা নিযুক্ত হইয়া নজদ্রানে আগমন করিলে এই মাওয়ালীর দল (কৃতদাসগণ) তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হইয়া নানা রূপ চাটুকারিতা ও স্তবস্তুতির সাহায্যে তাঁহাকে বশীভূত করিতে চেষ্টিত হইত। কিন্তু আমার কাছে সমবেত হইবার তাহারা সুবিধা পায় নাই"। ইতিমধ্যে নূতন একজন লোক ইয়ামানের গভর্ণর হইয়া আসে। এই লোকটি অত্যন্ত বদ-মেজাজ ও অত্যচারী ছিল। তাহার অত্যাচারের হস্ত হইতে নজরানের অধিবাসীবৃন্দকে রক্ষা করিবার জন্য ইমাম শাফেয়ী বদ্ধপরিকর হইলেন এবং উহার অত্যাচারের প্রতিরোধকল্পে তিনি তাহার কার্যকলাপের কঠোর সমালোচনা শুরু করিয়া দিলেন।
আব্বাসীরা হযরত আলীর বংশধরদের সাহায্যেই খিলাফতের সিংহাসনে সমারূঢ় হইয়াছিলেন, কিন্তু গদ্দী অধিকার করার পর তাহারা আলাব্বীদিগকেই নিজেদের সর্বাপেক্ষা বড় দুশমন ভাবিতে আরম্ভ করেন। রাসূলুল্লাহর (সা) আত্মীয়তার দাবীতেই আব্বাসী খলীফারা সিংহাসনের পথ প্রশস্ত করিয়াছিলেন, আর আলাব্বীরা আত্মীয়তার দাবীর দিক দিয়া রাসূলুল্লাহর (সা) অধিকতর নিকটবর্তী ছিলেন, ফলে আব্বাসী সম্রাটগণ আলাব্বীদিগকে নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বী স্থির করিয়া তাঁহাদের নিধনকল্পে দৃঢ় সংকল্প হইয়াছিলেন। ইয়ামানের শাসনকর্তা ইমাম শাফেয়ীর ক্ষুরধার সমালোচনার প্রতিশোধ গ্রহণ করার জন্য 'খলীফা হারুনুর রশীদকে লিখিয়া পাঠাইলেন যে, মুহাম্মদ বিনে ইদরীস নামক জনৈক শাফেয়ী মওলবী আলাব্বী বিদ্রোহের নেতৃত্ব গ্রহণ করিয়াছে। এই লোকটির রসনা যে কার্য করিতে সক্ষম অন্য কাহারও তরবারি তাহা করিতে সক্ষম নয়। হারূন ব্যস্তসমস্ত হইয়া ৯জন বিদ্রোহী আলাব্বীকে ইমাম শাফেয়ী সমভিব্যবহারে বাগদাদের দরবারে প্রেরণ করিবার ফর্মান জারি করিলেন। ইমাম শাফেয়ীকে খলীফা হারুনুর রশীদের সম্মুখে উপস্থিত করা হইলে খলীফা তাঁর বিরুদ্ধে আব্বাসী খিলাফতের অবসানকল্পে আলাব্বীদের সহিত ষড়যন্ত্র করার অভিযোগ উপস্থিত করেন এবং তাঁর আচরণের কৈফিয়ত চান। ইমাম সাহেব অভিযোগের জওয়াবে বলেন, আমীরুল মুমেনীন! আচ্ছা বলুন দেখি, দুইজন লোকের মধ্যে একজন আমাকে তাহার ভাই মনে করে আর অপর ব্যক্তি আমাকে তাহার ক্রীতদাস ধারণা করে, এতদুভয়ের মধ্যে আমার প্রীতিভাজন হইবে কে? খলীফা বলেন, যে ব্যক্তি আপনাকে ভাই মনে করিয়া থাকে স্বভাবতঃ সেই আপনার প্রীতিভাজন হইবে। শাফেয়ী বলিলেন, আমিরুল মুমেনীন! ইহাই আপনার অভিযোগের জওয়াব। আপনি হযরত আব্বাসের আর আলাব্বীরা রাসূলুল্লাহর (সা) জামাতা হযরত আলীর বংশধর। আমি মুত্তালিবের বংশধর! আপনারা আমাদিগকে আপনাদের ভ্রাতা বিবেচনা করেন, কিন্তু আলাব্বীরা আমাদিগকে তাহাদের দাস ধারণা করিয়া থাকে।
