📘 ফিরকাবন্দি বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি 📄 কূপমণ্ডুকতা বিরোধী নীতি

📄 কূপমণ্ডুকতা বিরোধী নীতি


বর্তমান জগতে ইলমুল হাদীসের প্রাচীনতম ও শ্রেষ্ঠতম সম্পদ হইতেছে "মু'আত্তা ইমাম মালিক"। ইমাম সাহেব সুদীর্ঘ চল্লিশ বৎসরের কঠোর পরিশ্রমে এই অমূল্য গ্রন্থ সংকলিত ও সুসম্পাদিত করিয়াছিলেন। খলিফা মনসুর আব্বাসী এই অপূর্ব গ্রন্থের বৈশিষ্ট্যে মুগ্ধ হইয়া হজ্জ করিতে আসিয়া ইমাম সাহেবের নিকট প্রস্তাব করেন, ‘আমি আপনার প্রণীত গ্রন্থগুলি নকল করাইয়া মুসলিম অধ্যূষিত নগরসমূহে প্রেরণ করিতে এবং সর্বত্র এই আদেশ প্রচার করিতে চাই যে, সকলকে শুধু আপনার গ্রন্থগুলিরই অনুসরণ করিতে হইবে এবং কেহ ওগুলিকে অতিক্রম করিয়া চলিতে পারিবে না।’

ইমাম সাহেব খলিফার প্রস্তাবের উত্তরে বলিলেন, "আমীরুল মু'মেনীন! আপনি কদাচ এরূপ কার্য করিবেন না। কারণ "মুআত্তা" সংকলিত হইবার পূর্বেই বিভিন্ন উক্তি জনগণের হস্তগত হইয়াছে এবং তাঁহারা হাদীসসমূহ শ্রবণ করিয়াছেন এবং বিভিন্ন রেওয়ায়ত বিদ্বানগণ বর্ণনা করিয়াছেন, যেরূপ উক্তি যে দলের হস্তগত হইয়াছে, তাঁহারা তাহাই অবলম্বন করিয়াছেন, এই ভাবে ব্যবহারিক বিষয়সমূহে বিদ্বানগণের মতভেদ জনগণের মধ্যে ছড়াইয়া পড়িয়াছে। অতএব প্রত্যেক নগরের অধিবাসীবৃন্দ তাহাদের জন্য যে যাহা অবলম্বন করিয়াছেন, আপনি তাঁহাদিগকে সেই অবস্থাতেই থাকিতে দিন।"

শাহ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দিস স্বীয় গ্রন্থে লিখিয়াছেন যে, আর একটি বর্ণনা সূত্রে খলিফা হারুনর রশীদও ইমাম মালিকের নিকট তাঁর গ্রন্থ 'মুআত্তাকে' পবিত্র কা'বার প্রাচীর গাত্রে ঝুলাইয়া দিবার এবং জনমণ্ডলীকে তাঁর অনুসরণে বাধ্য করার প্রস্তাব উত্থাপিত করিয়াছিলেন। ইমাম সাহেব তদুত্তরে হারুনর রশীদকে বলেন, "আপনি এরূপ করিবেন না, কারণ রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীগণের মধ্যে ব্যবহারিক বিষয়সমূহে মতভেদ ঘটিয়াছিল আর এইভাবেই তাঁহারা বিভিন্ন দেশে ছড়াইয়া পড়িয়াছিলেন! তাঁহাদের সমুদয় মতভেদ অতিক্রান্ত সুন্নাতরূপে পরিগৃহীত!" খলিফা হারুন বলিলেন, ‘হে আবু আবদুল্লাহ, আপনার মহানুভবতাকে আল্লাহ বর্ধিত করুন।’ [হুজ্জাতুল্লাহেল বালেগা ১৫০ পৃষ্ঠা]।।

নির্দিষ্ট কোন মযহবে জনমণ্ডলীকে সমবেত হইবার জন্য বাধ্য করা জ্ঞানের সম্প্রসারণ ও গবেষণার পক্ষে হানিকর, হারুনর রশীদও যে তাহা বুঝিতেন, তাঁর শেষ কথায় ইহা স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। এই ঘটনা দ্বারা একদিকে যেমন ইমাম মালিকের জ্ঞানের প্রখরতা ও তদীয় গ্রন্থ 'মুআত্তার' গৌরব গরিমা প্রতিপন্ন হইতেছে, তেমনি ইহাও প্রমাণিত হইতেছে যে, ইমাম মালিক তাঁর মযহবে জনসাধারণকে সমবেত করার কার্য্যে সম্মতি দেন নাই।

