📄 রাসূলুল্লাহর [সা] হাদীসের প্রতি ... শ্রদ্ধা
দারুল হিজরত মদীনা-তাইয়েবার ইমাম হযরত মালিক বিনে আনস (রহ) রাসূলুল্লাহর (সা) পবিত্র হাদীসসমূহের প্রতি কিরূপ অসামান্য শ্রদ্ধা পোষণ করিতেন, সে সম্পর্কে ইমাম সাহেবের অন্যতম ছাত্র স্বনামধন্য মুহাদ্দিস ও মুজাহিদ হযরত আব্দুল্লাহ বিনুল মুবারক (১১৮-১৮১ হিঃ) এক রোমাঞ্চকর ঘটনা বিবৃত করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, একদা আমি ইমাম সাহেবের খিদমতে উপস্থিত ছিলাম, তখন তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস রেওয়ায়ত করিতেছিলেন। ইতিমধ্যে একটি বৃশ্চিক দশ বারের অধিক ইমাম সাহেবকে দংশন করে, তাঁর বদন মন্ডল বিবর্ণ হইয়া যায়, কিন্তু তিনি অঙ্গ সঞ্চালন পর্যন্ত না করিয়া সমানভাবে হাদীসের রেওয়ায়ত করিতে থাকেন। রেওয়ায়ত শেষ হইলে বৃশ্চিকটি দূরে নিক্ষিপ্ত হয়। ইবনুল মুবারক এ বিষয়ে ইমাম সাহেবকে জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলেন, স্বীয় ধৈর্য্য শক্তি প্রদর্শন করার জন্য এরূপ করি নাই, রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসের প্রতি সম্মানের বশবর্তী হইয়াই আমাকে এই কার্য করিতে হইয়াছে। [যুরকানীর শরহে মুআত্তা, উপক্রম ভাগ (১), ৩ পৃষ্ঠা]।।
📄 কূপমণ্ডুকতা বিরোধী নীতি
বর্তমান জগতে ইলমুল হাদীসের প্রাচীনতম ও শ্রেষ্ঠতম সম্পদ হইতেছে "মু'আত্তা ইমাম মালিক"। ইমাম সাহেব সুদীর্ঘ চল্লিশ বৎসরের কঠোর পরিশ্রমে এই অমূল্য গ্রন্থ সংকলিত ও সুসম্পাদিত করিয়াছিলেন। খলিফা মনসুর আব্বাসী এই অপূর্ব গ্রন্থের বৈশিষ্ট্যে মুগ্ধ হইয়া হজ্জ করিতে আসিয়া ইমাম সাহেবের নিকট প্রস্তাব করেন, ‘আমি আপনার প্রণীত গ্রন্থগুলি নকল করাইয়া মুসলিম অধ্যূষিত নগরসমূহে প্রেরণ করিতে এবং সর্বত্র এই আদেশ প্রচার করিতে চাই যে, সকলকে শুধু আপনার গ্রন্থগুলিরই অনুসরণ করিতে হইবে এবং কেহ ওগুলিকে অতিক্রম করিয়া চলিতে পারিবে না।’
ইমাম সাহেব খলিফার প্রস্তাবের উত্তরে বলিলেন, "আমীরুল মু'মেনীন! আপনি কদাচ এরূপ কার্য করিবেন না। কারণ "মুআত্তা" সংকলিত হইবার পূর্বেই বিভিন্ন উক্তি জনগণের হস্তগত হইয়াছে এবং তাঁহারা হাদীসসমূহ শ্রবণ করিয়াছেন এবং বিভিন্ন রেওয়ায়ত বিদ্বানগণ বর্ণনা করিয়াছেন, যেরূপ উক্তি যে দলের হস্তগত হইয়াছে, তাঁহারা তাহাই অবলম্বন করিয়াছেন, এই ভাবে ব্যবহারিক বিষয়সমূহে বিদ্বানগণের মতভেদ জনগণের মধ্যে ছড়াইয়া পড়িয়াছে। অতএব প্রত্যেক নগরের অধিবাসীবৃন্দ তাহাদের জন্য যে যাহা অবলম্বন করিয়াছেন, আপনি তাঁহাদিগকে সেই অবস্থাতেই থাকিতে দিন।"
শাহ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দিস স্বীয় গ্রন্থে লিখিয়াছেন যে, আর একটি বর্ণনা সূত্রে খলিফা হারুনর রশীদও ইমাম মালিকের নিকট তাঁর গ্রন্থ 'মুআত্তাকে' পবিত্র কা'বার প্রাচীর গাত্রে ঝুলাইয়া দিবার এবং জনমণ্ডলীকে তাঁর অনুসরণে বাধ্য করার প্রস্তাব উত্থাপিত করিয়াছিলেন। ইমাম সাহেব তদুত্তরে হারুনর রশীদকে বলেন, "আপনি এরূপ করিবেন না, কারণ রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীগণের মধ্যে ব্যবহারিক বিষয়সমূহে মতভেদ ঘটিয়াছিল আর এইভাবেই তাঁহারা বিভিন্ন দেশে ছড়াইয়া পড়িয়াছিলেন! তাঁহাদের সমুদয় মতভেদ অতিক্রান্ত সুন্নাতরূপে পরিগৃহীত!" খলিফা হারুন বলিলেন, ‘হে আবু আবদুল্লাহ, আপনার মহানুভবতাকে আল্লাহ বর্ধিত করুন।’ [হুজ্জাতুল্লাহেল বালেগা ১৫০ পৃষ্ঠা]।।