ইমাম ইবনে আবদুল বর এবং ইবনুল ইমাদ তাঁহাদের গ্রন্থে লিখিয়াছেন যে, হারুন তখন বাগদাদের অন্তঃপাতী রক্কা নামক নগরে অবস্থান করিতেছিলেন। উক্ত নগরের প্রধান বিচারপতি ছিলেন আবু হানীফার বিশিষ্ট ছাত্র ইমাম মুহাম্মদ বিনুল হাসান শয়বানী। তিনি শাফেয়ীর সুহৃদ ছিলেন এবং যাঁহাদের কাছে শাফেয়ী বিদ্যালাভ করার জন্য উপবেশন করিয়াছিলেন, ইমাম মুহাম্মদ বিনুল হাসান তাঁহাদের অন্যতম ছিলেন। ইমাম সাহেব হিজায হইতে ৯ জন আলাব্বীর সহিত রাজদ্রোহের অভিযোগে শৃংখলাবদ্ধ হইয়া মক্কায় নীত হন। অন্য একটি রেওয়াত সূত্রে শাফেয়ী কতিপয় কুরায়শী সমভিব্যবহারে জনৈক আলাব্বীর সহিত বিদ্রোহ সৃষ্টি করার অভিযোগে ধৃত হইয়া শৃংখলিত অবস্থায় মক্কা হইতে রক্কায় হারূনের সম্মুখে নীত হন, হারুনুর রশীদ ইমাম শাফেয়ীকে মক্কার কুরায়শী দলের মুখপাত্র স্বরূপ কৈফিয়ৎ জিজ্ঞাসা করিলে শাফেয়ী উপরিউক্ত মন্তব্য করিয়া ছিলেন। হারূন তাঁর জওয়াবে সন্তুষ্ট হইয়া সমুদয় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ৫ শত সুবর্ণ মুদ্রা এবং শাফেয়ীকে পৃথক ভাবে পঞ্চাশ সুবর্ণ মুদ্রা প্রদান করার আদেশ দিয়া মুক্তি দেন। কিন্তু অপর রেওয়ায়ত অনুসারে হারুন ৯ জন আলাব্বীকেই নিহত করিয়াছিলেন। আর ইমাম শাফেয়ী জিজ্ঞাসিত হইলে, তিনি জওয়াব দিয়াছিলেন যে, আমি তালেবী (আবুতালেবের বংশধর) অথবা আলাব্বী (হযরত আলীর বংশধর) এতদুভয়ের কোনটাই নই। আমাকে যবরদস্তী এই দলের সংগে জুড়িয়া দেওয়া হইয়াছে। আমি আব্দে মানাফের পুত্র মুত্তালিব বংশীয়। [রাসূলুল্লাহর (সা) প্রপিতামহ হাশিমের ভ্রাতা, মুত্তালিবের পুত্র হাশিম আর রাসূলুল্লাহর (সা) প্রপিতামহ হাশেম সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ব্যক্তি]।
এতদ্ব্যতীত আমি কিছু বিদ্যাবুদ্ধিও রাখি, ফিক্ শাস্ত্রও অবগত আছি। আপনার কাযী অর্থাৎ ইমাম মুহাম্মদ বিনুল হাসান আমাকে চিনেন, আমার নাম মুহাম্মদ বিনে ইদরীস! তখন ইমাম মুহাম্মদও শাফেয়ীকে সমর্থন করেন এবং তাঁর জ্ঞান গরিমা ও বিদ্যাবত্তার কথা খলীফা হারুনের নিকট ব্যক্ত করেন। হারুনুর রশীদ সমুদয় বিষয় অবগত হইয়া ইমাম শাফেয়ীকে ইমাম মুহাম্মদের সংগে যাইতে দেন। এই ব্যাপার ১৮৪ হিজরীতে অর্থাৎ ইমাম শাফেয়ীর ৩২ বৎসর বয়সে ঘটিয়াছিল বলিয়া ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করিয়াছেন।