📘 ফিরকাবন্দি বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি 📄 রাসূলুল্লাহর [সা] প্রতি অনাবিল শ্রদ্ধা

📄 রাসূলুল্লাহর [সা] প্রতি অনাবিল শ্রদ্ধা


রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসের প্রতি ইমাম মালিকের অনাবিল শ্রদ্ধার বিবরণ পাঠকগণ ইতিপূর্বে শ্রবণ করিয়াছেন, এক্ষণে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা) প্রতি ইমাম সাহেবের সীমাহীন ও গভীরতম ভক্তির পরিচয় তাঁর দৈনন্দিন জীবনের একটি আচরণ হইতে গ্রহণ করুন। দুর্বলতা ও বার্ধক্য সত্ত্বেও ইমাম সাহেব তাঁর মৃত্যুকাল পর্যন্ত মদীনার বুকে কোন দিন কোন যানবাহনে আরোহণ করেন নাই। কেহ বিশেষভাবে অনুরোধ করিলে তিনি বলিতেন, "লা আরকাবু ফী মদীনাতি ফিহা জুসসাতু রাসূলিল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা মাদফূনাহ— যে মদীনার মাটির নীচে রাসূলুল্লাহর (সা) পবিত্র দেহ সমাহিত রহিয়াছে, সেই মদীনার বুকের উপর আমি কোন যানবাহনে উঠিতে পারি না।" [ইবনে খল্লকান (১) ৪৪৯ পৃঃ; শযরাতুয যাহব (১), ২৮৯ পৃঃ]।।

মুহাম্মদ আরবী (সা) উভয় জগতের আবরূ,
যে তাঁর দুয়ারের মাটি নয়, তার কপালে মাটি!

📘 ফিরকাবন্দি বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি 📄 মৃত্যু শয্যায় ইমাম

📄 মৃত্যু শয্যায় ইমাম


হাফেজ হুমায়দি "জযওয়াতুল মুকতাবিস" গ্রন্থে ইমাম মালিকের অন্যতম ছাত্র আবদুল্লাহ বিনে মুসলিমা কাত্মবীর প্রমুখাৎ বিবৃত করিয়াছেন যে, ইমাম মালিকের মৃত্যু শয্যায় আমি তাঁহাকে দর্শন করিতে গমন করি। সালামের পর আমি তাঁর শয্যা পার্শ্বে উপবেশন করিয়া দেখিতে পাই, তিনি অশ্রুবর্ষণ করিতেছেন। আমি আরয করিলাম, আবু আবদুল্লাহ, আপনি কাঁদিতেছেন কিসের জন্য? ইমাম সাহেব আমাকে প্রত্যুত্তরে বলিলেন:

"ইয়া ইবনে ক্বাননাব, মালী লা আবকী ওয়ামান আহাক্কু বিল বুকা-ই মিন্নী? ওয়াল্লাহি লা ওয়াদ্দাদ্দতু আন্নী যুরিবতু বিকুল্লি মাসআলাতিন আফতাইতু ফিহা বিরা’য়ী বি-সাওতিন সাওতিন, ওয়া ক্বাদ কানাত লিয়াছ সা’আতু ফিহা ক্বাদ সাবাক্বাত ইলাইয়্যা ওয়া লাইতানী লাম আফতি বি-রা’য়ী!"

অর্থাৎ— ওগো কানবের পুত্র, আমি কাঁদিব না কেন? আমি যদি না কাঁদি, তাহা হইলে আর কাঁদিবে কে? আল্লাহর শপথ! আমি যতগুলি ফতওয়া কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট নির্দেশ ছাড়া স্বীয় ব্যক্তিগত বিচার বুদ্ধির সাহায্যে প্রদান করিয়াছি, সেগুলির প্রত্যেকটির বিনিময়ে এক একটি করিয়া কোড়ার আঘাত সহ্য করা আমার পক্ষে উত্তম ছিল। অথচ এরূপ ফতওয়ায় নিরস্ত থাকা আমার সাধ্যাতীত ছিল না! হায় দুর্ভাগ্য! যদি ব্যক্তিগত বিচার বুদ্ধি প্রয়োগ করিয়া আমি ফতওয়া প্রদান না করিতাম! [ইবনে খল্লকান (১), ৪৩৯ পৃঃ]।।

📘 ফিরকাবন্দি বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি 📄 ইমাম সাহেবের ছাত্রমণ্ডলী