নির্দিষ্ট কোন মযহবে জনমণ্ডলীকে সমবেত হইবার জন্য বাধ্য করা জ্ঞানের সম্প্রসারণ ও গবেষণার পক্ষে হানিকর, হারুনর রশীদও যে তাহা বুঝিতেন, তাঁর শেষ কথায় ইহা স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। এই ঘটনা দ্বারা একদিকে যেমন ইমাম মালিকের জ্ঞানের প্রখরতা ও তদীয় গ্রন্থ 'মুআত্তার' গৌরব গরিমা প্রতিপন্ন হইতেছে, তেমনি ইহাও প্রমাণিত হইতেছে যে, ইমাম মালিক তাঁর মযহবে জনসাধারণকে সমবেত করার কার্য্যে সম্মতি দেন নাই।
📄 রাসূলুল্লাহর [সা] প্রতি অনাবিল শ্রদ্ধা
রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীসের প্রতি ইমাম মালিকের অনাবিল শ্রদ্ধার বিবরণ পাঠকগণ ইতিপূর্বে শ্রবণ করিয়াছেন, এক্ষণে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা) প্রতি ইমাম সাহেবের সীমাহীন ও গভীরতম ভক্তির পরিচয় তাঁর দৈনন্দিন জীবনের একটি আচরণ হইতে গ্রহণ করুন। দুর্বলতা ও বার্ধক্য সত্ত্বেও ইমাম সাহেব তাঁর মৃত্যুকাল পর্যন্ত মদীনার বুকে কোন দিন কোন যানবাহনে আরোহণ করেন নাই। কেহ বিশেষভাবে অনুরোধ করিলে তিনি বলিতেন, "লা আরকাবু ফী মদীনাতি ফিহা জুসসাতু রাসূলিল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা মাদফূনাহ— যে মদীনার মাটির নীচে রাসূলুল্লাহর (সা) পবিত্র দেহ সমাহিত রহিয়াছে, সেই মদীনার বুকের উপর আমি কোন যানবাহনে উঠিতে পারি না।" [ইবনে খল্লকান (১) ৪৪৯ পৃঃ; শযরাতুয যাহব (১), ২৮৯ পৃঃ]।।
মুহাম্মদ আরবী (সা) উভয় জগতের আবরূ,
যে তাঁর দুয়ারের মাটি নয়, তার কপালে মাটি!
📄 মৃত্যু শয্যায় ইমাম
হাফেজ হুমায়দি "জযওয়াতুল মুকতাবিস" গ্রন্থে ইমাম মালিকের অন্যতম ছাত্র আবদুল্লাহ বিনে মুসলিমা কাত্মবীর প্রমুখাৎ বিবৃত করিয়াছেন যে, ইমাম মালিকের মৃত্যু শয্যায় আমি তাঁহাকে দর্শন করিতে গমন করি। সালামের পর আমি তাঁর শয্যা পার্শ্বে উপবেশন করিয়া দেখিতে পাই, তিনি অশ্রুবর্ষণ করিতেছেন। আমি আরয করিলাম, আবু আবদুল্লাহ, আপনি কাঁদিতেছেন কিসের জন্য? ইমাম সাহেব আমাকে প্রত্যুত্তরে বলিলেন:
"ইয়া ইবনে ক্বাননাব, মালী লা আবকী ওয়ামান আহাক্কু বিল বুকা-ই মিন্নী? ওয়াল্লাহি লা ওয়াদ্দাদ্দতু আন্নী যুরিবতু বিকুল্লি মাসআলাতিন আফতাইতু ফিহা বিরা’য়ী বি-সাওতিন সাওতিন, ওয়া ক্বাদ কানাত লিয়াছ সা’আতু ফিহা ক্বাদ সাবাক্বাত ইলাইয়্যা ওয়া লাইতানী লাম আফতি বি-রা’য়ী!"
অর্থাৎ— ওগো কানবের পুত্র, আমি কাঁদিব না কেন? আমি যদি না কাঁদি, তাহা হইলে আর কাঁদিবে কে? আল্লাহর শপথ! আমি যতগুলি ফতওয়া কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট নির্দেশ ছাড়া স্বীয় ব্যক্তিগত বিচার বুদ্ধির সাহায্যে প্রদান করিয়াছি, সেগুলির প্রত্যেকটির বিনিময়ে এক একটি করিয়া কোড়ার আঘাত সহ্য করা আমার পক্ষে উত্তম ছিল। অথচ এরূপ ফতওয়ায় নিরস্ত থাকা আমার সাধ্যাতীত ছিল না! হায় দুর্ভাগ্য! যদি ব্যক্তিগত বিচার বুদ্ধি প্রয়োগ করিয়া আমি ফতওয়া প্রদান না করিতাম! [ইবনে খল্লকান (১), ৪৩৯ পৃঃ]।।