📄 ইমাম শাফেয়ীর বৈশিষ্ট্য
ইমাম মালিক (র) যেরূপ মদনী ও কুফী বিদ্যার উদ্ভব কেন্দ্র ছিলেন, সেইরূপ ইমাম শাফেয়ীর মধ্যে মদনী ও কুফী অর্থাৎ হাদীস ও রায় উভয় বিদ্যা সংগম লাভ করিয়াছিল। হাফেয ইবনে হজর আসকালানীর ভাষায় বলা যাইতে পারে যে, "মদনী ফিক্সের সার্বভৌমত্ব ইমাম মালিকের ভিতর নিঃশোষিত হইয়াছিল, ইমাম শাফেয়ী তাঁর নিকট উপস্থিত হইয়া, তাঁর শিষ্যত্ব বরণ করিয়া ইমাম মালিকের সমুদয় বিদ্যার ধারক হইয়াছিলেন। আবার ইরাকী ফিরে একচ্ছত্র অধিনায়কত্ব ইমাম আবু হানিফার মধ্যে সমাপ্তি লাভ করিয়াছিল। ইমাম শাফেয়ী তাঁর সন্দর্শন লাভ করেন নাই। কিন্তু তাঁর বিশিষ্ট ছাত্র যিনি ইমাম মালিকেরও অন্যতম ছাত্র ছিলেন সেই ইমাম মুহাম্মদ বিনুল হাসানের নিকট হইতে ইরাকী ফিক্সের সমস্তই শ্রবণ করিয়াছিলেন। ফলে ইমাম শাফেয়ীর মধ্যে আহলে হাদীস ও আহলে রায় উভয় দলের বিদ্যার সমাবেশ হইয়াছিল এবং এ বিষয়ে তাঁর পক্ষ ও প্রতিপক্ষ সকলেই তাঁর আনুগত্য স্বীকার করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন।"
ইমাম শাফেয়ী স্বয়ং বলিয়াছিলেন:
‘আমি মুহাম্মদ বিনুল হাসানের নিকট হইতে উষ্ট্রের বোঝা পরিমাণ বিদ্যা সংকলিত করিয়াছিলাম এবং যদি তিনি না হইতেন তাহা হইলে আমার বিদ্যা যেরূপ বিস্তৃতি লাভ করিয়াছে, সেরূপ করিত না।’ [শযরাতুযযহব (১) ৩২৩ পৃঃ]।।
ইমাম মুহাম্মদ ইমাম শাফেয়ীকে যেরূপ ইরাকের বিদ্যায় সমৃদ্ধ করিয়া তুলিয়াছিলেন, সেইরূপ তাঁর অভাব অভিযোগেও সকল সময়ে প্রচুর অর্থ সাহায্য করিতেন। ইমাম মুহাম্মদ স্বীয় উসতায ভাই ও গৌরবান্বিত ছাত্রকে অত্যন্ত সম্মান করিতেন। একদা খলীফার দরবারে গমন করার জন্য কাযী মুহাম্মদ বিনুল হাসান অশ্বারোহণ করিয়াছিলেন এমন সময়ে ইমাম শাফেয়ী আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তাঁহাকে দর্শন করা মাত্র ইমাম মুহাম্মদ অশ্বপৃষ্ঠ হইতে অবতরণ করিলেন এবং স্বীয় খাদিমকে বলিলেন, যাও, খলীফার কাছে গিয়া বল, আমার পক্ষে এখন উপস্থিত হওয়া সম্ভবপর হইল না; শাফেয়ী স্বীয় উসতাযকে বলিলেন, আমি অন্য সময় উপস্থিত হইলেই চলিবে। ইমাম মুহাম্মদ বলিলেন, তাহা হইতে পারে না। এই কথা বলিয়া তিনি শাফেয়ীর হস্ত ধারণ পূর্বক স্বীয় বাসভবনে প্রবেশ করিলেন।