📄 ইমাম সাহেবের ছাত্রমণ্ডলী


ইমাম মালিকের প্রমুখাৎ যাঁহারা হাদীস শ্রবণ করিয়াছিলেন, অথচ যাঁহারা তাঁর অপেক্ষা বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলেন এবং জ্ঞান-গরিমায় তাঁর তুলনায় নিকৃষ্টও ছিলেন না, পক্ষান্তরে যাঁহাদের মধ্যে কেহ কেহ ইমাম মালিকের উসতাযও ছিলেন, এরূপ বিদ্বানের সংখ্যা মুষ্টিমেয় নয়। হাফেজ ইবনে আবদুল বর নিম্নলিখিত বিদ্যা-মহার্ণবগণকে ইমাম মালিকের রেওয়ায়তে হাদীসের ছাত্ররূপে গণনা করিয়াছেন: ইয়াহইয়া বিনে সঈদ আল আনসারী, আবুল আসওয়াদ মুহাম্মদ বিনে আবদুর রহমান ইবনে নওফল আল আসাদী আল কুরয়াশী, যিয়াদ বিনে সাদ খুরাসানী, ইমাম আবু হানীফা নু'মান বিনে সাবিত কুফী, সুফিয়ান সওরী, সুফিয়ান বিনে উআয়না, শো'বা বিনুল হাজ্জাজ, ইমাম আওযায়ী, ইমাম লয়েস বিনে সাদ মিস্ত্রী। ইহাদের মধ্যে সুফিয়ান বিনে উআয়না ব্যতীত অন্য সকলেই ইমাম মালিকের জীবদ্দশাতেই মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছিলেন। [আল্ ইন্তিকা, ১২ পৃষ্ঠা]।।

আর যাঁহারা প্রকৃতই ইমাম সাহেবের নিকট হইতে বিদ্যা অর্জন করিয়াছিলেন, হাফেজ দারুকুতনী স্বীয় গ্রন্থে তাঁহাদের সংখ্যা সহস্রাধিক নির্ণয় করিয়াছেন। আমরা এই জনসমুদ্র হইতে মাত্র কয়েক জনের নাম নিম্নে উল্লেখ করিতেছি: আবদুল্লাহ বিনুল মুবারক, ইয়াহইয়া বিনে সঈদ আল কাতান, আবদুর রহমান বিনে মহদী, ইবনে ওয়াহহাব, ইবনুল কাসেম, কান্নবী, আবদুল্লাহ বিনে ইউসূফ, সঈদ বিনে মনসূর, ইয়াহইয়া বিনে ইয়াহয়া নেশাপুরী, ইয়াহয়া বিনে ইয়াহয়া অন্দুলুসী, ইয়াহয়া বিনে বুকাই, কোতায়বা, আবু মাসরব যুবায়রী, আবু হুযায়ফা সহমী, মুহাম্মদ বিনুল হাসান শয়বানী ও ইমাম মুহাম্মদ বিনে ইদ্রীস শাফেয়ী।

ইমাম মালিকের ছাত্রমন্ডলীর তালিকা অভিনিবেশ সহকারে পাঠ করিলে একটি চমৎকার ব্যাপার পরিলক্ষিত হইবে। অর্থাৎ দেখিতে পাওয়া যাইবে যে, আহলে সুন্নাতগণের মধ্যে প্রচলিত প্রসিদ্ধতম মযহবগুলির উদ্ভব কেন্দ্ররূপে ইমাম মালিক পরিগণিত হইয়াছেন। ইরাকের ফকীহগণের অধিনায়ক ইমাম আবু হানীফাকে যেরূপ ইমাম মালিকের রেওয়ায়তে হাদীসের ছাত্র মন্ডলীতে দেখা যাইতেছে— ইমাম আহমদ বিনে হাম্বলের উস্তায ইমাম শাফেয়ীও সেইরূপ ইমাম মালিকের ছাত্রদলে দৃশ্যমান হইতেছেন। ইমাম আবু হানীফাকে বাদ দিলেও হানাফী মযহবের সংকলিয়তা ইমাম মুহাম্মদ বিনুল হাসান যে ইমাম মালিকের প্রত্যক্ষ এবং বিশিষ্ট ছাত্র, সে বিষয়ে মতভেদের অবকাশ নাই। সুতরাং তাঁর সাগর তীর্থে হানাফী, মালিকী, শাফেয়ী, হাম্বলী ও যাহেরী সমুদয় আহলে মযহবকে আসিয়া মিলিত হইতে হইয়াছে— রাযিয়াল্লাহু আনহু।

ফন্ট সাইজ
15px
17px