📄 স্মৃতি ও অধ্যবসায়
স্মরণ শক্তি অতিশয় তীক্ষ্ণ হওয়া সত্বেও অধিকতর স্মৃতি শক্তি লাভ করার জন্য লোবান ব্যবহার করার ফলে শাফেয়ী অর্শ্বরোগে আক্রান্ত হইয়াছিলেন। অসামান্য স্মৃতিধর হইয়াও ইমাম শাফেয়ী কাপড় ও চামড়ায় হাদীস লিখিয়া লইতেন। দারিদ্র নিবন্ধন কাগজ কিনিতে অক্ষম হওয়ায় অনেক সময়ে সরকারী দফতরের পরিত্যক্ত কাগজের শূন্য পৃষ্ঠায় হাদীস লিপিবদ্ধ করিতেন।
📄 সাহিত্যিক পাণ্ডিত্য ও প্রতিভা
ইমাম শাফেয়ী প্রথমেই বুঝিতে পারিয়াছিলেন যে, ইসলামী ফিকহ, সুন্নত ও কুরআনে বিশেষজ্ঞের আসন অধিকার করিতে হইলে আরবী সাহিত্যে ও সাহিত্যিকতায় অগাধ পাণ্ডিত্যের প্রয়োজন। এই উদ্দেশ্যে প্রায় কুড়ি বৎসর পর্যন্ত তিনি আরব বেদুইনদের মধ্যে অতিবাহিত করিয়াছিলেন, হুযায়লদের দশ সহস্র কবিতা সঠিক উচ্চারণ ও প্রয়োগ পদ্ধতি সহকারে ইমাম সাহেবের কণ্ঠস্থ ছিল। প্রথিতযশা সাহিত্যিক ও আভিধানিক আসমায়ী (১২২-২১৬) ইমাম শাফেয়ীর বয়োজ্যেষ্ঠ হওয়া সত্বেও হুযায়লীদের কবিতা তাঁর নিকট হইতে শিক্ষা করিয়াছিলেন, তিনি স্বয়ং বলিয়াছেন,
‘আমি শনফরা আযদীর কবিতামালা মুহাম্মদ বিনে ইদরীস শাফেয়ীর নিকট পাঠ করিয়াছি।’
মুতাযেলাদের ইমাম স্বনামধন্য সাহিত্যিক জাহেয বলেন,
‘আমি এই সকল অনুসরণজীবী অর্থাৎ আহলে সুন্নতদের গ্রন্থগুলি পাঠ করিয়া দেখিলাম যে, মুত্তলবী অপেক্ষা উৎকৃষ্ট সাহিত্যিক আর কেহই নাই। তাঁর ভাষা যেন মুক্তার মালা গাঁথিয়া যাইতেছে।’
কুরআন মজীদের সূরা আননিসার আয়াতে কথিত:
‘যালিকা আদনা- আল্লা তা’উ-লূ’
বাক্যের ব্যাখ্যা প্রসংগে মু'তাযেলী হানাফী ইমাম আল্লামা যমখশরী (৪৬৭-৫০৬) তাঁর "কাশশাফে" ইমাম শাফেয়ী কর্তৃক প্রদত্ত ব্যাখ্যার সমর্থন করিয়া লিখিয়াছেন,
‘শাফেয়ীর ন্যায় বিদ্বজ্জনমণ্ডলীর মুখপাত্র, শরীয়তের ইমাম, মুজতাহিদগণের শিরোমণি ব্যক্তির প্রদত্ত ব্যাখ্যাকেই সঠিক ও অভ্রান্ত মনে করা উচিত। আরবী সাহিত্যে তিনি অসাধারণ দক্ষতা ও নৈপুণ্যের অধিকারী ছিলেন।’
সুপ্রসিদ্ধ বৈয়াকরণ মাযেনী (-২৪৯), আভিধানিক স'লব (২০০-২৯১) ও আযহারী (২৮২-৩৭০) সাক্ষ্য দিয়াছেন যে,
‘মুহাম্মদ বিনে ইদরীস (শাফেয়ীর) উক্তি অভিধানের দিক দিয়া অথরিটি বা প্রামাণ্য।’
📄 লক্ষ্যভেদে অসাধারণত্ব
আরবী সাহিত্য, ব্যাকরণ ও অভিধানের ন্যায় ইমাম শাফেয়ী শর সন্ধানেও পারদর্শিতা লাভ করিয়াছিলেন। একদিন ছাত্র ও বন্ধু বান্ধব পরিবেষ্টিত মজলিসে তিনি বলিতে ছিলেন, আমার ষোলআনা মনোযোগ বাল্যে ও যৌবনে তীর কামান শিক্ষা করার ও বিদ্যা অর্জনের কার্যে নিবিষ্ট ছিল, তীর নিক্ষেপ করার কার্যে আমি এরূপ দক্ষতা অর্জন করিয়াছিলাম যে, আমার নিক্ষিপ্ত দশটি তীরের মধ্যে একটিও লক্ষ্যচ্যুত হইত না। ইমাম সাহেব তীর কামানে তাঁর দক্ষতার কথা বলিলেন বটে কিন্তু নিজের জ্ঞান গরিমা সম্বন্ধে কিছুই বলিলেন না। মজলিসে সমাগত জনৈক ব্যক্তি বলিয়া উঠিলেন, আল্লাহর শপথ! বিদ্যার গরিমায় আপনি তীর কামানের নৈপুন্যকেও অতিক্রম করিয়া গিয়াছেন।
📄 মদীনায় আগমন
মক্কার গুণী ও সুধীবৃন্দের নিকট হইতে শিক্ষা সমাপ্ত করিয়া ইমাম সাহেব ১৬৩ হিজরীতে মদীনার ইমাম মালিক বিনে আনসের নিকট উপস্থিত হন। শাফেয়ী স্বয়ং বলিয়াছেন, আমি ইমাম মালিক কর্তৃক ক্লাসে শরীক হইবার অনুমতি প্রাপ্ত হইয়া পরবর্তী দিবসের দরসের হলকায় যোগদান করিলাম মোয়াত্তা আমার হাতেই ছিল, আমি উচ্চকণ্ঠে উহা আবৃত্তি করিতে আরম্ভ করিয়া দিলাম কিন্তু আমি ইমাম মালিকের প্রতাপে স্তব্ধ হইয়া গেলাম এবং আবৃত্তি শেষ করিতে উদ্যত হইলাম। ইমাম মালিক আমার আবৃত্তির সৌন্দর্যে সন্তুষ্ট হইয়া বলিয়া উঠিলেন, হে জওয়ান, পড়িতে থাক। আবৃত্তি বন্ধ করিও না। ইমাম শাফেয়ী বলেন, আমি এই ভাবে কয়েক দিবস পর্যন্ত মুওয়াত্তা আবৃত্তি করিতে থাকিলাম। ১৯৭ হিজরীতে ইমাম মালিকের ওফাত হয়, ইমাম শাফেয়ী উসতাযের মৃত্যুকাল পর্যন্ত তাঁর সাহচর্য সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করেন নাই, মাঝে মাঝে মাতৃ দর্শনের উদ্দেশ্যে তিনি মক্কায় এবং দেশ পর্যটনের জন্য বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করিতেন।